বিচারে হেলাফেলা অনিচ্ছাকৃত নাকি রাজনৈতিক খেলা
আজাদুর রহমান চন্দন, বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০১৩


একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ছয়জনকে সাজা দিয়েছেন। একজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড এবং চারজনকে ফাঁসির দণ্ড দেন দুটি ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু কারো ফাঁসির দণ্ড এ সরকারের মেয়াদে কার্যকর হবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কাদের মোল্লার সাজার বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এই আপিলটি নিষ্পত্তি হবে, এটা নিশ্চিত। কিন্তু আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেবেন কি না তা নিশ্চিত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এ আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার পর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের শুনানি শুরু হবে। কিন্তু আগস্টের প্রথম দিক থেকেই দীর্ঘ ছুটি শুরু হবে সুপ্রিম কোর্টে। চলবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ। এরপর অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার শুরু হবে ছুটি। কাজেই এ সময়ের মধ্যে এ সংক্রান্ত আর কোনো আপিল নিষ্পত্তি হবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ছয়টি রায়ের মধ্যে এ পর্যন্ত তিনটির বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। দুটি মামলায় আপিল দায়েরের সময়সীমা পার হয়নি। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস। এ সময়ের মধ্যে সব আপিলের শুনানি হওয়ারই সম্ভাবনা নেই, নিষ্পত্তি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। দুটির বেশি আপিল এ সরকারের আমলে নিষ্পত্তি হবে এমন আশার কথা সরকারি মহল থেকেও শোনা যায় না।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল, সাত সদস্যের তদন্ত সংস্থা ও ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেল ঘোষণা করে। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি দেখা দেয় তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে। ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলে শুরুতে সরকারদলীয় একাধিক সংসদ সদস্যের নাম ছিল। এ রকম আরো কয়েকজনের বিষয়ে কিছু প্রশ্ন ওঠায় তাঁদের বাদ দেওয়া হয়। পরে কয়েক দফায় নিয়োগ দেওয়া হয় আরো কয়েকজনকে। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত সব আইনজীবীও (প্রসিকিউটর) দীর্ঘদিন সমন্বিতভাবে কাজ করছিলেন না বলে অভিযোগ ছিল। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক দেখা দেয় তদন্ত সংস্থার সর্বজ্যেষ্ঠ সদস্যকে নিয়ে। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রজীবনে ওই সদস্য জামায়াতের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ বিষয়টি সুরাহা করতেও লেগে যায় কয়েক মাস। অবশেষে ২০১০ সালের ৫ মে ওই সদস্য পদত্যাগ করেন।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রায় চার মাস পর এর কার্যবিধি প্রকাশ করা হয় প্রজ্ঞাপন আকারে। এ কার্যবিধি না থাকায় ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন তাঁদের কর্মপরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে ছিলেন অন্ধকারে। ফলে কার্যক্রম চলে এলোমেলোভাবে। আবার দেরিতে কার্যবিধি তৈরি হলেও অনেক বিষয় তাতেও অস্পষ্ট থেকে যায়। বিশেষ করে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েই দেখা দেয় সংশয়। অভিযোগ দাখিল করার আগে কাউকে গ্রেপ্তার করা আইনসংগত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই কার্যবিধির ত্র“টি নিয়ে কালের কণ্ঠে ২০১০ সালের ২০ জুলাই আমারই লেখা একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। অস্পষ্টতা ও ত্র“টি দূর করে সংশোধিত এই কার্যবিধি প্রণয়ন করতেও লেগে যায় আরো প্রায় সাড়ে তিন মাস। অবশেষে সে বছর ২৮ অক্টোবর সংশোধিত কার্যবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে ২০১০ সালের ২৮ মার্চ পুরনো হাইকোর্ট ভবনে। শুরুতে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের অফিসও ছিল সেখানেই। কিন্তু ওই ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সে বছরের ৪ জুলাই বেইলি রোডে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের জন্য নতুন কার্যালয় স্থাপন করা হয়। সেখানেও দুটি সংস্থার কাজ করা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে প্রসিকিউশনের কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয় ট্রাইব্যুনালের পাশে একটি ভবনে। কিন্তু প্রসিকিউটরদের কেউ কেউ এতে নাখোশ হন। তদন্তের কাজে সহায়তার জন্য গবেষকরা যেসব দলিলপত্র সরবরাহ করেছিলেন, সেগুলো ছিল বেইলি রোডের কার্যালয়ে একটি কক্ষে। তদন্ত সংস্থা দীর্ঘদিন সেই কক্ষটি খুলতে পারছিল না চাবি তাদের হাতে না থাকায়। একজন প্রসিকিউটর চাবিটি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। এ জটিলতা কাটতেও অনেকদিন লেগে যায়।

