সহিংসতার মূল কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানো : সলিমুল্লাহ খান
এইদেশ সংগ্রহ, মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৩


ড. সলিমুল্লাহ খান কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে ১৯৭৩ সালে মাধ্যমিক (মানবিক) এবং ১৯৭৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিতে। শিক্ষকতা জীবনের শুরু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইবিএ এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে ইউল্যাবের পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত । শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি গবেষণা কাজে সক্রিয়। লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। বই রয়েছে প্রায় ২০টি।

দৈনিক সমকাল-এর কাছে দেয়া সাক্ষাতকারটি এইদেশ-এ তুলে দেয়া হলো।



**************: দেশব্যাপী সহিংসতা-প্রাণহানি চলছে। এর প্রধান কারণ কী?

সলিমুল্লাহ :কম করে হলেও দুটি কারণ আমি বলব। এক. ১৮ দলের কর্মসূচি। তারা ৫ জানুয়ারি ঘোষিত নির্বাচন বর্জন করেছে এবং তারই অংশ এই সহিংস আন্দোলন। এটা অসত্য নয়। তারা হরতাল-অবরোধ ঘোষণা করছে। শেষ বিচারে সহিংসতার দায় খালেদা জিয়ার ওপরে বর্তাবেই। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম বলেছেন, তাদের অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। এটা অনেকটা ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই না প্রবাদের মতো। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের বক্তব্য থেকে অশান্তির পেছনে যে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিথ তার স্বীকৃতিই প্রদান করা হয়। কিন্তু এটা হচ্ছে ঘটনাপ্রবাহের ওপরতলা, ভাসা ভাসা দিক।

**************:তলার দিকটা তা হলে কী?

সলিমুল্লাহ :নির্বাচনী হাঙ্গামা মুখ্য নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুই মুখ্য। সেই অর্থে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত প্রশ্নের পুনরুত্থান।

**************:কীভাবে এর ব্যাখ্যা করবেন?

সলিমুল্লাহ :১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা নির্বাচনী হাঙ্গামা দেখেছি। ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্তও বিস্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তখনও মৃত্যু, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এখনকার সঙ্গে পরিমাণ ও গুণে তার বিস্তর পার্থক্য। একটি সংবাদপত্রে দেখেছি, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতায় অন্তত ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত শত শত। রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং ধ্বংসাত্মক বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে সম্পদহানির বিষয়টি যদি বাদও রাখিথ তা হলে এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি কীভাবে মেনে নেব? চলতি বছরে প্রায় তিনশ' লোকের মৃত্যু হয়েছে রাজপথের সহিংসতায়থ এমন হিসাবও আমরা বেসরকারি সূত্রে জানতে পারছি। এটা নির্বাচনী কারণে নয়, বরং দ্বিতীয় কারণে।

**************:এ পর্যায়ের সূচনা ঘটে কোন সময়ে?

সলিমুল্লাহ :এতক্ষণ সংখ্যা বা পরিমাণের কথা বললাম। এখন গুণগত দিকে আসি। আপনার মনে থাকার কথা, এ বছরের ৫ ফেব্র“য়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্র-তরুণরা, যাদের নতুন প্রজন্ম বলা হয়, শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে সংগঠিত হয়। তারা নতুন ধারার একটি আন্দোলন শুরু করে। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফেব্র“য়ারি থেকে ডিসেম্বর, এই সময়ে যত সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তার ৯০ শতাংশ ঘটানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে। বাকি ১০ শতাংশ নির্বাচনকেন্দ্রিক। এসব হচ্ছে তথ্য। এখন তত্ত্বে আসি। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, তত্ত্ব ছাড়া তথ্য হয় না।

**************:তত্ত্ব কী বলে?

সলিমুল্লাহ :জামায়াতে ইসলামী একটাই অবস্থানে রয়েছে নির্বাচনে তারা যাবে না। এটা তাদের রণনীতি। যুদ্ধাপরাধী বলে যাদের সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বিচার চলছে তাদের বাঁচাতে এই দলের কাছে শ্রেষ্ঠ পন্থা হলোথ নো ইলেকশন। সহিংস উপায়ে সংবিধান-বহির্ভূত পন্থায় তারা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এটা জামায়াতে ইসলামীর সার কথা।

