জঙ্গীবাদ রুখতে হলে তাদের অর্থের উৎস নির্মূল করতে হবে ।। জঙ্গীবাদবিরোধী জাতীয় কনভেনশনে যৌথ প্রতিরোধের আহ্বান
জনকন্ঠ রিপোর্ট, শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৩


দেশ থেকে সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা এবং জঙ্গীবাদ নিমূর্ল করতে হলে এর বিরুদ্ধে যৌথভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদের অর্থ উৎস বন্ধ করে দিতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তি শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছরে দেশে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক শক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় চরিত্র নষ্ট করে দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তাকে এখনই নিমূর্ল করা না গেলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না। দেশে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মূলে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত চেতনাকে বিনাশ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রুখতে হলে এখনই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে। উপমহাদেশে স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে।

শুক্রবার সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গীবাদবিরোধী মঞ্চের দ্বিতীয় জাতীয় কনভেনশনে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মোকাবেলায় যৌথভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এ আহ্বান জানান। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউিট মিলনায়তনে এ কনভেশনের আয়োজন করা হয়। কনভেনশনে বাংলাদেশ ছাড়া ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশগ্রহণ করেন। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, পেশাজীবী, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা কনভেশনে অংশগ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সমন্বয়ক অজয় রায়।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু ৪২ বছরের ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে। ’৭৫ সালের পটপরিবর্তনের ফলে সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেয়া হয়েছে। অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনীর ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এলেও রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানে এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু এ দুটি বিষয় সংবিধানে কিভাবে পাশাপাশি থাকে?

তিনি বলেন, সাস্প্রতিককালে দেশে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপতৎপতরতা বৃদ্ধি পেলেও নাগরিক সমাজকে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। অথচ ৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। ২০০৩ সালে দেশে প্রথম জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে। অথচ সে সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেশে কোন জঙ্গীবাদ নেই বলে অস্বীকার করা হয়েছিল। পরে অনুসন্ধানে জঙ্গীবাদের আস্তানা পর্যন্ত আবিষ্কার করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে যেসব সংগঠন আইনের চোখে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে সেসব সংগঠনকে এখনই নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত করতে এবং রায় কার্যকর করতে হলে জনগণের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে। নারী সমাজের সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এ কাজে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।

শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে দেশে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। ’৭৫ সালের পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দেশে জঙ্গীবাদ বিস্তার লাভ করেছে। জঙ্গীবাদ শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ১৮ দলীয় জোটের নেতৃত্বে বিএনপি নয়, রয়েছে জামায়াত। নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় আসলে দেশ সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের আস্তানায় পরিণত হবে।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেমন এমপি বলেন, দেশে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টাও করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক হামলার মধ্য দিয়ে তারা আগামীতে আরও বড় ধরনের আঘাত হানার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ফিরে আসলে দেশে জঙ্গীবাদ ফিরে আসবে। দুর্নীতি ও লুটপাট বৃদ্ধি পাবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ায় বিস্তার লাভ করবে দক্ষিণপন্থী জঙ্গীবাদে। তিনি বলেন, ৪০ বছর পরে হলেও দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ চলছে। সুপ্রীমকোর্টে যুদ্ধাপরাধীদের মামলা রায় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলছে। অথচ তাদের নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানালেও তারা সাড়া দিচ্ছে না। তাদের এ দাবির পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে।

জাসদের কার্যকরী কমিটির সভাপতি মাইনুদ্দিন খান বাদল বলেন, আগামী নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় ফিরে না এলে দেশ ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি বর্তমানে দূষিত হয়ে পড়লেও তারা সপক্ষ শক্তি। কিন্তু ভোটের রাজনীতি গ-গোল পাকিয়ে ফেলে। তাই অনেক সময় তাদের আপোস মীমাংসার ভূমিকায় দেখা যায়।

