প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে অসহায় ।। প্রভাষ আমিন
এইদেশ উপস্থাপনা, রবিবার, আগস্ট ০৪, ২০১৩


সরকারি দলের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিককে পেটানোর পর ‘এমপি=মোস্ট পাওয়ারফুল’ শিরোণামে একটি লেখা লিখেছিলাম। অনেকে প্রশংসা করেছেন, অনেকে দ্বিমত পোষণ করেছেন, অনেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। যারা দ্বিমত পোষণ করেছেন, তারা বলছেন, এমপিদের নানা অপকর্মের কথা লিখেছেন, কিন্তু সাংবাদিকদের অপকর্মের কথা কে লিখবে? অনেকে বলছেন, আপনি এমপিদের ‘মোস্ট পাওয়ারফুল’ বলছেন, কিন্তু সেই এমপিকেও কারাগারে যেতে হয়েছে সাংবাদিক পেটানোর মামলায়। তার মানে সাংবাদিকদের ক্ষমতা এমপিদের চেয়েও বেশি। শুনতে খুব যৌক্তিক মনে হয়। কিন্তু অন্তত এই ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে না। এমপি হোন আর যেই হোন কেউ কারো গায়ে হাত তুলতে পারেন না, মানে আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই। মানে গোলাম মাওলা রনি যদি ২ জন সাংবাদিককে না পিটিয়ে একজন রিকশাওয়ালাকেও পেটাতেন, তাহলেও তার সমান অপরাধ হতো। তবে এটা ঠিক সাংবাদিক পিটিয়েছেন বলেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে, রিকশাওয়ালাকে পেটালে হয়তো যেতে হতো না।

পত্র পত্রিকার প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত সাড়ে ৪ বছরে আওয়ামী লীগের এমপিরা শিক্ষক, আইনজীবী, নির্বাচনী কর্মকর্তা, প্রকৌশলীসহ অনেককেই পিটিয়েছেন। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই অপরাধ গোলাম মাওলা রনির সমান। তাও তাদের কাউকেই কারাগারে যেতে হয়নি। অনেকে বলছেন, সাংবাদিক পেটানোর অপরাধে নয়, রনিকে আসলে কারাগারে যেতে হয়েছে আসলে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে লেগেছেন বলে। কিন্তু এই যুক্তিতেও রনিকে বেনিফিট অব ডাউট দেয়ার সুযোগ নেই। সালমান এফ রহমান যত খারাপ লোকই হোন, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ তো আর রনির সাংবাদিক পেটানোর অপরাধ জায়েজ করে দেয় না। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য যে বা যারাই দায়ী, তিনি সালমান এফ রহমানই হোন আর যেই হোন তাদের গ্রেপ্তার করা হোক, বিচার করা হোক। কিন্তু সালমান রহমানের বিরুদ্ধে বলেছেন বলেই রনির পক্ষে দাড়াতে হবে, এমন কোনো যুক্তি নেই।

বলছিলাম ক্ষমতার কথা। কে বেশি ক্ষমতাশালী, এমপি না সাংবাদিক? এটা আসলে একটা কূ তর্ক। ক্ষমতা সবারই আছে, কে কিভাবে সেটা প্রয়োগ করে সেটাই হলো বড় কথা। আসলে ‘ক্ষমতা’ শব্দটার মধ্যেই একধরনের নেতিবাচক ব্যাপার আছে। তার বদলে ‘দায়িত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করলে শুনতে ভালো লাগতে। একজন এমপির দায়িত্ব সংসদে জনগণের কথা তুলে ধরা, আইন প্রণয়ন করা। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো জনগণকে সঠিক তথ্য জানানো। একজন পুলিশের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসবই ভালো এমপি, ভালো সাংবাদিক বা ভালো পুলিশের দায়িত্ব। সবাই ভালো হবেন, যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, এটাই প্রত্যাশিত। তাই আলাদা করে ভালো এমপি, ভালো পুলিশ, ভালো সাংবাদিক লেখার দরকার নেই। এমপি, পুলিশ, সাংবাদিক লিখলেই আমরা ধরে নেবো তিনি ভালো।

