আলম সৈয়দের ৬টি কবিতা
আ ল ম সৈ য় দ, সোমবার, অক্টোবর ২২, ২০১২


আলম সৈয়দের জন্ম ২ নভেম্বর মহেশখালী দ্বীপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মহেশখালী কলেজে ইংরাজি পড়ান। অনেক লিটলম্যাগে তার কবিতা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও এখনো কোনো বই প্রকাশিত হয় নাই।



কৃষ্ণচূড়া

কৃষ্ণচূড়ার ভেতরে লালের অধিক লাল হয়ে ফোটে আছে পরম কৃষ্ণচূড়া
সবুজের ভেতরে হাসে বিকশিত সবুজ
আকাশটাই শুধু শুনে সৈকতের প্রেম ও যন্ত্রণার এক অপূর্ব উচ্ছ্বাস
যে শূন্যতা আমার শিরায় শিরায় অস্তিত্বের ও অধিক বাস্তব
তার খোরাক হতে পারে সমগ্র সৃষ্টিজগত

কেয়াং ঘরের প্রাকৃত নিস:ঙ্গতায় ফুটেছে কাঁঠালিচাঁপার শুভ্র ফুল
পরিত্যক্ত পুরুনো বাড়ি তার নির্জনতায় জাগিয়ে তোলে হাজারো উদ্ভিদ
একা একটা পাখি একতারা হয়ে যায়
ভরে দেয় সুরের জগত দূরবিশ্বের সোনালি সঙ্গীতে
প্রভু, সম্মত আছি দগ্ধ হতে হারানোর অগ্নিকুন্ডে
এটুকুই প্রার্থনা –- আমার নি:সঙ্গতা যেনো ফুল হয়ে ফোটে ।


পুর্নজন্ম

নারিকেল গাছের একটা সবুজ ডালে প্যাঁচানো কাফনের কাপড়
তার ভেতরেই ছিল তার এক বছরের সবুজ শরীর
এক বছরের মাথায় অপারেশনের সেলাই
তখনো হাঁটতে ও শিখেনি
তার আগেই তার কাছে ডাক পেড়েছিল মহাকাশ

স্মৃতির সূক্ষ্ম পথ বেয়ে আসতো সে ঘুমে
তারপর আমার মগজে প্রকৃতির অপারেশনের পালা
আমার কাছে ও ডাক পেড়েছিল আকাশের তারা
প্রেমিকার মতো চোখ দিয়ে তাকিয়েছিলো আকাশপাড়া
তারপরও মাটির জরায়ু আমাকে জন্ম দিয়েছে আবার
আমার সাথেই যেনো জন্ম নিলো আবার ঐ একবছরের প্রাণ
প্রকৃতি এখনো পুরোটা সারিয়ে তোলেনি তার পুরুনো অসুখ
তার মাথায় এখনো লেপ্টে আছে অদৃশ্য ব্যান্ডেজ ।

দিকচিহ্নহীন

চিরচেনা মুখ যখন অচেনা হয়ে যায়
কি কাজে লাগে তখন পরিচিত শহর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট
পরিচিত গ্রাম-নাড়িকাটা গ্রাম কি কাজে আসে তখন
আজীবন বারবার নাড়িকাটার যন্ত্রণা বয়ে চলার নামই কি জীবন
কেবলি আমূল উদ্বাস্তু হয়ে পড়া
জন্মদাত্রী মাটির থেকে
প্রেমিকার হৃদয় থেকে
আর অচেনা সঙ্গীর সাথে গুণ টানা অজানা নদীতে
আর হৃদ্যতার আগেই নির্বাসিত হওয়া আরেক গ্রহের মাটিতে
চিরচেনা কন্ঠস্বরে যখন অনুরণিত অস্বীকৃতির সুর
তখন প্রকৃতি ও সৃষ্টি করতে পারে না কোনো আশ্রয়স্থল
বরং তার ভেতরেই অন্ধকার ও পাপের হাত পা গজিয়ে উঠে
সন্ধ্যার স্বর্ণালী চাঁদ হয়ে উঠে পরিহাসপ্রবণ
নীরবতার কিরিচ কেটে দেয় সম্পর্কের সব শিরাউপশিরা
ভবিষ্যতের সব দরোজায় লাল সংকেত
কোথায় যাবে তুমি যখন ঈশ্বর ও একপাল বানরের সাথে স্বর্গে বসে হাসে


ধুলো আর কুয়াশার কাহিনী

যেখানেই যাই একটা নি:সঙ্গ গাছ সঙ্গী হয়ে থাকে
প্রেতাত্মার মতো জড়িয়ে থাকে দিনরাত
শীত এলে ধুলোর চুম্বনে অতীষ্ট সে কুয়াশাকেই পরমাত্মীয় বলে মেনে নেয়
আমি ও আত্মীয় হিসেবে ধরি মেরুমজ্জায় চিরজাগরুক মহাজগতের ঐ কুয়াশাকেই
রোদ পড়লে সে জানে রোদ সরে যাবে মেঘমাল্লার আমন্ত্রণে
ফুল ফুটলে প্রজাপতি আসবেই
মৃত্যুর শক্ত খোলস ভেঙে সংগ্রহ করে নিতে জীবনের বীজ
গাছটি জানে - তাই নিজেকে সজ্জিত করে উৎসর্গের রঙে
ঋতুর প্রতি আমার অতটা আত্মীয়তা নাই
রোদ -বৃষ্টি- মেঘে আমার একটাই ঋতু স্থায়ী হয়ে থাকে
ঋতু বদলের শত ঘাত-প্রতিঘাতে কপোট্রনে কুয়াশাই অবিকৃত থাকে ।


নস্টালজিয়া

শুধু একজোড়া ডানার আশায় ডাইনোসরেরা বিসর্জন দিয়েছিল পর্বত প্রমাণ দেহ
তবু স্বর্গ ছাড়ে নি
শুধু টিকে থাকবার আশায় এমিবা কখনো সঙ্গী খুঁজে নি
অমরত্বের মদে আসক্ত হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেকেই করে আসছে দুভাগ
আর হাইড্রা থেকে গেছে পরিবর্তনের ক্রীতদাস
কিন্তু স্বর্গ ছাড়ে নি
বানরেরা বিদ্রোহ করে বসল একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে
আমরা তো স্বর্গ ছেড়েছি প্রভু
কিসের আশায় তাও ভুলে গেছি
তাই বুঝি আমাদের ভেতরে এই নি:সীম খাঁ-খাঁ
স্বর্গের বদলে তুমি মূলত আমাদের দিয়ে গেছ স্বপ্নের অসুখ ।


বৃষ্টি ও পাহাড়


পাহাড়ের বাতিজ্বলা রাতে আজ আসেনি কেউ
সমন্বয়ী বৃষ্টির আড়াল নিয়েছে ঐ সমুদ্রের ঢেউ
এমনকি ঝিঁ ঝিঁ পোকারা ও থামিয়ে দিয়েছে জীবনের সব স্পন্দন
জোনাকিদের পাড়ায় থেমেছে মুক্তালোকের কম্পন
রাডারের চৌশিঙা আলো ধরে বিভাজিত আগুনের রূপ
গৃহবন্দী ভূতেরা ও আজ নিশ্চুপ
শুধু এক বয়সী অজগর তার ষোড়শী আগুন নিয়ে সাজায় কাল নিরবধি
তরুণী আগুনে থৈ থৈ অস্তিত্বের নদী

সার্কিট হাউস পাহাড়টাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি আমি
শুধু একবার একটা শকুন কেদেঁছিল পাহাড়ের শাখা-প্রশাখায়
যেনবা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো পাহাড়ের অন্তর্যামী
বৃষ্টির দিন কোন শকুনের ছায়াও পড়েনা এ উপত্যকায়
পাহাড়ে পাহাড়ে বস্তুসমূহ নিজস্ব আলোতে ভিজে
সৃষ্টির সমস্ত গান বুকের গভীরে গিয়ে বাজে