শাহবাগের পর কী? ।। সলিমুল্লাহ খান
এইদেশ সংগ্রহ, বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৪


গত বছর ফেব্রুয়ারি মাস হইতে যে গণআন্দোলন শুরু হইয়াছে তাহার এক বছর পার হইতেছে। এই এক বছরে প্রায় এক যুগের মতন ঘটনা ঘটিয়াছে। শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলন দেখা দেওয়ার পর ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও কম দেখা দেয় নাই। একটা প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসাধারণের ধর্মানুভূতি ব্যবহার করিয়া এই আন্দোলনকে দুর্বল করা। ইঁহারা প্রচার করিয়াছিলেন শাহবাগের আন্দোলন নাস্তিক ছেলেপিলেদের আন্দোলন মাত্র। দ্বিতীয় ধরনের প্রতিক্রিয়াটি ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা করিয়া সাম্প্রদায়িক উস্কানির সৃষ্টি করা। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হয়তো আশা করিয়াছিল হামলার মধ্যস্থতায় প্রতিবেশি দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরও সক্রিয় করা যাইবে। দেশে দেশে দাঙ্গা বাঁধিয়া যাইবে। সৌভাগ্যের মধ্যে, তাহারা ষোল আনা সফল হয় নাই।

এই সমস্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী মহল মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় লইয়াছিল। ইহাতেই প্রমাণ তাহাদের ভিত্তি দুর্বল ছিল। এই জাতীয় মিথ্যা প্রচারণার মধ্যে সবচেয়ে জ্যান্ত মিথ্যাটি ছিল ৫ মে মতিঝিলের জমায়েতকে কেন্দ্র করিয়া। যাহারা বলিয়াছিলেন সেদিন দিবাগত রাত্রে মতিঝিলে কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষ নিহত হইয়াছিলেন তাহারা কিন্তু এখনও বোবা হইয়া যান নাই।



১৯৭১ সনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা খুঁটি ছিল গণতন্ত্র বা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার। সেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াই বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অটুট ঐক্যের পরিচয় দিয়াছিল। তাহার পরও পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি সামরিক বলপ্রয়োগ করিয়া এই জাতির ইচ্ছাশক্তিকে খামোশ করিতে চাহিয়াছিল। পাকিস্তানের হাতে তখন হাতিয়ার ছিল একটাই– ধর্ম, পবিত্র ধর্ম এসলাম। বিপদের দিনে এসলামের দোহাই পাকিস্তানকে রক্ষা করিতে পারে নাই। কারণ খোদ ধর্মই তাহাদের পক্ষে ছিল না।

শাহবাগে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদের মোকাবেলায় দেখা যাইতেছে যুদ্ধাপরাধী পক্ষের হাতেও সেই একই ধর্মাভিমানের অতিরিক্ত কোনো নতুন ন্যায়, নতুন যুক্তি ছিল না। ইহাই তাহাদের মূল দূর্বলতা। তাই তাহাদিগের আশ্রয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল একের পর এক মিথ্যাপ্রচার আর গুজব রটানো। তাহাতেই মনে হইতেছে শাহবাগের তরুণেরা তিষ্ঠিয়া গিয়াছেন। শাহবাগের তরুণজাতি তিষ্ঠিয়াছে প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের জোরে।

শাহবাগ কি তাহা হইলে সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হইয়াছে? উত্তরে ‘হা’ বলিতে পারিলে খুশি হইতাম। বাংলাদেশ কায়েম হইয়াছে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের অনুগত থাকিয়া। বাংলাদেশকে যদি টিকিয়া থাকিতে হয় তাহাও থাকিতে হইবে একই নীতিতে অটল থাকিয়া। প্রশ্ন উঠিবে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্র কী পদার্থ?

৫ জানুয়ারির পর দেশের রাজনীতিতে একটা আপাত-পরিবর্তন ঘটিয়াছে। গত একবছর ধরিয়া যে ধরনের হত্যা, নির্যাতন আর বলাৎকারের ঘটনা দেশে ঘটিয়াছে এই মুহূর্তে তাহাতে একটা চিড় ধরিয়াছে। একথা সত্য। কিন্তু সেই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটিবে না তাহা কি কেহ হলপ করিয়া বলিতে পারেন?

