রাজনীতিতে ধর্ম টেনে আনার ফল কখনও সুখকর হয়নি ।। আন্তর্জাতিক সম্মিলনে বিশেষজ্ঞদের অভিমত
এইদেশ ডেস্ক, শুক্রবার, অক্টোবর ০৪, ২০১৩


ধর্মনিরপেক্ষতা হলো গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ধর্মনিরপেক্ষতাই একমাত্র পথ। এর কোন বিকল্প নেই। রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার ফল কখনও সুখকর হয়নি। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করেই দেখতে হবে। আর ধর্মনিরপেক্ষ দক্ষিণ এশিয়া গড়ার লক্ষ্যে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুক্রবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক গণবক্তৃতা ও সম্মিলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। এ সম্মিলনে বাংলাদেশে থেকে উগ্রধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রুখতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে। এ নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও নতুন কিছু নয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই প্রবণতা মহামারি আকার ধারণ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও-এর বাইরে নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিকরা এ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন। এতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইতিহাসবিদরা বলেন, রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার ফল কখনও সুখকর হয়নি। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করেই দেখতে হবে। সম্মিলনে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

সম্মিলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্টমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, পাকিস্তানী কাঠামোর ভেতরে ধর্মের নামে আমাদের ওপরে যে নিপীড়ন চলেছিল তা প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রথম সংবিধানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক একটি রাষ্ট্র হবে। সেই অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরুও হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে আসায় দেশ এখন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিচালিত হচ্ছে।
ডা. দীপু মনি বলেন, ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে। সে সময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। ৬৪ জেলায় একযোগে বোমা হামলা হয়। জঙ্গী সংগঠন জেএমবির উত্থান ঘটে। তবে বর্তমান সরকার অসাম্প্রাদায়িক দেশ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।

অনুষ্ঠানে আলোচনার মূল বক্তা ভারতের জামিয়া মিল্লাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুশিরুল হাসান বলেন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাই একমাত্র পথ। এর কোন বিকল্প নেই। তবে মনে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্ম বিরোধিতা নয়। তিনি বলেন, ভারতবর্ষ স্বাধীনের পর রাজনীতিবিদরা অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন করার লক্ষ্যে তেমন কোন কাজ করেননি। যদি তাঁরা সেভাবে কাজ করতেন, তাহলে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন সম্ভব হতো। তিনি বলেন, মুসলিম সমাজে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মুসলিম সমাজে নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন। মুসলিম নারীদের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি।

পাকিস্তানের লাহোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক রহমান বলেন, অসাম্প্রদায়িকতা ইস্যুতে আমরা দক্ষিণ এশিয়া দেশগুলো এক হয়েছি। নানা মত-ভাবনা আর পরামর্শে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা দরকার বলে আমরা মনে করি। তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের বিষয় তুলে ধরে বলেন, গত তিনদশক ধরে পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান হারে অধিক থেকে অধিকতর ইসলামীকরণ হচ্ছে। জেনারেল জিয়াউল হকের আমল থেকেই বিভিন্ন নীতি ও আইন ইসলামীকরণ হয়েছে। তবে এখন নারী ও পুরুষের নামের ইসলামীকরণ ঘটছে।


প্রখ্যাত লেখক ও কলামিস্ট তারিক রহমান বলেন, পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের পুুরুষদের মধ্যে প্রতি দশজনের জনপ্রিয় নামের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে মুহম্মদ, আলী, আহমেদ, হুসেইন রাখা হয়। একই অবস্থা নারীর নামের ক্ষেত্রেও। প্রতি দশটি নারীর নামের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফাতেমা, আমেনা, আয়েশা ইত্যাদি নাম রাখা হয়। এমনকি খ্রীস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ও মুসলিম নামের দিকে ঝুঁকছে। তবে আগে এমনটি ছিল না। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো ইসলামীকরণ হওয়ার কারণে মানুষের নাম রাখার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, পাকিস্তান গঠনের মধ্যে দিয়ে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে ধর্মকে চরমভাবে ব্যবহার শুরু হয়। তবে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অসাম্প্রদিক চেতনা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পঁচাত্তরের পর আবারও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মকে ব্যবহার করা শুরু হয়। বর্তমানে ধর্ম নিয়ে বিভেদের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধর্মীয় আচরণ অনুসরণ করা এক কথা, ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করা এক কথা আর ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা আরেক কথা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপ্রধান মুনতাসীর মামুন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে এখনই সজাগ হতে হবে। যারা ডেমোক্র্যাট, লিবারেল তাঁরা ধর্মীয় জঙ্গীবাদ উত্থানকে ধর্ম দিয়ে অনেক সময় প্রতিরোধ করতে চায়। কিন্তু সেটা এক পর্যায়ে বিপদজ্জনক হয়ে ওঠে। সে কারণে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
মেসবাহ কামাল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসকে দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। ইতিহাসকে যোগ্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করে। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেন, বাঙালীর রক্তের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবাহিত হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবেই এ দেশের মানুষ চিরকালই উদার ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। কখনই অন্য ধর্মের প্রতি আঘাত হানেনি। সেই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় চরিত্র পঁচাত্তরে পর নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আবার ফিরিয়ে এনেছে।


অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এটি গণভাবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। ধর্মকে ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন তাঁরা একটি নীতি নিয়েছিল। ভাগ কর, শাসন কর। এই নীতি নেয়ার ফলে তাঁদের শাসন করতে সুবিধা হয়। পাশাপাশি তখন মুসলিম লীগও ধর্ম ব্যবহার করতে শুরু করে। পরিণতিতে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ভাগ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, দেশে এখন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই সমাজের ধনীরা এলাকায় গিয়ে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। কোন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে না। আর মাদ্রাসায় পড়ছে গরিব শিক্ষার্থীরা। সেখানে কোন ধনীর সন্তানরা পড়েন না। আসলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একটি ষড়যন্ত্রের শিকার। মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেন উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, সেটা ভেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা হলো গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে শ্রীলঙ্কার অধ্যাপক রোহান গুনারত্মে বাংলাদেশে থেকে উগ্রধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা রুখতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ও নিষিদ্ধের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যাঁরা ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন করে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া বুদ্ধিভিত্তিক ও আদর্শগত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। তবে এখনও তা অপ্রতিরোধ্য অবস্থায় পৌঁছেনি। এখই ব্যবস্থা নিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী। এটা মৌলবাদিতা রুখতে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, ২০০২, ০৩ ও ০৫ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলকায়দার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু সে সময়ের সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে ব্যবস্থায় না নিয়ে এড়িয়ে গেছে। অথচ সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ মোকাবেলা করতে হলে সরকারী সহায়তা দারুণভাবে প্রয়োজন।

গুনারত্নে বলেন, এ উপমহাদেশের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সংঘাতের মূল কারণ হলো জাতিগত ধর্মভিত্তিক। আর সংঘাতের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। এ কারণে সংঘাত এক জায়গায় শুরু হলে দ্রুতই তা অন্যস্থানে পৌঁছে যায়। আফগানিস্তানে তালেবানদে দ্বারা হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করা হয়েছে একইভাবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের বুদ্ধিভিক্তিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য ইতিহাস সম্মিলনীর মতো এ ধরনের সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা ধর্মে নামে সন্ত্রাস করে তাঁরা মূলত ধর্মের অপব্যাখ্যার করে। এ ক্ষেত্রে ধর্মের কোন দোষ নেই। শুধু ইসলাম নয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ধর্মের নামেও উগ্রবাদিতার মাধ্যমে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। আর যাঁরা করছে তাঁরা মূলত ধর্মকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে নিজেদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। যাঁরা এ কাজ করছে তাঁরা বেশিরভাই অশিক্ষিত। তাঁরা যে বিশ্বাস নিয়ে এ উগ্র কার্যক্রম চালায় তা ধর্মে নেই এটাও তাঁরা জানে না।
তিনি বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদী রোধে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রীতি ক্লাব গঠন করতে হবে। কারণ ধর্ম বড় না মানবতা বড় এটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

ইতিহাস সম্মেলনে ধর্মীয় মৌলবাদ অর্থনীতির ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, জামায়াত সুসংগঠিত জঙ্গী কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা দখল করতে চায়। এ জন্য তাঁরা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁদের সাম্প্রদায়িক কর্মকা- দেশকে হাজার বছর পিছিয়ে দেবে। কারণ তাঁরা যুক্তির ধার ধারে না। তাঁদের অর্থনৈতিকভিত্তি মজবুত। দেশে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। বিগত বছরগুলোতে মাদ্রাসা শিক্ষা কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন প্রতি তিনজন ছাত্রের একজন মাদ্রাসার ছাত্র। মাদ্রাসা পড়াদের ৭৫ ভাগই হলো বেকার।

