তবুও অধিকার মানবাধিকার সংস্থা ! ।। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
এইদেশ উপস্থাপনা, বুধবার, আগস্ট ১৪, ২০১৩


সাংবাদিকতার শিক্ষা – যে রিপোর্ট-এ সূত্রের নাম নেই, তার চেয়ে দূর্বল রিপোর্ট আর নেই, এতে যতই চাঞ্চল্যকর তথ্য থাকুক না কেন। সাংবাদিকরা সূত্র ছাড়া রিপোর্ট করলে, তা বস্তুনিষ্ঠ হয়না। মানবাধিকার নিয়ে এনজিও ব্যবসা করলে যেনতেনভাবে রিপোর্ট করা যায়, তার জন্য বিদেশী আনুদান পাওয়া যায়। কোন জববাদিহিতা লাগেনা। সেই মানুষকে ধরলে সমাজের সুশীলরা সব এক হয়ে যায়, বিদেশী কূটনীতিকরা এদেশের আদালতে ছুটে যেতে পারে। সত্যি বিচিত্র এই দেশ!!

মতিঝিলে, হেফাজতবিরোধী অভিযান নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে গ্রেপ্তার হন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্র। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ ও মানবিধার লঙ্ঘন- শিরোনামের অধিকারের সেই প্রতিবেদনে কি ছিলো?

সরকার বাহাদুরকে বাহবা দিতে হয় তার কর্মের জন্য। আমি এই রিপোর্টটি বিশ্লষণ করতে গিয়ে, অধিকারের কর্মকান্ড পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, সরকারের প্রচারযন্ত্র একটু সচেষ্ট হলে, আদিলুর রহমান খান শুভ্র নামক সাবেক জাসদীয়, বর্তমানে জামাতীয়কে, গ্রেপ্তার না করে তার রিপোর্টটার আসারতা জনসম্মূখে তুলে ধরলে জনগণ বুঝতে পারত কতটা অনৈতিক পন্থায়, কতটা অশুভ পথে মানবাধিকার নামের এনজিও ব্যবসা করেন শুভ্র।

অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ঢাকায় আসার পথে হেফাজত কর্মীদের উপর আইন শৃংখলা বাহিনী হামলা চালিয়েছে এবং তাদের সাথে ছিল সরকার সমর্থিতরা। অধিকার বলেছে, গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে পুলিশের সহায়তায় সরকার ও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের সশস্ত্র হামলায় কয়েক'শ হেফাজত কর্মী আহত এবং ৩ জন নিহত হয়েছে। প্রতিবেদনে এই তথ্যের কোন উৎস উল্লেখ করেনি অধিকার। তবে কি আদিলুর রহমান খান নিজে দাড়িয়ে থেকে সব দেখেছেন?

এখানে আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রতিরোধকে হামলা বললেও হেফাজত কর্মীদের নাশকতা এবং তথ্যের উৎস সম্পর্কে কিছুই বলা হয়না। একটি বাক্য নেই অসংখ্য গাড়ী পোড়ানো, ব্যাংক-এ হামলা, কোরআন পোড়ানো, ফুটপাথের দোকান পুড়িয়ে দেয়া, বই এর দোকান জ্বালিয়ে দেয়া, স্বর্নের দোকান লুট করা, গাছ উপড়ে ফেলা সম্পর্কে।

অধিকার বলছে, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পুলিশ হেফাজত কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিতে সাতজন হেফাজত কর্মী মারা যায়। এই তথ্যের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে। একটি মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট, যা ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে, নানা আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সরকার প্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে, সেই রিপোর্ট বলছে “একজন প্রত্যক্ষদর্শী”? তাও নাম না জানা? এই তথ্য উৎসের নির্ভরযোগ্যতা ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে কী?

রাতে আইন-শৃংখলা বাহিনী তৎপরতা শুরুর আগে মতিঝিল ছাড়তে হেফাজত কর্মীদের যে ঘোষণা দিয়েছিল, সেটা কোথাও উল্লেখ নেই। বরং বলা হচ্ছে, যৌথবাহিনী নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত হেফাজত কর্মীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এমনভাবে বর্ণনা দেবে হেফাজত, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু অধিকারতো একটি মানবাধিকার সংস্থা। তার ভাষাও এমন? বেশিরভাগ কথাতেই গুলি শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটি কোন ধরনের 'বুলেট' তা উল্লেখ নেই। প্রতিবেদনে, যৌথবাহিনীর দশ হাজার সদস্য অংশ নিয়েছে বলা হয়েছে। অথচ দেশের প্রায় সব গণমাধ্যম বলেছে এই সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বেশি উল্লেখ করলেও তথ্যের উৎস দেয়নি অধিকার।

পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, যেন কউ মারা না যায়, প্রতিবেদনে তাও উল্লেখ করা হয়নি। সমাবেশে অংশ নেয়া, এতিম মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী এখনো নিখোঁজ, প্রতিবেদনে বিষয়টি আনলেও বিস্তারিত কোন তালিকা নেই অধিকারের প্রতিবেদন। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভূক্তভোগীদের দেওয়া বর্ণনা উদ্ধৃত হলেও তাদের পরিচয় বা কোথায় তাদের সাথে অধিকার কথা বলেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো উল্লেখ নেই। এমনকি নাম গোপনকরা সাংবাদিক উল্লেখ করে তাকে প্রত্যক্ষদর্শী বলা হয়েছে!

আহত ও নিহতদের নামের তালিকা অংশে আহত ৬৯ জন এবং নিহত ১৬জন উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে আহতদের নাম ছাড়া অন্য তথ্য নেই, যা দিয়ে তাদের সনাক্ত করা যায়। এমনকি অধিকারের কাছে ঘটনার জবানবন্দি দেওয়া হাসপাতালে চিকিৎসক বা নার্সদের তথ্য উৎস হিসেবে ব্যবহার করলেও, তাদের নাম বা পরিচয় প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তাতে এই তথ্যের থাকে কি?
প্রতিবেদনে, ১৮৬২জন সহ আনুমানিক ১৩৩৫০০জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি নামে মামলা করা হয়েছে, উল্লেখ আছে। খেয়াল করুন বলা হচ্ছে ‘আনুমানিক’। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যদি হয়, তবে কি তা আনুমানিক হতে পারে?

অধিকার তার রিপোর্টে হেফাজতদের সমাবেশে হেফাজতেরই দাবি করা ২০২ জনের মৃত্যু এবং ২৫০০জন নিখোঁজের খবরকে উদ্ধৃত করে নিহত ৬১ জনের নাম সংগ্রহের কথা উল্লেখ করেছে। এই তথ্যেরও কোন উৎসের কথা বলেনি অধিকার। মাত্র তিনজন নিহতের নাম ও পরিচয় দিতে পরেছে এই এনজিওটি।

প্রতিবেদনে ব্যবহার করা ছবিগুলোতে 'বাংলার চোখ' নামে অনলাইনে ভিত্তিক একটি সংবাদ ও ফটো এজেন্সির বরাত দেওয়া হয়েছে। বাংলার চোখ বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় সংবাদ বা ফটো সংস্থা?

তথ্যানুসন্ধানের উদ্দেশ্য বা ব্যবহার করা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোন ধারণা দেয়নি 'অধিকার'। অথচ সুপ্রীম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত 'বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিটি'র ধারনা পরিষ্কার করা হয়নি। দেওয়া হয়নি কোন শব্দেরই সংজ্ঞা।

অধিকার কি ধরনের মানবাধিকার সংস্থা? হেফাজতের সমাবেশ নিয়ে তার অনেক মানবিক দরদ। তবে হেফাজতের কর্মীরা যে, নারী সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনকে আক্রমণ করলো, তার জন্য একটি বাক্য নেই প্রতিবেদনে। একটি বাক্য নেই শাপলা আভিযানের পরদিন ভোরে কাচপুরের মাদ্রাসার মাইক ব্যবহার করে, মানুষকে উত্তেজিত করে পুলিশ হত্যা করা সম্পর্কে।

এই অধিকার একটি কথাও কোনদিন বলেনি, ২০০১ এর নির্বাচেনর পর সারাদেশে যে, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয়েছে, তা নিয়ে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, শিশু, নারী ধর্ষন করা, হত্যা করা অধিকারের চোখে মানবাদিকার লংঘন নয়। অধিকার তেমনি চুপ, কিছুদিন আগেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর দেশব্যাপী যে চরম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশের সংখ্যালঘু মানুষেরা। পুলিশ বিরোধী কর্মীদের মারছে, অধিকার সোচ্চার। কিন্তু অধিকারের দৃষ্টিতে পুলিশ হয়তো মানুষ নয়। তাই দেশব্যাপী সংঘবদ্ধভাবে পুলিশের উপর আক্রমণ হলে, পুলিশ হত্যা হলে অধিকার কোন রিপোর্ট তৈরী করেনা।

এতো দূর্বল ভিত্তি, এতোটা এক চোখা, এতটা পক্ষপাতিত্ব, তবুও এই রিপোর্ট কতই না সমাদরের, তবুও আধিকার মানবাধিকার সংস্থা !!!!!

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সাংবাদিক, পরিচালক, বার্তাবিভাগ, একাত্তর টিভি