এ দেশে কি সত্যিকারের বাঙালীরা বসবাস করে না? ।। মুনতাসীর মামুন
এইদেশ ডেস্ক, শুক্রবার, অক্টোবর ১৮, ২০১৩


এরিক প্রাইবেক জার্মান। নাজি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এরিক ইতালির রোমে। ১৯৪৩ সালে রোমের আর্ডিটাইনে নাজি বাহিনী গণহত্যা চালায়। ৩৩৫ জন নিহত হয়, তার মধ্যে ৭৫ জন ছিলেন ইহুদী। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে এরিক ধরা পড়েন। কিন্তু ব্রিটিশ যুদ্ধবন্দীদের শিবির থেকে পালাতে সক্ষম হন। এক ক্যাথলিক বিশপ তাঁকে ভ্যাটিকানের একটি ভ্রমণপাস দেন। আরও অনেকের মতো এরিক পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়।
লসএঞ্জেলেসের সাইমন ওয়েজেনথাল সেন্টার গত কয়েক দশক ধরে নাজি যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজে বের করছে। যুদ্ধ শেষের ৫০ বছর পর ১৯৯৪ সালে সাইমন ওয়েজেনথাল সেন্টার আর্জেন্টিনায় এরিকের খোঁজ পায়। তাঁকে গ্রেফতার করে যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য ১৯৯৬ সালে ইতালি পাঠানো হয়। এরিকের বয়স তখন ৮৩। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয় এরিক। তবে তাঁর বয়স ও অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে তাঁকে তাঁর আইনজীবীর বাসায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
যুদ্ধাপরাধী এরিক এখন ১০০ বছর বয়সে মারা গেছেন। যেহেতু এরিক ক্যাথলিক, সেহেতু গির্জায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হওয়ার কথা। আর ভ্যাটিকান তো ক্যাথলিকদের সদর দফতর। কিন্তু, ভ্যাটিকান এখন বলছে, তারা গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হতে দেবে না। চার্চ সাধারণত এরকম সিদ্ধান্ত নেয় না। ইতালিতে চার্চের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ কেউ করেনি।
এরিকের আইনজীবী পাওলো গিয়াচিনি ঘোষণা করেছেন, ঠিক আছে, এরিকের মরদেহ আর্জেন্টিনায় পাঠানো হবে। সেখানে তাঁর স্ত্রীর পাশে তাঁকে সমাহিত করা হবে। আর্জেন্টিনায় এরিক প্রায় ৫০ বছর বসবাস করেছেন। এখন আর্জেন্টিনার সরকার বলছে, না, যুদ্ধাপরাধীর মরদেহ আর্জেন্টিনায় আনা যাবে না।
গিয়াচিনি বলছেন, এরিকের সন্তানরা চান ক্যাথলিক মতে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হোক। তাদের বাবা ছিলেন ক্যাথলিক, তাঁকে তো সম্মান দেখান উচিত। গিয়াচিনির দাবি, ক্যাথলিক মতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এরিকের অধিকার। ওয়েজেনথাল সেন্টার বলছে, এই যুদ্ধাপরাধীর মৃতদেহ জার্মানিতে পাঠানো হোক। সেখানে তাঁকে দাহ করা যেতে পারে। হিটলারের মরদেহও দাহ করা হয়েছিল। কারণ, নাজিদের কোন চিহ্ন পৃথিবীতে রাখা যাবে না।
যুদ্ধাপরাধীদেরও দু’একজন ভক্ত থাকে। যেখানে এরিক মারা গেছেন সেখানে তারা ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিল। তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। ইউরোপে নিউ-নাজিদের রাজনীতির কোন অধিকার নেই।
এরিককৃত গণহত্যায় নিহত একজনের আত্মীয় বলছেন, ওই লোকটির মনে কোন করুণা ছিল না। সবচেয়ে ভাল হয় তাঁকে দাহ করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া এবং সেই ছাই কোথায় ছড়ানো হয়েছে তাও যেন গোপন থাকে। তাঁকে ভুলে যেতে হবে। তাঁর কথা কখনও উচ্চারণ করা যাবে না। রোমে তাঁকে সমাহিত করার অর্থ, নাজিবাদের চিহ্ন রাখা এবং নিউ-নাজিদের ‘শ্রদ্ধা’ জানানোর স্থান হবে সেটি। এটি হতে পারে না।
