কি ঘটবে? সঙ্কট নাকি উত্তরণ? ।। আমান-উদ-দৌলা
এইদেশ বিশ্লেষণ, বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১, ২০১৩


আর কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশে নির্বাচনের আসল চিত্রটি পরিষ্কার হবে। বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে যাচ্ছে নাকি তাদেরকে বাইরে রেখেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেবল এরশাদের জাপাকে নিয়েই নির্বাচনে যাবে। তত্বাবধয়াকের দাবি থেকে সরে দাঁড়িয়ে বিএনপি এখন বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই তাদের শেষ ও একমাত্র দাবিতে এসে স্থির হয়েছে। তা হলো, নির্বাচনকালীন যে সরকারই হোক, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যেতে হবে, নইলে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বলছে।

অন্যদিকে, পূনর্গঠিত মন্ত্রিসভায় এরশাদের জাতীয় পার্টির কয়েকজন যোগ দেয়ায়, সরকারী দল আওয়ামী লীগ এখন আর বিএনপির কোনো দাবির প্রতি কর্ণপাত করছে না। বা কার্যকর আলোচনা-সংলাপ-সমঝোতার ব্যপারে সর্বমহলের আহ্বান সত্তেও তাগিদ অনুভব করছে না।

সরকারি মহলের ধারনা, এরশাদকে নির্বাচনে নামাতে পেরে এখন আর তাদেরকে ‘একক নির্বাচনের কলঙ্ক’ নিতে হচ্ছে না। বিএনপি ছাড়াই নির্বাচনের আবহ সৃষ্টিতে তারা সক্ষম হবে। শুধু তাই নয়, বিএনপি তার চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা বা বার্গেনিং পাওয়ার খানিকটা হারিয়েছে বলে মনে করেন তারা। এমনকি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকেও কাউকে কাউকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে কিংবা জোট ভাঙ্গিয়ে নির্বাচনের স্রোতধারায় সামিল করাতে সক্ষম হবে, আশা করছে। ভোট কেন্দ্রে ৫১% এর বেশি ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলেই ‘গ্রহনযোগ্যতা’র প্রশ্নটিও আর থাকবে না, ধরে নিচ্ছে্ন।

তবে, অন্য অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপি শেষ পর্যন্ত অনেকখানি ছাড় দিয়ে হলেও নির্বাচনে যাবে। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন প্রস্তাবিত ‘সর্বদলীয়’ মন্ত্রিসভায় তাদের কেউ যোগ দেবে, নাকি, মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়ে নির্বাচনে যাবে, সেই হিসাব-নিকাশের জন্য আরো কিছুদিন সময় নেবে। বিএনপি নির্বাচনে না গেলে দলের বেশকিছু লোকজনকে ধরে রাখা মুস্কিল হবে, এমন কি জোট থেকে শরিকদেরও কেউ কেউ বেরিয়ে নির্বাচনে চলে যেতে পারে। এই অবস্থায় বিএনপির জন্য উভয় সংকটের সৃষ্টি করেছে।

তবে, বিএনপি ও তাদের শরিকদের মধ্যকার কট্টরপন্থি অংশের চাপ রয়েছে নির্বাচনে না-যাবার। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনে গেলে, দীর্ঘ মেয়াদে বিএনপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। বিএনপি দেশের অধিকাংশ মানুষের সহানুভূতি কুড়াতে সক্ষম হবে। সরকার একক নির্বাচন করে পার পেলেও, আন্তর্জাতিকভাবে ‘গ্রহনযোগ্যতা’র সংকটে পড়বে। দেশে তীব্র আন্দোলনের চাপে অবশেষে নতুন করে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে সরকার।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারনা, নিবন্ধন বাতিলের জন্য জামাতের নির্বাচনে যেতে না পারা এবং সরকারের আয়ু বৃদ্ধি পেলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামাতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায় অবিলম্বে কার্যকর হতে পারে। আর তাই জামাত, দেশে নির্বাচনের আগেই সহিংস ধারায় তীব্র আন্দোলন-অবরোধ গড়ে তুলে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলে তাদের নেতৃবৃন্দের মুক্তির পথ বের করে নিতে চাইবে।

আরো ধারনা করা হচ্ছে, বিএনপির নীতি নির্ধারকরা নিশ্চিত নন যে, নির্বাচন বয়কটের ধারায় আন্দোলন-সংগ্রামের তীব্রতা বাড়িয়ে তাদের কোনো লাভ হবে। জামাত তাদের নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে সক্রিয় হবে সহিংসতার মাত্রা আরো বাড়াতে। ২০০৭ এর পূনরাবৃত্তি ঘটাতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সেনা হস্তক্ষেপ বিএনপির ক্ষমতায় আসবার জন্য যথেষ্ঠ সহায়ক হবে কিনা, এই হিসাব তারা মেলাতে পারছেন না। বরং জামাত-শিবিরের মারমুখি তান্ডবকে উস্কে দিয়ে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে জননিরাপত্তা-হীনতার সংকট আরো বৃদ্ধি করবে,বলাই বাহুল্য। সেক্ষেত্রে বিএনপির প্রতি জন-সহানুভূতি বৃদ্ধির বদলে জামাত-শিবিরকে নিয়ন্ত্রনহীন জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দেবার জন্য এবং জামাতের এলায়েন্স পার্টনার হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাতে জঙ্গি দমনের নতুন করে সুযোগ তুলে দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতায় টিকে থাকার আইনসঙ্গত বৈধতাকে আরো বেশি করে নিশ্চিত করবে।