যে গল্পের শেষ নেই!
Fazlul Bari, বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৩



ফজলুল বারী।। অন্যতম সম্পাদক, এইদেশ নিউজ,
বঙ্গবন্ধু, জিয়া হত্যা, এরশাদের স্বৈরশাসন, এসবের অভিজ্ঞতায় তিন জোটের রুপরেখায় দেশকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরানোর অঙ্গিকার করা হয়। কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জিতে খালেদা জিয়া বোধগম্য কারনে সংসদীয় পদ্ধতিতে যেন ফিরতে চাইছিলেন না! সে কারনে তখনও বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দেশকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরানোর সিদ্ধান্ত হচ্ছিল না! আর এ নিয়ে দ্বিধার বোধগম্য কারনটা, গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়ার ওই সময়ে তিনি এবং তার উপদেষ্টারা হয়তো সংসদ নেত্রী হিসাবে সংসদে নেতৃত্বে তিনি কতটা সক্ষম হবেন, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন, অথবা আমাদের দুই নেত্রীই ব্যক্তিগত আচরনের দিক দিয়ে অনেকটা রাষ্ট্রপতি ধাচের!
অনেকের হয়তো মনে আছে, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন তখন এক রকম হুমকি দিয়েই তাকে ও বিএনপিকে সংসদীয় পদ্ধতিতে যেতে বাধ্য করেন। আবার দেশের ইতিহাসের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারর অধীনে অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে খালেদার বিজয়ের বিরুদ্ধে সূক্ষ কারচুপির অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা।
এরপর আবার খালেদা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গিয়ে সংবিধানে নেই বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করতে থাকেন! শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রচন্ড আন্দোলন স্বত্ত্বেও এক তরফা করে ফেলেন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন! অতঃপর অরিন্দম কহিলা বিষাদের মতো বাধ্য হয়ে সারা রাত সংসদ চালিয়ে খালেদা ক্ষমতা ছাড়েন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভূক্ত করে! এরপর বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান খানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। কারচুপির অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া!
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করেননি। সংবিধান নির্ধারিত পথে বিচারপতি লতিফুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হয়েও যান। কিন্তু শপথ নিয়েই পররাষ্ট্র সচিব সহ শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া প্রশাসনের পুরোটা পালটে দিয়ে একটি বার্তা দিয়ে দেন লতিফুর! নির্বাচনে হেরে শেখ হাসিনা এবার অভিযোগ করেন স্থূল কারচুপির!
খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় ফিরে শুরু করেন দূর্নীতির মচ্ছব, যা তার আগের মেয়াদে এতটা দেখা যায়নি! নতুন মেয়াদে হাওয়া ভবনে বসে বিকল্প সরকার পরিচালনা শুরু করেন তারেক রহমান! আগের দফার মতো তত্ত্বাবধায়কের বিরোধিতা না করলেও পছন্দের বিচারপতি হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতিদের বয়স সীমায় রদবদল করা হয়! এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার তরফে প্রচন্ড বাধা আসলে সংবিধানের অপরাপর অপশন এড়িয়ে নিজেদের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকেই করে ফেলা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান! এসব জারিজুরি বিফলে গেলে দেশে ১/১১'র সরকার আসে! দুই নেত্রীর জীবনের প্রথম জেলের ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়! চিকিৎসা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার দুই ছেলে বিদেশ চলে যান! এবং তারেক রহমান ভাঙ্গা মেরুদন্ডের চিকিৎসায় বিদেশ যাবার আগে মুচলেকা দিয়ে যান, জীবনে আর রাজনীতি না করার!
ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়কের নির্বাচনে হাসিনা বিপুল ভাবে ক্ষমতায় ফিরলে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন ডিজিটাল কারচুপির! অর্থাৎ বাংলাদেশের একটি তত্ত্বাবধায়কের নির্বাচনও কোন কালে বিজিতের প্রশংসা পায়নি! বিজিতের তরফে বরাবর কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছে! বিজিত কোনদিন বিজয়ী নতুন সরকারের শপথে যায়নি!
২০০৮ সালে বিজয়ী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে যত দূর্নীতির অভিযোগ এসেছে, তা ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারের বিরুদ্ধে অতটা ছিলোনা। সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে, সুরঞ্জিতের মন্ত্রিত্ব কেড়ে নিতে হয়েছে! খালেদা জিয়ার আমলে করা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মামলার পক্ষে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধান বিরোধী বলে হাইকোর্ট রায় দিলে শেখ হাসিনাও তড়িঘড়ি সংবিধান সংশোধন করে এ ব্যবস্থার বিলোপ করেন! হাইকোর্ট-সুপ্রীমকোর্ট প্রথম রায়ে সংসদ চাইলে বিচারপতিদের বাদ দিয়ে আগামি দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা বললেও চূড়ান্ত লিখিত রায়ে সেটিও বাদ দেয়া হয়।
১৯৯১ সালের পর খালেদা জিয়া যেভাবে বলতেন, এখন তেমন করে শেখ হাসিনা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে নেই, সংবিধানে যেভাবে আছে, সেভাবেই নির্বাচন হবে, অন্য্ সংসদীয় পদ্ধতির দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবেই নির্বাচন হবে। খালেদা জিয়া বলছেন, হবেনা। তত্ত্বাবধায়কের অধীনেই নির্বাচন দিতে হবে। নতুুবা নির্বাচন করতে দেয়া হবেনা। শেখ হাসিনা এই কথাগুলোই বলেছেন খালেদার আমলে!
আবার, সংসদীয় ব্যবস্থায় চলতে চাইলে একদিন অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলোপ করতে হবে। অন্য্ সংসদীয় পদ্ধতির দেশে যেভাবে ইমিডিয়েট পাস্ট সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, সেভাবেই নির্বাচন হতে হবে। কিন্তু সেদিনটি কি বাংলাদেশে আসবে অনন্তকাল পরে? কোন একটা সময়েতো তেমন শুরু করতে হবে। এখন যদি আগামি নির্বাচনে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসেন, তিনি কি আর তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন দেবেন? খালেদা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন না দিলে শেখ হাসিনা কি তা মানবেন? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, না'। খালেদা জিয়াও দিতে চাইবেন না, শেখ হাসিনাও তা মানবেন না। সুপ্রীমকোর্টতো সংসদ চাইলে আগামি দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে করতে বলেছিল। কিন্তু আগামি দুটি নির্বাচন তথা দশ বছর পর কি বাংলাদেশে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র চলে আসবে? তাহলে এই গল্পের শেষ কোথায়? না এ পরিস্থিতির শিরোনাম যে গল্পের শেষ নেই?