'জলপাই কাঠের বাঁশি' দেবানন্দ সরকারের গল্প
দেবানন্দ সরকার, সোমবার, অক্টোবর ২২, ২০১২


দেবানন্দ সরকার: জন্ম, বেড়ে-ওঠা ঢাকা শহরে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন প্রবাসী। পেশা ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা। নেশা রাত জেগে গল্প লেখা। স্ত্রী এবং দুই পুত্র সহ ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে নিবাস। প্রকাশিত গল্প সংকলন ‘সৌরভ আর বর্ষার গল্প’ (প্রকাশক: সংঘ, ২০১০) এবং ‘মনোবেদনার পথে’ (প্রকাশক: শুদ্ধস্বর, ২০১২)।






--------------------------
জলপাই কাঠের বাঁশি
--------------------------

লাল টুকটুকে গোল টমেটোটা মাধ্যকর্ষণের টানে ওপর থেকে দ্রুত নেমে আসতে থাকল। তারপর সশব্দে ফেটে পড়ে ছড়িয়ে গেল চারপাশে। ছোট্ট মেয়েটি চোখ বড় বড় করে দেখছিল টমেটোর নেমে আসা। টমেটোটা ফেটে যেতে হতচকিত হয়ে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরল মাকে। ধীরে ধীরে টমেটোটা ছড়িয়ে পড়া শরীর গুটিয়ে আনতে থাকল অ্যামিবার মত। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার আগের মত পরিপূর্ণ গোল হয়ে উঠল।
মেয়েটা হাততালি দিয়ে হেসে উঠল আনন্দে, ‘মা, দেখ, দেখ, ম্যাজিক। আমাকে কিনে দাও না?’
‘না, তোর কত খেলনা আছে। এটা দিয়ে তুই কি করবি?’ মার কন্ঠে একটু রাগের আভাস।
‘দাও না মা কিনে?’ মেয়েটা আকুল কন্ঠে মিনতি করে।
‘বলেছি তো না।’ মার মুখ লাল হয়ে ওঠে।
‘না, কিনে দিতেই হবে। এই খেলনাটা আমার চাই-ই চাই।’ মেয়েটা এবার জিদ করে। নীচের ঠোঁট ফুলিয়ে প্রায় কেঁদে ওঠে।
মা আর পেরে ওঠে না। দোকানিকে জিজ্ঞেস করে, ‘কত দাম?’
দোকানির মুখ আলো করে হাসি ফুটে ওঠে, ‘দুই ইউরো।’
‘বল কি, এই সামান্য জিনিসের এত দাম!’
‘সামান্য বলছেন কেন? এত ম্যাজিক, তাই না লক্ষী মেয়ে?’ দোকানি মেয়েটাকে দলে আনার চেষ্টা করে।
‘ঠিক আছে। দিন।’ মা হাল ছেড়ে দেয়। দোকানি বাক্স থেকে পলিথিনে মোড়া একটা টমেটো তুলে দেয় মেয়েটির হাতে।
মেয়েটি টমেটোটা হাতে নিয়ে মার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে চলে যায়। দোকানি পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেন বলে, ‘এই মাইত্র সাইট করলাম। এক ঘন্টা বইসা থাকার পর। ব্যবসার খুবই খারাপ অবস্থা। একজন লোক আইতেছে। পরে ফোন করুম নে।’
একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা এতক্ষণ ধরে দেখছিল আরিফ। ফুটপাতে প্লাস্টিকের টুলের ওপর দোকানি বসে। পাশে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে রাখা টমেটোগুলো। বাক্সের ওপর একটা সাদা পাতলা প্লাস্টিকের টুকরো যার ওপর টমেটোটা এসে ফেটে পড়ে। এই হচ্ছে ব্যবসার সরঞ্জাম। এ দিয়েই পেট চালাচ্ছে দোকানি।
টমেটোর ম্যাজিকে নয়, আরিফ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল দোকানির চেহারা দেখে। ট্যুরিস্টের পদচারণায় গমগম করছে পথ। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। এসেছে জাপান, কোরিয়া থেকে। এদের মাঝে দোকানির কাল গায়ের রং আর মুখের আদল স্বতন্ত্র হয়ে ফুটে আছে। আরিফের সন্দেহ হচ্ছিল দোকানি বাংলাদেশি। ফোনে কথা বলতে শুনে নিশ্চিত হল।
আরিফ এগিয়ে গিয়ে বাংলায় জিজ্ঞেস করল দোকানিকে, ‘কেমন আছেন?’
‘ভাল। ভাই দেখি বাংলাদেশি! আমি দেখতেছিলাম আপনেরে। তয় ভাবছিলাম ইন্ডিয়ান। ভাই কই থাকেন?’
‘বহু দূর। অ্যামেরিকায়।’
‘এইখানে কি কাজে আইছেন?’
‘আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। একটা কনফারেন্সে এসেছি। আপনি কতদিন ধরে এখানে আছেন?’
‘তা পরায় দুই বছর হইতে চলল। ভাইয়ের দেশে বাড়ি কই?’
‘ঢাকায়।’
‘ঢাকার কোনখানে?’
‘পুরোনো ঢাকায়। লালবাগে।’
‘কন কি? আমিও তো পুরান ঢাকার পোলা। বংশাল বাড়ি আমার।’
‘তা এখানে কি করে এলেন? এই দ্বীপেও যে বাংলাদেশি আছে সেটা ভাবি নি।’
‘ভাই যে কি কন? বাংলাদেশি নাই কই? চান্দে পর্যন্ত আছে। আমার ভাই থাকে এ্যাথেন্সে। প্রথমে সেই খানে আইছিলাম। তারপর মারামারি লাইগা যাইতে ক্রিটে পালাইয়া আইছি। এ্যাথেন্সে বড় ঝামেলা। বাইরের লোকদের মাইর দিতাছে যেইখানে সেইখানে।’
‘খবরে তো তাই শুনছি। গ্রীসের ইকোনমির তো বেশ খারাপ অবস্থা।’
‘শুধু গ্রীস না। পুরা ইউরোপের অবস্থাই নাজেহাল। ইতালি, ইস্পেইন, পর্তুগাল সব ডাউন। শুধু ভালা আছে জার্মান আর ইংল্যান্ড। কিন্তু ওই দুইটা দেশে ঢুকা বড় মুশকিল।’
‘এখানে আসলেন কি করে?’
