শ্যামলী নাসরিনের কান্নাভেজা সাক্ষ্য ।। নিজামীর নির্দেশেই ডাঃ আলীমকে হত্যা করা হয়
এইদেশ ডেস্ক, বুধবার, জুলাই ১০, ২০১৩


জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশেই ১৯৭১ সালে চিকিৎসক আলীম চৌধুরীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সাক্ষ্যে বলেছেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মামলায় ১৩তম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বুধবার সাক্ষ্য দেন তিনি।

সাক্ষ্য দেয়ার সময় একাত্তরে স্বামীকে হারানোর ঘটনা স্মরণ করে বেশ কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শ্যামলী নাসরিন, তার কান্না ছুঁয়ে যায় বিচারকদেরও।

শ্যামলী নাসরিন জানান, ১৯৭১ সালে ২৯/১ পুরানা পল্টনের বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। সঙ্গে থাকতেন স্বামী, দুই মেয়ে, অসুস্থ বাবা-মা, ছোট বোন এবং দুই ভাই। এই দুই ভাই পরে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান।

একাত্তরের জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে মাওলানা মান্নান (দৈনিক ইনকিলাবের মালিক) আশ্রয় নিতে যান।

অপরিচিত হওয়ায় তাকে আশ্রয় দিতে আলীম চৌধুরী না চাইলেও প্রতিবেশী মতিন সাহেবের সুপারিশে দুই-তিনদিন থাকার জন্য মাওলানা মান্নান ও তার পরিবারকে আশ্রয় দেয়া হয়।

শ্যামলী নাসরিন জানান, এর কিছুদিনের মধ্যে মাওলানা মান্নানের বাড়ি জিনিসপত্রে ভরে যায় এবং তার কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকজন যাওয়া আসা শুরু করে। বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে তিনি বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে নেন।

“১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসের ২/৩ তারিখ থেকে দেখতে পাই ছাই রংয়ের প্যান্ট ও নীল রংয়ের শার্ট পড়া কিছু যুবক অস্ত্র হাতে পুরো বাড়ি পাহারা দিতে থাকে। ডাক্তার আলীম চৌধুরী মাওলানা মান্নানকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, মান্নান নিজে আলবদরের সংগঠক এবং ওই যুবকরা আলবদর সদস্য।”

“আমার স্বামী এতে ভয় পেয়ে বলেন, তারা আপনার গেইটে থাকুক, আমরা গেটে কেন? মান্নান তখন বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে মেরে ফেলবে, তাই এই পাহারা। মুক্তিযোদ্ধারা আপনার গেইট দিয়ে ঢুকবে।”

শ্যামলী নাসরিনরা ততদিনে জেনে গেছেন যে ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যরা আলবদর বাহিনী গঠন করেছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক হয়ে বাঙালিদের হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে অংশ নিচ্ছে।




“মাওলানা মান্নান সবসময় আমাদের অভয় দিতেন, ‘আপনারা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আপনাদের ভয় নেই। আমি আপনাদের রক্ষা করব’।”

চিকিৎসক আলীম চৌধুরীকে ধরে নেয়া হয় ১৫ ডিসেম্বর সকালে। ঘটনার বর্ণনা দেন শ্যামলী নাসরিন।

“বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ঢাকা শহরে বোমাবর্ষণ করছিল। আমি আমার স্বামী ও মা দোতলার বারান্দায় বসে ওই বোম্বিং দেখছিলাম এবং খুব উৎফুল্ল ছিলাম এই ভেবে যে খুব দ্রুত হয়ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে।”

“তখন কারফিউ ছিল। একটি গাড়ির শব্দ শুনতে পেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই কাদামাখানো একটি মাইক্রোবাস মাওলানা মান্নানের গেটে এসে দাঁড়ায়।”

“৩০-৩৫ মিনিট পর দেখি আমাদের দরজার বাইরে থেকে প্রচণ্ড শব্দ ও দরজা খুলতে বলছে। আমি ওপরের জানালা দিয়ে দেখলাম অস্ত্র হাতে দুই/তিনজন আলবদর দরজায় লাথি দিচ্ছে।”

শ্যামলী নাসরিন তখন স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি দরজা খুলে দিতে বলেন।

“আমি দেখি আমার স্বামী দৌড়ে নিচে যেতে চাচ্ছেন। আমি তাকে আটকালে তিনি বলেন, মান্নানের কাছে যাচ্ছি। তিনি সবসময় বলেছেন আমার কোনো ভয় নেই, তিনি আমাকে রক্ষা করবেন।”

“আমার স্বামী মান্নানের দরজায় প্রাণপণে ধাক্কা দিলে তিনি দরজা সামান্য ফাঁক করে বলেন, ‘আপনি যান, আমি আছি’। আমার স্বামী আবার উপরে উঠতে চাইলেও পারলেন না। ততোক্ষণে আলবদর সদস্যরা ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ‘হ্যান্ডস আপ’ করতে বলে।”

