বাংলাদেশের রাজনীতির তিন দৃশ্যকল্প ।। আলী রীয়াজ
এইদেশ সংগ্রহ, মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০১৩


১.

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হবে; তাঁর ভাষায়, “জনগণের ভোট নিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছি। যা হবে সংবিধান মোতাবেক হবে। একচুলও নড়া হবে না, ব্যাস”। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র পক্ষে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে তাঁরা এই সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে যাবেননা। খলেদা জিয়া আরো কঠিন ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন, “বাতাসে গেলেই চুল উড়ে যাবে। জনগণের আন্দোলনের বাতাসে চুল তো থাকবেই না, সব এলোমেলো হয়ে যাবে। দিশেহারা হয়ে যাবেন”। ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান সাবেক সেনাশাসক এইচ এম এরশাদ বলেছেন, বিএনপি না গেলে আগামী সংসদ নির্বাচনে তার দলও অংশ নেবে না। বিএনপি’র শরিক জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি কেননা তাঁরা এখন কার্যত অস্তিত্বের লড়াইয়ে ব্যাপৃত এবং আদালতের রায় অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে তাঁদের নিবন্ধন না থাকারই আশংকা বেশি। তবে অনুমান করতে পারি যে বিএনপি’র সিদ্ধান্তের বাইরে দলটি নির্বাচনে যাবেনা, এমনকি সুযোগ থাকলেও। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি সবসময় বলে আসছি নির্বাচন হবে না। ক্ষমতা ছাড়ার সম্ভাবনা আছে এমন কোন নির্বাচন আওয়ামী লীগ করবে না’।

গত কয়েক দিনের এ সব উক্তি একার্থে নতুন কিছু নয়, পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ হবার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী বলে এসেছেন যে তাঁর দল এ নিয়ে কোনো রকম আপসের পথে পা বাড়াবেনা। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকারের নাম ‘তত্বাবধায়ক’ হবে না ‘অন্তর্বর্তী’ হবে সে ব্যাপারে আপসের কথা বললেও সরকারের চরিত্রের মর্মবস্তর দিক থেকে কোনো আপসেই রাজি নন। কিন্ত তারপরেও এই কথাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে এমন সময়ে যখন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা খুব ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয়না।

এই সব বক্তব্যে আমরা তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বা দৃশ্যকল্প (সিনারিও) দেখতে পাই। প্রধানমন্ত্রী যখন নির্বাচনের সময়কার সরকার নিয়ে কথা বলেন তখন তিনি নিঃসন্দেহে সবার অংশগ্রহণের নির্বাচনের কথাই বলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি। এটা একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, একটি সিনারিও বা দৃশ্যকল্প । বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি যখন নির্বাচনে না যাবার কথা বলে তখন দ্বিতীয় সম্ভাব্য দৃশ্যকল্প তৈরি হয়ঃ তাঁদের বাদ দিয়ে নির্বাচন। বিএনপি’র দাবি তত্ত্বা্বধায়ক সরকার না হলে দল নির্বাচনে যাবেনা। তৃতীয় দৃশ্যকল্পের কথা বলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, তিনি সম্ভবত অনেকের মনের আশঙ্কাকেই তুলে ধরেছেন – নির্বাচন না হওয়া। রাজনীতিতে সুস্পষ্টভাবে কোন দলের প্রতি পক্ষপাত না থাকলে যে কোনো নাগরিকের মনেই প্রশ্ন উঠবে যে এই তিন দৃশ্যকল্পের কোনটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেবে।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে যে, এই তিন দৃশ্যকল্পের কোনোটাই নেহাত কল্পনা নয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের ইতিহাসে সকল দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনের উদাহরণ যেমন আছে তেমনি আছে কার্যত এককভাবে, বিরোধী দল তৈরি করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। বিরোধীদের একাংশকে সাথে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও সংসদ গঠিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালের আন্দোলনের পর আশা করা হয়েছিল যে তাঁর অবসান হবে। তা যে হয় নি সেটাও আমরা বিস্মৃত হতে পারিনা। চারটি নির্বাচন সকলের অংশগ্রহনের মাধ্যমে হয়েছে। এর দুটো হয়েছে সময়মত; বাকী দুটোকে সময় মত বলা যাবে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এককভাবে সরকারী দলের নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হয় নি, শেষ পর্যন্ত তা হয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে। মাঝের দু’বছরে অনেক ঘটনাই ঘটেছে; নির্বাচন যে নির্ধারিত সময়ে হয় নি সে কথা সবাই স্বীকার করবেন। ফলে এই তিন দৃশ্যকল্পের যে কোন একটিকে একেবার সম্পূর্নভাবে বাতিল করে দেয়ার অবকাশ নেই।