তিনি বলেন, দেশে গত ৪০ বছরের মৌলবাদের অর্থনীতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর মৌলবাদের অর্থনীতির মাধ্যমে তাঁরা নিট মুনাফা করে ২ হাজার কোটি টাকা। দেশের ১২টি সেক্টরে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। প্রথম তাঁরা ’৭১ সালে লুটপাটের মাধ্যমে অর্থসংগ্রহ করে। এর পর ৭০ দশকে বিদেশী সাহায্য সহযোগিতায় তাঁরা বিনিয়োগ শুরু করে। অনেকে বলে থাকে দেশে বিদেশী অর্থায়নে জঙ্গী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আসলে এ কথা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ মৌলবাদের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে এর মাধ্যমে মূলত জঙ্গী অর্থায়ন হয়ে থাকে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে সরকার নজরদারি করছে না।

আবুল বারকাত আরও বলেন, মৌলবাদের অর্থনীতি প্রতিবছর যে মুনাফা করছে তার ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করেই প্রায় ১০ লাখ কর্মীকে পূর্ণকালীন সময়ে নিয়োগ দেয়া সম্ভব। দেশে জঙ্গীবাদ এতই শক্তিশালী যে তাঁরা ধরা পড়লে তাঁদের ছাড়িয়ে নেয়ার লোকের অভাব হয় না। তাঁদের গডফাদার সব সময় ধরা ছোয়ার বাইরে থাকে। ইসলামী মৌলবাদ দুর্বল কোন প্রতিপক্ষ নয়। তাঁদের তিন স্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রথম স্তরে রয়েছে জামায়াত ইসলাম। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ১২৫টি জঙ্গী সংগঠন। তৃতীয় স্তরে রয়েছে ২৩০টি মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাদের কর্মকা-ে সাধারণ মানুষ আজ অতিষ্ঠ। তাঁরা দেশে উৎপাদন ও অবকঠামো ধ্বংস করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল নিতে চায়। ১৩ দফা দাবির মাধ্যমে দেশকে আস্তিক-নাস্তিক বিভাজনে পরিণত করেছে। তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করা তাদের অন্যতম টার্গেট। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। দেশে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখনি তাঁদের প্রতিরোধ করা না গেলে দেশের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে।
লেখক সাংবাদিক শাহারিয়ার কবীর ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ তাঁদের দেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাঁদের স্বার্থে জামায়াত ইসলামসহ রাজনৈতিক ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পেছনেও তাঁদের হাত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব মুসলিম দেশে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠন করেছে তাদের আমেরিকা বল প্রয়োগের মাধ্যমে হটিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ক্ষীণ পরিসরে হলেও এ উপমহাদেশের মুসলিম দেশ একমাত্র বাংলাদেশে ধর্মনিরেপক্ষ সরকার কায়েম রয়েছে। তবে তাও হুমকির মুখে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, অসাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চার ধারাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী এই গণবক্তৃতার আয়োজন করেছে। জঙ্গীবাদ, মৌলবাদমুক্ত দক্ষিণ এশিয়া বিনির্মাণে ইতিহাস হবে শক্তিশালী হাতিয়ার। কেবল উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দক্ষিণ এশিয়া এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

শনিবার অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনের চতুর্থ অধিবেশনে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ভারতের রিয়াজ পাঞ্জাবী, পাকিস্তানের তারিক রহমান বক্তব্য রাখবেন। পঞ্চম অধিবেশনে হাসানুল হক ইনু, শ্রীলঙ্কার অধ্যাপক রোহান গুনারতেœ, বাংলাদেশের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বক্তব্য রাখবেন। ষষ্ঠ অধিবেশনে শাহরিয়ার কবীর, ভারতের মনিশঙ্কর আয়ার এমপি, অধ্যাপক মুশিরুল হাসান বক্তব্য রাখবেন। সমাপনী অধিবেশনে পাকিস্তানের সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদী, আসাদুজ্জামান নূর, সিরডাপের ড. সিসেপ ইফেন্দি, ভারতের সাঈদ নাকভী, নেপালের তাইবুল হাসান খান, যুবনাথ লামসাল, শ্রীলঙ্কার রোহান গুনারত্নে, বাংলাদেশের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বক্তব্য রাখবেন। সমাপনী অধিবেশন শেষে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর প্রথম জাতীয় প্রতিনিধিসভা অনুষ্ঠিত হবে।
জনকন্ঠে প্রকাশিত।