সহিংস রাজনীতি বাংলাদেশকে সুশাসন থেকে সরিয়ে দিচ্ছে দিন দিন ।। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা'র বাজেট ভাবনা
এইদেশ উপস্থাপনা, বুধবার, মে ২৯, ২০১৩


বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা আর দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপ নিয়েই বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত। অবকঠামোর স্বল্পতা আর দুর্বলাতার সাথে সহিংস রাজনীতির কারণে দেশে বিনিয়োগ বিরোধী একটি পরিবেশ বিরাজ করছে। বাজেট কতটা তা সামলাতে পারবে, তা বলা কঠিন।

সরকারের শেষ বছর, নির্বাচনের বছর। সহিংস রাজনীতি আর সরকারের উপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত নিয়ে বেশ অস্বাচ্ছন্দে আছেন অর্থমন্ত্রী। আইএমএফ বলছে বাজেটের ঘাটতি জিডিপি’র ৪.৩ ভাগ রাখতে হবে। এই শর্ত যে কতটা কঠিন, তা একমাত্র অর্থমন্ত্রীই জানেন। কারণ সরকারের শেষ সময়ে এসে ব্যয় আর বরাদ্দের যে দাবি আছে, তা মেটাতে গিয়ে আইএমএফ-এর শর্ত পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থমন্ত্রী হয়তো চাইবেন, রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতি যে গতি হারিয়েছে, তাতে সেই লক্ষ্য পূরণও সম্ভব বলে মনে হয়না।

বাজেটের আকার হচ্ছে দুই লাখ ২২ কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। সরকারের শেষ বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি- এডিপি'র আকার এক-তৃতীয়াংশ বাড়ছে। পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখে, আগামী অর্থবছরের এডিপি'র জন্য প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, সরকার। পদ্মাসেতু প্রকল্পে বরাদ্দ থাকছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এবারের এডিপি’র নতুন বৈশিষ্ট স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথমবার আলাদা আট হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা। পরিকল্পনা মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, এর পেছনে কোন রাজনীতি নেই। চলতি অথর্বছরের সংশোধিত বাজেট প্রকৃত বাজেটের চেয়ে প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা কমে কমে এক লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় এসে দাড়াতে পারে।

এবার এডিপি-তে বরাদ্দ বাড়বে, এটা ধারণা করাই ছিল। কারণ সরকারের সামনে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কলভার্ট আর বিদ্যুতের লা্‌ইনের আনেক চাহিদা। তবে, সরকারের ব্যয় বাড়ার সবচেয়ে যে বড় দাবি, সরকারি-আধাসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ্যভাতা, তা শেষ পর্যন্ত দিচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী। ঘোষণা থাকবে পে-কমিশনের।

বাংলাদেশের বাজেট কখনোই খাতভিত্তিক মূল্যায়ন করে হয়না। ফলে তা বাস্তবসম্মতও হয়না। বাজেটে খাত ভিত্তি বরাদ্দের পাশাপাশি এসব খাতের উন্নয়নে কি কি করা যায় তার সুক্ষ বিশ্লেষণ দরকার। গত চারটি বছরে সরকার কোথায় কোথায় বাস্তবায়ন সমস্যায় ভুগেছে, তার একটা পর্যালোচনাও জরুরী। কিন্তু বাস্তবতা হলো এমনটা কোন সরকারই করেনা। দুই দুইবার পিপিপি’র জন্য বরাদ্দ রাখা হলো, একটি পয়সাও ব্যয় হলোনা। এই ব্যর্থতার দায় কী অর্থমন্ত্রী নিজে নিবেন?

গত চার বছরে আওয়ামীলীগের আগের বারের মতোই কৃষি খাতে সরকারের সাফল্য আছে। তবে কৃষির উপখাত মৎস্য ও দুগ্ধ খাতে তেমন কোন উন্নতি চোখে পড়েনি। নগর অবকাঠামোর মধ্যে রাজধানীতে কিছু কাজ ছাড়া বড় উন্নয়ন খুব একটা হয়নি।
সরকার পে কমিশন গঠন করবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে হবে। কিন্ত সরকারের আকার ছোট করা, চলতি ব্যায় কমানোর যে, লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরে লালিত, সেক্ষেত্রে কোন প্রচেষ্টাই লক্ষ্যণীয় নয়।

বরাবরের মতোই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানী খাত। সরকার শুরু থেকে এই খাতে গুরুত্ব দেয়ায় কিছু প্রকল্প চালু হয়েছে। কুইক রেন্টালে বিদ্যুৎ আসছে। তবে যতটুকু দরকার, সেটুকু বিদ্যুৎ যাচ্ছেনা শিল্প-কারখানায়।

রাজনৈতিক সহিংতায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কমেছে। আগামী অর্থবছরেও পরিস্থিতি খুব ভালো যাবে না বলে আশংকা আছে। চলতি অর্থবছরে বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ছ'মাস রাজস্ব আদায়ের চিত্র ভাল হলেও শেষ ভাগে এসে কিছুটা গতি কমেছে। আমদানী শুল্ক কম আদায় হওয়ায় প্রথম ন’মাসে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছরে বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হতে পারে ৩৬ ভাগ। এই লক্ষ্যমাত্রাকে বেশি বলছে এনবিআর। রাজনৈতিক সহিংসতা আর নির্বাচনী বছর হওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে। আর এর ফলে বাজেটে সম্পদের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত পদ্মাসেতুর জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ শ কোটি টাকা। আশংকা আছে এর ফলে অন্য প্রকল্পে প্রভাব পড়বে। বাজেটে পদ্মাসেতু প্রকল্পে বরাদ্দ রাখতে হয়েছে দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে রাজি না হওয়ায়। কোন যুক্তিতে সরকার বাজেটে পদ্মাসেতুর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সরকারই তা বলতে পারবে।

বাজেটে বরাদ্দের চেয়ে বরাদ্দের ফলাফল কী তা কোন সরকারই ভাবেনা। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন এখন কী আর কেউ দেখে? সহিংস রাজনীতি বাংলাদেশকে সুশাসন থেকে সরিয়ে দিচ্ছে দিন দিন।
একটি ভাল বাজেট মানে যেটি বিনিয়োগকে আর সমাজের প্রগতির চাকাকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করে। আর এই চেষ্টায় থাকে সব বরাদ্দের গুণগত মান। খারাপ বাজেট সেটি যার আসল দর্শন সস্তা জনপ্রিয়তায় আচ্ছন্ন থাকে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
পরিচালক (বার্তা)
একাত্তর টেলিভিশন