ফাঁসির দড়িতে ঝুললো মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লা
এইদেশ ডেস্ক, বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১৩


অনেক নাটকীয়তার পর বৃহস্পতিবার রাতেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারীদের অন্যতম আব্দুল কাদের মোল্লার।রাত ১০টা ১ মিনিটে জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে ছয়জন ফাঁসি কার্যক্রম শেষ করেন বলে কারা অভ্যন্তরের কয়েকটি সূত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছে।

নৃশংসতার জন্য একাত্তর সালে আলবদর বাহিনীর সদস্য মোল্লার কুখ্যাতি ছড়িয়ে ছিল মিরপুরের কসাই নামে। বিচার চলাকালে কাঠগড়ায় থেকেও তার দম্ভোক্তি শোনা গিয়েছিল- ‘বাংলাদেশ হয়েছে বলে অনেকের মাতব্বরি বেড়ে গেছে’।

অপরাধযজ্ঞের দীর্ঘ ৪২ বছর পর বিচারের পর সাজা কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার জন্য প্রথম কারো মৃত্যুদণ্ড কারর্যকর হল।

গ্রেপ্তার হওয়ার ৩ বছর ৫ মাস পর শুক্রবার রাত্রির প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকর করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উল্লাসের খবর পাওয়া যায়।

মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যাকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সব বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও চেম্বার বিচারপতির একটি আদেশে গত মঙ্গলবার ফাঁসির মঞ্চ থেকেই ফিরে আসেন একাত্তরের এই ঘাতক।

তবে বৃহস্পতিবার দিনে পুনর্বিবেচনার দুটি আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর রাতেই ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয় একাত্তরের কসাই কাদেরকে।

২০১১ সালের ১ নভেম্বর কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

পরে গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এই দণ্ড দেয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের সুযোগ ছিলো না। সর্বোচ্চ দণ্ডের দাবিতে প্রতিবাদে জেগে উঠে ছাত্র-জনতা।

উভয়পক্ষকে আপিলে সমান সুযোগ দিয়ে সংশোধন করা হয় আইন, যে আইনে করা আপিলে গত ১৭ সেপ্টেম্বর কাদেরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়।

মঙ্গলবার ফাঁসি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ মুহুর্তে চেম্বার বিচারকের আদেশে তা আটকে যায়। বৃহস্পতিবার পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ হওয়ার পর রায় কার্যকরে বাধা কাটে।

কাদের মোল্লার আগে ওই ট্রাইব্যুনালে বর্তমান ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের সাবেক সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে।

পলাতক থাকায় তার ওই রায় বাস্তবায়ন হয়নি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চিকন আলী নামে এক দালালের ফাঁসি হয়েছিলো, তবে জেনারেল জিয়ার আমলে তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যান।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঘাতক দালালদের বিচারে আইন প্রণয়ন আদালত গঠন করা হলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই উদ্যোগ থেমে যায়।

এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করলে দেশে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়, যা পরে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে পরিণত হয়।

কাদের মোল্লার বিচার পরিক্রমা
চার দশক আগে হত্যা-ধর্ষণের মতো অপরাধের কারণে ‘মিরপুরের কসাই’ নামে পরিচিতি পাওয়া যে যুদ্ধাপরাধীকে প্রথম ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে হচ্ছে, তার মামলার শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর।

মুক্তিযুদ্ধকালে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে ওইদিন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রোটারি জেনারেল কাদের মোল্লাসহ কয়েকজন জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়।

এরপর ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। ওই মামলাতেই ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরইমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে। গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

২০১১ সালের ১ নভেম্বর প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ট্রাইব্যুনালে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, তাতে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ওই বছর ২৮ ডিসেম্বর তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

গতবছর ২৮ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই জামায়াত নেতার বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২।

দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।

এর পক্ষকাল পর ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে সংশ্লিষ্টতা এবং দুটিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ আদালতে প্রমাণিত হলেও তাকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীর শাহবাগে তাৎক্ষণিকভাবে ছাত্র-জনতার যে বিক্ষোভের সূচনা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে আন্দোলনের রূপ নিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

এই দাবির মুখে সরকার আন্তর্জাতিক আপরাধ আইনে সংশোধন আনতে বাধ্য হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্র ও আসামি- দুই পক্ষের জন্যই আপিলের সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। আগের আইনে আসামিপক্ষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার সুযোগ গেলেও রাষ্ট্রপক্ষের সে সুযোগ ছিল না।

সংশোধিত আইনে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড চেয়ে ৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর খালাস চেয়ে পরদিন কাদের মোল্লাও আপিল আবেদন জমা দেয়।

আপিলের পর বেশ কিছু পদ্ধতিগত কাজ শেষে গত ১ এপ্রিল এই মামলার শুনানি শুরু হয়। এর আগেই আপিল বিভাগে গঠন করা হয় দুটি বেঞ্চ। একটিতে নেতৃত্বে থাকেন প্রধান বিচারপতি নিজেই, যে বেঞ্চে শুনানি হয় যুদ্ধাপরাধের আপিলের মামলা।

প্রথম দিকে ওই বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে ছিলেন বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

তবে বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া অবসরে যাওয়ায় জুন মাস থেকে ৫ বিচারপতি নিয়েই শুনানি চালায় এই বেঞ্চ।

এই বেঞ্চের দুই বিচারককে যুদ্ধাপরাধ মামলা থেকে নিবৃত্ত করতে আবেদন করেছিলেন কাদের মোল্লা। শুনানির এক পর্যায়ে এই বেঞ্চের বাকি চার বিচারকও ওই আবেদন শোনেন। তবে তারা আবেদনটি গ্রহণ করেননি।

উভয়পক্ষের আইনজীবীরা ৪০ দিনের মতো এ মামলায় নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শুনানির এক পর্যায়ে কাদের মোল্লার আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক সংশোধিত আইন এ মামলায় প্রযোজ্য হবে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বিচারে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তার জন্য গত ২০ জুন ৭ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি।

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বক্তব্যের মাধ্যমে গত ৮ জুলাই অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য শুরু হয়।

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, টি এইচ খান, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ২২ জুলাই অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য শেষ হয়।

শুনানি শেষে ২৩ জুলাই এই মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। পরে রায় ঘোষণা করা ১৭ সেপ্টেম্বর।

এই রায়ে ৪:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আসামিকে মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগের মধ্যে যে একটিতে ট্রাইব্যুনাল তাকে অব্যাহতি দিয়েছিল, আপিলের রায়ে তাতে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। অন্য চারটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের শাস্তিই বহাল রাখে আপিল বিভাগ।

আর ছয় নম্বর অভিযোগে একাত্তরের ২৬ মার্চ মিরপুরে হযরত আলী লস্করের বাসায় গিয়ে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা এবং এক মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশের বদলে আপিল বিভাগ সর্বোচ্চ সাজার এই আদেশ দেয়।

প্রায় আড়াই মাস পর এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে আপিল বিভাগ। কাশিমপুর থেকে কাদের মোল্লাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

দুই পৃষ্ঠার একটি ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ খামে করে এবং লাল কাপড়ে মোড়ানো ৭৯০ পৃষ্ঠার নথিসহ রায়ের কপি গত ৮ ডিসেম্বর পৌঁছে দেয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু জানান, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার আগে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কাদের মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও নেননি।

ওইদিন রাত ১২টা ১ মিনিটেই মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা হবে বলে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু আসামিপক্ষের আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ রাতে এক আকস্মিক আদেশে তা স্থগিত করে দেন। ওই রাতেই কাদের মোল্লার পক্ষে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হয়।

এরপর ১১ ও ১২ ডিসেম্বর আসামিপক্ষের রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি শেষে তা নাকচ করে দেয় প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।

১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করেন তার পরিবারের সদস্যরা।

বিকাল থেকেই কারাগার ঘিরে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। যাদের আন্দোলনে কাদের মোল্লার মামলা আপিল বিভাগে গিয়েছিল, সেই গণজাগরণমঞ্চের কর্মীরা আবার শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন দুদিন আগে থেকেই।

বাংলাদেশের বিজয় দিবসের তিন দিন আগে ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন পর্বে পৌঁছায়।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

চারজন বিচারক মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে রায় দিলেও তাতে একজনের দ্বিমত ছিল বলে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত রায়ে দেখা যায়।


কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে পাঁচটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

যে একটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছিল বিচারিক আদালত, আপিলের রায়ে তাতে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। অন্য যে চারটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের শাস্তিই বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ।

সংক্ষিপ্ত রায়ে দেখা যায়, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল চলতে পারে বলে একমত হয়েছেন বেঞ্চের পাঁচ বিচারক। আপিল মঞ্জুর হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

আপিল বিভাগের এই বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে রয়েছেন বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

রায়ে বলা হয়, ষষ্ঠ অভিযোগে ৪:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল। মৃত্যু পর্যন্ত তাকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে।

ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৬ মার্চ কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যান। সেখানে কাদের মোল্লার নির্দেশে লস্করের স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা করা হয়। এক মেয়ে হন ধর্ষণের শিকার।

চতুর্থ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া খালাসের রায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাতিল করে আপিল বিভাগ। ওই অপরাধে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লা রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটারচরে শতাধিক গ্রামবাসীকে হত্যা করেন।

প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চম অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দণ্ড বহালের পক্ষেও ৪:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আপিল বিভাগের রায় হয়।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম অভিযোগ, ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল তার নির্দেশে মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে তাদের মিরপুরের বাসায় গিয়ে হত্যা করেন।

কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে একাত্তরের ২৯ মার্চ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে আরামবাগ থেকে তুলে নিয়ে জল্লাদখানা পাম্পহাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন বলে তৃতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, তিনি একাত্তরের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে নিয়ে মিরপুরের আলোকদী গ্রামে যান এবং রাজাকার সদস্যদের নিয়ে গণহত্যা চালান। ওই ঘটনায় নিহত হন ৩৪৪ জনের বেশি।

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে কাদের মোল্লার ১৫ বছর করে কারাদণ্ডের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। পঞ্চমটিতে হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়। এই দুটি দণ্ডই আপিল বিভাগ বহাল রেখেছে।