রাজনীতির নতুন কেবলা, নতুন পীর ।। প্রভাষ আমিন
এইদেশ উপস্থাপনা, রবিবার, জুলাই ০৭, ২০১৩


রাজনীতিবিদরা পীর সাহেবদের খুব পছন্দ করেন। সম্ভবত নিজেদের নানা অপকর্ম ঢাকতেই তারা আশ্রয় নেন ধর্মের। আর এই সুযোগে ভন্ড পীরেরাও ফুলে ফেঁপে ওঠেন। এরশাদের আমলে তার কল্যাণে বাংলাদেশে অনেক পীরের উত্থান ঘটে। এরশাদের ঘন ঘন যাতায়তের সুবাদে সারা বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পান আটরশির পীর। ওরশে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি দেখে আটরশির পীর ভেবেছিলেন সব ক্ষমতার উৎস বুঝি তিনিই। পরে জাকের পার্টি নামের রাজনৈতিক দল গঠন করে টের পেয়েছেন কত ধানে কত চাল। এখনও আটরশির ওরশে অনেক মানুষ যায় বটে, তবে জাকের পার্টির ভোটের বাক্স ফাঁকাই থাকে। জাকের পার্টির গোলাপ ফুলের সুবাস বেশি লোককে টানতে পারেনি। সায়েদাবাদের আরেক ভন্ড পীর তো এরশাদের মন্ত্রিসভার গোটা দশেক সদস্যকে তার কোম্পানির ট্যালকম পাউডারের বিজ্ঞাপনের মডেল বানিয়েছিলেন। লাইন ধরে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মডেল হওয়ার ঘটনা বিশ্বে সেটিই প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেনজির ভুট্টো বাংলাদেশে উড়ে এসে জয়পুরহাটের এক অখ্যাত পীরের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিলেন। পরে সেই পীর স্বাভাবিক নিয়মে হারিয়েও গিয়েছিলেন। মেজর ফারুক রহমানও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করার সময় পরামর্শ নিয়েছিলেন এক অন্ধ পীরের। রাজনীতিবিদরা যেমন পীরের কাছে যান, তেমনি আবার পীর বদলও করেন। সাধারণত পীরেরা তেমন কোথাও যান না, অন্যরা ছুটে যান তার কাছে। আর নেতারা গেলে লাইন ধরে যান তাদের চেলা-চামুন্ডারা। ফলে পসার বাড়ে সেই পীরের, বাড়ে ওরশে গরুর সংখ্যা। পীরের রেটিং যতটা না তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় নির্ধারিত হয়; তারচেয়ে বেশি নির্ধারিত হয় তার পার্থিব কানেকশন, প্রভাব, ক্ষমতা দিয়ে। আধ্যাত্মিক ক্ষমতা তো বায়বীয় ব্যাপার, সেটা থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইদানিং দুজন নতুন পীরের আবির্ভাব ঘটেছে। দুজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কামেল পুরুষ। তবে ইদানিং তারা যেন পীরের মর্যাদা পাচ্ছেন। তাদের একজন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ।
অর্থনীতিবিদ হলেও ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে অনন্য অবদান রাখায় গ্রামীণ ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ড. ইউনূস। বিশ্বে মুখ উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের। বিশ্বের প্রায় সবখানেই তাকে চেনেন সবাই। এমনকি যেখানে কেউ বাংলাদেশকে চেনে না, সেখানেও পরিচিত ড. ইউনূস। দেশের বাইরে গেলেই ড. ইউনূসের গর্বে যে কোনো বাংলাদেশীর বুক ফুলে যায়। আর বর্তমান বিশ্ব গ্রামের একমাত্র মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে তার দারুণ প্রভাব। ড. ইউনূসকে সম্মানিত করতে আইন বদলে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র। সাদা বাড়ির হেশেল পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়াত। স্বপ্নের এই ফেরিওয়ালাও যে নিছক একজন সাধারণ মানুষ সেটা টের পাওয়া গেছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়ের একটি ওয়ান