এ সব নির্বাচনের অভিজ্ঞতা – ১৯৯১ সালের আগে ও পরে – একটা বিষয় আমাদেরকে অবশ্যই শিক্ষা দিয়েছে; তা হল সব দল অংশ না নিলে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি সংসদ তাঁর মেয়াদকাল পূর্ন করতে পারেনা; তার গ্রহণযোগ্যতাও থাকে না। এর পাশাপাশি এই পরিহাসের দিকটি তুলে না ধরলে অন্যায় হবে যে, আজকে যে তত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের টানাহ্যাঁচড়া তার সাংবিধানিক রূপ তৈরি হয়েছিল এমনি একটি সংসদের হাতে যা কেবল অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছিল তা নয় উপরন্ত এর মেয়াদও ছিল বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম।

কিন্ত আগের যে কোনো সময়ের সঙ্গে এখনকার অবস্থার তুলনা একার্থে খুব সাহায্য নাও করতে পারে। কেননা এখনকার পরিস্থিতি বড়জোর তুলনীয় ১৯৯৬ সালের গোড়ার দিকের সঙ্গে। সে সময়ও সংবিধানে এই ব্যবস্থা ছিল না যে নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্যে বিরোধীদের দাবি মানা যেতে পারে। কিন্ত তখন তত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র এক বারের এবং তা প্রীতিকরই ছিলো। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা, বিশেষত ক্ষমতাসীনরা, অনেক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। এর মধ্যে একটা অভিজ্ঞতা হল তত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অব্যবহিত পূর্বের ক্ষমতাসীন সরকার আর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেনা। শুধু তাই নয়, ২০০৭-২০০৮ সালের তত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা কমবেশি সব রাজনীতিবিদের জন্যেই অস্বস্তিকর। প্রধানমন্ত্রী সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে মোটেই কুন্ঠিত হন না। এমনকি ২১ জুন আওয়ামী লীগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় তিনি বিরোধী নেতার উদ্দেশে বলেনঃ ‘আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আসলে আপনাকেও আবার জেলে যেতে হবে, আমাকেও যেতে হবে’।

এই তিনটি দৃশ্যকল্পের বিবেচনার পাশাপাশি ভালো করে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই যে নির্বাচন পর্যন্ত যে সময় রয়েছে তাকে তিনটি সময় পরিসরে ভাগে ভাগ করা যায়। এই তিন ভাগের মধ্যে তিনটি প্রধান ঘটনা রয়েছে – একটি হল প্রচলতি সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করার দিন – ২৭ অক্টোবর ২০১৩; নির্বাচন – তা যে দিনই হোক না কেন, অবশ্য সংবিধানের এক ধারা অনুযায়ী নির্বাচন ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে হবে; এবং ২৪ জানুয়ারি ২০১৪, যে দিন সংসদের মেয়াদ পূর্ন হবে। এই তিনটি প্রধান ঘটনাকে সামনে রেখে আমরা দেখতে পাই যে এখন থেকে ২৭ অক্টোবর একটা সময় পরিসর যখন এই সরকার বহাল থাকবে এবং সংসদ সক্রিয় থাকবে; দ্বিতীয় সময় পরিসর হল ২৭ অক্টোবর থেকে নির্বাচন বা ২৪ জানুয়ারি ২০১৪, যে দিন সংসদ তাঁর মেয়াদ পূর্ন করবে। যদি নির্বাচন ২৪ জানুয়ারির আগে অনুষ্ঠিত হয় তা হলেও সংসদের মেয়াদের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যথা ঘটেনা। তৃতীয় সময় পরিসর হল নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতি বা ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ পরবর্তী পরিস্থিতি যখন এই সংসদ আর কার্যকর থাকবেনা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যে সংবিধান নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাবে। আমরা এই তারিখগুলোকে বিবেচনায় নিচ্ছি সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারার আলোকে যেখানে বলা হচ্ছে যে ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বুই দিনের মধ্যে সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে’।