আরেকজন, যার শ্বশুর সেই গণহত্যায় নিহত হয়েছেন, বলেছেন, এই শহর কিভাবে তাঁর শত্রুর দেহকে আশ্রয় দেবে? এই ধরনের জঘন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল তো কোন শহর হতে পারে না।
১০০ বছরের যুদ্ধাপরাধী এরিক প্রাইবেকের মরদেহ এখন রোমের একটি মর্গে পড়ে আছে।
এরিক ছিলেন সামান্য একজন নাজি অফিসার। উচ্চমার্গের কেউ নয়। তাঁর আজ এ পরিণতি।
গোলাম আযম বাংলাদেশের একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দ-িত হয়েছেন। তাঁর বয়স এরিকের থেকে কম। গোলাম আযম এ দেশে ৩০ লাখ মানুষের হত্যা, প্রায় ৬ লাখ নারী নির্যাতন, অগণতি মানুষকে আহত, এক কোটিরও বেশি মানুষের বাস্তুত্যাগের জন্য দায়ী। এরিক পালিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়, গোলাম আযম পালিয়েছিলেন সৌদি আরবে। এরিককে আশ্রয় দিয়েছিল আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকরা। গোলাম আযমকে পরে আশ্রয় দিয়েছিলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। সামরিক শাসকদের আমলে আর্জেন্টিনায় সুখেই ছিলেন এরিক, তারা থাকলে আর্জেন্টিনায়ই সমাহিত হতেন। কিন্তু, আর্জেন্টিনায় এখন গণতান্ত্রিক শাসন। যুদ্ধাপরাধীর স্থান সেখানে নেই। গোলাম আযম জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের আমলে শুধু সুখে-শান্তিতে নয়, রাজনীতি করে বাংলাদেশের নাজি পার্টি জামায়াতকে শক্তিশালীও করেছেন। প্রকাশ্যে, দম্ভভরে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তার গণবিচার করায় জেনারেল জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া এত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, গণআদালতের ২৪ জন উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা করেছিলেন। জেনারেল-পতœীরা জেনারেলদের মতোই হয়, আচরণ করে, যারা এটি ভুলে যায় তারা মূর্খ এবং বেকুব দুটোই।
শেখ হাসিনার আমল সামরিক আমল নয়। তাই যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার হয়েছে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে; তারপরই আর কিছু ঠিক নেই। এই ঠিক না থাকাটা প্রমাণ করে আমরা বাংলাদেশকে এখনও সম্পূর্ণভাবে জাতিরাষ্ট্রে পরিণত করতে পারিনি; আমাদের মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে, আমাদের মনের গহীন গভীরে এখনও পাকিস্তানীদের প্রতি মোহ জমা আছে, বঙ্গবন্ধুর বদলে কায়েদে আযমকে জাতির পিতা বলতে পারলে আমাদের কণ্ঠ খুলে যাবে, বাইরে বেশ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা ভাব, ভেতরে হেজাবি [হেফাজত+জামায়াত+ বিএনপি]দের জন্য প্রীতি, হাড়ে হারামজাদা বলতে পারছি না, অনেকে ক্ষুব্ধ হবেন ভেবে, এই হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশীদের অবস্থা।
গোলাম আযমকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়নি করুণা করে। বিচারকরা করুণার আধার। যে বৃদ্ধদের/বৃদ্ধাদের গোলাম আযমের সহযোগিতায় হত্যা করা হয়েছিল তারা অবশ্য পাকিস্তানী গোলামের করুণা পায়নি। গোলাম আযমকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে বাড়ির চেয়ে ভাল অবস্থায় রাখা হয়েছে। বাড়িতে এত ভালবাসা ও যতœ এ বয়সে তিনি পেতেন কিনা সন্দেহ। ২৪ ঘণ্টা ডাক্তারি সেবা। বাড়ি থেকে প্রেরিত খাবার। প্রতিদিন ১৬টি খবরের কাগজ। শাহরিয়ার কবির এক প্রবন্ধে লিখেছেন, তাঁকে যখন জেলে নেয় এই গোলাম আযম ও খালেদার সরকার, তখন তাঁকে বিন্দুমাত্র করুণা করা হয়নি। পাকিস্তানী গোলামরা সানন্দে ঈদ করে, যুদ্ধাপরাধী হলেও। আসলে, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী হওয়া খারাপ কিছু না !
এরিক কতজনকে হত্যা করেছে আর আবদুল আলীম? মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের চামড়া ছিলে নুন মাখাতেন আলীম। বাঘের খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঢুকিয়েছেন। গর্ভবতী হত্যায় সাহায্য করেছেন বলেও শুনেছি। সেই আবদুল আলীমকেও মৃত্যুদ- দেয়া হয়নি তার বাতের ব্যথার কারণে। তিনিও বহাল তবিয়তে আছেন গোলাম আযমের মতো হাসপাতালে। তাঁকে কি সুবিধা দেয়া হচ্ছে তা আমরা এখনও জানতে পারিনি। আলীম ছিলেন বিএনপির মন্ত্রী।
আমাদের মিডিয়া যারা এত শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা করা যাবে না। মোবাইল কোম্পানির মতো। তারা যা খুশি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রসাদধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা, প্রধানমন্ত্রীর করুণায় টিভি চ্যানেল পাওয়া ব্যক্তিত্বরা, বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু বলে যারা যখন তখন ডুকরে ওঠেন সেইসব মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে দাবিদার টিভির কর্তাব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে টিভিতে দেখিয়ে এসেছেন গোলাম আযম, আলীম বা কখনও কখনও সা.কা. চৌধুরী অশক্ত, নিজামী কারও কাঁধে ভর দেয়া ছাড়া সিঁড়ি ভাঙতে পারেন না, হাত নেড়ে তাঁদের অভিনন্দন ও ভি-চিহ্ন দেখানোÑধারণা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে এবং আংশিক সফল হয়েছে যে, গোলাম আযমরা বৃদ্ধ, তারা অশক্ত, তাদের নিয়ে এত টানা হেঁচড়া কেন। তাঁরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকতে পারেন, হয়ত করেছেন ভুলবশত এখন জামায়াত করেন, করতেই পারেন তাতে দোষের কি, তারা তো আওয়ামী লীগ করেন না। আলীম মুক্তিযোদ্ধাদের চামড়া তুলে লবণ মাখিয়েছেন, মাখাতেই পারেন কারণ তারা তো ছিল আওয়ামীপন্থী, পাকিস্তানপন্থী নয়। পরে তিনি তো বিএনপি করেছেন। তাতে দোষ স্খলন হয় না? আমাদের অনেকের প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রতিটি চ্যানেলের সম্পাদক-মালিকরা এ কাজগুলো করেছেন। ইচ্ছে করেই করেছেন নিরপেক্ষতার নামে। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে দেশপ্রেমের কারণে মিডিয়া এ ধরনের আচরণ করে না। টিভি/খবরের কাগজে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিভিন্ন আখ্যান, কর্মকা- প্রচার করেছে, কিন্তু কোন প্রতিবেদন কি দেখানো হয়েছে বা ছাপা হয়েছে এ বিষয়ে যে, দ-িত হওয়ার পরও গোলাম আযম বা আলীম কি আরামে আছে ? বেআইনীভাবে [আইন দেখিয়ে] যে সুবিধা পাচ্ছে বা এতদিন দেয়া হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের তা কেউ প্রচার করেনি। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এতদিনের সৃষ্ট ‘সমবেদনা’ যদি নষ্ট হযে যায় !
