ফাঁসির দন্ডপ্র্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সাকা’র দোস্তদের প্রতিহত করবে কী বাংলাদেশ?
Fazlul Bari, মঙ্গলবার, অক্টোবর ০১, ২০১৩



ফজলুল বারী, অন্যতম সম্পাদক, এইদেশ নিউজ।।যুদ্ধাপরাধী সাকা তথা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির দন্ডে খুশি হয়েছি। ফাঁসির চেয়ে কম দন্ডে নাখোশ শুধু আমি না, দেশজুড়ে যত কোটি কোটি মানুষ এই বিচার চান, তারাও হতেন। ফাঁসির কমে প্রশ্নবিদ্ধ হতো বিচার। যেমন গোলাম আযমের ক্ষেত্রে হয়েছে। কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা এখন যাদের বিচার হচ্ছে, এরা সবাই দাগী-আত্মস্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী। দাগী ডাকাত, ক্রিমিন্যাল যেমন হয়। এরা বরাবর মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজেদের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের পক্ষের ‘অকুতোভয় যোদ্ধা’ বলে জাহির করেছে! এরসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের গণহত্যা, ধর্ষন-দূর্ভোগ জড়িত। আত্মস্বীকৃতরা এসবের দায় এড়াতে পারেনা। কিন্তু গত বিয়াল্লিশ বছর নানাভাবে এরা যুদ্ধাপরাধের বিচার আটকে বা ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে! মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধীদের বিচারের দালাল আইন বাতিল করে, আটক ব্যক্তিদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে জিয়ার বিএনপি গঠিত হয়েছিল। খালেদা জিয়ার বিএনপির যুদ্ধাপরাধী নেতা সাকা চৌধুরীর বিচার কঠিন হবার কারন ছিল, সে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ সদস্য! আদালত স্বীকৃত এমন একটি খুনি-নৃশংস প্রজাতির লোক কি করে ধারাবাহিক এমপিত্ব বজায় রেখে এসেছে, তা তার এলাকার লোকজন ভালো জানেন! এরশাদের মন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতার বহরে ঢোকা একাত্তরের ঘৃণ্য চরিত্র সাকা চৌধুরী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন! কিন্তু তার অতীত কীর্তির(!) জন্য খালেদা তাকে কখনও মন্ত্রী করেননি! এবার বিরোধীদলের উপনেতাও করেননি। সেই ‘ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী সাকা’র’ শাস্তি শুনে ‘বেদনাহত বিএনপি’ যুদ্ধাপরাধের বিচার শুধু পন্ড না, সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বিচারের ঘোষনা দিয়ে নিজেদের কোথায় নিয়ে গেল, তা কি তারা ভেবেছেন?
এবার যখন বহুল অপেক্ষার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াটি শুরু হলো, তা কোন গোপন প্রক্রিয়া ছিলোনা। রীতিমতো নির্বাচনে ঘোষনা দিয়ে ম্যান্ডেট নেয়া হয়েছে! বিচার করবেন বলে ম্যান্ডেট নিয়েছেন শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়া এখন স্বচ্ছ-আন্তর্জাতিক মানের বিচারের কথা বললেও গত নির্বাচনের আগে কিন্তু এ ব্যাপারে কোন কথা বলেননি। বরঞ্চ এসব সাকা সহ যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বগলদাবা করেই নির্বাচন করেছেন এবং এখনও বগলদাবা করে আছেন!