যে তিনটি দৃশ্যকল্পের কথা আমি উল্লেখ করেছি তাঁর কোনোটিই এক দিনে ঘটবে না। তাঁর ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাবো যে তিনটি সময়ের কথা আমার বলেছি সেই সময়ে, ক্ষেত্রে বিশেষে পর্যায়ক্রমিকভাবে। অর্থাৎ এখন থেকে ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখলে আমরা হয়তো বুঝতে পারবো যে কোন দৃশ্যকল্প বাস্তবায়িত হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর যে কোনো একটি বাস্তবায়িত হওয়ার জন্যে কিছু ঘটনাকে পূর্বশর্ত বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও একথা সত্য যে একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার জন্ম দিতে পারে, ঘটনা পরম্পরায় অনেক সময় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ঃ কিন্ত ঘটনার পেছনে থাকে ক্রীড়নক। অর্থাৎ রাজনৈতিক এবং সামাজিক শক্তির ভূমিকাই ঘটনার জন্ম দেয় ও তা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এই তিনটি দৃশ্যকল্পের ক্ষেত্রেও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে কাদের ভূমিকা কখন প্রধান বা গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠছে। বিশেষ একটি সময়ে কোনো শক্তির বা রাজনৈতিক ক্রীড়নকের ভূমিকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবার অর্থ নয় যে সেই শক্তি পরবর্তী সময়কালেও অব্যাহতভাবে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে থাকবে। বরঞ্চ কোনো কোনো প্রধান শক্তির ব্যর্থতাই অন্য দৃশ্যকল্প তৈরির পথ সুগম করে। ফলে কোন দৃশ্যকল্পের দিকে বাংলাদেশের রাজনীতি এগুচ্ছে তা বোঝার জন্যে সময়ের পাশাপাশি আমাদের নজর রাখতে হবে এই শক্তিগুলোর ওপরে।

কোন সময়ে কোন ঘটনাধারার ওপরে আমাদের নজর রাখা দরকার, কোন ঘটনা কিসের ইঙ্গিত দেবে এবং কোন শক্তিগুলো কোন দৃশ্যকল্পে প্রধান হয়ে উঠবে বলে মনে হয়?

২.

আগামী দিনগুলিতে বাংলাদেশের রাজনীতির সব কার্যকলাপ নির্বাচনকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে। সংবিধানের সেই বাধ্যবাধকতাকে সামনে রেখে, আলোচনার আগের অংশে, আমরা তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যকল্পের কথা বলেছি। এই তিনটি দৃশ্যকল্প হলোঃ সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন, বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন, অথবা নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া। আগামী দিনগুলিকে আমরা তিনটি সময়-পরিসরে ভাগ করেছিঃ এখন থেকে ২৭ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত; ২৭ অক্টোবর ২০১৩ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত; এবং ২৪ জানুয়ারি বা নির্বাচন পরবর্তী। নির্বাচন বিষয়ক তিনটি দৃশ্যকল্প বা সিনারিগুলোর মধ্যে দেশ কোন পথে এগুচ্ছে সেটা এই সময়ের ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর রাখলে বোঝা যাবে বলে আমাদের ধারণা। প্রত্যেকটি সময় পরিসরে কিছু ঘটনা ঘটার পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক ক্রীড়নক গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠবে। আমরা আগেও বলেছি যে, বিশেষ একটি সময়ে কোনো শক্তির বা রাজনৈতিক ক্রীড়নকের ভূমিকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবার অর্থ নয় যে সেই শক্তি পরবর্তী সময়কালেও অব্যাহতভাবে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেমন দেখবো যে কিছু ক্রীড়নকের ভূমিকা গৌণ হয়ে যাচ্ছে তেমনি নতুন ক্রীড়নকের ভূমিকাও দেখা যাবে।

কোন সময়ে কোন ঘটনা কোন দৃশ্যকল্পের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দেবে সেটা পর্যায়ক্রমিকভাবে বিবেচনা করতে পারি।

প্রথম দৃশ্যকল্প : সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন

এখন থেকে ২৭ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত/ঘটনাঃ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা; সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন অথবা বিরোধী দলের আস্থা অর্জনে সংবিধানের নতুন ব্যাখ্যা; পারস্পরিক আক্রমনের ভাষায় পরিবর্তন; নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক প্রস্ততি এবং তৎপরতা; জনসমাবেশ; ভবিষ্যতে সরকার গঠনের পর যে সব কর্মসূচি নেয়া হবে তার ওপরে জোর দেয়া। ক্রীড়নকঃ মধ্যস্থতাকারী (দেশি/বিদেশি); ব্যবসায়ীদের সংগঠন; জাতীয় সংসদ; আওয়ামী লীগ; বিএনপি; জামায়াতে ইসলামী; জাতীয় পার্টি; বিভিন্ন দলের জোট; সিভিল সোসাইটি; গণমাধ্যম।