যুদ্ধাপরাধী এরিক এমন কোন নামকরা যুদ্ধাপরাধী নয়, অথচ কোন দেশে তাঁকে সমাহিত করতে দেয়া হচ্ছে না। কেননা, এইসব দেশের জনগণের দাবিÑ এদের দাহ করে মর্ত্যে যে এরা ছিল সে চিহ্ন মুছে ফেলা হোক। বাংলাদেশের মানুষ ও শাসকদের এখন একথা ভাবার সময় এসেছে। বিচারের রায়ের কপি পাওয়া যায়নি এ অজুহাতে সরকার হয়ত গোলাম আযমদের রায় কার্যকর করবে না। সরকারের ভেতর হেজাবিদের প্রতি সহানুভূতিশীলরা, অনেকের মতে, চাচ্ছেন যে, রায় কার্যকর না হোক। নির্বাচনের আগে এসব ঝামেলায় না যাওয়া ভাল। অন্যদিকে, আমজনতা মনে করে রায় কার্যকর করলে ভোটাধিক্যের সৃষ্টি হতে পারে। এ বিতর্কে নাই বা গেলাম। জীবনে একমাত্র সত্য মৃত্যু। এবং যে কোন সময় যে কোনখানে মৃত্যু। এই যে আমি, এখন এ লেখা লিখছি, লেখাটি ছাপা হলো কি না তা নাও দেখে যেতে পারি। গোলাম আযমদেরও মৃত্যু হবে। তখন কি হবে? যেহেতু যুদ্ধাপরাধ বিচারের পক্ষের সরকার, সেহেতু তাদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। জেনারেল জিয়া/এরশাদ/খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে এ প্রশ্ন উঠত না। তারা পারলে এদের কবরে স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে কসুর করবেন না। আমেরিকা এ সব বিবেচনা করে বিন লাদেনের মৃতদেহ পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। বিন লাদেন এখন বিস্মৃত। কিন্তু, তার মরদেহ পাকিস্তানে থাকলে এখন আজমীরের মতো মাজার শরিফ বানিয়ে ফেলা হতো। আমাদের রাজাকার ও রাজাকারপন্থী পার্টিগুলো কিন্তু এখন থেকেই প্ল্যান ছকে রেখেছে, নবীনগরে গোলাম আযমের মাজার হবে, পিরোজপুরে সাঈদীর আর সাঁথিয়ায় নিজামীর। রাউজানে সাকার স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ হবে। যাতে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে যুদ্ধাপরাধ কোন বিষয় বলে পরিগণিত না হয়। এবং এক দশক পর হজরত শাহ গোলাম আযম পাকিস্তানীর নামে উরস হবে। যেভাবে জিয়াউর রহমানের কবর মাজারে পরিণত করা হয়েছে। এবং এখন খবরের কাগজ ও টিভি প্রতিবেদনে একে মাজার বলেও উল্লেখ করা হয় যদিও তা শরিয়তবিরোধী। এ গুলো হতে পারে, বাংলাদেশী তো। গোলাম আযমের প্রকাশ্য সমর্থনকারী যদি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হন তাহলে সাকার স্মৃতিস্তম্ভ হতে দোষ কি ! আর যাই হোক আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথাকথিত মওলানাদের আর যাই থাকুক ভ্যাটিকানের মওলানাদের মতো সাহস আর ধর্মবোধ নেই। তারা যে এরিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অস্বীকৃতি জানিয়েছে তার কারণ নৈতিকতা, ধর্মবোধ ও মানবতা এবং সভ্যতা বোধ। একটা উপায় হতে পারে, যুদ্ধাপরাধীদের জন্য আলাদা ছোট গোরস্তান।