‘অনেক ঘুইরা। দেশে এক ডাক্তারের চেম্বারে নাম লিখার কাম করতাম। পাড়ার মাস্তানরা খুব জালাইত। পত্যেকদিন চান্দা চাইত। ডাক্তারসাব শ্যাষম্যাষ খেইপা চইলা গেল কানাডা। ভাবলাম আমি দেশে থাইকা আর কি করুম। মালয়েশিয়ায় চইলা গেলাম কাম করতে। ওইখানে বাংগালীগো মাইনষ বইলাই মনে করে না। ফকিরদের লাইগাও খারাপ ব্যবহার করে। বড় ভাই বহুতদিন আগে এ্যাথেন্স আইছে। বিয়া করছে এক গ্রীক মাইয়ারে। তয় আমি মনে করলাম ভাইজানের কাছে চইলা আসি। চাইর বছর কাম কইরা টাকা জমাইলাম। দালালরে নয় লক্ষ ট্যাকা দিলাম। প্লেনে কইরা আইলাম দুবাই। সেইখান থেইকা পায়ে হাইটা ওমান।’
‘বলেন কি? পায়ে হেঁটে আসলেন! কতদিন লাগল?’
‘দেড় দিন। খাওন নাই কিছু নাই। ওমানে ঘাপটি মাইরা রইলাম তিন দিন। সেইখান থিকা জাহাজের খোলের মইধ্যে কইরা আইলাম ইরানে। ইরানের কোন্ জায়গায় জানি না। সেইখান থিকা হাইটা, গাড়িতে কইরা তিনদিন পর পউছলাম তেহরানে। তেহরানে লুকাইয়া রইলাম কিছুদিন। তারপর আবার একইভাবে ঢুকলাম তুর্কিতে। তুর্কি পার হইয়া শ্যাষম্যাষ এ্যাথেন্স।’
আরিফ মুখ হা করে কথা শুনছিল। ও জানে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি এমনিভাবে দেশ ছেড়ে ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর দূর-দুরান্তরে। পত্রিকায় তাদের জীবন-সংগ্রামের কাহিনী পড়েছে। আজ এই প্রথম এমনি একজন মানুষের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয় হল আরিফের।
‘এ্যাথেন্স-এ তো আপনার ভাই আছে। তাহলে সেখান থেকে ক্রিটে চলে এলেন কেন?’
‘কি আর কমু? ভাবী গ্রীক। ভাইজানও গ্রীক হইয়া গেছে। একটা খেলনাপাতির দুকান চালায় শ্বশুরের লগে। ওইখানে আমিও কাম করতাম। এ্যাথেন্সের অবস্থা হইয়া গেছে পুরা ঢাকা শহরের মত। হরতাল, মারামারি লাইগায় রইছে। লোকের কাম নাই। পকেটে পয়সা নাই। ব্যাংকগুলা পর্যন্ত খালি। লোকে রাস্তা থিকা সরকারী অফিসে ইটা মারে। খেলনাপাতি কে কিনব? ভাইজানের সংসার চলে না। ভাইজান নিজে কিছু কয় নাই তয় ভাবী বুঝাইয়া দিছে আমারে নিজের পথ দেখতে। গ্রীক মহিলারা বহুত কঠিন জাইত। মুখের উপর ঠাসঠাস কথা কইয়া দেয়। ক্রিটের অবস্থা কিছুটা ভাল। বহুত লোক বাইরে থিকা বেড়াইতে আসে। কোনোমতে টিকা আছি।’
‘ক্রিটে বাংলাদেশি আছে কতজন?’
‘সারা ক্রিট দ্বীপে ছড়াইয়া ছিটাইয়া আছে পাচ-সাতশ জন। তা ভাইজান আমরিকার কই থাকেন?’
‘নিউ ইয়র্কে।’
‘কি পড়ান ওইখানে?’
‘কেমিস্ট্রি।’
‘আপনে উঠছেন কোনখানে?’
‘সমুদ্রের পারে ক্রেটা মারিস রিসর্ট আছে না ওখানে? ক্রেটা মারিসের কনভেনশন সেন্টারে কনফারেন্স হচ্ছে আর আমরা থাকছি হোটেলে।’
‘খাওয়া দাওয়া?’
‘রিসর্ট হোটেলেই সব ব্যবস্থা আছে।’
‘ভাইজান কি এই দেশী খাওয়া খাইতে পারেন? আমার তো বিস্বাদ লাগে। খাওনের কষ্ট হইলে এই সামনে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। তাজমহল। ওইখানে খাইতে পারেন।’
‘না, আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। দেশ ছেড়েছি বিশ বছর হতে চলল। আপনি থাকেন কোথায়?’
‘ইরাক্লিও। এইখান থিকা বাসে আধঘন্টা লাগে। যাইতে আইতে তিন-তিন ছয় ইউরো। তয় লোকতো সব আসে সাগরের পারে। ব্যবসাপাতি এইখানেই কিছু হয়। হের লাইগা আইতে হয় এইখানে।’
‘আপনার টমেটোটা দারুণ। কে বানায় এটা?’
‘লিখা আছে মেড ইন চায়না। ইরাক্লিও হইতেছে ক্রিট দ্বীপের রাজধানী। ওইখানে হোলসেল মার্কেট থিকা পঞ্চাশ সেন্ট কইরা কিনি আর দুই ইউরো কইরা বিক্রি করি। দিনে দশটার মত বিক্রি করতে পারলে চইলা যায়। রাইতের বেলা দুই ঘন্টা একটা হোটেলে ধুয়ামুছা পরিষ্কার করার কাম করি। জোরাতালি দিয়া চালায়া যাইতেছি।’
‘আপনার নাম কিন্তু জানা হল না।’
‘আব্দুল আলিম। ভাইজানের নাম?’
‘আরিফুর রহমান।’
‘ভাইজানের পরিবার আছে?’
‘আছে। দুই মেয়ে। বড় জন ক্লাস টেনে পড়ে। ছোটটা সেভেনে।’
‘ওদের আনেন নাই?’
