সোহেলী
রেজা নুর, মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৩, ২০১২


টোপর মাথায় বর হাসছে মিটিমিটি। লজ্জিত মুখে সামনের শাদা বিছানার চাদরের নিচে সারি সারি মাথার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে। খুঁজছে কাউকে। চারদিকে সবার মিলিত স্বর খুইজে বাইর করতি হবে কোনডা তুমার বউ...’
চওড়া খাটের ওপর আটদশজন মেয়েকে বসিয়ে মাথার ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। বিয়ে হয়েছে দুপুরে। রোদের তাপ রয়েছে এখনও। বাইরে তাকালে বাতাস কিছুটা লালচে মনে হয়। বর চিন্তিত, অপ্রস্তুত, লজ্জায় ফর্সা মুখ লাল। বিয়ের আগের আনন্দ, রোমাঞ্চকর ভাবনাগুলোর পেছনে পদাঘাত করার ইচ্ছে হচ্ছে। কোনো দিকে ইশারা করতে পারছে না। বউ’র বদলে যদি অন্য কেউ বের হয়ে পড়ে? তখন? হই চই বাড়ছে। এই খেলা পরিচালনার মেয়েটি তাগাদা দিয়ে চলেছে, ও বর, কী... হইলো, বউ চিনতি না পারলি একা একা বাড়ী যাতি হবে। শিগগির দ্যাকায় দ্যাও কোইনডে তুমার বউ’।
একদিকে দেখালো মুকুল। মুহূর্তে চাদর স’রে গেলো। সবার মিলিত উল্লাস উজাড় ক’রে নিলো ঘর। একজন শুধু বসে রইলো পুতুলের মতো। মুখ নিচু। ঘাম ঝরছে। নাকের আগায় ঘামের স্বর্ণবিন্দু। ঢলে আসা সূর্যটাও দেখছে রুবিকে। মুকুলও। বিয়ের আগে একবার দেখেছিলো। বড়োদের প্রশ্নের সময় দেখে নিয়েছিলো নিজের মতো ক’রে। প্রশ্নগুলো কী, কেমন উত্তর দিচ্ছিলো, রুবির কন্ঠ কেমন তা-ও মনে পড়ে না। অস্ফুট জবাবের ভেতর মিহিস্বর শুনেছিলো। সেই বিনয়ী আলোর মতো মুখ ঘর রাঙিয়ে ব’সে আছে। হাত ধ’রে সবাই ওকে রুবি’র পাশে বসালো। একটু দূরে বসেছিলো ও। একসাথে চার-পাঁচ জোড়া হাত মৃদু ধাক্কায় রুবির গায়ের ওপর ফেলে দিলো। আরেকটু ঘন হয়ে বসলো মুকুল। জোড়ের পাখির প্রণয়ের ডানা স্পর্শ পেলো। কী অদ্ভূত ভালো লাগা, কী নরোম রেশমের মতো মতো অনুভব!
বিকেল হয়ে এলো। বিদায়ের আয়োজন চলছে। রুবির বাবা-মা’র চোখেমুখে সন্ধ্যা নেমেছে আগেই। বড়ো মেয়ে। পরিবারের প্রথম বিয়ে। সব আয়োজন আর অতিথি দেখাশোনার ক্লান্তি যতটা না হয়েছে, মেয়ের বিদায় বেলা ঘনিয়ে আসার ক্ষণ মনে এলে দাম ফুরিয়ে আসছে মুতালিব মোড়লের। জামাই বাবাকে নানা অজুহাতে কয়েক বার দেখে এসেছেন বিয়ে বাড়ীর ব্যস্ততার মধ্যেও। ওদের অবস্থা ভালো। তার নিজের মতোই। জামাই’র সুন্দর চেহারা আর বিনম্রতায় মন খুশিতে ভরে উঠেছে বার বার। বউকে একটু পর পর হাসিমুখে বলেছেন, ‘জামাই বাবা যে এতো সুন্দর হবে তা ভাবিনি রুবি’র মা। শুনিচি আলাপ ব্যবহারও নাকি খুব ভালো। মাইয়েডা আমার শুকি থাকুক এই দুয়া মনে হয় কবুল হইয়েচে’। শুনে গালভরে হাসেন রহিমা বেগম।
রোদ থাকতে থাকতে রওয়ানা দিয়েছিলো ওরা। সূর্য ডুবলেও আলোর আভা আছে এখনও। ছইওয়ালা গরুর গাড়ী থেমেছে মুকুলদের উঠোনে। বাড়ীর বউ-ঝি’রা দৌঁড়ে এলো। ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটিতে মনে হলো মৌচাকে কেউ ঢিল মেরেছে এই ভর সন্ধ্যায়। শ্রাবণ মাসের শেষাশেষি হলেও বৃষ্টি তেমন হয়নি এখনও। সকালে সামান্য ক’ফোঁটা ঝ’রে ঝকঝকে হয়ে উঠেছিলো আকাশ। পরিষ্কার আকাশে চাঁদ প্রায় গোল হয়ে এসেছে। দু’একদিন পরেই পূর্ণিমা মনে হয়। ফিনফিনে আলোছায়ায় উঠোনে হেজাক জ্বালিয়ে টাঙানো বাঁশের লগির আগায়। ফুঁসে ফুঁসে আলো ছড়িয়ে পড়ছে উঠোনে। নতুন বউ সেই আলোয় আলতো ক’রে হেঁটে হেঁটে উঠে এলো ঘরে। তিন চারটে হাতপাখায় বাতাস হচ্ছে ওর গায়ে। সেই বাতাসে ঘোমটা নড়ছে। একটু বেশী বাতাসে ঘোমটা স’রে গেলো। সুন্দর গোলগাল ভরাট মুখশ্রী চমকে দিলো সবাইকে। সবার মিলিত স্বর, ‘ওরে বাবা, কতো সুন্দর বউ!’
