চুপচাপ মই আন ।। লুনা রুশদীর লেখা
লু না রু শ দী, শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০১২


খবরটা পেয়েই খুশির চোটে লাফাতে লাফাতে আম্মাকে বললাম ‘আম্মা জানো মো-ইয়ান সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন’।

আম্মা কড়াইয়ে কী একটা নাড়তে নাড়তে চোখ গোল করে উত্তর দিল ‘কোথাকার কে মই আনতে গিয়ে প্রাইজ পেয়েছে তুই এত লাফাস কেন? তোকে একটা বোকার প্রাইজ দিয়ে দেয়া উচিত ব্যাটাদের!’

উত্তরে এমন মুখভঙ্গি করলাম যার অর্থ মো-ইয়ানের নাম যে অর্বাচীন না জানে তার সাথে আলাপই বৃথা। গত বছর মেলবোর্নের লেখক-পাঠক মেলার আগে আমিও যে তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞান ছিলাম, তা আর জানালাম না।


প্রায় দৈবক্রমেই মো-ইয়ানের সেমিনারে বসার সুযোগ হয়েছিল। মেলার তখন দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে। এই কয়েক দিনে ফেডারেশান স্কয়ারের হলোঘর, স্টুডিও সব পরিচিত হয়ে গেছে। সকালে একটা সেমিনার থেকে ফিরে ক্যাফেতে বসে সেইদিনের অনুষ্ঠানসূচি খুঁটিয়ে দেখছিলাম। তখনই মো-ইয়ানের নামের ওপর চোখ আটকে গেল। তাঁকে নাকি চীন দেশী ফ্রানৎ্‌স কাফকা বলা হয়। তাই নাকি? অথচ এতদিন তাঁর নামও শুনি নাই, কী অন্যায়! শুধু তাই না, আমার প্রিয় পরিচালক ঝ্যাং ইয়েমুর (ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন যাঁর পরিচালিত) ছায়াছবি ‘রেড-সরঘাম’ মো-ইয়ানের বইয়েরই চলচ্চিত্রায়ণ।

মো-ইয়ান কথা বলবেন এক নম্বর স্টুডিওতে। কফি শেষ করে হাঁটা দিলাম। মনের চোখে ভাসছিল কাফকার রুগ্ন দুঃখী মুখ আর তীব্র চোখ। মো-ইয়ান কি কাফকার মতনই দেখতে? স্টুডিওর দরজায় এসে আমার কল্পনা হোঁচট খেল। মঞ্চের তিনটা চেয়ারের একটাতে বসে আছেন স্যুট টাই পড়া গোলগাল চেহারার ছোটখাটো এক চায়নাম্যান। আরে এঁর মতোন দেখতে কত মানুষ তো আমি বাসস্টপে বা চীনাদের সব্জির দোকানগুলোতেই দেখি! একটু পরে সম্বিত ফিরে পেয়ে নিজেকেই ধমকালাম মনে মনে ‘চীন দেশের মানুষ কি আর হারকিউলিস এর মতোন দেখতে হবেন নাকি?’ ভিতরে গিয়ে বসলাম। এই স্টুডিওটা বেশ ঘরোয়া। সামনে একটুখানি মঞ্চ মতোন জায়গা আর ঘরে তিনটা সারিতে প্রশস্ত কাঠের বেঞ্চ পাতা দর্শকদের জন্য। সব মিলিয়ে আমরা আট নয় জন এসেছি বক্তৃতা শুনতে। মাইক আর ক্যামেরা ঠিকঠাক করা হচ্ছিল। মো-ইয়ান বসে ছিলেন মাঝের চেয়ারটায়। তাঁর একপাশে জেনি নিভেন বসেছেন, তিনিই সাক্ষাৎকারটা নেবেন। অন্যপাশে আছেন মো-ইয়ানের দোভাষী লিলিয়ান।

জেনি পরিচয় পর্ব শুরু করলেন। মো-ইয়ান হাসিহাসি মুখে সবার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ভাষা বুঝতে না পারার কারণে একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠছিল চোখে মুখে। জেনি বলছিলেন অন্যান্য চীনদেশি লেখকদের তুলনায় মো-ইয়ান পশ্চিমা বিশ্বে অনেক বেশি সুপরিচিত। তাঁর বেশ কিছু বই হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাটের ইংরেজি অনুবাদে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের নাম – ‘লাল-সরঘম’ (Red Sorghum) যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, ‘শিফু, হাসির জন্য তুমি সবকিছু করবে’ (Shifu, You’ll Do Anything for a Laugh) , চৈনিক ভাষায় ‘শিফু’ মানে যে কোনো কাজে দক্ষ কোনো ব্যক্তি, ‘জীবন ও মৃত্যু আমায় ক্ষয় করে ফেলছে’ (Life and Death are Wearing me Out) ইত্যাদি। জেনি আরো জানালেন মো-ইয়ানের লেখার ভাষা বলিষ্ঠ, বিষয় ব্যাপক, খুব ভিজুয়্যাল, মাঝে মাঝেই ইতিহাসনির্ভর, লেখার ধরনে প্রায়ই মিশে থাকে ফ্যান্টাসি আর অ্যাবসার্ডিটি। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হলো তারপর।


