রোকনউদ্দিন মাহমুদ এবং আইনজীবী প্রসঙ্গ ।। আনিস আলমগীর
এইদেশ উপস্থাপনা, বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৩, ২০১৪


সাম্প্রতিক আদালত-আইনজীবী বনাম সাংবাদিক বিরোধে ব্যারিষ্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ একটি আলোচিত চরিত্র হিসেবে সামনে এসেছেন সাংবাদিকদের কাছে। দেশবাসীর কাছেও। কারো কারো কাছে তিনি মিডিয়া এনিমি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন


আমি এই বিরোধ নিয়ে একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছি বুধবার। সেখানে রোকনউদ্দিনের কর্মকাণ্ড নাম ধরে বলেনি বলে সাংবাদিকদের কেউ কেউ ইনবক্সে কারণ জানতে চেয়েছেন। তাদের আরও মনে হয়েছে আমি বোধহয় তার পক্ষ নিয়ে কথা বলেছি। একজন সাংবাদিক বড় ভাই ফোন করেছেন এটা জানানোর জন্য- তিনি আমার প্রায় লেখা, ফেইসবুক স্ট্যাটাসের সঙ্গে একমত হলেও, এখানে আমি রোকনউদ্দিনের মতো নাকউঁচু লোকের বক্তব্য নিয়ে কিছু না বলায় মনে কষ্ট পেয়েছেন। আমি ব্যাখ্যা না দিলে নাকি অনেকে ভুল বুঝতে পারেন। মূলত তার জন্যই রোকনউদ্দিন সম্পর্কে মুখ খুলতে হচ্ছে।




এই লোকটির সঙ্গে আমার কোনও ব্যক্তিগত যোগাযোগ নেই। কখনো তেমন কথা হয়েছে বলেও মনে পড়েনা। কিন্তু ১/১১ এর কালে তার ভূমিকায়, আমার একজন সহকর্মীর সঙ্গে বিনা কারণে অত্যন্ত অন্যায় আচরণ করার জন্য তার প্রতি আমার যে ঘৃণা জমে আছে সেটা এখনো কাটেনি। আবার তাকে জানানোরও প্রয়োজন বোধ করিনি।




আমি তখন বৈশাখী টিভিতে হেড অব নিউজ। আদিষ্ট হয়ে প্রায় প্রতিদিন তার লম্বা লম্বা সিঙ্ক প্রচার করছি। কারণ একটু ছোট হলে ফোন আসতো, এমনকি তিন মিনিট লম্বা তার সিঙ্কও আমাকে ‘নিউজ নামে’ হজম করতে হয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে আমিরুল মোমেনিন মানিক নামে আমার এক সহকর্মী, যে আদালত বিট-এর রিপোর্ট করতো, একদিন চরম ভয়ার্ত, প্রায় কাদো কাদো চেহারা নিয়ে আমাকে জানাল, তার চাকরি থাকবেনা। কারণ আজ রোকনউদ্দিন তার চেম্বারে মানিককে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে করতে সে হুমকি দিয়েছেন। ক্যামরাম্যান আবার সেগুলো রেকর্ড করে রেখেছে রোকনউদ্দিনের অজান্তে। জানলাম, মানিক তাকে প্রশ্ন করেছিল- এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কয়দিন থাকবে সংবিধান অনুসারেতো তাদের তিন মাস থাকার কথা। রোকনউদ্দিন তার সুন্দর একটা ব্যাখ্যা না দিয়ে, অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তাকে এবং সাংবাদিক সমাজকে অশিক্ষিত, সংবিধান জানে না ইত্যাদি ইত্যাদি গালি দেয় এবং কোন সাহসে এই প্রশ্ন করেছে সে অপরাধে তার চাকরি খাওয়ার হুমকিটি দিয়ে রাখে।




আমি সমস্ত ঘটনাটি শুনে তাকে শুধু একটু বলে রাখলাম, চাকরি কিভাবে খায় আমি দেখবো , তুমি শুধু ক্যাসেটটি যত্ন করে রেখে দাও, প্রয়োজনে অনএয়ার হবে। মানিক এ ঘটনা তার একটি বইতে প্রকাশ করেছে, অনেকে হয়তো পড়েছেন।




সেই রোকনউদ্দিন যখন মিজান খানের মামলা নিয়ে সাংবাদিকদের উপর অতি সম্প্রতি তার রাগ ঝাড়ছেন তখন আমি বিস্মিত হইনি। কারণ এগুলোতো তার পুরাণ কথা, নতুন লাগছে হয়তো তাদের কাছে যারা মিজানের ঘটনায় প্রথম তার এ ধরনের বয়ান শুনছেন। যারা আদালত বিট করেন তারা হয়তো রোকনউদ্দিনকে আমার থেকে আরও ভালোভাবেই চেনেন।