এই পর্যায়ের সবচেয়ে বড় বিষয় হল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধীদের এক ধরণের সমঝোতা প্রতিষ্ঠা, কমপক্ষে একটি সমঝোতার ক্ষেত্র প্রস্তত করা। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়িদের সংগঠনসহ অন্যান্যদের সক্রিয়তা লক্ষনীয় হতে পারে। সমঝোতার জন্যে দরকার কিছু সাংবিধানিক সংশোধনীর ব্যবস্থা করা। এই সমঝোতা ২৭ অক্টোবরের আগেই উপনীত হতে হবে কেননা তাঁর পরে নির্বাচন অনুষ্ঠান সরকারের ইচ্ছে-নিরপেক্ষ – নির্বাচনের ব্যবস্থা করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।

২৭ অক্টোবর ২০১৩– ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ অথবা নির্বাচন/ ঘটনাঃ অন্তর্বর্তী সরকার গঠন; নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা; নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা; প্রার্থী মনোনয়ন; দলীয় অভ্যন্তরীণ কলহ; নির্বাচনী তৎপরতা; বিদেশী পর্যবেক্ষদের উপস্থিতি; নির্বাচন-পুর্ব এবং নির্বাচনকালীন সহিংসতা; নির্বাচন অনুষ্ঠান। ক্রীড়নকঃ অন্তর্বর্তী সরকার; নির্বাচন কমিশন; গণমাধ্যম; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; আওয়ামী লীগ; বিএনপি; গণমাধ্যম; সিভিল সোসাইটি।

২৭ অক্টোবরের মধ্যে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে এই পর্যায়ের বিষয়গুলো কার্যত রুটিন বলে আমরা গণ্য করতে পারি। এই পর্যায়ের ঘটনা ও প্রধান ক্রীড়নক কারা তা অতীতের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা কমবেশি সবাই জানি। এই পর্যায়ে সরকার ও বিরোধীদের গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা হবে রাজনীতির প্রধান বিষয় এবং দলগুলো নিজেদের মনোনয়ন ও নির্বাচনী তৎপরতায় মনোনিবেশ করবে। বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি হবে অতীতের মতই। এই সময় পরিসরের চূড়ান্ত পর্যায় হবে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। প্রথম দৃশ্যকল্প যে বাস্তবায়িত হচ্ছে সে বিষয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ থাকবেনা যখন সব দল তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দেবে।

২৫ জানুয়ারি ২০১৪ অথবা নির্বাচন পরবর্তী/ ঘটনাঃ নতুন সরকার গঠন; নির্বাচন বিষয়ক স্থানীয় অভিযোগ; নির্বাচনের ফলাফল বিষয়ে পারস্পরিক অভিযোগ; নির্বাচন-উত্তর সহিংসতা। ক্রীড়নকঃ নির্বাচন কমিশন; গণমাধ্যম; রাষ্ট্রপতি; বিজয়ী দল (স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীরা); বিজিত দল (স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীরা); নতুন সরকার; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এই পর্যায়ে নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি হবে মুখ্য। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে মনোযোগ থাকার কারণে নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। নির্বাচনের ফলাফলের ওপরে নির্ভর করবে রাষ্ট্রপতি কতটা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করবেন।

দ্বিতীয় দৃশ্যকল্প : বিরোধী দল ব্যতিরকে নির্বাচন

এখন থেকে ২৭ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত/ ঘটনাঃ পারস্পরিক আক্রমনাত্মক ভাষা ব্যবহার; ক্রমবর্ধমাণ সহিংসতা; হরতাল; নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে পক্ষপাতিত্ব। ক্রীড়নকঃ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; আওয়ামী লীগ; বিএনপি; হেফাজতে ইসলামী; গণজাগরণ মঞ্চ; জামায়াতে ইসলামী; জাতীয় পার্টি; মধ্যস্থতাকারী (দেশী/বিদেশী); নির্বাচন কমিশন; ব্যবসায়ীদের সংগঠন