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য পবিত্র সরকার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় দুটি সম্প্রদায় বহুদিন ধরে চেষ্টা করেছে এক সঙ্গে বসবাস করার। কিন্তু সাম্প্রতিককালে উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা দুই সম্প্রদায়কে নষ্ট করে ফেলেছে। ভারতে সাম্প্রদায়িক শক্তি সক্রিয় রয়েছে। সেখানে হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী মৌলবাদীও রয়েছে। ভোটের রাজনীতির কারণে তাদের প্রশ্র্রয় দেয়া হয়। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতাহীন ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারলে উপমহাদেশে পৃথিবীর মধ্যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব হবে। বলেন, ভারতে পাশাপাশি দুটি সম্প্রদায়ের একসঙ্গে বসবাস করার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যখন মুসলিম শাসকরা এ দেশের শাসনভার নেয় তখন তারা কোন সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমকি ভারতবর্ষকে তারা কখনও ইসলামীকরণের চেষ্টা করেনি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে সম্রাট আকবর ভারতবর্ষ শাসন করে গেছেন। এমনকি তিনি সব ধর্মের মর্মবাণী নিয়ে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পাকিস্তানের আওয়ামী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফারুক তারিক বলেন, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল পীড়ন সৃষ্টি করছে। এর মূলে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত পরস্পরবিরোধী চিন্তা করে। তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছে। আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তারা পাকিস্তানকে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ সৃষ্টিতেও জামায়াত বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী মিলিটারীদের সহায়তা করে জামায়াত গণহত্যা চালিয়েছে। এ কাজ করে তারা গণমানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার সময় পাকিস্তান জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রহমত আলী তখন বলেছিলেন, আল্লাহর অসীম কৃপা পাকিস্তানকে বাঁচানো গেছে। তখন মুওদুদীও বলেছিলেন, সত্যিকার মুসলিম হিসেবে জামায়াত পাকিস্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ’৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান জামায়াতের পক্ষ থেকে ৪১টি দেশে মওদুদী চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক শক্তি সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষতি করে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সামারিক বাহিনী যারা এ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে এ দেশের মাটিতে তাদের বিচার হওয়া উচিত। ধর্মের সহায়তা নিয়ে কোন দেশে রাজনীতি অর্থনীতি পরিচালিত হতে পারে না। ধর্ম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। আগামী পৃথিবীর রাজদ-ে ধর্মের স্থান দেয়া ঠিক হবে না। কারণ ধর্ম থাকবে মানুষের অন্তরে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানের জনগণও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর বিচার চলছে। আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল তারা করায় তারা আনন্দিত। বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াত ইসলামীর নেতাদের বিচার করা হচ্ছে। এ বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য শাহবাগের তরুণরা জেগে উঠেছে। শাহবাগের তরুণরা জেগে না উঠলে বিচার প্রক্রিয়া আবার পেছনে পড়ে যেত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, দেশে জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদ মোকাবেলায় নিরপেক্ষতার কোন স্থান নেই। বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করতে হবে যেখানে সবার ওপরে মানুষ থাকবে। তিনি বলেন, জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদ দেশের মানুষের অধিকার হরণ করতে চায়। নারীর স্বাধীনতায় আঘাত হানতে চায়। দেশে সাম্প্রতিকালে হিন্দুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছে আতঙ্কের মধ্যে। কিন্তু এমন বাংলাদেশ আমরা চাইনি। তিনি বলেন, যারাই দেশে রাজনীতি করবে তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতানা ধারণ করেই করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কারও রাজনীতি করার সুযোগ এ দেশে দেয়া হবে না।