বিধি সংশোধন করে তদন্ত সংস্থার কোনো সদস্যকে কো-অর্ডিনেটর মনোনীত করার বিধান যুক্ত করা হলেও সরকার দীর্ঘদিন কাউকে কো-অর্ডিনেটর মনোনীত করেনি। ফলে তদন্ত সংস্থায় সমন্বয়হীনতা থেকে যায়। পরে আবদুল হান্নান খানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হলে সংস্থার কাজে মোটামুটি গতি আসে।

দীর্ঘদিন সমন্বয়ের অভাব লক্ষ করা যায় প্রসিকিউটরদের মধ্যেও। প্রসিকিউটরদের অনেককেই পেশাগত কাজে যতটা ব্যস্ত দেখা যায়, ট্রাইব্যুনালের কাজে তেমনটা দেখা যায়নি। একটি সুসংগঠিত একক টিম হিসেবে প্রসিকিউশনের সক্রিয়তা চোখে পড়েনি দীর্ঘদিন। এ ছাড়া গঠন করা হয়নি কোনো গবেষণা সেল। অথচ এ ধরনের বিচারের ক্ষেত্রে এটি ছিল অপরিহার্য। তদন্ত সংস্থায় শুরুতে একজন গবেষককে (এ এস এম সামছুল আরেফিন) রাখা হলেও নানা জটিলতার কারণে তিনি পরে থাকেননি। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিভিন্ন দেশে এসব অপরাধের বিচারের বিষয়ে চর্চা আছে, সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন, সেই রকম কোনো আইনজীবীকে প্রসিকিউশন টিমে রাখা হয়নি।

কাদের মোল্লার বিচারে প্রত্যাশিত রায় না হওয়ায় ব্যাপক জনঅসন্তোষের মুখে কিছুদিন আগে ড. তুরিন আফরোজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রসিকিউটর হিসেবে। প্রথমবারের মতো দেখা গেল, কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার যুক্তিতর্কে তুরিন আফরোজ সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির বিষয়টি তুলে ধরেন বাইরের অনেক উদাহরণ দিয়ে। রায়েও বিষয়টি উল্লেখ আছে। তবে ফরমাল চার্জে কামারুজ্জামানের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন হিসেবে দায়) উল্লেখ না থাকায় এর দায়ে কোনো সাজা দেননি ট্রাইব্যুনাল। অথচ কাদের মোল্লার মামলায়ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি চাপানোর সুযোগ ছিল। এমনকি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডেও আল বদর হাইকমান্ডের সদস্য হিসেবে কাদের মোল্লাকে অভিযুক্ত করা যেত। কিন্তু প্রসিকিউশনের দুর্বলতার কারণে তা করা যায়নি।