বন্ধুদের সাথে উঠোনে জলচকি পেতে বসেছিলো মুকুল। সোরগোলের মধ্যে কথাটা কানে গেলো ওর। বন্ধুরাও শুনলো। চোখাচোখি হলো ওদের। একজন বললো, ‘কীরে মুকুল, খুশি হইচিস তো বউ পাইয়ে?’ মুকুল হাসলো। সাজানো মুক্তোর মতো দাঁত। রক্তরাঙা ঠোঁট। ধবধবে গায়ের রঙ। মাঝারি গড়নে ও এক সুন্দর সুপুরুষ। কত রকমের বন্ধু-বান্ধবে ঘিরে থাকে ও। হাসি তামাশা হয় কতো। শব্দ ক’রে কখনও হাসতে শোনেনি কেউ ওকে। বেশি খুশি বা আনন্দিত হলে মুখটা একটু লাল হয়ে ওঠে মুকুলের।
নতুন বউ দেখতে আসা অতিথিদের খাইয়ে দেয়া হলো উঠোনে পাটি পেতে। খাওয়া দাওয়ার পর গল্প-গুজব হলো খুব। পান তামাকের পর্ব শেষে বউ দেখে বিদায় হলো সবাই। মুকুলের মা একবার বউ দেখে পানের ডালা নিয়ে বসেছেন বারান্দায়। বাবাও এসে বসলেন। নিজের হাতে পান সাজিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘ দেকতি যাইয়ে যিরাম দেকিলাম, মাইয়ে তার চাইতি সুন্দর। মুকুলির সাতে মানাইয়েচে ভালো। তুমার মনে কোনো কষ্ট আর থাকপে না’। শুকনো সুপুরিতে একটু জোরে কামড় দিলেন জোহরা খাতুন। কিছু বললেন না। একমনে আরেকটা পান বানানোয় ব্যস্ত হয়ে মুখ নিচু ক’রে রইলেন।
এতো রাত পর্যন্ত কখনও জেগে থাকে না মুকুল। একটু পর পর ঝিমুনি আসছে। মুখ তুলে উপরের দিকে তাকালো একবার। হালকা মেঘের আড়ালে ঘুম পেয়েছে হয়তো চাঁদেরও। স্বপ্নের মতো ভেসে উঠছে রুবি’র মুখ। চাঁদের গায়েও রুবির ছবি আঁকা। কেমন সুন্দর সাজানো হয়েছে ওকে। সিনেমায় নায়িকাদের বিয়ের সময় যেভাবে সাজায় ঠিক সেই ভাবে। কারো ডাকে ফিরে তাকালো মুকুল। ছোটো বোন লিলি আর ওর দলবল এগিয়ে আসছে। লিলি হাত টেনে বললো, ‘আর ওই চাঁনের দিকি দেকতি হবে না, তুমার আসল চাঁন বইসে আচে ঘরে, চলো। মুকুলের দুই হাত ধ’রে টানছে ওরা। মুকুল আঁঠার মতো বসে আছে। লিলি জানে কীভাবে মুকুলের অনড়তা ভাঙতে হয়। দুই হাতের আঙুল মেলে বগলের নিচে কাতুকুতু দিলো। হো হো ক’রে হেসে উঠে পড়লো মুকুল। এই কাজটা শুধু লিলি করতে পারে। অন্যকেউ সাহস পায় না।
এতোগুলো মেয়ের মাঝখানে টলতে টলতে অনিচ্ছুক পায়ে ঘরের দিকে এগোলো মুকুল। ওরা বসালো মুকুলকে। রুবির পাশে। স’রে আসতে চাইলো মুকুল। মেয়েরা ঠেঁসে ধ’রে হালকা ধাক্কা দিলো। স’রে আসতে পারলো না। লিলি বললো, ‘এটটুও নড়বা না মুকুল ভাই, আর ঘুম পইড়ে ভাবীডার বাসর রাইত নষ্ট করবা না’। মুকুল ঘুমভরা চোখে হাসলো। আড়চোখে ওর হাসি দেখে ফেললো রুবি। ভালো লাগায় মোচড় দিয়ে উঠলো মন। লিলিরা চ’লে গেলে একটু স’রে এলো মুকুল। প্রায় মু্খোমুখি হবার মতো ক’রে বসলো। আলো জ্ব’লে আছে ঘরে। মাটির দেয়াল আর খড়ের চালের ঘরখানায় রাতের বেলা একটু গরম কমে আসে। তা’ছাড়া শ্রাবণের বৃষ্টির ভিজে হাওয়ায় গুমোট কেটে গিয়ে হিমেলতা এসেছে। কাঠের জানলার ফাঁক দিয়ে মিহি বাতাসের ফুঁ আসছে। নড়ে নড়ে উঠছে রুবির ঘোমটা। মুখ নিচু ক’রে আছে মুকুল। মাথাটা দু’একবার ঝুঁকে ঝুঁকে পড়লো। হঠাৎ গলার আওয়াজে মাথা সোজা ক’রে তাকালো। দেখলো রুবি তাকিয়ে আছে। ঘোমটা সরানো। চেনা জানা দৃষ্টি। বলছে, ‘তুমার ঘুম আসলি শুইয়ে পড়ো। আমি তাড়াতাড়ি শুইনে’। খুব লজ্জা পেলো মুকুল। ব’লে উঠলো, ‘না না না, ঘুম আইসতেচে না, তুমার সাতে কী কতা বলবো তা-ই ভাবতিলাম’।
রুবি হেসে বললো, ‘ কতা খুঁইজে যদি না পাও, তালি আমি কতা বলি। পড়ে মনে পড়লি তুমি বলবা’। রুবির রসিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলো মুকুল। চোখ বড়ো বড়ো ক’রে তাকিয়ে থাকলো। চাঁদ দেখার মতো ভালো লাগায় ভরে গেলো মন। কেমন সুগোল সুন্দর মুখখানা রুবির। ঘরের আলোর চেয়ে উজ্জ্বল। হাতদুটো রুটির ব্যালনের মতো। হাত বাড়ালো রুবি। স’রে এসে মুকুলের হাতদুটো টেনে নিলো নিজের দিকে। আধমুঠো ক’রে রাখা হাতের ওপরে চুমু খেয়ে কোলের ওপর রেখে দিলো। হাত সরালো না মুকুল। কেমন যেনো দেবে দেবে যাচ্ছে ওর হাত রুবির কোলে। রুবি দু’হাত মেলে মোনাজাতের ভঙ্গিতে চোয়াল স্পর্শ করলো মুকুলের। মাথা টেনে শুইয়ে দিলো উরুর ওপর। লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে মুকুল। ভোরের সূর্যের মতো ঝুলে আছে ওর মুখ। ঠোঁটদুটো রক্ত-গোলাপ। কী মধুর ঘ্রাণ আসছে সেই অধর-গোলাপের। একটু একটু ক’রে নিচে নেমে আসছে ফুল দুটো। তাদের ঘ্রাণময় ছোঁয়া লাগলো মুকুলের ঠোঁটে। চোখ বুঁজে এলো ওর।
