বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে একটা দূরত্ব দেখতে চান ।। আলী রীয়াজ
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক আজকালের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাউসার মুমিন , শুক্রবার, জুন ১৪, ২০১৩


কাউসার মুমিন: প্রফেসর আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ে স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ের তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় ইসলামী উগ্রপন্থীদের ভূমিকা নিয়ে তিনি বিস্তর গবেষণা করেছেন। যে কোনো একাডেমিক আলোচনায় বস্তুনিষ্ঠতা ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনার বাইরেও আলোচ্য বিষয়বস্তুর প্রতি তাঁর দরদ অনুসন্ধিৎসু শ্রোতাকে উদ্দীপ্ত করে।। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব এবং রাজনৈতিক ইসলামের ভবিষ্যত বিষয়ে সম্প্রতি নিউইয়র্কে একটি সেমিনারে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে তিনি লিখেছেন, কথা বলেছেন। এরই সূত্র ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের অবস্থান নির্ধারণে একটি সিরিয়াস আলোচনা শুরুর প্রয়াসে সাপ্তাহিক আজকালের পক্ষ থেকে কথা হয় প্রফেসর আলী রীয়াজের সাথে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি নিউইয়র্কে একটি সেমিনারে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর ফলে ভবিষ্যত রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে আপনি কথা বলেছেন। নিউইয়র্কের সেমিনারে আপনার বক্তব্যে আপনি অনেক জোর দিয়ে বলেছেন 'বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের অবস্থান' নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ে একাডেমিক আলোচনা খুব একটা হয়নি। এই আলোচনা খুব শীঘ্রই শুরু হওয়া জরুরী এবং তা করতে হবে এখনি। এই যে আলোচনা শুরু করতে দেরী, এর পিছনে কি কি কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন। এখন আলোচনার শুরুটা কিভাবে হতে পারে, এই কাজে মূল উদ্যোগটা কার নেওয়া উচিত। আলোচনায় কোন কোন বিষয় স্পষ্ট হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

প্রফেসর আলী রীয়াজ : রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে যে দ্বিধা আমরা দেখতে পাই তার বিভিন্ন কারণ রয়েছে; তার মধ্যে যেগুলো সহজেই শনাক্ত করা যায় তা হল ধর্ম বিষয়ে জানা, চর্চা ও গবেষণার অভাব; সমাজে ধর্ম বিষয়ে অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা; ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক যে পূর্বনির্ধারিত বা একমুখী নয় সেটা স্বীকার করার মতো মনোভাবের অভাব; এবং ধর্মকে যারা রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চান তাঁদের বাধা। ‘ধর্মকে যারা হাতিয়ার করেন’ বলতে আমি কেবল ধর্মভিত্তিক দলের কথা বোঝাচ্ছি না, যারা আপাতদৃষ্টে ধর্মভিত্তিক দল নয় তাঁরাও অংশত এই কাতারে অন্তর্ভুক্ত। লক্ষ্য করলে দেখবেন যারা ধর্মকে তাঁদের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে দাবি করেন তাঁরাও ধর্ম বিষয়ে আপনার কোনো বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য মনে করলে তার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করার চেয়ে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বলে বর্ণনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সমাজে সহনশীলতার অভাব থাকলে যে কোনো বিষয়েই আলোচনা করা দুরূহ- বাংলাদেশের সমাজে সহনশীলতার অভাব তো সহজেই দেখা যায়। আরেকটা দিক হল ধর্ম বিষয়ে আক্রমণাত্মক মনোভঙ্গি পোষণ করা। অজ্ঞতাবশতই হোক কিংবা ভিন্নমতের কারণেই হোক, কারো কারো মধ্যে এই মনোভাব রয়েছে। এখন আলোচনার কাজটা শুরু করতে চাইলে আপনাকে খোলামেলা কথা বলার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ধরণের আলোচনার গোড়াতে কিছু অতিরঞ্জন ঘটতে পারে, ভুল ভ্রান্তি হতে পারে। সবাইকেই মেনে নিতে হবে যে আমরা ইতিহাস ও রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলছি, অতএব আপনার এবং আমার দেখবার দৃষ্টিভঙ্গি এক হবে না। তার মানে এই নয় যে কিছু বিষয়ে আমাদের একমত হতেই হবে, তার মানে এই নয় যে একেবারে মৌলিক বিষয়ে আমাদের দ্বি-মত থাকতে পারবে না। এ বিষয়ে ঘটা করে প্রাতিষ্ঠানিক উদযোগের অবকাশ কতটা আছে সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। তবে যারা জ্ঞান চর্চা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত তাঁদেরকে এগিয়ে আসতে হবে, সেটা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে পারে, গণমাধ্যম হতে পারে, সামাজিক সংগঠন হতে পারে। ছোট ছোট আকারের আলোচনায়ও এই কাজ শুরু করা, অব্যাহত রাখা দরকার। কী কী বিষয় নিয়ে কথা হবে তার কোনো এজেন্ডা আগে থেকে তৈরি করা যাবে না। এক অর্থে আমাদের এই কথাবার্তাও সেই আলোচনারই অংশ বলতে পারেন।