‘না ওদের এখন স্কুল খোলা।’
‘থাকবেন কত্দিন আর?’
‘আর দু’দিন। রোববার চলে যাব।’
আলিম বাক্স থেকে দু’টো টমেটো বের করে আরিফকে বাড়িয়ে দেয়, ‘আপনের মাইয়াদের দিয়েন।’
‘আরে কি যে করেন? ওদের কি এসব দিয়ে খেলার বয়স আছে?’
‘আমার তো ওদের দেয়ার মত আর কিছু নাই।’
‘আপনার ওদেরকে কিছু দেবার তো দরকার নেই। আচ্ছা ঠিক আছে এই দু’টো টমেটো আমি আপনার কাছ থেকে কিনে নিচ্ছি। আপনার ব্যবসা তো চালাতে হবে।’
‘কি যে কন না ভাইজান? আমি ট্যাকা নিমু বাংলাদেশির কাছ থিকা? কেন্ খাম্খা শরম দেন?’
‘শোনেন আপনার এখন খারাপ সময় যাচ্ছে। এখন শুধু শুধু ফর্মালিটি করার দরকার নেই। আপনার পেট তো চালাতে হবে।’ আরিফ জোর করে পাঁচ ইউরোর একটা নোট আলিমের হাতে গুঁজে দেয়।
আলিম এক ইউরো ফেরত দিতে চায়। আরিফ নেয় না। আলিম মাথায় হাত তুলে লম্বা সালাম দেয় আরিফকে, ‘দোয়া কইরেন। আল্লাহ আপনার হাজার শোকর করুক।’
‘আজকে যাই। এই রাস্তার ওপর যদি বসেন তাহলে আবার আপনার সাথে দেখা হতে পারে। ভাল থাকেন। খোদা হাফেজ।’
‘খোদা হাফেজ ভাইজান।’ আলিম হাসিমুখে বলে।
আরিফ ফিরে আসার জন্য পা বাড়ায়। এ জায়গাটার নাম ইয়েরসনিসস। প্রধান সড়ক ‘মেইন স্ট্রিট’-এর দু’ পাশে কয়েক কিলোমিটার ধরে সারিসারি দোকানপাট। অক্টোবরের শুরুতে চমৎকার আবহাওয়া এখানে। তাপমাত্রা পঁচিশ ডিগ্রী সেলসিয়াসে স্থির হয়ে আছে। মূল ট্যুরিস্ট সিজন জুন থেকে সেপ্টেম্বর। আর কিছুদিন পর বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়ে যাবে। ক্রিটের সৌন্দর্যের শেষ আনন্দটুকু বুকভরে নিতে এখনো অনেক ট্যুরিস্ট ঘোরাফেরা করছে। স্যুভেনির আর খাবার দোকানগুলো উপচে পড়ছে লোকের ভিড়ে।
বিকেল নাগাদ কনফারেন্স শেষ হতে আরিফ হাঁটতে হাঁটতে এসেছিল বাড়ির জন্য কিছু কিনতে। ক্রিট বিখ্যাত জলপাইগাছের জন্য। আরিফ কিনল এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল। জলপাই গাছের কাঠ দিয়ে তৈরী ঘরসাজানোর টুকিটাকি। মেয়েদের জন্য গ্রীক মোটিফের টি-শার্ট, চামড়ার ব্যাগ, চকোলেট। কেনাকাটি করে ফেরার পথে আলিমের সাথে দেখা হয়ে গেল ওর।
রিসর্টে ফিরে চারতলায় ঘরের বারান্দায় এসে বসল আরিফ। বারান্দার ওপারে সরু গলি। আর তার পর থেকে শুরু হয়েছে ভূমধ্যসাগর। যেন হাত বাড়ালেই ধরা যাবে। গাঢ় নীল জল বুকে নিয়ে শান্ত শুয়ে আছে। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে ঘনিয়ে এসেছে। চারপাশ অসংখ্য পাখির কলতানে মুখর হয়ে আছে।
আরিফ টমেটো দু’টো হাতে নিয়ে দেখতে থাকে। লাল পাতলা প্লাস্টিকের বলের কেরামতি প্লাস্টিকের ভৌত ধর্মে। ওপর থেকে পড়ে ছড়িয়ে যাবার পর অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতায় আবার গোল হয়ে আগের অবস্থানে ফিরে আসে। দেখতে সামান্য মনে হলেও তৈরীর প্রযুক্তি অনেক উঁচু মানের। আরিফ মনে মনে তারিফ করে আবিষ্কর্তার।
রাতে কনফারেন্সের আয়োজকরা ওদের সবাইকে ‘হ্যাপি ট্রেন’-এ করে নিয়ে গেলেন চিরাচরিত গ্রীক খাবারের স্বাদ নিতে। ‘হ্যাপি ট্রেন’ ট্রেন নয়। বাস। কিন্তু দেখতে লম্বা ট্রেনের মত। ছোট ছোট কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা। দু’দিকটা খোলা। ‘হ্যাপি ট্রেন’-এ করে ট্যুরিস্টরা শহর ঘুরে দেখে। রাতের বেলা রাস্তার দু’পাশের দোকানপাট আলো ঝলমল। জমজমাট। দোকানগুলো পার হয়ে দ্বীপের গভীরে ঢোকার পর ঘন অন্ধকার ঢেকে ফেলল ওদের। রেস্তোরাঁটা একটা ছোট পাহাড়ের ওপর। আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা দিয়ে ড্রাইভার চমৎকার দক্ষতায় ওদের নিয়ে এল ওপরে। বিশাল রেস্তোরাঁর সামনেটা পুরোটাই খোলা। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে অ্যামফিথিয়েটার যেন। আশেপাশে আর কিছু নেই। অন্ধকারের মাঝে হীরকখন্ডের মত জ্বলজ্বল করছে ফ্লুরোসেন্ট আলো। অনেক রাত পর্যন্ত চলল পার্টি। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া পানীয়ের ব্যবস্থা। এক পাশে এক মধ্যবয়সী লোক নিপুণ দক্ষতায় বুজুকি বাজিয়ে চলেছে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে গান গাইছে তার মেয়ে আর নেচে চলছে চারটি ছেলে আর চারটি মেয়ের একটি দল। গানের কথা গ্রীক ভাষায়। আরিফ বুঝছে না কিছু। কিন্তু বুজুকির দ্রুত লয় আর নাচের ছন্দ মনোযোগ ধরে রেখেছে সবার। খাওয়া শেষ হতে নাচিয়েরা সবাইকে হাত ধরে নিয়ে এল নাচার জন্য। প্রায় একশ জন লোক গোল হয়ে হাত ধরে পা মেলাতে লাগল গানের ছন্দের সাথে। অবাধ নির্মল আনন্দ।
ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারটা বেজে গেল। কিন্তু আরিফ ঘুমাতে পারল না। আলিমের চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখল আরিফকে। কি বিচিত্র মানুষের জীবন! কি প্রবল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আলিম কিন্তু মুখের হাসি এখনো মুছে যায় নি। আরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে নিউ ইয়র্কে এসে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে ওকেও প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সারাদিন ক্লাস করে রাতে পিজা ডেলিভারি দিয়ে থাকা-খাওয়ার সংস্থান করেছে। কিন্তু ও জানত এই কষ্টটুকুর শেষে একটা আলোকিত ভবিষ্যৎ আছে। যে স্বপ্ন নিয়ে আরিফ দেশ ছেড়েছিল তা বাস্তবে মূর্ত হবার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু আলিম? মালয়েশিয়ার চাকরি ফেলে অনেক আশা বুকে নিয়ে ভয়ংকর পথ অতিক্রম করে ইউরোপে এসেছে। কিন্তু ওর সব আশা ফুৎকারে মিলিয়ে গেছে। আলিম কি আর স্বপ্ন দেখে? আরিফ ঘুমুতে পারে না এলোমেলো চিন্তায়। বিছানায় শুয়ে এপাশওপাশ করতে থাকে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে যায় আরিফের। তড়িঘড়ি করে দৌড় দেয় কনফারেন্সের প্রথম সেসন শোনার জন্য। দুপুর সাড়ে বারটা থেকে দু’ঘন্টার বিরতি লাঞ্চের জন্য। তারপর আবার সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চলে কনফারেন্স। লাঞ্চ সেরে আরিফ সৈকতে নেমে আসে। খুব ঠান্ডা এই সাগর। ছোট ছোট ঢেউ। টলটলে পরিষ্কার জল। সৈকত ছাড়িয়ে জলে দাঁড়ালে টের পাওয়া যায় বিরাট বিশাল পাথর ঢেকে রেখেছে সমুদ্রের মেঝে। ঢেউয়ের ধাক্কায় এই পাথরগুলো ভেঙে সৈকতের বালি হয়েছে। মহাসাগরের মত শক্তিশালী ঢেউ নয় এখানে। তাই এখানের বালি পাউডারের মত মিহি নয়। বরং বেশ বড় বড় দানা। সাদা-কাল-ধূসর নানা রঙে মেশানো। পাথরগুলো পার হয়ে জলের গভীরে গেলে স্বচ্ছন্দে সাঁতার কাটা যায়। মধ্য দুপুরে অনেকেই সাঁতার কাটছে। কেউ বা প্যাডেল বোট চালিয়ে চলে যাচ্ছে আরো গভীরে। চমৎকার আবহাওয়া। বাতাসে আর্দ্রতা নেই। মধ্য দুপুর হলেও রোদের প্রচন্ড তেজ নেই। একটা হাল্কা হাওয়া থাকায় রোদটা বেশ আরাম লাগছে।
আরিফ জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে নিয়ে জলের ভেতরে পাথরের ওপর এসে দাঁড়াল। সমুদ্রের শ্যাওলায় কিছুটা পিচ্ছিল হয়ে আছে পাথর। জলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল আরিফ। কাজলি মাছের মত সাদা মাছ খেলে বেড়াচ্ছে জলে। এরকমতো দেখা যায় পুকুরে বা লেকে! একটা ছোট ছেলে হাত দিয়ে মাছ ধরে জলভরা প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর ভরার চেষ্টা করছে। মাছগুলো চালাক আছে। পিছলে পালিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা খুব একটা জুত করে উঠতে পারছে না।
জলের ধার ঘেঁষে সৈকত দিয়ে হাঁটতে থাকে আরিফ। সৈকতটা ছোট। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। তারপর পাথরের দেয়াল আর গাছ। সৈকতে শুয়ে ত্বকে রোদের উষ্ণতা নিচ্ছে অনেকে। এটা ন্যুড বিচ নয়। কিন্তু অনেকেই ঊর্ধ্বাবসান পুরো খুলে শুয়ে আছে ‘পারফেক্ট ট্যান’-এর আশায়। ইউরোপীয়দের শরীর নিয়ে বাছ-বিচার অনেক কম। অ্যামেরিকাতে এরকম করলে সাথে সাথে লাইফ-গার্ড পুলিশকে খবর দিত। এখানের রোদের তেজ আর তাপমাত্রা ত্বককে বাদামী করার জন্য আদর্শ। বক্ষবন্ধনীর আবরণে ঢাকা পড়ে চামড়ার দু’ধরণের রং হোক তা কেউ চায় না। শ্বেতাঙ্গরা এশিয়দের ব্যঙ্গ করে ডাকে ‘ব্রাউনি’। আবার নিজেরা ত্বককে বাদামী করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে। কি অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী বৈচিত্র মানুষের চরিত্রে!
বিকেলে কনফারেন্স শেষে আরিফ আবারো হাঁটতে হাঁটতে এল মেইন স্ট্রিটে। আলিমকে খুঁজে পেল না আগের জায়গায়। ভাল করে এদিক ওদিক চাইতে আলিমকে দেখতে পেল রাস্তার উল্টো দিকে। জায়গা বদলেছে আলিম।
‘কেমন চলছে ব্যবসাপাতি?’ আরিফ পাশে এসে দাঁড়ায় আলিমের।
‘বালা না। সাইট হয় নাই।’ দুঃখের কথা কিন্তু আলিম বলে হাসিমুখে।
‘ভাইজানের কি কোনো কাম আছে এখন?’
‘না। আজকের মত কনফারেন্স শেষ।’
‘যাইবেন নাকি আমার লগে? দেশী খানা তো খাইতে পারতেছেন না। আপনারে পাঙ্গাস মাছ খাওয়ামু।’
‘পাঙ্গাস মাছ পাওয়া যায় এখানে?’
‘এরা কয় পাঙ্গাসিয়াস। আমি কই পাঙ্গাস। স্বাদটা একটু ভিন্ন। কিন্তু মজা আছে। এরা তো রানতে জানে না। এই মাছ ঝাল কইরা ভুনা করলে কি যে মজা হয়! ভাইজান ঝাল খান তো?’
‘খেতে পারি। কিন্তু আমাকে যে নিয়ে যাবেন আপনার ব্যবসার কি হবে? আপনার রাতে হোটেলে কাজ আছে না?’
‘ব্যবসা কিছু হইব না মনে লয়। হোটেলের কাম রাইত দশটা থিকা। তার আগে খানা সাইরা ফেলতে পারুম।’
আরিফের হোটেলে রাতে ডিনার আছে। তবে আজকে কোন বিশেষ অনুষ্ঠান নেই। ও রাজী হয়ে গেল আলিমের সাথে যেতে। ওরা আধ কিলোমিটার হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে এল।
‘বাস কি সময়মত আসে?’
‘না এইটা তো ইংল্যান্ড জার্মান না। এইটা গ্রীস। আমাগো দেশের মতই নিয়মকানুন কম এইখানে। আধঘন্টা পরপর বাস আওনের কথা। সেই বাস কখনো কখনো এক ঘন্টা পরও আসে। আর এখন তো সিজনের শ্যাষ তাই সব আরো ঢিলা হইয়া গ্যাছে।’
এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট কুড়ি পরে বাস চলে এল। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মার্সিডিজ বাস। বাসে ভিড় ছিল না। ওরা দু’জন এসে বসল সামনের সারিতে। ইরাক্লিও-তে বিমানবন্দর। এ রাস্তা দিয়েই আরিফ ক্রেটা মারিসে এসেছে প্রথমদিন। লম্বা ভ্রমণের পর ট্যাক্সিতে উঠে খানিকটা ঝিমুনি এসেছিল। তার সাথে নীচু ট্যাক্সিতে বসে চারপাশ ভাল করে দেখা যায় নি। আজকে উঁচু বাসের সামনের জানালা দিয়ে রৌদ্রকরোজ্জ্বল চমৎকার দৃশ্য ফুটে উঠল। রাস্তাটা এঁকে-বেঁকে গেছে সাগরের সমান্তরালে। বেশ খানিকটা জায়গায় সাগরের ঠিক উপর থেকে শুরু হয়েছে শক্ত পাথরের নির্বৃক্ষ পাহাড়। পাথর কেটে বানানো হয়েছে রাস্তা। চড়াইতে পাহাড়ের ওপরে ওঠা আবার উৎরাইতে নেমে আসা। সাগরের মাঝখানে বিশাল একখন্ড পাথর দ্বীপ হয়ে ভেসে আছে। এর নাম আইল্যান্ড অব দিয়া। কোনো গাছ নেই তাতে। কেউ থাকেও না ওখানে। রুক্ষ লাল পাথর প্রকৃতির তেজ আর কাঠিন্যকে মনে পড়িয়ে দেয়।
বাসে ওদের ঠিক পেছনে বসেছিল একটি গ্রীক মেয়ে আর তার সঙ্গী এক বয়স্ক বিদেশী লোক। মেয়েটি ক্রিটের ইতিহাস বলছিল লোকটিকে। ভূমধ্যসাগরে ক্রিটের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা তিনটি মহাদেশ ক্রিট থেকে খুব সহজেই প্রবেশ করা যায়। তাই সুপ্রাচীনকাল থেকে শক্তিশালী সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছে ক্রিট। রোম, ভেনিস, তুরস্ক বিভিন্ন সময় শাসন করেছে ক্রিটকে। সবচেয়ে লম্বা সময় ক্রিট দখল করে ছিল ভেনিসিয়রা। খ্রীষ্টিয় ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ শতক অব্দি। উঁচু লম্বা দেয়াল আর তার চারপাশে পরিখা দিয়ে ইরাক্লিও শহরকে শক্তিশালী দুর্গ বানিয়ে তুলেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার দখল করে নিয়েছিল ক্রিট। যুদ্ধ শেষে ক্রিট স্বায়ত্বশাসন পেয়েছিল কিছুদিন। পরে স্বেচ্ছায় গ্রীসের সাথে আবার মিলে গেছে ক্রিট। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি। আলাদা থাকবার দরকার কি?
ক্রিট দ্বীপটার দু’ তৃতীয়াংশ পাহাড়। বেশী উঁচু নয়। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দু’হাজার মিটার মাত্র। মেয়েটি একটি পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই পাহাড়টার নাম আইডা। ওখানে একটা গুহা আছে যেখানে দেবরাজ জিউসের জন্ম। পুরাণে আছে জিউসের বাবা ক্রোনাস সন্তান জন্ম হওয়ার সাথে সাথে তাকে খেয়ে ফেলতেন। জিউস হবার আগে মা রিয়া লুকিয়ে ছিলেন ওই গুহায়। জিউস জন্ম হবার পর একটা পাথর কাপড়ে মুড়ে ক্রোনাসকে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই তোমার সন্তান।’ ক্রোনাস পাথরটাকে সন্তান মনে করে খেয়ে ফেলেছিলেন আর বেঁচে গিয়েছিলেন জিউস।’
‘অসাধারণ গল্প!’ লোকটা হাসতে হাসতে বলে।
‘এবার ওই পাহাড়টা দেখ। ওর নাম ইউকটাস। ওটা দেখে কি তোমার কিছু মনে হচ্ছে?’
‘কি মনে হচ্ছে জানো? একটা শুয়ে থাকা মানুষের মুখ পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে।’ লোকটা বলল।
‘ঠিক ধরেছ। ওখানে হচ্ছে জিউস-এর সমাধি। জিউস মাউন্ট অলিম্পাস-এ থাকলেও তাঁর জন্ম, বিয়ে আর মৃত্যু ক্রিটে। জিউস-এর ছেলে মিনোস হচ্ছে ক্রিটের প্রথম সম্রাট। খ্রীষ্টপূর্ব দু’হাজার সাতশ থেকে পনেরশ অব্দি ছিল মিনোস-এর রাজত্বকাল। সেই সময়ের পুরাকীর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ক্রিটে। মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার হয়েছে প্রাসাদ।’
মেয়েটির কথা শুনে আরিফ নিজেকে সামলাতে পারল না। বলে উঠল, ‘দেবতারা না অমর? তাহলে জিউস-এর সমাধি হল কিভাবে?’
মেয়েটি হেসে ফেলল আরিফের কথা শুনে। বলল, ‘গ্রীস এখন প্রায় একশ’ ভাগ খ্রীষ্টান। প্রায় সবাই গ্রীক অর্থোডক্স। নতুন খ্রীষ্টধর্ম যখন গ্রীসে ছড়িয়ে পড়ল তখন পুরাণভিত্তিক পুরোনো ধর্মকে ত্যাগ করল গ্রীকরা। সে সাথে সমাধিস্থ করল জিউসকে। ওই যে দেখ ইউকটাস পাহাড়ের যে অংশটা মনে হচ্ছে জিউসের নাক তার ওপরে একটা চ্যাপেল আছে। ওখানে তীর্থ করতে যায় লোকে।’
ওরা প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। ইরাক্লিও বড় শহর। অনেক দোকানপাট। ম্যাকডোনল্ডস, সাবওয়ে সব আছে। বেশীর ভাগ বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানো। সূর্যের শক্তি আহরণ করে তা দিয়ে জল গরম করা হয়। বাসটা শহরের ভেতরে ঢুকে বিমানবন্দরের ঠিক পাশ দিয়ে চলে গেল। বিমানগুলো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে টারমাকে। এত কাছে যেন জানালা দিয়ে হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায়। সেখান থেকে বাসস্টপ পর্যন্ত যেতে লাগল আরো মিনিট দশেক। আলিমের থাকার জায়গা বাসস্টপের কাছে। ইরাক্লিও জনবহুল। কম ভাড়ায় বাড়ি পাওয়া যায়। ক্রেটা মারিসের মত রিসর্ট এলাকায় বাড়ি ভাড়া অনেক বেশী। একটা একতলা বাড়ির পেছনে টালির ছাদের ছোট একটা ঘর। মনে হয় গুদাম ঘর ছিল। তার সাথে ছোট একটা বাথরুম বানিয়ে আর প্রোপেন গ্যাসের ট্যাঙ্ক লাগানো চুলো বসিয়ে ভাড়া দেবার উপযোগি করেছে বাড়িওয়ালা। একটা সিঙ্গেল বেড, কাঠের ছোট টেবিলের সাথে দু’টো চেয়ার আর একটা ফ্রিজ। এতেই ঘরটা ভরে গেছে। এই সিঙ্গেল বেডে আলিম আর একটি পাকিস্তানী ছেলে ভাগাভাগি করে থাকে। ছেলেটা রঙের কাজ জানে। একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানীর সাথে কাজ করতে গেছে দ্বীপের আরেক প্রান্তে। তিনদিন পর আসবে।
আলিম ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে রান্নার জোগাড় করে। আরিফ চেয়ারে এসে বসে। টেবিলের ওপর একটা পুরোনো গ্রীক ম্যাগাজিন। আরিফের হঠাৎ মনে হল আরে ও তো সব পড়তে পারছে! শব্দের অর্থ জানে না বলে কিছু বুঝতে পারছে না কিন্তু পড়তে অসুবিধা হচ্ছে না। সেই ছোটবেলা থেকে সংকেত হিসেবে শিখে এসেছে গ্রীক বর্ণমালা। আলফা, বিটা, গামা। বিজ্ঞানের প্রতিটি পদে ব্যবহার করেছে এইসব সংকেত। পুরো গণিতের কেন্দ্রে রয়েছে পাই। এই সংকেতগুলো যে প্রাচীনতম ভাষার বর্ণমালা তা যেন ভুলে গিয়েছিল আরিফ। প্রাচীন চারটি ভাষার মাঝে ল্যাটিন আর সংস্কৃত টিঁকে আছে ধর্মপুস্তকে। গ্রীক আর আরবী এখনো মানুষের কথ্যভাষায় প্রবল উদ্দীপনায় সজীব হয়ে আছে।
‘আসেন ভাইজান, হাত ধুইয়া নেন।’ আলিম ডাক দেয় আরিফকে। দারুণ রান্না করেছে আলিম। পাঙ্গাসিয়াস মাছের ভুনা আর সার্ডিন মাঝের ভর্তা। প্রচন্ড ঝাল। আরিফের মেয়েরা ঝাল খেতে পারেনা। কাজেই বাড়িতে ঝাল রান্না হয়না বহুদিন। আলিম খাদ্যরসিক। ওর দেখাদেখি আরিফ উঃ আঃ করতে করতে অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলল। ওর দৈনন্দিন রুটিনের একদম বাইরে এ রকম উটের মত খাওয়া। আইঢাই লাগতে লাগল আরিফের।
‘ভাইজানের কাইল সকালে জরুরী কাম না থাকলে আইজকে আমার এইখানে থাইকা যান। কাইল শনিবার। একটা মজার জায়গায় আপনেরে নিয়া যামু। দুপুরের মইধ্যে ফিরা যাইতে পারবেন।’
আরিফের হাসি পায়। প্রস্তাবটা মন্দ নয়। ছাত্রজীবনের পর এরকম সিঙ্গেল বেডে গাদাগাদি করে ঘুমানো আর হয় নি। তাছাড়া এরকম নিয়মের বাইরে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ কারো বাড়িতে থেকে যাওয়া সেটাও করা হয় না বহুদিন। কালকে সকালের সেসনটা মিস হবে কিন্তু আলিমের প্রস্তাবনা চুম্বকের মত টানতে থাকে আরিফকে।
আলিম চলে যায় হোটেলের কাজে। ভরপেট ভাত খেয়ে ঘুম নেমে আসে আরিফের চোখে। গতরাতে ভাল ঘুম হয় নি। আরিফ বিছানায় গা এলিয়ে দেবার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। একবারে ভোর হয়ে গেছে। রাতে আলিম কখন ফিরেছে আরিফ টের পায় নি। আরিফ তাকিয়ে দেখে দেয়াল আর খাটের মাঝে এক চিলতে জায়গায় মেঝেতে চাদর বিছিয়ে আলিম ঘুমিয়ে আছে। আরিফ উঠে বাথরুমে যায়। সেই শব্দে আলিম ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে।
‘ভাইজান তো জব্বর ঘুম দিছেন কাইল রাতে।’
‘যা খাইয়েছেন আপনি। ঘুম না এসে পারে? রাতে ভাত খাওয়া ছেড়েছি কয়েকবছর হয়ে গেছে।’
রুটি আর কফি দিয়ে সকালের নাস্তা সারে ওরা।
‘ভাইজান হাটতে পারবেন তো? এইখান থিকা মিনিট পনের লাগব যাইতে।’
ওরা হাঁটা দেয়। কয়েকটা অলি-গলি পেরিয়ে ওরা এসে পড়ে অফিসপাড়ায় একটা বিশাল পার্কিং লটে। আজ শনিবার। অফিস বন্ধ। পার্কিং লট খালি। সেখানে বসেছে বাজার। এ যেন বিশাল আড়ং এক। পুরো পার্কিং লট ত্রিপল দিয়ে ঢেকে তাঁবুর মত বানানো হয়েছে। তার মাঝখানে গোটা পঞ্চাশেক দোকান। তিনটে সিঙ্গেল চৌকি জোড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে একেকটা দোকান। ভ্যানে করে পণ্যসামগ্রী নিয়ে এসেছে দোকানি। ভ্যান দোকানের পাশেই দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। কি নেই এখানে? কাঁচাবাজার, খেলনা, কাপড়চোপড়, বাসনকোসন, গ্রীক কাবাব সুভলাকি আর জলপাই পাতায় মোড়ানো দোলমা সব আছে। আশেপাশের গ্রাম থেকে টাটকা সব্জি আর ফল নিয়ে এসেছে কৃষকেরা। এই বাজারের নাম ‘চিপ মার্কেট’। শস্তার জিনিসের বাজার। একেকটা চৌকির ওপর পাহাড়ের মত স্তূপ করা জিনিস। একটা দোকানে খেলনা বিক্রি হচ্ছে এক ইউরো করে। পুরোনো কোট বিক্রি হচ্ছে দশ ইউরোতে।
আলিম আরিফকে নিয়ে আসে একটা টি-শার্টের দোকানে। দোকানের মালিক গ্রীক। তাকে সাহায্য করছে দু’টো বাংলাদেশি ছেলে। কবির আর এনায়েত। এদের গল্প আলিমের মতই। জীবন-সংগ্রাম এখনো ওদের পর্যুদস্ত করে ফেলতে পারেনি। ওরা যুদ্ধ করছে দাঁতে দাঁত চেপে। ওরা চারজন আড্ডা মারল কিছুক্ষণ। সকাল সাড়ে ন’টা বাজে। এখন যদি রওয়ানা দেয় তাহলে সকালের সেসনের শেষটুকু ধরতে পারবে আরিফ। আরিফ যাবার তাড়া দেয়। আলিম বাসস্টপ পর্যন্ত আরিফকে পৌঁছে দেয়।
‘ভাইজান তো কালকে যাইবেন, না?’
‘জ্বি।’
‘আপনের পেলেন কয়টায়?’
‘সকাল নয়টায়। আপনার সাথে মনে হয় আর দেখা হবে না। আজকে কনফারেন্স শেষ। রাতে ফেয়ারওয়েল ডিনার আছে। খুব ভাল লাগল আপনার সাথে পরিচয় হয়ে। অনেকদিন পর মনে হল স্টুডেন্ট লাইফে ফিরে গেছি। ভাল থাকবেন। খোদা হাফেজ।’
‘কি যে কন ভাইজান? আপনেরে তো ঠিকমত যতœই করতে পারলাম না। করুম কেমনে? নিজেরই তো কিছু ঠিক নাই। ঠিক আছে ভাইজান। সাবধানে সহি সালামতে যান। ভাবীরে আর ভাতিজিদের আমার সালাম দিয়েন। খোদা হাফেজ।’ আরিফের হাতটা জড়িয়ে গাঢ় কন্ঠে আলিম বলে।
মেইন স্ট্রিটে ক্রেটা মারিস স্টপে বাস আরিফকে নামিয়ে দেয়। তার উল্টোদিকে বিশাল এক দোকান। ‘ভস ফার এন্ড স্পেশালিটি সেন্টার’। কি মনে করে আরিফ ঢোকে দোকানটায়। থরে থরে সাজানো রয়েছে ফারের কোট। একটা কোনায় তিরিশ ভাগ ছাড় দেয়া জিনিস। একটা কোট আরিফের পছন্দ হল। নায়লাকে মানাবে বেশ। দাম দেখে আরিফের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। প্রায় তিন হাজার ইউরো। বাংলাদেশের টাকায় তিন লাখেরও বেশী। কে কেনে? আরিফ খারাপ উপার্জন করে না। তবু ও তো স্বপ্নেও কিনতে পারবে না এত দামের কোট! শুধু ভস নয় আরো কয়েকটা ফার কোটের দোকান দেখেছে আরিফ। উত্তর ইউরোপের ধনী দেশগুলো থেকে ট্যুরিস্টরা আসে গরমের সময়। ক্রিটে যখন গ্রীষ্ম এসেছে ওই দেশগুলোতে তখনো বেশ ঠান্ডা। সূর্যের তাপে গরম হওয়া রক্ত ফিরে যাবার পর তুষারের প্রকোপে যেন ঠান্ডা না হয়ে যায় তার জন্য তারা ফার কোট কিনে নিয়ে যায়। চিপ মার্কেট আর ভস! এই গভীর বৈপরীত্য যতদিন না ঘুচবে ততদিন সামাজিক আর অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব চলতেই থাকবে। যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে সমগ্র ইউরোপে তা সহজে মিটবে না।
হোটেলে এসে স্নান করে কাপড় বদলে কনফারেন্সে এসে আরিফ টের পায় কনফারেন্সের বাতাস যেন বেশ প্রফুল্ল হয়ে আছে। এই কনফারেন্সটা বছর পনের আগে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিটের একজন অধ্যাপক নিজের উদ্যোগে শুরু করেছেন। সবার জন্য উন্মুক্ত নয় এই কনফারেন্স। শুধু নিমন্ত্রিত বক্তারা যোগ দেন এতে। বিশ্বের প্রথিতযশা একশজন রসায়নবিদ আসেন এখানে। সবাই সবাইকে চেনেন। পনের বছর পর এই কনফারেন্স বেশ বিখ্যাত হয়ে গেছে। এখানে বক্তৃতা দেবার ডাক পাওয়ার অর্থ হল নিজের কাজ বিশ্বমানের স্তরে পৌঁছে যাবার স্বীকৃতি পাওয়া। আরিফ এবারই প্রথম যোগ দিয়েছে এই কনফারেন্সে। বেশ আত্মশ্লাঘা হয়েছে ওর নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে। আরিফ যখন কনভেনশন সেন্টারে ঢুকল তখন সকালের সেশন শেষ হয়ে কফিব্রেক চলছে। কফি খেতে খেতে সবাই উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। সেই উত্তেজনার মধ্যে মিশে আছে প্রকাশ্য আনন্দ। বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলছে না কেউ। আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