“এসময় আমার স্বামী তাদের বলেন, কী ব্যাপার? তারা তখন বলেন, সেটা আপনি গেলেই জানতে পারবেন। এটা আলবদরের হাইকমান্ড নিজামীর নির্দেশ।আমার স্বামী কাপড় পাল্টে নিতে চাইলে তারা বলে, তার আর দরকার হবে না। এরপর উনাকে চোখ বেঁধে বের করে নিয়ে যায়।”

ওই সময় দৌড়ে মান্নানের কাছে গিয়ে সহায়তা চান শ্যামলী। মান্নান তখন বলেন, “ঘাবড়াবেন না, ওরা আলবদরের হাইকমান্ডের নির্দেশে আপনার স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছে। ডা. ফজলে রাব্বীকেও নিয়ে গেছে।”

তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে মান্নান বিরক্ত হয়ে শ্যামলী নাসরিনকে বলেন, চারিদিকে বোম্বিং হচ্ছে। চিকিৎসা করানোর জন্য উনাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কখন দিয়ে যাবে জানতে চাইলে বলেন, কাজ শেষ হলেই দিয়ে যাবে।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পরে ডা. আলীমকে অনেক জায়গায় খোঁজাথুঁজি করেন শ্যামলী। ১৭ তারিখ জানতে পারেন, যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তারা কেউ বেঁচে নেই।

১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অনেক লাশ পড়ে আছে শুনে আলীম চৌধুরীর ছোট ভাই হাফিজ চৌধুরী, চেম্বার সহকারী হাকিম ও মোমিনসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা সেখানে গিয়ে তার লাশ বাসায় নিয়ে আসে। সেখানে তারা ডা. ফজলে রাব্বী, সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের লাশও খুঁজে পান।

“উনার হাত দুটো দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল, চোখ ছিল গামছা দিয়ে বাঁধা। সারা শরীরে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো চিহ্ন। অসংখ্য গুলিতে বুক ঝাঁঝরা ছিলো।”

সাক্ষ্য দেয়ার এই পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্যামলী নাসরিন।

“মানুষ কীভাবে আরেকটা মানুষকে এভাবে মারতে পারে?”

এসময় পুরো আদালত নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। বিচারকদের মধ্যেও একজনকে চোখ মুছতে দেখা যায়।

শ্যামলী নাসরিন জানান, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই সাংবাদিক, সাহিত্যিকসহ মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে বাড়িতে আশ্রয় দেয়াসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন চিকিৎসক আলীম চৌধুরী।

মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু গোপন হাসপাতাল ছিলো, যেখানে তিনি ও ফজলে রাব্বি গোপনে গিয়ে চিকিৎসা দিতেন।

শ্যামলী নাসরিন আরো জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাদের বাসায় আশ্রয় নেন। তাকে লুকিয়ে রাখার পরে ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে অতিগোপনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়।

আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল পরে মুজিবনগর সরকারের উপরাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর কারাগারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। তার ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বর্তমানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।

সাক্ষ্যে শ্যামলী নাসরিন ট্রাইব্যুনালের কাছে বলেন, “আমি ৪২টি বছর এই বিচারের অপেক্ষা করে আসছি। আমার স্বামীসহ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে যে আলবদর বাহিনী, আলবদরের যে হাইকমান্ড তাদের হত্যা করেছে তাদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছি।”




সাক্ষ্য দেয়ার পরে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।

জেরায় শ্যামলী নাসরিন জানান, নিজামীকে স্বচক্ষে প্রথম দেখেন তিনি এই ট্রাইব্যুনালে, তবে ১৯৭১ দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক খবরে মতিউর রহমানের আলবদরের কমান্ডার এবং পাকিস্তানের আলবদরের হাইকমান্ড বলে পরিচয় দেয়া হয়।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ১৯৬৯ সাল থেকে পুরানা পল্টনের বাসাটিতে থাকতেন তিনি ও তার পরিবার। স্বাধীনতার পর বছর দুয়েক ওই বাড়িতে ছিলেন তারা। বাড়ির মালিক ইঞ্জিনিয়ার জিয়াউল কবীর অন্য এলাকায় থাকতেন।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মাওলানা মান্নান স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে ওই বাড়িতে উঠেছিলেন।

জেরা অসমাপ্ত রেখে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে ট্রাইব্যুনাল।

নিজামীর বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ অগাস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে প্রসিকিউশনের ১২ জন সাক্ষী তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

গত বছরের ২৮ মে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি ঘটনায় নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এর আগে ৯ জানুয়ারি নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এতে মোট ১৫টি অভিযোগ ছিল। অভিযোগ গঠনকালে বুদ্ধিজীবী হত্যা যোগ হয়।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