**************:আর বিএনপির?

সলিমুল্লাহ :এ দলটি এই ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত বলতে পারি। প্রথম কথা, তারা যুদ্ধাপরাধ কথাটি বলে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলে না। তারা বলে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচারের কথা। খালেদা জিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বলেছেন 'রাজনৈতিক বন্দি'। এটা হচ্ছে তাদের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার প্রকাশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে তাদের সঙ্গে জামায়াতের সহমত রয়েছে। এটা জোটবদ্ধতার কারণ। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী একা হরতাল দেয়। বাকি হরতাল একসঙ্গে ডাকে। বিএনপির ভেতরে অনেকে যুদ্ধাপরাধ বিষয়টির ফয়সালা চায় বলেই এ কৌশল। বিএনপি যদি বলত, একাত্তরে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার করব, তা হলে হাঙ্গামা কমে আসত। আমরা বলতে পারি, ওই সময়ের অপরাধের যারা বিচার চায় এবং চায় নাথ এভাবে দেশ বিভক্ত।

**************:সরকারও এ বিভক্তির কথা বলছে?

সলিমুল্লাহ :হ্যাঁ, তারা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলছে। বিএনপি বলছে, বিভক্তির মূল কারণ ভিন্নথ ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী। এখানেও বিএনপির দ্বিধা। তারা এখন আর ত্রয়োদশ সংশোধনীর হুবহু প্রয়োগ চায় না। এটা বহাল থাকলেও বিরোধ হতো। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনেক আগেই মৃত। কারণ বিএনপি বলেছে, তারা এ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী যার তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার, সেই বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রহণ করবে না। বলতে পারেন, আওয়ামী লীগ কেবল পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মৃত ত্রয়োদশ সংশোধনীর দাফনের ব্যবস্থা করেছে।

**************:সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীই সব অশান্তির মূলে...

সলিমুল্লাহ :একজন প্রাজ্ঞ লোক কীভাবে এমন চিন্তাহীন কথা বলেনথ ভেবে পাই না। ত্রয়োদশ সংশোধনী বজায় থাকলেও সমস্যা হতো। এর সমাধান কী? সরকার একটা পথ বলছে। বিগত সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হবে। যেমন ভারত কিংবা সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যান্য দেশে রয়েছে। এক সময়ে আমাদের দেশেও ছিল। বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারত। তারা আন্দোলনে আছে। জামায়াতে ইসলামীও আছে। এখন আমাদের এই দুই দলের আন্দোলনকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাতাসে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড রয়েছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কম। কিন্তু ভূমন্ডলে উষ্ণতা বাড়ানোর জন্য এর দায়ই বেশি। বিএনপি বলছে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের নির্বাচনী আঁতাত। বিএনপির যারা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, বুদ্ধিজীবী, তাদের কেউ কেউ বলছেন, সংগ্রাম কমিটি করতে হবে। তারা সহিংসতায় প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমে বোমা মারার কথা বলছেন। কিংবা যে মাত্রায় বোমা-ককটেল মারা হচ্ছে, তা বাড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু এ সহিংসতা কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। বোমা মেরে আন্দোলন জোরদার কেবল নির্বাচনের সময় কী ধরনের সরকার থাকবে তার জন্য নয়। এর বড় কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানো।

**************:কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো জুনিয়র পার্টনার। তাদের ভোট সংখ্যাও খুব বেশি নয়।

সলিমুল্লাহ :আমরা জানি, খাদ্যের পরিমাণ বেশি হলেও ক্ষতি হয় না; কিন্তু সামান্য বিষও ক্ষতির কাজটা করে বেশি। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নিন্দা করে প্রস্তাব পাস হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এর অঙ্গীকার করেছিল। এ দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, আমরা যে আন্তরিক তার প্রমাণ রেখেছি। তারা বিচার করে প্রমাণ করল যে, এতদিন বিচার হয়নি।

