'সাদা বিড়ালেরা' রাশিদা সুলতানার উপন্যাস
রা শি দা সু ল তা না, বুধবার, অক্টোবর ১৭, ২০১২


রাশিদা সুলতানার জন্ম ১৯৭৩ সালের ৩রা জানুয়ারি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বাবার কর্মসূত্রে আশৈশব তিনি বড় হন ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন মতিঝিল আইডিয়াল হাই স্কুল, ভিকারুন্নেসা নুন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ,এবং জাপানের কিয়োতোয় রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভিন্ন দৈনিক, সাময়িক, ও ছোটকাগজে তাঁর কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়ে আসছে বেশ ক’বছর যাবৎ। বর্তমানে কাজ করেন জাতিসঙ্ঘে। কর্মস্থল দার্ফুর, সুদান।



প্রকাশিত বই

অপণা মাঁসেঁ হরিণা বৈরী
আঁধি
জীবন যাপন দখিন হাওয়া
পরালালনীল
পাখসাট



.......................
সাদা বিড়ালেরা
.......................


১.
একটা ব্যালকনি আমাকে নিঃসঙ্গ করেছে।

নীচেই নিবিড় অরণ্যে-ছাওয়া সবুজ জলের পুকুর। তারপরই বিস্তৃত হ্রদ। দূরে সেতা শহরের খুদে ঘরবাড়ি। দিগন্তরেখায় সফেদ মেঘ, কুয়াশার মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে নীল পাহাড়। উজ্জ্বল, বর্ণিল, মৃন্ময় আঁধারে পুকুরপাড়ে বৃক্ষতলে ছোট-ছোট লাল, নীল, পীত, বেগুনি, নীল ফুল-লতাদির সমৃদ্ধি। রাতে পুকুরপাড়ের অরণ্যে ঝিঁঝির টানা শব্দ, রাতজাগা পাখির ডাক, দূরে ঝলমলে সেতা শহর, আরো দূরে পাহাড়ের চূড়ায় নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকা বিদ্যুৎ-বাতি, হুহু হাওয়া, পাতার মর্মর, সাঁঝের আকাশে ঝিরঝির-নাচা ফুলঝুড়ি পাখির দল, রোদে-জ্বলে-ওঠা পুঞ্জ শিশির, সব ভালো লাগে।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সংলগ্ন ‘এক্সেলশিয়র’ নামের দশতলা দালানটির চারশ-বারো নম্বর ফ্ল্যাটে যেদিন উঠি সেদিনই উইকএন্ড শুরু। একবার শুধু খাবার কেনার জন্য সাইকেলে কনভেনি শপে যাই। বাকিটা সময় ব্যালকনিতে ইজি চেয়ারে বসে কাটিয়ে দেই।

সেমিস্টারের প্রথম দিকে পড়ালেখার চাপ না-থাকায় বিছানায় শুয়ে, বারান্দায় বসে আলস্যে দিনরাত পার করি। সবচে ভালো লাগে আমার বাবা, মা, রোমেল, আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু সবার থেকে দূরে আমি। তাদের কারো জন্য কোনো কাতরতা আমার নাই। সাইকেল আর ব্যালকনি আমার জীবনে নতুন প্রাণ, নতুন উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে। সাইকেলে উড়ে বেড়াই সবুজ প্রান্তরে, ধানক্ষেতের ভিতর, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অথবা বিওয়া হ্রদের পাড়ে। বাতাস আমার হাতে, চুলে, চোখে, মুখে, ব্যাখ্যার অতীত বৈচিত্র্য নিয়ে স্পর্শ করে।

পড়ালেখা, গুগুল সার্চ, অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে কখনো সাইকেলের ডানায় উড়ে উড়ে নতুন শহর দেখি। অর্কিড আর অন্য নানা ফুলের বাহার, মাথাউঁচু বাঁশঝাড়ের মর্মরধ্বনি গ্যাসের মতো আমার শরীরে ঢুকে পড়ে। দিনে দিনে আমি হয়ে উঠি ভয়হীন, চাপহীন, পলকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে আমার বিয়ে হয়। তিনবছরের মাথায় জাপানে মাস্টার্স করার জন্য স্কলারশিপ পাই। সবসময়ই আমার মনে হতো স্বামী-সংসার, বাবা-মা, ভালবাসা-সন্দেহ, বিবাদ-বিসম্বাদ এসবের মধ্যে থাকতে হলে মানুষকে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। অথচ বরাবর আমি অসহিষ্ণু প্রকৃতির আর পলায়নপর। মনের মধ্যে কোথাও কোনোকিছু নিয়ে সামান্য খচখচানির জন্ম হলেও সেখান থেকে পালাই। যত দ্রুত সম্ভব।




২.
ব্যালকনির রাত্রি আমার বড় প্রিয়। পুকুরপাড়ে নানা অরণ্যলতার সমৃদ্ধিতে এমন নিবিড় বন হয়েছে এবং গাছেদের ছায়াতে রাতে এই অরণ্যে যখন নিকষ আঁধার, চাঁদ ও তারার সাথে প্রতিবিম্বিত সবুজ শাখা-পল্লব ঝিকমিক করে আর হ্রদের পানিতে ঝিলমিল চাঁদ ভাসে। গভীর নিস্তব্ধ রাত্রিতে বৃক্ষলতাপাতা-উৎসারিত ভেষজ গন্ধ এমন ঘন হয়ে ছড়ায়, মনে হয় ক্ষুদ্র এই অরণ্যের বৃক্ষলতাদি নিজেদের গন্ধেই নিঝুম মাতাল হয়ে আছে।

ব্যালকনিতে স্থবির বসে থাকা আমার কাছে জাদু। ক্লাস শেষে, লাইব্রেরিতে কোর্সের পড়াশোনা শেষ করে দিনরাতের বেশিরভাগ সময় ব্যালকনিতে বসে থাকি। ব্যালকনির ঠিক নীচেই সবুজ জলের পুকুরে অর্ধেক শরীর ভাসিয়ে রাখা একটা মরা গাছের ডালে অলস এক মাছরাঙা সারাদিন বসে ঝিমায়।

এখানে নতুন কিছুই নাই। একই অরণ্য, লতা, সফেদ মেঘ-মাথায় একই নীল পাহাড়, হ্রদের জলে ঘুমঘোরে ভেসে থাকা একই হাঁসের দল, তবু সব কাজ ফেলে অপরাহ্ণে ব্যালকনিতে নিত্য আমি বসবই। অধিগম্যতার বাইরের কোনো এক আকর্ষণ আমাকে ব্যালকনিতে আটকে রাখে। প্রায়াগতা যামিনীর অন্ধকারে একঠাঁই বসে থাকি। পৃথিবী যখন তার রং বদলায়, কত যে স্নিগ্ধতায়, মোহনীয়তায় ধীরে ধীরে আঁধার নেমে আসে, আমার তখন ঘোর লাগে।

অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে ডুবে যেতে যেতে বাবা-মা বা স্বামীকে ফোন করতে ভুলে যাই। বাঁশঝাড়ে পাতার খশখশ মৃদু ফিসফিসানির মতো, দূরাগত ধ্বনির রেশের মতো। আমি ভুলে গেলেও, বাবা-মা নিজেরাই ফোন করে। রোমেল তাও করে না। সকালে সে টেক্সট পাঠালে হয়তো বিকালে বা রাতে ঘুমানোর আগে তার উত্তর দেই। ছায়াঢাকা পুকুরে অথবা দূর পাহাড়চূড়ায় মেঘের আনাগোনায় তাকিয়ে থেকে অনন্তকাল পার করে দেই।

বাবা মা স্বামী পরিবার সবারই প্রতি এই উদাসীনতা, এই দুঃসাহস দেখানোর স্পর্ধা জাপানে আসবার পর কেমন করে হলো তাই ভাবি! বাংলাদেশে আমি ছিলাম আপাদমস্তক ভীতু একজন মানুষ। বাবা, মা, স্বামী, বন্ধু, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বলতে গেলে সবাইকে ভয় পেতাম। কারো সামনে সহজ হতে পারতাম না। ভাবতে ভালো লাগে, ধীরে ধীরে আমি আমার জীবনের মালিক হয়ে উঠেছি। নিজেকে হঠাৎ ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিমান মানুষ মনে হয়। আমি দ্রুত বদলে গেছি। এত দ্রুত যে, কেউ জানে না কোনোদিন আর আগের জীবনে ফিরে যেতে পারব কীনা।




৩.
রোমেলের সাথে দুই-তিন দিন পর-পর টেক্সট বিনিময় হয়।

আমার মোবাইলে যখন রোমেলের মেসেজ আসে, তার শব্দগুলোর ফাঁকে, ব্যক্তিত্বের ভারে ন্যূব্জ, গম্ভীর মুখখানায় শান্ত অহঙ্কারী চোখ দু’টো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যতেœ, বাছাইকৃত শব্দে-লেখা টেক্সট মেসেজ। একটা শব্দেও যেন সামান্য ভাবালুতা, সামান্য বাহুল্য প্রকাশিত না হয় সে দিকে কড়া নজর তার।

রোমেলের সাথে আমার এক অদ্ভুত আলগা দাম্পত্য চলতে থাকে। গোড়া থেকেই এমন। রোমেলকে সারাক্ষণই আমার একজন বিদেশি অতিথি মনে হতো। ওর যে বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তা তার বিশেষ ভালোমানুষি আচরণ। ক্রোধ-উত্তেজনা-নির্লিপ্ত সবকিছুতেই সমাহিত এই মানুষটি সারা বছর একই ধরনের আচরণ করে। কখনোই উচ্চস্বরে কথা বলে না, অল্প কথা বলে, গাম্ভীর্যে কখনোই খামতি পড়ে না। আমার সাথে কখনোই রাগ করে না, সবসময় নিদারুণ এক ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে রাখে চেহারায়। ল্যাপটপে যখন কাজ করে, এত গভীর মনোযোগে করে যে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করছে সে। তার এই সার্বক্ষণিক ব্যক্তিত্ব আমার মধ্যে সে জাগিয়ে রাখে।

আমার স্বামী গৌরবর্ণ, উন্নত নাক। ঈষৎ কোঁকড়া চুল। বিস্তৃত কপাল এবং চরম আত্মবিশ্বাসী দিঘল একজোড়া চোখ। তার সুদর্শন, চকচকে চেহারা আর উজ্জ্বল চোখজোড়ার সামনে দাঁড়ালেই আমি সব কথা হারিয়ে ফেলি। সবসময় মনে হয় এখুনি কোনো পরীক্ষা দিতে হবে। লোকটার প্রতি আমার সকল ভীতির উৎস তার উজ্জ্বল চোখজোড়া আর ঝকঝকে নিখুঁত টানটান স্মার্টনেস। ঐ চোখ আমার সকল অযোগ্যতা, অক্ষমতা যেন মুহূর্তে নগ্ন করে ফ্যালে। মনে হয় আমার হাত, পা, কথা, বাক্য কোনটা কখন কোথায় যাবে সব সে জানে। ওদিকে আমাকে ভোগাত আমার আত্মবিশ্বাসহীনতা আর কারো আমার প্রতি অপছন্দের, অপ্রিয় আচরণে মুখের ওপর জবাব দিতে পারার অক্ষমতা। আমি কারো কথার পিঠে কথা বলব কল্পনা করলেই মনে হয় তারপর নিশ্চয়ই প্রলয় কাণ্ড ঘটবে।

বিয়ের আগে আমার এক খালাত বোন আমার স্বামীর একটা ছবি দেয়। বইয়ের মাঝে লুকিয়ে ছবিটা দেখি। চৌকস, হাসিমুখ, ঝকঝকে এই মানুষটার ছবি দেখেই আমি নিজের ভিতর সেঁধিয়ে যাই। আমি নিশ্চিত ছিলাম আমাকে দেখে লোকটার পছন্দ হবে না এবং এই বিয়ে হবে না। কিন্তু বাবা-মায়ের অর্থবিত্ত, প্রতিষ্ঠা, সম্মান অথবা চাতুর্যের কারণে আমার সাথে রোমেলের বিয়েটা হয়েই যায়। বিয়ে ঠিক হবার পর ছবি দেখে কিছুদিন ঘোর লেগেছিল। বিয়ের পর সংসার, দাম্পত্যের নতুন রহস্যের গিঁট খুলে ওঠার আগেই আমি আবিষ্কার করি, আমার মা-বাবা-শিক্ষকদের মতোই রোমেলকেও আমি ভয় পাই। হয়তো অন্য আর সবার চেয়েও বেশি।

আমি আমার নিজেকে কখনো রোমেলের কাছে পুরোপুরি খুলে ধরি নাই। সেও কখনোই না। আমাদের এই উশখুশ দাম্পত্যের কথা মাকে বলেছি। বিপর্যয়শঙ্ক মা আমাকে বাবার বাড়িতেও এসে দু’টো দিনও থাকতে দেয় না। আমার আত্মীয়-স্বজনেরা আমার স্বামীর কত যে উচ্চপ্রশংসা করে মা তার ফিরিস্তি শোনায়। আমাকে বোঝায়, ‘তার পরিবার তো বহু পুরনো খান্দান, যে কারণে সে প্রগল্ভ নয়। বৈঠকি আচরণ তো তার খান্দানের লক্ষণ।’ আমি বলি, ‘মা, আমার মনে হয়, সে আমাকে করুণা করে।’ মা বলে, ‘সব তোর হীনম্মন্যতা, সারাজীবন চাকরবাকরদের সাথে মিশছিস। আজন্ম তুই আনকালচার্ড থাকলি। কুকুরের পেটে ঘি-ভাত সহ্য হয় না। খোদার দোহাই, অ্যাডজাস্ট করতে চেষ্টা কর। তোদের বনিবনা না হইলে আত্মীয়স্বজনের কাছে আমি শেষ হয়ে যাব। আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার পথ থাকবে না।’ এমন কৃতবিদ্য জামাতার সাথে মেয়ের ডিভোর্স-আশঙ্কায় মা পাথর-খোদাই চেহারায় চেয়ারে বসে থাকে। আমি ওখান থেকে আস্তে উবে যাই।

ডাইনিং টেবিলে আমার বাবা-মাকে রোমেল হাস্যচ্ছলে বলে, ‘ফাহিমা আপনাদের মেয়ে, কিন্তু তার চরিত্র একেবারে আপনাদের বিপরীত। আমার বন্ধু, আত্মীয়দের সামনে সে কথা বলে না। আবার এসব নিয়ে আমি কখনো কিছু বললে এত বেশি এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলে, অপ্রয়োজনে হাসে।’ কথা বলা শেষে রোমেল হো হো হেসে ওঠে। হাসলে রোমেলের বয়স প্রায় দশ বছর কমে যায় মনে হয়। বাবা-মা, রোমেল সবার দিকে আমি অপরাধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে কুঁকড়ে থাকি।

মায়ের উৎকণ্ঠায় রোমেলের সাথে কখনো জোর করে প্রগল্ভ হতে চেষ্টা করেছি। আর-দশটা মানুষের মতো, স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কে যেতেও চেষ্টা করেছি। মাঝেসাঝে কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলেছি, ‘তুমি খুব সুন্দর দেখতে, তোমার চোখগুলো খুব সুন্দর।’ আমার দিকে তাকিয়ে সে করুণার হাসি হাসে। আমার মনে হয় সে আমার মিথ্যা কথা বুঝে ফেলেছে। তারপরই সে ভীষণ গম্ভীর হয়ে যায়। যেন একমাত্র গাম্ভীর্যেই তার সত্তা ঠিকমতো প্রকাশিত হয়। আর বেশিরভাগ সময়ই আমার বোকা আচরণ বা উচ্ছ্বাসপূর্ণ কথার জবাবই দেয় না। এমনকী সৌজন্যমূলক হাসিও না।




৪.
আমার পাশে রোমেল, একপাশে চিবুকের নীচে একটা হাত রেখে ঘুমাচ্ছে। ছুটির দিনের ভাতঘুম। ঘুমালে তার ভাব-গাম্ভীর্য অন্তর্হিত হয়ে বোকা বোকা এক চেহারা ফুটে ওঠে। ঘুম ভাঙলেই আবার অন্য চেহারা। ছুটির দিনে সাধারণত আমরা যে যার মতো নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি। রোমেল একটা পুরো দিন আমার সাথে অথবা কারো সাথেই প্রগলভ বা সপ্রতিভ থাকার মানুষ নয়। বাক্য-বিনিময়ের চেয়ে আমাদের যোগাযোগ বেশি হয় নৈঃশব্দ্যে। এ-অন্যের নৈঃশব্দ্য আমরা অনুবাদ করতে পারি।