শুধু প্রচলিত ফৌজদারি আইনের জ্ঞান-অভিজ্ঞতা দিয়ে এ ধরনের মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ বিচারের ক্ষেত্রে গবেষণার কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এই বিচার প্রক্রিয়ায় তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন এমনকি ট্রাইব্যুনালেও সম্পৃক্ত করা দরকার ছিল সংশ্লিষ্ট গবেষকদের। বিভিন্ন মহলের দাবিও ছিল গবেষকদের সম্পৃক্ত করার। কিন্তু সে রকম কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে গবেষকদের কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে নানা তথ্য, দলিল ও পরামর্শ তদন্ত সংস্থা কিংবা প্রসিকিউশনকে দিয়েছেন। তবে সেটা ছিল একেবারেই অনানুষ্ঠানিক। সরকারিভাবে গবেষক নিয়োগ না দেওয়ার কারণেও বিচার প্রক্রিয়ায় যে জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ হয়েছে তার বড় নজির একজন প্রবাসী গবেষকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যানের কথোপকতনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনাপ্রবাহ।

এ বিচারের ক্ষেত্রে গবেষণা ও দলিলপত্রের গুরুত্ব কতখানি তার উল্লেখ আছে ট্রাইব্যুনালের রায়েও। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার রায় দিতে গিয়ে গত ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর বলেন, ‘এ মামলায় মৌখিক সাক্ষ্যের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, সবই দালিলিক সাক্ষ্য।...তবে আমরা মনে করি, আরো কিছু ডক্যুমেন্ট দাখিল করলে আমাদের জন্য ভালো হতো। রেফারেন্স বই হিসেবে তেমন কোনো বই উপস্থাপন করা হয়নি।’ গবেষণার ওপর জোর না দেওয়ার কারণেও যে বিচারকাজে সময় বেশি লাগছে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে ওই রায়ে। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর বলেন, ‘রায় দিতে তিন মাস লেগেছে বলে অনেকে আমাদের সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা করতেই পারেন, কিন্তু আমাদের কিছু সমষ্টিগত সমস্যা আছে। আমাদের ট্রাইব্যুনালে এক সেট স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র ছাড়া আর কোনো আইনের বই নেই, সেটাও দুই ট্রাইব্যুনাল শেয়ার করে পড়তে হয়। গত ৪০ বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শত শত বই লেখা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো রাষ্ট্রপক্ষ আমাদের দেয়নি, আমরাও পাইনি। বিভিন্ন জায়গা থেকে রেফারেন্স সংগ্রহ করে আমরা রায় সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।’

এই বিচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই সরকার ও রাষ্ট্রপক্ষের নানা দুর্বলতা, গাফিলতি ও কালক্ষেপণ লক্ষ করা গেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। এমনকি ট্রাইব্যুনালও প্রসিকিউশনকে ভর্ৎসনা করেছেন বারবার। শুধু তাই নয়, গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগই ঠিকমতো উত্থাপন করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে সেগুলো ট্রাইব্যুনাল থেকে ফেরত দেওয়া হয়। বাড়তি সময় লেগেছে রাষ্ট্রপক্ষের এমন দুর্বলতার কারণেও। আর এরই ফল হলো রায় কার্যকর হওয়া নিয়ে আজকের এই সংশয়। কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন যে সরকার ইচ্ছে করেই এমনটি করেছে, যাতে বিষয়টি ঝুলে থাকে পরবর্তী সরকারের জন্য। এতে সরকার তথা ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ থাকতে পারে। যেমন বিষয়টি আগামী নির্বাচনে একটি ভালো ইস্যু হতে পারে। আওয়ামী লীগ ভোটারদের বলতে পারবে যে তারা আবার ক্ষমতায় না গেলে সাজাপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাবে। আবার অন্য কেউ, বিশেষ করে বিএনপি, ক্ষমতায় এলে বিষয়টি তাদের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেবে। তারা এ অপরাধীদের ছাড়তে গেলেও বিপাকে পড়বে, আবার রায় কার্যকর করাও তাদের পক্ষে কঠিন হবে। আর তেমনটি সত্যি হলে রাজনীতির খেলায় আটকে থাকবে জাতির কলঙ্ক মোচন।

লেখক : সাংবাদিক