প্রশ্ন: বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রসারে যুক্তরাষ্ট্রের ডাবল-স্ট্যান্ডারড নীতি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা রয়েছে। নিউইয়র্কের সেমিনারে আপনিও বলেছেন, গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বেশ শক্তি সঞ্চয় করেছে। আর এর পিছনে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী বিশেষ করে গণতন্ত্র প্রসারে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বি-মুখী নীতি দায়ী। আপনি কি এই বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলবেন?

প্রফেসর আলী রীয়াজ : আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহ বলতে আমি বোঝাতে চাই সারা দুনিয়ায় কী ঘটছে, গত কয়েক দশকে কী ঘটেছে। আপনি দেখবেন যে ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পেছনে কাজ করেছে তার আগে সেই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যাঁদের সমর্থন যুগিয়েছে তার পরিণাম শেষ পর্যন্ত তালেবান তৈরির কাজে সহযোগিতা করেছে, আল-কায়েদার উৎস যে আফগান যুদ্ধের ভেতরে তাতো নতুন করে বলার নেই। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি যেভাবে ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে ভারসাম্যহীন হয়েছে তাতে করে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীরাই কেবল অন্যায়, অবিচারের সম্মুখীন হয়েছে তা নয়; সারা পৃথিবীতেই তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এই ধরণের বৈধ ক্ষোভকে ইসলামপন্থীরা কাজে লাগাতে পেরেছে। তাছাড়া আমরা দেখেছি যে বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা শক্তি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন যুগিয়েছে, যার ফলে গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঘটেনি। অন্যদিকে সেই সুযোগে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হয়েছে এবং তাঁদের বিস্তারকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে অগণতান্ত্রিক শাসনকে বহাল রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে যে সব কর্মকান্ড চালানো হয়েছে তাও দীর্ঘমেয়াদে শান্তি, স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্যে ক্ষতিকর হয়েছে। এগুলোকে কোনো অবস্থাতেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, আমি আমার বক্তব্যে সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: একটি ইসলামী আন্দোলনে মূলত কি কি উপাদান থাকে? রাজনৈতিক ইসলামের সাথে মূল ইসলাম কিংবা ইসলামী আন্দোলনের পার্থক্যটা কোন জায়গায়? বাংলাদেশের হেফাজতে ইসলামকে কি রাজনৈতিক দল বলা যেতে পারে? আপনার মতে জামায়াতে ইসলামের সাথে হেফাজতে ইসলামের মিল অমিল কোন জায়গায়? হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফাদাবীর কোন কোন দাবীগুলো আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। তুরস্ক, মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী আন্দোলন বা ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচীর সাথে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী কিংবা হেফাজতে ইসলামের দাবী দাওয়ার মিল অমিল সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