গতকাল পুরস্কার ঘোষণা হয়েছে। আরিফ রাতে আলিমের বাড়িতে ছিল বলে খবরটা জানতে পারে নি। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর গত ষাটবছরে ইউরোপের নেতৃমন্ডলী শান্তিস্থাপনের প্রাণপণ চেষ্টায় সাতাশটি দেশকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে এসেছেন। তাদের সীমানা উন্মুক্ত। এক মুদ্রা ইউরো ব্যবহার করে সবাই। ফ্রান্স আর জার্মানী যারা যুগের পর যুগ যুদ্ধ করেছে একে অপরের সাথে তারা এখন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হবার পর কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রীসে, আয়ারল্যান্ডে, পর্তুগালে। ইউরোপের ইতিহাসে এই প্রথম দীর্ঘদিন যুদ্ধবিহীন শান্তির পতাকা উড়ছে। এই ক্রান্তিকালে যখন ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা ফাটল ধরাচ্ছে ইউরোপের ঐক্যে তখন এই পুরস্কার যেন সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাফল্যের কথা, অর্জনের কথা। জার্মানীর চ্যান্সেলার এনগেলা মার্কেল গ্রীসে এলে এক দল গ্রীক নাৎসীর পোষাক পরে আর সোয়াসটিকার পতাকা উড়িয়ে তাঁকে উপহাস করেছে। সেই ঘটনার পর অনেকেই বলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙতে আর বেশী দেরী নেই। শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা হয়তো সেই ভাঙনটাকে ঠেকাবে। জল্পনা-কল্পনা চলছে অনেক। কে গ্রহণ করবে এই পুরস্কার? কারা পাবে এই টাকা? ইউরোপের পাঁচশ মিলিয়ন লোকের মধ্যে কি ভাগ হবে পুরস্কারের নয় লক্ষ ইউরো? মাথাপিছু পাওয়া যাবে এক সেন্টের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। হিসেবটা কষে সবার মাঝে হাসির রোল ওঠে।
কনফারেন্স শেষ। তিনদিন মন্দ কাটল না। ট্যাক্সি করে সকাল সাড়ে সাতটায় বিমানবন্দরে এসে আরিফ অবাক হয়ে গেল। আলিম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওর অপেক্ষায়।
‘আরে আপনি? এত সকালে কি করছেন এখানে?’
‘আপনের সাথে দেখা করতে আইছি। বেয়াদবি না নিলে ভাইজানরে একটা কথা কইতে চাই।’
‘বলেন না, কি বলবেন?’
‘ভাইজান কইছিলেন ডিসেম্বর মাসে দেশে যাইবেন।’
‘জ্বি যাওয়ার তো ইচ্ছে আছে।’
‘একটা জিনিস কি ভাইজান দেশে নিয়া যাইতে পারবেন? জানি আইজকাল ওজন নিয়া বেশ সমস্যা। বেশী কিছু দিমু না। ছোট, হাল্কা একটা জিনিস।’ আলিম আমতা আমতা করে বলে।
‘দিন কি দেবেন।’
আলিম বের করে আনে ব্যাগ থেকে। জলপাই গাছের কাঠ দিয়ে তৈরী একটা বাঁশি। সেই সাথে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় আরিফের দিকে।
‘আমার পোলার লাইগা। এইখানে ঠিকানা ফোন নম্বর আছে। ভাইজান যদি কষ্ট কইরা ফোন করেন তাইলে কেউ আইসা নিয়া যাইব।’
‘দেশে আপনার ছেলে আছে!’ আরিফ অবাক হয়ে যায়। আলিম আরিফের পরিবারের খোঁজখবর করেছে কিন্তু আরিফ ব্যস্ত ছিল আলিমের জীবনকাহিনী শুনতে। আলিমের কে আছে তা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে নি।
‘আছে ভাইজান। বউ আছে। আর সাত বছরের একটা পোলা। বংশালে থাকে আমার মায়ের সাথে। পোলাটারে এক বছরের রাইখা মালয়েশিয়ায় আইছিলাম। তারপর আর যাওয়া হয় নাই। পোলাটা কেমন হইছে, কিরম দেখতে হইছে কিছুই জানিনা। গত দুই বছর ঠিকমত ট্যাকাও পাঠাইতে পারতেছি না। কেমনযে ওগো চলতেছে খোদাতালাই জানে।’ সদাহাস্য আলিমের বুক থেকে গাঢ় দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। চোখের কোলে ছলকে ওঠে জল।
বাঁশি আর ঠিকানার কাগজটা ব্যাগের সাইড পকেটে ঢুকিয়ে প্লেনে উঠে আসে আরিফ। ফোনটা অন করে দু’ মেয়ের ছবি দেখে অনেকক্ষণ ধরে। মেয়েদের জন্য ব্যাগ ভর্তি করে উপহার নিয়ে যাচ্ছে আরিফ। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি আদর-স্নেহ-ভালবাসা-মাখানো যেন তিন ইউরো দামের জলপাই কাঠের বাঁশি।