**************:পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলছিলেন...

সলিমুল্লাহ :যুদ্ধাপরাধের বিচার যে প্রকৃতই আমাদের জাতীয় ইস্যুথ এক বা দুটি দলের নয়থ সেটা এ ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। ওই দেশের সবাই কাদের মোল্লার ফাঁসির নিন্দা হয়তো করছে না। কিন্তু যারা বাংলাদেশকে উপনিবেশ বানাতে চেয়েছিল, তারা পরাজয়ের ৪২ বছর পরও ক্ষোভ প্রশমিত করেনি। যারা ১৬ ডিসেম্বরের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল কিংবা যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারত হয়ে দেশে ফিরেছিল, তাদের বিচার তারা করেনি। এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচারেও হস্তক্ষেপ করছে। তাদের এ পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যজনক। যদি বিশ্ব সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, তাহলে ন্যূনতম ন্যায়বোধ ও আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা করতে হয়। তারা সেটা করছে না।

**************:সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আস্তিকতা ও নাস্তিকতা ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ :১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল। আসন পেয়েছিল ৯৯ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের আসন ছিল না; ভোট ছিল। গত চার দশকে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা হারায়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। তবে তারা নিষ্পাপ নয়। ২১ বছর পর তারা ক্ষমতায় ফিরে আসে। কিন্তু এই সময়ে দেশের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। যারা মুজিবকে হত্যা করেছে; জিয়াউর রহমান তাদের 'ইনডেমনিটি' দিয়েছেন। গণভোট করেছেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী করেছেন। ইসলামের নামে পাকিস্তানি ধারা ফিরিয়ে এনেছেন। এখন খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের বলছেন, 'ওই সব ছেলেমেয়ে নাস্তিক।' হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর একই সুর। শাহবাগে ঘোষিত কোনো নাস্তিক ছিল না। কিছু ব্লগার, যারা নাস্তিকতার প্রচার করেছে, তাদের কেউ কেউ সেখানে ছিল বলে বিএনপি বলছে। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাহানারা ইমাম গণআদালত গঠন করেছিলেন। সেখানে আহমদ শরীফের মতো ঘোষিত নাস্তিকেরা ছিলেন। এবারে কেউ তেমন ছিলেন না। নাস্তিকতার সংজ্ঞা কীথ এটা কেউ স্পষ্ট বলছে না। কিন্তু এ অভিযোগ শাহবাগে অংশগ্রহণকারীদের ওপর আরোপ করা হয় এবং এটাই জামায়াত-হেফাজত-বিএনপির ঐক্যের ভিত্তি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় পাকিস্তান বলতথ ৬ দফা, ১১ দফা কায়েম হলে পাকিস্তান থাকবে না। আর জামায়াতে ইসলামী বলত, ইসলাম থাকবে না। কারণ, ৬ দফা হলে পাকিস্তান থাকবে না। পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ পুরো স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। ২৫ মার্চেও ধারণা ছিলথ পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে আপস হতে পারে। কিন্তু ৬ দফা মানা হলে পাকিস্তান থাকবে নাথ এই যুক্তিতে ২৫ মার্চ চালানো হয় নৃশংস অভিযান। তারা বুদ্ধিজীবী মারেনি; নাস্তিক মেরেছে। পাকিস্তান এবং জামায়াতে ইসলামী বলেছেথ ১৪ ডিসেম্বর যাদের মারা হয়েছে তারা নাস্তিক এবং পাকিস্তানবিরোধী। এখন নাস্তিক ইস্যু তুলে কার্যত সেই অপরাধই স্বীকার করে নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারা ভালো করেই জানে যে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক নাস্তিক নয়। এটা কেবল পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা। তারা আন্দোলনের জন্য মিথ্যাচার করছে। ফরহাদ মজহার নিজেই 'এবাদতনামা'য় বলেছেন, 'আমি নাস্তিক'। এটা এখনও বাজারে আছে। তিনি শাহবাগের আন্দোলনকারীদের যারা নাস্তিক বলেন, তাদের পাশে রয়েছেন।

