রাজনৈতিক ইসলাম ।। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
এইদেশ উপস্থাপনা, শুক্রবার, আগস্ট ১৬, ২০১৩


রক্তাক্ত মিশর পরিস্থিতি নিশ্চয় আরো একবার নানা দেশে আলোচিত হতে থাকবে এই বলে যে, “রাজনৈতিক ইসলাম কি বিতর্কিত’? মিশরের ঘটনাতো আছেই, এর বাইরে সিরিয়ার পরিস্তিতিও বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের নানাভাবেই প্রতিদিনের মনোবেদনার কারণ। পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই মৌলবাদি, জঙ্গি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি দেশটিকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। বাংলাদেশেও চেষ্টা আছে এই একই গোষ্ঠীর ক্ষমতার কুরসি দখলে নেবার।
মিশর আর সিরিয়ার ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্বে আনেকেই বলছে, রাজনৈতিক ইসলামের দিন হয়তে শেষ। তবে কি ইসলাম গণতন্ত্রের বিপরীতে চলে?

বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সম্প্রতি Le Figaro নামের একটি ফরাসী পত্রিকায় বলেছেন, এই প্রথমবারের মতো মধ্য প্রাচ্যের রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু হয়েছে। মোহাম্মদ মুরসী কেন ক্ষমচ্যুত হলেন এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো, “মুসলিম ব্রাদারহুড সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের চেয়ে বেশি নজর দিয়েছিলেন ধর্মের দিকে। আর তার সরকারে ছিল চরম স্বজনপ্রীতি”।
মিশরের মুরসী গণতান্ত্রিক পথেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সরে যেতে হলো এক বিপ্লবের মাধ্যমে, যা আসলে ছিল সামরিক অভ্যূত্থান। কারণগুলো যা বের হয়ে এসেছে এ পর্যন্ত সেসব হলো: রাষ্ট্রপরিচালনা চরম অদক্ষতা, জনগণের প্রত্যাশার সাথে প্রতারণা এবং স্বজনপ্রীতি। জনগণ কতৃক নির্বাচিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার যা খুশী তাই করার অধিকার আছে।

এখানে ইসলাম ও গণতন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা অবধারিতভাবেই আসে। মুসলমানদের একটি বড় অংশই যেকোন ধরনের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাদের বক্তব্য হলো ধর্মের ভেতরেই সব নির্দেশনা আছে। প্রয়োজন হলো বিশ্বাস। আবার একটি অংশ মনে করে ইসলামের সাথে গণতন্ত্রের বিরোধ নেই। গণতান্ত্রিক পথে চলেও ইসলাম কায়েম করা যায়।
গণতন্ত্রও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি নেই। যেমন যুক্তরাজ্য, সেখানে আছে রাজতন্ত্র। আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্শিয়াল সিস্টেম। গণতন্ত্র এমন ব্যবস্থা নয়, যা রাতারাতি পূর্ণতা পায়। গণতন্ত্রের আসল রূপ হলো মানুষের চাওয়াকে মূল্য দেয়া।

রাজনীতি আর ধর্মের মধ্যে গণতন্ত্রকে তার স্থান ভাববার সময় এসেছে। এই চ্যালেঞ্জ যেমন ইসলামের জন্য, তেমনি অন্য ধর্মের জন্যও। বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে সহজেই আনুমেয় যে, শান্তির স্বার্থে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদাই রাখতে হবে। রাজনৈতিক আচার আচরণে ধর্মকে টেনে আনলে যে সংঘাতময় পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়, তা প্রকারান্তরে ফ্যাসিবাদকেই টেনে আনে। ফরাসী লেখক এরিক জেমর ধর্ম আর গণতন্ত্রের মিলনকে বলেছেন “The impossible wedding’।

কিন্তু গণতন্ত্রকে তথা রাজনীতিকে ধর্ম থেকে আলাদা করা খুব সহজ কাজ নয়। বিষয়টি খুবই চ্যালেঞ্জিং। রাষ্ট্রপরিচলনায় উদার গণতান্ত্রিক মানসিকতার যারা ক্ষমতায় বসেন, তাদের উচিত এমনভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করা যেন, সামান্য ফাঁকফোকর দিয়েও ধর্ম ব্যবসায়ীরা ঢুকে না পড়ে। আর এজন্য তাদের নজর দিতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ের দিকেই। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি থেকে দূরে থেকে যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায়, একই সাথে জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলেই কেবল সম্ভব ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। দিন শেষে সাধারন মানুষের চাহিদা নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন আর সেই সাথে স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও বিচার, নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্র।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সাংবাদিক, পরিচালক, বার্তাবিভাগ, একাত্তর টিভি