নিউ নাজিদের যাতে রবরবা না হয় সে কারণে এরিককে সমাহিত করতে কেউ রাজি নন। কারণ নিউ নাজিরা সেটিকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জায়গা করে ফেলবে। আমাদের এখানেও আছে নিউ নাজিরা, যারা একত্রে ১৮ দল হিসেবে পরিচিত। এদের প্রধান বিএনপি, যার নেতারা প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিরোধিতা করছেন। তাঁদের দ-ের বিরোধিতা করছেন। এদের নব্য রাজাকার সংক্ষেপে রাজাকারের দল বলা যেতে পারে। গণতন্ত্রের নামে মিডিয়া এই রাজাকারদের সমর্থন করছে, রাজনীতিবিদরা করছেন, সাধারণ মানুষ করছেন, সরকারও করছে [এর প্রমাণ গোলাম আযমদের সুবিধা দেয়া। বলা হয় সৌদি আরবের ভয়ে সরকার এ কাজ করছে। সৌদিরা শক্তিশালীকে বাবা ডাকে, একটু নরম হলে পায়ের নিচে রাখতে চায়। সৌদিদের কখনও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে শুনেছেন?] ইতালিতে ফ্যাসিবাদের জন্ম। সেই ইতালির মানুষরা কিন্তু ফ্যাসিবাদকে শুধু ছুঁড়ে ফেলা নয়, তার চিহ্নও রাখতে চায় না। আমরা জামায়াতকে রাখতে চাই, বিএনপিকে রাখতে চাই। বিএনপি যেন নির্বাচনে যায় সে জন্য সাধ্যসাধনা করি।
তারা যাতে জয়ী হয় সে প্রচার করি। যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকরা তো দেশপ্রেমী হতে পারে না, রাজনীতিও করতে পারে না সভ্য দেশে। এখানে পারে। এখানেই সভ্যদের সঙ্গে, দেশপ্রেমীদের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশীদের ফারাক। এখানে বীরোত্তম সিদ্দিকী হয়ে যায় ব্রীজোত্তম সিদ্দিকী।
প্রবাসে যে সব বাঙালী আছেন ১৯৭১ সালে তারা জান প্রাণ দিয়ে দেশ মুক্ত করতে চেয়েছেন। সভ্য দেশে ছিলেন, সভ্যতা তাদের স্পর্শ করেছিল; তাই খুনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এখনও তারা সভ্য দেশে আছেন, তারা অন্তত ইউরোপ-আমেরিকায় এ প্রচার চালান, বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধী তো বটেই যারা তাদের সমর্থন করছে সে সব রাজনীতিক/বুদ্ধিজীবীরাও যুদ্ধাপরাধী; অতএব, তাদের ভিসা দেয়া বন্ধ হোক। ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির ল-ন শাখা এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে ব্রিটেনে সাঈদীর প্রবেশ বন্ধ করেছিল। এই প্রতিবাদ প্রচার কিন্তু কাজ দেবে। আমরা সবাই মিলে এখন যে ধারণার সৃষ্টি করছি [বিচার করেও, যুদ্ধাপরাধীর পক্ষেও এ দেশে রায় হয় বিচারের নামে] তাতে এ দেশ পৃথিবীর একমাত্র যুদ্ধাপরাধী সমর্থক দেশ হলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, নৈতিকতা কোন নিরিখে যুদ্ধাপরাধী ও যুদ্ধাপরাধী সমর্থকদের রাজনীতি করতে দেয়া যায় না। তাদের পক্ষে প্রচার চালানোও যায় না। বাংলাদেশে এ ভেদরেখা মুছে ফেলা হচ্ছে যা একটি অপরাধ।
ইতালিতে এরিকের পক্ষে কোন মিডিয়া নেই, কোন বিচারক নেই, গির্জা নেই, মানুষ নেই। কারণ সে এক ‘জঘন্য প্রাণী’ যার পৃথিবীতে থাকার অধিকার নেই। এ দেশে যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে মিডিয়া আছে, বিচারক এবং বিচারকের করুণা আছে, মসজিদ আছে, মানুষও আছে।
এ দেশে গণতন্ত্রের নামে, নিরপেক্ষতার নামে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থকরা সমান স্পেস পায় তাদের বিরোধীদের সঙ্গে, সব খানে এবং এ কারণে কারও লজ্জাবোধ হয় না, ধর্মবোধ আহত হয় না। সাধারণ অপরাধী ও খুনীদের থেকেও যুদ্ধাপরাধীদের কর্মকা-কে হাল্কা করে দেখান হয়। তাদের পক্ষে বলার জন্য নানা কৌশলে টিভিতে টকশোর অনুষ্ঠান করা হয়, কাগজে নিবন্ধ ছাপা হয়। এ দেশটি কি আর বাংলাদেশ আছে? এ দেশে কি মানুষের বাচ্চারা বসবাস করে?
জনকন্ঠে প্রকাশিত।