জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল, 'জামায়াত নিষিদ্ধের ভিত্তি জোরদার'
এইদেশ ডেস্ক, বৃহস্পতিবার, আগস্ট ০১, ২০১৩


একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ। এই রায়ের ফলে রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামী আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়ে ওঠার মধ্যেই বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন।

বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন সংক্ষিপ্ত রায়ে বলেন, “বাই মেজরিটি, রুল ইজ মেইড অ্যাবসিলিউট অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশেন গিভেন টু জামায়াত বাই ইলেকশন কমিশন ইজ ডিক্লিয়ার্ড ইলিগ্যাল অ্যান্ড ভয়েড।”

রায়ের বিস্তারিত পরে প্রকাশ করা হবে বলেও আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

আলোচিত এ রায় উপলক্ষে আগেই হাই কোর্ট এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংবাদকর্মী ও আইনজীবীরা রায় শুনতে এজলাসে জড়ো হন।

রায়ের পর জামায়াতের আইন সম্পাদক ও এ মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, “রায়ে আদালত বলেছে, নির্বাচন কমিশন জামায়াতে ইসলামীকে যে নিবন্ধন দিয়েছে তা অবৈধ।”

আর নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, “এই রায়ের ফলে রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।”

রায়ের সময় রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন এ আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতে ইসলামী ২০০৮ সালে ৩৮টি দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়। আইন অনুযায়ী শুধু ইসিতে নিবন্ধিত দলগুলোই নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।

তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মাওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ জন ওই নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হাই কোর্ট একটি রুল জারি করে।

একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১)(বি)(২) ও ৯০(সি) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে বলে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের বেঞ্চ।

পরে রুলটি বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে যায়। সেখানে আংশিক শুনানির মধ্যেই ওই বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন হয়ে যায়।

এরপর বৃহত্তর বেঞ্চে রিটের শুনানি শেষ হয় গত ১২ জুন।

‘এ রায় জামায়াত নিষিদ্ধের আইনি ভিত্তি হবে’
জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের রায় দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের ‘আইনি প্রক্রিয়ায় শক্ত ভিত্তি’ হিসেবে কাজ করবে বলে মন্তব্য করেছেন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম।বৃহস্পতিবার হাই কোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি শুভ দিন। নিবন্ধনের বিষয়ে পজিটিভ রায় এসেছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।”

এই রায়ের মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি ভিন্ন বিষয়।

তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, “শিগগিরই আইনের মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আমরা আশা করি।”

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের ইসলামীর যুদ্ধাপরাধের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালো হতে থাকে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়, যা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ক্ষমতাসীন মহাজোটের কয়েকটি শরিক দলসহ বাম সংগঠনগুলোও এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানায়।

বৃহস্পতিবার নিবন্ধন বাতিলের রায়ের পর সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিটি সামনে নিয়ে আসা হয়।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল বলেন, “সরকার নয়, বরং আইনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আমি আশা করি।

“এ রায় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় শক্ত ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে।”

হাই কোর্টের রায়ের ফলে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন কি না- জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সে রকম কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ‘যথাযথভাবে’ মোকাবেলা করা হবে।


প্রমাণ হলো, জামায়াত সন্ত্রাসী সংগঠন: ১৪ দল
জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের নেতারা বলেছেন, জামায়াত যে সন্ত্রাসী সংগঠন সেটা আবার প্রমাণ হলো। সহিংসতার চেষ্টা করলে তাদের সন্ত্রাসীদের মতোই দমন করা হবে।

আজ জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল-সংক্রান্ত রায় দেওয়ার পর জোটটির নেতারা এসব মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করায় আরও আগেই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। তবে তাদের চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য আপিল বিভাগের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

সভাপতিমণ্ডলীর অপর সদস্য নূহ উল আলম লেনিন প্রথম আলো ডটকমকে বলেছেন, এ রায়ের ফলে তাদের আর রাজনীতি করার বৈধতা নেই।

এদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়া রায়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জামায়াত যে সন্ত্রাসী সংগঠন সেটা আবার প্রমাণ হলো। তারা যদি কোনো সহিংসতার চেষ্টা করে, তাহলে সন্ত্রাসীদের যেভাবে দমন করা হয়, তাদেরও সেভাবে দমন করা হবে।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতার বিরোধিতা করার পরও গত ৪২ বছরে তাদের মধ্যে অনুতাপ লক্ষ করা যায়নি। বরং তারা একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। হাইকোর্টের রায়ে এটাই প্রমাণিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হানিফ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এখন জামায়াত নিষিদ্ধের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি।’

জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘এটা আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত রায়। কারণ, তারা ছিল স্বাধীনতাবিরোধী। তারা আইন-আদালত কিছুই মানে না। সুতরাং তাদের নিষিদ্ধ করা উচিত।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া রায়কে স্বাগত জানিয়ে প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘এই রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হবে না।’
নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায় প্রত্যাখ্যান করে আগামী ১২ ও ১৩ আগস্ট (সোম ও মঙ্গলবার) লাগাতার ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে আগামী শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। জামায়াত রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল করেছে।
সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪ ও প্রথম আলো