‘গণমাধ্যমে স্বেচ্ছাচারিতা' বন্ধে নীতিমালার প্রস্তাব, 'আমারদেশ'- অপরাধমূলক সাংবাদিকতা করেছে ।। মতামত বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকবৃন্দ
এইদেশ ডেস্ক, শুক্রবার, জুন ১৪, ২০১৩


বাংলাদেশে গণমাধ্যমে স্বাধীনতার নামে ‘অপসাংবাদিকতার’ মূল কারণ পেশাদারিত্বের অভাব। ফলে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে ঘটানো হচ্ছে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা। আর এ থেকে উত্তরণে দরকার সুস্পষ্ট নীতিমালা। শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘গণমাধ্যম: স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।


জার্নালিজম অ্যান্ড পিস ফাউন্ডেশন এই আলোচনার আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হারুন হাবীব। শুরুতে তিনি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরে গণমাধ্যমের সম্পাদক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আলোচনায় অংশ নেন।

জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গণমাধ্যমের অপব্যবহার করছে। সম্প্রতি গণমাধ্যম ব্যপক স্বাধীনতা ভোগ করায় ওই গোষ্ঠী পুনরায় সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।”
সুস্থ ধারার গণমাধ্যমের বিকাশের জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট সম্পাদক মাহবুবুল আলম বলেন, “উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে সাংবাদিকরা নিজেরাই কোড অব কনডাক্ট ঠিক করেছে। যা তারা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ। কেউ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। বাংলাদেশেও এমন হওয়া উচিত।”

“ফ্রিডম অব প্রেস মানে এই না যে যার যা খুশি তাই করবে। উস্কানি দিবে, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে। এজন্য সবাইকে বসে গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা ঠিক করা যেতে পারে।”

সদ্য গঠিত সম্পাদক ফোরাম এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।


তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই সাবেক উপদেষ্টা বলেন, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতন্ত্র, মানবাধিকার যেন লঙ্ঘন না করি সে বিষয়ে আমাদের একমত হতে হবে। সবাইকে মেনে নিতে হবে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়।”

ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, “এই মুহূর্তে গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে পেশাদারিত্ব। পেশাদারিত্ব না থাকার কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে অপসাংবাদিকতা, দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে। আর গণমাধ্যমের নতুন বাস্তবতা হচ্ছে পত্রিকা বা টেলিভিশনের মালিকানা। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীরা এর মালিক হচ্ছেন। এখন পত্রিকা হাতে নিলেই বোঝা যায় এটি কোন শিল্প বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর।”

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এটিএম সফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, “অনেক গণমাধ্যমই আছে যারা স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা করছে। বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে না। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সংবাদ প্রচার করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ থেকে গণমাধ্যমকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য সরকারেরও উচিত নীতিমালা করা।”

তবে শুধু সাংবাদিকদের মধ্যেই পেশাদারিত্বের অভাব মানতে রাজি নন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম।

তিনি বলেন, “দলবাজি করতে গিয়ে শুধু সাংবাদিক মহল নয়, সমাজের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ অনেকেই পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে সড়ে পড়ছে।”

অন্যদিকে খোদ সম্পাদকদের মধ্যে বিভেদের কথা বলেন বালাদেশ সংবাদ সংস্থার (বিএসএস) প্রধান সম্পাদক আজিজুল ইসলাম ভূইয়া।

“সদ্য গঠিত এডিটরস কাউন্সিল নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী নই। কারণ ১৬ জন এক পক্ষে বললো, আবার দেখলাম অন্য ২৩ জন্য অন্য পক্ষে বলছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, “পরমতসহিষ্ণুতা হচ্ছে বিউটি অব ডেমোক্রেসি। কিন্তু সেই মতামতেরও সীমা থাকা উচিত। স্বাধীনতাকে আমরা এমনভাবে ব্যবহার করছি যে তা অন্যায় হচ্ছে। স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে হবে। এজন্য দরকার হলে নীতিমালা করতে হবে।”

“মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতার নামে ধর্মীয় উন্মাদনা ও সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছেন। এটা অপরাধমূলক সাংবাদিকতা। এ ধরনের সাংবাদিকতা বন্ধ হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “দলীয় বিবেচনায় খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম পেশাদারিত্ব থেকে সড়ে যাচ্ছে। করপোরেট পুঁজির দাসত্ববরণে ছুটে চলেছে এ খাতটি।”

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ফেব্রুয়ারির শুরুতে শাহবাগে শুরু হওয়া আন্দোলন নিয়ে নানা ধরনের ‘উস্কানিমূলক’ সংবাদের শিরোনাম করে খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা মাহমুদুর সম্পাদিত আমার দেশ। অভিযোগ রয়েছে, হেফাজতে ইসলামের উত্থানের পেছনে ওই পত্রিকাটির ইন্ধন ছিল।

পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গত ১১ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয় পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। বন্ধ করে দেয়া হয় ছাপাখানা।


এছাড়া লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ ও দাঙ্গা লাগানোর মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করায় ৫ মে গভীর রাতে ‘সাময়িকভাবে’ বন্ধ করে দেয়া হয় দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার।

ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর বলেন, “পেশাদারিত্ব না থাকায় গণমাধ্যমে এই সংকট তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কী মালিকের স্বাধীনতা না সাংবাদিকের স্বাধীনতা তা স্পষ্ট নয়। সুস্থ ধারার গণমাধ্যম পেতে হলে অবশ্যই পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।”

সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, “গণমাধ্যমের বড় দুর্বলতা হচ্ছে তার দায়বদ্ধতা নিয়ে। দায়বদ্ধতা অবশ্যই আছে, তবে তা জনগণের বা সত্যের প্রতি নয়, তা দলের প্রতি, রাজনীতির প্রতি। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

“মাহমুদুর রহমান যা করেছেন, তা শুধু ধর্মীয় উস্কানি নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি হামলা,” যোগ করেন মনিরুজ্জামান।

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, “কারো স্বাধীনতাই শর্তহীন নয়। সবাইকে তার সীমায় থাকতে হবে। বর্তমান সরকারের সময়ে গণমাধ্যম অনেক স্বাধীনতা ভোগ করছে। কিন্তু এতে রাজনীতির লেজুরবৃত্তিও বেড়েছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

এটিএন নিউজের প্রভাষ আমিন বলেন, “আমার দেশ পত্রিকা যা করেছে তা সাংবাদিকতা নয়। গণমাধ্যমে স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন অপসাংবাদিকতা করেছে পত্রিকাটি।”

আমার দেশ প্রত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে ১৫ সম্পাদকের বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সরকার যখন মাহমুদুর রহমানকে আটক করেছে তখন সম্পাদকরা তার মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিচ্ছে। অবশ্যই এটা সম্পাদকদের দায়িত্ব। কিন্তু তিনি (মাহমুদুর রহমান) যখন সাংবাদিকতার নামে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছিলেন, অপসাংবাদিকতা করছিলেন, তখন কেন কেউ তাকে বলেননি এটা ঠিক হচ্ছে না। সেটাও সম্পাদকদের বলা উচিত ছিল।”

“এজন্য গণমাধ্যমের লোকদের নিজেদেরই একটি ন্যুনতম বিধি নিষেধ ঠিক করে নেওয়া উচিত যে আমরা কি করবো, কি করবো না। যদিও নীতিমালা করার কাজ সরকারের, কিন্তু সরকার করে দিলে মনে হবে চাপিয়ে দিচ্ছে। আমরা মানতে চাইবো না। এজন্য নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে নিজেরাই নীতিমালা করা উচিত।”


হারুন হাবীব তার প্রবন্ধে বলেন,“বাংলাদেশে প্রচুর গণমাধ্যম রয়েছে যাদের নিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে। মৌলবাদী অর্থনীতির মতো মৌলবাদী মিডিয়া সমাজকে পেছনে টানছে।

“গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য এসব মিডিয়াকে ব্যবহার কাঁ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। একদিকে তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে, অন্যদিকে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ধারাকে পরিকল্পিতভাবে আঘাত করছে। যে কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সীমা বা পরিধি সমালোচিত হচ্ছে।”
বিডিনিউজ২৪-এ প্রকাশিত।