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল বারাকাত বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় জামায়াত ইসলামের হরিলুটের মাধ্যমে দেশে মৌলবাদের অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। তারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রায় ৯টি খাতে অর্থ বিনিয়োগ করছে। জামায়াতের বিনিয়োগ করা অর্থের সংস্থান শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসেনি। এর বিশাল একটি অংশ এসেছে আমেরিকা থেকেও। বর্তমানে তারা আর্থিক, বাণিজ্যিক, শিল্প প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ও পরিবহন খাত, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ও সংবাদমাধ্যমসহ ৯টি খাতে অর্থের বিনিয়োগ করছে। এ খাতে বিনিয়োগ করা অর্থ থেকে তারা বছরে ২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছে। ৩৮ বছরে তাদের পুঞ্জিভূত নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের এক বছরে আয়-ব্যয়ের সমান। তিনি বলেন, এদের প্রতিরোধ করা এখন কোন সহজ কাজ নয়। যৌথ উদ্যোগ ছাড়া তাদের প্রতিরোধ করার সম্ভব নয়। জঙ্গী ও সাম্প্রদায়িকতা রুখতে হলে আগে তাদের অর্থের উৎস নির্মূল করতে হবে। তাদের পরিচালিত ব্যাংক বাজেয়াফত করে সে খাতে অর্থ দেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের ট্রাস্টি ড. সারোয়ার আলী বলেন, সম্প্রতিকালে দেশে জঙ্গী তৎপরতা ও সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে ১০৫ মন্দিরে হামলা হয়েছে। শহীদ মিনার ভাংচুর এবং জাতীয় পতাকায় অগ্নিসংযোগ করে অবমাননা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এদেশে আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদ মনে করছে না। অথচ সমঅধিকারের ভিত্তিতে এ দেশের জন্ম হয়েছিল। বর্তমানে ধর্মের উগ্রবাদী ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। এগুলোর মোকাবেলায় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির পেছনের রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অথচ জামায়াতকে নিষিদ্ধে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপমহাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা বর্তমানে নেই। সমাজ ক্রমে ক্রমে মৌলবাদের দিকে ধাবিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে দেশে জঙ্গীবাদ নির্মূল করা যাবে না। জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ’৭১-এর মতো রুখে দাঁড়াতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সমন্বয়ক অজয় রায় বলেন, জনগণের ধর্ম বিশ্বাসকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সহিংসতার মাধ্যমে দেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের চলমান বিচার প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে চাইছে। তেমনই সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মন্ধতা উস্কে দিয়ে দেশে ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলতে চাইছে। তেমনইভাবে নারী সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে তাদের জীবনকে অর্থহীন ভবিষ্যতের আশাভরসাহীন নিছক এক প্রাণহীন অস্তিত্বে পরিণত করতে চাইছে।
সাম্প্রদায়িকতা জঙ্গীবাদবিরোধী মঞ্চে দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণা বলা হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করার পর থেকে পরাজিত শক্তি মরিয়া হয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে দেশব্যাপী সন্ত্রাস-তা-ব চালাচ্ছে। এ জন্য তারা যেমন প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের সহযোগীদের সাহায্যে জটিলতা সৃষ্টি করতে চাইছে, তেমনই জনজীবনের সমস্যাবলী ব্যবহার করে পরিস্থিতি নানাভাবে জটিল করে তুলছে। জামায়াত-শিবির এবং তাদের নতুন সহযোগী হেফাজত ইসলাম সরকারকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এদিকে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদ দমনের জন্য সরকারী উদ্যোগ আরও গতিশীল করতে হবে। প্রশাসনকে চক্রান্তকারীদের রাহুমুক্ত করতে হবে। এ অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশের সকল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে।

জাতীয় কনভেনশন থেকে জঙ্গীবাদ নির্মূলে বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক সংবিধান নিশ্চিত করে রাষ্ট্রকে জঙ্গীবাদের ছোবল থেকে মুক্ত করতে হবে। জঙ্গীদের অর্থায়নের সকল উৎস বন্ধ করে জামায়াত-শিবির এবং সকল উগ্রবাদী সংগঠন নিষিদ্ধ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করতে দ্রুততার সঙ্গে আপীল নিষ্পত্তি করে সকল রায় কার্যকর করতে হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচার দ্রুত করতে হবে। রমনা বটমূল, উদীচী সম্মেলনে বোমা হামলা, সিপিবির জনসভায় বোমা হামলাসহ সকল সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিচার করতে হবে। জাতীয় সংসদে গৃহীত শিক্ষানীতি, নারী উন্নয়ন নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নে সফল উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে।