ধর্মভিত্তিক দল এবং রাজনীতির ভবিষ্যৎ ।। আলী রীয়াজ
এইদেশ সংগ্রহে, রবিবার, জুন ০২, ২০১৩


[এই নিবন্ধটি সংক্ষিপ্ত আকারে গত ২৫ মে নিউইয়র্কের বইমেলায় আয়োজিত সেমিনারে উত্থাপিত হয়েছে 'ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ' শিরোনামে, এবং এইদেশ ডটকমে তা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তিতে লেখক লেখাটি বিস্তারিতভাবে প্রথম আলোতে ৩ কিস্তিতে তুলে ধরেন। আমরা এইদেশ-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি একত্রিত আকারে তুলে ধরছি।]


সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসঙ্গটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তা এর আগে আমরা কখনোই প্রত্যক্ষ করিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তো নয়ই, এমনকি সম্ভবত গত প্রায় এক শ বছরেও আমরা এই আকারে এই প্রপঞ্চের মুখোমুখি হইনি। এর কারণ কী? এই পরিস্থিতিকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের করণীয় কী? আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখায় তার কী প্রভাব পড়বে? এ ধরনের প্রশ্ন আমাদের সবার মনের ভেতরেই যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে তা নয়, আমরা সবাই কমবেশি এ নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা এ বিষয়ে বেশি করে উৎসাহী হয়েছি সাম্প্রতিক কালে জামায়াতে ইসলামীর সহিংস আচরণ ও তার নিষিদ্ধকরণের দাবির পটভূমিকায়, পাশাপাশি হেফাজতে ইসলাম বলে একটি সংগঠনের উত্থানের কারণে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয়, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আপসমুখী অবস্থান, এই সব দলকে আশু স্বার্থে ব্যবহারের জন্য মরিয়া ভাব, ধর্মভিত্তিক দলের আড়ালে ও নামে সহিংসতার ব্যাপক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির চেহারা বিষয়ে উদ্বেগ নিঃসন্দেহে যৌক্তিক।

১. বাংলাদেশ কোন পথে?

ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বুঝতে চাইলে, তার বর্তমান অবস্থাকে উপলব্ধি করতে চাইলে কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪২ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয় বলে আমার ধারণা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি যখন তৎকালীন বাংলার সমাজজীবনে আলোড়ন তুলেছিল, তখনো আমরা রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের বিষয় নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক দেখতে পাই না। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তখনো এই বিবেচনার মধ্যে আসেনি। কেননা সমাজে ধর্মের উপস্থিতি, ব্যক্তিজীবনে ধর্মাচরণের সঙ্গে রাজনীতির একটা দূরত্ব বজায় থেকেছে। আর তা ছাড়া বিষয়টি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় একভাবে নিষ্পত্তিও হয়ে গিয়েছিল; বাঙালির ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে পাকিস্তান দাবির পেছনে ধর্মের বিবেচনা সত্ত্বেও এবং এ বিষয়ে চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলমানের অকুণ্ঠ সমর্থন সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, মুসলিম লিগকে কখনোই ধর্মভিত্তিক দল বলে বিবেচনা করা হয়নি, বাঙালি মুসলমান ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ২৫ বছরের ইতিহাসেও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল প্রশ্ন হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক দল গঠনের সুযোগ ছিল না; সাংবিধানিকভাবেই বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন ওঠেনি।
কিন্তু ইতিহাস হচ্ছে একটা কূপের মতো, আপনি কতটা গভীর পর্যন্ত খুঁড়তে চান তার ওপর নির্ভর করবে আপনি শেষ পর্যন্ত কী ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন। ধর্মভিত্তিক দল ও রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন ছিল না মানে কি এই যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কখনোই আমাদের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেনি?

১৯৪৭ সালে বাংলা প্রদেশ ভাগ হবে কি না সে প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সংগঠনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো হিন্দু মহাসভা। ইতিহাসের সনিষ্ঠ পাঠকেরা জানেন যে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং শরৎ বসু স্বাধীন-সার্বভৌম যুক্তবাংলা গঠনের যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ২ মে ১৯৪৭ সালে একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘একটি স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা সম্বন্ধে কিছু এলোমেলো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এর ভাবার্থ আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয় এবং আমরা এর সমর্থন কোনোভাবেই করি না। হিন্দুদের কাছে এই পরিকল্পনা কোনো উপকারে আসবে না। স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা প্রকৃতপক্ষে একটি পাকিস্তানের রূপ নেবে… আমরা কোনোভাবেই ভারতের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না (দেখুন, মাউন্ট ব্যাটেন পেপারস, নিকোলাস মানসার্গ ও অন্যান্য, দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার, ১৯৪২-৪৭, ভলিউম ১০, পৃ. ৫৫৭।. তা ছাড়া হিন্দু মহাসভার ভূমিকা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে)।. বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই যে হিন্দু মহাসভাই কালক্রমে ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির জন্ম দিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বলে পরিচিত ভূখণ্ডে ইসলামপন্থী রাজনীতির উপস্থিতি আরও পুরোনো। কার্যত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে, বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের মধ্যেই তার উদ্ভব। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় হাজী শরীয়তউল্লাহ্র নেতৃত্বে সংঘটিত ফারায়েজি আন্দোলন, বিশেষত দুদু মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন এবং তিতুমীরের নেতৃত্বে তারিক-ই-মুহাম্মাদিয়ার প্রভাবে ‘বাঁশের কেল্লা’ বলে পরিচিত আন্দোলন এই ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। সমাজসংস্কারের এসব আন্দোলন কালক্রমে রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছিল। পরে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের শক্তি সঞ্চয় হলে, তারাই প্রধান দলে পরিণত হলে এসব আন্দোলন হারিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ মানসে, প্রচলিত লোককথায়, সংস্কৃতিতে তার প্রভাব একেবারে অবসিত হয়ে যায়নি। এখানে এটাও জোর দিয়ে বলতে চাই যে এই ধারার সঙ্গে অতিসমপ্রতি জামায়াতে ইসলামীর যোগাযোগ এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও জামায়াত এই ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি নয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তা হলো—আমরা কি এখন বহুধা বিভক্ত ইসলামপন্থী রাজনীতিকে একটি কেন্দ্রে সম্মিলিত হতে দেখছি?

আমরা এখানে এলাম কীভাবে?

ইসলামি রাজনীতির ধারা যদি মুসলিম লিগ আর কংগ্রেসের সাফল্যের কারণে ১৯৪৭ সালে নাগাদ দুর্বল ও প্রায়-নিঃশেষিত হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আমরা আজকে কেন তার এই শক্তি দেখতে পাই—এ বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি। বাংলাদেশের লোককথায় যে ইসলামি আন্দোলন, সেই ধারাটি পাকিস্তানি শাসনামলে (১৯৪৭-১৯৭১) আর বেগ লাভ করতে পারেনি, তার কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জামায়াতে ইসলামীর আবির্ভাব। জামায়াতের নেতারা, এমনকি তাঁদের দীক্ষাগুরু আবুল আলা মওদুদী, প্রচলিত অর্থে মাদ্রাসায় শিক্ষিত নয়।

পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামী ইসলামপন্থীদের নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়, যা নগরকেন্দ্রিক, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের নেতৃত্বাধীন এবং যার লক্ষ্য মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, এমনকি সমাজে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত নয়, কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। পাকিস্তান আমলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর আধিপত্য ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে ও রাজনীতির প্রধান ধারায় তারা কোনো আবেদন রাখতে পারেনি; তার অন্যতম কারণ হলো সাধারণ শিক্ষার প্রসার, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ, নগরায়ণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব এবং পাকিস্তানিদের শোষণ।

বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালের পর জামায়াতে ইসলামী এবং ১৯৮১ সালে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর (হাফেজ্জি হুজুর) রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামপন্থীরা রাজনীতিতে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করেছে। জিয়া ও এরশাদের আমলে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান, রাষ্ট্রধর্মের ঘোষণা এবং একই সময়ে প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আশ্রয়-প্রশ্রয় যেমন জামায়াতে ইসলামীকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি কওমি মাদ্রাসার প্রসারের কারণে মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামপন্থী দলগুলোর ভিত্তি জোরালো হয়েছে। সামরিক শাসকেরা তাঁদের অবৈধ শাসনকে বৈধতা দিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শরণাপন্ন হয়েছেন, অন্যদিকে ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতির অতিসরলীকৃত অঙ্কের বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে। দলগুলোর আচরণ থেকে মনে হয়, তাদের এই ধারণা হয়েছে যে সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রমাণ দিতে হলে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সব সময় তাদের সঙ্গে রাখা দরকার। দেশের ইতিহাস এবং অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসারের কারণ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়; কিন্তু তা সম্পূর্ণ চিত্রটি তুলে ধরে না। কেননা দেশের বাইরের ঘটনাপ্রবাহও এর পেছনে কাজ করেছে। তা ছাড়া প্রশ্ন থাকছে ধর্মভিত্তিক দল শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার ফল কী।

২. ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বোঝার অক্ষমতা

বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ও তার প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে উৎসাহ এবং উদ্বেগ দুই-ই আছে। গত কয়েক মাসে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনায় দেশের ইতিহাসে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দল বা ইসলামপন্থীদের উত্থান ও শক্তি সঞ্চয়ের বিষয়টিকে কেবল দেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়। গত কয়েক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থীরা শক্তি সঞ্চয় করেছে। তার পেছনে কাজ করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, বিশেষত রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রের আবেদন হ্রাস। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি। ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ২০১৩ সালে সিরিয়া পর্যন্ত অনেক দেশেই মার্কিন নীতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসলামপন্থীদের শক্তি জুগিয়েছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। ফিলিস্তান প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর দুমুখো নীতি সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামপন্থীদের আবেদন তৈরি করেছে। দেশে দেশে সেক্যুলার রাষ্ট্র এবং তাদের নেতারা জনসাধারণের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে, তাঁদের দুর্নীতির কারণে ইসলামপন্থীরা নিজেদের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ লাভ করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (যেমন মালয়েশিয়া) কিছু দেশের সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ। একদিকে স্বল্প মেয়াদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে/ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাওয়া মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে একধরনের ধর্মীয় রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশের পক্ষ থেকে দেওয়া আর্থিক সহযোগিতায় দেশের ভেতরে সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, যেগুলো একধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর পক্ষে মানসিকতা তৈরি করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই সুবিধা লাভ করে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। আজ তাদের আর এই বিদেশি সাহায্যের দরকার না হলেও অতীতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বায়নের যে সুযোগে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি জোরদার করেছে, সে পথেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চিন্তা দেশের ভেতরে প্রসারিত হয়েছে। তা কেবল দরিদ্র মানুষের মধ্যে সীমিত আছে বলে মনে করার কারণ নেই। বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমর্থনের মাত্রা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চেয়ে খুব কম নয়।

বর্তমান পরিস্থিতি

বিভিন্ন কারণে ও প্রক্রিয়ার ফসল হিসেবে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে। বাংলাদেশের সমাজে এই রাজনীতির প্রতি আকারে ছোট হলেও সমর্থন রয়েছে। তবে লক্ষণীয় হলো, গত চারটি নির্বাচনে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে এই সমর্থনের পরিমাণ অত্যন্ত কম; নির্বাচনী হিসাবে সব ইসলামপন্থী দল মিলে গড়ে ৮ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। বাংলাদেশের মানুষ এখনো ধর্মকে ‘রাজনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে বিবেচনা করে না। তাদের কাছে সামাজিক জীবনে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী; কিন্তু সেই গুরুত্ব যত বিশালই হোক না কেন, রাজনীতিতে তারা ধর্মের ব্যবহার দেখতে চায় না; ধর্মভিত্তিক দলকে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিও মনে করে না। এ ধরনের অবস্থা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কয়েক মাসে আমরা দেখেছি যে জামায়াতে ইসলামী এবং সম্প্রতি তাদের পক্ষে হেফাজতে ইসলামের সহিংস ঘটনা। এসবের পেছনে আস্তিকতা-নাস্তিকতার প্রশ্ন, ধর্মের অবমাননা, সংবিধানে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের ঘোষণা পুনঃস্থাপনের কথা যতই বলা হোক, প্রকৃতপক্ষে এই অবস্থার কারণ হলো চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট। সাময়িক রাজনৈতিক সংকট থেকে এর উদ্ভব ঘটলেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘাটতি থাকলে এটি কেবল এই সময়ের মধ্যে সীমিত থাকবে না। এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ওপর তার বিরূপ প্র্রভাব পড়বে।

ধর্মভিত্তিক দল শক্তিশালী হলে কী হয়?

ধর্মভিত্তিক দলের লক্ষ্য আর দশটা রাজনৈতিক দলের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। তারা চায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক দলগুলো ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয় না। লিবারেল গণতন্ত্রের একটা অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ইসলামপন্থী দলগুলো মনে করে, ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এবং সে কারণেই তা অগ্রহণযোগ্য। (এই ধারণা একসময় খ্রিষ্টান সমাজেও বিরাজমান ছিল; এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ইভাঞ্জেলিক্যালদের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে)।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, যেকোনো ধর্মেরই রয়েছে চূড়ান্ত সত্যের (আলটিমেট ট্রুথ) দাবি; ফলে যে বিষয়ে চূড়ান্ত সত্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে, তা নিয়ে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিষয়ে ধর্মের অনুশাসনে কিছু বলা হয়ে থাকে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের দরজা ধর্মভিত্তিক দল বন্ধ করে দিতে কেবল উৎসাহীই নয়, বাধ্যও বটে। এসবই সমাজে বহুত্ববাদিতার (প্লুরালিটি) প্রতিকূল ধারণা। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ধর্মভিত্তিক দলগুলো ধর্মীয় সহিষ্ণুতার (টলারেন্স) কথা বললেও ধর্মীয় বহুত্ববাদিতার (প্লুরালিজম) বিষয়ে নীরবতা পালন করে; ক্ষেত্রবিশেষে তার বিরোধিতাও করে থাকে। ধর্মভিত্তিক দলগুলো যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তারা কি এ কথা স্বীকার করে, তাদের রাজনৈতিক আদর্শ হচ্ছে একটি ধর্মভিত্তিক মতামত, কিন্তু তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; আর দশটা রাজনৈতিক মতবাদের মতোই এটিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুলভ্রান্তির জন্য প্রস্তুত একটি মতবাদ কিংবা সাধারণ সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি রাজনৈতিক আদর্শ মাত্র? যদি এর কোনোটাই ধর্মভিত্তিক দল মেনে নিতে অসম্মত হয়, তবে তার বুঝতে হবে যে ওই রাজনীতি গণতান্ত্রিকতার বিরোধী।

ধর্মভিত্তিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো নাগরিকের সমান অধিকারের ধারণার অবসান। রাষ্ট্র যখন কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত দেখায়, তখন সেই রাষ্ট্র আইনের চোখে নাগরিকের সমতার ধারণাকে জলাঞ্জলি দেয়। এটা যে ধর্মভিত্তিক দল কেবল ক্ষমতায় গেলেই ঘটে, তা-ই নয়; রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দল যখন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখনো সেটা ঘটে। পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক দলগুলো ১৯৭৪ সালে দেশের সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে আহমাদিয়া গোষ্ঠীকে ‘কাফের’ বলে চিহ্নিত করতে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলো অনেক দিনে ধরেই সেই দাবি তুলে আসছে এবং সম্প্রতি হেফাজতের ১৩ দফা দাবিতেও এটা রয়েছে, ধর্মভিত্তিক অন্য যে দল ও সংগঠন তাদের বিরোধিতা করেছে, তারাও এই দাবির বিষয়ে একমত। বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে নাগরিকের সমতার প্রশ্ন ইতিমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে, এখন চাপ দিয়ে সে পথে ঠেলে দেওয়ার জন্যই ইসলামপন্থীরা চেষ্টা করছে।

পাকিস্তানে জিয়াউল হকের সময় ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া হুদুদ আইনের কথা অনেকেরই জানা আছে। নারীদের নিরাপত্তা ও জীবন এই আইনের কারণে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ২০০৬ সালে পাস হওয়া নারী সুরক্ষা বিল এই হুদুদ আইনের সংশোধন করলেও হুদুদের বিপজ্জনক অবস্থার সম্পূর্ণ অবসান হয়নি। বাংলাদেশে আজ যারা হেফাজতে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে, তারা প্রথম ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। নারীর অধিকারের প্রশ্নটি ইসলামপন্থীদের জন্য একটা বড় বিষয়। ইসলামপন্থীদের একাংশ নারীর সীমিত অধিকারের সমর্থক হলেও তা সীমিত মাত্র; অন্য পক্ষে হেফাজতের মতো ইসলামপন্থীরা নারীর স্বাভাবিক চলাফেরার ওপরও বাধা-নিষেধের পক্ষপাতী।

ধর্মভিত্তিক দল রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারলে তারা যে ব্লাসফেমি আইন প্রচলনে উৎসাহী হবে, তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। পাকিস্তানে প্রচলিত এই আইনের আদলে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে একটি আইন চালুর জন্য সংসদে আইনের প্রস্তাব করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে মতিউর রহমান নিজামী। হেফাজতের ১৩ দফায়ও ভিন্ন ভাষায় একই দাবিই তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের পরিণাম বলা বাহুল্য। এই আইনের আওতায় এক হাজার ২০০-এর বেশি লোক অভিযুক্ত হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাই মিথ্যা অভিযোগে হয়রানির শিকার হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছে। এই আইনের বিরোধিতা করে একজন গভর্নর ও একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। এসব কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। ধর্মরাষ্ট্র বা থিওক্রেটিক স্টেট প্রতিষ্ঠিত হলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে, তা বোঝার জন্য ইরানের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনার আরেক উদাহরণ সৌদি আরব নিশ্চয়ই ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় না।

বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দল যতই শক্তি প্রদর্শন করেছে, বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো ততই সেই চাপের মুখে পশ্চাদপসরণের পথ বেছে নিয়েছে। সর্বসাম্প্রতিককালে হেফাজতের দাবিদাওয়ার মুখে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কোরআন শরিফের প্রতিকৃতির সামনে বসে সাক্ষাৎকার প্রদান, হেফাজতের দাবি বিবেচনার, অংশত মেনে নেওয়ার এবং মদিনা সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ঘোষণা তার প্রমাণ। অন্যদিকে বিএনপি হেফাজতের দাবিদাওয়ার বিষয়ে কোনো রকম ধারণা ছাড়াও (এমনকি সংগঠনের নামের বিষয়ে খালেদা জিয়ার অজ্ঞতা সত্ত্বেও) আশু রাজনৈতিক স্বার্থে এই সংগঠনকে ব্যবহারের যে চেষ্টা করেছে, তা থেকে বোঝা যায় যে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে ধর্মভিত্তিক দলের প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়েই রাজনীতিবিদেরা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভূমিকা কী হবে এবং সংবিধান ও আইনই বা কী ভূমিকা রাখবে?