সকালে আমার রুমে শুয়ে মাধুকরী পড়ছি। রোমেল দৈনিক পত্রিকা, ল্যাপটপ সমেত অন্য ঘরে। সকালে আমি আর রোমেল যে যার মতো নাস্তা করে নিয়েছি। দুপুরে খাবার টেবিলে আমাদের মাঝে সেইদিনের প্রথম বাক্য-বিনিময় হয়। বিস্ময়বিস্ফারিত আমি দেখি সে বুয়াকে তার রান্নার প্রশংসা করছে। কালেভদ্রে রোমেলের মুখ থেকে কারো জন্য প্রশংসাবাক্য নিঃসৃত হয়। সামনাসামনি কখনোই কারো প্রশংসা করে না। আমি বলি, ‘হ্যাঁ, বুয়ার রান্না তো ভালো।’ সে বলে, ‘আজকের রান্না অসামান্য।’

আমি প্রমাদ গুনি। নিশ্চয়ই বিকাল পর্যন্তই। বিকালের মধ্যেই এই সপ্রতিভ চেহারা এই হাসিমুখ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং পরবর্তী কয়েকদিনের জন্য আবারো শক্ত মুখটা ফিরে আসবে। চার-পাঁচদিন যাবে তার এই সংবরণ, ভীতিকর বাক্সংযম। আবার হয়তো সহজ হয়ে উঠবে ঘণ্টা-কয়েকের জন্য।

খাওয়া শেষে বলে, ‘চলো ঘুমাই। বই পড়ে এখন আর কী করবা।’ বিছানায় গা এলানোর পাঁচ মিনিটের মাথায় সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। আমি তার ঘুমন্ত বোকা বোকা সহজ চেহারায় তাকাই। দেয়ালে ফ্রেমে-বাঁধা সাদাকালো ছবিটি দেখি। বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্য দিয়ে অপস্রিয়মান ট্রেন চলে যাচ্ছে, রোমেলে সংগ্রহের পুরনো ছবি। ছবির সাদা অংশটুকু শ্যাওলা-পড়া হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। জানালার বাইরে কাঠগোলাপ গাছ বাতাসে দুলে দুলে ছবিটিতে আলোছায়ার নানা রেখা তৈরি করছে।

বৃষ্টিভেজা উঠানের প্যাচপেচে কাদা পেরিয়ে বড় একটা চৌচালা টিনের ঘরে ঢুকি। আঁধার ঘরে স্ট্যান্ডসহ একটা খাট। পাশে কাঠের আলমারি। খাট, আলমারি দু’টোরই রঙ, বার্নিশ উঠে গেছে। হার্ডবোর্ডের পার্টিশনের দরজা পেরিয়ে ভিতরের ঘরে যাই। খুদে লকেটাকৃতির টিকলি আর নাকে নোলক পরিহিত বউ সাজে শ্যামলা এক তরুণী। আমাকে দেখে বলে, ‘বিশ্বাস করেন, এই বিয়েটা হোক আমি চাই না। যার সাথে বিয়ে হইতেছে সে স্থূল রুচির একটা মানুষ। আমি এই কথা বাবা-মা কাউকে বুঝাইতে পারি না,’ তরুণী ফুঁপিয়ে ওঠে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরি। জীবনে এই মেয়েটিকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সে আমার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদে। কিন্তু আশেপাশে কোথাও কোনো জনমানুষের চিহ্ন নাই।

মেয়েটিকে রেখে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। উঠানের কাদায় আমার পা ডুবে যায়। রান্নাঘরের পাশে চাপকল চেপে কাদা ধুই। পুকুরপাড়ে গাছে পাকা-আম ঝুলে আছে। সেখানে বড়মামা। বলেন, ‘দেখছিস, কত আম পাইকা আছে?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, আম খেতে মন চাইতেছে। পেড়ে দাও।’ ব্যালকনিতে ভোরের আলো ফোটেনি। সবদিকে ঝিঁঝিঁর ক্রন্দন।







৫.
শুরুতে জাপানে দেশি-বিদেশি প্রায় কারো সাথেই আমার বন্ধুত্ব হয় না। মাস ছয় পর থেকে মিয়ানমারের সান্দ্রা হয়ে ওঠে একমাত্র সুহৃদ। পার্টি, কারাওকে, বাংলাদেশিদের ঈদ পুনর্মিলনী, হুল্লোড়, আনুষ্ঠানিকতা, দেশি-বিদেশি কোনো বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ, কোনোকিছুতেই যাই না। এক বিকেলে সোনালি রোদের মৌতাত পিঠে মেখে সাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পথের দু’পাশে সারি সারি ফুলগাছে নানা রঙের আগুন ধরেছে। গোলচত্বরে ঝর্নার চারপাশে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীরা আড্ডা দিচ্ছে। সিগারেট ফুঁকছে। আইটির একজন পিএইডি ছাত্রীর সাথে চোখাচোখি হয়। আমাকে দেখে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের পাশ দিয়ে দু’বার চক্কর দেই, তাদের দিকে না তাকিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ এই শহরের এবং আশপাশের শহরের প্রবাসী বাঙালি কেউই আমার সাথে শুভেচ্ছা বা বাক্য বিনিময় করে না। আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করে, ফিসফিস করে, হাসে অথবা না-দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যায়।

শৈশব-কৈশোরের কোনো চাপল্যের কথা আমার মনে পড়ে না। যা-কিছু স্মৃতি আছে তা ভয়ের। কম বয়সে ভয় আমাকে কুয়াশার মতো জড়িয়ে রেখেছে। অহর্নিশ শঙ্কাসঙ্কুল থাকতাম, আজ, কাল, পরশু, সপ্তাহের যে কোনো দিন, যে কোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর কোনো বিপদ আসছে আমার জন্য। হয়তো বাবা-মা তুমুল ঝগড়া করবে, ঝগড়া করে একে অন্যকে খুনও করে ফেলতে পারে। বা আমাকে পিটাবে, নয় শিক্ষক, বা বন্ধু, সহপাঠী কেউ অপমান করবে অথবা এর চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে। বাবা-মা, দাদি, আমি সবাই আমরা মারা যাব কোনো কারণে।




৬.
সন্ধ্যায় আমি শাড়ি পরে, চুল বেঁধে রোমেলের জন্য অপেক্ষা করি। রোমেল আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কালো শাড়িটা বদলে ফ্যালো। তোমাকে অত ভালো লাগতেছে না। গত ঈদে তোমার মা ম্যাজেন্টা যে কাতান শাড়িটা দিল ওটা পরো।’ শাড়ি বদলে আমি দেখি রোমেল পুরোদস্তুর রেডি। আমার দিকে একবার তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ, এখন ঠিক আছে।’ গাড়িতে দু’জনের প্রায় কোনো কথাই হয় না।’ গাড়িতে পিছনের সিটে অচঞ্চল পিনপতন নিঃশব্দতায় আমরা বসে থাকি পুরো পথ। অবশ্য প্রায় সবসময়ই আমাদের যুগল যাত্রাপথ এমনই নিঃশব্দ থাকে।

বিয়েবাড়িতে ঢোকার পর একমুহূর্তও সে আমার পাশে দাঁড়ায়নি। ভিড়ের মধ্যে মুহূর্তেই রোমেল অপসৃত হয়ে যায়। আমি দোতলায় যাই। আমার ননাশ, নাম শম্পা, আমাকে কনের মঞ্চের কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে যায়। রোমেলের ভাগনি মারজুকার সাথে চোখাচোখি হলে সে আমাকে ঈশারায় তার পাশে বসতে বলে। আমি বসি। আমার মনে হতে থাকে চারপাশের মানুষ আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি উঠে দাঁড়াই। মঞ্চের পাশে এক কোনায় দাঁড়িয়ে থাকি। মারজুকা এবং তার বান্ধবীদের সাজসজ্জা দেখি। শম্পা আপা আমার সাথে তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের পরিচয় করিয়ে দেন। সবাই বিউটি পারলার থেকে সেজে, চুল বেঁধে এসেছে। শম্পা আপা মারজুকা প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘শ্বশুরবাড়িতে মেয়ে পাঠায়া তো আমি টিকতে পারব না।’ শম্পা আপার শ্বশরবাড়ির আত্মীয়রা নিজেদের মাঝে আলাপচারিতায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এক-দু’জন চেহারায় হাসিমুখ ঝুলিয়ে রাখে। আমি তাদের কাছ থেকে সরে যাই। শম্পা আপা আমাকে ডাকেন। তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে এক টেবিলে বসে খেতে বললে দাঁড়িয়ে আমি শুভেচ্ছা বিনিময় করে বলি, ‘নিচে রোমেলের সাথে কথা বলে আসি, খানিক পর বসব।’

নীচতলায় বরকে ঘিরে মানুষের ভিড়। কাছেই আত্মীয়-স্বজনের মাঝে আড্ডারত রোমেল। দুর্দান্ত প্রগল্ভ, আড্ডাবাজ এক মানুষ। পাশে তার দুলাভাই, খালাত ভাই আর দু’-তিন জন অপরিচিত মানুষ। এ আমার অচেনা এক রোমেল। আমি তাদেরকে না দেখার ভান করে বরের মঞ্চের সামনে কিছুসময় দাঁড়াই, তারপর উপরে চলে যাই। বিয়েতে আসা আমার অপরিচিত অতিথিদের সাথে বসে খেয়ে নেই। চেয়ারে বসে মানুষজনের আসা যাওয়া দেখি। কাজি এবং সাক্ষীরা কাবিনে মেয়ের স্বাক্ষর নিতে এলে রোমেলও তাদের সাথে আসে। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলে শম্পা আপা তাঁর খালাত বোনকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন।

মারজুকার বিয়ে হয়ে গেলে রোমেল চারিদিকে তাকিয়ে আমার দিকে দৃষ্টি পড়তেই বলে, ‘চলো বাসায় যাই।’ আমি বলি, ‘চলো।’ ‘এক মিনিট দাঁড়াও’ বলে সে তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসে। কাউকে কিছু না বলেই আমি রোমেলকে অনুসরণ করে নীচে নেমে যাই। গাড়িতে যথারীতি আমরা পাশাপাশি নীরব বসে থাকি। নীরবতা ভাঙতেই আমি কথা বলি, ‘ শম্পা আপা মেয়ে বিয়ে দিয়ে যেভাবে কাঁদতেছিল, তোমার বোন বলে মনেই হইতেছিল না। তোমার বোন এত ইমোশনাল, আমি ভাবতেই পারি না। তোমার সাথে যায়ই না।’
রোমেল বলে, ‘তুমি ঠিকমতো খাইছো? ওদের খাবারটা কিন্তু বেশ ভালো হইছে।’ রোমেল তার বোন প্রসঙ্গে কোনো কথা বলবে না। আমার মনে পড়ে রোমেল বাপ, মা, বোন কারো প্রসঙ্গে কোনো কথা আমার সাথে বলে না। একটা মন্তব্যও না। খুব চাপাচাপিতে হয়তো দায়সারা কোনো কথা বলবে।
আমি বলি, ‘হ্যাঁ খাবার ভালো ছিল।’ বাকিপথ আমরা দু’জন নিঃশব্দে বসে থাকি।

রোমেলের সাথে আমার কখনো বাকবিতণ্ডা হয় না। উচ্চস্বরে সে কথা বলতে জানে না। যে কোনো অপ্রিয় প্রসঙ্গে নীরব হয়ে যায়। তার নীরবতা ক্রমাগত তার ক্ষমতা তৈরি করে। সে নীরব একটা দানব হয়ে ওঠে।

পরিমিত উচ্ছ্বাস, আচরণওয়ালা স্বামীটি আমাতে উপগত হয় বিপুল আনন্দ নিয়ে। আমার শরীরে তার ভারি নেশা। মুখে কোনোকিছুই বলে না, কিন্তু তবু তার শরীরী অভিব্যক্তি, আনন্দ সে আড়াল করতেও পারে না। রাতে আমাকে ক্ষিপ্রহাতে বস্ত্রহীন করে ফেলে।

রাত্রির রেশ ধরে সকালে আমি কলকলিয়ে উঠি। ঘুম ভেঙে দেখি সে পোশাক পরে অফিসে বেরিয়ে যেতে উদ্যত। খাবার টেবিলে সঙ্গ দিতে হবে অথবা সে সকালে অফিস যাওয়ার আগে ঘুম ভেঙে উঠে বসে থাকতে হবে, এ-ধরনের কোনো আবদার তার নাই। আমি জিজ্ঞাসা করি, ‘নাস্তা করছো?’ সে মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ। করলাম।’ আমি আহ্লাদি সুরে বলি, ‘আজকে রাতে অফিসের পর মার বাসায় ডিনার করব। মা বলতেছিল অনেকদিন আমরা দু’জনে মিলে মার বাসায় যাই না।’ সে কোনো জবাব দেয় না। আমি আরও একবার জিজ্ঞেস করি, তখনো লাজবাব। আমি বুঝি, আবার মুড মারা, আবার রাসভারি ব্যক্তিত্ব সদর্পে ফিরে আসছে।

দুপুরে আমি টেক্সট মেসেজ পাঠাই: ‘মার বাসায় যাবা কি না জানাও।’ দু’ঘণ্টা পর আমাকে জবাব পাঠায়: ‘এখন ঠিক বলতে পারছি না। সন্ধ্যায় আমাকে ফোন করে জেনে নিয়ো।’ রোমেলকে আমি আর ফোন করি না। মায়ের বাসায় রাতের খাবার খেয়ে রাত দশটায় ঘরে ফিরে দেখি ল্যাপটপে সিনেমা দেখছে। আমার পানে এক পলক চেয়ে আবার সিনেমায় বুঁদ হয়ে যায়। বিছানায় ঘুমাতে গেলে গভীর মমতায় আমার শরীর স্পর্শ করে। সঙ্গমক্লান্ত শরীরে বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে নিয়ে কৌতুক শোনায়। সে এক ভিন্ন রোমেল।




৭.
মাথা থেকে পূর্বজীবনের স্মৃতি আগাছার মতো অক্লেশে উপড়ে ফেলি। স্মৃতি বলতে আমার আছে শুধুই ভয়ের আর সংকোচের স্মৃতি। আমি সবচেয়ে সহজ আর সপ্রতিভ ছিলাম আমার দাদি আর আমার বাড়ির কাজের বুয়া আমিরনের সাথে। আমিরন সারাদিন তার হারিয়ে যাওয়া দুই সন্তান হীরা আর মানিকের গল্প করত যারা তাদের গর্ভধারিণী মা আমিরনের চেয়ে সৎ-মায়ের সঙ্গে বেশি অন্তরঙ্গ এবং নিকটবর্তী। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় অভিমানে বাপের বাড়ি চলে এসেছিল। তার সতিন ওদিকে তার সন্তানদের এমন জাদুটোনা করেছে যে হীরা-মানিক সৎ-মা থেকে একদিন দূরে থাকতে পারে না। রাতে সৎ-মাকে ছাড়া তারা ঘুমাতেই পারে না। দূরে এসে নানির বাড়ি গর্ভধারিণী মায়ের কাছে আসে না। সারাদিনই আমিরন ‘হীরা-মানিক’ জপে জপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সবচেয়ে সহজ, স্বাভাবিক আর শঙ্কাহীন সম্পর্ক ছিল দাদির সঙ্গে। আশৈশব দাদির সাথে ঘুমাতাম একই বিছানায়। আমার পাশে শুয়ে সারারাত্রি নাক ডাকত দাদি, সমতালে টেনে টেনে। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে বিছানায় উঠে বসে নাক ডাকার সাথে সাথে দাদির শরীরের ওঠানামা দেখতাম। তাঁর ঘুম ভাঙাতে মন চাইত না। আমার উসখুসে দাদির ঘুম ভেঙে গেলে দুঃখ প্রকাশ করে এপাশ ওপাশ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে আবারো নাক ডাকত। দাদির মুখের পানে তাকিয়ে থাকতেই ভালো লাগত। রাতের পর রাত নির্ঘুম জেগে জেগে ক্রমে দাদির নাক ডাকার শব্দ সুরেলা ও ছন্দোময় মনে হতো। এমনকী সকালে ঘুম ভাঙার পরও মৃদু সুরেলা সঙ্গীতের মতো, দূরাগত ধ্বনির রেশের মতো মৃদুভাবে আমার মাথায় বাজত দাদির নাক ডাকার শব্দ। কখনো ফিসফিসানির মতো হালকা প্রায় স্পষ্টভাবে বাজত। বিশেষ করে মায়ের হম্বিতম্বি, হোমওয়ার্কের চোটে যখন অসহায় তখন দাদির নাক ডাকার শব্দ ধীরে ধীরে আমাকে পুরোদস্তুর আচ্ছন্ন করে ফেলত। বাকি সবকিছু আমার মাথা থেকে নাই হয়ে যেত।

মা যখন আমার পড়াশোনা বা আমার আনকালচার্ড আচরণ নিয়ে চেঁচায় আমার মাথায় কোনো শব্দই আর প্রবেশ করে না। শুধু মা না, যে কেউ উঁচু স্বরে, ধমকে আমার সঙ্গে কথা বললেই আমার ব্ল্যাক আউট হয়ে যায়। বিশেষ করে স্কুলে পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট খারাপ হলে মা রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ত। বাবা অফিস থেকে রাত দশটা-এগারোটার আগে ফিরত না। ছুটির দিনেও নিয়মিত অফিস করত। বাসায় থাকত খুব কম সময়। সংবৎসর আমার বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। আমি তখন ভয়ে কাঁপতাম। থরহরি কম্প। মনে হত এখনই হয়তো বাবা বা মা কেউ কাউকে খুন করে ফেলবে অথবা দু’জনেই একসাথে উত্তেজনায়, ক্রোধে মারা যাবে। আমাকে কাঁপতে দেখে দাদি তার ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে আমাকে নানা গল্প শোনাত। তখনো কোনো শব্দ আমার মাথায় ঢুকত না। দাদির নাক ডাকার শব্দ ঘুমপাড়ানি গানের মতো আমার মাথায় বেজে যেত আমি ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত।

আমার এসএসসি পরীক্ষার আগে যখন রাত জেগে পড়ালেখা করি, শণের নুড়ির মতো সাদা চুলে রুপালি জরির চিকন পাড়ের সাদা শাড়ি পরা দাদি খাটের কোনায় সফেদ ময়দার স্তূপের মতো বসে থাকে, আমার পাঠ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত, ঘুমকাতর চোখে, রোজ।

একদিন টেবিলের সামনে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে আমগাছের গাঢ় অন্ধকারে তাকিয়ে ক্লাসের ভালো ছাত্রীদের ভান-ভঙ্গিমার কথা ভাবছি, বিছানায় দৃষ্টি পড়তে দেখি দাদি নাই । যেন জানালার বাইরের নিকষ আঁধার মুহূর্তে ঘরে ঢুকে পড়েছে। যেন কেউ আমার শ্বাসরোধ করবে আর আমি মরে যাব। ‘দাদি!’ বলে চিৎকার ছেড়ে আমি রুম থেকে বের হই। দাদি ডাইনিংরুমের সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছে আর আমিরন বুয়া দাদির মাথায় তেল ঘষে দিচ্ছে। আমি দাদি আর আমিরন বুয়ার গা ঘেঁষে বসে টেলিভিশনে বাংলা ছায়াছবি দেখি। ভাবি, মা নিশ্চয়ই বাইরে কোথাও গেছে। তা না হলে দাদি আমিরন বুয়ার সাথে এত ঘনিষ্ঠতার সাহস পেত না। মা ছোটলোকদের সাথে মাখামাখি পছন্দ করেন না।

আরেকদিন মা অফিস থেকে ফিরে দ্যাখে আমিরন বুয়া দাদির খাটে বসে আছে, সামনে মোড়ায়-বসা দাদির মাথায় বিলি কেটে তেল দিয়ে দিচ্ছে। আমি বুয়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছি। মা অফিসে থাকলে কাজটা আমি প্রায়ই করি। মা এ দৃশ্য দেখে আমার আর বুয়ার সাথে পাগলের মতো চিৎকার করে। বলে, ‘তোর দাদিই তোকে আনকালচার্ড বানাইছে।’ দাদিকে বলে, ‘আমিরনের ময়লা ঘামের শাড়িতে আমার মেয়েটা মুখ ঘষতেছে, আপনার চোখে পড়ে না? আমিরন আপনার বিছানায় বসল কেমন কইরা? একটা চেয়ারে বসতে পারত।’ সবশেষে আমিরনকে বজ্রদৃষ্টি হেনে বলে, ‘এই, তুমি একটা চেয়ার বা মোড়া টেনে ব’সো। আমার বাসায় কোনোদিন কারো বিছানায় যেন তোমাকে বসতে না দেখি। আরেকদিন দেখলে সোজা বাসে তুলে কিশোরগঞ্জ পাঠায়ে দিব।

আমি, দাদি আর আমিরন বুয়ার এই মাখামাখি মায়ের দৃষ্টির আড়ালে চলতেই থাকে।

মৃত্যুর আগে তার চেহারা ফারাওদের মমির মতো হয়ে যায়। যেন কঙ্কালের উপর চামড়া বসানো আছে। মৃত্যুর আগে- আগে দাদি অন্ধ হয়ে গেছিল। তার স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছিল। মৃত্যুর আগেই তার সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি প্রায় সবাই তার দ্রুত মৃত্যু কামনা করে। সবার জন্য দাদি দুঃসহ বোঝা হয়ে ওঠে। চলচ্ছক্তিহীন দাদি খালি কাঁদে আর বলে, ‘আমারে লইয়া যাও তোমরা, আমারে আমার গ্রামে লইয়া যাও।’ শেষ সময়ে হাসপাতালে অর্থ এবং সময় অপচয় করার ইচ্ছা দাদির উত্তরাধিকারীদের কারো ছিল না। স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় দাদি মাকে তার মৃত ছোটবোন হাবিবা বলে ডাকে। বহুবছর আগে সন্তান বিয়োবার সময় হাবিবা মারা যায়। মাকে হাবিবা জ্ঞান করে দাদি তাঁর তারুণ্যে ফিরে যায়। মার গলা শুনলেই অফুরন্ত কথা বলতে শুরু করে। একদিন বলে, ‘দ্যাখ, নিজামের ঝিয়েরে কিন্তু আমার দাদা বিয়া দিছে। অথচ বড় ঘরে বিয়া হওয়ার অহংকারে আমাগোর বাড়িমুখী একবার হয় না। বিয়ার আগে এই নিজামের ঝিই আমার হাতের বাউটি চুরি কইরা লইয়া গেছিল। পরে চাইল-পড়া দিয়া আমার মায় এইগুলি বাইর কইরা আনছিল।’ মায়ের হাত মুঠায় নিয়ে দাদি গল্প করে যায়। মা হাত ছাড়িয়ে উঠতে গেলে, দাদি শিশুর মতো কাঁদে, ‘হাবিবা গো, তুই আমারে ফালায়া যাইস না, আমার ভয় লাগে, রাক্ষসের মতো এক দামড়া বেডা বঁটি নিয়া ওইখানে দাঁড়ায়া আছে।’ মৃত্যুর আগে দাদির চেহারা প্রায় পশুর মতো কদর্য হয়ে যাওয়ায় আমিও দাদির পাশে গিয়ে কখনো বসতাম না।




৮.
দাদির মৃত্যুর পর মা আমার নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে একটু নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করে। তার নিকটবর্তী হওয়ার মানে হলো স্কুলের পড়ালেখা কী হচ্ছে, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া যাবে কীনা, প্রতিযোগিতায় থাকব কীনা, কে কোন কোচিংয়ে যাচ্ছে, এ সমস্ত খবর নেওয়া। যেহেতু আমি এসব যথেষ্ট জানতাম না, মা আমাকে ‘ভূত’ ‘অপদার্থ’ ইত্যাদি নানা বকাঝকা করে নিজেই স্কুলে খোঁজ নিয়ে আমার শিক্ষক, কোচিং সব ঠিক করে দিত। তাছাড়া যথাসম্ভব চেষ্টা করত আমাকে বৈঠকি কেতা, সংস্কৃতি, প্রমিত ভাষা শেখাতে। মায়ের সাথে আমার পড়ালেখা বা যে কোনোকিছু নিয়ে কথা বলতে যাওয়ার আগেই আমি শঙ্কিত হয়ে পড়তাম মা কখন কোথায় কোন খুঁত বের করে সেই চিন্তায়। আমি ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়ার সময় মা একবার আমাকে আমিরন বুয়ার শরীরে মুখ ঘষতে দেখে হাইহিল জুতা দিয়ে খুব মারে। সে অফিসে চলে গেলে আমি বুয়ার গায়ে, শরীরে আমার মুখ ঘষি। বুয়ার শরীরের ঘামের গন্ধ আমার চরম প্রিয়।

মা আবিষ্কার করে আমি মানুষের সামনে সহজ হতে অক্ষম। সবসময় শিঁটিয়ে থাকি ভয়ে। এমনকী মায়ের সাথেও প্রয়োজনের বাইরে কথা বলি না। মা আমাকে বোঝায়, আত্মবিশ্বাস দিতে চেষ্টা করে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের বাড়িতে নিয়ে যায়। একদিন তার বান্ধবী ঝরনা আন্টিকে বলে, ‘আমার মেয়েটা সমাজে চলার অযোগ্য, স্কুলে বন্ধু নাই, কোথাও বন্ধু নাই। তবে স্কুলের পড়ালেখা নিয়মিত করে। অন্যের বাচ্চাদের সাথে খেলতে গেলেও সহজ হতে পারে না, অন্যদের খেলা দেখে, কিন্তু নিজে খেলে না।’

মা মানুষের কাছে আমাকে নিয়ে এ ধরনের কথা যত বেশি বলে, আমার ভীতি আরো বাড়ে বরং। বাড়তেই থাকে। আমি মাকে বলি না যে আমার সমবয়সীদের ভয় লাগে। সহপাঠী এবং শিক্ষকদেরও ভয় লাগে। মা-বাবার মতোই ভয় পাই সবাইকে। সর্বক্ষণ আমার মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে, এ নিয়ে লোকজন হাসাহাসি বা বকাঝকা করবে। মা-বাবা আমাকে হাসিখুশি চপল করে তুলতে অধীর। যেহেতু স্কুলের পড়ালেখায় আমি মনোযোগী, তারা আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করে যেন শিক্ষকদের সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করি। মা আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকদের সাথে আলাপ করে। মাকে খুশি করতে আমি জীববিদ্যা শিক্ষক সায়েমা ম্যাডামের সাথে সহজ হতে চেষ্টা করি, বলি, ‘ম্যাডাম, আমার মা গভর্মেন্ট অফিসার, বলেন ম্যাডাম, বায়োলজি ক্লাসে আমি সবচেয়ে বেশি বুঝি না?’ মা অথবা সায়েমা ম্যাডামের ভয়ে বা নার্ভাসনেসে কথাগুলি আমি স্বাভাবিকের চেয়ে এত বেশি উচ্চ স্বরে বলি যে দু’জনেই চমকে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মা হঠাৎ হো হো করে হাসতে শুরু করে যা মায়ের মেজাজের সাথে খাপ খায় না। মায়ের কণ্ঠার হাড় সামান্য উঁচু। মুখের হালকা মেছেতা ঢেকেছে ফেস পাউডারে। চর্বিহীন শরীরে মা রয়্যাল-ব্লু রাজশাহি সিল্ক শাড়ি পরেছে। কানে নীল পাথরের ঝোলানো কানের দুল। হিজাব পরিহিত পৃথুলা বায়োলজি আপা বিস্ময়ে আমাকে দেখছেন।

যে কোনো আত্মবিশ্বাসী, চকচকে, ঝকঝকে স্মার্ট মানুষের সামনেই আমি নার্ভাস বোধ করি। আশৈশব। আমার দিকে এমন মানুষজন কিছুসময় তাকিয়ে থাকলে মনে হয় মানুষটা আমার অভীপ্সা, অবদমন, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন সব জেনে ফেলেছে। আমার সব কথা আমার ভিতরে হারিয়ে যেতে থাকলে বোকার মতো দাঁত কেলিয়ে হাসি। কারণে-অকারণে আমার অস্বস্তি দূর করতে সব কথার উত্তরে হেসে হেসে মাথা নাড়াই। আমার পাশে-থাকা যে কোনো মানুষের চেয়ে আমি কম-মানুষ বা উপমানব হয়ে যাই। বাবা-মা জীবনভর বৈঠকি আচরণ শিখিয়েছে; অনুচ্চ স্বরে কথা বলা, সবার সামনে ঘর ফাটিয়ে না-হাসা, মেপে মেপে মানুষজনের সাথে চলা, ইত্যাদি। স্বামীও এসেছে বৈঠকের পালকিতে চড়ে, বাবা-মায়ের পছন্দ, তার সাথে যেটুকু সময় কেটেছে তাও কেটেছে আনুষ্ঠানিকতায়। একাকিত্বকে আমি কখনোই ভয় পাই নাই, বরং বাঘ, সিংহ বা পশুর মতো মানুষ ভয় পাই আমি।





৯.
আমার বিয়ের আগে একবার সংক্ষিপ্ত এক প্রেম হয়। এই একবারই। প্রথম এবং শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ক্লাসের অবসরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে বসে থাকি। বসে বসে তরুণ-তরুণীদের আসা-যাওয়া, আহ্লাদ, আড্ডা, ফ্যাশন দেখি। হয়তো রোজ আমাকে একা বসে থাকতে দেখেই শুভর আমাকে ভালো লাগে। দীর্ঘদেহী, টকটকে ফর্সা, পৃথিবীর সবচাইতে স্বপ্নালু চোখের তরুণ শুভ।

লাইব্রেরির সামনে একদিন আমার সামনে এসে হাসিমুখে নিজের পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়ে। আমার ঠিক এক ক্লাস উপরে। আমার সম্পর্কে জানতে চায়। তারপর সে বলে বেশ কিছুদিন ধরে সে আমাকে লক্ষ করছে। আমাকে দেখে তার মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচাইতে নিঃসঙ্গ একটা মেয়ে। এ জন্য সে আমার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করে। সেও নিঃসঙ্গ মানুষ, কিন্তু নিজেকে নিয়ে সুখী। পরিচয়ের এক সপ্তাহের মাথায় সে আমাকে প্রেম নিবেদন করে। অধীর উচ্ছ্বাসে আমি তৎক্ষণাৎ বলি, ‘পৃথিবীতে কেউ কোনোদিন আমার প্রেমে পড়তে পারে আমি ভাবি নাই। তাও তোমার মতো এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয় কেউ।’ উত্তেজনা লুকাবার কোনো উপায় আমার ছিল না।

তারপরের দিনগুলিতে শুভর সাথে আমি এত কথা বলি, এত কথা বলি, মাঝেমধ্যে মনে হয় গত একুশ বছরে সব মিলিয়েও এত কথা আমি বলি নাই। বাবা-মা, দাদি, আমিরন বুয়া, কার সাথে আমার কেমন সম্পর্ক, মা-বাবাকে, শিক্ষক, বন্ধু, পাড়ার ছেলেমেয়ে সবাইকে যে আমি কী পরিমাণ ভয় পাই, সব।

একবার আমার একবার টাইফয়েড জ্বর হয়, প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় এবং তখন প্রথম বাবা-মায়ের প্রতি আতঙ্ক, ভয় আমার খানিকটা যে কমে; কারণ দু’জনেই তখন অফিস ছুটি নিয়ে দিনরাত্রি আমার পাশে বসে থাকত। একদিন আমার জ্বর একশ’ চার ডিগ্রির উপর উঠে গেলে মা আমাকে ছেড়ে দিয়ে শিশুর মতো বিছানায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। বাবা বরফ মেশানো পানি আমার মাথায় ঢালে। আমিরন বুয়ার ছেলেমেয়ে হীরা আর মানিক তাদের সত্যিকার মাকে বাদ দিয়ে সৎমাকে বেশি ভালোবাসে— জীবনে শোনা, দেখা, আমার অভিজ্ঞতায় ঘটে যাওয়া এমন কোনো তথ্য নাই যা তাকে আমি বলি না। কী যে শান্তস্বরে সে কথা বলে! শুভকে দেখলেই, বা তার গলা শুনলেই আমার নিজেকে একশভাগ খুলে ধরতে ইচ্ছা করে। সে যেন অন্য কোনো মানুষ নয়। সে যেন আরেকটা আমিই। সেও গভীর মনোযোগে আমার সব গল্প শুনে যায়।

একদিন শুভ আমাকে বলে, সে আমার বন্ধু এখন থেকে, আর প্রেমিক নয়। শুভ চায় আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক। সন্ধ্যার পর গুলশান লেডিস ক্লাব পার্কে হাঁটি আর মনে মনে শতবার উচ্চারণ করি, শুভ আমার বন্ধু, আর আমার প্রেমিক না। বার বার উচ্চারণ করে নিজেকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করি। হাঁটার ট্র্যাকের অদূরে অন্ধকারে পাথুরে বেদিতে বসি। শুভকে টেক্সট মেসেজ পাঠাই, ‘বন্ধুত্ব শব্দটাকে ঘৃণা করি, প্রেম শব্দটাকে ঘৃণা করি। আমি আমার নিজেকে ঘৃণা করি, তোমাকে ঘৃণা করি। পৃথিবীর সবকিছু আমি ঘৃণা করি।’

তার কাছে থেকে আমি ত্বড়িতাহতের মতো ছিটকে যাই, তার ঝকমকে দেবদূত মূর্তিটাকে কালিমামলিন করে তুলি। শুভ পাল্টা অভিযোগ করে না কোনো, শুধু বলে, ‘তুমি পাগল।’