আমরা যদি দেখতে পাই যে মধ্যস্থতাকারীরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন, সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে এক ধরণের সমঝোতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাহলে আমরা অনুমান করতে পারবো যে হয় বিরোধীরা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অথবা বিরোধীদের দাবিকে উপেক্ষা করেই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্ততি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। যদি সংবিধানের কোনো রকম পরিবর্তন না হয় তবে সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারা বহাল থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনকে নতুন আচরণ বিধি তৈরি করতে হবে কেননা তখন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বহাল রেখেই তাঁদের নির্বাচন করতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের চেয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠতে দেখবো। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয় এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলো (যেমন হেফাজতে ইসলাম কিংবা গণজাগরণ মঞ্চ)-কে আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখতে পারি।

২৭ অক্টোবর ২০১৩– ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ অথবা নির্বাচন/ ঘটনাঃ সহিংসতার মাত্রায় নাটকীয় বৃদ্ধি; উপুর্যপুরি হরতাল; নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে পক্ষপাতিত্ব; নির্বাচনের প্রচার ও তার বিরোধিতা। ক্রীড়নকঃ সেনাবাহিনী; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; রাষ্ট্রপতি; স্পিকার; গণমাধ্যম; অন্তর্বর্তী সরকার; যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল; আওয়ামী লীগ; বিএনপি; হেফাজতে ইসলামী; গণজাগরণ মঞ্চ; জামায়াতে ইসলামী; জাতীয় পার্টি; জঙ্গী সংগঠন।

অব্যাহত সহিংসতা এবং সেনাবাহিনীর লক্ষযোগ্য ভূমিকাই কার্যত বলে দেবে যে দ্বিতীয় দৃশ্যকল্পের পথেই দেশের রাজনীতি অগ্রসর হয়েছে। যদিও গোড়াতে তা একেবারেই অপরিবর্তনীয় নয়, তথাপি এক পর্যায়ে এসে আমরা বলতে পারবো যে বিরোধীদের নির্বাচনে আসবার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে বা রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই পর্বের গোড়াতে রাষ্ট্রপতি এবং স্পীকারের ভূমিকা রাখবার অবকাশ তৈরি হবে বলে আমরা অনুমান করতে পারি, এবং সম্ভবত সে জন্যে কোনো কোনো মহল থেকে চাপও তৈরি হতে পারে। নিঃসন্দেহে এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমের ওপরে সবারই মনোযোগ থাকবে। কিন্ত যদি ক্ষমতাসীন দল এখন পর্যন্ত দেয়া বক্তব্যকে তাঁরা অনুসরণ করেন তবে সেই সরকারের কর্মকান্ড খুব বেশি দূর বিবেচ্য হবেনা। জাতীয় পার্টি এই সময়ে একটা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যান্য যে সব শক্তি ভূমিকা রাখতে পারে তাঁর মধ্যে নতুন উপাদান হিসেবে জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এই সময়ের শেষ পর্যায় হচ্ছে নির্বাচন। কিন্ত প্রধান বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে তার ফলাফল নিয়ে উৎসাহের কারণ থাকবে না।

২৫ জানুয়ারি ২০১৪ অথবা নির্বাচন পরবর্তী/ ঘটনাঃ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় অবনতি; সহিংসতার মাত্রা ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন ও নাটকীয় বৃদ্ধি; প্রত্যক্ষ সহিংস কার্যক্রম; ক্রীড়নকঃ রাষ্ট্রপতি; সেনাবাহিনী; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; জঙ্গী সংগঠন; গণমাধ্যম; নতুন সরকার।

বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনের সময় এবং পরে সহিংসতার কারণে দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাবনীয় অবনতির কারণ সৃষ্টি হবে। সে সময় রাষ্ট্রপতি এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা পালনের প্রয়োজন এবং তাগিদ দুই-ই সৃষ্টি হবে বলে আমরা অনুমান করতে পারি। জঙ্গী সংগঠনগুলো এই সু্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা যেতে পারে। নতুন সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী পদক্ষেপ নেবে সেটাও দেশ এবং দেশের বাইরে বিবেচিত হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এই দুই দৃশ্যকল্প – যাতে অভিন্ন বিষয় হচ্ছে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া – তার পথ ভিন্ন এবং আগামী দিনগুলিতেই আমরা তার ইঙ্গিত পেতে থাকবো। কিন্ত তৃতীয় যে দৃশ্যকল্প – নির্বাচন না হওয়া – তাঁর ইঙ্গিত আমরা কিভাবে পাবো? আর যদি শেষ পর্যন্ত যদি নির্বাচন না হয় তবে সাংবিধানিকভাবে দেশ শাসনের কী পথ খোলা থাকবে?