হত্যা, নির্যাতন ও বলাৎকার বন্ধ করার একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ জনসাধারণের মধ্যে ন্যায়ের অনুরাগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বিরাজমান রাষ্ট্র যদি নিজেই সেই ন্যায়ের সীমা প্রতিদিন লঙ্ঘন করিতে থাকে তবে এই রাষ্ট্রের শত্রুর প্রয়োজন পড়িবে না। সে নিজেই নিজের কবর খুঁড়িতে যথেষ্ট হইবে।

শাহবাগের আন্দোলনকে অনেকে লিঞ্চিঙ্গের দাবি বলিয়া গালি দিয়াছিলেন। উত্তর আমেরিকার দাক্ষিণাত্যে চার্লস লিঞ্চ বলিয়া এক দুর্বৃত্ত দাসমালিক কালো মানুষ ধরিয়া ধরিয়া বিনা ওজরে ফাঁসিতে লটকাইত। তাহা হইতে এই লিঞ্চিং নামটা আসিয়াছে। অথচ শাহবাগ বিনাবিচারে কাহারও হত্যা দাবি করে নাই। তাহারা দাবি করিয়াছিল বিচারের। অথচ এখন দেশে যে সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যার ঘটনা অহরহ ঘটিতেছে শাহবাগ কেন তাহার বিরুদ্ধে কিছুই বলিতে পারিতেছে না? ইহাতেই শাহবাগের পেছন দরজা। এই চোরাপথেই শত্রু তাহার সর্বনাশ করিতেছে। এইখানেই শাহবাগকে সাবধান হইতে হইবে। শাপলা দিয়া শাহবাগ-বধ সম্পন্ন হয় নাই। সাপ দিয়া হইতে পারে।

১৯৭১ সালে যাহারা জাতির সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল, যাহারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের দাবিকে উপেক্ষা করিয়া হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর বলাৎকারের সহিত সহযোগিতা করিয়াছিল, তাহাদের ন্যায়সঙ্গত বিচারের জন্য জাতি বিয়াল্লিশ বছর অপেক্ষা করিয়াছে, বিনাবিচারে হত্যার দাবি তোলে নাই– একথা ভুলিলে চলিবে না। আর স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাহারা প্রকাশ্যে লড়িতেছে তাহাদের বিচারের দাবিকে কেন পাশ কাটাইতে হইবে?



গত এক বছর ধরিয়া যাহারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করিবার মতলবে দেশব্যাপী হত্যা, নির্যাতন ও বলাৎকার করিয়াছে তাহাদেরও বিচারের মুখামুখি করিতে হইবে। বিচার-বহির্ভূত হত্যা কোনো ওজরেই অনুমোদন করা যাইবে না। কারণ মাত্র এই নহে যে হত্যা শুদ্ধ আরও হত্যা ডাকিয়া আনিবে। মনে রাখিতে হইবে নরকের পথও মঙ্গলালোকের মোমবাতি দিয়াই সাজানো থাকে। শাহবাগের তরুণজাতি যদি আবালবৃদ্ধ জাতির বিবেক হইয়া উঠিতে চাহে তো তাহাকে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের আওয়াজ তুলিতে হইবে। আর গণতন্ত্র শব্দের মধ্যেই কিনা লুকাইয়া আছে মানুষে মানুষে সমানাধিকার, মানুষের মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের দাবি।

শাহবাগের তরুণজাতি কি প্রস্তুত? ভুলিলে চলিবে না বাংলাদেশ না বাঁচিলে গণতন্ত্র বাঁচিবে না। আরও বেশি মনে রাখিতে হইবে গণতন্ত্র না বাঁচিলে বাংলাদেশও জাহান্নামে যাইবে। শাহবাগের পর কী? অনেকেই এই প্রশ্ন তুলিতেছেন। আমরা বলিব শাহবাগের আর পর নাই। শাহবাগের পর শাহবাগই আমাদের জনগণের রক্ষাকবচ।

আহরণঃ বিডিনিউজ২৪