৩. বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দল ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দল ও রাজনীতির ভূমিকা কী হবে, সেটা অনেকেরই প্রশ্ন। বিশেষ করে প্রশ্নটি ওঠে জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ কী, সেটাকে কেন্দ্র করেই। পাশাপাশি যাঁরা এ রাজনীতির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, এ রাজনীতির প্রসারকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চান, তাঁরা বুঝতে চান তাঁদের করণীয় কী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কী করতে পারে।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মোকাবিলা করার উপায় হিসেবে সাধারণত আইনি ও সাংবিধানিক দিকগুলোই প্রথমে সবার বিবেচ্য বিষয় হয়। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ও বিশেষ কোনো ধর্ম পালনের কারণে ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য লোপ করা হবে বলে অঙ্গীকার ছিল। তদুপরি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুযায়ী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার বা তাদের সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনোভাবে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকবে না। ১৯৭৭ সালের প্রোক্লেমেশন অর্ডার নম্বর ১-এর মাধ্যমে সংবিধানের ধর্মীয় ১২ সম্পূর্ণভাবে ও ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ বিলোপ করা হয়। ২০১১ সালে আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বর্ণনা করে তা বাতিল করা হলে এ দুই ধারাই পুনর্বহাল হয়। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধানে ১২ অনুচ্ছেদ ফিরে এলেও ৩৮ অনুচ্ছেদ নতুন রূপ নিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে কারও এমন সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা তার সদস্য হওয়ার অধিকার থাকবে না, যা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কিংবা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ পরিবর্তনের ফলে এ সংবিধানের আওতায় রাষ্ট্র কোনো দলকে ধর্মভিত্তিক হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ করতে পারে না। সম্ভবত এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকেরা এটা বারবার বলেছেন যে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে না। তদুপরি দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখাও এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের পথে বড় অন্তরায়। রাষ্ট্রধর্মবিষয়ক ধারা কার্যত ১২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এখানে অবশ্য এটাই বলা দরকার যে এ আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর বিষয়টিকে কেবল ধর্মভিত্তিক দল বলে বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়; দলটি নিষিদ্ধকরণের আলোচনাকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্ন থেকে আলাদা রাখাই বাঞ্ছনীয়। তার কারণ হলো, মুক্তিযুদ্ধকালে দলটি গণহত্যায় সাংগঠনিকভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং তার জন্য কোনো ধরনের ক্ষমাপ্রার্থনা পর্যন্ত করেনি। গণহত্যায় সংশ্লিষ্টতা এবং মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিবেচনায় জামায়াত নিষিদ্ধকরণের প্রশ্নটি তুলনীয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি পার্টি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করার সঙ্গে। তা ছাড়া এ দলের আচরণ সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের বর্ণিত ‘এই সংবিধানের পরিপন্থী’ কি না, তা-ও বিবেচ্য।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিবেচনায়ও আলাদা করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে মোকাবিলা করা যাবে না। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারতে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও বিজেপি এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো ছাড়াও কমপক্ষে ৩৭টি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সর্বভারতীয় ভিত্তিতে এবং ১০টি আঞ্চলিক দল হিসেবে তৎপর বলে জানা গেছে। এসব রাজনৈতিক দল বৈধভাবেই কাজ করছে। কিন্তু পাশাপাশি এটাও বলা দরকার যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা করলে এসব দলকে অন্যদের মতোই দেশের প্রচলিত আইনের পরিণতি ভোগ করতে হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও আমরা ধর্মভিত্তিক দলের উপস্থিতির কথা জানি, তবে তাদের নিষিদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে।

তার অর্থ কি এই যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথরেখায় ধর্মভিত্তিক দলের প্রভাব হ্রাস করার, জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ধর্মের পার্থক্যকে চিহ্নিত করার, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপজ্জনক দিকগুলো মোকাবিলা করার কোনো উপায় নেই? আমার ধারণা যে অবশ্যই তা আছে। এ বিষয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কী করা যেতে পারে, তার বিবেচনায় আমি করণীয় চারটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

