কালো, তা সে যত কালো হোক ।। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
এইদেশ উপস্থাপনা, মঙ্গলবার, জুন ০৪, ২০১৩


সরকার ভেদে যত বিরোধই থাকনা কেন, এ দেশের অর্থমন্ত্রীদের একটি ক্ষেত্রে মিল আছে। তারা কালো কে ভালবাসেন। গত ১৭ বছর ধরেই তারা বাজেট করছেন এমনভাবে কালো টাকার মালিকরা পাছে যেন ফুলের ঘায়ে মূর্ছা না যান।
কালোর প্রতি তাদের এই ভালবাসা আর দরদের কি প্রতিদান জাতি দিতে পারে? নিশ্চয়ই জানা নেই কারো।

এ মুহুর্তে, অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত প্রায় শেষ করে এনেছেন, তাঁর বাজেট। হয়তো ছাপাও প্রায় শেষ। এর মধ্যেই জানা গেলো তিনি আবারো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখছেন। চিরাচরিত সেই পুঁজি বাজারে বিনিয়োগের জন্য, যে বাজারটি বরাবরই কিছু কালো টাকার মালিক আর বেনিয়া ব্যসায়ীর নিয়ন্ত্রণে। এবার আর একটি খাতে কালো টাকা বিনিয়েগের সুযোগ থাকছে, সেটি হলো আবাসন খাত। জমি প্রায় দুর্লভ। কোন সৎ লোকের পক্ষে জমি কেনা অসম্ভব। আর ফ্ল্যাট কেনার জন্য সাধারনের জন্য ব্যাংক ঋনও প্রায় বন্ধ। কিন্তু সরকার জমি-বাড়ি করার সুযোগ দিচ্ছেন তাদের, যারা অসৎ পথে, দুর্নীতি করে টাকা আয় করেছে।
কালো টাকার মালিকদের প্রতি প্রতিটি সরকারের সংযম, সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানোর যে নজির দেখছি তা দস্তুর হয়ে উঠলে, আগামীতে মানুষ কোন ক্ষেত্রেই সৎ থাকার সামান্য চেষ্টাও করবেনা।

সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকে অর্থনীতিবিদদের, যেন কালো টাকা সাদা করার বিধান তুলে দেয়া হয়। আর চাপ থাকে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর। যে যুক্তিতে এই সুযোগ বারবার দেয়া হয় তার কোন প্রমাণ পাওযা যায়নি কোন বছরই। বলা হয় বিনিয়োগ হবে, রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু এর কোনটিই হয়না। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারগুলো ১৭ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। আর সব মিলিয়ে দেশে সাদা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৩৭৪ কোটি কালোটাকা। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। তবুও তাদের সরকারের ভালবাসা থাকবেই।

কালো টাকার মালিকদের প্রতি এই অতি দরদের ফলে আজ দেশে একটি সমান্তরাল কালো অর্থনীতি বিরাজ করছে। কালো টাকার মালিক কোন জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে তাকে মাত্র মোট মূল্যের ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তাকে তার টাকার উৎস সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা হবেনা, তাকে আর কোন কর দিতে হবেনা। যারা সৎ পথে আয় করেন তারা যে, কতটা নাজেহাল হন, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।

সরকার হয়তো ধারণা করছে যে, ক্রমেই বেড়ে চলা চলতি ব্যয় আর পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের আবাসন খাতে কালো টাকা আহরণ করা গেলে তার তহবিলে চাপ কমবে। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বার্তা জনগণকে দেয়া হলো, তা ভয়নাক ও অনৈতিক। বোঝা গেলো দুর্নীতি করলে পুরষ্কৃত হওয়া যায়, আর সৎ থাকলে শাস্তি পেতে হয়। ন্যায্যতা, বিচার আর সব মানুষের প্রতি সমান আচরণের যে কথা বলা হয়, আসলে তা থেকে অনেক দূরে বাস করে সরকার।

কালো টাকা সাদা করার বিধান বারবার করেও কাংখিত ফল না পাওয়ার আরেকটি কারণ এর ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও দুর্নীতি। এই টাকা বিনিয়োগে আনতে যারা দায়িত্বে থাকেন তারা নিজেরাই আবার সেই কালো টাকার মালিকদের সাথে একটা সখ্যতা গড়ে তুলেন যাতে উৎপাদনশীল খাতে এই অর্থ না আসে। ফলে কালো টাকার মালিকরা আরো একটি কালো চক্রে জড়িয়ে পড়েন আরো বেশি কালো টাকা বায়ের জন্য। এবং তারা এটি জানেন যে সুযোগ বারবারই দেয়া হবে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
পরিচালক, বার্তা
একাত্তর টেলিভিশন