কিন্তু বাস্তবতা হলো সবাই ‘ভালো’ নয়। ‘খারাপ’ এমপি যেমন আছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ‘খারাপ’ সাংবাদিকও আছে। তবে আমি বিশ্বাস করি সব পেশাজীবীদের মধ্যেই এখনও খারাপের চেয়ে ভালোর সংখ্যা বেশি। যেদিন খারাপের সংখ্যা বেশি হবে, সেদিন সমাজ-সভ্যতা টিকবে না। আমাদের সংগ্রাম হলো সব পেশা থেকে ‘খারাপ’দের সরিয়ে ‘ভালো’দের সংখ্যা বাড়ানো। তবে শুধু সাংবাদিকরা ভালো হবেন; আর এমপি, পুলিশ, আইনজীবী, ডাক্তাররা ভালো হবেন না; তাহলে তো সমাজ চলবে না। সবাইকেই সমানতালে ভালো হতে হবে। বাংলাদেশে দায়িত্বের ধারণাটাই নেই। সবাই মাপেন ক্ষমতা, গুরুত্ব মাপা হয় ক্ষমতা দিয়ে। আর ক্ষমতা মানে কিন্তু কে কত বেশি ক্ষতি করতে পারেন তা। তার মানে ক্ষতি করতে পারা হলো ক্ষমতার সূচক। যিনি যত বেশি ক্ষতি করতে পারেন, তিনি তত বেশি ক্ষমতাশালী। যিনি যত বেশি ক্ষমতাশালী, লোকজন তার থেকে তত বেশি দূরে থাকেন। বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক আছে যারা সাংবাদিক, পুলিশ আর আইনজীবীদের ঋণ দেয় না। অনেক বাড়িওয়ালা আছেন যারা বাড়ি ভাড়া দেন না। এমন কৌতুকও প্রচলিত আছে, পুলিশ সবার কাছ থেকে ঘুষ খায়, আর সেই পুলিশের কাছ থেকে ঘুষ নেয় সাংবাদিকরা। প্রিয় পাঠক, এখন তাহলে আপনারাই বিবেচনা করে নিন কে বেশি পাওয়ারফুল? আজকের আলোচনা যেহেতু সাংবাদিকদের নিয়ে, তাই অন্য প্রসঙ্গ থাক।

এটা ঠিক বাংলাদেশে এখন সক্রিয় ও সজাগ গণমাধ্যম রয়েছে। সংখ্যায় যেমন বেশি, তৎপরতায়ও বিশাল। সদাসজাগ গণমাধ্যম আছে বলেই এখন নির্বাচনে কারচুপি করা যায় না, দুর্নীতি করলেও তা লুকিয়ে রাখা যায় না, সন্ত্রাসীরা সহজে পার পায় না। তাই গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। বিপদাপন্ন মানুষ এমপি, পুলিশ বা আইনজীবীর কাছে যান না, ছুটে আসেন সাংবাদিকদের কাছে। বিপদগ্রস্ত লোক যদি বিএনপি সমর্থক হন, আর তার এমপি যদি আওয়ামী লীগের হন; তাহলে তার বিপদ কমবে না, বরং আরো বাড়তে পারে। আমাদের এমপিরা দলের এমপি, জনগণের নয়। আর পুলিশের কাছে তো মানুষ ভয়েও যান না।

কিন্তু নির্দ্বিধায় ছুটে আসেন সাংবাদিকের কাছে। মানুষ দাবি-দাওয়া নিয়ে মানববন্ধন, প্রেস কনফারেন্স, সভা-সমাবেশ করেন প্রেসক্লাবের সামনে। তারা কিন্তু সংসদ ভবন বা পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে যান না। যেহেতু মানুষের প্রত্যাশা বেশি তাই সাংবাদিকদের দায়িত্বও বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো এই বাড়তি দায়িত্বকে কেউ কেউ বাড়তি ক্ষমতা হিসেবে মনে করেন এবং তা ভোগ করতে চান। গোল বাধে তখনই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৭ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে এক ইফতার আয়োজনে অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা জানি অসির চেয়ে মসি বড়। আপনারা আক্রান্ত হলে আমাদের কাছে বিচার চান। আমরা বিচার করি, এমপিকে গ্রেপ্তার করি। কিন্তু আপনাদের মসি যখন আমাদের ক্ষতবিক্ষত করে, তখন আমরা কার কাছে বিচার চাইবো, কোথায় যাবো? সরকার প্রধানের এই অসহায় জিজ্ঞাসা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্রধানমন্ত্রীর যদি বিচার চাওয়ার জায়গা না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্ন শুনে মনে হতে পারে সাংবাদিকরা আইনের উর্ধ্বে। বাস্তবে কিন্তু তা নয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত যে কোনো সংবাদে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারেন, পারেন সাধারণ আদালতে যেতেও। কিন্তু এই বাস্তবতার পেছনেও আরেকটি বাস্তবতা আছে, তাহলো সাংবাদিকদের সঙ্গে কেউ মামলা লড়তে চান না, ভয় পান। এই মামলায় জিতলেও ভবিষ্যতে আবারও আবারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সহজে কেউ সাংবাদিকদের ঘাটাতে চান না, মামলা করার ঝামেলায় যান না। আগেই বলেছি সব পেশাজীবীদের মধ্যেই ভালো-খারাপ আছে। ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করলে, পুলিশ ঘুষ খেলে পত্রিকায় নিউজ হয়। কিন্তু সাংবাদিকদের অনিয়মের ব্যাপারে সাধারণত কোনো নিউজ দেখা যায় না। কাক কাকের মাংস খায় না- এমন একটি অনৈতিক আপ্তবাক্যকে ব্যবহার করে আমরা ঢেকে রাখি আমাদের অসঙ্গতি, অনিয়ম। সম্ভাব্য পরবর্তী ঝামেলা এড়াতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির মামলা না করার প্রবণতা আর নিউজ না হওয়ার সুযোগটাই নেই আমরা। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদেরকে ক্ষমতাশালী মনে করেন, সমাজের সর্বত্র অগ্রাধিকার আশা করেন। পেশাগত কাজে অনেক সময় মিডিয়ার গাড়ি ট্রাফিকের বাড়তি সুবিধা পায়, দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য অনেক সময় উল্টো পথেও যায়। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের গাড়ি যখন ব্যক্তিগত কাজেও রাস্তায় বাড়তি সুবিধা দাবি করে বা আশা করে, তখনই ক্ষমতার প্রশ্নটি আসে।

