যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে মার্কিন দূতের সন্তোষ প্রকাশ
এইদেশ ডেস্ক, বুধবার, মে ১৫, ২০১৩


বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সফররত যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ। বুধবার সচিবালয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাপ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধকে ‘মারাত্মক অপরাধ’ উল্লেখ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিচার চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামীতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশে এ বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। এর আগে প্রতিনিধি দল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারকাজ পরিদর্শন করেন। স্টিফেন জে র‌্যাপ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ সঠিকভাবেই এগুচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন।
গ্লোবাল ক্রিমিনাল জাস্টিস দফতরের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক এ্যাম্বাসেডর-এ্যাট-লার্জ স্টিফেন জে র‌্যাপ দুই দিনের সফরে মঙ্গলবার ঢাকায় আসেন।

এ সরকারের সময়ে এটি তার চতুর্থ সফর। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় এসে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছিলেন। ২০১১ সালের নবেম্বরে ঢাকা সফরের উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, বিবাদী ও বাদী দুই পক্ষেরই আপীলের সুযোগসহ তার কিছু সুপারিশ গৃহীত হওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কোন রায় ঘোষণার পর র‌্যাপের এটিই প্রথম ঢাকা সফর।

সংবাদ সম্মেলন ॥ বুধবার বিকেলে আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন স্টিফেন জে র‌্যাপ বলেন, কিছু বিষয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিগত দিনগুলোর তুলনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচার ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে তিন জামায়াত নেতার মৃত্যুদ-ের রায়ের বিষয়ে সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এদেশে যে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়েছিল তা মারাত্মক অপরাধ। এদেশের জনগণ চায় দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে। এদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ব্যক্তি অপরাধের বিচার মন্তব্য করে এর সঙ্গে জড়িয়ে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেন র‌্যাপ।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাপ বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় শাহবাগ আন্দোলন কোন প্রভাব ফেলেনি। মোল্লার (কাদের মোল্লা) যাবজ্জীবন রায়ের পরই এর বিরুদ্ধে শাহবাগে আন্দোলন শুরু হয়। এক্ষেত্রে একাত্তরে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণের অনুভূতির পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তার বিচারকদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে। বিচার ব্যবস্থা ঠিকভাবে এগুচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

র‌্যাপ যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রাখার ওপর জোর দিয়ে বলেন, এ বিচার করা এ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। এটা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও। এর কারণে এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ ছিল। আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে এ বিচার অনেক আগেই শুরু হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাংলাদেশ দেরি করেছে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই শুরু করা সম্ভব হয়েছে। আমি আশাবাদী যে, এটা অব্যাহত থাকবে। যে সরকারই আগামীতে ক্ষমতায় আসুক না কেন এ বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। এ সরকারের মেয়াদ বেশি সময় নেই, এই ভেবে বিচার নিয়ে কোন তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না।

তবে মৃত্যুদন্ডের রায়ের বিষয়ে তিনি সন্তুষ্ট না উদ্বিগ্ন এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি জবাব না দিয়ে র‌্যাপ বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় আইনে মৃত্যুদন্ড নেই। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন। এটা নিয়ে আমার কথা বলা যায় না। আর সন্তোষ বা উদ্বেগের জায়গায় এক কথায় সব কিছু প্রকাশ করা যায় না। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, এটা যেন আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রেখে স্বচ্ছতার সঙ্গে করা যায়, সে লক্ষ্যে আমি কিছু সুপারিশ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে কিছু কিছু গ্রহণ করা হয়েছে। এটা সন্তোষজনক। তবে এখনও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে যে দূরত্ব রয়েছে তা পূরণ করা হলে আমি আনন্দিত হব। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার রাজনীতিকরণ করার বিষয় নয়। এটা আইনী প্রক্রিয়া। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তা হতে হবে। তাহলে কারও কাছেই কোন প্রশ্ন উঠবে না।

এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমান আইনটিতে সংশোধন এনে দুই পক্ষের আপীলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে দুই পক্ষেরই অধিকার সংরক্ষিত হবে। তিনি বলেন, এ সফরে আমি ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছি। প্রক্রিয়া বেশ ভাল লেগেছে। তবে এখনও সুযোগ আছে আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে ফাঁকগুলো রয়েছে তা পূরণ করা।