রোকনউদ্দিন ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের যেভাবে গালি দিচ্ছেন, সেভাবে আমাদের কেউ কেউ আবার এক রোকনউদ্দিনকে দেখে সমগ্র আইনজীবী সমাজকে দেখছেন। ঢালাওভাবে আদালত এবং আইনজীবী পেশাকে সমার্থক করে দেখছেন। রোকনউদ্দিনের নামে ফেইসবুকে তাদের নানা বিরূপ স্ট্যাটাস দেখছি। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী, এমনকি রোকনউদ্দিনকে কটু কথা বলতেও আগ্রহী নই। আমি তার কাতারে নামতে পারবো না। শুধু তাকে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দেব- কোন এক জামাত শিবিরের চর সাংবাদিকের লেখার জন্য তিনি সমগ্র সাংবাদিক সমাজের চরিত্রহরণ করতে পারেন না। তাদের সবার ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন না। যদি সাংবাদিকরা দায়িত্বহীন হতো উনার ফুলের মতো চরিত্র নিয়ে যেসব কেচ্ছা সাংবাদিকদের কানে আসে, তা পত্রিকায় পাতায় এতোদিনে সংবাদ হিসেবে মুদ্রিত হয়ে যেতো।




আইনজীবী সম্প্রদায়ের প্রতি আমি কি খুব প্রীত? মোটেও না, যদিও আমার অনেক আইনজীবী বন্ধু আছেন এবং আমি তাদের প্রতি অনেক প্রীত। অনেকের কর্মকাণ্ডে খুশি। এ প্রসঙ্গে আজ আইনজীবীদের নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা না জানিয়ে পারছি না। আমিই সেই অসহায় সাংবাদিক যার বিরদ্ধে সারাদেশের আইনজীবীরা দল বেধে প্রায় ৬৪ জেলায় মানহানীর মামলা করেছেন ২০০১/০২ সালের দিকে। আইনজীবীদের আচরণ নিয়ে ‘আজকের কাগজ’-এ প্রকাশিত আমার একটি মন্তব্য প্রতিবেদনের জন্য ঢাকায় সিএমএম আদালতে যে মামলা হয়েছে তার বাদী ছিলেন বারের সাধারণ সম্পাদক। মামলায় তিনি বর্ণনা করেছেন লেখাটা পড়ে তিনি নাকি তাদের অফিসে মূর্চা গিয়েছিলেন এবং তার অমুক তমুক সহকর্মী সে ঘটনার স্বাক্ষী। আদালত আমাকে সপ্তাহে ২ বার হাজিরার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতি রবিবার আর বুধবার। আমার সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ হাজির না হওয়ায় তার সম্পক্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন এবং পরে জামিন দিয়েছেন।




আদালতপাড়ায় আমার সেইসব দিনগুলি ছিল খুবই মানসিক নির্যাতনের। আমারপক্ষে কোনও উকিল লড়তে পারবে না বলেও আইনজীবীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শুধু আজকের কাগজের ‍অফিসিয়াল দুই আইনজীবী আমার পক্ষে নামকাওয়াস্তে দাঁড়াতেন এবং ওদের নানা কটু কথা শুনতেন। বিপক্ষে শতাধিক উকিল। ওরা যে যেমন পারতেন আমাকে মুখে ফায়ার করতেন বিচারপতির সামনে। মহিলা কয়টা উকিল এতো বাজে আচরণ করতেন বলার মতো না। তারমধ্যে সবচেয়ে ভদ্রবাক্য হচ্ছে ‘নিজেইতো শয়তান, আমাদেরকে বলে শয়তান..’। অঙ্গভঙ্গির কথা নাই বললাম।




দিনের পর দিন আমি সব সহ্য করেছি। কোনদিন অন্য উকিলদের এর জন্য দায়ী করিনি। পাল্টা তাদের বিরুদ্ধে লিখিনি। আদালতে ওদের খারাপ ব্যাবহারের উত্তর দিইনি। সাংবাদিক হয়েছি বলে আইনের উর্ধ্বে নিজেকে ভাবিনি এবং সাংবাদিক জমিয়ে আদালতে হৈ হুল্লা করিনি। কিছু সাংবাদিক আমাদের পক্ষে তখন দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকরা আমাকে এবং আমাদের সম্পাদককে হয়রানীর নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাকিতা বিভাগের আমার শিক্ষক, বিভাগের প্রাক্তন- বর্তমান স্টুডেন্টরা মিলে আমার জন্য বিবৃতি দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে আমি সেই হয়রানী থেকে রেহাই পেয়েছি।




সে কারণেও আমি আমাদের উচ্চ আদালতের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল। সে প্রতিষ্ঠানকে যখন কেউ ধ্বংস করতে চায়, ষড়যন্ত্রকারী যত বড় শক্তিধর হোক, তাদের সাজা হওয়া দরকার মনে করি! আদালতের মর্যাদাকে কোনও অবস্থায় ভূলণ্ঠিত করে দেওয়া যাবে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত। সেটা যেমন রাষ্ট্রকে, আদালতকে দেখতে হবে তেমনি সংবাপত্রের স্বাধীনতার নামে আদালতের মর্যাদাকে বিনাশ করার কোনও অধিকারও সংবাপত্রের নেই। আমাদের আদালত, টিউডর যুগের স্টার চেম্বার নয়।

আনিস আলমগীরঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক।