বুধিজীবি হত্যার অপারেশন-ইন-চার্জ মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের ফাঁসির রায়
এইদেশ ডেস্ক, রবিবার, নভেম্বর ০৩, ২০১৩


একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম নায়ক আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানকে ‘মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত’ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃতুদ- প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে আনা বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও গণহত্যাসহ ৫ ধরনের ১১টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্ব তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম। এ রায়ের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার ৪২ বছর পর জাতি ন্যায়বিচার পেয়েছে।

রবিবার বেলা ১১টার দিকে তিন বিচারক এজলাসে বসেন। রায় পড়া শুরুর সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, এটি ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ রায়। মূল রায় ১৫৪ পৃষ্ঠার। তবে ট্রাইব্যুনাল পড়বে সংক্ষিপ্ত ৪১ পৃষ্ঠার রায়। তিন অংশে এটি পড়া হবে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু আসামিপক্ষ পলাতক; তাই রাষ্ট্রপক্ষ শুধু রায়ের সার্টিফায়েড কপিটি পাবে। আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থন না করা পর্যন্ত তাদের সার্টিফায়েড কপি দেয়া হবে না। আসামিরা পলাতক থাকায় তারা গ্রেফতার হওয়া বা আত্মসমর্পণ করার পর এ রায় কার্যকর করা হবে।
৩০ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন ও আসামি উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। মামলায় দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। মামলায় যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর শাহিদুর রহমান, আসামিপক্ষে আব্দুস শুকুর খান ও সালমা হাই টুনি। প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনী বিষয়ে যুক্তিখ-ন করেন। একাত্তরের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ অধ্যাপক, ৬ সাংবাদিক ও ৩ জন চিকিৎসক রয়েছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি অভিযোগের সবগুলোতেই দুই আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। ‘মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে’ তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করার নির্দেশ দিয়ে বিচারক বলেন, ‘আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ না দিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জামায়াত ও পাকিস্তানী বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে এই বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মিশনটি আলবদর বাহিনী সম্পন্ন করে। এ সময় ট্রাইব্যুনাল চৌধুরী মাঈনুদ্দীনকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের মাস্টারমাইন্ড এবং অপারেশন ইনচার্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের চীফ এক্সকিউটিভ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল আরও জানায়, জাতিকে পঙ্গু করার জন্যই আলবদর বাহিনী দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে জামায়াত। আলবদর বাহিনী জামায়াতেরই সৃষ্টি, যারা একাত্তরে অত্যন্ত দুর্ধর্ষ, ফ্যাসিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আলবদর ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত। যা জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছিল। জামায়াতে ইসলামী একটি ফ্যাসিস্ট দল।

চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীন রায় পড়ার সময় বলেন, প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য অনুযায়ী আসামি চৌধুরী মাঈনুদ্দীন স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে বাংলাদেশে আসেন। দুইবারই তিনি পাকিস্তান দূতাবাসের গাড়িতে পুলিশ প্রহরায় নিজ এলাকায় যান। নিরাপত্তা দেয়ায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এইচএম এরশাদকে ধিক্কার জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। রায়ে আরও বলা হয়েছে, এটা জাতির জন্য লজ্জা যে, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ তাঁর গ্রামের বাড়িতে যেতে দিয়েছেন। তাদের পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। ‘হোয়াট এ শেম, হোয়াট এ শেম’ সন্দেহাতীতভাবে এটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে এবং হেয়প্রতিপন্ন করেছে, যা নিপীড়নের শিকার পরিবারের ক্ষতকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তাকে রাষ্ট্রীয় মেশিনারি দিয়ে সম্মান দেয়া হলো।’

রবিবার রায় উপলক্ষে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এ রায় কার্যকর করার জন্য তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার আইনসম্মতভাবে চেষ্টা করবে। মামলার অন্যতম প্রসিকিউটর শাহিদুর রহমান বলেছেন, আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় হয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট। জাতি দীর্ঘ ৪২ বছর পর কলঙ্কমুক্ত হলো। আসামিপক্ষের আইনজীবী সালমা হাই টুনি বলেছেন, তাঁরা প্রত্যাশিত রায় পাননি। রায় প্রত্যাশিত হয়নি। আপীল করবেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমাদের হাতে নেই। তাঁরা দেশে নেই। তাঁরা এসে রায়ের কপি নিয়ে যদি আপীলে যান, তাতে প্রত্যাশিত রায় পাব বলে আশা করছি।
রায় পড়াকালীন সময় চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ ট্রাইব্যুনালের অন্য প্রসিকিউটরবৃন্দ এবং ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা, প্রজন্ম একাত্তরের নেতারা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠন এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রকর্তৃক নিয়োগকৃত আইনজীবী আব্দুস শুক্কুর খান ও সালমা হাই টুনি উপস্থিত ছিলেন।

৪২ বছর পর ন্যায়বিচার ॥ স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছর পর শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের বিচার হলো। এর মধ্য দিয়ে জাতি ন্যায়বিচার পেয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম নায়ক আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট ৭৩-এর ৩(২) ধারা অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, ও গণহত্যাসহ ৫ ধরনের অপরাধের অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন পাস হয়। এ আইনটি কয়েক দফা সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের যেহেতু যুদ্ধ চলাকালীন হত্যা করা হয়েছে, সেহেতু তাদের বিচারও এ আইনের আওতায় হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী কারাগার থেকে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধী ও বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘাতকদের বিচারের উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির আদেশে গঠিত হয় বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭২। এ আইনেই শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী অপহরণ মামলায় ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন দুইজনের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. একেএম আজাদ হত্যা মামলায় তিনজন আলবদরকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। দীর্ঘ ৪২ বছর পর বর্তমান সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানকে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে। এর মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো।

আমি সন্তুষ্ট ॥ আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত বিদেশে পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করতে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের এ সব কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল মৃত্যুদ- সমর্থন করে না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাদের মতামত না পাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠসন্তান শিক্ষক-লেখক, সাংবাদিক ও ডাক্তারসহ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। আশা করি, এ সব বিষয় আন্তর্জাতিক মহল বিবেচনায় নিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করবেন।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচারকাজ পরিচালনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকমানের ট্রাইব্যুনালে যথাযথ প্রক্রিয়াতেই বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আসামিরা আইনজীবী নিয়োগ না করলেও রাষ্ট্র তাদের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ আরও প্রসারিত হলো। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন তাদের পরিবার স্বস্তি পাবে। আমি রায়ে সন্তুষ্ট।

দ্বিতীয় মামলা ॥ আসামির অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে রায় হওয়া দ্বিতীয় মামলা এটি। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার হয় এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার ফাঁসির আদেশ দেন বিচারক। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি নবম রায়। আগের আটটি রায়ে জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান ছয়জন এবং বিএনপির দুই নেতাকে দ-াদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
আইন অনুয়ায়ী রায় কার্যকর হবে ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়কারী ও অতিরিক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান বলেছেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে দুই আসামির সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। এখন আইন অনুযায়ী রায় কার্যকর হবে। অপরাধীরা যদি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে বা তারা যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তা হলে আইন অনুযায়ী রায় কার্যকর হবে।
অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে ॥ প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেছেন, একাত্তরে ঘাতক ও বদর বাহিনীর দুই নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে জামায়াতের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত যে যুদ্ধাপরাধ করেছে, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ জানে তারা কোন দেশে অবস্থান করছে। তাদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর জরুরী। এ জন্য আন্তর্জাতিক লবিংয়ের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ॥ বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের মামলার রায় উপলক্ষে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ও বাইরে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে আগত সাংবাদিক, আইনজীবী, পর্যবেক্ষকসহ সবাইকে নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এর আগে ট্রাইব্যুনালের সামনে নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়।

যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয় ॥ স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সারাদেশে মোট ৯৬৮ শিক্ষাবিদ, ২১ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং ৪১ আইনজীবীসহ ১০২০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের বুদ্ধিজীবীদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয। ওই সময় ঢাকা শহরে যে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ করে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষকরা হচ্ছেন অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক ফয়জুল মহি, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। শহীদ চিকিৎসকরা হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোঃ মর্তুজা, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী ও বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. ফজলে রাব্বী। শহীদ সাংবাদিকরা হচ্ছেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেন, পিপিআইয়ের চীফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের চীফ রিপোর্টার আ ন ম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সংবাদদাতা ও পিপিআইয়ের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার নিজামউদ্দিন আহমেদ, শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন এবং দৈনিক সংবাদের যুগ্মসম্পাদক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার।

মামলায় যাঁরা সাক্ষী ॥ বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড- মামলায় দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। তাঁরা হলেন মাসুদা বানু রত্না, আসিফ মুনীর চৌধুরী তন্ময়, সুমন জাহিদ, ড. এনামুল হক খান, ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, তৌহিদ রেজা নুর, সৈয়দ মর্তুজা নামজুল, ডা. ফারহানা চৌধুরী নিপা, ড. নুরসাত রাব্বী, ইফতেখার হায়দার চৌধুরী, অনির্বাণ মোস্তফা, পান্না কায়সার, শরীয়তউল্লাহ বাঙালী, ওমর হায়াৎ, অধ্যাপিকা ফরিদা বানু, মো. ফিরোজ খান, রশিদুল ইসলাম, এজাব উদ্দিন, ড. আনিসুজ্জামান, দেলোয়ার হোসেন, শাফাকাত নিজাম বাপ্পি এবং দুই তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান কবীর ও আতাউর রহমান। এ ছাড়া প্রসিকিউশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯(২) ধারায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া ৪ সাক্ষীর জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এই ৪ সাক্ষী হলেন মিশুক মুনীর, আব্দুস সামাদ, তসলিম হায়দার ও আবুল কালাম আজাদ।

মামলার ধারাবাহিকতা ॥ বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তদন্ত শুরু হয়। এর পর ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর তদন্ত রিপোর্ট প্রসিকিউশনপক্ষকে জমা দেন তদন্ত সংস্থা। ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ ১৬টি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের দেয়া অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ২ মে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। এই দুই আলবদর নেতার বিরুদ্ধে ৫ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ১৬টি অভিযোগ আনা হয়েছিল আনুষ্ঠানিক অভিযোগে (ফরমাল চার্জ)। সেগুলোর মধ্যে ৪ ধরনের ১১টি গ্রহণ করে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। অবশ্য আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বর্ণিত মোট ১৮ বুদ্ধিজীবীকেই হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ১৬টি অভিযোগ সন্নিবেশিত করে ১১টিতে করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই প্রসিকিউশন সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণ করেন। প্রসিকিউশন পক্ষে ২৫ জন সাক্ষী প্রদান করেছেন। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনপক্ষ তাদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ২৯-৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার জন্য চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সিএভি (অপেক্ষমাণ) রাখেন।

নবম রায় ॥ এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবম রায়। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর ষষ্ঠ রায়। এর আগে যাদের মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে তাঁরা হলেন, ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের রায় প্রদান করা হয়। যদিও তিনি পলাতক রয়েছেন। ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা হয়। পরে আপীল বিভাগ ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের রায় প্রদান করে। ৯ জুন জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের রায় প্রদান করা হয়। ১৭ জুলাই আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু্দন্ডের রায় প্রদান করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করা হয়। ১৫ জুলাই গোলাম আযমের রায়ে ৯০ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়। ১ অক্টোবর বিএনপির শীর্ষনেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মুত্যুদ- প্রদান করছে ট্রাইব্যুনাল। ৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল-২ বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছে। উল্লেখ্য, নয়টি মামলায় এ নিয়ে মোট ১০ জনকে দ- প্রদান করা হয়েছে।

আসামিরা পলাতক ॥ আসামি চৌধুরী মাঈনুদ্দীনর মূল নাম মাঈনুদ্দীন চৌধুরী। মজনু চৌধুরী তাঁর ডাক নাম। মৃত দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ও মৃত দেলজাহান বেগমের ৬ পুত্রের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া থানাধীন ফাজিলেরঘাট বাজারের কাছে ৬ জগতপুর ইউনিয়নের চানপুরের চৌধুরীবাড়ি তাঁর গ্রামের বাড়ি। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর গোপনে আসামি প্রথমে পাকিস্তান ও পরবর্তীতে লন্ডনে যান। তিনি সপরিবারে সেখানকার অধিবাসী। বিগত কয়েক বছর পুর্বে ১ ঔড়হংড়হ জড়ধফ, ঞড়ঃঃবহযধস, খড়হফড়হ ঘঔ৫৪লঁ এই ঠিকানায় বসবাস করলেও বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি উত্তর লন্ডনের সাউথ গেট এলাকার অন্য একটি বাসায় অবস্থান করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নানাবিধ অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অপর আসামি আশরাফুজ্জামান খান ওরফে নায়েব আলী খান। পিতা মৃত মোঃ আজাহার আলী খান, মাতা মৃত রইমুননেছা। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানার ছোট ভাটরা গ্রামের চিলেরপাড়। তিনি বর্তমানে ১৬২-১৫, ঐরমযষধহফ : আব, অঢ়ঃ, ৩প লধসধরশধ, ঘবুিড়ৎশ, ১১৪৩২, টঝঅ এই ঠিকানায় বসবাস করছেন। আসামি সেখানে রংষধসরপ পরৎপষব ড়ভ হড়ৎঃয ধসবৎরপধ (ওঈঘঅ) নামের প্রতিষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম মামলা ॥ ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় রাজধানীর রমনা থানায় প্রথম মামলা করা হয়। ওই মামলায় আলবদর বাহিনীর চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে আসামি করা হয়। মামলাটি করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদের বোন ফরিদা বানু।
মামলাটি পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে পাঠানো হয়। মামলার তদন্ত পর্যায়ে ১৯৯৮ সালের ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইনে মামলা দায়েরের জন্য অনুমতি চান। তদন্ত চলাকালে তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মীয়স্বজনসহ ৪০ জনের সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন। এর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইনে মামলাটি নতুন করে দায়েরের জন্য সিআইডিকে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়।
১১ অভিযোগ ॥ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে প্রথম থেকে পঞ্চম অভিযোগে রয়েছে- একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, ১১ ডিসেম্বর ভোরে পিপিআইয়ের (পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের প্রধান প্রতিবেদক এএনএম গোলাম মোস্তফা, ১২ ডিসেম্বর দুপুরে বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদ এবং ১৩ ডিসেম্বর শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনকে অপহরণ করা হয়। মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের নির্দেশে এবং তাঁদের অংশগ্রহণে আলবদরের সদস্যরা ওই বুদ্ধিজীবীদের অপহরণের পর হত্যা করে। তাদের মধ্যে সেলিনা পারভীন ছাড়া আর কারও লাশ পাওয়া যায়নি।

ষষ্ঠ অভিযোগ অনুসারে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে পৌনে ১০টার মধ্যে মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন আলবদর সদস্য অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, আবুল খায়ের, ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য ও চিকিৎসক মোঃ মর্তুজাকে তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবন থেকে অপহরণ করে। ১৬ ডিসেম্বরের পর মিরপুর বধ্যভূমিতে তাদের ছয়জনের লাশ পাওয়া যায়। সিরাজুল হক খান ও ফয়জুল মহিউদ্দিনের লাশ পাওয়া যায়নি।
সপ্তম থেকে একাদশ অভিযোগে রয়েছে- একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও দৈনিক সংবাদের যুগ্মসম্পাদক শহীদল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করা হয়। তাদের কারও লাশ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজির অধ্যাপক মোঃ ফজলে রাব্বী এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাদের লাশ পাওয়া যায়।
সূত্রঃ জনকন্ঠ। কার্টুনঃ কালের কন্ঠ।