বিপ্লবের দৃষ্টি অথবা একটি খেঁজুর কাঁটা..
আরেফিন ফিদেল, রবিবার, অক্টোবর ২১, ২০১২


বিপ্লবের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তার মামা। মামা বিশ্ববিদ্যালয়ে বামদল করতেন, কাঠামোর কাছে হার মেনে স্নাতক শেষ করে এখন এলাকারই একটি হাইস্কুলে ইংরাজি পড়ান। এরশাদ হটাও আন্দোলনের প্রাক্কালে জন্ম নেওয়ায় ‘বিপ্লব’ নামটি তার মামাই রেখেছিলেন।বিপ্লব মাদ্রাসায় নিত ধর্মীয় শিক্ষা আর মামার কাছে পেত মার্ক্সবাদে দীক্ষা। দুইটার সংমিশ্রণে সে হয়ে উঠেছিল অন্য এক মানুষ। দুইটা বিপরীতধর্মী খাবার একসাথে খেতে গিয়ে অন্যদের মত বদহজম হয় নাই তার। বরং আরো বেশি খেতে চায় সে, জ্ঞানের অতল সাগরে আরও গভীরে ডুব দিতে চায়। এই দুর্বার চাওয়াটাকে চরিতার্থ করার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছাটা তার বুকে দানা বেধেছিল। অন্ধ হওয়াতে আর সবার মত অতি সহজে পড়তে পারেনা, কিন্তু পড়াকে কখনও চক্ষুওয়ালাদের মত চাকরী বাগানোর শেষ সম্বল ভাবে নাই সে। নিজের একনিষ্ঠতার প্রতি তার এতটাই অগাধ বিশ্বাস ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ফর্মে প্রতিবন্ধী কোটাতে সে টিক দেয়না। দুনিয়া তাকে প্রতিবন্ধী রুপে চিনুক সেটা সে চায় নাই। নিজের প্রতি আস্থা ভুল প্রমাণিত হয় নাই, উত্তীর্ণদের মেধা তালিকায় প্রথম দিকেই অবস্থান করে নিল সে। বিষয় পছন্দের দিন সে খুব অবাক হয়েছিল, মেধাতালিকায় প্রথম সারিতে থাকা সত্ত্বেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ২০০ মার্কের ইংরাজি না পড়ার জন্য প্রথম সারির অনেক বিষয়ে ভর্তি হতে পারবেনা। ব্যাপারটা আহত করে বিপ্লবকে, যে ব্যবস্থা মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সে ব্যবস্থা এ সমাজে কেন টিকে আছে? এ প্রশ্নের জবাব সে পায়নি। কাঠামোতে জবাবদিহিতা যখন অনুপস্থিত থাকে তখন এমন অনেক প্রশ্ন প্রতিনিয়ত মানবমনে শুধু কুঁকড়ে মরার জন্যই উপস্থিত হয়।

ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারলো তার বিভাগে প্রধানত দুধরণের শিক্ষক রয়েছে। একদল শিক্ষক নিজেদের নাস্তিকতার দম্ভকে অতিমাত্রায় প্রকাশ করতে ভালবাসেন অপর দল আবার প্রকাশভঙ্গীতে ঠিক ততখানিই কট্টরপন্থী ধর্মবিশ্বাসী। কিছু ব্যতিক্রমও যে নেই তা নয়, তবে এদের সংখ্যা নিতান্তই কম। একদিন ক্লাসে ২য় দলের অন্তর্ভুক্ত একজন শিক্ষক কসমোলজি পড়াচ্ছেন, হকিং এর প্রসঙ্গে এসে তিনি মূলস্রোত থেকে দূরে এসে বলতে শুরু করলেন, হকিং এর প্রথম দিকের কাজগুলা আমি খুবি পছন্দ করি। ব্রিফ হিস্টরিতে সে স্বীকার করেছে দুনিয়া সৃষ্টির পিছনে রয়েছেন বিধাতা। কিন্তু এই পঙ্গু লোকটার বুদ্ধি ক্রমাগত লোপ পাওয়ায় পরে সে নাস্তিক হয়া গেছে, সৃষ্টির মূলে বিধাতার ভূমিকাকে সে অস্বীকার করেছে। তোমরা একটা জিনিস কখনো ভেবে দেখেছ কি যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর ১০০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ বুদ্ধি সারা জাহানের সব বান্দার মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন সেখানে হকিং এর মত একজন ক্ষুদ্রবুদ্ধির মানুষ কিনা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করতেছে? নাউজুবিল্লাহ!

শিক্ষকের লেকচারে অভিভুত হয়ে কোমলমতি ছাত্রদের অনেকেই ‘নাউজুবিল্লাহ’ প্রতিধ্বনি তোলে। তার রেশ মিলিয়ে যাবার পূর্বেই বিপ্লব উঠে দাঁড়ায়। মহান শিক্ষককে সে প্রশ্নবিদ্ধ করে- আচ্ছা স্যার, যদি আপনার কথা কে মাথায় রেখে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কোন কম্পুটারের সাহায্যে এই পৃথিবীর সবার বুদ্ধি পরিমাপ করে তার যোগফলকে ১০০ দ্বারা গুন করা হয় তারপর যে ফিগারটা আসবে সেটায় তো তাহলে আল্লাহর বুদ্ধির সীমা তাইনা? তাহলে কি দাঁড়ায়, আল্লাহর জ্ঞান পরিক্রমা সসীম? কিন্তু আমি তো মাদ্রাসায় পড়েছি আল্লাহর জ্ঞান অসীম। শিক্ষক আমতা আমতা করে ধমক দিলেন,যা বোঝনা তা নিয়ে কথা বলবেনা, বসো। ক্লাস শেষে আমার সাথে দেখা করবে।

বিপ্লব ক্লাসের পর স্যারের কক্ষে গেলে তিনি বসতে বললেন বিপ্লবকে। এটা বিশ্ববিদ্যালয় বুঝলা? গ্রামের কোন মাদ্রাসা না। বাবা-মা কষ্ট করে লেখাপড়া করতে পাঠাইছে, সার্টিফিকেট নিয়া বাইর হয়া যাও। শিক্ষকদের ক্ষ্যাপাইলে ভেতরেই থাকবা, যাও।
বের হয়ে আসলো বিপ্লব। একজন শিক্ষকের মুখে এমন স্বৈরাচারী বয়ান শুনে তার কান্না পায়। চোখের পানি তাকে আরও বেশি দুর্বল করার আগেই নিজ হাতে আবার তা মুছেও ফেলে এটা ভেবে যে অন্তত এই অপশিক্ষকের পাষণ্ড মুখটা দুচোখ দিয়ে তাকে দেখতে হয় নাই। হায়,যারা সত্যের তাপ সহ্য করতে পারেনা তারাই আমাদের এখানে সত্য শেখায়!

আবাসিক হলের ছারপোকা আক্রান্ত ছোট্ট যে কক্ষটিতে তার জায়গা হয়েছে সেটা আরও ৭ জনের আশ্রয়স্থল। রোজ সন্ধ্যায় সেই বাকি সাতজনকে হল গেস্টরুমে পার্টির নেতাদের কাছে হাজিরা দিতে হয়, মাঝে মাঝেই নির্দেশ মোতাবেক বিপরীত গ্রুপের কর্মীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হয়। তাদের মত বিপ্লবকেও প্রথম কয়েকদিন মিছিল-মিটিং এ উপস্থিত থাকতে হয়েছিল কিন্তু অন্ধকর্মী দলাদলিতে কোন কাজে আসেনা তাই তার উপস্থিতিকে আর বাধ্যতামূলক রাখা হয় নাই। এখানে বিপ্লব তার অন্ধত্বকে শাপেবর ভাবে।

একদিন সকালে আকস্মিক একটা খবরে পুরো হল কেঁপে উঠল। বিপ্লবদের পাশের রুমের একটা ছেলেকে কে বা কারা মেরে লাশ চারতলা থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলেছে। ছেলেটি হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিল। নিজ বিভাগের সবগুলো পরীক্ষায় সে প্রথম স্থান দখলকারী, পড়াশোনা ছাড়া সে আর কিছুই আমলে নিত না। বিপ্লবের সাথে তার একটা দারুণ বোঝাপড়া ছিল। খবরটা শুনে ভীষণ কষ্ট হইছে তার, এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু মানতে পারছেনা সে কিছুতেই। ক্রমেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টাকে তার ধীশক্তি সম্পন্ন মানুষ নয় বরং মাস্তান-লুটতরাজ তৈরির লেজিটিমেট কারখানা বলে মনে হতে থাকে।
দুমাস কেটে গেছে, আজও বিচার হয় নাই কারো। জীবনের এই নাদেখা রং-রূপ গুলো সে আরও গভীর ভাবে ভাবতে থাকে। এই জীবনভাবনার জন্য কিছু সমমনা বন্ধুও জুটে যায় তার। সবাই মিলে তারা ঘুঁণেধরা সমাজটাকে বদলানোর স্বপ্ন দেখে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অন্যায়মূলক কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করতে মিছিল-সেমিনার ইত্যাদির আয়োজন করে। বিপ্লবও তাদের সাথে যোগ দেয়। ব্যানারের কোন লেখা সে দেখতে না পারুক, ছোট্ট মিছিলের শোভা দেখে চোখ না জুড়াক, তার অন্তরের চাপা ক্ষোভ স্লোগান রুপে বের হয়ে আসে তীব্র আগুনের স্ফুলিঙ্গের মত। কিন্তু সে আগুনে কেউ পোড়ে কি? বিপ্লব জানে বায়ান্ন, একাত্তর, নব্বই এই সবকটা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল অনেক মহৎ উদ্দেশ্য বুকে নিয়ে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবগুলো আন্দোলন কালক্রমে বেহাত আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছে।

কোন আন্দোলনের ফলাফলই নিম্নবর্গীয় সমাজ ভোগ করতে পারে নাই, ভোগ করে যাচ্ছে লুম্পেন হায়েনারা।তবুও সবকিছুর মত আন্দোলনের স্বভাবধারাকেও বিনির্মাণ করা যায় বলে বিপ্লবরা বিশ্বাস করে। কিন্তু তাদের আক্ষেপ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এগিয়ে আসা ছাত্রের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। অথচ লুম্পেন যুবরাজরা পায়খানার কমোডে পা-পিছলে আছাড় খাওয়ার ইস্যুতেও মুহূর্তে হাজারো পা-চাটা কুত্তার পাল হাজির হয়ে ক্যাম্পাস অন্ধকার করে দিতে পারে। সবাই এখন জেনে গেছে সবকিছু নষ্টদের জন্য,তাই নষ্ট হবার ইতর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে-কে কতটা নষ্ট হতে পারে।

একদিন বিপ্লবসহ হলের আরও ৫ জনকে, ছাত্রনেতারা নির্মমভাবে পিটিয়ে হল থেকে বের করে দিল। তাদের অপরাধ তারা হীরকরাজার দেশে পা-চাটা কুত্তা না হয়ে ‘না’ বলার সাহস দেখিয়েছে। দুনিয়ার সব ‘না’ বলতে পারা মানুষগুলো কেন জানি একটি জায়গায় খুবই অসহায়ভাবে স্ববিরোধী- যাদের কাছে তারা কোন সুবিচার পাবেনা বলে মনপ্রানে বিশ্বাস করে, বিপদে এরা তাদের কাছেই ছুটে যায় বিচার চাইতে। বিপ্লব ও তার বন্ধুরাও উদ্বাস্তূ হয়ে ঘুরতে ঘুরতে প্রভোস্ট, প্রকটর, নিজ নিজ বিভাগের প্রধান সবার দ্বারস্থ হল। কিন্তু একটাই উত্তর তাদের কানে প্রতিধ্বনিত হল-বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছো পড়াশোনা করতে নাকি গলাবাজি আর মিছিল-মিটিং করতে?

বিপ্লব অন্যদের সাথে অজানা পথে হাটতে থাকে আর ভাবে- যারা দলাদলি আর ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ‘শিক্ষক’ নামটিকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রকাশ্যে নানান রকম দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়, নিষ্পাপ ছাত্রদের দলে ভেড়াতে প্রলুদ্ধ করে, যারা এই ছাত্রদের উপরে উঠার সিঁড়ি হিসেবে গিনিপিগের মত ব্যবহার করে, যারা সবার অলক্ষ্যে থেকে মিটিং-মিছিল-হামলার-টেন্ডারবাজির মাস্টারপ্ল্যান বানায়, যাদের কাছে মনুষ্যত্তের চেয়ে ক্ষমতা বড়; পেশার অহংকারের চেয়ে টাকার গন্ধ বড় তাদের মুখেই তো এমন কথা শোভা পায়।

বিপ্লবরা সেদিন রাতে উত্তরায় তাদের এক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নিল। সবাই ক্লান্ত শরীরকে একটু আরাম দিতে ঘুমিয়ে পড়লেও বিপ্লবের চোখে ঘুম আসেনা। হঠাৎ নস্টালজিক হয়ে যায় সে, গ্রামের কথা-ছেলেবেলার কথা চোখের সামনে ভাসতে থাকে। সে মনস্থির করে সকালে গ্রামে ফিরে যাবে। যে উচ্চশিক্ষা মানুষের আচরণের নূনতম পরিবর্তন ঘটায়না সে শিক্ষাতো অর্থহীন। যে শিক্ষা শুধু কিতাবের পাতায় আছে কিন্তু প্রয়োগ অশ্বডিম্ভ সমান সে শিক্ষা লাইব্রেরীতেই থাক। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলেগেছে, আরো যাবে। প্রতিবাদ করার কেও নাই, সবাই যে যার আখের নিয়া আছে।পরিবর্তনের স্বাদ রক্তের চেয়েও নোনতা হয়ে গেছে, সেটা আনতে আরকেউ রক্ত ঝরাতে রাজি না।

গ্রামে ফিরে আসে বিপ্লব। বাবার কাছে জানতে পারে মামা হাসপাতালে, মামীর সন্তান প্রসব হবে যেকোন মুহূর্তে। বাবার সাথে বিপ্লব হাসপাতালে আসে। মামা তাকে হঠাৎ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে-কিরে এভাবে হুট করে গ্রামে আসলি যে? বিপ্লব কোন উত্তর না দিয়ে মামার বুকে মাথা গুজে দেয়, পুরো পৃথিবীতে এটাই তার কাছে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। সে ফুঁপায়, বলতে থাকে- মামা এটা কেমন সমাজ? মার্ক্স, ডিকেন্স, জোঁলা, শরৎ, কামুর যে বইগুলো তুমি আমায় দিয়েছিলে সেগুলোতে মানুষের অনেক নিদারুণ কষ্ট আর দুর্দশার কথা আমি পড়েছি কিন্তু আমরা যে অন্যায়-অবিচারের জালে আবদ্ধ নিষ্ঠুরতম এক সময়ে বেঁচে আছি তার বর্ণনা তো আমি কোথাও পেলাম না মামা। কোথাও পেলাম না...।
কে লিখবে তার কথা...?

মামা কোন সান্ত্বনা দেওয়ার আগেই একজন নার্স তাদের দিকে ছুটে এসে বলল, মিস্টি আনেন ভাবীর পুত্রসন্তান হয়েছে। বিপ্লব ও মামা দুজনেই ছুটে গেল কেবিনে। বিপ্লবের চোখের পানি এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি, সে পাগলের মত চিৎকার করে বলতে লাগলো, কই দেখি দেখি বাবু কোথায়। শিশুটি ততক্ষণে মামার কোলে। মামা বিপ্লবের হাতটা ছেলের শরীরে স্পর্শ করিয়ে বলল, এই যে দ্যাখ অনেক সুন্দর হয়েছে।
কই মামা দেখি দেখি, ছেলের চোখ কোথায়, চোখ হয়েছে তো? ওর চোখের মণি ফুঁটেছে কি?
হ্যা, কি আশ্চর্য কেন ফুঁটবেনা?
আরো ভাল করে দেখেন মামা, বাবুটা এই পৃথিবী দেখতে পারবে কি?
হ্যারে পাগল, হ্যা, ও সব দেখতে পাবে।
একটু নীরব থেকে বিপ্লব মামাকে বলে, আমায় একটা খেঁজুরের কাঁটা এনে দেনতো। কাঁটা দিয়ে ওর চোখদুটো এক্ষুনি ফুটো করে দেই।
কি অলুক্ষণে কথা বলছিস বিপ্লব, তুই ঠিক আছিস তো?
হ্যা, আমি ঠিক আছি। ওর চোখ দুটো অন্ধ করে দিতে হবে যাতে কখনো এই পৃথিবীর বর্বরতা-নির্মমতা ওকে দেখতে নাহয়।

দেখতে নাহয়...দেখতে নাহয়...দেখতে নাহয়... হাসপাতালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। বিপ্লব বেরিয়ে পড়ে। একটা খেঁজুরের কাঁটা না খুঁজে সে আর ফিরবেনা।