প্রফেসর আলী রীয়াজ : ইসলামী আন্দোলন যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের চেয়ে তেমন আলাদা কিছু নয়। তার দরকার হয় একটি আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব। যে কোনো আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে জনগণের মধ্যে তার আবেদন সৃষ্টি করতে পারছে কিনা, তাকে মবিলাইজ করতে পারছে কিনা। ‘মূল ইসলাম’ বা ‘সেকেন্ডারি ইসলাম’ বলে কিছু নেই। যে কোনো ধর্মের ক্ষেত্রেই যেটা হয় তা হলো তা কতকগুলো মৌলিক বিষয়ে সর্বত্র এক হলেও সমাজ ও সময় ভেদে তার বিভিন্ন রকমের প্রকাশ ঘটে; তার বিধানের ভিন্নতা থাকে। যেমন ধরুন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশে প্রচলিত অনেক ইসলামি আচার ইন্দোনেশিয়ায় প্রচলিত নয় বা দক্ষিণ এশিয়ায় তার কোনো প্রভাব নেই। তাতে করে আমরা একটাকে অন্যটার চেয়ে কম ইসলামী বলে বর্ণনা করতে পারবো না। ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে ইসলাম এবং রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ইসলাম দুটো আলাদা পরিসরের বিষয়। যারা ইসলাম ও রাজনীতির সংমিশ্রণ ঘটান তাঁদেরকে প্রচলিত অর্থে ইসলামপন্থী বা ইসলামিস্ট বলে বর্ণনা করা হয়, বোঝানো হয়। ইসলামপন্থী রাজনীতিকে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বলেও বর্ণনা করা হয়। ইসলামপন্থী রাজনীতি বলতে আমি সেই রাজনৈতিক আদর্শগুলো এবং আন্দোলনসমূহকেই বোঝাই যারা ইসলামকে কেবল একটি ধর্ম হিসেবে বিবেচনা কওে না; মনে করে যে এটি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এবং ইসলামের শিক্ষা সমাজের সর্বস্তরে, এমনকি আইন প্রণয়নেও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। রাজনৈতিক ইসলামের প্রধান বিষয় হল যে এটি একটি রাজনৈতিক আদর্শ, আর দশটা রাজনৈতিক আদর্শের মতোই। রাজনৈতিক ইসলামের প্রধান বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনার, সমাজে তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের প্রশ্ন। তাঁদের কাছে ব্যক্তির আধ্যাত্মিক মুক্তির বিষয়টি হচ্ছে আনুষঙ্গিক বা সেকেন্ডারি বিষয়। যে কোনো একনিষ্ঠ মুসলিম চাইবেন ইসলাম তার জীবনের নৈতিক কম্পাস হিসেবে কাজ করুক, তার ব্যক্তিগত মোক্ষ বা স্যালভেশন হিসেবে কাজ করুক। কিন্ত ইসলামপন্থীদের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সেটা ধর্মরাষ্ট্র হোক, খিলাফত হোক, আমিরাত হোক। ইসলামপন্থীরা তাঁদের রাজনৈতিক দীক্ষাগুরুদের দেওয়া কোরান ও হাদিসের ব্যাখ্যাগুলোকেই গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেন এবং সেগুলোকে সে ভাবেই বাস্তবায়নে আগ্রহী। এই দীক্ষাগুরু মধ্যে আছেন সৈয়দ কুতুব, আয়াতুল্লাহ খোমেনি, আবুল আলা মওদুদি, হাসান তুরাবি।