ইলাভেনের সময় তার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা দেখে। আরো অনেকের মত তিনি নিজেও একটি ‘কিংস পার্টি’ গঠনের চেষ্টা করেছেন। পরে তা ক্ষান্তও দিয়েছেন। পরে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের সময় আরো একবার ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন, তিনি নিছকই একজন রক্ত-মাংসে গড়া সাধারণ মানুষ। কার কি হয়েছে, জানি না, ড. ইউনূসকে সাধারণ মানুষের কাতারে দেখতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে, এখনও হচ্ছে। একজন সত্যিকারের বড় মানুষ দেখার মধ্যেও একধরনের পূণ্য আছে। আমি ড. ইউনূসকে দেখে সেই পূণ্য অর্জনের চেষ্টা করেছিলাম। বয়স ৬০ পেরোনোর পর আর কেউ কোনো ব্যাংকের এমডি থাকতে পারবেন না, আইনের এই সহজ অঙ্কটা বুঝতে কেন ড. ইউনূসকে হাইকোর্টের বারান্দা পর্যন্ত ঘুরতে হলো। ড. ইউনূসকে হাইকোর্টের বারান্দায় দেখলে আমার খুব খারাপ লাগে, কষ্টে বুক ফেটে যায়। একমাত্র নোবেল বিজয়ীকে আমরা যথাযথ সম্মান জানাতে পারলাম না, নাকি তিনি সম্মানটা রাখতে পারলেন না- আমি বুঝতে পারি না। তিনি যদি আইন মেনে ৬০ বছর পর গ্রামীণ ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিতেন, তাহলে জাতি তাকে আরো অনেক বড় সম্মানের আসনে বসাতো। ম্যান্ডেলা তো অনেকদিন ধরে কোনো পদে নেই, তাতে তো সম্মানের কোনো কমতি হয়নি। আমার মনে হয় ড. ইউনূস নিজেকে যে উচ্চতায় তুলে নিয়েছিলেন, তাতে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির চেয়ারটি বরং তার জন্য ছোট হয়ে গিয়েছিল। তবে সরকার যেভাবে ড. ইউনূসকে শত্র“পক্ষ বানিয়ে ফেলেছে, সেটা খুবই ছোটলোকি ছেলেমানুষি হয়েছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন পুরোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাচ্ছে। কিন্তু একজন ব্যক্তি কখনো একটি রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। আর ইউনূসের সঙ্গে লাগতে গিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। দুর্জনেরা বলেন, পদ্মা সেতু ও জিএসপি সঙ্কটের পেছনে ড. ইউনূসের হাত রয়েছে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি ড. ইউনূস একজন দেশপ্রেমিক মানুষ, দেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমার একটি অভিমান আছে, ড. ইউনূস হয়তো পদ্মা সেতু বা জিএসপি নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেননি। কিন্তু তিনি তো চাইলে এ দুটি ব্যাপারে তার মার্কিন বন্ধুদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারতেন। আমি বিশ্বাস করি, ড. ইউনূস চাইলে এ দুটি সিদ্ধান্তই বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে পারতেন। পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গেলে বা জিএসপি স্থগিত করলে, যতটা না আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় তারচেয়ে অনেক বেশি। দেশটা তো আর আওয়ামী লীগের একার নয়। সম্প্রতি গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের একটি অপ্রকাশিত সুপারিশকে ঘিড়ে আবার আলোচনায় আসেন ড. ইউনূস। কমিশন নাকি গ্রামীণ ব্যাংককে ভাঙ্গার সুপারিশ করছে- এমন একটি সংবাদকে ঘিড়েই আলোচনার ঝড়। যদিও সরকার বলে দিয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু আলোচনা থামেনি। ড. ইউনূসও গ্রামীণ ব্যাংককে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়ে রীতিমত জেহাদ ঘোষণা করে মাঠে নেমেছেন। আর হঠাৎ করেই বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন কেবলা হয়ে উঠেছে মিরপুরের ইউনূস সেন্টার। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সেখানে গিয়ে তার প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন, ছুটে যাচ্ছেন পেশাজীবীরাও। আগে ড. ইউনূস বাংলাদেশবিমুখ ছিলেন।

