ভৌতিক বিলবোর্ড ।। প্রভাষ আমিন
এইদেশ উপস্থাপনা, শুক্রবার, আগস্ট ০৯, ২০১৩


কচ্ছপ আর খড়গোশের দৌড় প্রতিযোগিতার গল্পটি সবারই জানা। অতি আত্মবিশ্বাসি খড়গোশ মাঝপথে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এই ফাঁকে কচ্ছপ পৌছে যায় গন্তব্যে। ঘুম ভাঙার পর খরগোশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েও আর দেরিটা কাভার করতে পারেনি। অবিশ্বাস্য দৌড় প্রতিযোগিতায় জিতে যায় কচ্ছপ। গল্পটি মনে পড়লো আওয়ামী লীগের বিলবোর্ড প্রচারণার ধরন দেখে।

গত ১৫ জুন চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সন্ধ্যায় সম্ভাব্য ভরাডুবি আঁচ করতে পেরে ওবায়দুল কাদের তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন ‘ওয়েক আপ কল ফর রুলিং পার্টি’। কিন্তু সেই ওয়েক আপ কলে ঘুম ভাঙেনি আওয়ামী লীগ বা সরকারের। সেই নির্বাচন ও ওবায়দুল কাদেরের স্ট্যাটাসের পর ‘জেগে ঘুমালে কাউকে জাগানো যায় না’ শিরোণামে একটি লেখা লিখেছিলাম। ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় ‘ওয়েক আপ কলেও’ যে আওয়ামী লীগের ঘুম ভাঙেনি, তার প্রমাণ তাদের দ্বিতীয় দূর্গ গাজীপুরেও ভরাডুবি। পাঁচটি সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পরও আওয়ামী লীগের আত্মবিশ্বাসের কোনো ঘাটতি চোখে পড়েনি। বরং তারা বারবার বলছিলেন, স্থানীয় নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। নিজেদের সাফল্য বলার চেয়ে তারা বেশি ব্যস্ত ছিলেন খালেদা জিয়ার জন্ম ইতিহাস নিয়ে। হঠাৎ করেই যেন ঘুম ভাঙলো আওয়ামী লীগের। এক সকালে বদলে গেল ঢাকার দিগন্ত। রাজধানীর প্রায় সব বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডে মহাজোট সরকারের উন্নয়নের জোয়ার। ঢাকায় আপনি যেদিকেই তাকাবেন, চারদিকে শুধু মহাজোট সরকারের সাফল্য আর সাফল্য। খুবই ভালো উদ্যোগ। বিএনপিকে গালাগালি করার চেয়ে নিজেদের সাফল্য প্রচার। কিন্তু একটি ভালো উদ্যোগও যে কিভাবে ভাবমূর্তি ধ্বসিয়ে দিতে পারে তার একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে এই বিলবোর্ড প্রচারণা। হিতে বিপরীত বুঝি একেই বলে।

মহাজোট সরকার তাদের সাফল্য তুলে ধরছে, ধরতেই পারে, ধরাই উচিত। কিন্তু এই বিলবোর্ড প্রচারণা ঝড় তুলেছে রাজনীতিতে। আপত্তিটা হলো, মহাজোট সরকারের সাফল্য প্রচার করছে কে, কার বিলবোর্ডে? ঢাকার বেশিরভাগ বিলবোর্ডই সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন। তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা বিলবোর্ড ভাড়া নেন। পরে ব্যবসায়ীরা সেটা ভাড়া দেন বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। সপ্তাহ, মাস, বছর- এমন নানা হিসাবে বিলবোর্ড ভাড়া দেয়া হয়। সরকার বা আওয়ামী লীগ যদি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিলবোর্ডে নিজেদের সাফল্য প্রচার করতো তাহলে কারো কোনো আপত্তি থাকতো না। কিন্তু অভিযোগ হলো, বিলবোর্ড প্রচারণার কাজটি করা হয়েছে স্রেফ গায়ের জোরে, কোনোরকম আইন-কানুন, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে। কিন্তু সমস্যা হলো আপনি এই বেআইনী কাজের জন্য কাকে ধরবেন? ধরার কোনো সুযোগ নেই। কারণ কোনো বিজ্ঞাপনেই কারো নাম নেই। সাধারণত সরকার বা দলের শীর্ষ মহলের নজর কাড়ার জন্য অনেকেই বিভিন্ন ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুন-বিলবোর্ড বানান। আর তাতে মূল কথার চেয়ে কার ‘সৌজন্যে’ তা লেখা থাকে অনেক বড় হরফে। তবে এবারই ব্যতিক্রম। মহাজোট সরকারের সাফল্য প্রচারের মহতী উদ্যোগের দায়ও কেউ স্বীকার করছে না। কোনো ব্যক্তির নাম নেই, কোনো সংগঠনের নাম নেই, কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। যেন কোনো ভুত এসে একরাতে বদলে দিয়েছে ঢাকার দিগন্ত। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এটা সরকারের প্রচারণা, সরকারই করেছে। আর স্বয়ং তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, এর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে কে করলো? আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বিএনপির দুষ্টুরা সরকারের সাফল্য চোখে দেখে না। তাই যাতে তাদের চোখে পরে, সেজন্যই বড় করে সাফল্য প্রচার করা হয়েছে। তার ধারণা, শুভাকাঙ্খী জনগণের কেউ এই বিলবোর্ড লাগিয়েছে। কিন্তু নিজেদের পরিচয় গোপন করে সরকারের গুণগান প্রচারের মত এমন দাতা হাতেম তাই শুভাকাঙ্খী দেশে আছে বলে ধারণা ছিল না। বিলবোর্ডগুলো না হয় ভাড়া না দিয়ে জোর করে দখল করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো বানাতে এবং লাগাতে তো টাকা লেগেছে। অনুমান করি সেই অঙ্কটা কম নয়। ৫০ লাখ টাকার আশপাশে হবে। তো এই টাকাটা জোগালো কোন গৌরী সেন?

আওয়ামী লীগের ভুত শাখার কর্মীরা যেভাবে প্রচারণায় মাঠে নেমেছে তাতে ঈদ মাটি হয়ে গেছে বিলবোর্ড ব্যবসায়ীদের। কারণ প্রচারণা দৃশ্যমান না হলে তো বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের টাকা দেবেন না। ঈদের আগে এ যেন তাদের মাথায় বিলবোর্ড ভেঙে পড়ার সমান। ক্ষতিগ্রস্তরা কার কাছে যাবেন, কার কাছে বিচার চাইবেন? কমনসেন্স বলে তাদের উচিত সিটি করপোরেশনের কাছে গিয়ে প্রোটেকশন দাবি করা বা পুলিশের কাছে যাওয়া বা আদালতে যাওয়া। কিন্তু সব জায়গায় এখন ঈদের ছুটি। তাই প্রতিকার পাওয়ার আইনী সুযোগ নেই। বিলবোর্ড ব্যবসায়ী বা বিজ্ঞাপনদাতারা তো আর ভুতদের মত শক্তিশালী নয় যে ভৌতিক বিজ্ঞাপনগুলো তুলে ফেলবেন। প্রতিকার চাইতে চাইতে, পেতে পেতে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে; ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। একজন বিলবোর্ড ব্যবসায়ী বলেছেন, আমরা কার কাছে বিচার চাইবো? যার কাছে বিচার চাইবো বিলবোর্ডে তো তারই ছবি। তিনি নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর কথা বোঝাতে চেয়েছেন, বলতে চেয়েছেন সরকারের কথা। তাই তো বাংলাদেশে কার বুকের পাটা কত বড় যে বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার ছবি নামিয়ে ফেলবে। তাই প্রতিকার চাওয়ার বা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এখানে। দেশটাকে কেমন মগের মুল্লুক, মগের মুল্লুক লাগছে। সবাই দেখছে, জানছে; কিন্তু কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না, কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একজনের ভাড়া করা বিলবোর্ড আরেকজন দখল করে ফেলবে- এটা কিভাবে সম্ভব? যদি কেউ দায়িত্ব না নেয়, তাহলে সরকারের উচিত অবিলম্বে গায়ের জোরে লাগানো এসব বিলবোর্ড উচ্ছেদ করা। এটাই আইনের শাসনের কথা, সুশাসনের আকাঙ্খা। এসব বিলবোর্ডে আওয়ামী লীগের অনেক সাফল্য উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পুরোটাই ম্লান হয়ে যায়, আইনের শাসনহীনতায়। সুশাসনই যদি না থাকে তাহলে আর এত সাফল্য প্রচার করে লাভ কি। বিলবোর্ডে লাগানো কথাগুলো যদি সত্যিও হয় তাও যেন মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না। শুধু ভালো কাজ আর উন্নয়ন দিয়ে যে পাশ করা যায় না, তা তো চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই দেখা গেছে। মহাজোট সরকারের অনেক ভালো কাজও হয়তো এভাবেই অজানা কারো বোকামিতে চাপা পড়ে যাবে।