হেফাজতে ইসলামকে আমি রাজনৈতিক মোর্চা বলেই মনে করি। যে অর্থে এক সময় ইসলামী ঐক্য জোট গড়ে উঠেছিল সেই একই রকম রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েই হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে। মোর্চা হিসেবে এদের লক্ষ্য রাজনৈতিক। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হেফাজতের আদর্শিক পার্থক্য বুঝতে হলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। (আমি এ বিষয়ে প্রথম আলো’তে ৪, ৫ ও ৬ মে ২০১৩ প্রকাশিত ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ক তিনপর্বের নিবন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি; তাই সংক্ষেপে বলি)। হেফাজত প্রতিনিধিত্ব করে সেই ধারাটি যারা এক অর্থে হাজী শরিয়তউল্লাহ্ ও দুদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ফারায়েজি আন্দোলন এবং তিতুমীরের রাজনীতির উত্তরাধিকার। আর অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তৈরি হয়েছে ১৯৪১ সালের পরে মওদুদির রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপরে ভিত্তি করে। তাঁদের সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক কৌশল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা ভিন্ন। মিলের জায়গাটা হল উভয় দলই কোনো না কোনো ভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাঁরা মনে করে যে শ’রিয়া হবে আইনের ভিত্তি। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন তাঁরা কাছাকাছি এসেছে। কেননা জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের দাবিকে হেফাজতের নেতৃবৃন্দ দেখছেন ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্যে চ্যালেঞ্জ বলে। এখন তাঁদের আশংকা যে একবার জামায়াত নিষিদ্ধ করা গেলে তাঁদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ হবে। তাঁরা চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে, ফলে তাঁরা মনে করছে এই জায়গায় জামায়াতের পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। পাশাপাশি তাঁরা সম্ভবত এই সুযোগে তাঁদেরকে রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী একটা বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছেন, যাতে করে প্রয়োজনে এবং সুযোগ তৈরি হলে তাঁরা ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রধান প্রতিনিধিত্বের জায়গায় দাঁড়াতে পারেন। এই চেষ্টা তাঁরা আগেও করেছেন কিন্ত এবার দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে (প্রধানত নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে) তাঁদের এই চেষ্টা অনেক বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অন্য দিকে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ হেফাজতকে সমর্থন ও সাহায্য করছে কেননা এই মুহূর্তে তাঁরা যে বিরূপ অবস্থায় আছেন সেখানে হেফাজতের শক্তি বৃদ্ধি তাঁদের জন্যে ইতিবাচক। তাঁরা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন।

হেফাজতের ১৩ দফার সঙ্গে বর্তমান সংবিধানের সাংঘর্ষিক অবস্থান ধারাওয়ারিভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে যে সময় ও জায়গা দরকার তা এই ক্ষেত্রে নেই। এ বিষয়ে দেশের আইন মন্ত্রণালয়ের একটা ব্যাখ্যার কথা আমরা জানি। কিন্ত আমি একে দেখি এর স্পিরিটের দিক থেকে। হেফাজতের দাবিতে সংবিধানের মূল যে ভিত্তি তা বদলাবার দাবি তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের অন্তর্ভুক্তি সংবিধানের সেক্যুলার চরিত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এর সঙ্গে হেফাজতের দাবি মানার অর্থ হবে ইসলামীকরণের পথে এগিয়ে যাওয়া। তা ছাড়া তাঁদের দাবিতে দেশের প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ব্যাপারে যে সব আপত্তি তোলা হয়েছে তাতে বাঙ্গালি সংস্কৃতির প্রতিই যে কেবল বিরাগ প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, আমি এর মধ্যে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদিতার ধারার বিরোধিতাও দেখতে পাই।

প্রশ্ন: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বেশীরভাগ মানুষের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার কথা। এই হিসেবে বাংলাদেশে বেশীরভাগ মানুষের ধর্ম বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটিয়ে যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র সেক্যুলার থাকবে কি? আপনি বলেছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মোকাবেলার একমাত্র কার্যকর উপায়। এই ক্ষেত্রে আপনি কি আমাদের বলবেন, ধর্ম হিসেবে ইসলাম এবং গণতন্ত্র পরস্পরের কতটা পরিপূরক? একটি ইসলামিক রাষ্ট্র কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পারে? অথবা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলো ধারণ করে গড়ে উঠতে পারে?

