প্রেম ও প্রকৃতি: সিমাস হিনি
ভাষাবদল:কামাল রাহমান, সোমবার, নভেম্বর ০৫, ২০১২


আইরিশ কবি সিমাস হিনির জন্ম ১৯৩৯ সালে, নাট্যকার ও অনুবাদক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৯৫এ কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পান। হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড, উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জণ করেন কবিতার জন্য। বাংলায়ও তাঁর কবিতার অনেক অনুবাদ রয়েছে।


অ্যানাহোরিশ

অ্যানাহোরিশ
আমার ‘‘স্বচ্ছ জলের হ্রদ”
পৃথিবীর প্রথম পাহাড়চূড়ো
যেখানে ঝরনা ধুয়ে দেয়
উজ্জ্বল ঘাসেদের

এবং উজ্জ্বল করে
পথে বিছানো পাথরগুলো।
অ্যানাহোরিশ, ব্যাঞ্জনবর্ণের
মৃদু ঢাল, তৃণভূমি স্বরবর্ণের,

বাতির পরবর্তী প্রচ্ছায়া
ঝুলে থাকে আঙ্গিনায়
শীতের সন্ধ্যাগুলোয়।
জলপিপে ও সমাধিগুলোয়

ঐ টিলাবাসীরা
ডুবে যায় কোমর পর্যন্ত, কুজ্ঝটিকায়
পাতলা বরফের স্তর ভাঙে
কূপগুলোয় ও গোবরগাদায়।

ঘুড়ি

অন্য জীবন অন্য সময় ও অন্য অবস্থান হতে আসা বাতাস।
হাল্কা নীল, স্বর্গীয় ঐ বাতাস ভেসে আসে কারো দিকে
ডানা ঝাপটায়, একটা সাদা ডানা, মুদুমন্দ বাতাসের বিপরীতে,

হ্যাঁ, ওটা একটা ঘুড়ি! যেমন এক বিকেলে
সবাই বেরিয়ে পড়ি ওখানে
কাঁটা-ঝোপের ঘের ও সার-দেয়া কাঁটার ভেতর

আবার দাঁড়াই, থামি ঐ অ্যানাহোরিশ পাহাড়ের বিপরীতে
আকাশ থেকে নীল ছেঁকে নিতে,
ঐ মাঠের পেছনে আমাদের লম্বালেজের চোঙা ওড়াতে।

লাফাতে থাকে ওটা এখন, টান দেয় হেঁচকা, ঘুরে যায়. গোত্তা খায় তির্যকভাবে,
আবার উঠে যায়, বাতাসের সঙ্গে ভেসে যায়, যে-পর্যন্ত না
আমাদের চিৎকার উঠে যায় নিচ থেকে অনেক উপরে।

উঠতে থাকে ওটা, ঘূর্ণিচাকার মতো আমার হাত সুতো
ছাড়ে অবিরাম, হালকা এক ফুলের পাপড়ির মতো
আকাশ বেয়ে উঠতে থাকে ওটা, আরো উঁচুতে, এবং আরো,
বুক ফুলিয়ে, পায়ে শেকড় না জড়ানো পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে
আটকে রাখে অবাক-চোখ ও পুলকিত অন্তরে ঘুড়ি-ওড়ানো বালকদের।
যে-পর্যন্ত না ওটার সুতো ছিঁড়ে যায় বিচ্ছিন্ন, প্রাণিত
নেমে আসে ঘুড়িটা, একাকী, একটা বর্ণহীন বাতাসের নেমে আসা।

গান

রঞ্জনমাখা এক বালিকা-ঠোঁটের মতো
এক থোকা বৈঁচিফল।
সড়কের চলন্ত সারির বিপরীতে
মূল সড়ক ও পার্শ্ব-পথে
জলে ভেজা এলডার গাছেরা
দাঁড়িয়ে থাকে, স্থির।

প্রকৃত শব্দতরঙ্গের প্রক্ষেপে
পঙ্কজ ফুল ফোটে উপভাষার
খুব নিবিড় ঐ মুহূর্তে
পাখি গায় প্রকৃতির অনুপম সংগীত।

অ্যারানে প্রেমিকারা

সময়-সম্পর্কহীন ঢেউগুলো, বাতাস ছেঁকে আসা, উজ্জ্বল,
চকচক করে ধেয়ে আসে চারপাশে, ভাঙ্গা কাচের মতো
ঝলকে ওঠে পর্বতের ভেতর, ছেঁকে আসে আমেরিকা হতে

অ্যারানের দখল নিতে। অথবা ধেয়ে আসে অ্যারান
পর্বতের বাড়িয়ে দেয়া বিস্তৃত বাহুর দিকে,
একটা ভাটার জন্ম দেয় ঐ ঢেউ, শান্তভাবে লুটিয়ে পড়ে পায়ের কাছে।

সমুদ্র কি নিরূপণ করে স্থল, না স্থল সমুদ্রকে?
ঢেউয়ের প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ নতুন অর্থ এনে দেয় প্রতিবার।
ভেঙ্গে যায় সমুদ্র, স্থলের পায়ে, পরিচয়ের পূর্ণতা প্রকাশে।

বসন্তের শেষকৃত্য

অতএব শীত বন্ধ করে ওর নির্মম বাহু
এটা আটকে যায় এক চাপযন্ত্রে
ঐ চাপকলের গলায় জমে ওঠে একটা চাকা

হিম দেখতে পায় নিজেকে
কঠিন লোহার উপর। চাপকলের হাতল
নিঃসাড় হয়ে থাকে এক কৌণিক বিন্দুতে।

পেঁচিয়ে ওঠে গমের খড়
একটা রজ্জুতে, শক্তভাবে এঁটে থাকে ওটার
কাঠামোয়, ও সূঁচালো অংশে, তারপর এক ঝলক আলো

ঐ চাপকল বদলে যায় উজ্জ্বল এক শিখায়
অতপর শীতল হয় এটা, অর্গল খুলে ফেলি আমরা, ওটার
প্রবেশমুখ ভেজা, এবং সে আসে।

পার্চ

বান নদীর স্বচ্ছ জলে ভেসে থাকে এই
পার্চ মাছেরা
এলডার গাছেরা দুলেদুলে আলোছায়া তৈরি করে কাদালেপা ঐ নদীতীরে।
‘ঘরঘরে’ বলে ওরা পার্চ মাছেদের, ছোট্ট বামন, সদা-প্রস্তুত
বানভাসি নদীর জৌলুসভরা শরীরে
যে-কোনো সময় পেরোনো যায় ঐ নদী, অথচ ঔদ্ধত্য নিয়ে আগলে থাকে ওরা
পথ,
জলের ছাদের নিচে, নদীর তলায়, ঝিমিয়ে থাকে ওরা
স্রোতের ভেতর, অথবা এর বিপরীতে
ওদের পাখার নিচে জমিয়ে রাখে ঘোলাজল, এলডার গাছের চারপাশে, বাতাসে
বানের স্রোতের নিচে ধরে রাখে
যা কিছু প্রবহমান, এবং স্থির, এই পৃথিবীর।

আশ্চর্য ফল

কবর থেকে তুলে আনা একটা কুমড়োর মতো বালিকার ঐ মাথা।
ডিম্বাকৃতি, শুকনো আলুবোখারা ত্বক, ঝামাপাথরের মতো দাঁত।

চুলের জঞ্জাল হতে ভেজা কাপড়ের ফালি সরিয়ে ফেলে ওরা
দেখায় ওটার প্যাঁচের গড়ণ
কিছুটা বাতাস লাগুক ওর ত্বকের সৌন্দর্যে।
চর্বির দলা, য়িষ্ণু, রত্নভাণ্ডার:
জমাট ঘাসের কালো টুকরোর মতো ওর ভাঙ্গা নাক,
শূন্য কোটর পুরোনো গর্তের মতো।
দোষ স্বীকার করে ডিওডোরাস সিচেলাস
ধীরে ধীরে মুছে যায় এটার প্রতিরূপ
খুন করা, ভুলে যাওয়া, নির্মম কুঠার
এবং স্বর্গপ্রাপ্তি, নির্মম।
এটা শুরু হয়েছিল অনুভব করাতে বিস্ময়, ও গভীর ভীতি।

সত্যায়ন

‘ইয়াঙ্কেরা এলো
যখন শুকরছানাগুলো নিধন করছিলাম আমরা।
মঙ্গলবার সকালে, সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত
কষাইখানার বাইরে
রক্তে ভরা নর্দমা।
হয়তো মূল সড়ক হতে
ওরা শুনেছে ওদের আর্তচিৎকার,
এবং শুনেছে ওটার থেমে যাওয়া, তারপর দেখতে পায় আমাদের
এই পাহাড়ের নিচে,
আমাদের দস্তানা ও রক্তাক্ত এপ্রোন নিয়ে।
দুটো সারি ওদের, কাঁধে ঝোলানো বন্দুক, মার্চ করে আসে ওরা
সাঁজোয়া গাড়িতে, কামানের ভেতরে, ও খোলা জীপে।
সূর্যে ঝলসানো ওদের হাত, ও অস্ত্রগুলো।
নামিয়ে রাখে অস্ত্র ওরা, পদপে শান্ত,
অপো করে লাল নর্ম্যান্ডি মদের জন্য।
এমন নয় যে আমরা জানিনে
কোথায় যাচ্ছে ওরা, দাঁড়িয়ে আছে এখন
তরুণ তুর্কীর মতো
ওরা ছুঁড়ে দেয় আমাদের
রঙিন মিঠাই, ও নরোম চকোলেট’

অন্ত্যেষ্টিসংগীত

ওভারকোটের পকেটগুলো আমাদের যবচূর্ণে ভরা...
কোনো রন্ধনশালা নেই যাত্রাপথে, নেই আকর্ষণীয় কোনো তাঁবু...
দ্রুত সরে এসেছি আমরা, এবং অকস্মাৎ নিজেদের ভিটেয়।
খানাখন্দের পেছনে পড়ে থাকে যাজক, তার ভারি পদেক্ষেপে
কেউ একজন দৌড়ে যায় বড়জোড়... চড়াইয়ের দিকে...
খুঁজে পাই প্রতিদিন নতুন এক কৌশল
কেটে ফেলা যেতো ওটা লাগাম দিয়ে অথবা
গরুগুলোকে ছত্রভঙ্গ করা যেতো বর্শা দিয়ে, পদাতিকে,
ফিরে আসা যেতো তারপর, ঝোপের ভেতর দিয়ে
যেখানে ছুঁড়ে ফেলা হতো অশ্বারোহীদের
যে-পর্যন্ত না... ভিনেগার পাহাড়ে... চূড়ান্ত হয়ে উঠতো গোপনক
মরেছে হাজার হাজার, সারিবদ্ধ কামানের সামনে কাঁচি নাড়িয়ে
রক্তে রঞ্জিত করেছে পাহাড়, ভাঙ্গা ঢেউয়ের সারি এখন আমরা।
ওরা সমাহিত করে আমাদের কাফন অথবা কফিন ছাড়া
এবং অগাস্টে... আমাদের সমাধিতে আবার জন্ম নেয় নতুন যব।

পুনশ্চে

সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরে, বাতাস
ও আলো নিবিড়ভাবে মেতে থাকে নিজেদের সঙ্গে
পশ্চিমে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে আসে কিছুটা সময়
পতাকা ওড়ানো উপকূল বেয়ে ধীরে এগিয়ে যায় গাড়ি
গ্রামের পাশে সমুদ্র হয়ে ওঠে বুনো একদিকে, সাদাফেনা,
সকল চাকচিক্য নিয়ে উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক
রাজহাঁসের ডানা ঝলকানিতে
আলোকিত হয়ে ওঠে পর্বতের পাথর
ও হ্রদের ধূসর-কালো, উজ্জ্বল উপরিতল
এলোমেলো হা্সঁগুলোর পালক, অমসৃণ, সাদার ভেতর সাদা,
বেড়ে ওঠা ওদের ঝুঁটিগুলো দেখায় শিরস্ত্রাণের মতো
কখনো আঘাত করে ওরা অথবা উঠে আসে অথবা ব্যস্ত থাকে জলের নিচে।
অকারণে ভাবো তুমি যে ধারণ করবে এসব,
আরো গভীরভাবে। বস্তুত এখানে নেই তুমি, ওখানেও না,
অতিক্রম করে যাও অজানা এক চঞ্চলতার ভেতর দিয়ে
জানা ও বিস্ময়কর বিষয়গুলো, নরোম ও কর্কশ একটা আঘাত আসে
গাড়ির পাশ থেকে, খামচে ধরে বুকের ভেতর, এবং খুলে ফেলে দরোজা।