অন্যান্য দিনের মতো খুব সকালে ঘুম ভাঙলো মুকুলের। ওকে দ’হাতে পেঁচিয়ে বুকের ওপর মাথা রেখে বেঘোর ঘুমে তখনও রুবি। আলতো ক’রে মাথাটা নামিয়ে রাখলো বালিশে। হাত সরিয়ে রেখে নি:শব্দে উঠে পড়লো। দরোজা খুলে দ্যাখে মা দাঁড়ানো। মুরগীর বাচ্চাদের চাউলের খুঁদ ছিটিয়ে দিচ্ছেন। ছা গুলো টিউ টিউ ক’রে খুঁটে খাচ্ছে। ওদের মা কক্ কক্ ক’রে ঘুরে ঘুরে দেখাশোনা করছে। ছেলেকে আসতে দেখে আড়চোখে তাকালেন জোহরা। কিছু বললেন না। আবছায়া আর অল্প ঘোমটার আড়ালে মা’র মুখটাও ভালো নজরে এলো না। টিউব ওয়েলের দিকে এগিয়ে বদনায় পানি ভরতে লাগলো মুকুল। নাস্তার আয়োজন করছে লিলি আর কাজের মেয়ে নাঈমা। লিলি চোখ বাঁকা ক’রে তাকালো। বললো, ‘পয়লা রাত্তিরর পরও এতো সক্কাল বেলায় ঘুম ভাইঙলো কী কইরে, ভাই?’ মুখ টিপে হাসছে নাঈমা। মুকুল বললো না কিছু। ভাবলো, এই মেয়েটার হাত থেকে রেহাই নেই।

বছর হতে চললো রুবি আর মুকুলের বিয়ে হয়েছে। ঘর সংসার অন্যান্য সবার মতো। শুধু রুবির শ্বাশুড়িকেমনে হয় এখনও পর। বাড়ীর লোক তো দূরে থাক পাড়ার এমন কেউ নেই যার কাছে রুবির সুনাম ছড়ায় নি। বাপের বাড়ীর গ্রামটাকে যেনো উঠিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে। মানুষগুলো শুধু ভিন্ন। আন্তরিকতা, মেলামেশা সব একইরকম। মুকুল যে মা’র মানসিকতা বোঝে না তা-না। তবে বউয়ের হয়ে কিছু বলতেও পারেনা। আগের মতোই ব্যবসার টাকাপয়সা মা’র কাছেই রাখে। নিজের খরচের জন্য কিছু রেখে দিয়ে মা’র হাতেই তুলে দেয় সব। মা আলমারিতে তালা-বন্ধ ক’রে রাখেন। রুবি এসবে বলে না কিছুই। সংসারের কতৃত্ব নেয়া টেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ নেই ওর। সুন্দর মনের স্বামী পেয়েছে। চেহার মন আর চলাফেরায় এমন স্বামী খুঁজে পাওয়া ভার। ওর নিঝুম মনের গহীনে ডুব দিয়ে দেখেছে রুবি। স্বচ্ছ টলটলে জলের স্রোত সেখানে। সেই-ই শুধু একলা সাঁতারু মুকুলের মনের দীঘিতে। বিয়ের প্রতিটি মুহূর্তে আবিষ্কার করেছে ওকে। ইচ্ছে ক’রে খুঁজে বের করতে চেয়েছে এক আধটু খুঁত। পায় নি। দোষে-গুণে মানুষ। রাগ দু:খ হাসি আনন্দ মিলেই মানুষ। তবেই তো মানুষ হিসেবে মানায়। তা-না হলে সারাক্ষণ তো ফেরেশতা ঘোরাফেরা করতে দেখতে হয় সামনে। ইচ্চে ক’রে ভুল করেও দেখেছে রুবি। হাসিমুখে ভালো দিক বের করে নিয়েছে মুকুল।
আর ক’দিন পর সন্তান আসবে ওদের। এ সময় যে কাজগুলো শ্বাশুড়ি ননদদের করার কথা সেগুলোও করে মুকুল। খাওয়া দাওয়ার খেয়াল রাখা— এইসবে কমতি হতে দেয়নি কখনও। ব্যবসার কাজে নাভারণ গেলে মাছ গোশতো’র পাশাপাশি ফল-ফলাদি আর সন্দেশও নিয়ে আসে। বলে, ‘তুমার জন্যি না, বাচ্চার জন্যি আনিচি আপেল’। রুবি হাসে। মনে মনে বলে, আমি জানি কার জন্যি।
সন্তান জন্ম হওয়ার দিন এগিয়ে আসছে। বাপের বাড়ীতে মায়ের কাছে থেকে বাচ্চা হবে এই আশা রুবির। মুকুলও মত দিয়েছে। শ্বাশুড়ি বলেন নি কিছু। ছোট-ভাইবোন মিঠু আর রেখা নিতে এসেছে রুবিকে। মুকুলও যাচ্ছে সাথে।
রুবি রেখা আর মিঠু ভ্যান-রিকশায় বসেছে। মুকুল পেছনে, সাইকেলে। বায়সা গ্রামের ব্যাতনা নদীর পাশ দিয়ে চলছে ভ্যান। নদী হলেও পানি তেমন নেই এতে। নদীর তলায় চিকন পানির স্রোত। পানি-শূন্য পাড়ে জমাট ঘাসের চাদর। ছাগল গরু চরে বেড়ায়। ঢালু উপত্যকার মতো জায়গাটায় একটু পর পর ছোটো ছোটো গাছের ঝোঁপ ব’সে আছে। যেনো শুকিয়ে যাওয়া নদীর জল-ধারা দেখে বিষণ্ন তারা। ধারা-জলে স্নান করে, কাপড় ধোয়, গরু গোসল করায় গ্রামের লোকজন। দু’পাশে গাছগুলোর শুকনো পাতা ভেসে বেড়ায় সুতোময় সেই স্রোতের ধারায়। ধারাজল দেখছে রুবি। হেঁটে যাবার মতো ধী-রে চলছে ভ্যান। তবুও হালকা ঝাঁকুনি আছে। দৃষ্টি দুলে দুলে উঠছে রুবির। চেনাজানা অনেকেই নেমেছে নদীতে। নিজেও কতো সাঁতার কেটেছে ওই পানিতে। বাপের বাড়ীর কপোতাক্ষ’র মতোই আপন ক’রে নিয়েছে একেও। কপোতাক্ষ নদের বোন যেনো এই ব্যাতনা নদী।