প্রফেসর আলী রীয়াজ : আপনার প্রশ্নের ভেতরে একটা অনুমান রয়েছে যেটা প্রথমেই স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। আপনি ধরে নিচ্ছেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে চান এবং তাঁরা রাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্রের সঙ্গে একমত নয়। আমি আপনার এই অনুমানের সঙ্গে একমত নই। বাংলাদেশে গত চারটি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে, ক্ষমতার হাত বদল ঘটেছে। এই সব নির্বাচনে ভোটারদের সামনে ইসলামপন্থী দলগুলো তাঁদের কর্মসূচি উপস্থাপন করেছে এবং তাঁদের সমর্থন চেয়েছে। দলগুলো বলেছে যে তাঁরা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে, শরিয়া আইন চালু করবে, তাঁদের ভাষায় আল্লাহর আইন চালু করবে । কিন্ত ভোটাররেদের এক সামান্য অংশই তাঁদের সমর্থন করেছে। তার মানে যে এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখতে চান না। আগামীতে কি হবে সেটা আমার পক্ষে বলা অসম্ভব, কিন্ত আপনি যদি ১৯৫৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল দেখেন তবে এই রকম মনে করার কারণ দেখি না। অন্য দেশের অভিজ্ঞতাও কিন্তু বলে না যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সব সময়ই তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে ভোট দিয়েছে বা নেতৃত্ব নির্বাচন করেছে । ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো রকম বিরোধ আছে কিনা সে বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়েছে। এক সময় বলা হতো ইসলাম এবং গণতন্ত্র সহাবস্থান করতে পারেনা; গত কয়েক দশকের গবেষণায় অনেকেই দেখিয়েছেন যে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু আপনি যখন বলেন ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ তখন প্রশ্নটি অন্য রূপ নেয়। আমি মনে করি যে, যদি কোনো রাষ্ট্র কোনো ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হয়, পরিচালিত হয় তবে তার গণতান্ত্রিক উপাদান বিঘ্নিত হয়। গণতন্ত্রের একটা বড় দিক হল তা সবাইকে সমান চোখে দেখার অঙ্গিকার করে; ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নাগরিকের সমতার ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে বলে আমি মনে করি না।

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসকে ধারন করে কোনো রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে কিনা সেটা নির্ভর করবে ‘মৌলিক বিশ্বাস’ বলতে আপনি কোন বিষয়গুলোর ওপরে আলোকপাত করছেন তার ওপরে। আপনি দেখবেন, যে কোনো ধর্মেরই যে ধর্মগ্রন্থ রয়েছে তা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। একজন আলেম যেভাবে ব্যাখ্যা করেন, আরেকজন আলেম তার ভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিতেই পারেন। তা ছাড়া আমরা এও জানি যে অনেক ইসলামী ধর্মতত্ত্ব¡বিদ মনে করেন যে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সিভিল সংগঠনের ব্যাপারে ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। মিসরের বিশিষ্ট ধর্মতত্ত্ববিদ আলী আব্দেল রাজিক ১৯২৫ সালে প্রকাশিত তার বই ‘আল ইসলাম ওয়া উসুল আল হুক্ম্’ (ইসলাম ও শাসনের ভিত্তি)-এ খেলাফত বিষয়ক আলোচনায় স্পষ্ট করেই বলেছেন যে রাষ্ট্র বা শাসনের ধরন কেমন হবে এ বিষয়ে ইসলামের কোনো নির্দেশ নেই।

