পদ্মার ঢেউ রে......
সুবর্ণ আকাশ, সোমবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১২


আপনাদের মনে পড়বে, ফেরদৌসী রহমানের কন্ঠে বহুবার শোনা একটি নজরুল গীতি ‘পদ্মার ঢেউ রে...’ এবং কাছাকাছি সুরে ‘মাঝি বাইয়া যাও রে...’ বা একই সুরে গাঁথা ‘মুজিব বাইয়া যাও রে...’
পদ্মার কী অবস্থা আজ? ফারাক্কার প্রভাবে সেকি মৃত প্রায়? নাকি প্রবল বর্ষায় এখনও ডোবায় তার দুই কূলের গ্রাম-গঞ্জ? বাঙ্গালির পাতে এখনো কি পদ্মার ইলিশ নুন মরিচের ঝোলে সাঁতার কেটে রসনার সমুদ্রে ঝাপ দেয়?
পদ্মায় নাকি ব্রিজ হবে। টাকা দেবে কি দেবে না বিশ্ব ব্যাঙ্ক এই নিয়ে গঞ্জের হাটে চায়ের দোকানে কথা বলাবলি হয়। দূর্নীতির নাকি কিছু আলামত পাওয়া গেছে। হাসিনা বললো কিসের কি? ওরা না দিলে দেশের মানুষের টাকা দিয়ে হবে,হবেই হবে। তো চাঁদা তোলা শুরু হলো। পরে দেখা গেল, পদ্মার নামে চাঁদা তুলছে সবাই। এক মন্ত্রী বললো, মালয়েশিয়া দেবে। মুহিত বললো নাহ চাঁদাবাজি করে হবে না, এদিক-ওদিক হাত বাড়িয়েও লাভ নেই। বিশ্বব্যাঙ্ক-ই আমাদের ত্রাণ কর্তা। দেখি শর্তগুলো মানা যায় কিনা। জানা গেল,এক মন্ত্রী পদত্যাগ করলেই হবে না।আরও একজন উপদেষ্টাকে যেতে হবে,ছুটিতে গেলেও চলে।
কিন্ত না,বিপদ আরও আছে। কানাডা পুলিশ নাকি তদন্ত শুরু করতে পারে। কিসের তদন্ত? সে এক অজানা রহস্য।
তবে সংবাদ মাধ্যমগুলো খবর দিচ্ছেঃ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের শেষ শর্ত পূরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও চিন্তিত সরকার। সরকার নিশ্চিত, মসিউর চলে গেলে পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে। কিন্তু শর্ত পূরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামাল দেওয়াটাও সরকারের কাছে এখন দুশ্চিন্তার বিষয়।
বিশেষ করে, কানাডা পুলিশের তদন্ত নিয়েই সরকার বেশি উদ্বিগ্ন।
সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি সূত্র গতকাল রোববার প্রথম আলোকে জানিয়েছে, পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য বিশ্বব্যাংককে রাজি করাতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক শর্ত পূরণ থেকে একটুও সরছে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে তাঁর পদে রেখে বিশ্বব্যাংকের অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এ অবস্থায় পুরো বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলে আছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থ পাওয়া অথবা মসিউরকে পদে বহাল রাখা—দুটির একটিকে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সরকারকে সুরাহা করতে হবে। কারণ, পদ্মা সেতু প্রকল্পের আরেক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা তাদের ঋণ কার্যকরের মেয়াদ তিন সপ্তাহ, অর্থাৎ ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ কার্যকরের মেয়াদ আছে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
গত ৩১ আগস্ট এ দুই সংস্থার ঋণ কার্যকরের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছা যাবে—এ বিবেচনা থেকেই এডিবি ও জাইকাকে সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছিল সরকার। এ দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থাও সরকারের প্রতি আস্থা রেখে সময় বাড়ায়। এর আগেও এডিবি ও জাইকা এক দফা সময় বৃদ্ধি করে। কিন্তু এবার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে এডিবি ও জাইকাও পুরোপুরি সরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংককে ঋণচুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে রাজি করাতে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে ওয়াশিংটনে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও গওহর রিজভীর ওয়াশিংটন যাওয়ার কথা গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন। তবে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পরই তিনি ওয়াশিংটনে যাবেন। এ ব্যাপারে গতকাল গওহর রিজভীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এদিকে মসিউর রহমান এখনো স্বপদেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। গত শুক্রবার ভারত থেকে দেশে ফিরে তিনি বিমানবন্দরে গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে মিথ্যা অপবাদ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন না বলে জানান। তিনি সে সময় বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংকের কাছে যদি দুর্নীতির প্রমাণ থেকে থাকে, তারা তা দিক।’
মসিউর রহমানের এই অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি সূত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার প্রমাণ উপদেষ্টা চাইতেই পারেন। তবে সেটি সময়ের ব্যাপার। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অপেক্ষার সুযোগ রয়েছে কি না, তা-ও দেখার আছে। তবে বাংলাদেশকে যা করার তা ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই করতে হবে।
ওই সূত্রটি মনে করে, পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে এ মুহূর্তে যা করার তা বাংলাদেশকেই করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে দুটি পথই খোলা রয়েছে। একটি হচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের সব শর্ত মেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া। অন্যটি, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নের বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবা।
এদিকে সরকারের আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাংকের শর্ত মানা হলেও দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত বন্ধ হচ্ছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিশ্বব্যাংকের একটি প্যানেলের মাধ্যমে যৌথভাবে পরিচালিত ওই তদন্তের ফলাফল কী হবে, তা সরকার জানে না। এখন পদত্যাগ করার পরও যদি ওই তদন্তের ফল সরকারের জন্য নেতিবাচক হয়, তা হলে কী হবে, এ প্রশ্ন থেকে যায়। এ ছাড়া কানাডায় যে মামলা চলছে তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও সেই মামলায় যদি সরকারের জন্য বিব্রতকর কোনো তথ্য বের হয়ে আসে, তখনই বা কী হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদত্যাগ করলেই তদন্ত এবং মামলার ফলাফল বদলাবে না। আবার পদত্যাগের শর্ত পূরণ না হলেও বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে আসবে না। এটা সরকারের জন্য এক ‘উভয় সংকট’ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনাও হচ্ছে বলে জানা যায়।
সরকারের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্রটি আরও বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আর বিশ্বব্যাংক যদি সেতু প্রকল্পে অংশ না নেয়, তা হলে সেটি হবে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, দাতাদের সাহায্য ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত হবে।
গত ২৯ জুন পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। সে সময় অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কয়েকটি শর্ত দেয় বিশ্বব্যাংক। শর্তগুলো হচ্ছে, মন্ত্রী ও উপদেষ্টাসহ যেসব সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিদায় অথবা ছুটি দেওয়া, অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদকের অধীনে একটি বিশেষ তদন্ত দল নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা একটি প্যানেলের কাছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সব তথ্যের পূর্ণ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকারে সরকারের সম্মতি দেওয়া, যাতে এ প্যানেল তদন্তের অগ্রগতি, ব্যাপকতা ও সুষ্ঠুতার ব্যাপারে উন্নয়ন সহযোগীদের নির্দেশনা দিতে পারে।
মসিউর রহমান ছাড়া আর সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও বিশেষ তদন্ত দল তৈরি করেছে। ফলে এখন মসিউর রহমানের পদত্যাগ প্রশ্নেই পুরো বিষয়টি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়ে গেছে।

*বাংলাদেশে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে এ কাহিনী রচিত।
আসুন আমরা এখন নীচের এই লিঙ্ক-এ ক্লিক করে গানটি শুনি।

লিঙ্ক