৩.

আগামী নির্বাচনের সময় দেশে কোন ধরণের সরকার থাকবে এই নিয়ে ২০১১ সালের মাঝামাঝি থেকে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধীদের মতপার্থক্যের কারণে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে তাঁর অবসান করার জন্যে এখন হাতে সময় আর বেশি বাকি নেই। ইতিমধ্যে অনেক বাক্য বিস্তার হয়েছে, অনেক হরতাল পালিত হয়েছে, অনেক প্রাণনাশ হয়েছে। কিন্ত আমরা ২০১১ সালের ২ জুলাই যেখানে ছিলাম তাঁর থেকে এক কদম আগে বা পিছে যাই নি। আগামীতে কী হবে সে বিষয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য ধার করে বলতে পারি ‘একচুলও’ নড়েন নি কেউ – না সরকার, না বিরোধী দল। এই পটভূমিকায় রাজনীতিবিদদের বক্তব্য থেকে যে তিনটি সম্ভাব্য পথ বা অবস্থা আমরা দেখতে পাই তার একটি হল নির্বাচন না হওয়া। এ ছাড়া রয়েছে সকলের অংশ গ্রহণে নির্বাচন অথবা বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন, এই দুই সম্ভাব্য সিনারিও বা দৃশ্যকল্প নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। কিন্ত দেশ তৃতীয় পথেই এগুচ্ছে কিনা সেটা আমার কোন ঘটনা দিয়ে অনুমান করতে পারবো? আমরা আগামী দিনগুলিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছিঃ এখন থেকে ২৭ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত; ২৭ অক্টোবর ২০১৩ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ অথবা নির্বাচন পর্যন্ত এবং ২৫ জানুয়ারি ২০১৪ পরবর্তী সময়। আজকের আলোচনা তৃতীয় দৃশ্যকল্প – নির্বাচন না হওয়া বিষয়ে। সেই আশংকা যে একেবারেই অমূলক তা নয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ১৬ জুনে সংসদে দেয়া এক বক্তৃতায় বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন যে “আর কোনো অসাংবিধানিক কাউকে [সরকার] আনার চেষ্টা করবেন না। তাতে কারো লাভ হবে না, নির্বাচনই হবে না”।

দেশের রাজনীতি তৃতীয় দৃশ্যকল্পের দিকেই এগুচ্ছে কিনা সেটা ২৭ অক্টোবর ২০১৩ পর্যন্ত ঘটনা প্রবাহে বোঝার অবকাশ সীমিত । তবে এটা বলা যায় যে প্রথম দৃশ্যকল্পের উপাদান যে সব পদক্ষেপ সেগুলো নেয়া হলে তৃতীয় দৃশ্যকল্পের আশংকা থাকবেনা। অর্থাৎ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের জন্যে দরকারি পদক্ষেপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে নির্বাচন না হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। এমনকি যদি শেষ মুহূর্তে বিরোধীরা কোনো অজুহাতে নির্বাচন থেকে সরেও দাঁড়ায় তবুও নির্বাচন গ্রহণযোগ্য বলেই বিবেচিত হবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় দৃশ্যকল্পের দিকে অগ্রসরমান হলে এক পর্যায়ে তা তৃতীয় দৃশ্যকল্পে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা নির্বাচন না হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কিনা সেটা আমরা বুঝতে পারবো ২৭ অক্টোবরের পর।

২৭ অক্টোবর ২০১৩– ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ / ঘটনাঃ মধ্যস্থতাকারী (দেশী/বিদেশী) এবং ব্যবসায়ীদের সংগঠনের প্রচেষ্টার অবসান; এই ধরণের প্রচেষ্টাকে সরকার এবং বিরোধীদের প্রত্যাখান; সহিংসতার মাত্রা ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন ও নাটকীয় বৃদ্ধি; উপুর্যপুরি হরতাল; নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতার অবসান; নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারীদের নির্বাচনী প্রচারে অনুৎসাহিতা। ক্রীড়নকঃ রাষ্ট্রপতি; সেনাবাহিনী; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; আওয়ামী লীগ; বিএনপি; হেফাজতে ইসলামী; গণজাগরণ মঞ্চ; জামায়াতে ইসলামী; জাতীয় পার্টি; জঙ্গী সংগঠন।

