ক্যামেরা আন্দোলনের দাওয়াতি সাংবাদিকতা ।। প্রভাষ আমিন
এইদেশ উপস্থাপনা, শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৩



প্রায়ই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, ভাই আপনারা সব খবর কিভাবে সবার আগে পেয়ে যান? যেখানেই ঘটনা সেখানেই আপনারা কিভাবে পৌঁছে যান? আগে সাংবাদিকতার গর্ব নিয়ে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকাতাম। ভাবটা এমন থাকতো, এই কারণেই তো আমরা সাংবাদিক, আমরা সব খবর পেয়ে যাই। কিন্তু আমি নিজে মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করতাম, আসলে আমরা কিভাবে সব খবর আগেভাগে পেয়ে যাই। আমি বলি সাংবাদিকদের খবর জোগায় ভুতে। এই ‘ভুত’রাই সাংবাদিকদের সোর্স। যার সোর্স যত স্ট্রং, তিনি তত ভালো সাংবাদিক। সোর্স নামের সেই ভুতদের দেখা যায় না। আমি অনেকবার দেখেছি অপরিচিত, স্বল্প পরিচিত লোকজনও ফোন করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর জানিয়েছেন। ক্রাইম রিপোর্টারদের সোর্স সবচেয়ে ভালো থাকে। পুলিশ, সন্ত্রাসী সবাই তাদের সোর্স। খবরের সাথে থাকার এই সুযোগকে সাংবাদিকতার প্রিভিলেজ হিসাবে বিবেচনা করে এতদিন এক ধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি। কিন্তু ইদানিং এই আগে খবর পেয়ে যাওয়াটাই হয়ে দাড়িয়েছে বিব্রতকর। গাড়ি পোড়ানো, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর- সব খবর সাংবাদিকরা আগেই পেয়ে যান। সবকিছু ঘটে ক্যামেরার সামনে, এখন দেশে চলছে ক্যামেরা আন্দোলন।

এই প্রবণতা শুরু হয়েছে গত কয়েক বছরে। বিশেষ করে বেসরকারি টেলিভিশনের বুম হওয়ার পর থেকে। দলগুলো এখন আন্দোলন করে ক্যামেরার সামনে। ক্যামেরা নিশ্চিত করার পরেই আন্দোলন শুরু হয়। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে যখন মাঠের কর্মী ছিলাম, শেষদিকে যখন সংবাদকর্মী হিসাবে মাঠে ছিলাম; তখন পর্যন্ত এই বিষয়টি ছিল না। এরশাদের পতনের পর যতদিন ফুলটাইম মাঠের রিপোর্টার ছিলাম, ততদিনও এই বিষয়টি খুব একটা চোখে পড়েনি। নেতারা কাভারেজ চাইতেন, সাংবাদিকদের জন্য অপেক্ষা করতেন; একসময় ইত্তেফাকের রিপোর্টার না এলে সংবাদ সম্মেলন শুরু হতো না। কিন্তু এখনকার মত ক্যামেরসর্বস্ব ছিল না আন্দোলন। গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সময় থেকে এটার প্রচলন। তখন হরতাল বা এ ধরনের কোনো কর্মসূচির সময় বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দুই পাশে কাটাতারের ব্যারিকেড দেয়া থাকতো। নেতা কর্মীরা এই ব্যারিকেডের মধ্যে থেকেই ‘উত্তপ্ত’ আন্দোলন করতেন।

সন্ধ্যায় টিভিতে দেখা যেতো বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দিনভর পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। কিন্তু দিনে সেখানে গেলে সেই উত্তাপটা টের পাওয়া যেতো না। দিনের চিত্রটা থাকতো এমন- কাটাতারের ব্যারিকেডের ভেতরে বসে খোশগল্প করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সিনিয়র নেতারা পুরোনো দিনের গল্প শোনাচ্ছেন কর্মীদের। আগ্রহ নিয়ে সেই গল্পে যোগ দেন দায়িত্বরত পুলিশ কর্তারাও। হয়তো কোনো টিভি রিপোর্টার গিয়ে নেতাদের বললেন, ভাই আজকে ভালো ছবি পাইনি এখনো। ব্যস নেতাকর্মীরা আড্ডা ছেড়ে চলে গেলেন কাটাতারের পাশে, পুলিশও চলে গেলেন ঐপাশে। ব্যস কিছুক্ষণ কাটাতার ধরে ধাক্কাধাক্কি। দারুণ ছবি হয়ে গেল। নেতাকর্মীরা আবার মেতে উঠলেন আড্ডায়, সেই আড্ডায় যোগ দিলেন একটু আগেই ধাক্কাধাক্কি করা পুলিশ সদস্যরাও। এভাবেই ক্যামেরা আন্দোলন চলেছে দীর্ঘদিন, যদিও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আন্দোলন অত নিরীহ থাকেনি।

বিএনপি বিরোধী দলে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের শিখিয়ে দেয়া পথেই আন্দোলন শুরু করে। খালি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর বদলে নয়াপল্টন। সীমাবদ্ধ জায়গায় উত্তপ্ত আন্দোলনের মহড়া। এক পর্যায়ে পুলিশের কঠোর অবস্থান, ব্যাপক ধরপাকড় আর নির্যাতনের মুখে রাজপথ ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় বিএনপির আন্দোলন। এখন এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় এবং কখনো কখনো একমাত্র অস্ত্র টেলিভিশন ক্যামেরা। তাই আমি এই আন্দোলনের নাম দিয়েছি ক্যামেরা আন্দোলন। ক্যামেরা ট্রায়ালে ক্যামেরা থাকে না, কিন্তু ক্যামেরা আন্দোলন নিছকই ক্যামেরানির্ভর। জামায়াত-শিবির প্রথম এই প্রবণতা চালু করে। গোপনে সাংবাদিকদের ফোন করে তারা জানায়, এতটার সময় অমুক জায়গায় আসেন। সাংবাদিকরাও ছুটে যান সেখানে। গেলে গাড়ি ভাঙচুর, আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ- কিছু না কিছু একটা পাওয়া যায় লাইভ। জামায়াত-শিবিরের দেখাদেখি বিএনপিও এই ফর্মুলা চালু করেছে।

সাংবাদিকরা একে বলেন ‘দাওয়াত’। ডাক্তারদের মত সাংবাদিকরাও দাওয়াত পেলে ‘কল’এ যান। এখন আর ঢাকায় হরতাল বা অবরোধের সময় বিএনপি বা জামায়াতের কর্মীদের দেখা যায় না। তারা গোপন স্থান থেকে ফোন করেন, তারপর শুরু হয় তাদের আন্দোলন। অবস্থা এমন দাড়ালো যে এক পর্যায়ে নাশকতাকারীদের ধরতে পুলিশ সাংবাদিকদের অনুসরণ করা শুরু করলো। এমনকি ঢাকা মহানগর পুলিশ যেখানে সাংবাদিকদের জটলা সেখানে সাধারণ মানুষকে যেতে নিষেধ করেছে। কী ভয়ঙ্কর! সাংবাদিকরা তাহলে সত্যি সাংঘাতিক হয়ে উঠছেন।

বাস্তবতা হলো কোনো খবর পেলেই সাংবাদিকরা সেখানে ছুটে যান। এটাই সাংবাদিকদের কাজ। শুরুতে এই দাওয়াতি বিষয়টিকেও সাংবাদিকতার সাধারণ দায়িত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। এই গোপন খবর পাওয়াকে শুরুতে সাংবাদিকদের কৃতিত্ব হিসাবেই বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু জোরেশোরে প্রশ্নটা উঠে যায়, গোপন খবর পেয়ে সম্ভাব্য ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্যামেরা তাক করে লাইভ গাড়িতে আগুন দেয়ার ছবি ধারণ করাই কি সাংবাদিকদের কাজ? নাকি এ ধরনের খবর জানলে সেটা পুলিশে জানিয়ে দেয়া সাংবাদিকের দায়িত্ব? কিন্তু একবার যদি কোনো সাংবাদিক এ ধরনের কোনো দাওয়াতের খবর ফাঁস করে দেন, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি আর খবর পাবেন না। গোপন খবর দেয়াই হয় আস্থাভাজন সাংবাদিকদের।

আন্দোলন এখন এতটাই ক্যামেরানির্ভর হয়ে গেছে যে, সাংবাদিকরা দাওয়াতে সাড়া না দিলে আমন্ত্রণকারীরাও টেবিল সাজান না। এমন উদাহরণও আছে, অন্য ব্যস্ততার কারণে সাংবাদিকরা ‘কল’এ যেতে পারলেন না। তখন আমন্ত্রণকারীরা উল্টো ফোন করে ক্ষোভ ঝাড়েন, ভাই আপনারা আসলেন না বলে আজ ককটেলগুলো বাসায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। আবার উল্টো উদাহরণও আছে, সাংবাদিকরা হয়তো পড়িমরি করে ছুটে গেলেন, কিন্তু গিয়ে দেখলেন, ছোট একটা ককটেল ফোটানো হয়েছে বা ছোট গাড়ি ভাঙ্গা হয়েছে। তাতে ক্ষেপে যান সাংবাদিকরা, এত কষ্ট করে এসে মাত্র একটা ককটেল, পোষাইল না, ঠিকমত ফুটেজও তো হলো না। তারা তখন গোপন আন্দোলনকারীদের আরো বেশি নাশকতার উস্কানি দেন।

বিএনপি বাংলাদেশের দুটি বড় সংগঠনের একটি। এরশাদ পতনের পর থেকে এক মেয়াদ পরপর আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। দলের বর্তমান চেয়ারপারসন তিন বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দলটি সবচেয়ে খারাপ করলেও ৩৫ শতাংশ ভোট পায়। জামায়াতের প্রভাবে সেই দলটিরও প্রায় আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনে পরিণত হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। অনেকদিন ধরেই বিএনপির এই আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি হয়ে যাওয়ার প্রবণতা চলে আসছিল। হরতাল-অবরোধে নেতাকর্মীদের মাঠে দেখা যেতনা। খালি সন্ধ্যায় বিএনপির আবাসিক নেতা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ হরতাল-অবরোধ সফল করায় জনগণকে অভিনন্দন জানাতেন বা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করতেন। কিন্তু নয়াপল্টনের কার্যালয় থেকে তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে গোটা পার্টিই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে।

নতুন যাকে মুখপাত্র বানানো হয়েছে, সেই সালাউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে এই কৃতিত্ব ওসামা বিন লাদেনের। তিনি প্রায়শই গোপন স্থান থেকে পাঠানো ভিডিও বার্তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় দেখাতেন। এমনকি এই গোপন ভিডিও বার্তা নিয়ে বলিউডে সিনেমাও বানানো হয়েছে। বাংলাদেশে সালাউদ্দিন আহমেদও গোপন বার্তা পাঠানো শুরু করেছেন। এই গোপন বার্তার মাধ্যমেই টানা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের সাথে আরো ৭২ ঘণ্টা যোগ করে দেন। জাস্ট একটি ভিডিও বার্তায় তিনদিনের অবরোধ! শোনা যায়, এই গোপন ভিডিও বার্তা ধারণ করেন আস্থাভাজন কোনো সাংবাদিকই। তারপর তার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় অন্য সাংবাদিকদের। বিএনপি নেতারা বলেন, সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনীর জুলুম-নির্যাতন-মামলার কারণেই তারা আন্দোলন করতে পারছেন না। খুবই শক্ত যুক্তি। সরকার সত্যি সত্যি তাদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছেন। অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এখন জেলে। বাকিরা যেতে চান না বলেই পালিয়ে আছেন। কিন্তু কখনোই কি কোনো সরকার আন্দোলনকারীদের ছাড় দিয়েছে? বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে, ৬৯ বা ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও কি পুলিশ জুলুম-নির্যাতন চালায়নি?

বিএনপি খুব যৌক্তিক একটি দাবিতে আন্দোলন করছে। তারা আগামী নির্বাচনের জন্য একটি সমতল মাঠ চায়। কিন্তু এমন একটি যৌক্তিক আন্দোলন কেন এমন নেতাবিচ্ছিন্ন, কর্মীবিচ্ছিন্ন, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর কি বিএনপি নেতারা জানেন? আমি অন্তত কখনো এমন জনবিচ্ছিন্ন আন্দোলন দেখিনি বা শুনিনি। সাধারণত আন্দোলন আস্তে আস্তে পিকে উঠে। যে কোনো আন্দোলনে শুরুতে নেতারা থাকেন, তারপর কর্মীরা নামেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে নেমে আসেন জনগণ। কিন্তু এই প্রথম দেখলাম উল্টা চিত্র। বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের শুরুর দিকে জনগণকে দেখা গেলেও আন্দোলন যখন পিকে থাকার কথা, তখন তা নিছকই নাশকতানির্ভর, ক্যামেরানির্ভর হয়ে গেছে; আন্দোলনে নেতা নেই, কর্মী নেই, জনগণ তো অনেক দূরের কথা।

বলছিলাম দাওয়াতি সাংবাদিকতার কথা। দাওয়াতি সাংবাদিকতার বিপদের কথা বলি এবার। সম্প্রতি জামায়াতের এমন এক ‘কল’এ উত্তরায় গেলেন একটি টিভির টিম। সাধারণভাবে সেই টিভি জামায়াত বিরোধী হিসাবে পরিচিত। দাওয়াত দিয়ে উত্তরা এক গলির ভেতর নিয়ে সেই টিমকে মাইর দিয়েছে জামায়াত ক্যাডাররা, ভেঙ্গে দিয়েছে ক্যামেরাও। সেই টিভি স্টেশন গোটা বিষয়টি চেপে গিয়েছে বলে বিষয়টি নিয়ে হইচই হয়নি। তবে তার দুদিন পরই আক্রমণটা এলো সরাসরি। এমনই এক ‘কল’এ কামরাঙ্গিরচরে গিয়েছিলেন আরটিভি রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান। সেখানে স্থানীয় লোকজন তাদের ধরে পিটুনি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় এক দোকানদারকে দিয়ে মামলা করিয়ে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের চারদিনের রিমান্ডেও নেয়া হয়। পরদিন অবশ্য তাদের রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেয়া হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো তাদের অপরাধটা কী? তারা তো সোর্সের খবর পেয়ে ঘটনা কাভার করতে গিয়েছিলেন। তাদের কেন গ্রেপ্তার এবং রিমান্ডে নেয়া হলো। এই গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি আমি। মনে করি, এটা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।

আইনের দৃষ্টিতে হয়তো আরটিভির দুই সাংবাদিক কোনো অপরাধ করেননি। তাদের গ্রেপ্তার-রিমান্ডটাও অন্যায্য, বেআইনী হয়েছে। কিন্তু তাদের এই গ্রেপ্তার-রিমান্ড বেশ কয়েকদিন ধরেই ছাইচাপা প্রশ্নটিকে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের ‘কল’এ যাওয়াটা সাংবাদিকতার এথিকস কতটা অনুমোদন করে। প্রশ্নটা যতটা না আইনী, তারচেয়ে অনেক বেশি নৈতিক। সব খবরই যেমন সাংবাদিকদের জন্য নিউজ নয়, তেমনি সব সোর্সও নিউজ সোর্স নয়। নাশকতা করার জন্য যারা খবর দেয়, তারা কিছুতেই নিউজ সোর্স হতে পারেন না।

প্রশ্নটা হলো এ ধরনের খবর পেলে সাংবাদিকদের কী করা উচিত? তারা কি পুলিশকে জানিয়ে দেবে? সাংবাদিকতার একটি অতি পুরোনো বিতর্ক হলো, সাংবাদিকদের দায়িত্বের পরিধি কতটা? সাংবাদিকরা কি মৃত্যুপথযাত্রী কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন নাকি নিছক সংবাদ সংগ্রহ করবেন? সাংবাদিকতার তাত্ত্বিকরা বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব শুধু সংবাদ সংগ্রহ করা, অন্য কোনো দিকে তাকানো তার দায়িত্ব নয়। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে বিশ্বজিতের হত্যার ঘটনার পরও বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, সাংবাদিকরা খুব ভালোভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রলীগের নৃশংসতার ছবি ব্যাপক প্রচারের কারণেই সারাদেশে জনমত তৈরি হয়েছে, বিচার হচ্ছে। কিন্তু পাল্টা মত ছিল, উপস্থিত সাংবাদিকরা চাইলে বিশ্বজিতকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারতেন কিনা? আমি এখনও বিশ্বাস করি উপস্থিত সাংবাদিকরা চাইলে বিশ্বজিতকে বাঁচাতে পারতেন, অন্তত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পর সাংবাদিকরা বিশ্বজিতকে হাসপাতালে নিতে পারতেন। কিন্তু সাংবাদিকরা শুধু সাংবাদিকতাই করেছেন, মানবিক দায়িত্ব পালন করেননি। এখন আবার দাওয়াতি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। সাংবাদিকরা কি রোবটের মত দায়িত্ব পালন করবে, নাকি সচেতন নাগরিকের মত মানবিক আচরণ করবে? কোথাও কোনো নাশকতার খবর পেলে একজন সচেতন নাগরিক কী করবেন? নিশ্চয়ই পুলিশে খবর দেবেন। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে সচেতন অংশের দাবিদার আমরা সাংবাদিকরা কী করি?

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওত পেতে বসে থাকি গাড়িতে আগুন দেয়ার অপেক্ষায়। রাজনৈতিক নেতারা ডাকলে অবশ্যই সাংবাদিকরা যাবেন। কিন্তু গোপনে যারা ফোন করে, নাশকতার লাইভ ফুটেজ নেয়ার আমন্ত্রণ জানায় তারা অবশ্যই রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নন, তারা সন্ত্রাসী। তাদের ধরিয়ে দেয়াই একজন সচেতন সংবাদকর্মীর দায়িত্ব। এই দাওয়াতি সাংবাদিকতা জনপ্রিয় হয়েছে আমাদের টেলিভিশনগুলোর ‘ভালো’ ফুটেজ প্রচারের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে। ‘কল’এ গেলে ভালো ফুটেজ পাওয়া যায়। আর কোনো টিভি চ্যানেলে ভালো ফুটেজ প্রচারিত হলে অন্য চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তখন তাদের রিপোর্টারকে বকা দেন। তাই সেই রিপোর্টারও ভালো ফুটেজের আশায় দাওয়াত গ্রহণ করেন। এভাবেই চ্যানেলগুলোর ইদুর দৌঁড়ের সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা। টিভিতে টিভিতে তখন প্রতিযোগিতা করে ভালো ফুটেজ প্রচারিত হয়। দর্শকরা দেখে অবাক, সাংবাদিকরা এত তৎপর! গাড়ি জ্বলছে দাউ দাউ করে, ককটেল বিস্ফোরণের আওয়াজ এবং তারপর ধোঁয়া সবই দেখা যাচ্ছে। আমরা যদি সবাই এই প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করি, আমার বিশ্বাস পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। ধরুন আমরা সব টিভি মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা কোনো দাওয়াতে যাবো না, কোনো নাশকতা কাভার করবো না। তাহলে কী দাড়াবে? আমি নিশ্চিত, নাশকতা রাতারাতি কমে যাবে, এক পর্যায়ে হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। রাজনৈতিক নেতারা ডাকলে আমরা অবশ্যই যাবো, রাজনৈতিক কর্মসূচি কাভার করবো। কিন্তু সন্ত্রাসীদের ডাকে সাংবাদিকরা সাড়া দেবেন কিনা, তা নিয়ে ভাবার সময় চলে এসেছে। এথিক্স বলে সাংবাদিকরা সন্ত্রাসীদের ডাকে সাড়া দেবেন না। ইদানিং নানা বিপত্তির পর দাওয়াতি সাংবাদিকতায় সাড়া দেয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। জামায়াত-শিবির এখন সাংবাদিকদের কাজ আরো সহজ করে দিয়েছে। দাওয়াতে সাড়া না দিলেও ক্ষতি নেই। তারা অফিসে ক্যাসেট পৌঁছে দেন। তার মানে সেখানেও ক্যামেরা আন্দোলন। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ককটেলবাজি সব চলে ক্যামেরার সামনেই। নিজেদের ধারণ করা ফুটেজ তারা পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