জেনিঃ আমার প্রথম প্রশ্ন আপনার ছোটবেলা প্রসঙ্গে। আপনার অনেক লেখাতেই শানদং এর কথা এসেছে। এ প্রদেশে চীনের বহু বিখ্যাত ব্যক্তির জন্ম, যেমন কনফুশিয়াস বা লেখক পু সংলিং। আপনার লেখার উপরে ছোটবেলার শহর কী রকম প্রভাব ফেলেছে?

মো-ইয়ানঃ আমার জন্ম ১৯৫৫ সালে। আমি শানদং প্রদেশের গাওমী জেলার একটা ছোট্ট গ্রাম তুন-পে তে জন্মেছি। তুন-পে অর্থ ‘উত্তর-পূর্ব’। গ্রামটা ছিল বেশ নীচু এলাকায় তাই প্রায়ই বন্যা হতো। বন্যার পানির কারণে তেমন কোনো ফসল ফলানো যেত না আমাদের গ্রামে। শুধু লাল-সরঘাম (এক ধরনের গম) ছাড়া আর কিছু টিকতো না। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনুন্নত ছিল, এই গ্রামের বাইরের মানুষ যেমন এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিল না, তেমনি আমাদের গ্রামেও বাইরের খবর তেমন পৌঁছাতো না। এ গ্রামের অনেক মানুষ তাঁদের সারা জীবনে বাইরে কোথাও যান নাই, অনেকেই ট্রেনও দেখেন নাই কোনোদিন। বিদ্যুৎ এসেছে মাত্র দুই দশক আগে। প্রথমবার বিজলিবাতি দেখার কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সুইচ অন করতেই ঘরভর্তি আলো। কী যে অবাক হয়েছিলাম! বারে বারে জানতে চাইছিলাম ‘এটা কীভাবে সম্ভব? কেমন করে হলো? কোথা থেকে আসছে?’ (বলতে বলতেই হাসলেন)

এরপরে অবশ্য বিজ্ঞান নিয়ে আরেকটু পড়াশোনা করে জানতে পেরেছি কেমন করে এরকম যাদু সম্ভবপর হয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের অল্পবয়ষ্ক অনেকের মধ্যেই এই কৌতূহলটুকু নাই।


আমাদের ওখানে আর যা আছে, তা হলো পরম্পরা, লোকগাঁথা, কিংবদন্তি। মনে আছে ছোটবেলায় আমি সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম । অন্ধকার হয়ে গেলে বাইরে যেতে সাহস পেতাম না। বাইরে গেলে মনে হলো ভূত আর শেয়াল বোধহয় আমার পিছু নিয়েছে। যদি কখনো অন্ধকারে বাইরে যেতে হতো ভীষণ চিৎকার করতে করতে ছুটতাম অথবা খুব জোরে জোরে গান গাইতাম নিজেকে সাহস দেয়ার জন্য। যখন বাসায় ফিরতাম প্রায়ই মা বলতেন ‘আমি আগেই বুঝেছিলাম তুই বাসায় ফিরছিস, তোর আগে তোর চিৎকার এসে পৌঁছেছে’।

(আমরা সমস্বরে হেসে উঠলাম)


মা জিজ্ঞেস করতেন ‘কী নিয়ে এমন চেঁচাচ্ছিলি এমন করে?’


আমি বলতাম ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম, খুব ভয় পাচ্ছিলাম’।

তিনি জানতে চাইতেন ‘কীসের এত ভয় তোর?’

আমি বলতাম ‘তা তো জানি না!’ (জোরে হেসে উঠলেন)


শুধু এক অজানা ভয়। তারপরে একদিন পু-সংলিং এর ‘ভুত ও শেয়ালের গল্প’ (The Tales of Foxes and Ghosts) পড়লাম। তার গল্পে মানুষরূপী অনেক শেয়ালের কথা ছিল, সে শেয়ালগুলি সুন্দরী মেয়েদের রূপ ধারণ করতো। কিছু গল্প ছিল মৃত মানুষের আবার জীবিত হয়ে ফিরে আসার। বইয়ের গল্পগুলি আমি আগেও শুনেছি গ্রামের বুড়োবুড়িদের কাছে। আমার মনে তখন একটা প্রশ্ন জাগলো। তাহলে কি আমার গ্রামের বয়ষ্করা আগেই বইটা পড়ে ফেলেছিলেন? নাকি পু-সংলিং বয়স্কদের কাছে গল্পগুলো শুনে নিয়ে বইয়ে লিখে রেখেছেন? পরে মনে হলো হয়তো এই দুইরকমই সম্ভব।