১০.
শুভর সাথে সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে এক-দুই দিন আমার তুমুল কলহ হয়। সে কোনো কাজে ব্যস্ত থাকায় ফোন ধরতে দেরি হলে, ইচ্ছা করে আমার ফোন না ধরলে বা ব্যস্ততার অজুহাতে ফোন রেখে দিলে, আমার টেক্সট-এর উত্তর দিতে দেরি হলে, আমার পায়ের তলা মাটিশূন্য হয়ে যায়। মনে হয় আর-কোনোদিন সে আমার সাথে যোগাযোগ করবে না। তীব্র আতঙ্কে আমি গালমন্দ করে শুভকে মেসেজ পাঠাই। শুভ রাগ করে না, হয়তো নীরব থাকে কিছুসময়। শেষমেষ আমি মেসেজ পাঠাই, ‘একটা কথার জবাব দাও। তুমি কি চাও আমি তোমার জীবন থেকে সরে যাই? তুমি চাইলে যে কোনো মূল্যে আমি সরে যাব।’ শুভ তৎক্ষণাৎ জবাব পাঠায়, ‘না, তা চাই না।’

তারপর আমি পুকুরের নিস্তরঙ্গ জলের মতো শান্ত। দু’-এক সপ্তাহে এক-দুইবার প্রায় নিয়ম করেই এমন উলটপালট হয় আমার। তুমুল কলহের পর যখন আমরা আবার কথা বলি, আমরা কথা বলি একেবারে স্বাভাবিক সুরে, যেন কেউ কাউকে কখনো কোনো বাজে কথা বলি নাই। আহত করি নাই। যেন অপ্রিয় কিছুই ঘটে নাই আমাদের মধ্যে। আমরা একে অন্যকে নিরীহ সব প্রশ্ন করি: পড়ালেখার কী অবস্থা; অ্যাসাইনমেন্ট টিউটোরিয়াল কেমন চলছে; ইত্যাদি।

আমরা যখন শান্ত, এক-দুই দিন দিনরাত্রি আমার হাওয়ায় শুভর শরীরের গন্ধ ফিরে আসে। আমার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষের গন্ধ। শুভকে যখন কাছে পাই, হাভাতের মতো, পশুর মতো তার গায়ের গন্ধ শুঁকি।

প্রায় বছর-দেড়েক পর এক সন্ধ্যায় আমার বাসার কাছে গুলশানে এক ক্যাফেতে শান্তস্বরে শুভ জানায় তার ক্লাসমেট জেরিনের সাথে তার প্রেম হয়ে গেছে। আমার কাছে বার বার ক্ষমা চায়। সে জানায় জেরিনকে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথমদিক থেকেই পছন্দ করত। এর আগে বহুবার তাকে প্রেম নিবেদন করেছে। এখন কিছুদিন ধরে জেরিনও তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ শুভ আবিষ্কার করে জেরিনকে সে ভালবাসে। আমার হাত দু’টি তার মুঠিতে নিয়ে ক্ষমা চাইতে গিয়ে তার দু’চোখ পানিতে ভরে ওঠে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করি না। হেসে বলি, ‘মিথ্যুক! ফান করো, না?’ শুভর গাল বেয়ে অশ্র“ধারা নেমে আসে।
আমি বলি ‘প্লিজ, মিথ্যা বলো, মিথ্যা বলো, সোনা। এই সত্য নেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই। প্লিজ বলো, জেরিন নামের কেউ নাই।’ শুভ কেঁদেই চলে।

এরপর আমি শুভকে আর কোনোদিন ফোন করি নাই। মেসেজও পাঠাই নাই। প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গুলশান পার্কে হাঁটতে যাই। প্রথম কিছুদিন সন্ধ্যার আঁধারে হাঁটি, আর আমার গাল বেয়ে চোখের পানি নেমে আসে। আসলে আমি হাঁটার নাম করে কাঁদতে যাই গুলশান পার্কের আঁধারে। ক্রমে অন্ধকারের নৈসর্গিক সঙ্গমে ডুবে যাই।

কিছুদিন পর আমার মা আমার সাথে পার্কে হাঁটতে আসেন। ততদিনে মায়ের প্রতি ভয় আমার অনেকটা কমে এসেছে। সান্ধ্য অন্ধকারে মা আর আমি একসাথে হাঁটি। শিগগিরই দ্রুত হেঁটে বা দৌড়ে মায়ের সাথে দূরত্ব তৈরি করে ফেলি। এর পর মা হাঁটে জগিং ট্র্যাকের এক প্রান্তে, আমি অপর প্রান্তে, কিংবা ক্লান্ত মা বেরিয়ে গেটের কাছে অন্ধকারে কোথাও বসে আমার জন্য অপেক্ষা করে।




১১
রাতে ঘরের বাতি নিভিয়ে ব্যালকনিতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়ি। পুকুরপাড়ের অরণ্যে রাতজাগা পাখির শব্দের মাঝে দূরে নক্ষত্রের টিমটিমে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে যাই। টানা বিশ দিন আমার ঘর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বের হইনি। সেমিস্টার শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ। বাইশ দিন আগে বাজার করেছি। দিব্যি চলে যাচ্ছে। ঘর থেকে বেরুতেও মন চায় না। সকালে ঘুম ভাঙে ব্যালকনি দিয়ে ভেসে-আসা ঝিঁঝিসঙ্গীতে।

বাংলাদেশে কোথাও ঝিঁঝিপোকাদের এমন দুনিয়াব্যাপী কান-মাথা-ঝিম-ধরানো শব্দ করতে শুনিনি। শুধু পুকুরের চারিপাশে গাছের নিবিড় ছায়ায় অন্ধকার। বাদবাকি সারা পৃথিবী রৌদ্রকরোজ্জ্বল। বিছানার আলস্য ছেড়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই চুম্বকের মতো আটকে যাই। শরীর, আত্মা, মন সব খুলে দিয়ে নিজেকে এলিয়ে দেই। পুকুরপাড়ে অরণ্যের বাতাসে বাঁশঝাড়ে মর্মর বাজে। দিনের পর দিন ব্যালকনিতে বসে থাকতে থাকতে এই মর্র্মরধ্বনি আমার মাথায় স্থায়ী হয়ে যায়। ট্রেনে, বাসে চলতে গেলে, অথবা একাকী কোনো সময়ে, এমনকী বাস বা ট্রেন-স্টেশনে অপেক্ষমাণ অবস্থায়ও আমার মাথায় অনুরনণ তোলে ঐ বাঁশঝাড়, দাদির নাক-ডাকার মতো।

ঠিক দুপুরবেলায় আকাশের মেঘ সাঁতরে একদল সাদা বিড়াল নেমে আসে। ছোট বড় নানা আকৃতির। দু’একটা বিড়াল এত বিশাল, মনে হয় তুষার-ভালুক। হামাগুড়ি দেয়ার ভঙ্গিতে আকাশে ভাসতে ভাসতে নামে। ব্যালকনিতে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। পুকুরপাড়ে বৃক্ষশাখে নিঃশব্দে হাঁটে। হ্রদের উপর, শূন্যে ভাসে দল বেঁধে, প্লেন থেকে দেখা মেঘের চাঁইয়ের মতো।






১২
দরজার সামনে আনতমস্তকে এমনভাবে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে যেন সে আমার বাসার কলিংবেল টিপে নাই অথবা ভুল করে দাঁড়িয়েছে। আমার মুখের দিকে একবারও না তাকিয়ে সে দুইবার মাথা নুইয়ে শুভসন্ধ্যা বলে। একবার চোখ তুলে সরাসরি তাকায়— তারপরই ত্রস্ত চোখ নামিয়ে ফেলে। বলে, ‘আমি রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। দুই বছর তোমার এই ফ্ল্যাটে থেকেছি। এ ফ্ল্যাটটা আবার আমি দেখতে চাই। যদি তুমি কিছু মনে না করো, কিছুসময় তোমার ব্যালকনিতে বসতে চাইব— মাত্র কিছুসময়।’ বলেই আবার অপরাধীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি হ্যাঁ বলতেই সে মাথা নীচু করেই আমার রান্নাঘর, বেডরুম পেরিয়ে সোজা আমার ব্যালকনিতে চলে যায়, কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না-করে। তাকে অনুসরণ করে আমিও ব্যালকনিতে তার পাশে দাঁড়াই। শেষ বিকালে কোজুর মুখের রঙ, দেয়াল, ব্যালকনি, পুকুরপাড়ের গাছগাছালি— সব ঝলমলে সোনালি রঙ ধরে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে জাপানি এই তরুণটির আড়ষ্টতা, লাজুকভাব কেটে গেছে। ঋজু, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে থাকে দূরে পাহাড়ে, হ্রদে, দিগন্তরেখায়। একবার আমার দিকে অভিব্যক্তিহীন তাকায় কয়েক মুহূর্ত। কবরের নিস্তব্ধতা আর শীতলতা পাথরের মতো জমাট বেঁধে আছে তার দু’চোখে। সে চোখ ফেরায় ব্যালকনির নীচে পুকুরের সবুজ পানিতে। কোজুর সাথে দৃষ্টিবিনিময়ের পর আমি ব্যালকনি ছেড়ে রুমে ঢুকে যাই।

প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট পর কোজু ব্যালকনি থেকে ঘরে ঢোকে। আমার দিকে ফিরে দুইবার মাথা নুইয়ে আরিগাতো গোজাইমাসু (ধন্যবাদ) বলে হনহন হেঁটে যায় দরজা পর্যন্ত। দরজা খুলে একবারও পিছে না তাকিয়ে চলে যায়। আমি তাকে কী কী জিজ্ঞাসা করতে পারতাম তা বুঝে ওঠার আগেই তার পায়ের শব্দ করিডোরে মিলিয়ে যায়।

পানির প্রবল তোড়ে বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। হুড়মুড় পানি ঢুকে মাঠ, ঘাট, ঘরবাড়ি সব ডুবে যাচ্ছে। ভয়ার্ত মানুষের দিগি¦দিক ছুটাছুটি। কেউ কেউ বাঁধের উপর বালির বস্তা ফেলছে। আমি তোড়ে ভেসে যাচ্ছি। নদীতে ডুবছি ভাসছি। দূরে সারি সারি নৌকা বাঁধা। মা ওদিকে বিছানায় বসে কাঁদছে। আমি বসে আছি কালো কাঠের বাউন্ডারি দেয়ালে ঘেরা একটা ফার্ম হাউজের মাঠে। সামনে পুরনো কাঠের বাড়ি আর সবজি বাগান।

আমি শুভর অপেক্ষায়। ও আমাকে এখানেই থাকতে বলেছিল। সামনের কাঠের ঘরটিতে আগুন ধরেছে, ফটফট কাঠ ফাটছে। শুভ এখানে আসবে বলেছে। চারপাশের বাউন্ডারি দেয়ালেও আগুন ধরে গেছে। আমি শান্তভাবে চারিদিকে আগুনের ছড়িয়ে পড়া দেখি...





১৩

জাপান জীবনে একজনই আমার আপনজন, সান্দার, সবাই তাকে সান্দ্রা বলে ডাকত। মিয়ানমারের মেয়ে। এক্সেলশিয়রে একই ফ্লোরে থাকি, ইমারজেন্সি-এক্সিট সংলগ্ন রুমটি তার। আয় তবে সহচরী হাতে হাত ধরি ধরি টাইপের বন্ধুত্ব না। সারাদিন কোনো মাখামাখির চিহ্ন নাই, এমনকী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা হলেও স্বল্প-চেনা মানুষের মতো হাত নাড়া, শুভেচ্ছা বিনিময়ের বেশি যোগাযোগ হয় না। তার সাথে আমার যোগাযোগ হয় রাতের মধ্যযামের পর। স্বভাবে দুইজন দুই মেরুর বাসিন্দা। সারাদিন হুল্লোড়, পার্টি, রান্না, মেসেঞ্জার, স্কাইপ সবকিছু শেষ করে রাত একটা-দেড়টার দিকে সান্দ্রা আমার ঘরে আসে। এক অদ্ভুত বশ্যতা ছিল আমার তার প্রতি। রাতের বেলা যে-কোনো সময় আমাকে ডাকলে ঘুম ভেঙে আমি দরজা খুলে বেরিয়ে যাই। আমাদের ইমারজেন্সি-এক্সিটের নয়-দশ তলায় সিঁড়িতে বসে থাকি। সান্দ্রা গিটারে সুর তোলে, আমি সিঁড়ির রেলিং-এ মাথা রেখে ঝিমুতে ঝিমুতে গান শুনি আকাশ ভরা তারার নীচে কিংবা জ্যোৎস্নায় ভেসে যেতে যেতে। কোনো-কোনোদিন মদ্যপান করি ভোর পর্যন্ত। কোনোদিন দেখি হ্রদের জলে কমলা চাঁদ অস্ত যাচ্ছে। পুরো হ্রদ রক্তিম আভায় চিকচিকে। উদাত্ত সঙ্গীত অথবা মদ্যপ সান্দ্রার হাসির অনিরুদ্ধ ছটায় রাতগুলি ঝিকমিকিয়ে ওঠে। আমরা আমাদের বাবা, মা, স্বামী, শৈশব, সম্পর্ক, বন্ধু এসব নিয়ে কখনো আলোচনা করি না। কেউ কাউকে কোনো প্রশ্ন করি না।

সান্দ্রাকে দেখে সবাই জড়িয়ে ধরে। কেউ কেউ আলতো চুমু খায়। আমাকে এক-দু’জন হাই বলে। সান্দ্রা একটা প্লেটে খাবার এবং গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে আমার জন্য নিয়ে আসে। লাওসের বান্ধবী লাভিনিয়া তার মাতাল যৌন আবেদনময়ী ঢুলু ঢুলু চোখে আমাকে হাই বলে। রাশান তরুণ সাশার সাথে হাসিতে ভেঙে পড়ছে সে। কাজাখস্তানের শারাফ, আমাদের পরের ব্যাচের অর্থনীতির ছাত্রী ফিলিপিনের ওয়াইলিসের সাথে উদ্দাম নৃত্যরত। কী নিখুঁত ছন্দোবিভঙ্গে তারা নাচছে, যেন দু’টি মানুষ একক সত্তা হয়ে গেছে। শারাফকে নাচতে দেখে তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। গতকাল ভার্সিটি থেকে সাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় শারাফ আর তার স্ত্রীর সাথে দেখা হয়। আটমাসের পোয়াতি স্ত্রী কায়ক্লেশে শারাফের পাশে হেঁটে যায়। স্বামী-স্ত্রী যতটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছিল মাঝে দুইজন লোক অনায়াসে আসা যাওয়া করতে পারে। দু’গ্লাস ওয়াইনে আমার সবকিছু ভালো লাগতে শুরু করে।

আমি আর সান্দ্রা সামান্য কথায় হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি বা দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে অকারণে হাসি। অন্য প্রায় সবাইকে সঙ্গীতের তালে তালে নাচতে দেখে আমি আর স্রান্দা নাচি হালকা দুলে দুলে। তারপর আমরা আরো দ্রুত গতিতে নাচি। একসময় আমরা দু’জন কেনেথ-এর মেঝেতে-পাতা ম্যাট্রেসের উপর লাফাতে শুরু করি। ভিয়েতনামি এক তরুণ আমাদের সাথে যোগ দেয়। সেও আমাদের মতো লাফায়। সে আমার কোমরে ধরে আমার সাথে আলাদা করে নাচতে আগ্রহ দেখায়। আমি তার হাত ছাড়িয়ে সান্দ্রার দিকে এগিয়ে যাই। ভিয়েতনামি তরুণটি ফিলিপিনো সেরেন-এর দিকে এগিয়ে যায়। সেরেন খানিক পূর্বে পার্টিতে ঢুকেছে। আমি আর সান্দ্রা দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে পুনরায় হাসিতে ভেঙে পড়ি। যেন আমরা এই রাত্রির জন্যই সারাজীবনের সব হাসি জমিয়ে রেখেছিলাম।

সান্দ্রার কাছে এসে কানে কানে ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলে বলিভিয়ার তরুণ হোসে। সান্দ্রাও তার শরীরে লেপ্টে গিয়ে মুখের কাছে মুখ নিয়ে কিছু একটা বলে, তারপর দু’হাতে তার নিজের জন্য এবং আমার জন্য দু’গ্লাস ওয়াইন নিয়ে ফিরে আসে। চতুর্থ গ্লাস পেটে পড়তেই পুরো ঘরে ভাসতে-থাকা সঙ্গীতের প্রতিটা বিট, প্রতিটা ছন্দ, সুর আমার মাথায় খুলে খুলে উড়ে বেড়ায়। অর্ধেক গ্লাস শেষ হতেই সান্দ্রার হাত ধরে বলি, ‘চলো, আমরা নাচি আবার।’ সান্দ্রা হাসে। আমি ওয়াইনের গ্লাস রেখে দু’হাত শূন্যে ছুঁড়ে ম্যাট্রেসের উপর আবার লাফাই। সান্দ্রা মাতাল ঢুলু ঢুলু চোখে আমাকে দ্যাখে আর হাসে। খানিক পর গ্লাস রেখে সেও আমার সাথে যোগ দেয়। নেচে ক্লান্ত হয়ে এলে সান্দ্রাকে বলি, ‘ঘরে যাব। ঘুমাব এখন।’ রুমের ভিতর দিগি^দিক জ্ঞান হারিয়ে নাচছে সবাই তখন। সান্দ্রা আমাকে রুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে, ঘাড়ে-গালে চুমু খেয়ে আবার পার্টিতে ফিরে যায়।

আমার ঘরের ঠিক বিপরীতে নেপালি এক পিএইডি ছাত্র থাকে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের বেশি যোগাযোগ নাই। ভার্সিটি, লিফট, করিডোর, কোথাও দেখা হলে জুলজুল তাকিয়ে থাকে সে। এক রাতে আমাকে টেক্সট পাঠায়, ‘আমার দরজা খোলা আছে। চলে এসো।’ তার চাহনি মনে পড়ে। দক্ষিণ এশিয় হিসাবে তার ধারণা তারই সর্বাগ্রে অধিকার আমার সাথে শুতে যাবার।

সান্দ্রার ঘরে চুল কাটতে যাই আমি। এপ্রন-পরা, চুল কাটার কাঁচি-হাতে দরজা খুলে দেয়। মঙ্গোলিয়ার সেলেদার চুল কাটছে সে। তাকে সাহায্য করছে ভিয়েতনামের মেয়ে ত্রান লুই হ্যাং। আমাকে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম বের করে নিতে বলে। বলে, ‘একটু অপেক্ষা করো। ওরটা শেষ করে নেই।’

সান্দ্রার ঘরে মানুষের হুল্লোড় লেগেই থাকে। মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, এসব গরিব দেশের ছাত্রীরা তার বাড়িতে চুল কাটতে যায়। নিজের ঘর নোংরা করে, বিনা পয়সায় হাসিমুখে সান্দ্রা এই কাজটি করে থাকে। এদিকে বিদেশি ছাত্রীরা বিউটি সেলুনে ত্রিশ চল্লিশ ডলার খরচার হাত থেকে বেঁচে যায়।

এক রাতে ঘোরানো উন্মুক্ত সিঁড়িতে গান গেয়ে, মদ্যপান করে, তারপর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এমন আমরা প্রায়শই করি। শুনশান আলোআঁধারি পথে আমরা সাইকেল চালাই। সান্দ্রাও কখনো গান গায়, শিস বাজায়। চাঁদের আলোর নিষ্কোষিত তরবারির রজতঝলকে-ঝলসে যাওয়া ধানখেতের পাশে আমি আর সান্দ্রা সাইকেলে পাশাপাশি চলি। গায়ে ঠাণ্ডা হাওয়া লাগে। ধানখেতে সাইকেল-আরোহী আমাদের ছায়া নেচে নেচে যায়। শৈশবের, দাদির হাতে-মাখা জামবাকের গন্ধ হঠাৎ আমার নাকে লাগে। পরমুহূর্তেই গন্ধটি হাওয়ায় মিলিয়ে যায় শিস বাজাতে বাজাতে। আমার থেকে সামান্য অগ্রসর সান্দ্রা চাঁদের আলোর ঘোরলাগা বিভ্রমে পথের ডানে মোড় না নিয়ে সোজা পাশে সরু নালায় পড়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে আমিও ধানখেতের পাশে নালায় স-সাইকেল হুড়মুড় করে পড়ি।




১৪

উইকএন্ডের দুই দিনই পুকুরপাড়ের অরণ্যে গাছের ছায়ায় বসে থাকে লোকটি। আমার ব্যালকনি থেকে গাছের গুঁড়ির আড়ালে দেখা যায় নাতিপ্রৌঢ় একটা মানুষের অবয়ব। বয়স হয়তো পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। পুকুরে ছিপ ফেলে মেপল গাছের আড়ালে সে বসে থাকে। তার মাছ ধরার সরঞ্জামাদি সমেত এমন স্থির দৃষ্টিতে পুকুরের পানিতে তাকিয়ে থাকে, যে মনে হয় লোকটা যেন গাছের গুঁড়ির পাশে মাটিতেই গজিয়েছে। যেন এই বাঁশঝাড়, মেপলগাছ, গাছ-আলু লতা, ফার্ন আর পাইনের অরণ্যের অংশ সে। নিয়ম করে শনি-রবিবার লোকটা আসে, ঘুম ভেঙে আমি ব্যালকনিতে গেলেই তাকে দেখি এক দৃষ্টিতে ফাৎনার দিকে তাকিয়ে আছে।

শুধু যেদিন সারাদিন ঝুরঝুর বরফ পড়ে, নীল পাহাড়ের চূড়া-শহর বরফের টুপিতে আচ্ছাদিত, লোকটা আসে না; জুতা-মোজা, শীতবস্ত্র, মাফলার পেঁচিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বরফের সৌন্দর্যে আমি আকণ্ঠ বুঁদ হয়ে থাকি। শীতে আমি টানা সাতাশ দিন আমার ঘরে কাটিয়ে দেই, বেশিরভাগ সময় ব্যালকনিতেই। তখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ক্রিসমাস হলিডে। সাইকেল নিয়েও একবারের জন্য বের হইনি, মাঝেমধ্যে বই পড়ছি। গাব্রিয়েল গার্থিয়া মার্কেস-এর ‘অব লাভ অ্যান্ড আদার ডিমনজ’ বইটা পড়ছি। বাকিসময় ব্যালকনিতে।

কোনো কোনো সন্ধ্যায় রান্না করতে মন চায়। পরোটা, কোরমা, টুনা কাবাব, সরিষা ইলিশ, টমইয়াম স্যুপ, পোলাও, মুড়োঘণ্ট; আমার যাবতীয় পছন্দের খাবার একই দিনে রান্না করে ফেলি। তারপর প্রায় জন্ম-উপাসির মতো খাই। আবার বহুবার এমন হয় টানা তিন-চারদিন কাটিয়ে দেই তিন বেলা সিরিয়াল খেয়ে। রান্না করতে বেদম আলস্য। প্রায়-প্রতিদিনই কারো সাথে বাক্যলাপ হয় না, এমনকী টেলিফোনেও না। প্রায় প্রতিদিনই ভালো বোধ করি। অন্যরকম লাগে।




১৫
গত দুইদিন টানা বরফ পড়ছে। পথ, ঘাট, বাড়িঘর, বরফের পুরু স্তরে আচ্ছাদিত। সন্ধ্যায় রাস্তায় উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটতে নামি। মাথার ওপর ঝুরঝুর বরফ পড়ছে। এক বৃদ্ধার মুখে ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়েছে। পসারি দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছে। ক্লান্ত, বেদনাক্লিষ্ট। বৃদ্ধা প্রায় পিঁপড়ার গতিতে হাঁটছে। আমার কী মনে হয়, আমি বৃদ্ধাকে অনুসরণ করি, যদিও পিঁপড়ার গতিতে হেঁটে বৃদ্ধাকে অনুসরণ করা আমার জন্য সহজ ছিল না। প্লাস্টিকের ব্যাগের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে ব্যাগটাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সামান্য এই সদাইপাতির ব্যাগটাকে বইবার ক্ষমতা তার নাই। হয়তো আলু, টমেটো, মুরগির একটুখানি বুক। বৃদ্ধা জানে শীতেই সে মারা যাবে। হতে পারে এই শীতেই। হতে পারে এই তার শেষ কেনাকাটা।

বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা কী গভীর মনোযোগে বাজারসদাই করে। সবজি, আলু, মুরগি, দুধ, ব্রেড-রোল কিনে, তাদের সমস্ত মনোযোগ, প্রায় সবগুলো ইন্দ্রিয় দিয়ে স্পর্শ করে। তাদের নিঃসঙ্গ জীবনে একমাত্র সঙ্গী এই জিনিসগুলোই। বৃদ্ধা দড়ার মতো আঙুলে বাজারের থলের দড়িটি শক্ত হাতে ধরে রাখে। সে জানে বাড়ি পৌঁছানোর আগেই বরফে জমে সে মরে যেতে পারে। সে জানে তার সন্তানেরা হয়তো মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে এই শীতেই সে মারা যেতে পারে।




১৬

বছরের নানা সময় টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে বার বার টাইফুনের সতর্ক সংকেত জানায়। এক টাইফুনের দিন ঘুমের পোশাক পরেই ঘুমকাতুরে চোখে সান্দার সকালে এসে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ ক্লাস হবে না। টাইফুনের পুরোসময় আমি ব্যালকনিতে বসে কাটাই। বাতাসের উন্মত্ততায় আমার রক্তে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ বয়ে যায়। প্রবল বেগে ছুটে আসা এই বাতাসে গাছলতাপাতা যেমন আন্দোলিত হয় আমারও শরীর উদ্দাম হয়ে ওঠে এই বাতাসে। আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে একটা সচকিত উদ্যম, একটা উৎসবের আয়োজন পড়ে যায়। একটা উদ্ভাসিত উষ্ণতা আমাকে জড়িয়ে ধরে। হাওয়ার হুঙ্কার দীর্ঘ-হ্রস্ব ঢেউ তুলে পাহাড়ের ওপারে মিলিয়ে যায়।

এই গতি, এই শক্তি, বাতাসের শো-শো শব্দ, এই তীব্রতা, তাণ্ডবের মোহনীয় রূপ, আমাকে জাদুর মতো ব্যালকনিতে আটকে রাখে। আমার যেন হ্যালুসিনেশন হয়, মনে হয় বাতাসে ভাসছি আমি। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে চলে যাচ্ছি। প্রতিটা টাইফুনে ব্যালকনিতে সমাচ্ছন্ন বসে থেকেছি আমি। টাইফুনের পর বাত্যাবর্ষাবিধৌত ব্যালকনিতে বসে মুগ্ধতায় চোখ, নাক, মুখ, মন, আত্মা সব খুলে দিয়ে বসে থাকি।



১৭

নেভি-ব্লু টি-শার্ট আর অফ-হোয়াইট প্যান্ট পরা তরুণ দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলে, ‘কিছুদিন আগে এসেছিলাম। আমি কোজু। আগে এই ফ্ল্যাটে থাকতাম। যদি কিছু মনে না করো, তোমার ব্যালকনিতে কিছুসময় কাটাতে চাই।’ আমি হেসে তাকে রুমের ভিতর ডাকলে সে মাথা নুইয়ে দু’বার ধন্যবাদ জানায়। আমার পাশ কাটিয়ে ঘরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। তাকে অনুসরণ করে আমিও ব্যালকনিতে যাই। হ্রদে মৃদু ঢেউয়ে নীল মাথাঅলা হাঁসেরা ঘুমঘোরে ভাসছে।

কোজুর চোখেমুখে ফুটে ওঠে অনাবিল আনন্দের আভা। আমার দিকে তাকিয়ে সহজ ভঙ্গিতে হাসে। আমি বলি, ‘তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছ।’ লাজুক ভঙ্গি ফিরে আসে। আবার পুকুরের পানিতে চোখ রেখে বলে, ‘এ জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। পৃথিবীর সবচাইতে প্রিয়।’ আমি বলি, ‘আমারও ঠিক তাই। দিনরাতের বেশিরভাগ সময় আমি এখানেই বসে থাকি।’ আমার কাছে প্রশ্রয় পেয়ে সে প্রগল্ভ হয়ে ওঠে, বলে, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিনের পর দিন এই ব্যালকনিতে কাটিয়ে দিতাম। আমি ভয়ঙ্করভাবে এই ব্যালকনি মিস করি।’ বলতে বলতে দু’চোখ পানিতে ভরে ওঠে তার। এমনভাবে বলে যেন হারানো প্রেমিকা সম্পর্কে বলছে।

‘ব্যালকনিতে সময় কাটানোর সময় আমার প্রেমিকা, বাবা-মা, বন্ধু কেউ ফোন করলে কেটে দিতাম। আমাকে বাইরে যেতে বললে যেতাম না, নিজের সঙ্গে নিজের সংযোগের এই অনুভূতির তুলনা হয় না। এখন আমার কেউ নাই। প্রেমিকা ছেড়ে গেছে, বাবা-মা কালেভদ্রে ফোন করে, বন্ধুরা কেউই আর যোগাযোগ করে না। আমি যে কী চাই এই শহরে থেকে যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হতে চেষ্টা করি যেন এখানে থাকতে পারি। কিন্তু আমার রেজাল্ট ভালো ছিল না বলে পিএইচডিতে ভর্তি হতে পারি নাই। আমার বাবা আমার মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখে শিনজুকুতে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে আমাকে এই শহর থেকে নিয়ে যান, শিনজুকুতে আমার ব্যালকনির সামনে উঁচু উঁচু দালান। অফিস থেকে ফিরে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেই। পার্টি, কারাওকে, বন্ধু-বান্ধব কোনোকিছুই টানে না। বারে বারে এই ব্যালকনিতে আমার মন, আত্মা একেবারে ছুটে যায়।’

কোজুকে ব্যালকনিতে একা রেখে ঘরে চলে আসি। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে চোখ মেলতেই দেখি ঘর-ভর্তি ধবধবে সাদা বিড়াল হেঁটে বেড়াচ্ছে, দল বেঁধে, নিঃশব্দে। আমি আবার বারান্দায় যাই। কোজুর মাথায়, কাঁধে, হাতে, ব্যালকনি, পুকুরপাড়ের অরণ্য, হ্রদের উপর শতসহস্র দুধসাদা বিড়াল মেঘের মতো ভেসে বেড়ায়। যেন সারা দুনিয়ার সাদা বিড়াল এখানে সমবেত হয়েছে। কোজু হেসে বলে, ‘দেখেছ?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, দুপুরের দিকে মাঝেমধ্যেই ওরা নামে। যখন সারা পৃথিবী শুনশান, পুকুরপাড়ের অরণ্যে যখন পাখির কাকলি ছাড়া অন্য কোনো শব্দ কোথাও থাকে না, সেই সময়ে।’

জাপান ছাড়ার ঠিক আগে, রাত আটটার পর আমি আর সান্দ্রা সাইকেল নিয়ে বের হই। হেমন্তের ঝিরঝির বাতাসে ধানখেতের পাশে বিওয়া লেকের পাড় ধরে সাইকেল চালাই। প্রায় পুরোটা সময়ই আমরা নীরব থাকি। আমি শুধু একবার বলি বাসায় ফিরে মদ খাব আর সান্দ্রার গিটার শুনব। সান্দ্রা মাথা নেড়ে সায় দেয়।

ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত দু’জনা স্টেশনের কাছে কেএফসিতে বার্গার খেয়ে স্টেশনের সামনে পাথুরে বেঞ্চিতে বসি। স্টেশনের নীচতলার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে গিটারে সুর তুলে এক প্রৌঢ় কিন্নর কণ্ঠে গান গায়। আমি বেঞ্চিতে সান্দ্রার কোলে শুয়ে পড়ি। ঝিরিঝিরি বাতাস আর গানে কখন ঘুমিয়ে পড়ি জানি না। সান্দ্রা আমার ঘুম ভাঙিয়ে বলে, ‘অনেক রাত হয়ে গেছে। চলো, বাসায় যাই।’

জাপান ছাড়ার সময় স্টেশনে সান্দ্রাই শুধুমাত্র আমাকে বিদায় জানাতে আসে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখে, মুখে, গলায় চুমু খায়। সাত আট দিন পর সেও মিয়ানমারে ফিরে যাবে। স্যুটকেস-সহ আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ভেন্ডিং মেশিনের সামনে দাঁড়ায়। ট্রেন ছেড়ে দিলে আমরা দু’জন দু’জনের দিকে হাত নাড়াই। উড়ন্ত চুমু পাঠাই।

বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে আমি তাকে বেশ কয়েকটা ইমেইল পাঠাই। কিন্তু মিয়ানমার থেকে কোনো জবাব আসে না।





১৮
জাপান থেকে ফেরার পর ডাঙ্গায় তোলা মাছের দশা আমার। ঘরে-বাইরে এত মানুষ! আমার ব্যক্তিগত, নিজস্ব বলতে আর কিছু নাই। আমার বাবা-মা এয়ারপোর্টে আসে। বিকালে রোমেলের সাথে দেখা। অফিসে ব্যস্ত ছিল সে। মন্ত্রীর সাথে জরুরি কী মিটিং ছিল এ জন্য এয়ারপোর্টে যেতে পারে নাই। বিকালে অফিস থেকে ফিরে রোমেল জিজ্ঞাসা করে, ‘আশা করি জার্নিতে কোনো ঝামেলা হয় নাই?’ আমাকে এয়ারপোর্টে আনতে না যেতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সে। আমি বলি, ‘না, সব ঠিকঠাক ছিল।’