বাংলাদেশে কোনো সভা-সেমিনার-বক্তৃতায় দুর্লভ ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তার বক্তৃতার অনুবাদ করতো। কিন্তু ইদানিং তিনি বেশ জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছে, খুবই সরব আর সক্রিয়। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোখাও বক্তৃতা দিচ্ছেন। মার্কিনরা যে বক্তৃতা ডলার দিয়ে শোনে, আমরা সেটা শুনতে পাচ্ছি মুফতে। এটা ছাড়া তার এই সাম্প্রতিক অতি তৎপরতায় আর কোনো লাভ হচ্ছে না। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে যেন বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন পীর ড. ইউনূস। আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসার শিকার একজন ব্যক্তির পাশে বিএনপিকে দাড়াতে দেখলে ভালোই লাগে। কিন্তু যার পাশে দাড়াচ্ছেন, তার কেমন লাগে? খুব জানতে ইচ্ছা করে। চুন খেয়ে মুখ পোড়ানো ড. ইউনূস বলে দিয়েছেন, তিনি আর রাজনীতি করবেন না। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে তার মাখামাখি দেখে ভ্রম জাগে রাজনীতি করা কাকে বলে? ড. ইউনূসের প্রতি আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসা দেখে যেমন আমার খারাপ লেগেছে, তেমনি তার প্রতি বিএনপির অতি প্রেম দেখতেও অস্বস্তি লাগছে। ড. ইউনূস তো আওয়ামী লীগের শত্র“ বা বিএনপির বন্ধু নন, তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। তিনি তো নিজেকে সবকিছুর উর্ধ্বে রাখবেন, তিনি হবেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। আওয়ামী লীগ তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন বলেই তাকে বিএনপির আশ্রয়ে যেতে হবে। বিএনপি নেতাদের প্রতি আমার দুটি আমার দুটি প্রশ্ন। তারা ক্ষমতায় গেলে কি প্রতিশ্র“তিমত ৭৩ বছর বয়সী ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি ফিরিয়ে দেবেন? সেটা করতে হলে কিন্তু আইন পাল্টাতে হবে। একজন ব্যক্তির জন্য আইন পাল্টানোটা কিন্তু ভালো দৃষ্টান্ত নয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের জন্য আইন পাল্টাতে হয়েছিল। কিন্তু সেটাও সমালোচনার উর্ধ্বে থাকেনি। অনেকেই বলেন, সবার জন্য না হলেও ড. ইউনূসের মত ব্যক্তির জন্য আইন বদলানো যেতে পারে, কারণ তিনি না থাকলে গ্রামীণ ব্যাংক থাকবে না। কিন্তু ড. ইউনূসকে ছাড়াও কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক ভালোই চলছে। আর ড. ইউনূস না থাকলে গ্রামীণ ব্যাংক থাকবে না, এটা কিন্তু তার জন্যই অবমাননাকর। নোবেল বিজয়ী একটি প্রতিষ্ঠানের তো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ার কথা নয়। যেই থাকুক, প্রতিষ্ঠান থাকবেÑ এটাই তো হওয়ার কথা। আর সবাই চাইলেও তো পট্রকৃতির নিয়মেই ড. ইউনূস অনন্তকাল গ্রামীণ ব্যাংক আগলে রাখতে পারবেন না। ড. ইউনূসের কথা মানলে বলতে হয়, তিনি বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে গ্রামীণ ব্যাংক। বিএনপি নেতাদের প্রতি আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, সরকারের প্রতিহিংসার শিকার ড. ইউনূসের পাশে দাড়িয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু এই সরকারের প্রতিহিংসার শিকার লিমনের পাশে আপনারা দাড়াচ্ছেন না কেন? আইনের মারপ্যাচে ড. ইউনূস তার গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ‘পদ’টি হারিয়েছেন। র‌্যাবের গুলিতে নিরীহ কলেজছাত্র লিমনও তো তার ডান ‘পদ’টি হারিয়েছেন। ড. ইউনূসের দেশে-বিদেশে অনেক বন্ধু আছেন। কিন্তু অসহায় লিমনের তো কেউ নেই। সহায়তা তো তার বেশি দরকার। বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন পীর ড. ইউনূস আগামী দিনগুলোতে কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য সাগ্রহে বসে রইলাম।

এবার আসি আরেক পীর এরশাদ প্রসঙ্গে। এরশাদ অবশ্য শুধু পীর নয়, পীরে কামেল। তার মাঝে কিছু আধ্যাত্মিক শক্তির প্রমাণ আমরা ২৫ বছর আগেই পেয়েছি। ক্ষমতায় থাকতে এই ‘ভন্ড’ পীর হুটহাট কোনো মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে বলতেন, কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি এই মসজিদে নামাজ পড়ছি। এই স্বাপ্নিক পুরুষ মসজিদে দাড়িয়ে অবলীলায় মিথ্যা কথা বলতেন। কারণ এলাকাবাসী জানতেন, এরশাদ কাল রাতে যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে ১০ দিন ধরে সেই মসজিদ পাহারা দিচ্ছে নিরাপত্তা কর্মীরা। লাম্পট্যের জন্য বিশ্ব খেতাবের দাবিদার এরশাদ যখন হেফাজতের পাশে দাড়ান তখন হেফাজতের দাবির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ৯০এর ৬ ডিসেম্বর যখন এরশাদ গণঅভ্যূত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন, তখন মনে হয়েছিল অন্তত বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কখনো এই বিশ্ব বেহায়ার ঠাঁই হবে না। কিন্তু বিএনপির প্রথম আমলটা কারাগারে থেকেই যেন সব প্রায়শ্চিত হয়ে গেছে নয় বছর বাংলাদেশের ঘাড়ে সিন্দাবাদের মত চেপে থাকা এই স্বৈরাচারের। তারপর থেকে একবার আওয়ামী লীগ, একবার বিএনপিÑ এইভাবেই চলছে এরশাদের মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা। আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার রাজনীতির লোভে এরশাদ এখন রীতিমত পীরে কামেল। জাতীয় পার্টি বর্তমান মহাজোটের অংশীদার হলেও তেমন কিছু পাননি এরশাদ। এমনকি সরকার তাকে পাত্তাও দেয়নি। গত ১৫ জুন চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভরাডুবির পর কিছুটা টনক নড়ে সরকারি দলের। কিন্তু তারপরও গাজিপুর নির্বাচনের শুরুতে এরশাদকে আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগ। কিন্তু যখন পত্রিকায় এলো জাতীয় পার্টি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে, তখনই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় সরকারি দলের। মন্ত্রিসভার দুই সদস্য ওবায়দুল কাদের আর জাহাঙ্গীর কবির নানক ছুটে যান তার বাসায়। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয় এরশাদের। এরশাদ আসলে এটাই চাইছিলেন, একটু গুরুত্ব। দলগুলোর ক্ষমতার লোভ তাকে সেটা দিয়েছে। গাজীপুরের আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী আজমতউল্লাহ খান দোয়া চাইতে ছুটে যান এরশাদের বাসায়। এরশাদ তাকে দোয়া করে দেন। পরদিন ছুটে যান বিএনপি সমর্থিত এম এ মান্নান। এরশাদ তাকেও দোয়া করেন। এরশাদ যেন দোয়ার ভান্ডার খুলে বসেছেন। মানুষ দোয়া চাইতে যায় পীরের কাছে। গাজীপুরের প্রার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন এরশাদের কাছে। গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে এরশাদ যা করলেন, এটাই তার এবং জাতীয় পার্টির রাজনীতির আসল চেহারা। সকালে এক কথা তো বিকালে আরেক কথা। দুই প্রার্থীকে দোয়া করার পরদিন বিবৃতি দিয়ে জানালো হলো, যেহেতু এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন, তাই জাতীয় পার্টি কাউকে সমর্থন দিচ্ছে না। পরদিন দুপুরে এরশাদ আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে তার সমর্থন ঘোষণা করেন। এত চেষ্টা করে শেষ মূহুর্তে এরশাদ সমর্থন নিয়েও গাজীপুরের পুরোনো দূর্গ রক্ষা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। আবারও প্রমাণ হয়েছে, এরশাদ যার বন্ধু, তার শত্র“র দরকার নেই।

একটা জিনিস পরিস্কার এরশাদের আসলে কোনো নীতি নেই। তার নীতি একটাই নিজেকে নিরাপদ রাখা। বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজে ব্ল্যাকমেইল করা যায় এরশাদকে। খালি বললেই হলো, অমুক মামলা চাঙা হলো বলে। ব্যস সব বিপ্লব শেষ, সুরসুর করে খোয়াড়ে ঢুকে যাবে এরশাদ। পাঁচ বছর কারাগারে থেকে এরশাদ এখন কারাগারকে সাংঘাতিক ভয় পান। তাই কারাগারে যেতে হবে না, এটা নিশ্চিত করতে যা যা দরকার সব করেন তিনি। এই বিশ্ব বেহায়া নয় বছর গোটা বাংলাদেশকে জিম্মি করে রেখেছিল। আর এখন রীতিমত তুড়ি মেরেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে এরশাদকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। হায়, আমরা কী তবে ভুল আন্দোলনে আমাদের যৌবন ব্যয় করেছি, নাকি রাজনীতিবিদরা আমাদের আন্দোলনের ফসল গণতন্ত্রকে ভুলভাবে ব্যবহার করছেন। আমি খুব আশাবাদী মানুষ। সব সময়ই সব খারাপের মধ্যেই একটা কিছু ভালো বের করে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি। তাই যখন দেখি এরশাদকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে, তখন খারাপ লাগে না।

এরশাদ না হয়, নিজেকে নিরাপদ রাখতে লাঙ্গল দিয়ে একবার ধানের শীষ চাষ করেন, একবার নৌকায় চড়ে বসেন। এরশাদ না হয় নীতিহীন। কিন্তু আমাদের প্রধান দুই দল কতটা নীতিবান। আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেয় বলেই তো এরশাদ আজো রাজনৈতিক শক্তি। ৯০এর চেতনায় যদি দুই দল বয়কট করতো, তাহলে এরশাদকে এতদিনে রংপুরে ঠাঁই নিতো হতো। এরশাদ বিরোধী দুই সৈনিক এম এ মান্নান আর আজমতউল্লা বলেছেন, প্রেক্ষাপট বদলে গেছে বলেই তারা এরশাদের কাছে গিয়েছেন। হায় রাজনীতি! দেশের মানুষের ভাগ্য বদলায় না, খালি রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যায়। রাজনীতির এই নীতিহীনতার আসলে কোনো শেষ নেই। আজ যে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, সেই আওয়ামী লীগই জামায়াতে ইসলামীকে পাশে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দোয়া নিতে ছুটে যান গোলাম আযমের বাসায়।

বলছিলাম রাজনীতির নতুন দুই পীরের কথা। আমি নিশ্চিত বলে দিতে পারি আবার বদলে যাবে এই পীর, এই কেবলা। রাজনীতি এমনই, আসলে রাজনীতিরই কোনো নীতি নেই।

প্রভাষ আমিন, এডিটর, নিউজ এন্ড কারেন্ট এফেয়ার্স,এটিএন নিউজ
৭ জুলাই, ২০১৩
probhash2000@gmail.com