বাসায় এবং স্কুলে আমি খুব দুষ্টামি করতাম। সে কারণে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। (হেসে উঠলাম সবাই)

সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আমার অত্যাধিক কথা বলার অভ্যাস। সে সময় চীনের রাজনৈতিক অবস্থা অস্বাভাবিক ছিল। কেউ মুখ ফস্কে কিছু বলে ফেললে অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিবারও সমস্যায় পড়তো। যখনই আমি স্কুলে যেতাম বা বাইরে কোথাও, বাবা মা সাবধান করে দিতেন ‘তুই বাইরে গেলে চুপচাপ থাকার চেষ্টা করিস, বেশি কথা বলিস না’। তারা বলতেন যে ‘তোকে যে যাই জিজ্ঞেস করুক সবকিছুর উত্তরে বলবি - আমি জানি না’। কিন্তু আমার তো সারাক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছা করতো! ওঁদের নিষেধের সাথে তাল মিলিয়ে ইচ্ছাটাও প্রবল হতে থাকতো। স্কুলেও অনেক অনভিপ্রেত কথা বলে ফেলেছি। সে সময় আমরা স্লোগান দিতাম ‘চেয়ারম্যান মাও দীর্ঘজীবি হোন, তিনি দশ হাজার বছর বেঁচে থাকুন’। আমি আমার শিক্ষককে প্রশ্ন করলাম ‘কোনো মানুষ কি অনন্তকাল বাঁচতে পারে?’ তিনি বলতেন ‘অবশ্যই পারে না’। তখন জানতে চাইলাম তাহলে যে আমরা রোজ চেয়ারম্যান মাওয়ের জন্য স্লোগান দেই? আমার শিক্ষক ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন ‘ওহ! তুমি তো দেখি বিপ্লবের বিপক্ষে!’ এরপর স্কুলের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হলো আমার প্রশ্ন নিয়ে। একটা ছোট ছেলে নিজের ঔৎসুক্য থেকে এরকম একটা প্রশ্ন করতে পারে তা তাঁরা ভাবতে পারেন নাই। তাঁদের সন্দেহ নিশ্চয়ই আমার বাবা-মা এই বিষয়ে বাসায় কথাবার্তা বলেন। এইসব বেফাঁস কথাবার্তার কারণে বাবা-মায়ের অনেক রকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আমার মা প্রায়ই কাঁদতে কাঁদতে আমাকে প্রশ্ন করতেন ‘তুই কবে এইরকম গাধার মতোন কথা বলা থামাবি?’ বিশ বছর পরে যখন আমি লেখালেখি শুরু করলাম, তখন ভাবলাম নিজের একটা নামকরণ দরকার। তাই আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে ‘মো-ইয়ান’ নামটা ব্যবহার করি, এর অর্থ ‘চুপ কর’। এটা নিজেকেই আমার বাবা-মায়ের উপদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য রাখা।


জেনিঃ এই যে আপনার ছোটবেলার প্রবল ইচ্ছা কথা বলার এবং তার জন্য নানা রকম বিপদে পড়া। এর সাথে, একজন ঔপন্যাসিক হিসাবে আপনার বিকাশের কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে?


মো-ইয়ানঃ তাহলে আগের কথায় ফিরি। বেশি কথা বলার কারণে স্কুল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে কিছুদিন কোনো কাজকর্ম ছিল না। আমি রাখাল হয়ে গেলাম। আমাদের গরুগুলির দেখাশোনা করতাম, মাঠে নিয়ে যেতাম। মাঠে শুধু আমি আর গরু ছাড়া কেউ নাই। ভোরে উঠে গরু চড়াতে মাঠে যেতাম, সন্ধ্যাবেলায় ফিরতাম। কখনো কখনো সারাদিনেও কোনো মানুষের সাথে দেখা হতো না, একটা কথা হতো না। গরুদের সাথেই কথা বলতাম, কখনো পাখিদের সাথে আর কখনো নিজের সাথে। এই সমস্ত কথোপকথনই আমার উপন্যাসে জায়গা করে নিয়েছে। আমার ছোটবেলার জমা করা গল্পগুলোই এখনো লিখে যাচ্ছি।


জেনিঃ আপনার অনেক গল্পের বিস্তারেই রয়েছে শানদং এর গ্রামীণ জীবন আর পারিপার্শ্বিক। আপনার বই পড়লে গ্রামীণ জীবন ও সেখানকার মানুষ সম্পর্কে বেশ স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আপনার লেখায় এই পারিপার্শ্বিকের প্রভাব বিষয়ে কিছু বলবেন?



মো-ইয়ানঃ প্রথম যখন লেখা শুরু করি তখন গ্রামীণ জীবন নিয়ে লিখি নাই। সে সময়ে আমি সেনাবাহিনীতে কাজ করতাম, সে জীবন নিয়েই লিখতে শুরু করেছিলাম। এখন ফিরে তাকালে মনে হয় সে সময়ের লেখাগুলোকে উপন্যাস বলা ঠিক হবে না। বরং সেনাবাহিনী জীবনের খণ্ডচিত্র বলা যায়।


আশির দশকের শুরুর দিকে চীনে যখন open door policy বাস্তবায়িত হলো, সে সময় সাহিত্য বিষয়ে মানুষের ধারণাও বদলাল। আমার মনে হলো লেখক হিসাবে শুধু কল্পনানির্ভর গল্প না, বরং আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্যেও গল্প খুঁজে নেয়া যায়। আমি মনে করি একজন লেখকের চেনা জগৎ, তাঁর শৈশবের নানা খুঁটিনাটি যখন লেখায় উঠে আসে তাতে একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়।

আমি জন্মের পর একুশ বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের বাইরে যাই নাই। গ্রামের প্রতিটা পরিবারকেই চিনতাম। প্রত্যেক সদস্যই শুধু না, এমনকি কার বাড়িতে কয়টা মুরগি তাও ছিল আমার নখদর্পণে(হেসে উঠলাম আমরা সবাই)। গ্রামের প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা গাছ এমনকি প্রতিটা ঘাস বারে বারেই আমার স্বপ্নে এসেছে। আমার লেখাতে তাই এই গ্রামটা সবসময়েই প্রাসঙ্গিক।


জেনিঃ আপনার লেখার ধরন খুব আকর্ষণীয় মনে হয় আমার। আশির দশকের যে সময়টার কথা বললেন আমি জানি সে সময় চীনে বিদেশি সাহিত্য বেশ সহজলভ্য হতে শুরু করে। সে সময়ের লেখকদের উপরেও এর প্রভাব পরেছিল। আপনার ব্যক্তিগত রচনায় বলেছেন যে ইউরোপীয় লেখা আপনার উপরে তেমন প্রভাব ফেলে নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে প্রায়ই আপনাকে তুলনা করা হয় ফ্রানৎস কাফকা অথবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সাথে। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

মো-ইয়ানঃ একটা সময়ে তাঁদের প্রভাব আমার উপরেও পড়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রথম মার্কেজের লেখা বই পড়ে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম যে কথা আমার মনে এসেছিল তা হলো ‘ওহ! এভাবেও তাহলে উপন্যাস লেখা যায়!’ আর দ্বিতীয় যে কথা মনে এল তা হলো ‘এই কথা যদি আগে জানতাম তাহলে তো আমিও নোবেল প্রাইজ পেতাম!’ কারণ যে একুশ বছর আমি গ্রামে থেকেছি, সে সময়ে মার্কেজের বইয়ে লেখা অনেক ছোট ছোট দৃশ্যের মতোন অনেক কিছু আমার মনেও এসেছে। এই সব চিন্তায় তাঁর বইটা পড়ে শেষ করার ধৈর্য ধরতে পারলাম না। আমি করলাম কি, বইটা রেখে দিয়ে তাড়াহুড়া করে নিজেই একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করে দিলাম। তাই স্বীকার না করে উপায় নাই যে সে সময়ে আমার লেখায় মার্কেজ ঢুকে পড়েছিলেন। শুধু তিনিই না, মার্কিন লেখক ফকনারের প্রভাবও ছিল আমার লেখায়।


তবে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝেছিলাম যে অন্যদের লেখার ধরন নকল করে আসলে খুব বেশিদূর যাওয়া যায় না। যদি বিশ্বসাহিত্যে একজন চৈনিক লেখক স্থান করে নিতে চান, তাহলে চীনা চরিত্র নিয়েই লিখতে হবে। ১৯৮৭ সালে আমি এই নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সেখানে বলেছিলাম যে আমরা যদি হই বরফের মতো তাহলে মার্কেজের মতো বিশ্ববিখ্যাত লেখকেরা আমাদের পাশে আগুনের শিখার মতোন, তাঁদের খুব কাছে থাকলে আমরা অদৃশ্য হয়ে যাবো। তখন থেকেই সচেতনভাবে অন্য দেশি লেখকের প্রভাব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি। তার বদলে আমার লেখায় নিয়ে আসলাম আমার পরিচিত পৃথিবী – যেমন আমাদের গ্রামীণ জীবন, কিংবদনন্তি, লোককথা ইত্যাদি। গত বিশ বছর ধরে এইদিকেই আমার চেষ্টা ছিল।


জেনীঃ আপনার কাজের উপরে চৈনিক সাহিত্যের প্রভাব বিষয়েও একই মত আপনার?