প্রথমত এ রাজনীতি মোকাবিলায় প্রথমেই দরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করা। কোনো দেশে ধর্মভিত্তিক দল কখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটা পৃথিবীর মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ইসলামপন্থীদের উত্থানের ইতিহাস থেকেই ভালো করে বোঝা যায়। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে ফিলিস্তিনে হামাসের উত্থানের ইতিহাস বলে দেয় যে যখন কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত হয়েছে, ক্ষমতাসীনেরা নাগরিকের অধিকারকে সীমিত করেছে, সেখানেই ইসলামপন্থীরা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। আশির দশকে আলজেরিয়ার ইতিহাসও তা-ই সাক্ষ্য দেয়। এ রকম পরিস্থিতিতে তারা এটা দেখাতে পেরেছে যে প্রচলিত ‘সেক্যুলার গণতন্ত্র’ বলে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা নাগরিকের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সে কারণেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি যেমন ধর্মভিত্তিক দলকে রাজনীতির অধিকার দেয়, তেমনি গণতন্ত্রই কেবল ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে সীমিত পরিসরের মধ্যে আটকে রাখতে পারে। লক্ষণীয়ভাবে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈরিতার রাজনীতিকে ও সহিংসতার রাজনীতিকে উসকে দিতে চায়। বাংলাদেশের দুই প্রধান দলের অগণতান্ত্রিক আচরণ এদের স্বার্থের অনুকূলেই গেছে।

কোনো দেশে কোনো রাজনীতি কেবল রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয় না। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এমনকি দাতব্য সংস্থার মধ্য দিয়ে তার মানসিক জমিন এবং তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষা ও গণমাধ্যম সেই রাজনীতিকে সমাজের গভীরে স্থায়ী আসন করে দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল অবধি দেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল না থাকলেও এ লক্ষ্যে কাজ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। একই প্রক্রিয়া তার পরও অব্যাহত থেকেছে এবং এখন তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। বিপরীতক্রমে তার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার কাজে নিয়োজিত সংগঠনগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমিত আকারে কাজ করেছে। এ পরিস্থিতিকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে সফল হয়েছে। সমাজের ভেতরে এ অবস্থা অব্যাহত রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আইনি ও সাংবিধানিক বিধিবিধান দিয়ে, কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চাইলে তাতে সাফল্য আসবে বলে আমি মনে করি না। এ জন্যই দ্বিতীয় করণীয় হলো সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করা ও তা অব্যাহত রাখা। শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় আকারের সংস্কার ছাড়া এ পথে এগোনো যাবে কি না, আমি সে বিষয়ে সন্দিহান।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানের দিকে খুব ভালোভাবে তাকানোর বিষয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। পঞ্চদশ সংশোধনী সেই সুযোগকে কেবল হেলায় হারিয়েছে তা নয়, উপরন্তু তা সংবিধানকে আরও বেশি সমস্যাজর্জরিত করেছে। রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের প্রশ্নকে আমাদের গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে ধর্মকে আলাদা করেছে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে, সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে ধর্মের প্রভাব তাতে ক্ষুণ্ন হয়নি। এতে করে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব একেবারে অপসৃত হয়েছে এমনও বলা যাবে না। অন্যদিকে ফ্রান্স কেবল যে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কচ্ছেদের বিধান করেছে তা নয়, সামাজিক জীবনেও ধর্মের ভূমিকাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করেছে, ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে ধর্মের ভূমিকা সীমিত এবং সংকুচিত করা হয়েছে। ব্রিটেনে আইনগতভাবে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে বিভাজন টানা না হলেও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দুর্বল চার্চ এবং সমাজে ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে বলে সেখানে ধর্মের প্রশ্ন রাজনীতিতে আর মুখ্য থাকেনি। রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের ব্যাপারে এ তিনটি মডেলের কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত বা সমালোচনামুক্ত নয়। গত কয়েক দশকে এ নিয়ে প্রবল আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। এ মডেলগুলোর উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গে খ্রিষ্টধর্মের মূল্যবোধের সম্পর্কের বিষয়ও উঠে এসেছে। আবার এর বাইরেও অন্যান্য মডেল আছে, অন্যভাবে এসব প্রশ্ন মোকাবিলা করা হয়েছে। মুসলিমপ্রধান তুরস্কে একধরনের নিজস্ব মডেল তৈরি হয়েছে, যেখানে ধর্ম রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে না, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের জন্য হুমকি হলে ব্যক্তির ধর্মপালনের অধিকারে পর্যন্ত রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে। ইন্দোনেশিয়ায় সংবিধান সংস্কারের জন্য ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত যে বিতর্ক হয়, তাতে রাষ্ট্রধর্ম থেকে শরিয়ার প্রশ্ন বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন দল ইসলামপন্থী হলেও গত কয়েক বছরে সে আর ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে না; ২০০৮ সাল থেকে এ দলের লক্ষ্য হচ্ছে ‘বেনোভলেন্ট’ বা ‘বদান্য রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা। এসব অভিজ্ঞতা থেকে ধার করে তার আলোকে এবং বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংবিধান বিষয়ে যে মুক্তমনে আলোচনা হওয়া আবশ্যক, তা রাজনীতিতে অনুপস্থিত।