**************: কেন এ মিথ্যাচার?

সলিমুল্লাহ :হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবল্স বলতো একটা মিথ্যা হাজার বার বললে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। তারা সেটা সত্য বলে মানে। যুদ্ধে জয়ী হতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া চলে। মিথ্যা কে বলছেথ তার প্রমাণ মাহমুদুর রহমান, আদিলুর রহমান। ৫ মে রাতের অন্ধকারে বাতি নিভিয়ে শাপলা চত্বরে 'হাজার হাজার লোক' শেখ হাসিনা মেরেছেনথ এমন কথা বলা হয়। কিন্তু যে রাতে শাপলা চত্বরে একজন লোকও মারা যায়নি, সেখানে 'হাজার হাজার মৃত্যু' ঘটেছে এটা কী করে কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন লোক প্রচার করতে পারেন? ৫ মে দিনে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ মে নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা এলাকাতেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। যে কোনো সাংবাদিক এটা যাচাই করতে পারেন। অধিকারের আদিলুর রহমান বলেছেন, '৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে শাপলা চত্বরে।' এটা হচ্ছে হোমমেড। গোয়েবল্সের মতো প্রচারণা। রাজনীতিকরা জনগণের উপকারের জন্য দু-একটা মিথ্যা বলতে পারেন এটা প্লেটো বলেছিলেন। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে যেভাবে মিথ্যাচার হয়েছে, তা রাষ্ট্রের ভিত ধসিয়ে দিতে পারে।

**************:এখন উত্তরণের পথ কী?

সলিমুল্লাহ :সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা চাই, একটা বৃত্তের পরিধি থেকে বৃত্তের কেন্দ্রে পৌঁছাতে অগণিত ব্যাসার্ধ টানা যায়। এখন সরকার যে কায়দায় উত্তরণ চাইছে, সেটা সঠিক কি-নাথ এ প্রশ্ন আমারও। বিএনপি বড় দল। অনেক সমর্থক রয়েছে। কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছে। সরকার তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে ঐকমত্যে আনার চেষ্টা করতে পারত। উভয় দলের শ্রেণীস্বার্থ এখন মোটামুটি অভিন্ন। উভয় দল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উভয় দল সংকটের জন্য সমান দায়ী। এভাবে তারা সমদূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। এর কারণ আছে। আওয়ামী লীগ অসহিষ্ণু দল। সিপিবি-বাসদথ তারা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার চায়। পদ্ধতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে দ্বিমত। আওয়ামী লীগ পশ্চিমা শক্তিকে খুশি করতে চায়। সিপিবির মতো বামপন্থিরা এতে নাখোশ। এভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিপিবির মধ্যে এই ইস্যুতে স্ববিরোধিতা রয়েছে। সিপিবির কর্মীদের মধ্যেও সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টিতে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারও তাদের কাছে টানতে তেমন সচেষ্ট নয়।

**************:সরকার বলছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা।

সলিমুল্লাহ :১৯৪৭ সালেও এ যুক্তি ছিল। আমরা ব্রিটিশ মডেলের গণতন্ত্র গ্রহণ করেছি। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ছিল। আমরা করেছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এইচএম এরশাদের পতনের সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা সামনে আসে। তিন জোট প্রথমে প্রধান বিচারপতিকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তারপর এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। যে কোনো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা যায়। কিন্তু সামরিক শাসনের বিধান কোনো সংবিধানে নেই। এটা হলে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে জনসমর্থন হারিয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর ফের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। জনমত বদলায়। আমি মনে করি, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে জনমত সুইং করছে। সাম্প্রতিক সহিংসতা আওয়ামী লীগ সরকারের জনসমর্থন বাড়াচ্ছে। জনমত সহিংসতার বিরুদ্ধে। বিএনপির উচিত সহিংসতা থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। তবে এই দুই দলের বাইরেও আরও শক্তি রয়েছে সমাজে। প্রকৃতপক্ষে এখন যা চলছে দেশে, সেটা হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকট।