মো-ইয়ানঃ আমি চীনা লেখকদের প্রভাব থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করি। সব লেখকই মৌলিক হওয়ার সাধনা করেন। আর এই মৌলিকত্ব শুধু কি গল্প তাঁরা বলছেন তার উপরেই নির্ভর করে না, বরং কীভাবে বলছেন আর কি ভাষা প্রয়োগ করছেন সেটাও জরুরী বিষয়। একই ঘটনার উপরে ভিত্তি করে দুইজন লেখকের গল্প সেইজন্যই দুটি ভিন্ন রূপ নেয়। সাহিত্য তো ভাষাভিত্তিক শিল্প, একজন লেখকের যদি ভাষার উপরে দখল না থাকে, তিনি ভালো লেখক হতে পারেন না। ভাষারও আবার নানা রূপ রয়েছে। সব চীনা লেখকই প্রাচীন চীনা ভাষা দিয়ে কমবেশি প্রভাবিত, প্রাচীন এই ভাষা আধুনিক চীনা ভাষার চেয়ে আলাদা। লু-সুন এবং আরো অনেক আধুনিক লেখকও বর্তমান চীনা লেখকদের প্রভাবিত করেছেন। একইভাবে অনুবাদ সাহিত্য দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছি আমরা। আমার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে লোকশিল্প। বিশেষ করে গ্রামের রাস্তায় মুখে মুখে গল্প বলতেন যাঁরা আর দাদা/দাদী, নানা/নানীর কাছে শোনা গল্পের প্রভাবও কম না। ভাষার ব্যপারে সৃজনশীল হতে পারা বেশ কষ্টসাধ্য। এখনো ভাষার সীমাবদ্ধতাই আমার ভাব প্রকাশে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়।


জেনীঃ আপনি বললেন যে একই ঘটনা দুইজন লেখক দুইভাবে দেখেন। এর পরের প্রশ্ন অনুবাদ সাহিত্য বিষয়ে। তবে প্রথমে জানতে চাই আপনার বই ‘রেড-সরঘাম’ এর চলচ্চিত্রায়ণ করেছিলেন ঝ্যাং ইয়েমু। সেটা তাঁর প্রথম দিককার ছবি ছিল আর এর মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিও লাভ করেন তিনি ও অভিনেতা গং-লি। নিজের বইয়ের ছায়াছবিতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়া আপনার কাছে কেমন লেগেছে? এর সাথে আপনি কতটা যুক্ত ছিলেন? এই রূপান্তরে আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন?

মো-ইয়ানঃ আমার কাজের অনুবাদ বিষয়ে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি বলবো যে আমার জন্য ব্যপারটা একদম ভাগ্য নির্ভর। ভালো অথবা খারাপ অনুবাদ বা রূপান্তর বোঝার সাধ্য তো আমার নাই, আমি তো ইংরেজিই জানি না।


জেনীঃ হুম তবে আপনার বেশির ভাগ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদই তো করেছেন হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট। তার মানে তিনি আপনার সাথে বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ করছেন, এই সম্পর্কটা নিশ্চয়ই দিনে দিনে নিবিড় হয়েছে অথবা বদলেছে এই পাঁচ ছয়টা বইয়ের পরিসরে। আমি সেইসাথে এটাও যোগ করতে চাই যে আপনার আর হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাটের মধ্যকার একটা কথোপকথন আমি দেখেছি। আপনাদের মধ্যকার আদানপ্রদান দর্শকদের কাছেও যাদুকরী মনে হয়েছে।


মো-ইয়ানঃ আসলে বন্ধু হিসাবে আমি তো খুব অনুগত। আর হাওয়ার্ডকে আমি চিনি প্রায় বিশ বছর ধরে, আমরা খুব ভালো বন্ধু আর একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত। আশির দশকেও খুব কম চীনা বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ হতো। হাওয়ার্ড সেইসময় আমার সাথে যোগাযোগ করেন ও আমার লেখার অনুবাদ শুরু করেন। আমি জানতাম আমার কাজের অনুবাদ বেশ কষ্টসাধ্য হবে কারণ আমার লেখায় চীনা উপকথা ও প্রবাদ-প্রবচণের ব্যবহার অনেক। পরবর্তীতে হংকং এর প্রফেসর লিও যোগাযোগ করেন আমার সাথে, তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে হাওয়ার্ডের অনুবাদ নাকি মূল লেখাগুলোর মতোনই ভাল। হাওয়ার্ডের প্রতি আমার প্রবল আস্থার সেটাও একটা ভিত্তি। এ পর্যন্ত তিনি আমার আটটি বই অনুবাদ করেছেন। অবশ্য তাঁরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করি। যেমন যে লেখককে তাঁর পছন্দ না, তাঁদের কাজের অনুবাদ তিনি খুব তাড়াহুড়া করে শেষ করেন। আমি বলবো তাঁর কাছে দুটি কলম আছে। একটা কলমে তিনি আমার লেখা অনুবাদ করেন – যথেষ্ট সময় নিয়ে, যত্নের সাথে। আর অন্য কলম চালান টাকা আয় করার জন্য, খুব দ্রুত।


তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে চীনা গল্প অন্য যে কোনো ভাষায় অনুবাদ করার প্রক্রিয়া খুব লম্বা সময়সাপেক্ষ আর কঠিন। মূলত অনুবাদ বিষয়টাই এরকম। যত দক্ষ অনুবাদকই হন না কেন, মূল থেকে বিচ্যূতি অনিবার্য্য। এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে রূপান্তরের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য।

‘রেড-সরঘাম’ এর চলচ্চিত্রে রূপায়নের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি একজন লেখক আর পরিচালকের মধ্যকার যোগাযোগটা হওয়া দরকার খুব সুক্ষ্ণ। যখন রেড-সরঘাম বইটা লিখেছিলাম তখন স্বপ্নেও ভাবি নাই যে এই বইয়ের গল্পে ছায়াছবি হতে পারে। যখন এ ব্যপারে পরিচালক ঝ্যাং ইয়েমো আমার সাথে কথা বললেন, আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম ‘কি বলেন? এইরকম বই দিয়ে সিনেমা কীভাবে বানাবেন?’ যেমন বইয়ে সরঘামের মাঠের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছি ‘এক সাগরের সমান প্রশস্ত’, আমি জানতে চাইলাম এই রকম একটা দৃশ্য কীভাবে চিত্রায়িত হবে কারণ আমাদের গ্রামে তো আর ওই পরিমাণ সরঘাম নাই। ইয়েমো তখন বলেছিলেন ‘চিন্তার কিছু নাই, সব ব্যবস্থা হবে’।

পরে বুঝেছিলাম একটা বই থেকে ছায়াছবি বানানোর বিষয়টা আসলে অনেকাংশেই বাছাই নির্ভর। যেমন একটা বইয়ে অনেক অনেক চরিত্র থাকতে পারে আর এক গল্পের ভিতরেই ছোট ছোট আরো অনেক গল্প থাকতে পারে। চলচ্চিত্রে এই সমস্ত চরিত্র আর সব গল্প নিয়ে আসা তো সম্ভব না। একজন ভালো পরিচালকের ক্ষমতা থাকে একটা বইয়ের সবচেয়ে ভালো ও প্রয়োজনীয় অংশটুকু বেছে নেয়ার। রেড-সরঘামের চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে আমি খুশি। ইয়েমোর পরিচালিত সমকালীন উপন্যাস ভিত্তিক ছবিগুলির কারণেই পরিচালক হিসাবে তিনি সফল। তবে তাঁর সাম্প্রতিক কাজ আমার ভালো লাগে না।


ঝ্যাং ইয়েমো আমাকে বলেছিলেন তাঁর জন্য আরেকটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিতে। এবারের গল্পের নাম ‘হোয়াইট কটন’। গল্পটা ছিল কয়েকজন তুলা চাষিকে কেন্দ্র করে, যারা ফসল কাটার পরে তাদের শস্য পাঠায় কারখানায়। ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশানের সাথে সাথে মানুষগুলিও কীভাবে বদলাতে থাকে তাই নিয়ে ছিল গল্পটা। তবে দুর্ভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় নাই।

জেনীঃ আপনার উপন্যাস ‘ফ্রগ’ সম্পর্কে এবার কিছু শুনতে চাই। শুনেছি উপন্যাসটা মাত্রই ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে তবে এখনো প্রকাশ পায় নাই। বইটা নাকি পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে?

মো-ইয়ানঃ ‘ফ্রগ’ আমার সর্বশেষ উপন্যাস। এটা প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে। চীনে এই বইটা ‘মাও দুন’ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। দশ বছর আগে এধরনের একটা বই পুরস্কার পাওয়া তো দূরের কথা, প্রকাশিতও হতো না। তাই বলতেই হয়ে চৈনিক সমাজও প্রগতির মুখ দেখতে শুরু করেছে। চীনের one child policyর কথা এসেছে এই উপন্যাসে, যা ত্রিশ বছর আগে বাস্তবায়িত হয়েছিল। আমি উপন্যাসটাতে গ্রামের একজন ধাত্রীর জীবন দেখাতে চেয়েছি।