চতুর্থত, সারা পৃথিবীতে ধর্ম ও সেক্যুলারিজম বিষয়ে কয়েক দশক ধরে যে ব্যাপক আলোচনা চলছে, বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে সে বিষয়ে উৎসাহ কম। বিশ্বের জ্ঞান-জগতের নতুন চিন্তাভাবনা ও বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে চিন্তার একধরনের দৈন্য তৈরি হচ্ছে। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যেতে পারে যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থীদেরও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন ঘটেছে, আদর্শিক অবস্থানেও বদল দেখা গেছে। কিন্তু তার সামান্য ছোঁয়া পর্যন্ত আমরা দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদ ও তাঁদের সমর্থক চিন্তাবিদদের মধ্যে দেখতে পাই না। বাংলাদেশে ধর্ম, সেক্যুলারিজম, রাজনীতি ও সমাজের সম্পর্ক বিষয়ে পঠন-পাঠন, গবেষণা এবং এ বিষয়ে নির্ভয়ে বিতর্কের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমরা পুরোনো চিন্তার বৃত্তচক্রে ঘুরপাক খেতে থাকব। এ থেকে বেরোনোর পথ খোঁজার দায়িত্ব অন্যের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে আমরা এটা আশা করতে পারি না যে হঠাৎ করে একটা সমাধান তৈরি হবে। এটাও মনে করার কারণ নেই যে এর বিতর্কে ভিন্নমতাবলম্বীদের যুক্তির সবটাই অগ্রহণযোগ্য। যুক্তিসম্পন্ন নিরাবেগ বিতর্কের মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মভিত্তিক দল এবং ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমাধান হঠাৎ করে পাওয়া যাবে না। তবে সেই সমাধানের জন্য কেবল ঘটনাধারার ওপর নির্ভর করাও যথাযথ নয়; শক্তি প্রয়োগের মধ্যে এ প্রশ্নের সমাধান নিহিত নয়। বরং এসব প্রশ্নের উত্তর নিহিত নাগরিকদের সক্রিয়তার মধ্যেই। এ বিষয়ে জোরদার আলোচনার মধ্য দিয়ে অবশ্যই একটা নতুন পথ বের করতে পারব বলেই আমার প্রত্যাশা।

প্রথম আলো’তে ৩০ মে, ৩১ মে এবং ১ জুন প্রকাশিত

(আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক । ইংরেজিতে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটি। এর মধ্যে রয়েছে– ‘পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাজ ইন সাউথ এশিয়া’ (২০০৮) এবং ‘গড উইলিং – দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’ (২০০৪)। তিনি ‘স্টাডিজ অন এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদক।)