এই বিচার যখন শুরু হলো, তখন এই বিচার বিরোধীদের নানা বক্তব্য অথবা বাহানা দেখা গেল! যেমন প্রথম বলা হলো, সরকার আসলে এ বিচার করবেনা! রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের বাহানা করছে!এক ফুঁতে ট্রাইবুন্যাল উড়িয়ে দেয়া হবে, এমনও বলা হয়েছিল!বিচার ঠেকাতে দেশে-বিদেশে লবিষ্ট-ভাড়াটিয়া নিয়োগ সহ নানা চেষ্টায়ও কমতি ছিলোনা বা এখনও নেই! কিন্তু যখন গ্রেফতার শুরু-বিচার শুরু হলো, তখন বলা হলো এ ট্রাইবুন্যাল-বিচার স্বচ্ছ-আন্তর্জাতিক মানের নয়! অথচ যাদের বিচারের প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে, তাদের অপকর্মের দলিল দস্তাবেজ অথবা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আছে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছরে অনেক সাক্ষীর মৃত্যু হলেও সাক্ষীদের অনেকে এখনও বেঁচে আছেন। এখন পর্যন্ত যত যুদ্ধাপরাধীর সাজা হয়েছে, এর সব সাজাই হয়েছে তাদেরই দলিলদস্তাবেজ আর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। সাকা সহ বিচার বিরোধীরা পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে প্র্রশ্নবিদ্ধ, বিলম্বিত করতে কম চেষ্টা করেনি বা করছেনা। আওয়ামী লীগ সরকারের উদারতায় আপিলের সুযোগকে কেন্দ্র করেও বিচার বিলম্বিত হচ্ছে! বিচার শেষ করার আইনগত বিধান আপিল বিভাগ শুনছেনা! অথচ যুদ্ধাপরাধী-মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে এর আগে পৃথিবীর কোথাও আপিলের বিধান ছিলোনা।
শুরু থেকে সরকারি অথবা বিচার সংশ্লিষ্ট সরলতা অথবা উদাসীনতার সুযোগও কালপ্রিটরা নিয়েছে এবং এখনও নিচ্ছে! নতুবা একজন বিচারকের সঙ্গে বেলজিয়াম প্রবাসী বাংলাদেশি একজন আইন বিশেষজ্ঞের স্কাইপে কথোপকথন কি করে হ্যাক-ফাঁস হলো, তা আজ পর্যন্ত কি সরকার উদঘাটন করতে পেরেছে? যেখানে বিলিয়ন ডলারের লবিষ্ট-দালাল নিয়োগ-ভাড়ার ফন্দি-ফিকির চলে, সেখানে ওই কথোপকথনের কোথাও কি একটি টাকারও লেনদেনের কথা ছিল? এখন আবার বিচারকদের লেখা রায় যদি আগেভাগে ওয়েবসাইটে গিয়ে থাকে, সেটি কিভাবে কাদের মাধ্যমে হ্যাক অথবা কারসাজি করে নেয়া হয়েছে, সেটি সরকারি গোয়েন্দাদেরই বের করে জনগণকে বলতে হবে। বাংলাদেশে যেখানে পরীক্ষার প্র্রশ্নপত্র সহ নানাকিছু ফাঁস হয়, এক্ষেত্রে এটিও অসম্ভব না। মিডিয়ায় দেখলাম এরমাঝে এরমাঝে আইন মন্ত্রণালয়-বেলজিয়াম এসব গল্প জুড়ে দেয়া হয়েছে! কিন্তু এসব ছড়িয়েও এটা বলা সম্ভব হয়নি যে, নতুন চন্দ্র খুন হননি খুনি সাকা’র হাতে! রাউজানের উনসত্তুর পাড়ার বধ্যভূমিতো ভূমিকম্পে তলিয়ে যায়নি! সাংবাদিক নিজামউদ্দিন যে স্বয়ং নির্যাতিত হয়েছেন নৃশংস সাকা’র হাতে, তিনিওতো এই বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজে এসে কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, এসবকে অসত্য-সাজানো বলা যায়নি। সাকার বিরুদ্ধে কোর্টে সাক্ষী দিয়েছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বাংলাদেশের কোন ফালতু চরিত্র না।
এবং সাকা’র এই বিচারটি দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির খোলস আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে! মিডিয়ায় বলা হচ্ছিল, এ রায়ের পরও বিএনপি বোবা হয়ে গেছে! কিন্তু খন্দকার মাহবুব হোসেন, মওদুদ আহমদ, রকিফুল ইসলাম মিয়া এরাতো বিএনপিরই নেতা, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, স্থায়ী কমিটির সদস্য! আপিল বিভাগে কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে এরাইতো ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পাশে বসে সংবাদ সম্মেলন করেছেন! এর সাকার’ রায়ের পরে হুমকি দিয়ে বলেছেন, বিচারদের বিচার করবেন! এই বিচারকদের মধ্যে হাইকোর্টের বিচারকওতো আছেন! এখন দেশের হাইকোর্ট-সুপ্রীমকোর্ট এসব হুমকিদাতাকে তাদের আওতায় আনবেন না? মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের বিচার পন্ড করা যাদের ক্ষমতায় যাবার মূল লক্ষ্য, তাদের কি প্রতিহত করবে না বাংলাদেশ? এটি এখন মিলিয়ন ডলারের প্র্রশ্ন!



লিঙ্ক