দেশের রাজনিতিতে সেপ্টেম্বরে নাটকীয় কিছু ঘটতে পারে!
বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক জনকন্ঠ, মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০১৩


সংঘাত নয়, সংলাপের পথেই দেশের রাজনীতি। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সংলাপের ব্যাপারে দু’পক্ষই রাজি। শর্তের বেড়াজালে সংলাপের সম্ভাবনা বন্দী থাকলেও রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সেপ্টেম্বরের যে কোন সময় ঘটতে পারে নাটকীয় ঘটনা। মুখে বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকি আর সরকারী দলের মোকাবেলার ঘোষণায় রাজনীতির মাঠ গরম রাখলেও পর্দার অন্তরালে দু’পক্ষই খুঁজছে সংবিধানের আওতার মধ্যেই গ্রহণযোগ্য বিকল্প একটি ‘নতুন ফর্মুলা’। কোন ফর্মুলায় দু’পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছে সবার অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন জানুয়ারিতে সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন ‘দূতিয়ালি’র মাধ্যমে চলছে ভেতরে ভেতরে বিস্তর আলোচনা।

জাতীয় নির্বাচন দুয়ারে কড়া নাড়ছে। সরকারের মেয়াদকাল যতই কমছে ততই সরকারী দল বা বিরোধী দলের শিবিরেও আশার সঞ্চার হচ্ছে। উভয়েই ‘নির্বাচনে জয়ে’র আশাবাদ নিয়েই নির্বাচনের মাঠে ঘর গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবাই নেমে পড়েছেন নির্বাচনী প্রচারে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের এলাকায় ভোটাররা সহজেই আঁচ করতে পারছেন, নির্বাচন হবেই। উভয় জোটেরই জোর নির্বাচনী প্রস্তুতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ‘গৃহবিবাদ বা কোন্দল’ থাকলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বলতে গেলে গোটা দেশেই নির্বাচনের আবহ তৈরি করেছে। তবুও কোথাও যেন বিঁধে আছে দ্বন্দ্বের কাঁটা।

বিরোধী শিবিরের মতে এই কাঁটা ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার’, আর সরকারী দলের মতে ‘সাংবিধানিক অন্তবর্তী সরকার।’ কী হবে শেষ পর্যন্ত? যথাসময়ে নির্বাচন হবে কি না, এ নিয়ে সংশয় না কাটলেও সরকার ও বিরোধী দল দু’পক্ষই দৃঢ় আশাবাদীÑ শেষ মুহূর্তের সমঝোতায় কেটে যাবে সব সংশয়। সব দলের অংশগ্রহণেই হবে আগামী নির্বাচন। জানা গেছে, তৃতীয় পক্ষের দূতিয়ালি বা হস্তক্ষেপে নয়, দু’পক্ষই চাইছে নিজেদের সঙ্কট নিজেরাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে।

প্রথম থেকেই অনির্বাচিত কোন সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যেতে কঠোর অবস্থানে শাসক দল আওয়ামী লীগ। এ অবস্থানে অনড় থেকেই সংবিধানের আওতায় বিকল্প কোন ফর্মুলা বিরোধী পক্ষের কাছ থেকে আসলে সে ব্যাপারে ছাড় দেয়ার কথা কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারক নেতারা। সর্বশেষ খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ‘সংলাপের’ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সংবিধান থেকে ‘এক চুলও’ নড়বেন না তিনি। তবে সংবিধানের মধ্যে থাকা একাধিক ফর্মুলা নিয়ে আলোচনার দরজা সবসময় খোলা রেখেছেন তিনি। বিরোধী দলকে আসন্ন সংসদে প্রস্তাব উত্থাপনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। পরিষ্কারভাবে সরকারী দলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সংবিধানের আওতার মধ্যে বিরোধী দল কোন বিকল্প প্রস্তাব দিলে অবশ্যই তা নিয়ে তারা আলোচনায় বসতে রাজি।
সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শাসক দলের নীতিনির্ধারক নেতারা শতভাগ নিশ্চিত বর্তমান সংবিধানের আওতায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। তবুও জনগণ যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ফর্মুলা খুঁজছে সরকার। সংবিধানের আওতায় থেকেই বিকল্প একাধিক ফর্মুলা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসলেই সৃষ্ট সব সঙ্কটের সমাধান হবে, এমনটাই মনে করছে শাসক পক্ষ।

দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক নেতা আভাস দিয়েছেন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার যে বিতর্ক চলছে, এর সমাধানের পথ বের করতে তত্ত্বাবধায়কের বিকল্প গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকারের নানা ফর্মুলা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ও দূতিয়ালির মাধ্যমে আলোচনা চলছে। খুব শীঘ্রই খুলতে যাচ্ছে সেই সমঝোতার দুয়ার, নাটকীয়ভাবে ঘটতে পারে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান।

দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনা বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার বলেন, আমরা বিভাজনের দেয়াল উঠাতে চাই না। সমঝোতার সেতু তৈরি করতে চাই। সরকার কখনও বলেনি আলোচনায় বসবে না। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতা করতে চাই। কিন্তু দেয়ালটা বিএনপিই তুলেছে ১৫ আগস্ট বানোয়াট জন্মদিন পালন করে।

আরেক সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও মঙ্গলবার জনকণ্ঠকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার কোন সুযোগ নেই। সংবিধানের আওতায় অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে তারা যদি কোন আলোচনা করতে চায় তবে তা হতে হবে জাতীয় সংসদেই। আর এটিই আলোচনার শেষ সুযোগ। সংসদের বাইরে আলোচনার পরিবেশ খালেদা জিয়াই আল্টিমেটাম, সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ও ১৫ আগস্ট মিথ্যা জন্মদিন পালন করে নষ্ট করে দিয়েছেন। খালেদা জিয়া আন্দোলনের ট্রেন অনেক আগেই মিস করেছেন, আশা করি নির্বাচনের ট্রেনটি তিনি মিস করবেন না।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ঈদের পর কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দাবি আদায়ের হুমকি-ধমকি দিলেও ভেতরে ভেতরে তারাও নির্বাচনে যাওয়ার পথ খুঁজছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুখে আন্দোলনের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে পূর্ণ নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে দলটিতে। দলটির হাইকমান্ড থেকে নীতিনির্ধারক পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সকল নেতাই নিশ্চিত, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনভাবেই মানবে না শাসক দলটি। আর বিএনপির শীর্ষ অধিকাংশ নেতাও চান না অনির্বাচিত কেউ ক্ষমতায় এসে আবারও ‘ওয়ান ইলেভেনের’ মতো কোন পরিবেশ সৃষ্টি করুক।

আর দলটির হাইকমান্ডের কাছে এ তথ্যও আছে, বিএনপির প্রায় সব পর্যায়ের নেতাই নির্বাচনে মাঠে নেমে পড়েছে। তাঁরা নিশ্চিত, নির্বাচনে গেলেই বিজয় অবশ্যম্ভাবী। আর মাঠে নেমে পড়া নেতাদের আর কোনভাবেই নির্বাচনের মাঠ থেকে ফেরত আনা যাবে না। শেষ পর্যন্ত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দাবিতে নির্বাচন বয়কটের হুমকি দিলেও অনেক নেতাই যে তা মানবেন না, প্রয়োজনে দল ভেঙ্গে বড় একটি নির্বাচনী জোট গড়ে তুলবেন এমন শঙ্কাও স্পষ্ট বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে।

এ কারণে বড় ধরনের কোন ঝুঁকি না নিয়ে সরকারকে চাপে রেখে সংবিধানের আওতায় বিকল্প গ্রহণযোগ্য কোন ফর্মুলার ভিত্তিতে সৃষ্ট সঙ্কট সমাধানে আগ্রহী বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রদত্ত ‘সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার’ ফর্মুলাকে সামনে রেখেই সমাধানের পথ খুঁজছে তারা। সেক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবর্তে অন্য কোন গ্রহণযোগ্য কাউকে আনার বিকল্প প্রস্তাব নিয়েই দূতিয়ালির মাধ্যমে সংলাপে বসার ব্যাপারে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ইচ্ছার কথাও ইতোমধ্যে জানতে পেরেছেন জাতিসংঘসহ বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিক মহল। এই ফর্মুলা নিয়েই এখন বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য পর্দার অন্তরালে আলাপ-আলোচনা চলছে বলেই একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

দু’পক্ষই যে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কটের সমাধান চাইছে- তা মঙ্গলবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক কারণে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ইস্যুটি থাকলেও তিনি বলেছেন, কোন বায়বীয় প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হবে না। সংলাপ চাইলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। যে কোন জায়গায় আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় রাজি। তবে সেই আলোচনা হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে। তবে তাৎক্ষণিক আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমসহ শাসক দলের একাধিক সিনিয়র নেতা ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নিয়ে কোন ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।