প্রধানমন্ত্রীর যাই বলুন, সাংবাদিকদের মসির কাজই হলো দুর্নীতিবাজদের ক্ষতবিক্ষত করা। সেই দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ হতে পারেন, ব্যবসায়ী হতে পারেন, পুলিশ হতে পারেন। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখনই, যখন গণমাধ্যমের ভুল আক্রমণের শিকার হন কেউ। এক্ষেত্রে দুটি ব্যাপার ঘটতে পারে। প্রথমত সাংবাদিক যে তথ্যের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে কিছু লিখেছেন সেই তথ্য ভুল হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভুল স্বীকার বা যথাযথ স্থানে সংক্ষুব্ধের প্রতিবাদ ছাপানোর মাধ্যমে সেই ক্ষতির কিছুটা হলেও পূরণের চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো কোনো গণমাধ্যম ইচ্ছা করে, পরিকল্পনা করেই কারো বিরুদ্ধে লাগে। তখন ভুল স্বীকার তো দূরের কথা, প্রতিবাদও ছাপা হয় না। ছাপা হলেও তা ভেতরের কোনো পৃষ্ঠায় ছোট করে, যাতে কারো চোখে পড়ে না। প্রথম পাতায় বিশাল নিউজ করে ভেতরের পাতায় ছোট করে প্রতিবাদ ছাপলে সেই ব্যক্তির যে বিশাল ক্ষতি হয়, তার কিছুই পুরণ হয় না।

কোনো কোনো পত্রিকা আরেকটা কৌশল নেয় বিশাল নিউজের নিচে লেখা থাকে ‘এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি বা তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন’। যার বিরুদ্ধে নিউজ করা হচ্ছে তিনি যদি সত্যি সত্যি নির্দোষ হন, তাহলে এই এক লাইন অস্বীকারেও তিনি পার পান না, ক্যামেরা ট্রায়ালের শিকার হয়ে যান। আদালতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু পত্রিকা অভিযুক্তের ‘অস্বীকার’সহ তাৎক্ষণিকভাবে তা ছেপে দেয়। কোনো কোনো পত্রিকা দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে রিপোর্ট ছাপে। কিন্তু সে অনুসন্ধান নিশ্চয়ই আদালতের মত সাক্ষি-সাবুদের ওপর নির্ভর করে হয় না। তবে আমি বলছি না, গণমাধ্যম আদালতের মত দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে রিপোর্ট ছাপবে।

এটা সম্ভব নয়, পৃথিবীর কোথাও হয় না। বরং পত্রিকার রিপোর্টের ভিত্তিতেই অনৈকের বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু দেখতে হবে সেই রিপোর্টের উদ্দেশ্যটা সৎ না অসৎ; যদি ভুল হয়, তবে সেটা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত। যদি কেউ সৎ উদ্দেশ্যে কারো অনিচ্ছাকৃত ভুল কিছু লিখে ফেলে, তাহলে সেটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ডোবানোর জন্য ভুল তথ্য পরিবেশন করেন, তাহলে কি হবে? আগেই বলেছি, তেমন হলে তার প্রতিবাদ ছাপা হবে ভেতরের পাতায় ছোট করে। প্রেস কাউন্সিল বা আদালতে মামলা করলেও তা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ততদিনে তার সামাজিক মর্যাদা যেটুকু ক্ষুন্ন হওয়ার তা হয়েই যাবে। সেই ক্ষতি তিনি কোনোভাবেই পূরণ করতে পারবেন না। সত্যি কথা বলতে কী এ ধরনের ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হেয় করার ঘটনা আমাদের এখানে অহরহ ঘটে। অনেক পত্রিকা প্রকাশিতই হয় মানুষকে হেয় করার জন্য, ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ের জন্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তিনি গণমাধ্যমের একটি অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন নিজের অসহায়ত্ব দিয়ে। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্ন নিয়ে ভাববেন সাংবাদিকরা।

এই ধরনের ক্ষেত্রে কী করা দরকার তারও উপায় বাতলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। পরদিন তার কার্যালয়ে অপর একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে গণমাধ্যম স্বাধীন। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা যেন অন্য কারো স্বাধীনতা ক্ষুন্ন না করে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে গণমাধ্যম যেমন স্বাধীন, তেমনি স্বাধীনতা আছে প্রত্যেকটি নাগরিকেরও। গণমাধ্যম যেন জনগণের স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ না করে সেটিও মাথায় রাখতে হবে; হোন তিনি এমপি, মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতা আর দায়িত্বশীলতার ভারসাম্য রক্ষায় চাই একটি বাস্তবায়নযোগ্য ও অনুসরণযোগ্য গণমাধ্যম নীতিমালা। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, একটি গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। তিনি তথ্যমন্ত্রীকে তাগিদ দিয়েছেন দ্রুত তা করার জন্য। গণমাধ্যম নীতিমালা দরকার, কিন্তু সেটা সরকার করছে শুনে আমি খুব শঙ্কিত। সরকার কোনো নীতিমালা চাপিয়ে দিলে আমরা সেটা মানতে বাধ্য কিনা, সেই প্রশ্নও রয়ে যায়।

কারণ একটি খসড়া নীতিমালা দেখার সুযোগ হয়েছিলাম। আমার শঙ্কাটা হলো, তেমন কোনো নীতিমালা মানতে হলে, বাংলাদেশে আর পত্রিকা প্রকাশ বা টেলিভিশন সম্প্রচার করতে হবে না। কারণ নীতিমালা ‘করা যাবে না’র দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা সরকারের চাপিয়ে দেয়া নীতিমালা মানলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলো কোথায়? এমনকি সরকারি নীতিমালা যদি ভালোও হয়, তাহলেও সেটা আমাদের কাছে চাপিয়ে দেয়াই মনে হবে। নীতিমালা প্রয়োজন, তবে আমাদের দাবি সেটা যেন সাংবাদিকরাই প্রণয়ন করেন। আমি আগেও এক লেখায় বলেছি, যেন সিনিয়র সাংবাদিকরা একত্রে বসে একটি অনুসরণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করেন। সবচেয়ে ভালো হয়, সম্প্রতি গঠিত সম্পাদক পরিষদ যদি নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব নেয়।

পাদটীকা: আমি নিশ্চিত আমার লেখা নিয়মিত পড়েন এমন কেউ নেই। যদি দুয়েকজন থাকেন, তাহলে আমি বিপদে পড়ে যাবো। কারণ তাহলে তারা বলতে পারেন, এই কথা তো আপনি আগেও অনেকবার বলেছেন। এক কুমিরের ছানা দেখিয়ে আর কত লেখা চালাবেন। কিন্তু আমি মনে করি প্রয়োজনীয় কথা বারবার বলা যেতে পারে। যতদিন বাংলাদেশের সকল সাংবাদিকের অনুসরণযোগ্য একটি ভালো নীতিমালা না হবে, ততদিন আমি সুযোগ পেলেই লিখবো, লিখেই যাবে। অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের ইচ্ছাকৃত ভুল আর অপ্রয়োজনে মানুষকে হেয় করা বা ব্ল্যাকমেইল করার প্রবণতার কাছে আমাদের প্রিয় এই পেশাকে আমরা জিম্মি হতে দিতে পারি না। বারবার একই বিষয়ের লেখা পড়ে যারা বিরক্ত হচ্ছেন তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

বাংলানিউজ২৪-এও প্রকাশিত।

প্রভাষ আমিন
এডিটর, নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, এটিএন নিউজ
৩০ জুলাই, ২০১৩
probhash2000@gmail.com