আমার ধারণা, হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙে আওয়ামী লীগ নেতাদের। খড়গোশের মত তারা দেখতে পান, আরে সময় তো শেষ, এত যে কাজ করলো সরকার তার কিছুই তো প্রচার করা হলো না। সময় যেহেতু কম তাই প্রচারণায় একেবারে ভাসিয়ে দিতে হবে। প্রচারণায় ভাসাতে গিয়ে এখন নিজেদেরই ভেসে যাওয়ার জোগাড়। সরকার বা আওয়ামী লীগের শীর্ষ কারো নির্দেশেই হয়তো এই অভিনব বেআইনী প্রচারণার পরিকল্পনা। কিন্তু আমি নিশ্চিত সরকার বা দলের যেই এই প্রচারণার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি অন্যের বিলবোর্ড দখল করার নির্দেশ দেননি। ধরে আনতে বললে বেধে আনার প্রবণতা তো আমাদের পুরোনো। আওয়ামী লীগের উচিত হবে অবিলম্বে এই ঘটনার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করা এবং স্যাবেটাজ করার দায়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। সাংবাদিকদেরও উচিত হবে অনুসন্ধান করে বের করা, কারা আওয়ামী লীগের এই শুভাকাঙ্খী? প্রথম দুয়েকদিন আওয়ামী লীগ নেতারা একটু দ্বিধান্বিত থাকলেও এখন তারা বিলবোর্ড রাজনীতির পক্ষে আজান দিয়ে নেমেছেন। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, সবে তো শুরু। এই বিলবোর্ড ছড়িয়ে দেয়া হবে সারাদেশে, জেলায় জেলায়, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। হায় হায়, তার মানে আওয়ামী লীগ কি সারাদেশ দখল করে ফেলবে! নৌকা ডোবাতে কয়জন সুরঞ্জিত লাগে?

পাদটীকা

বিলবোর্ড কেলেঙ্কারির পর বিএনপি নেতারা রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়লেন আওয়ামী লীগের সমালোচনায়। কিন্তু হায়, এই লেখা যখন লিখছি, তখন জানা গেল, নেতারা প্রেসক্লাবে বড় বড় কথা বললেও বিলবোর্ড দখলে পিছিয়ে নেই বিএনপিও। আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্খীদের কবল থেকে যে কয়টি বিলবোর্ড রক্ষা পেয়েছিল, সেগুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের ছবি। বাহ্‌। বাংলাদেশে সবসময়ই খারাপ কাজের প্রতিযোগিতা হয়। সংসদে বিএনপির এমপিরা খারাপ কথা বললে, আওয়ামী লীগের সাংসদরা দ্বিগুণ খারাপ কথা বলে তার জবাব দেন। এবারের ভৌতিক বিলবোর্ড কেলেঙ্কারি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিএনপি আমলে রাজধানীর বিলবোর্ডের একচেটিয়া ব্যবসার কথা। তখন নাকি বিলবোর্ড ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন ছোট রাজপুত্র আরাফাত রহমান কোকো। একটি খারাপ কাজকে আরেকটি খারাপ কাজ দিয়ে টেক্কা মারার এই অসুস্থ প্রবণতা থেকে কবে মুক্তি পাবে আমাদের রাজনীতি?

*পরিবর্তন ডটকম-এও প্রকাশিত।

প্রভাষ আমিন, এডিটর, নিউজ এন্ড কারেন্ট এফেয়ার্স, এটিএন নিউজ।

৮ আগস্ট, ২০১৩
probhash2000@gmail.com