প্রশ্ন : সেক্যুলারিজম আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।পাকিস্তান রাষ্ট্র-কাঠামোয় ধর্মের নামে বাঙালীকে শোষণ করা হয়েছিলো। এমনকি একাত্তরে বাঙালী নিধনেও ধর্মের দোহাই দেওয়া হয়েছিলো। তাই সংবিধান প্রণয়নের সময় তৎকালীন বাস্তবতায় নতুন গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাভাবিকভাবেই সেক্যুলারিজম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই সামাজিক বাস্তবতার প্রয়োজনে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বহাল থাকার পরও খুব দ্রুতই আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়েছে।এ বিষয়টিকে প্রফেসর তালুকদার মনিরুজ্জামান তার 'Bangladesh Politics: Islamic and Secular Trends' প্রবন্ধে উল্লেখ করে বলেছেন, 'Secularism in Bangladesh did not reflect its societal spirit' এ বিষয়ে প্রফেসর আমেনা মহসিন তাঁর 'Religion, Politics and Security: The Case of Bangladesh" শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন,'পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে ভাষা ও সংস্কৃতি বাঙালীর জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই জাতীয় পরিচয় হিসেবে মুসলিম আইডেন্টিটি আবার সামনে চলে আসে।' আপনি নিজেও বলেছেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব প্রত্যেক সরকারের সময়েই ক্রমাগত ভাবে বেড়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে শাসক গোষ্ঠী তা করতে বাধ্য হয়েছেন।এর ফলে কি আমরা মনে করতে পারি যে, আমাদের জাতীয় মানস গঠন ধর্মনিরিপেক্ষ মূল্যবোধকে ঠিক গ্রহণ করতে পারছে না। জনগণের আকাক্সক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই কি রাষ্ট্রীয় জীবনে বারবার বিভিন্ন ভাবে ধর্মের প্রভাব মেনে নিতে হচ্ছে ? এটা কি অগণতান্ত্রিক?

প্রফেসর আলী রীয়াজ : ‘ধর্মনিরেপক্ষতা’ কথাটা আমরা সাধারণত সেক্যুলারিজম অর্থে ব্যবহার করি। কিন্ত আমার মনে হয় না সেটা খুব সঠিক। সেক্যুলারিজম যার সঙ্গে জড়িত তা হল সেক্যুলারাইজেশন প্রক্রিয়া; বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ার কোনো চর্চা এখনও হয়নি। অন্যান্য দেশেও এটা গড়ে উঠেছে সমাজে সেক্যুলার চিন্তা ভাবনার দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে সেটা হয় নি। উপরন্তু সেক্যুলারিজম বলতে আমরা এক ধরণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বুঝেছি। ফলে স্বাধীনতার পর সেভাবেই চেষ্টা হয়েছে, সেটা সফল হয়নি। সফল না হওয়ার কারণ বাংলাদেশের মানুষের ‘আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে দ্বিধা’ বলে যারা মনে করেন তাঁদের মধ্যে তালুকদার মনিরুজ্জামান একজন। আমি তার সঙ্গে একমত নই। ( এ বিষয়ে ২০০৪ সালে প্রকাশিত আমার বই ‘গড ইউলিং: পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’-এ বিস্তারিত রয়েছে)। আমার মনে হয় যে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী আদর্শিকভাবে তাঁদের আধিপত্য বা হেজিমনি তৈরি করতে পারেন নি বলে এটার সূচনা হয়েছিল। তারপরে ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ধর্মের বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে বিষয়টি সামনে এসেছে। তাই এটা জনগণের আকাংখ্যার প্রতিফলন বলা ঠিক হবে না। আমি আগেও বলেছি যে নির্বাচনে বলুন, সাংগঠনিকভাবে বলুন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমর্থন কম। অন্য দিকে বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে একটা দূরত্ব দেখতে চান বলেই পাকিস্তান আমলে ‘ইসলাম গেলো’ চিৎকারে যোগ দেয়নি, বা ‘পাকিস্তানের বিরোধিতা ইসলামের বিরোধিতা’ বলে যে সব প্রচারণা তাতে আমলে নেয় নি। এখানে সমাজে ধর্মের উপস্থিতির সঙ্গে, সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতির সঙ্গে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাবের, রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের প্রভাবের পার্থক্যটা মনে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদ দমনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবেদন ২০১২। ইসলামী জঙ্গী দমনে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের যথেষ্ট নজরদারী, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরো শক্তিশালী করা ইত্যাদি বিষয় ইসলামী জঙ্গী দমনে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদের উত্থান বিষয়টিকে আপনি কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন? এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পার্টনারর্শীপ আর কি কি ক্ষেত্রে বাড়ানো যেতে পারে বলে আপনার পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়।