আমার এক খালা একজন ধাত্রী, তিনি সেই পঞ্চাশের দশক থেকে কাজ করছেন। আমি এবং আমার মেয়ের জন্মের সময় এই খালাই ধাত্রী ছিলেন। সম্প্রতি আমার নাতনি জন্মেছে, তার ধাত্রী ছিল আমার খালার মেয়ে। খালা হিসাব করে আমাকে বলেছিলেন যে তিনি নিজেই প্রায় ৬০০০ শিশু প্রসব করিয়েছেন। One child policy যখন কার্যকরী হলো তখন গ্রামের হাসপাতালের একজন ধাত্রী হিসাবে খালাকে অনেক গর্ভপাত করাতে হয়েছে। এরকম একজন মানুষের মনে নিশ্চয়ই অনেক রকম দ্বিধা এসেছে, বিবেকের দংশন সহ্য করতে হয়েছে। খালাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার কথা অনেকদিন ধরেই ভেবেছি।

২০০১ সালে জাপানের লেখক কেনজাবুরো আমার গ্রামে দেখা করতে এসেছিলেন, খালা তাঁর সাথেও অনেক কথা বলেছিলেন। খালার বাচনভঙ্গি সুন্দর, কেনজাবুরোর মনও জয় করে নিয়েছিলেন। পরে যখনই কেনজাবুরোর সাথে দেখা হতো তিনি জানতে চাইতেন খালাকে নিয়ে কেন এখনো কোনো উপন্যাস লিখছি না। তিনি জাপানে তাঁর অনেক বক্তৃতাতেও আমার খালার কথা বলেছেন। একবার শুনেছি বলেছেন ‘মো-ইয়ানের খালা প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সাইকেলে চড়ে জংলি খরগোশ ধাওয়া করছিলেন’। খালা বলেছিলেন যে খুব শীতের মধ্যেও মাঝে মাঝে মানুষের বাড়িতে যেতে হতো তাঁকে ধাত্রীর কাজে। একটা নদীর পানি জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল, তাড়াতাড়ি পৌঁছুবার জন্য তার উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পার হওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি মনে আছে, কেনজাবুরো যে এর মধ্যে খরগোশ কোথায় আবিষ্কার করলেন!

এই উপন্যাসটা লেখা শুরু করেছিলাম ২০০৪ সালে। তখন ১৫০০০০ শব্দ লিখেছিলাম পছন্দ না হওয়ায় ফেলে দিয়েছি। নতুন করে শুরু করেছি আবার ২০০৮ সালে। এবার মনে হয় সব ঠিকঠাক আছে। প্রথম চারটা অধ্যায় একটা চিঠির আকারে লেখা, যেন আমি একজন জাপানি লেখককে খালার কথা জানিয়ে চিঠি লিখছি। আর শেষ অংশটুকু নাটকের মতো। নাটকটা আবার বইয়েরই এক চরিত্রের লেখা। যদিও উপন্যাসে ঘুরেফিরেই এসেছে one child policyর কথা আর তাকে ঘিরে নানারকম হিংস্রতার কথাও এসেছে, আমি মূলত আমার খালার জীবনটাই উপন্যাসে ধরতে চেয়েছিলাম। খালা ভালবাসার মতোন মানুষ। বইটা যে পাঠকদের কাছে সমাদর পেয়েছে সেটাও হয়তো এজন্যই যে খালাকে সবার ভালো লেগেছে।


জেনীঃ আপনি বললেন যে গত দশ বছরে অনেক কিছুরই বদল হয়েছে। এ বদলে আপনার এবং আপনার মতোন অন্য আরো লেখকদের কী ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন?

মো-ইয়ানঃ চীনের এই সংশোধন বা সংস্কার কোনো হঠাৎ বদল না, আস্তে আস্তে সময় নিয়ে ঘটেছে ব্যপারটা। যে শক্তি এই বদলকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা আসছে জনসাধারণের কাছ থেকে। মানুষই বদল চেয়েছে। লেখক হিসাবে আমাদের কাজ হলো এই চাওয়াটারই প্রকাশ ঘটানো আমাদের কাজের মাধ্যমে।


জেনীঃ আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলেন প্লিজ। ফ্রগে কি এরকম কিছু করেছেন?

মো-ইয়ানঃ আমি সবসময় মনে করি একজন লেখকের কখনোই নিজেকে সাধারণের চেয়ে বড় মাপের মানুষ মনে করা ঠিক না। লেখকের হতে হবে জনসাধারণের মধ্যে একজন। তখনই আমরা নিজেকে প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের আশেপাশের মানুষের কামনা-বাসনাও প্রকাশ করতে পারবো। কারণ একজন লেখক সমাজের একজন সাধারণ সদস্য। লেখক মানেই কোনো আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক কেউ নন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয়, অনেক লেখকই হয়তো আমার সাথে একমত হবেন না।


জেনীঃ অন্য লেখকদের সাথে আপনার এই মত-পার্থক্যের কারণ কি? আলাদা বেড়ে ওঠা? শিক্ষার ধরন আলাদা ছিল বলে?