আন্দোলনের আরেকটি বড় অস্ত্র ব্রেকিং নিউজ। উত্তরখান বা ধোলাইখালের কোনো নির্জন গলিতে ৫টি ককটেল ফাটলেও সাথে সাথে সবগুলো টিভি চ্যানেলে লাল রঙের ব্রেকিং নিউজ। এই লাল এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ায়, অন্যদের উৎসাহিত করে। আন্দোলন বেগবান হয়। নিজেদের অজান্তেই টিভি চ্যানেলগুলো নাশকতায় উস্কানি দেয়। কোনটা ব্রেকিং নিউজ, কোনটা নয়; তার কোনো সীমানা নেই।

সময় এসেছে গণমাধ্যমের কিছু জরুরী প্রশ্ন মীমাংসা করার। সোর্স আর সন্ত্রাসীর মধ্যে পার্থক্য টানার, সংবাদ আর নাশকতার মধ্যে পার্থক্য টানার। ব্রেকিং নিউজ আর উস্কানীর মধ্যে পার্থক্য টানার। সমস্যা হলো এই পার্থক্যগুলো কেউ টেনে দেবে না, টানতে হবে সাংবাদিকদেরই। কখনো কখনো তাৎক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টারকেই। যদিও সব সাংবাদিকের বিবেকের ওপর আমার আস্থা নেই। তবু এটা সত্যি নিজের বিবেক ছাড়া সাংবাদিকের আর কোনো বাস্তব জবাবদিহিতা নেই। কোনো সন্ত্রাসীর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ‘কল’এ গিয়ে গাড়িতে আগুন দেয়ার ছবি তুলে আনলেও আইনের দৃষ্টিতে হয়তো তাকে আটকানো যাবে না। গ্রেপ্তার করলেই আমরা তীব্র নিন্দা জানাবো, মুক্তি দাবি করবো। আবার ঢালাওভাবে সব সোর্সকে উপেক্ষা করলে সংবাদবঞ্চিত হবো আমরা, বঞ্চিত হবেন দর্শক-পাঠক। তীব্র প্রতিদ্বন্দি¦তার এই সময়ে এই ঝূঁকি কেউ নিতে চাইবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সাংবাদিকদেরই, কখনো একা, প্রয়োজনে অফিসের নিউজ ম্যানেজারদের পরামর্শে। তবে সময় এসেছে সাংবাদিকসুলভ রোবটিকতা পরিহার করে আরো বেশি মানবিক হওয়ার। সাংবাদিকরাই সমাজের সবচেয়ে সচেতন অংশ। তাই অন্য সচেতন নাগরিকের মত সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারেন সাংবাদিকরাও। তাই বলে সাংবাদিকরা পুলিশের সোর্স হয়ে যাবেন না, গোপন খবর পুলিশকে জানিয়েও দেবেন না। সাংবাদিকরা সম্মিলিত উপেক্ষা দিয়েই তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে পারেন।

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক, লেখক।
০৭ ডিসেম্বর, ২০১৩
probhash2000@gmail.com