প্রফেসর আলী রীয়াজ : বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিকাশের সম্ভাবনা সব সময়ই খুব সীমিত, যদিও বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে এটা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল যা সবাইকেই শংকিত করার মতো। তবে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জঙ্গিবাদ সাধারণ মানুষের সমর্থন পায় নি। সেটা অবশ্য ধর্মভিত্তিক জঙ্গিবাদের জন্যে যেমন প্রযোজ্য তেমনি বামপন্থী জঙ্গিবাদের জন্যেও, সেটা অতীতেও দেখা গেছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য না পেলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ টিকতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। দেশে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপগুলো শুরু হয় ২০০৭ সালে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সেই প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখার নীতি নেওয়ায় এটাতে সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এটা নিশ্চয় ইতিবাচক। তবে কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টের বিশ্লেষণে যেগুলো বলা হয়েছে সবগুলোর সঙ্গে আমি একমত নই। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনের বিষয়টি কোনো দেশের পক্ষেই এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যে জঙ্গিবাদের বিকাশে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনা ও শক্তির প্রভাব রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে যতদূর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়া যায় ততটাই ভালো। তবে যে সব বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার তা হলো - জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার নিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাতে অনুকূল না হয় তার ব্যবস্থা করা।

প্রশ্ন: ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ বর্তমান সরকারের ৪ বছরপূর্তি উপলক্ষে সরকারের এ সময়ের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করে বলেছেন, 'সরকারের কুটনৈতিক তৎপরতায় বৈচিত্র ছিলো না, অতিমাত্রায় একদেশ (ভারত) কেন্দ্রিক' ছিলো সার্বিক কুটনৈতিক কার্যক্রম। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন সন্ত্রাস বিরোধী প্রতিবেদনেও কোনো রাখঢাক না রেখেই, 'বর্তমান বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতি অত্যধিক ভারত প্রভাবিত' বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এর সুবিধা অসুবিধা নিয়ে কিছু বলুন ? বর্তমান সরকারের বিদেশনীতি নিয়ে আপনার একটা মূল্যায়ন শুনতে চাই।

প্রফেসর আলী রীয়াজ : ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশি; বাংলাদেশ কার্যত ভারত-বেষ্টিত। এ কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত গুরুত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত গত চার বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অসমতা কেবল চোখে পড়ার মতোই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিকূলেই গেছে। এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। এটা দীর্ঘ মেয়াদে কেবল বাংলাদেশের জন্যেই ক্ষতিকর নয়, ভারতের জন্যেও তা ক্ষতিকর। আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই ধরনের অসম সম্পর্কের পরিণতি ভালো হয় না। বাংলাদেশের বৈধ দাবিগুলো বিবেচনা করার ক্ষেত্রে ভারত কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নেয় নি। পানি বন্টনের বিষয় থেকে শুরু করে সীমানা নির্ধারণ, কিংবা সীমান্তে নির্বিচার হত্যার ঘটনা বিষয়ে ভারত সরকারের অবহেলা অগ্রহণযোগ্য, কিন্তু একভাবে বোধগম্য; কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর এবং বাংলাদেশের জন্যে ক্ষতিকারক। বাংলাদেশের ভারত-নির্ভর পররাষ্ট্র নীতির কারণে বাংলাদেশ তার ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাগুলো ব্যবহার করতে পারেনি। এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রেক্ষিতে এবং ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যে সব সুবিধা লাভ করতে পারতো সেটা অনেকাংশেই অবহেলিত হয়েছে, কেননা তাতে করে ভারতের সঙ্গে সম্পকের্র টানাপোড়েন তৈরির আশংকা ছিলো। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের সমস্যা আমরা লক্ষ্য করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একদিকে সহযোগিতা বেড়েছে তার প্রমাণ হল পার্টনারশিপ ডায়লগ, অন্যদিকে কিছু সমস্যাও দেখা গেছে যেমন বাংলাদেশের পণ্য রফতানীর ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের কথা উঠেছে। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির তদন্তের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা কোনো অবস্থাতেই ইতিবাচক হয়নি।