**************:কীভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন?

সলিমুল্লাহ :নির্বাচনে শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে সর্বদাই প্রতারণা করা হয়। নির্বাচনে অনেক ত্রুটিও থাকে। আমরা সবটা জানতে পারি না। কেবল তখনই তা প্রকাশ পায়, যখন বড় দলগুলো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে থাকে। এ ব্যবস্থা যে নিরপেক্ষ নয়, সেটা দুই দল স্বীকার করে। উত্তরণের পথ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। হয়তো গরিবের কথা বাসি হলে ফলতে পারে।

**************:কীভাবে এ সংস্কার চাইছেন?

সলিমুল্লাহ :রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ। নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ বা সংসদ এবং বিচার বিভাগ। কেউ কারও ওপরে নয়; বরং সার্বভৌম। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথমে নির্বাহী বিভাগের কথা রয়েছে, তারপরে আইনসভা এবং তারও পরে বিচার ব্যবস্থা। সংবাদপত্র বামে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপে, ডানে থাকে বিরোধী নেতার। এ দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়। সংবিধানেও কোনটা আগে এবং কোনটা পরে, সেটা যেভাবে রয়েছে তা অকারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমে রয়েছে কংগ্রেস, তারপর প্রেসিডেন্ট এবং তৃতীয় স্থানে বিচার ব্যবস্থা। আমাদের এখানে বিচার ব্যবস্থা তৃতীয় স্থানে থাকলেও সার্বভৌম ক্ষমতার দিক থেকে সমান। আইনসভায় প্রণীত আইন সংবিধানসম্মত কি-নাথ সে ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন এবং সংবিধানবহির্ভূর্ত ঘোষণা করতে পারেন। বর্তমান সংকটের সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এটি সাংবিধানিক সংস্থা। বিচার বিভাগও সাংবিধানিক সংস্থা। নির্বাচকালীন সরকারের দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা যায়। একজন প্রধান বিচারপতি এবং দু'জন সাবেক বিচারপতি অতীতে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ৫ বছর। তাদের মেয়াদ বিচার বিভাগের মতো করা যায়। বিচার বিভাগের বিচারপতির মতো দীর্ঘ করা যায়। বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তাদের নিরপেক্ষতা আমরা মেনে নিই। নির্বাচন কমিশনের শক্তি বাড়ানো বর্তমান সংবিধানে সম্ভব নয়। তাদের নিয়োগ পদ্ধতিতে সমস্যা রয়েছে। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে ফর্মুলা করেছিলেন, তাদের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ধারণায় ত্রুটি ছিল। নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ প্রশাসক চাওয়া হয়েছে। একজন নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার না পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ প্রধান উপদেষ্টা কী করে খুঁজে পাব? খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। নিরপেক্ষতার বিষয়টি আপেক্ষিক প্রকৃতপক্ষে উভয় দলের সম্মতি বা সম-মতি।

**************:আপনি কি তিনটি অঙ্গের মতো চতুর্থটি চাইছেন?

সলিমুল্লাহ :ঠিক তাই। নির্বাচন কমিশনকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। আমরা বলিথ নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। কিন্তু নির্বাচন এলেই তারা নির্বাহী বিভাগের অধীন হয়ে যায়। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য সংবিধানে ব্যবস্থা রাখা চাই।