ভ্যান আসতে দেখে দৌঁড়ে উঠোনের বাইরে এসে দাঁড়ালেন রুবির মা, রহিমা বেগম। মিঠু নেমে বাক্স আর অন্যান্য জিনিসপত্র নামাতে লাগলো। রহিমা নামিয়ে নিলেন রুবিকে। তলপেটে হালকা হাত রেখে ধীরে বাঁকা হয়ে হাঁটছে রুবি। মা’র দিকে তাকিয়ে হেসে আছে ও। পেটের সন্তান খুট্ ক’রে লাথি মারলো মনে হয়। মিষ্টি এক ব্যথা-বোধে মুখ বেঁকিয়ে শব্দ ক’রে হাসলো। বললো, ‘বুইজলে মা, দুষ্টুডা আইজ-কাইল নড়ে খুপ, ঘোনো ঘোনো লাতি মারে’। রহিমা বললেন, ‘প্যাটের মদ্দি আর থাকতি চাচ্চে না, বাইর হতি পাল্লি বাঁচে’। মা মেয়ে হেসে উঠলো একসাথে। ঘর থেকে চেয়ার বের করতে করতে সবার হাসির শব্দে তাকালো মিঠু।
চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম ক’রে বসে আছে রুবি। বিরাট উঠোনটা ঝকঝক করছে। গোলাঘর আর গোয়ালের মাঝখানে উঁকি দিয়ে আছে আতা গাছটা। উঠোনের শেষে বড়ো আমগাছের ডাল ঝুঁকে নেমে আছে। পাতা প’ড়ে নেই একটাও। চকচকে ভাব চারদিকে। ও আসবে ব’লে মা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন সারা বাড়ী। উঠোনের বাম কোণার পাশ দিয়ে গরু-গাড়ী চলার যে পথ নিচের আমতলা হয়ে মাঠের দিকে গিয়েছে, সেই দিকে তাকিয়ে আছে রুবি। টিউব-ওয়েল থেকে পানি ভ’রে জগ আর কাঁসার গেলাস চৌকির ওপর রাখলেন রহিমা। কাঁচাঝাল পিঁয়াজ আর চানাচুরের সাথে সর্ষে তেলে মুড়ি মাখিয়ে নিয়ে এলো রেখা। দু’একবার মুখে দিয়ে পানি চাইলো। গেলাস এগিয়ে দিলো রেখা।
কী সুন্দর স্বাদ এই পানির। আলাদা রকমের ঘ্রাণ। কুসুম-উষ্ণ, টলটলে। কী অবাক ব্যাপার! জমাট মাটির গহীনে লুকিয়ে থাকে পানি। পাইপ বেয়ে উঠে আসে উপরে। খুকি-বেলায় চাপকল পোতা দেখেছিলো রুবি। চার পাঁচজন লোক পাম্প ক’রে ক’রে লোহার পাইপ পুঁতে দিচ্ছে মাটিতে। স্তর কেটে কেটে নিচে যাবার সময় নানা-রঙের কাদা-মিশ্রিত পানি উগরে দিচ্ছে গল্ গল্ ক’রে। ক’দিন পরেই ইট-সিমেন্টে কলের চারদিকে সুন্দর শান বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন ওর বাবা। কারণে অকারণে তৃষ্ণা না পেলেও কল তলায় ঘুর ঘুর করেছে। নতুন কলের কাঁচা-পানি খেয়ে খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলেছে কতো।
পানি রেখে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গিয়েছেন রহিমা। রেখা চৌকির পরে বসে আছে বোনের সাথে। ‘কী ভাবদিচাও বু?’ রেখা জিজ্ঞেস করলো। ‘আব্বা বাড়ী নেই রেখা?’ মিহি স্বরে জানতে চাইলো রুবি। ‘না, মা বলতিলো, আব্বা বাঁকড়া বাজারে গেচে। চলো বু আমরা এটটু হাইটে আসি। তুমার হাঁটাহাঁটি করা উচিত একন’।
পুকুরে জাল ফেলছে মন্টু। জমাট কমলা রঙের শেওলার স্তরে গোল হয়ে জাল নেমে যাচ্ছে পানির নিচে। কী সুন্দর জাল ফ্যালে মন্টু। বাম হাতে চিমটি মেরে টেনে ধ’রে ডান কনুইয়ে ঝুলিয়ে আগে-পিছে কয়েকবার দুলিয়ে গায়ের সমস্ত জোর জড়ো ক’রে জাল ছুঁড়ে দ্যায় সামনে। নিখুঁত বৃত্তের মতো চিড়িং ক’রে পানিতে ছড়িয়ে পড়ে জাল। হাঁটতে হাঁটতে দুইবোন জাল ফেলা দেখলো। রুবি জিজ্ঞেস করলো, এ-ই মন্টু... মাচ পাইচিস্?’ ‘না বু, কেবুলি দুইএক খ্যাপ ফেলালাম, বাইদব্যানে’। মন্টু চেঁচিয়ে জবাব দিলো।
আবুল ফকিরের বাড়ীর পাশে এসে রাস্তাটা একটু গড়ান হয়ে নিচে নেমেছে। রাস্তার ওপরে, শীতল সমৃন মাটির ঢালুতে মার্বেল খেলছে ছেলেরা। পাকা বরই’র মতো টসটসে টল্-গুটি ‌আঙুলের ধনুকে রেখে নিরিক ক’রে টকাস্ ক’রে মারছে একজন সামান্য দূরের মার্বেলের ঝাঁকে। বড়ো গুটিটা যেনো বাঘ আর নীল নীল কালচে মার্বেলগুলো ভীরু ভেড়ার পাল। মুহূর্তে ছিটিয়ে যাচ্ছে দিক-বিদিক। ওদের পাশ কেটে বু’র হাত ধ’রে আমগাছের ছায়ায় দাঁড়ালো রেখা। গলা তুলে ডাকলো কাউকে, এ-ই খুকি... বসার জন্যি এটটা পাটি নি’ আয় দিনি...’।