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল হলেও অভ্যন্তরীণ বিচারক ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে বিচার চলছে সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ- পুরোপুরি অর্জনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে কেন? -এর জবাবে র‌্যাপ বলেন, এটাকে মোটেও এভাবে বলা যায় না। কারণ আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে বিচার করছে বাংলাদেশ।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে লিখিত বক্তব্য দিতে গিয়ে স্টিফেন জে র‌্যাপ বলেন, তার এবারের সফর বাংলাদেশে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা।

তিনি বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধ একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। তাই এর বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে তা বিশ্ব নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এদেশে যে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে, গণহত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা কোন সাধারণ অপরাধ নয়। এটা মারাত্মক অপরাধ। কিন্তু এর বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। এর জন্য রাস্তায় কোন আন্দোলন বা সহিংসতা কাম্য নয়। একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত ন্যায়বিচার চায়। তারা এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা চায় না।

আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ বুধবার দুপুরে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে তার সচিবালয়ের কার্যালয়ে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ক্রিমিনাল জাস্টিসবিষয়ক এই বিশেষ দূত। বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজে মার্কিন প্রতিনিধি দল সন্তুষ্ট। এ পর্যন্ত দেয়া চারজনের রায়েই তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তারা সর্বোচ্চ সাজার বিরুদ্ধে নয়। তারা জানতে চেয়েছে যে বিচারকাজ স্বচ্ছভাবে হচ্ছে কি না? আমরা তাদের বলেছি, বিচারকাজ সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবেই হচ্ছে।
পরে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বৈঠক সম্পর্কে ব্রিফ করেন। আইনমন্ত্রী বলেন, স্টিফেন জে. র‌্যাপ আইনের বিধি সম্পর্কে পূর্বে কিছু সুপারিশ রেখেছিলেন। আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করেছি। আমাদের দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও মান সম্পর্কে র‌্যাপের ধারণা ভাল। বিচার সুষ্ঠুভাবে চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিভিন্ন দেশের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে। এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত চারটি রায়ে র‌্যাপ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিচারকে বিতর্কিত করার মতো কোন উপাদান নেই বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে র‌্যাপ মৃত্যুদ-ের বিষয়ে আমাদের অবস্থান জানতে চেয়েছেন। জবাবে বলেছি, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এক সময় মৃত্যুদ-ের বিপক্ষে ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর তিনি বলেছিলেন, যেসব ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ পরিকল্পিতভাবে শত শত মানুষ হত্যা করেছে তাদের মৃতুদ- ছাড়া অন্য দ- দেয়ার অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের দেশেও এ ধরনের জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কাজেই, এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের জন্য মৃত্যুদ-ের বিধান রাখতে কোন বাধা নেই। আইনমন্ত্রী বলেন, আসামিপক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে সহস্রাধিক সাক্ষীর তালিকা প্রদান করার বিষয়ে র‌্যাপ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, এতে বিচার বিলম্বিত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্তরা সুবিচারবঞ্চিত হয়।

ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন ॥ এর আগে স্টিফেন জে র‌্যাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারকাজ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ সঠিকভাবেই এগুচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির পর সারাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে র‌্যাপ বলেন, ‘নাশকতা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমি ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হওয়ার সময় থেকে এ পর্যন্ত তিনবার এসেছি। সবারই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। যেহেতু রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপীল করার সুযোগ রয়েছে, তাই নাশকতা না করে আইন অনুযায়ী তাঁদের সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। দু’দিনের সফরে মঙ্গলবার ঢাকা এসে ব্যস্ততম সময় কাটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ। এ সময় তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী, প্রসিকিউশন পক্ষের প্রসিকিউটর, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দন্ডপ্রাপ্ত আসামির আপীল বিভাগে শুনানি প্রত্যক্ষ করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রত্যক্ষ করেছেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর বিকেলে হোটেল ওয়েস্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
এর আগে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে কাদের মোল্লার শুনানি পর্যবেক্ষণ করেন।
সূত্রঃ জনকন্ঠ