**************:দেশবাসী আশার আলো দেখতে চায়। এত হানাহানি, রক্তপাত...।

সলিমুল্লাহ :উন্নত দেশগুলোর কেউ কেউ বলে গভর্ন্যান্স। কেউ কেউ এর সঙ্গে গুড শব্দ যোগ করে। আমাদের দেশের শাসন পদ্ধতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন। অনেকেই বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। কিন্তু এজন্য তাদের সবাই ত্রয়োদশ সংশোধনী পুরোপুরি মানতে চায় না। বিএনপি কৌশলগত কারণে বিষয়টি স্পষ্ট করে না। তারা নির্বাচনকালীন সরকারে শেখ হাসিনাকে রাখতে চায় না। রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার কিংবা এ কে খন্দকারের মতো কাউকে এ দায়িত্ব দিতে চায়। এটা হচ্ছে মর্যাদার লড়াই। এর মধ্যে তত্ত্ব নেই, নীতি নেই। কেবলই মর্যাদার লড়াই। হাসিনা ছাড়া যে কাউকে মেনে নিতে তারা রাজি। এভাবে প্রকারান্তরে তারা পঞ্চদশ সংশোধনী মেনে নিচ্ছে। এ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ এখনও বহাল রয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে অন্য কাউকে ক্ষমতা দিতে হলে অসাংবিধানিক পন্থা অনুসরণ করতে হবে। বিএনপি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু তারা ভরসা করছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর। তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে যা করছে, সেটা অপরাধ। রাষ্ট্র এ সহিংসতা থামাতে পারছে না। এটা তাদের ব্যর্থতা।

**************:কেউ কেউ তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ বাড়াতে বলেন?

সলিমুল্লাহ :কিছু লোক নিজেদের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় দেখতে চান। বর্তমান সংকটে অনেকে উল্লসিত। সামনে তারা সুদিন দেখেন। বিয়োগ চান। কিন্তু বিয়োগ যে বিয়োগান্ত হতে পারেথ সেটা ভাবেন না। আমাদের এখন যুক্তরাষ্ট্রকে তৎপর দেখতে হয়। ভারত ও পাকিস্তান তৎপর। চীন তৎপর। জাতিসংঘ তৎপর। কিন্তু এভাবে রাজনীতির সমস্যার সমাধান নেই।

**************:যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, কী বলবেন?

সলিমুল্লাহ :সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তোলা হলে কে আপত্তি করবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ না এলেও নির্বাচন হতে পারে। হতেই হবেথ এ বিষয়ে সাংবিধানিক ধারা দুর্বল। জামায়াতে ইসলামী যদি একাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করত,

তা হলে পাত্তা পেত না। কিন্তু ১৯৭০ সালেও আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। ২০ শতাংশ বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এরা বাংলাদেশে রয়েছে এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। কেন শক্তি বাড়ল? এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দায় রয়েছে। তারা ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঐক্যকে ধরে রেখে নতুন সরকার গঠন করতে পারত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন আইনি বৈধতা পেয়েছি। তখন আওয়ামী লীগ ছাড়াও মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদকে বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়েছিল। বাকশাল করা হলো অনেক দেরিতে। তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা ২০ বছর জাতীয় ঐক্যের সরকার পরিচালনা করেছেন। কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশে নয়, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবেও এ ধরনের সরকার হতে পারে।

**************:ফের উত্তরণের প্রশ্নে আসছি...।

সলিমুল্লাহ :কয়েকভাবে হতে পারে। শেখ হাসিনা পাঁচ বছর টিকে থাকতে পারেন কিংবা ষষ্ঠ সংসদের মতো দশম সংসদের মেয়াদ হতে পারে দেড় মাস বা আরও কয়েক মাস বেশি। এ নির্বাচন সব সমস্যার সমাধান দেবে না। আরেকটির জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে। তা হলে সম্পদের এত অপচয় কেন সে প্রশ্ন করা হতেই পারে। কেউ মজা করে বলেন, ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হওয়ায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমল। কিন্তু রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ে মজা করা চলে না। সরকার পরিবর্তনের অনেক পথ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে এটা করাই নানা দিক থেকে শ্রেয়। অন্য পথ যে খারাপ সেটা বোধ করি বিএনপিও জানে। সেটা তারা কিন্তু ১৯৯০ সালে এইচএম এরশাদকে অপসারণের সময়েও প্রমাণ রেখেছে। আওয়ামী লীগও করেছে।

**************:আপনাকে ধন্যবাদ।

সলিমুল্লাহ :সমকাল পাঠকদের শুভেচ্ছা। দেশের মঙ্গল হোক।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অজয় দাশগুপ্ত, সমকাল।