ঘাসের ওপর পাটি বিছিয়ে বসেছে দু’বোন। সামনে রাস্তার পাশে একটা জামগাছ। মান্দার গাছের আড়ালের ফাঁক দিয়ে তাকালে সামনে বিস্তৃত ফসলের মাঠ দেখা যায়। সেই মাঠের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই কপোতাক্ষ’র নির্মল সরু জল-ধারার শুরু। ভিজে ঠান্ডা হাওয়া চোখেমু্খে শীতল আদর বুলিয়ে দিতে লাগলো ওদের। মাঠের ওই দিক থেকেই হাওয়া ছুটে আসছে। রেখা’র চুল উড়ছে। একগোছা মুখের ওপর এসে পড়লো রুবি’র। ‘তুই আইজ চুল বানদিসনি ক্যান্?’ রেখা’র নদীর মতো বাঁকা-চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললো রুবি। বোনের আদরে মিহি হাসির রেখা হেঁটে গেলো রেখা’র সরু ঠোঁটে। কেমন ভক্তিময়, মায়াভরা মুগ্ধচোখে দেখলো বোনকে। ‘তুমি ওই গানডা আবার এটটু গাবা বু?’ ‘কোন্ গানডা রে?’ চমকে তাকিয়ে জানতে চাইলো রুবি। ‘ওই যে, পয়লা পয়লা বিয়ে হলি, গুণগুণ কইত্তে সপ-সুমায়— এ বাঁধন কেটে যেও না..., সেইডে’। ‘না-রে বু গো, গান গাতি আর ভালো লাগে না। তা’ছাড়া শরীলডাও তো খারাপ’। ‘এটটুখানি গা-ও বু...’।
বোনের আকুতি উপেক্ষা করতে পারলো না রুবি। উপরের দিকে তাকালো একবার। গাছের ডালে কিচির মিচির করছে পাখিরা। দূরের আকাশে বিকেলের একলা একখন্ড মেঘ উড়ে যাচ্ছে ধীরে। মিহিন বাতাস চিরে ভেসে এলো : ‘একই বন্ধনে বাঁধা দু...জনে...., এ বাঁধন কেটে যেও না... অশ্রু দিয়ে লে-খা এ গান কখনও ভুলে যেও না...’।
গান শেষ ক’রে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে রুবি। চোখ বুঁজে তন্ময় হয়ে শুনছিলো রেখা। সুরের রেশ শেষ হতেই চোখ মেলে তাকালো বোনের দিকে। বু’র মুখটা থমথমে। এমন কখনও দ্যাখেনি ও। হাসি ঠাট্টায়, উচ্ছলতায় দু’বোনের সময় কেটেছে। বু’র মুখের ওপর এমন মেঘ মানায় না। কিছু বলার আগে সাইকেলে বেলের শব্দে সামনে তাকালো রেখা। দেখলো, দু’পাশে পা নামিয়ে সাইকেলের সীটে বসে আছে মুকুল। ‘এতক্ষণ কুতায় ছিলেন, ভাই-সায়েপ?’ ‘বল্লা বাজারে মিষ্টি কিনতি থামিলাম। তারপর এটটু চা খাইয়ে গল্প-টল্প করলাম, তাই দেরী হইলো। সইন্দে হতি আর বাকী নেই, চলো বাড়ীর দিকি যাই’।
বাড়ী ফিরতে রাত হলো মুতালিব মোড়লের। মেয়ে আসবে সেজন্যে কত-কী কিনেছেন। সাইকেলের কেরিয়ারে আর সামনের রডের ওপর হ্যান্ডেলের নিচে বড়ো বড়ো থলে ফুলে আছে। উঠোনে দাঁড়াতেই মিঠু দৌঁড়ে গিয়ে নামালো সেগুলো। ‘কইরে, মা রুবি..., কুতায় তুই?’ মুতালিব মোড়ল চেঁচিয়ে কথা ব’লে উঠলেন।
বারান্দায় হেরিকেনের আলোয় ব’সে গল্প করছিলো দুইবোন। বাবার গলা শুনে সচকিত হলো। ‘এই আব্বা, আমরা ইকেনে’। বললো রুবি। মুতালিব মোড়ল কাছাকাছি এলে বাবা-মেয়ের চোখাচোখি হলো। বাবা তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। পলক পড়ছে না। দৃষ্টিটা একটু ঝাঁপসা হয়ে আসছে তাঁর। কিছুক্ষণ পর মেয়ের সামনে বসলেন। দৃষ্টি আরও গভীর ক’রে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ডান হাতের তালু চিবুকের ওপর রেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীরাম আচিস রে মা?’ দু’হাতে বাবার হাত আঁকড়ে ধরলো রুবি। কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কোলের ওপর। হেরিকেনের আলোয় মনে হলো অশ্রু নয়, ওগুলো আগুনের বিন্দু। বাবা আর বাবার বাড়ীর বিচ্ছেদের আগুনে অন্তর গলে গলে ঝ’রে পড়ছে এই অগ্নি-অশ্রু-বিন্দুগুলো।
সকাল থেকে কিছুক্ষণ পর পর ব্যথা শুরু হয়েছে। রহিমা বললেন, ‘ও রুবির বাপ, আইজ কোনো জাগায় যাইয়ে না। রুবির মনে হয় সুমায় হইয়ে আইয়েচে’। রহিমা’র মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন মুতালিব। জামা-কাপড় পাল্টিয়ে সাইকেল বের করলেন। রহিমা অবাক হলেন, ‘ওমা তুমি আবার কনে যাচ্চাও?’ ‘সরোয়ার ডাক্তারেরর মাইয়ে ডাক্তারী পাশ কইরে কিলিনিক খুইলেচে ঝিগোরগাচায়। বইলে রাকিলাম রুবির কতা। তাই ডাক্তার ‌আনতি যাচ্চি’।
রহিমা হা ক’রে শুনলেন কথাগুলো। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন স্বামীর দিকে। এমন স্নেহ-পরায়ণ পিতা! ছেলেময়েদের জন্য কখন কী ভেবে রাখেন বোঝা যায় না।
গাঢ় নীল রঙের একটি প্রাইভেট কার্ এসে থামলো রুবিদের বাড়ীর পাশের বেল-তলায়। ড্রাইভার বেরিয়ে এসে পেছনের বাম পাশের দরোজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকলো। ডা. নাজমুন নাহার বের হলেন। হালকা গোলাপী রঙের শাড়ী পরা। সাদামাট সাজ। চারপাশে তাকালেন ডাক্তার। তাঁর সাথে একজন নার্সও এসেছেন। দুধের মতো সাদা পোষাক, মাথায় সাদা ক্যাপ। পেছন দিকে খোলা ক্যাপের ফাঁকা দিয়ে দড়ির মতো বেণী করা চুল গড়িয়ে পড়েছে কোমর পর্যন্ত। নার্সকেই বেশি দেখছে সবাই। বাচ্চাদের ভেতর থেকে কেউ ব’লে উঠলো, ‘এই দেইকে যা, সাদা পরী আইয়েচে’। রেখা আর মিঠুর দৌঁড়ে আসা দেখে মুখ তুলে একটু হাসলেন নাজমুন নাহার। রেখা রুবির ঘরের দিকে দেখিয়ে হাঁটতে লাগলো সেদিকে। গাড়ীর পেছন থেকে ডাক্তারের ব্যাগ নিয়ে ওদের পেছনে পেছনে আসলো ড্রাইভার। বারান্দায় ব্যাগ রেখে ফিরে গেলো গাড়ীর কাছে।
এক টুকরো চিনির দানার চারদিকে পিঁপড়েরা যেমন দলবাঁধে, ডাক্তারের গাড়ীর চারদিকে সেইরকম ভীড়। গাড়ী ঘিরে আছে একদল ছেলেমেয়ে। সবাই অবাক হয়ে গাড়ী দেখছে। কেউ একজন একটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে টেনে নিলো হাত। আরেকজন শিশুর মাথায় হাত রাখার মতো আলতো ক’রে আয়না ধ’রে মুখ দেখছে। জিহবা বের করলো। ভেংচি কাটার মতো দুই ঠোঁট বেঁকিয়ে দাঁত দেখলো। হই হই ক’রে উঠলো অন্যরা। আসতে আসতে ওদের কান্ড দেখে হেসে ফেললো ড্রাইভার।
ঘন্টা তিনেক হলো ডাক্তার এসেছেন। নার্স এটা-ওটা করছেন। রহিমা মেয়ের মাথার কাছে। রেখা আর পাড়ার মেয়েরা বারান্দায়। কখন কী লাগে তা এগিয়ে দেবে ওরা। সবার মুখ ভার। মুতালিব ব’সে আছেন গোলাঘরের চালের ছায়ায়। একখন্ড পাথর যেনো বসানো জলচৌকিতে। গায়ে মাছি বসলেও নড়ছেন না। মুকুল এসেছিলো দু’দিন আগে। শ্বশুরের পাশে বসলো। এক মুহূর্তও রুবির কাছ থেকে নড়েনি ও। মুকুলের রাতদিন এখন একাকার। ঝিমুনি এসেছে ওর। গোলার চাঁচে মাথা কাত ক’রে চোখ বন্ধ বুঁজে আছে। মুকুল দেখতে পাচ্ছে না ওর শ্বশুরের চোখ দিয়ে পানি ঝরছে অবিরাম। ঘাড়ের গামছা দিয়ে চোখ মুছছেন বার বার। হেঁচকির মতো উঠছে। দুলে দুলে উঠছে শরীর। একবার ট’লে মুকুলের গায়ে এসে পড়লেন। মুকুল চোখ খুলে দ্যাখে শিশুর মতো কাঁদছেন মুতালিব। দু’হাতে শ্বশুরকে ধরে ফেলে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনি এতো ভাইঙে পড়বেন না, আব্বা। সবকিছু ভালোই ভালোই হবে ইনশাল্লা’। ‘তাই যোনো হয় বাবা’। কান্না-ভরা গলায় বললেন মুতালিব।
একটু পর দুপদাপ ক’রে বেরিয়ে এলেন রহিমা। আনন্দিত স্বরে বললেন, ও রুবির বাপ, তুমার বু হইয়েচে, বু’। উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন মুতালিব। হড়বড়িয়ে বললেন, রুবি কীরাম আচে, রুবি কীরাম আচে রইমা?’ ‘রুবি ভালো আচে। কিন্তু ওর মাইয়ে হাত পা দাপাচ্চে, তুমার কোলো ওটপে’। ভিজে ঝাঁপসা চোখে উপরের দিকে তাকালেন মুতালিব মোড়ল। দুই কানের ভেতর আঙুল দিয়ে পশ্চিম দিকে ফিরে আজান দিলেন কাঁদো কাঁদো গলায়।
বেশ অনেকক্ষণ পর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। মুতালিব মুগ্ধ চোখে তাকালেন। ডা. নাহার এগিয়ে এসে বলেন, ‘চাচা, খুব সুন্দর নাতনী হয়েছে আপনার। কী নাম রাখবেন?’ ‘ও আমার সকী হবে গো মা, ওর নাম রাকলাম আমি সোহেলী’। নাহার শব্দ ক’রে হাসলেন। বললেন, ‘সুন্দর তো নামটা। আচ্ছা চাচা, আবার তো আসতে হবে। এখনকার মতো যেতে হয় যে’।
সোহেলী হয়েছে মাস-দুয়েক হলো। এই দুই মাসে স্বামীর ভাব লক্ষণ লক্ষ্য করলেন রহিমা। গম্ভীর প্রকৃতির মানুষটা দূরন্ত বালকের মতো উচ্ছল হয়ে উঠলেন। রুবির জন্মের পর এরকমই দেখেছিলেন স্বামীকে। সোহেলী’র জন্য খেলনা জামাকাপড় ইত্যাদি এনে গাদা ক’রে ফেলেছেন। ব্যবসার কাজে ঝিকরগাছায় গেলে রুবির জন্য প্রয়োজনমত খাদ্য খাবার আনতে ভোলেন না। এরকম আনন্দময় ব্যস্ততার দিন শেষ হয়ে আসলো একদিন। মুকুল নিতে এসেছে স্ত্রী আর মেয়েকে। এই দুই মাসে কয়েক দিন পর পর আসতো। ওদেরকে সব সময় কাছে কাছে রাখতে চায় এখন। নিজের বাড়ীতে।
নিজের গরুর গাড়ীর ওপর চওড়া ছই বানিয়েছেন মুতালিব। গাড়ীর চাকার কোণায় কোণায় আলকাতরা মাখিয়েছেন যেনো চলার সময় শব্দ না হয়। রেখাকে পাঠাচ্ছেন রুবির সাথে। ব’লে দিয়েছেন, ‘তোর বু’র যোনো কোনো কষ্ট না হয়। সোহেলী’র তুই কোলো কইরে রাকপি’। মাথা নাড়লো রেখা। রুবি আর মুকুলকে আসতে দেখে চোখ-মুখের আলো নিভে গেলো তাঁর। পেছনে শব্দ ক’রে কেঁদে উঠলেন রহিমা। সোহেলীকে বাবার দিকে এগিয়ে দিলো রুবি। গামছায় ভালো ক’রে কয়েকবার হাত মুছে হাওয়ায় ওড়া এক টুকরো তুলো হাতের তালুতে তুলে আনার মতো আলতো আঁকড়ে বুকের সাথে গেঁথে ধরলেন সোহেলীকে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন নাতনীর মুখের দিকে। বড়ো বড়ো চোখে নানা’র দিকে তাকিয়ে হাসলো সোহেলী। মুতালিবের চোখের পানি গড়িয়ে টুপ ক’রে সোহেলী’র গোলাপী জামায়। পাশ থেকে আঁচল দিয়ে বাবার চোখ মুছে দিলো রুবি। বললো, ‘মন খারাপ কইরে না আব্বা, একমাসের মদ্যি আবার আসপানে। এর মদ্দি মাজে মাজে তুমি যাইয়ে দেইকে আসপা’। কিছু বলতে পারলেন না মুতালিব। থর্ থর্ ক’রে কাঁপতে লাগলেন। বাবার কোল থেকে সোহেলীকে উঠিয়ে নিলো রেখা। রুবিকে জড়িয়ে ধ’রে কেঁদে উঠলেন মুতালিব মোড়ল।

সকালটা কেমন ক’রে ফুরিয়ে গেলো মনে নেই রুবির। প্রতিদিনের মতো নাস্তা বেরিয়ে গেলো মুকুল। তাড়াতাড়ি ফিরবে বললো। বাবার বাড়ী যাবার আনন্দে সকালে তেমন কিছুই খায় নি রুবি। মুকুলকে রুটি, আলু আর ডিমভাজি দেবার সময় ভাজি পেঁচিয়ে একটা রুটি কামড়ে খেয়েছিলো। ঢক্ ঢক্ ক’রে পানি খেয়ে গোছগাছে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো আবার। নিজের কাপড়-চোপড়ের সাথে সোহেলী’র জামা-কাপড়, দুধ ইত্যাদি গোছাতে সময় লাগলো বেশিরকম।
সকাল দুপুরের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সোহেলীটাও আজ যেনো একটু কান্নাকাটি করছে বেশি। বারান্দায় শুয়ে আছে সোহেলী। উঠোনে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ওর চোখের মুখ নামিয়ে এনে রুবি বললো, ‘আইজ তুই নানার বাড়ী যাবি, দেরী সইজ্জো হচ্চে না তাই এতো কানতিচিস? চুপ কর্, তোর আব্বা একুনি আসপে, আমাগের নে যাবে’। মা’র কথার আওয়াজে একটু চুপ করার পর হাত-পা ছুঁড়তে লাগলো। ঠোঁট বেঁকিয়ে রাখলো। টসটসে গাল দুটো বৃষ্টি-ভেজা পাকা আমের মতো হয়ে আছে। ডাগর দুটো শিশুচোখ টলমল করছে পানিতে। চোখের কোণা দিয়ে যেনো দু:খ গড়িয়ে পড়ছে এখনও। টিকোলো নাকের দুইপাড় লাল হয়ে ফুলে ফুলে উঠছে। নি:শ্বাসের সাথে হেঁচকি উঠছে বার বার।
সোহেলীকে কোলে তুলে নিলো রুবি। হাতের তালু দিয়ে চিবুকের পানি মুছে চুমো খেলো ভেজা গালে। কারো ডাকে পেছন ফিরে তাকালো। ‘বউ মা..., মা... এটটু শুইনে যা এদিকি’। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো শ্বাশুড়ী রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। চোখে চোখ পড়তেই ডাকলেন হাত নেড়ে। কেমন স্নেহার্দ, মায়াবী আহবান।
বিস্ময়ে স্থবির হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো রুবি। সোহেলীকে দেখলো একবার। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ওর মুখের দিকে। তারপর ধী-রে যন্ত্রের মতো নামিয়ে রাখলো বিছানায়। একপা দু’পা ক’রে এগোতে এগোতে ভাবতে লাগলো। শ্বাশুড়ী আজ ওর সাথে কথা বলেছেন। বউমা শুধু না, মা ব’লেও ডেকেছেন। কী-যে ভালো লাগছে, কী-যে আনন্দ আজ ওর মনে। এই দুই বছরে মুখের দিকে ভালোমতো তাকান নি। কথাও বলেন নি। ইশারা-ইঙ্গিতে আর অন্যের মাধ্যমে কথা ছুঁড়ে দিয়েছেন। আজ মনে হয় মন নরোম হয়েছে তাঁর। গ্রহণ করেছেন ওকে মনে-প্রাণে। ভাবতে ভাবতে বার তিনেক আকাশের দিকে তাকালো রুবি। উদ্বেলিত, উৎফুল্ল মনে দ্রুত পায়ে চলতে চলতে ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলো। ক্ষণিকের দৃষ্টিতে আকাশ দেখা গেলো না তেমন। ঝাঁপসা, কুয়াশার মতো মনে হলো। শুধু দেখতে পেলো একখন্ড মেঘ কালো হয়ে এগিয়ে এসে আড়াল করলো আকাশ।
‘তাড়াতাড়ী আয় বউমা, ভাত বাড়িচি তোর জন্যি। তুই খা, আমি ন্যাদা কোলে নিচ্চি’। শ্বাশুড়ী গলায় আরও মমতা মাখিয়ে ডাক দিলেন। ডুক্ ক’রে কেঁদে উঠলো রুবি। সে কান্নায় শব্দ হলো না। শরীর দুলে উঠে আনন্দ-ভরা একরাশ রুদ্ধ শ্বাস বেরিয়ে এলো শুধু। ‘আইজ বাপের বাড়ী চইলে যাবি, ভাবলাম নিজির হাতে ভাত বাইড়ে খাওয়াই। মা’র হাতের রান্দা খাইয়েও আমার কতা যাতে মনে থাকে’। হেঁসেলের বারন্দায় উঠতে উঠতে শ্বাশুড়ীর কথাগুলো কানে বাজলো রুবির। দৃষ্টি স্থির ক’রে মুখখানা দেখলো শ্বাশুড়ীর। ঠিক মুকুলের মুখ। মুকুল যেনো ভর করেছে আজ মা’র ওপর। চোখে মুখে সেই হাসি, সেই উজ্জ্বলতা, সেই আন্তরিক আহবান। ‘তুই শিগগির খাইয়ে গুছায় নে, মুকুল আইসে পড়বে একুনি। আসার সুমায় ভ্যান নে আসপে সাতে কইরে’। বললেন, শ্বাশুড়ী। গলা তুলে উঁচু স্বরে রুবি বললো, ‘ঠিক আছে আম্মা’।
রান্নাঘরে ঢুকে পিড়ি টেনে বসলো রুবি। অবাক হয়ে গেলো। কড়ির প্লেটে ভাত বেড়ে সুন্দর প্লাস্টিকের সরা দিয়ে ঢাকা। ছোটোবড়ো বাটির ঢাকনা উল্টে উল্টে দ্যাখে অনেক পদের তরকারী। কেবল রান্না-করা তরকারীর ঘ্রাণ নাকে যেতেই ক্ষুধা আরও বেড়ে গেলো। সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়াও হয় নি। গরম ভাতের ওপর এক টুকরো ডাঁটা-শাক লেবু মুচড়ে মেখে ছোটো নলা মুখে দিলো রুবি। অমৃতের মতো স্বাদ। চোখ বুঁজে আসতে চাইলো। একের পর এক নানা-পদের তরকারী দিয়ে মেখে মেখে কখন যে এতোগুলো ভাত খেয়ে ফেললো টের পায় নি। গলা শুকিয়ে আসতে লাগলো। ঢক্ ঢক্ পানি খেলো অনেকখানি।
পানি পেটে যেতেই গা গুলিয়ে উঠলো। খাবার মোচড় দিয়ে উঠলো পেটে। একটা জলজ মিহি জ্বলন তিরতিরিয়ে উঠে আসতে লাগলো গলা বেয়ে। বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠলো যন্ত্রণাটা। বুক-জ্বলা দাউ দাউ আগুনের মতো ছড়িয়ে গেলো সারা শরীরে। বসা থেকে সটান দাঁড়িয়ে গেলো রুবি। মাথা ঘুরছে। চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে। নি:শ্বাসে বাতাসের বদলে বেরিয়ে আসছে হু হু অদৃশ্য আগুন। বুক চেপে ধ’রে দৌঁড়ে বাইরে এলো রুবি। ঘ্যাংরিয়ে ডাকলো শ্বাশুড়ীকে। উঠোনে দাঁড়ানো শ্বাশুড়ীর গায়ে ধাক্কা খেয়ে গড়িয়ে পড়লো। চিৎ হয়ে ছটফট করতে লাগলো। মাথা নেড়ে নেড়ে দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘুরিয়ে খুঁজতে লাগলো কাউকে। কথা বলতে চেয়েও স্বর বের করতে পারলো না। স্থির হয়ে আসা চোখে দেখলো, শ্বাশুড়ি ঝুঁকে আছেন ওর মুখের ওপর। মুকুলের মুখের সাথে মিল নেই এর। কুৎসিত বাঁকা হাসিতে অন্ধকার হয়ে আসছে শ্বাশুড়ীর মুখ।
মুকুল বাড়ী আসতেই সোহেলীকে কোলে নিয়ে হাউমাউ ক’রে কেঁদে পাড়ার সবাইকে জড়ো ক’রে ফেললেন মুকুলের মা। ‘ও-রে... মুকুল রে... সব্বোনাশ হইয়ে গেচে...। তোর রুবি গলায় দড়ি দেচে, ডাক্তার নি আয়’। কাঁদতে কাঁদতে ঘরের দিকে ইশারা করলেন। মুকুল সাইকেল ফেলে দিয়ে ঘরের দিকে দৌঁড় দিলো। ঘরের আধখোলা দরোজা ঠেলে ভেতরে গিয়ে দ্যাখে রুবি। ওদের ঘরের চালের বীমে দঁড়ি ঝুলছে। রুবি শুয়ে আছে মেঝেয়। গলা-জুড়ে কালো দাগ। চোখ আধ-খোলা। নাকে হাত রাখলো মুকুল। নি:শ্বাস নেই। কাঁধ ধ’রে ঝাঁকুনি দিলো। দু’হাতের পাতা বুকের ওপর চেপে পাম্প করলো মুকুল। কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। ছোটোবোনকে ডাকলো। বললো, ‘শিগগির মোসলেম ডাক্তারের ডাক দে...’। তোর ভাবী’র সাড়া-শব্দ নেই।
মোসলেম ডাক্তার আসলেন। নাড়ী দেখলেন। মুখ অন্ধকার ক’রে কিছুক্ষণ রুবির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তোমার বউ’র কেউ বিষ খাওয়ায়েচে মুকুল। ও গলায় দঁড়ি দেয় নি। গা’র রঙ দেখো, নীল হইয়ে গেচে। একনও মুকি ফেনা’। ডাক্তারের দিকে শান্ত স্থির ব্যথা-ভরা চোখে তাকালো মুকুল। আস্তে আস্তে উঠে বাইরে এলেন মোসলেম ডাক্তার। উঠোনে আসতেই দেখতে পেলেন মুকুলের মাকে । ডাক্তারকে দেখে মুখ নিচু ক’রে স’রে গেলেন ভীড়ের ভেতর।