মো-ইয়ানঃ পঞ্চম শ্রেণী থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আর লেখাপড়া হয় নাই আমার। এরপর নানা রকম কাজ করেছি – কখনো রাখাল, কখনো চাষি, কখনো কারখানার শ্রমিক, তারপর একুশ বছর বয়সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম। সে সময় চীনে গ্রাম আর শহর ছিল দুই আলাদা পৃথিবীর মতোন। একজন গ্রামের ছেলে আর শহরের ছেলের ভাবনা-চিন্তা আলাদা, স্বপ্ন, আশা এইসবও আলাদা। গ্রামের ছেলেদের স্বপ্ন ছিল কবে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবে। কিন্তু তখন নিজের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে যাওয়া খুব সহজ ছিল না। স্থানান্তরের উপরে কড়া নজর রাখা হতো। শুধু দুই উপায়ে বের হওয়া যেত। হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য অথবা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে। কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি আঠারো বছর বয়স থেকে চেষ্টা করছিলাম সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে একুশ বছর বয়সে সফল হয়েছি। ভেবেছিলাম এইভাবে গ্রাম থেকে বের হতে পারবো, কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, আমাকে ওরা পাঠালো এক খামারবাড়িতে, সেখানে আমার কাজ ছিল চাষাবাদ!

সব মিলিয়ে আমার জীবনের প্রথম পঁচিশ বছর চাষাবাদেই কেটেছে। এত বছর দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামাঞ্চলে থাকার ফলে গ্রামের মানুষজনদের সাথে আমার যোগাযোগ খুব নিবিড়। চীনের সবচেয়ে গরীব মানুষগুলো কীভাবে চিন্তা করেন সেটাও আমি বুঝতে পারি। একজন শহরে বেড়ে ওঠা অথবা বুদ্ধিজীবী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া লেখকের চিন্তাভাবনা আমার চেয়ে আলাদা হবে বলেই মনে হয়।


জেনীঃ আরেকটা প্রশ্ন দিয়ে শেষ করবো। নতুন লেখকদের বিষয়ে আপনার কী মতামত? এখন অনেকেই শহরের জীবন-যাপন নিয়ে লিখছেন। একই শহরে নানা স্তরের মানুষের কথা উঠে আসছে তাঁদের লেখায়। এদের লেখার সাথে মিল খুঁজে পান নিজের?


মো-ইয়ানঃ আমি নতুন লেখকদের বরাবরই সাহায্য করার চেষ্টা করি। তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাও রয়েছে। ওরা আমার চেয়ে অনেক বেশি লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়ে। প্রকৃতি বা বিজ্ঞান বিষয়েও আমার চেয়ে অনেক বেশি ওরা জানেন। তবে গ্রামের মানুষের জীবন সম্পর্কে ওদের ধারণা সীমিত। ওদের লেখা তাই আমার লেখার চেয়ে অনেক আলাদা। অবশ্য তাদের তো আর আমি জোর করে বলতে পারি না যে ‘তোমাদের আমার মতো করে লিখতেই হবে!’


একটা বিষয় আমার সবসময় মনে হয়। দারিদ্র্য মানুষের মন সীমাবদ্ধ করে দেয় অনেক সময়, তার আত্মার বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে। আবার প্রবল ঐশ্বর্যও একই রকম প্রভাব ফেলে মনের উপর। তবে যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো ধরনের লেখাতেই যদি মানুষের মনের নানা স্তর, জটিলতা অথবা মোচড়ের ঠিকঠাক বর্ণনা পাওয়া যায়, তাকে আমি ভালো লেখা বলবো।

***
মো-ইয়ানকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাক্ষাৎকার শেষ করলেন জেনী। আমি ঘুরতে ঘুরতে মেলার ভেতরে বইয়ের দোকানে ঢুকে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর দেখি দোকানের বাইরে লেখকদের জন্য আলাদা করে রাখা টেবিলে বসে পাঠকদের বইয়ে নাম সই করছেন মো-ইয়ান। তাঁকে ঘিরে বড়সড় ভিড়। আমি খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। এখনো সেই একই রকম মৃদু মৃদু হাসছেন। আর দেখছেন চারপাশ। হঠাৎ আমার চোখে চোখ পড়তেই পরিচিত ভঙ্গিতে হাসলেন। উত্তরে আমিও হাসলাম, তারপর মিশে গেলাম ভিড়ের মধ্যে।

মেলবোর্ন
১২ অক্টোবর, ২০১২