সাতাশে অক্টোবরের পর যদি মধ্যস্থতাকারীরা, দেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো এবং সিভিল সোসাইটির সদস্যরা তাঁদের সমঝোতা প্রচেষ্টার অবসানের ইঙ্গিত দেন তা হলে বুঝতে হবে যে সমাধানের দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সহিংসতার মাত্রা বাড়ার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি – সেটা যেমন নির্বাচন বর্জনকারীদের পক্ষ থেকে হতে পারে তেমনি তা নির্বাচন বহির্ভূত শক্তির পক্ষ থেকেও হতে পারে। সরকার এই ধরণের অবস্থা মোকাবেলায় যতই কঠোর হবেন বা হতে বাধ্য হবেন ততই পরিস্থিতির অবনতি হবার আশংকা বৃদ্ধি পাবে। সহিংসতার কারণ যে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোই হতে হবে তা নয়; যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট বিষয় কারণ হিসেবে কাজ করলেও বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই।

এই অবস্থায় আমরা প্রধান ক্রীড়নক হিসেবে রাষ্ট্রপতি এবং সেনাবাহিনীকে দেখবো বলেই অনুমান করা যেতে পারে। প্রস্ততির দিক থেকে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তার আবেদন ও কার্যকারিতা জনমনে কতটা আস্থার সৃষ্টি করবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

২৫ জানুয়ারি ২০১৪ পরবর্তী/ ঘটনাঃ ২৪ এপ্রিল ২০১৪ পর্যন্ত সাংবিধানিক সরকার; ইতিমধ্যে নির্বাচন না হলে পরবর্তীতেঅসাংবিধানিক অনির্বাচিত রাজনৈতিক প্রশাসন। ক্রীড়নকঃ রাষ্ট্রপতি; সেনাবাহিনী; আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী; বিদেশী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ; জাতিসংঘ।

যে কোন কারণে নির্বাচন না হলে সাংবিধানিকভাবে দেশ পরিচালনার কী কী ব্যবস্থা রয়েছে? সংবিধানের ১২৩ (৩) ধারা যেমন সংসদের মেয়াদ শেষ হবার আগের নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখেছে, তেমনি এও বলা হয়েছে যে যদি সংসদ তার মেয়াদ পূর্ন করার আগে ভেঙ্গে যায় তবে নির্বাচন হতে হবে পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; সংবিধানের ভাষায় - ‘মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে’। তা হলে যদি ঘটনাচক্রে মেয়াদ শেষ হবার এক দিন আগেও সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয় তবে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতার অবসান হবে। কি অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংসদ ভাঙ্গতে পারেন সেটা অন্য প্রসঙ্গ, ২৪ জানুয়ারির অব্যবহিত পূর্বে এমন ব্যবস্থা নিলে তা সংবিধানের বরখেলাফ হবে কিনা তা আদালতেই হয়তো নির্ধারিত হবে। আমরা আপাতত সেই রকম বিবেচনা বাদ রাখতে পারি এই বলে যে, আমরা আশা করি ক্ষমতাসীনরা ১২৩ (৩) ধারার উপচ্ছেদ ‘ক’ বাদ দিয়ে ‘খ’ উপচ্ছেদের শরণাপন্ন হবেন না।

সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলেও ২৪ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। তবে মন্ত্রীসভার মেয়াদ শেষ হবেনা, প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী নব্বই দিন, অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন। মিজানুর রহমান খান লিখেছেন, ‘২৪ জানুয়ারি সংসদ বিলুপ্ত হলেও বর্তমান মন্ত্রিসভা নির্বাচন না দিয়ে সর্বোচ্চ ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে। সংসদ ভেঙে গেলে কেবল যুদ্ধের কারণ ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে তাকে জীবিত করা যাবে না। বিলুপ্ত সংসদের যেকোনো সংখ্যক সদস্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি চাইলে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করতে পারবেন’। ফলে রাষ্ট্রপতির হাতে একটা বিকল্প থাকছে যা দিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠনের। এটাও উল্লেখ করা দরকার যে সে রকম অবস্থায় যে নির্বাচন হবে তা হবে এখনকার সংবিধানের আওতায়, কেননা সংবিধান সংশোধনের ইচ্ছে থাকলেও তার কোন ব্যবস্থা আর বহাল থাকবেনা।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী ২৫ অক্টোবরের পর সংবিধান আর বসবেনা, ৭ জুন সংসদে তিনি এমন ঘোষনাই দিয়েছেন। চুলচেরা সাংবিধানিক হিসেবে তারিখটা ২৭ অক্টোবর। কিন্ত এক/দুই দিনের হেরফের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সংবিধানে প্রতি ষাট দিনে সংসদের অধিবেশন ডাকার যে বাধ্যবাধকতা তা এই সময়ে রহিত করা হয়েছে। কিন্ত রাষ্ট্রপতি চাইলে সংসদ অধিবেশন ডাকতে পারবেন না এমন বিধান নেই। সংসদ তখনো কার্যকরী প্রতিষ্ঠান, সদস্যরা তখনো সংসদ সদস্য। ফলে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন না করে সমঝোতার দরজা খুলে রাখা যেতে পারে; সেটা দেশের স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্রের জন্যে কতটা ইতিবাচক সে প্রশ্ন ভিন্ন। তবে সেই দরজা আর ২৫ জানুয়ারিতে খোলা থাকবেনা। তারপরের নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন আবারও বাধ্যতামূলক। তাতে বিরোধীরা অংশ নেবেন এমন মনে করার কোনো কারন দেখিনা। ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর চতুর্থ সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার পর এই রকম বাধ্যবাধকতার মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল; নির্বাচন কমিশনের কাগজেপত্রে ৪২টি দল অংশ নিয়েছিলো বলে যতই হিসাব থাকুক প্রধান বিরোধী দল সমেত প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলো তাতে অংশ নেয়নি আমাদের তা ভোলার সুযোগ নেই।

নির্বাচন না হওয়ার যে দৃশ্যকল্প তাতে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন না করে সংবিধান মেনে নব্বই দিন কাটাবার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্ত সেই সময়ের পর রাষ্ট্রপতিকে বড় ধরণের ভূমিকা নিতে হবে এবং সম্ভবত সেনাবাহিনীকেও আইন-শৃঙ্খলার জন্যে দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে। সেটা রাজনৈতিক রূপ নেবে কিনা সেটা নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপরে এবং সরকার ও বিরোধীদের মনোভাবের ওপরে। তবে এই ধরণের পরিস্থিতিতে দেশের বাইরের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং জাতিসংঘের ভূমিকা রাখার অবকাশ তৈরি হবে এবং সরকারের ওপরে চাপ বাড়বে।

উপসংহার

যে কোন সময়েই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যত নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব, অস্থির সময়ে তা আরো দুরূহ। দেশের সামনের দিনগুলি নিয়ে যে সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যকল্পের কথা এখানে আলোচিত হয়েছে তার সব ঘটনা ঠিক এই ভাবেই ঘটবে তা মনে করার কারণ নেই, সেটা বলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। মোটাদাগে এগুলোর বৈশিষ্টগুলো তুলে ধরার চেষ্টাই মুখ্য। অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচিত হয় নি, বিবেচিত হয়নি অভাবনীয় কোনো ঘটনার বিষয়ও। কিন্ত আগামী দিনগুলির রাজনীতির যে সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যকল্প বা পথের আলোচনা করলাম তাতে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাংবিধানিক সংকটে রূপ নিতে চলেছে; আর তা মোকাবেলার পথ হচ্ছে অবিলম্বে আলোচনার দরজা খুলে দেয়া। ২৭ অক্টোবরের আগেই পথ খুঁজে বের করতে হবে। গত দু বছরে এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। দেশের রাজনীতিবিদরা তাতে কর্ণপাত করেন নি; আগামীতে করবেন এমন আশাবাদী হবার সুযোগ দেখিনা। কিন্ত এই তিন দৃশ্যকল্পে এটা স্পষ্ট যে সকলের অংশগ্রহণের বাইরে নির্বাচনের পথে এগুলে দেশে সহিংসতার মাত্রাই যে বাড়বে তা নয়, প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। ক্ষমতাসীন দলকে বুঝতে হবে সাংবিধানিক পথে সমাধান করতে চাইলে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নকে আলোচনার বাইরে রাখা যাবেনা। অন্যপক্ষে বিরোধীদের বুঝতে হবে যে সমঝোতার জন্যে ছাড় দিতে রাজি না হলে সংবিধানের বাইরের সমাধানই শেষ অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।

প্রথম আলোতে ৩ কিস্তিতে প্রকাশিত।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।