ডাইনিং টেবিলে মা, রোমেল, সবার সাথেই টুকটাক বাক্য-বিনিময় হয়। খাওয়া শেষে আমার স্যুটকেস-সহ রোমেল আমাকে নিয়ে বাসায় যায়। রোমেল চ্যানেল ঘুরিয়ে নানা চ্যানেলে সংবাদ দেখে। টেলিভিশন আমার দুই চোখের বিষ। বিটিভির কালে দেখতাম; বহু চ্যানেল আসার পর টিভির সামনে আর বসি না। রোমেলকে খুশি করতেই টেলিভিশন দেখতে চেষ্টা করি। আমি জাপানে কেমন ছিলাম, কী ছিলাম, কোনো কিছু নিয়েই প্রশ্ন করে না সে। একবার আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে একঠায় টেলিভিশনে তাকিয়ে থাকে। আমি একটা বই নিয়ে পাশের ঘরে চলে যাই।

অল্প ক’দিনেই একটা এনজিওতে চাকরি পাই। অফিসে এক রুমে চার-পাঁচজন বসে। অফিসটাকে আমার বাজার মনে হয়। বাসায় ফিরে দেখি কাজের মেয়েদের কোলাহল অথবা রোমেলের উচ্চশব্দে টেলিভিশন দেখা। আমি নৈঃশব্দ্যের অভাবে হাঁপিয়ে উঠি। কখনো বিকালে হাঁটতে বের হই। কখনো ঘরে ফিরে গেস্টরুমের দরজা বন্ধ করে ঘণ্টা দুয়েক নীরব কাটাই। কখনো বই বা ম্যাগাজিন ওল্টাই। কোনো-কোনো সময় ঘরের সাদা দেয়ালে তাকিয়ে থাকি এক-দেড় ঘণ্টা।

আমার মা এসে একদিন দরজা ধাক্কা দেয়। দরজা খুলতেই চিৎকার করে, ‘জামাইকে একা ঘরে রাইখা দরজা বন্ধ করে কী করিস?’ আমি বলি, ‘বই পড়ি।’ রাগে আমার মায়ের বিস্ফোরিত দু’চোখের মণি যেন চোখ থেকে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। ‘বই পড়তে দরজা বন্ধ করা লাগে? কোনো কুত্তাও তোর সাথে সংসার করবে না।’

এক বিকালে দেখি বেডরুমে বিছানার উপর রোমেলের প্যান্ট-শার্ট পড়ে আছে। রোমেল তখন ড্রইংরুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছে। আমি অফিস থেকে ফেরার পর রোমেল আমাকে দ্যাখে নাই। কিছু ভয়, কিছু কৌতূহলে আমি বেডরুমে ফিরে আসি। প্যান্টের পকেটে হাত দেই, যা আমি কখনোই করি না। কিছু খুচরা কার্ড, দোমড়ানো টিস্যু-পেপার আর ওয়ালেট। ওয়ালেটে কী খুঁজি নিজেও জানি না। কিছু পাঁচশ টাকার নোট, কিছু খুচরা একশ আর দশ টাকার নোট। কাগজে ভাঁজ-করা একটা সিম কার্ড। আমার গায়ে-হলুদের একটা ছবি। কাঁচি দিয়ে কেটে ছোট করা। শুধু মুখ। পিছনে দরজায় দাঁড়িয়ে রোমেল জিজ্ঞাসা করে, ‘কী করো?’ কখন এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে টের পাই নাই। আমার হাত থেকে ওয়ালেট মেঝেতে পড়ে যায়। আমি তার প্যান্টটা তুলে নিয়ে বলি, ‘প্যান্টে কেমন জানি গন্ধ হয়ে আছে। বুয়াকে ধুইতে বলব কিনা ভাবতেছি।’ সে এসে আমার মাথার পাশে দাঁড়ায়। রোমেল জানে আমি কোনোদিন তার পরিধেয় কোনোকিছু গোছানো বা লন্ড্রি করানোর কথা ভাবিও নাই, সে নিজেই বুয়াকে ওসব বুঝিয়ে দেয়। প্যান্টটা বিছানায় ফেলে দিয়ে বেডরুম থেকে ত্রস্ত বেরিয়ে যাই। রান্নাঘরে গিয়ে কাজের বুয়া অজিফার মাকে তার মেয়ে, বাবা-মা, সবার কুশল জিজ্ঞাসা করি। তার সাথে বলার সব কথা ফুরিয়ে গেলে হাতড়ে কথা খুঁজি। যেন অজিফার মার সাথে কথা বললেই কথা বলতে থাকলেই খানিক আগে ঘটে-যাওয়া ঘটনাটা মুছে যাবে। বাকি জীবনে রোমেল কখনোই আমাকে এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা করে নাই। আমরা দু’জনেই টের পাই কে কখন কাকে বোকা বানাচ্ছি। কিন্তুকখনোই এ নিয়ে কেউ কাউকে কোনো প্রশ্ন করি না, অপ্রস্তুত করি না।

আমরা দু’জনেই জানি যৌনতার বাইরে কোনো যৌথতা আমাদের নাই। ছুটির দিনে বা অফিসের পর একেবারে সীমিত বাক্য-বিনিময় আমাদের হয়। মাঝেমধ্যেই মনে হয় আমাদের মনে হয় কিছু নিয়ে কথা বলা উচিত, কিন্তু বলার মতো কিছুই হাতড়ে পাই না। অবসরে বই পড়ে বা যে যার ল্যাপটপে সিনেমা দেখে কাটাই। রোমেলই কখনো কখনো উদ্যোগী হয়ে আসে। বেশিরভাগ সময়ই জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার অফিস কেমন কাটল?’ অথবা ‘তোমার বাবা-মায়ের শরীর কেমন?’ আমি হয়তো জবাব দেই ‘অফিস ভালোই গেল।’ আর বাবা-মায়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মনে হয় বাবা-মা নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করা যায়। হয়তো বলি, ‘বাবার প্রেশার খানিকটা বাড়ন্ত। মার শরীরও ভালো না। গায়ে জ্বর। এই বয়সেও মার নাকি বৃষ্টি দেখে ভিজতে মন চায়। ছাদে গিয়ে ভিজে। তারপর থেকে জ্বর। অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছে।

মাঝেমধ্যে মনে হয় মার বয়স পঁচিশে আটকে আছে। মাকে ছোটবেলায় অনেক ভয় পাইতাম। বড় হবার পর মনে হয় তার মানসিক বয়স পঁচিশ-তিরিশে আটকে আছে। সারাক্ষণ আমাকে নিয়া ওভার কনশাস। আমার সংসার টিঁকে কি না। আমি চাকরি-বাকরি করতে পারব কি না। বা, পারলেও চাকরিতে কোনোদিন প্রমোশন পাব কি না, এইসব। ’ আমি রোমেলকে জিজ্ঞাসা করি, ‘তোমার মাও কি এমন ইমোশনাল, বাচ্চাদের মতো আচরণ করে তোমাদের সাথে? আমার সাথে তো শি ইজ নাইস। আমার সামনে ওনার ওপেন হবার কথাও না।’ রোমেল হয়তো বলে, ‘তোমার মার জ্বর কি কমছে? আজকের ওয়েদারটা কি বাজে দেখছ? একেবারে প্যাচপ্যাচা গরম।’

রোমেল তার বাবা-মা-বোন প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করবে না, অন্তত আমার কাছে করবে না, এ কথা কেন বার বার আমি ভুলে যাই, ভেবে নিজের উপরে রাগ হয়। অথচ তার বাবা, মা, বড় বোন শম্পা আপার সাথে কখনো কথা হলে তারা আমাকে রোমেলকে নিয়েই বেশি গল্প করে। রোমেল শৈশব-কৈশোরে কী ভীষণ মা-ন্যাওটা ছিল। বড় বোন শম্পা আপার বিয়ে হয়ে গেলে সে শিশুর মতো কেঁদেছিল। আমি মনে মনে হয়তো ভাবি, তাদের কাছে যে-রোমেলের গল্প শুনি আর আমি রোমেলকে যেভাবে চিনি তারা আলাদা মানুষ। আমি বলি, ‘হ্যাঁ। মার জ্বর মনে হয় কমছে। উফ কী গরম। অসহ্য লাগতেছে।’ কোনোদিন রোমেল হয়তো তার হাতে ধরে রাখা পাওলো কোয়েলহোর ‘দি আলকেমিস্ট’ বইটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলবে, ‘এইটা পড়ে দেখতে পারো। ভালো লাগবে।’ আমিও শান্তভাবেই নেব তার হাত থেকে বইটা।




১৯
রোমেল আমার সাথে তার অফিস নিয়েও কখনো কথা বলে না। একবার মাতাল অবস্থায় ঘরে ফিরে সে আমার সাথে প্রচুর কথা বলল, এবং অফিস নিয়ে। আমাকে এমনিতে আমার ডাকনাম “নীতু” বলে ডাকে না, “ফাহিমা” বলে। মাতাল অবস্থায় এই প্রথম আমাকে নীতু ডাকে সে। মাঝে মাঝে মদ্যপান করলেও, তাকে মাতাল হতে জীবনে এই প্রথম দেখলাম। রাজনৈতিক লেবেল এঁটে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তার অধস্তন বহু কর্মকতাকে তার উপরে তুলে দেওয়া হয়েছে। রোমেল চ্যাঁচায়, ‘চাকরির নিকুচি করি। চাকর শ্রেণির মানুষজন সরকারি চাকরিতে সবচেয়ে সফল হয়।’ সরকারি চাকরির চৌদ্দপুরুষ সে উদ্ধার করে যেতে থাকে, ‘আই হেইট গভর্মেন্ট সার্ভিস। এখানে প্রত্যেকে তার কলিগদের ঘৃণা করে। প্রায় সবাই মনে করে সে ছাড়া বাকি প্রায় সবাই চোর, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, ভণ্ড, মিথ্যুক, প্রতারক, ইতর, লম্পট।’ এই প্রথম সে তার সহজাত ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়ে মানুষকে গালমন্দ করে। ‘আই অ্যাম টায়ার্ড, নীতু। আই অ্যাম সো টায়ার্ড। এরা এদের ঘৃণাও করে আবার ভালোও বাসে। ভালবাসে বলেই হয়তো ক্যাডার সার্ভিসের বাইরে অন্যদের সাথে মিশে না। এরা আসলে কারো সাথে মিশতেও পারে না। এই দেশের মানুষ সরকারি, কর্পোরেট সবখানেই অধীনস্থদের চাকর হিসাবে ট্র্রিট করে। অধীনস্থ মানুষটা যত বড় কর্মকর্তাই হোক, তাকে তার নিজের চাকর, বাবার চাকর ভাবে। ঘুষখোর চোরদের এটা স্বর্গ। এ আমার জায়গা না।’ রোমেলকে সেদিন আমার অতিথি মনে হয় না। স্বামী মনে হয়।

সে কখনো কখনো আমাকে কাছে টানতে চেয়েছে। বলেছে আমাকে ভালবাসে। তার কথা আমার পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নাই। যান্ত্রিক মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, করুণা করছে। একটা নিয়মিত যৌনসম্পর্ক বয়ে নেওয়ার জন্য যেটুকু ন্যূনতম ভদ্রতা, ভালোমানুষি দেখানো দরকার, শুধু সেইটুকু সে দেখাচ্ছে।

কিছুদিন পর আবার একবার সে তার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, বলে, ‘আজকে জুনায়েদ রহমানের সাথে পরিচয় হলো। ইয়াং পলিটিশিয়ান, টিভিতে দ্যাখো নাই?’ আমি রোমেলের দিকে তাকাই। খাটের এক প্রান্তে পিঠে বালিশ ঠেকিয়ে টেলিভিশনের চ্যানেল ঘোরায়। আমি শুয়ে পুরনো ঈদসংখ্যা উল্টাচ্ছি। ‘বাবা দুই টার্মে মিনিস্টার ছিল, চরম দুর্নীতিবাজ। জুনায়েদ ভীষণ স্মার্ট, আমার সাথে তার দারুণ আড্ডা জমে উঠছে। এ সময়ের ছেলে তো, সেন্স অব হিউমার দুর্দান্ত।’ আমি বলি, ‘তুমি না নিজেকে অনেস্ট হিসাবে তুলে ধরো? তোমার সার্ভিসে সবাই জানে তুমি দুর্নীতিবিরোধী সৎ অফিসার। তারপর এমন দুর্নীতিবাজ, লুটেরা রাজনীতিবিদের সাথে আড্ডা দাও কেমন করে?’ আমার পানে অপাঙ্গে তাকিয়ে সে নীরব হয়ে যায়। গভীর অভিনিবেশে টেলিভিশন দ্যাখে। এরপর তার গম্ভীর মুখের রেখাসমূহ আমাকে বলে অনেকক্ষণ কোনো কথাই সে বলবে না আর। আমি রুম থেকে বেরিয়ে যাই।

মাস-পাঁচেক পর রোমেলকে বলি, ‘পাঁচ-সাতদিনের ছুটিতে আবার জাপান যাব। যে ফ্ল্যাটে থাকতাম ঐ ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটা খুব মিস করি, স্কলারশিপের জমানো টাকায় যাব।’ রোমেল বলে, ‘জাপানে তবে মধু ছিল?’ রোমেলের দাঁড়ানোর ভঙ্গি, স্মার্ট চাহনি, সবই আমার মধ্যে ভয় ধরিয়ে দেয়। তার চিরাচরিত ঐশী গাম্ভীর্য নিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমাকে থাপ্পড় মারবে।

বাবা, মা, রোমেল সবাই মিলে আমার চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিত করে, আমার বিষণ্নতা, দরজা বন্ধ করে দুই-এক ঘণ্টা রুমে কাটানো নিয়ে সন্দেহ; কটাক্ষ করে মা বলে, ‘তুই ঠাণ্ডা মাথার ক্রিমিনাল, তোকে দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না কত পাপ, কত শয়তানি তোর মাথায় আছে।’




২০
অফিসে একবার এক সহকর্মীকে বলেছিলাম ব্যালকনিটার কথা। তারপর থেকে আমার সহকর্মীরা আড়ালে হাসাহাসি করে। লীনা আমাকে বলেছে, আমার পিছনে সবাই আমাকে নষ্টচরিত্রের মেয়ে বলে। বলে, ব্যালকনির জন্য বিদেশ যাবে এসব হাস্যকর কথা কেউ বিশ্বাস করতে যাবে কোন দুঃখে।

লীনা ডিভোর্সি। বহুবছর একা থাকে। সে বলে, ‘কোনো সুন্দরী মেয়ে চাকরিতে ঢুকলে লোকজন বাজে কথা বলবেই। বাংলাদেশে আমার মতো ডিভোর্সি, বিধবা, সিঙ্গেল যে-কোনো মেয়েকে একা থাকতে দেখলে তার যৌন জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আশপাশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। অনেকেই এদের দুশ্চরিত্রা ভাবে। আমার অভিজ্ঞতা শোন, সংক্রামক রোগীর মতো ডিভোর্সি মেয়েদের বিবাহিত মেয়েরা ভয় পায়। যথাসম্ভব ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলে, যেন ছোঁয়া লাগলেই তার সাজানো সংসার শতখণ্ড হয়ে যাবে। যেন অন্যের স্বামী দেখলেই ডিভোর্সি, বিধবাদের লালা গড়ায়। যেন তারা সারাদিন এই পরিকল্পনাতেই ব্যস্ত থাকে কীভাবে অন্যের স্বামী ভাগিয়ে আনা যায়।’ লীনা কথা বলতে বলতে কাগজে আঁকাবুকি করে। একটা পাতা ভরে সে মানুষের চোখ এঁকেছে। গোলাকৃতি, বর্গাকৃতি, মুদিত, উন্মীলিত, অর্ধোন্মিলিত...




২১
চামেলিবাগ থেকে শান্তিনগর চৌরাস্তা, বেইলি রোড, ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল পেরিয়ে মিন্টো রোডের দিকে যাই। গাড়ির হর্ন ছাপিয়ে পাখির কাকলিতে মুখরিত মিন্টো রোডের সন্ধ্যা।

জাপান থেকে ফেরার পর সন্ধ্যার আঁধার নেমে এলে প্রায়ই এ পথ ধরে রমনা পার্কে হাঁটতে বের হই। আমরা তখন রোমেলের বেইলি রোডের সরকারি কোয়ার্টারে থাকি। একদিন সন্ধ্যা নেমে এলে গাড়ির কাচ নামিয়ে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করে দাম কত।

মাঝে মাঝে রোমেলও হাঁটতে বের হয়। আমার সাথে ব্যবধান রেখে সে হাঁটে, কোনো কথা না বলে। আবার কখনো একবারও না তাকিয়ে আমার পাশ দিয়ে সে রমনা পার্কে ভিতরে হারিয়ে যায়। কোনো-কোনোদিন কিছুদূর এগিয়ে রিকশা নিয়ে একাই বাড়ি ফেরে। অন্ধকারে আমি পার্কে একা। কিছুদিন পর রোমেল আর হাঁটতে বেরয় না। অন্তত আমার সাথে, একই সময়ে না।




২২
দুপুরে অফিসে ফোন করে মা, ‘অফিস শেষে আমার বাসায় আসবি। আমি তোর জন্য রান্না করছি।’ সন্ধ্যায় ডাইনিং টেবিলে মা বলে, ‘প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা দরজা বন্ধ করে রাখিস ক্যান? তুই তো লেখক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী আর্টিস্ট কোনোকিছুই না। তোর জামাই হয়তো মনে করে, দরজা বন্ধ করে তুই টেলিফোনে কারো সাথে প্রেম করিস। তোর ঘরের কাজের মেয়ে আমার বাসার সুফিয়াকে বলছে, “আপা প্রত্যেক দিন দুলাভাইয়ের মুখের উপর দরজা বন্ধ কইরা একলা ঘরে বইয়া থাকে। একলা ঘরে কী কী করে আল্লায় জানে।” আরো নাকি বলে, “দুলাভাই কোনোদিন আপার সাথে দুর্ব্যবহার করে নাই, উঁচা গলায় কথা বলে নাই, এমন ফেরেশতার মতো মানুষ দুনিয়াতে নাই।” তুই বুঝিস? মানসম্মান থাকে এতে? বাড়ির কাজের মেয়েরা পর্যন্ত সন্দেহ করে।’ আমি খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাই। সামনের তিনতলা দালানটি বোগেনভিলিয়ার লাল-বেগুনি আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে জাপান থেকে ফেরার পর অফিস থেকে ফিরে যখন একা ঘরে দরজা বন্ধ করে দুই-তিন ঘণ্টা পার করি, মা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় এ সংসার আর টিঁকবে না। রোমেল কত মহান, কত মেধাবী, কত সহনশীল, সকাল বিকাল আমাকে বোঝাতে থাকে। মায়ের দুর্নিবার চেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের দাম্পত্যের কোনো উন্নতি হয় না। জাপানে থাকার সময় কেন রোমেলের সাথে কথা বলতাম না, কেন আমি বাচ্চা নেই না, কেন সংসারের অযোগ্য করে তুলেছি নিজেকে...

সাকি আপা আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দিঘল চুলে তার কাঁধ, পিঠ পরিপ্লুত। মাকে বলে, ‘খালামনি আপনি রুম থেকে চলে যান। আমি একা কিছুক্ষণ ওর সাথে কথা বলব। মা যাবার পর সে আমার মুখোমুখি বসে বলে, ‘দ্যাখ তুই আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলিস না, যতটা পারিস এড়িয়ে চলিস। আমি বেহায়ার মতো একা-একা বলি। জাপান থেকে তুই নাকি তোর জামাইয়ের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করিস নাই? এইরকম সোবার, এত ভালো খান্দানের ছেলে, এত ভদ্রলোক স্বামী কয়জনের ভাগ্যে জোটে? তোর স্বামী কোনোদিন তোকে মারধর করে? নোংরা গালি দেয়? তোর রান্না ভালো হয় নাই বলে খাবার উল্টে দেয়? আমি তো শুনছি তুই কোনোদিন রান্নাই করিস না। তোর সাথে প্রতারণ করে প্রতিদিন? মিথ্যা কথা বলে?’
‘না, গালমন্দ, বকা, রান্না নিয়ে দুর্ব্যবহার এগুলা কিছুই করে না সে। মিথ্যা বলে না, প্রতারণাও মনে হয় করে না।’
‘তাইলে অন্য কারো সাথে প্রেম করে?’
‘না, এমন কখনো মনে হয় নাই।’
‘তাইলে তুই জাপান থেকে ঠিকমতো যোগাযোগ করিস নাই ক্যান? জামাইয়ের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে কী করিস? স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের একটা ব্যাকরণ আছে না? কেন তুই জাপান গিয়ে রোমেলের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছিস, আর এখন দেশে ফিরে সারাদিনের অফিস ক্লান্ত রোমেলের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে একা ঘরে সময় কাটাস?’

এককালে পুতুলের মতো গোলগাল দেখতে সাকি আপাার চেহারা এখন চোয়াড়ে, ঝগড়াটে হয়ে গেছে। ‘তুই জানিস, এতবড় গভর্মেন্ট অফিসার তোর দুলাভাই, সে নিত্যি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলে। শুধু সে না, তার ফ্যামিলির সবার মধ্যেই কম বেশি মিথ্যা বলার অভ্যাস আছে। এত ভান-ভনিতা এদের মধ্যে! কিন্তু আমি সব মেনে, জেনেবুঝে, চোখ-কান-মনে তুলা ঠেসে সংসার করে যাইতেছি। প্রতারণা ছাড়া এই জীবনে আর কিছু পাই নাই... সুখে থাকতে তোরে ভূতে কিলায়? এমন ভদ্রলোক স্বামীর সাথে মিলঝিল করে চলতে পারিস না!’ আমি বলি, ‘আমি ট্রাই করবো মিলে চলতে। অফিসের কিছু কাজ নিয়ে আসছি। আমি যাই।’ রুমে ঢুকতে ঢুকতে সাকি আপার আর্তনাদ শুনি। ‘আবার তোর ফুটানি শুরু হইছে। এগুলার লেসন আল্লাহ তোরে দিবে। তোদের বাড়ি আমি আর কোনোদিন আসব না।’

ঘরে ঢুকে পুরোনো সবুজ রঙের স্টিলের আলমারির সামনে দাঁড়াই। মা বহুবার আলমারিটা দারোয়ানকে দিয়ে দিতে চেয়েছে। আমি রাজি হই নাই। পুরোনো কিছুই ফেলতে মন চায় না আমার। আয়নায় নিজেকে দেখি। চুলের রাবারব্যান্ড খুলে দেই। চুলগুলো ঝিলমিল ছড়িয়ে পড়ে মুখের দু’পাশে।




২৩
সবার সব বাধা উপেক্ষা করে জাপান যাই। কেনসাই এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে আমার শরীরের প্রতিটা রোমকূপে রোমাঞ্চ অনুভব করি। সেই আগের মতো ট্রেনে বেশিরভাগ যাত্রী টেক্সট মেসেজ লিখতে ব্যস্ত। আগের মতোই সবাই চরম শৃঙ্খলাপরায়ণ। ওসাকা স্টেশনে ট্রেন বদলাই। ইবারাকিতে মাইকেল শপিং মল, অদূরে স্টারবাকস। আহ্ এই শহরে কত হেঁটেছি। আমার উচ্ছ্বাস দেখে যে-কারো মনে হতে পারে শপিং মলের মালিক পক্ষের হয়তো আমি কেউ।

মিনামি কুসাৎসু স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে আমার প্রাক্তন আবাস এক্সেলশিয়র-এ যাই। সারাদিন দালানটির সামনে সাইকেল স্ট্যান্ড সংলগ্ন ছোট পার্কে বসে থাকি। কত বিকালে এই পার্কে এসে বসেছি। পার্কের বালি-কাঁকর-মাটি ছেনে চার জাপানি শিশু খেলছে। পার্কের পাশে এই সাইকেল স্ট্যান্ডে আমার টুকটুকে লাল সাইকেল আমার অপেক্ষায় থাকত। বেঞ্চির পিছনে আমগাছের সারি। তারপর কাঁটাতারের বেড়া, যার ওপাশে পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, আরো নানান গাছগাছালি লতাপাতায় জড়ানো পুকুরপাড়ের অরণ্য। আমি হাভাতের মতো বাঁশঝাড়ে, পুকুরপানে তাকিয়ে থাকি। বাতাসে বাঁশঝাড়ের মর্মর আমার মাথায় বাজে। আমি নিঃসঙ্গ হলেই আমার মাথার ভিতর অবিরাম, অশ্রান্ত, অনন্তকাল বাজে অরণ্যের এই মৃদু ফিসফিস।

উইকএন্ডে সম্ভবত বাড়ির ম্যানেজার নাই। দু’-তিনজন ছাত্রকে ঢুকতে দেখে আমি তাদের সাথে ঢুকি। ঢুকতেই বাঁ পাশে বাড়ির বাসিন্দাদের ডাকবাক্সের ঘর। বক্স থেকে পড়ে-যাওয়া উন্মুক্তবক্ষা নানা অঙ্গভঙ্গির নারীদের ছবি। টেলিফোন নাম্বারসহ পর্নো বিজ্ঞাপনে পুরো মেঝে ছেয়ে থাকে সারাবছর।

আমার সাথে জাপানি তরুণ প্রেমিকযুগল লিফটে ওঠে। লিফটের স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে সূর্যের তির্যক আলো জাপানি ছেলেমেয়েদের চোখেমুখে পড়ে। লিফটের কাচের ওপাশে ঘন বৃক্ষাদিতে ছাওয়া আমার সবুজ পুকুর, দূরে পাহাড়, হ্রদ, সেতা শহর, আমার অস্বাভাবিক হৃৎকম্পনে লিফটের বোতাম টিপতে ভুলে যাই। চারতলা পার হয়ে প্রেমিকযুগলের সাথে নয়তলায় চলে যাই। তরুণীটি আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে। লিফট থেকে ব্যালকনি মাত্র পাঁচ-সাত গজ দূরে। আমার শরীর ঝিমঝিম করে। চারতলায় লিফট থেকে নেমে বাঁয়ে প্রথম রুমটি চারশ-বারো নম্বর।

বেল টিপি। অপেক্ষা করি। আবার বেল টিপি। পাঁচ, দশ, পনেরো মিনিট পার হবার পর আবার পর-পর দুইবার বেল টিপি। পাশের রুমের দরজায়ও টিপি। দ্বিতীয়বার টিপতেই দরজা খোলে এক জাপানি তরুণী। তাকে বলি, ‘আমি চারশ-বারো নম্বর ঘরটিতে থাকতাম দুই বছর, অনেক স্মৃতি আমার এখানে। আমি আসলে ভিতরে যেতে চাচ্ছিলাম। বার বার বেল টিপছি, কেউ খুলছে না, সম্ভবত বাসায় নাই, তুমি কি এই রুমের বাসিন্দার কোনো নম্বর জানো? অথবা সে রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে, জানো?’ তরুণীটি মাথা নেড়ে বলে, ‘এই রুমে কে থাকে তার সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। একটা বিদেশি ছাত্র দেখেছি। কোনোদিন কোনো কথা হয় নাই।’ দ্বিধা ঝেড়ে বেহায়ার মতো বলি, ‘যদি কিছু মনে না করো, আমি কি তোমার ব্যালকনিতে কিছুসময় দাঁড়িয়ে আমার আগের ঘর, পুকুর, ব্যালকনিটা দেখতে পারি?’ সে বিনয়ের সাথে বলে, ‘কিছু মনে কোরো না। ঘরে আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। পরে অন্য কোনোসময় এলে তুমি বসতে পারো।’

তাকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি দ্রুত সরে গিয়ে লিফটে উঠি। লিফটের স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের বাইরে চারশ-বারো নম্বর রুমের আমার ব্যালকনি, পুকুর, বাতাসে বাঁশঝাড়ের দোল-খাওয়া। আমি দশতলা উঠে যাই। দূরে নীল পাহাড়ের তুষার ধবল মেঘ সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। আবার নীচতলার বোতাম টিপি। প্রায় আট-দশবার এভাবে ওঠানামা করি। আমার ব্যালকনিতে স্বচ্ছ পলিথিনের ব্যাগে কতগুলো খালি বিয়ারের ক্যান, তার পাশে কিছু কাগজের প্যাকেট ডাঁই করে রাখা আছে।

গাছগাছালির আড়ালে পুকুরে ছিপ ফেলে বসে আছে একটা মানুষ। তার শরীরের অবয়ব, মাথার চুল দেখা যায়, মুখ দেখা যায় না। হয়তো সেই লোকটাই, যাকে আমি এখানে থাকার সময় টানা দুইবছর দেখেছি প্রতি উইকএন্ডে নিয়মিত ছিপ ফেলে পানির দিকে তাকিয়ে মূর্তিবৎ বসে থাকতে। সূর্য অপসৃত হয়ে আকাশ মেঘলা হয়ে উঠেছে। হঠাৎ বেদম বাতাসে পুকুরপাড়ের বৃক্ষেরা প্রবলভাবে দুলছে। এ অন্যের গায়ে আছড়ে পড়ছে। হালকা মেঘ আর এলোমেলো বাতাসের এমন দিনগুলিতে সারাদিন আমি ব্যালকনি থেকে উঠতাম না।

চারশ-বারো নম্বরের বাসিন্দা কি ছুটিতে গেছে? ছুটি থেকে আবার আসবে কবে সে? আসার আগেই হয়তো আমাকে জাপান থেকে চলে যেতে হবে। কোনো কিছু চিন্তা করতে আর মন চায় না। সারাদিন না-খেয়ে শরীরে অবসাদের ঝিমুনি ধরেছে। চিন্তা করার শক্তিও আর নাই। কোনো ক্যাফে বা অন্য কোথাও খেতে যেতেও মন চায় না। ঘুম পায়। পার্কের বেঞ্চিতে সটান শুয়ে ঘুমিয়ে যাই। কাছেই দু’টি খেলতে-থাকা বাচ্চার ঝগড়ায় ঘুম ভেঙে যায়। সকালের দিকে যে চলমান ঝলমলে ভালোলাগার বোধটা ছিল তা এখন আর নাই। ঘুম ঝিমুনি সমেত দালানটির ইমারজেন্সি-এক্সিটের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠি। সন্ধ্যার আকাশের নীলচে কমলা বেগুনি রঙের স্তব্ধ পৃথিবী যেন হঠাৎ প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে এলোমেলো বাতাসে দুলে ওঠে। আমার তখন ভেসে যাওয়ার দশা। ঢেউয়ের মতো বাতাসের দমক আমার শরীরে, মাথায়, চুলে আছড়ে পড়ে। একসময় মনে হয় আমার শরীর কাঁপছে। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। বাতাসকে স্বাভাবিক আর মনে হয় না। টাইফুনের দামাল হাওয়া যেন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রেলিং ধরে বসে থাকি। আমার চারপাশের বাতাসের রঙ কেমন নীল হয়ে উঠছে। যেন নীল কুয়াশার সমুদ্রে ডুবে আছি। ধীরে ধীরে সব আবার পরিষ্কার, স্বাভাবিক।

সন্ধ্যার অন্ধকার নামে। সিঁড়ি ভেঙে নামি আমিও। বাঁ পাশে ডাস্টবিন থেকে ময়লার কটু গন্ধ ভেসে আসে। অন্ধকারে শ্বাপদের মতো দালানটির চারপাশে ঘুরে বেড়াই। ক্লান্তিতে একসময় পার্কের পাশের বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে পড়ি। রাতজাগা পাখির কর্কশ শব্দে কয়েক ঘণ্টা পর ঘুম ভাঙে। সাইকেল স্ট্যান্ডের গা ঘেঁষে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাই। আমি পৌঁছুতে-না-পৌঁছুতেই সেতাগামী একটা বাস চলে যায়। এক ঘণ্টা পর আরেকটা বাস আসবে। অদূরে কনভেনি শপের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডারত তিন তরুণী সিগারেট খাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কো-অপারেটিভে খোঁজ নিয়ে চারশ-বারো নম্বর রুমের বাসিন্দার কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে তা, এবং তার টেলিফোন নম্বর জেনে নেই। সে ওকিনাওয়া বেড়াতে গেছে দুই সপ্তাহের জন্য। অথচ আমার টাকা দ্রুত ফুরিয়ে যচ্ছে। দেশে চলে যেতে হবে। জাপানে নেমে একবার তিন মিনিটের জন্য রোমেলকে ফোন করেছিলাম। জানিয়েছি আমি নিরাপদে পৌঁছেছি। এই কয়দিনে ঢাকায় একবারও যোগাযোগ করিনি। জাপানের বাকি কটাদিন প্রতিদিন বিকালে এক্সেলশিয়র দালানটির সামনের পার্কে ঝিম মেরে বসে থাকি। কখনো লিফটে নীচতলা-দশতলা করি পুকুর, হ্রদ, দূরের পাহাড় আর আমার ব্যালকনি দেখতে। আমি যে আবার এই জীবনে জাপানে আসতে পেরেছি, দালানটির সামনে বসে আছি, ভাবতেই ভালো লাগে।




২৪
অদূরে বিশাল সবজি-বাগান সমেত বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িটিতে লোকটি চন্দ্রাহতের মতো বাগানের রূপ দেখছে। সুন্দর পোশাক, হ্যাট পরিহিত বৃদ্ধা গ্লাভস হাতে বাগানের যত্ন নেয়। আমার জাপান জীবনের পুরোসময় প্রতি বিকালে দেখেছি সুসজ্জিত এই দম্পতি হয় বাগানের সেবা করে নয়তো মুগ্ধদৃষ্টিতে সবজি-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করে। এই দম্পতি বিদেশি তরুণদের সম্ভবত ঘৃণা করে।

আমি ও অন্য দেশের সহপাঠী বন্ধুরা নানা সময়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হেসেছি, শুভসন্ধ্যা, শুভসকাল বলেছি। তারা কখনো প্রতি-উত্তর করেনি, মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেছে। এইখানে সব আগের মতো আছে। সামনে সারি সারি সাইকেল, বাইক, ডানদিকে কার পার্কিং, তার পিছনে কোনায় অব্যবহৃত সুইমিংপুল, পুকুরের মাঝে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা মরা ডাল, জলচর পাখি, দূরের সেতা শহর, চারশ-বারো নম্বর ফ্ল্যাট, ব্যালকনি, নীল পাহাড় সব আছে। কিন্তু কিছুই আর আমার না। আমি এখানে ভূতপূর্ব।

সেতায় বাস থেকে নেমে সড়কদ্বীপের মাঝে ছোট পার্কে বসি। আমার মুখোমুখি পাথুরে বেঞ্চিতে সামনে ফোয়ারার জলের শব্দে আমি হালকা বোধ করি। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে কেউ একজন বসে আছে। হয়তো ল্যাটিন আমেরিকান। সাদামাটা ফ্যাকাশে চেহারা। শ্রমিক গোত্রের কেউ হতে পারে। দুই চোখ ভর্তি রাজ্যের ক্ষুধা। ঠোঁট চাটে। আলো থেকে বাঁচার জন্য চোখের উপর হাত রেখে বেঞ্চিতে সটান শুয়ে পড়ি। মনে পড়ে বছর দেড়েক আগে এই স্টেশনের সামনে হুইল চেয়ারে বসা এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ কাঁদছিল। এক স্টেশন-ভর্তি মানুষের কেউ তার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেনি কেন সে কাঁদছে। প্রায় আধঘণ্টা পর পুলিশ আসে। পুলিশ ক্রন্দনরত বৃদ্ধের হুইল চেয়ার ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যায়। তখনও বৃদ্ধ অঝোরে ক্রন্দনরত।

পরদিন ঢাকা যাব। আমাকে দেখে ঢাকায় আমার বাবা, মা, স্বামী সবার চেহারা আর তাদের প্রশ্নগুলি কল্পনা করে কুঁকড়ে যাই। ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকি, যে টেবিলে বসি, পাশে এক মা তার দুই সন্তান নিয়ে বসেছে। তাদের অর্ডার এসে এখনো পৌঁছায়নি। মা মোবাইলে মেসেজ পাঠানোয় ব্যস্ত। বাচ্চারা খেলছে। ম্যাগডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে সেতার পথের দু’পাশে দোকানপাট, ক্যামেরার দোকান, আর্ট গ্যালারি, পিজা হাট, বনসাই, অর্কিড আর পুরনো পাথরে অসামান্য রূপ-সৌন্দর্যে গঠিত ঘরবাড়ি পেরিয়ে যাই মাৎসুসিতা মিনামি গুচির পথে। সাঁই সাঁই গাড়ি চলে যাচ্ছে হাইওয়েতে। হাইওয়ের কাছ দিয়ে নেমে যাই ব্রিজের নীচে হাঁটা-পথ ধরে। কবরস্থান, তার পাশেই দিনের আলোয় মৃত ক্যাসিনো পেরিয়ে যাই। দূরে এক্সেলশিয়র দৃশ্যমান। বাতাস শীতল। রেল লাইনের পাশে কিছু সফেদ চেরি গাছ। গাছভর্তি থোকা থোকা ফুল। কিছু গাছে উজ্জ্বল লাল রংয়ের জাম ধরেছে।

চারশ-বারো নম্বর রুমে অকারণে দু’বার বেল টিপি। জানা সত্ত্বেও যে ফ্ল্যাটের বাসিন্দা এখানে নাই। পাশের রুমেও টিপি। জাপানি তরুণীটি দরজা খোলে, তাকে বলি, ‘তোমার কি মনে পড়ে কিছুদিন আগে এসেছিলাম। পাশের রুমে থাকতাম। কাল জাপান ছেড়ে চলে যাব, আর কোনোদিন আসা হয় কী না জানি না। তোমার ব্যালকনিতে কিছুসময়ের জন্য বসতে পারি?’ সে বিনীতভাবে বলে, ‘আমার প্রেমিক বাসায়, দুঃখিত।’

রাতে হোটেলে ফিরে ডায়েরিতে লিখি, “শুধু এই দালানটির সামনে বসে থাকতেই আমার এত ভালো লাগে!”




২৫
আমার জামা, জুতা, অন্তর্বাস, পুরনো ছবি, সার্টিফিকেট, বই, মাস্টার্সের থিসিস, এইসব কিছু হ্যান্ডব্যাগ আর স্যুটকেসে ঢুকিয়ে নেই। রোমেল ড্রয়িংরুমে তার ল্যাপটপে কাজ করছে। রাত একটার দিকে রোমেল রুমে ঢুকে তার আলমারি থেকে বের করে আমার বিয়ের গয়নার বাক্স। বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে বলে, ‘তোমার গয়না বুঝে নাও।’ লাল টুকটুকে বাক্স। সোনালি রিবনে মোড়া। বিছানার উপর ঝলমল করছে। এইবার আমি জাপান থেকে ফেরার পর থেকেই প্রায় পনেরো দিন রোমেল আমার সাথে কথা বন্ধ রাখে। আমি দুয়েকবার কথা বলতে চাইলে সে কোনো জবাব না দিয়ে গভীর মনোযোগে পত্রিকায় মুখ ডুবিয়ে রাখে, টেলিভিশন দ্যাখে অথবা ল্যাপটপে কাজ করে।

আজ বিকালে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখি দরজার কাছে আমার স্যুটকেস, হ্যান্ডব্যাগ বেঁধে রাখা আছে। রোমেল ডাইনিং চেয়ারে বসা। আমি ঘরে ঢুকতেই দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার সাথে কথা আছে।’ পনেরো দিন পর এই প্রথম কথা বলছে। শান্তস্বরে বলে, ‘আমি তোমাকে ডিভোর্স করার প্ল্যান করছি। তুমি বোঝো আমাদের এই সম্পর্ক কন্টিনিউ করার মতো কোনো জিনিস না। ডিভোর্স পেপার সাইন করে আগামিকাল রাতে আমি দেশের বাইরে যাব এক মাসের জন্য। তোমার কাপড়চোপড় জিনিসপত্র আজ রাতের মধ্যে সব গুছায়া নাও। সব জিনিস না নিতে পারলে এক মাস পরে আমি দেশে ফিরলে নিয়ে যেয়ো।’ কিছুসময় নীরব থেকে আমি বলি, ‘ঠিক আছে, গুছিয়ে নিতেছি।’

পরদিন সকাল সাতটায় রওনা হয়ে গাড়িতে মনে পড়ে বুয়াকে বলে আসি নাই বারান্দার টবগুলিতে পানি দিতে। গোলাপ গাছটায় হলুদ গোলাপের কুঁড়ি এসেছে। রোমেলকে বলি, ‘বুয়াকে বইলো যেন প্রতিদিন টবগুলোতে পানি দেয়। তা নাইলে একমাস পর তুমি বিদেশ থেকে এসে দেখবা সব গাছ মরা।’ রোমেল নীরব থাকে। ব্যাগপত্রসহ আমাকে আর রোমেলকে দেখে মা বলে, ‘ব্যাগ-ট্যাগ নিয়া কী প্ল্যান করতেছ তোমরা? আমার মেয়ের মাথায় কি নতুন কোনো ভূত চাপল?’ আমাদের দু’জনকে একসাথে দেখে বাবাও পাশে এসে দাঁড়ায়। রোমেল হেসে বলে, ‘শি ইজ অলরাইট, মা। আমি আপনাকে একটা স্যাড নিউজ দিব। আমি আসলে ওকে ডিভোর্স করার প্ল্যান করতেছি। আজকেই সাইন করব। আজ রাতেই আমি আবার একমাসের জন্য ইউএসএ ফ্লাই করতেছি।’

মা মূর্তিবৎ রোমেলের দিকে তাকিয়ে থাকে।

রোমেল বলে যায়, ‘মাফ চাই, মা। আমাদের এই সম্পর্কটা আসলে কখনোই টিঁকার কথা না। আমি জোর করে সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আপনি জানেন আমরা দু’জন দুই গ্রহের মানুষ। আপনার আর আমার শ্বশুরের অকৃত্রিম ভালবাসা, স্নেহের কথা আমি কখনোই ভুলব না।’ রোমেল চলে যাবার পর মা নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় নেয়। একবার আমার দিকে তাকায়, একবার বাবার দিকে। তাকানোতে কোনো কর্তৃত্ব বা সাহস নাই। মাকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত, ভগ্ন একজন মানুষ মনে হয়। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।




২৬
একজন ডিভোর্সি মহিলার জন্য বাংলাদেশ অতিদ্রত নরক হয়ে উঠতে পারে। ইন্টারনেটে দেশের বাইরে বিভিন্ন সংস্থায় চাকরির দরখাস্ত করে যাই। ঘর থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে বের হবার সময় বাবা জিজ্ঞাসা করেন, ‘এত রাতে কই যাও?’ আমি বলি, ‘এমনিতেই রাস্তায় গাড়ি চালাব।’
‘তাইলে ড্রাইভার ডাকো নাই কেন? একা বেরুচ্ছো কেন? তুমি তো খুব ভালো করে জানো বাড়ির ড্রাইভার, দারোয়ান, অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন সবাই জানে তুমি ডিভোর্সি। সবার নজর থাকে রাত কয়টায় তুমি বাড়িতে ফেরো। ঠিক এগারটার মধ্যে ঘরে ফিরবা।’

কোনো কথা না বলে আমি বেরিয়ে যাই। গাড়ি নিয়ে আশুলিয়ার দিকে যাই। রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে জলের নীচে চাঁদের আভা দেখি। উদ্দেশ্যবিহীন গাড়ি চালাই। আশুলিয়া দিয়ে মিরপুর এক নম্বরের দিকে যাই। ধানমন্ডি, মানিক মিয়া, চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াই। গুলশানে এসে আইসক্রিম খেতে মুভ অ্যান্ড পিক-এ ঢুকি। বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে-বারোটা বাজে। দারোয়ান আমার গাড়ি দেখে গেট খোলে। পাশের বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড এবং দারোয়ানের সাথে সে গল্প করছিল। আমাকে দেখে সবার পিনপতন নীরবতা। সবগুলো চোখ চুম্বকের মতো আমার দিকে আটকে আছে, আমার বসন আলুথালু কীনা। মাতাল কিংবা সঙ্গমক্লান্ত এলোমেলো পদক্ষেপ কীনা সবাই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ঘরে ঢুকতেই বাবা পুরোমাত্রায় বিস্ফোরিত, ‘কালকের মধ্যে তুই আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাবি। আমারে মান-সম্মান নিয়া থাকতে দিবি না।’ মা জিজ্ঞাসা করে, ‘তুই মদ খাইছিস? এত রাত হইল ক্যান?’ কারো কথার জবাব না দিয়ে আমি আমার রুমে ঢুকে যাই।




২৭
আমাকে দেখলেই সবাই আমার যৌনজীবন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। কেউ আমাকে বহু পুরুষের সাথে কল্পনা করে বিনোদিত হয়, আবার কেউ হয়তো ভাবে, আহা, এই সুন্দর মেয়েটার কোনো সেক্স লাইফ নাই। ডিভোর্সের আট মাসের মাথায় সুদানের দারফুরে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থায় চাকরি হয়। বিদেশে চাকরির কথা শুনে মালিহা বেগম আমার মাকে বলেন, ‘আপনার মেয়ে একা একা বিদেশে চাকরি করতে যাবে কেন? লোকজন তো খারাপ বলে। বাংলাদেশে কি এনজিও, জাতিসংঘ এসব নাই? মেয়েরা স্বামী-ছাড়া একা থাকলে তার সাথে শয়তান চলে।’ তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, ‘লোকজন কিন্তু আপনার মেয়েকে নিয়ে অলরেডি বাজে কথা বলতে শুরু করছে। আপনার ভালো চাই বলে আমি সাবধান করে দিলাম। একটা ইয়াং মেয়ে আবার একা থাকে কেমন করে। আত্মীয়-স্বজনেরা তো বলে, যেহেতু একা থাকে, হয়তো পুরুষ বন্ধু-টন্ধু আছে। বয়স পঞ্চাশের ওপরে গেলে সিঙ্গেল মেয়েরা সিঙ্গেল থাকার মজা বুঝে। কেউ তাদের তখন দাম দেয় না।’ মা তার বোনের মেয়ের শাশুড়িকে না-চটিয়ে সব শুনে যায়। ফোন রেখে আমার সাথে চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তোলে, কেন আমি সংসার টিঁকিয়ে রাখতে পারলাম না।

মালিহা বেগমের স্বামী পিডব্লিউডির চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। সন্তানেরা সবাই সুপ্রতিষ্ঠিত। সারাদিন প্রায় তসবি জপার মতো জপতে থাকেন স্বামী চিফ ইঞ্জিনিয়ার, বড় ছেলে উপসচিব, একছেলে ডাক্তার, ছোট ছেলে ফরেন সার্ভিসে। ছেলেবউও ফরেন সার্ভিসে। রিকশাওয়ালা, ড্রাইভার, কাজের মেয়ে, বান্ধবী, সবজি বিক্রেতা, পড়শি, আত্মীয়-স্বজন, ছেলের নতুন বন্ধু, কাউকে বলতে বাদ দেন না।


আলমারির দরজা খুলতেই হ্যাঙারে সার সার শাড়ি ঝোলানো, সালোয়ার কামিজ, টপস ট্রাউজার্স। এক কোনায় রোমেলের একটা লেদার জ্যাকেট, স্ট্রাইপড দুইটা শার্ট, একটা নেভি-ব্লু ট্রাউজার্স। রাশি রাশি কাপড়ের ভিতর থেকে রোমেলের শান্ত, গম্ভীর, অহংকারী চোখ দু’টো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। হ্যাঙারসহ রোমেলের পোশাকগুলো নিয়ে মার ঘরে যাই। বারান্দায় নীল শাল-পরিবৃত মা ছুরি দিয়ে টবের মাটি আলগা করে দিচ্ছে। তার খোলা চুল হাওয়ায় উড়ছে। জিজ্ঞাসা করি, ‘এইগুলা জমায়া রাখছো কেন? কোনো গরিব মানুষকে দিয়ে দাও অথবা রোমেলকে পাঠায়া দাও। বাসার ড্রাইভার দিয়ে তার অফিসে পাঠায়া দিলেই হয়।’

হ্যাঙারসহ কাপড়গুলো মার বিছানার উপর ফেলে দেই। আমি যেন এতক্ষণ রোমেলকে স্পর্শ করে ছিলাম। মা বলে, ‘দেখিস, রোমেলই একদিন আসবে এগুলো নিতে। রোমেল তোর পাগলামি চিনে। সে যে তোরে ডিভোর্স করে ভুল করছে ছয়মাস, একবছরের মধ্যে সে বুঝতে পারবে এবং সে ফিরে আসবে।’ আমি বলি, ‘কী বলো তুমি? রোমেল আইসা দুঃখ প্রকাশ করলেই আমি তারে আবার বিয়ে করব?’
টগরফুলের বেগুনি রঙের দিকে তাকিয়ে মা বলে, ‘তোর যদি কোথাও প্রেম-ট্রেম না-থাকে আমি তো এতে দোষের কিছু দেখি না।’
আমি গলা চড়িয়ে বলি, 'প্লিজ মা, বন্ধ করো এসব।'


নীচে গ্যারাজে দেখা চারতলার লিপির স্বামীর সাথে। লিপিসহ এই ভদ্রলোক প্রায়ই আমাদের বাসায় আসে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মিশুক এবং আড্ডাবাজ, বোঝা যায়। এরা মার প্রায় ঘরের মানুষ হয়ে গেছে। মা, বাবা এবং আমাকে কয়েকবার ডিনারে বলেছে। গ্যারাজে আমাকে দেখেই শাফকাত সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘আজকে সন্ধ্যায় তো আসতেছেন আমার ছেলের জন্মদিনে?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, মা বলছে, সন্ধ্যায় আপনাদের বাসায় কী অনুষ্ঠান আছে, যাব ইনশাল্লাহ।’, চকচকে মেরুন এলিযন গাড়ির ভিতর থেকে লোকটা হাসিমুখে হাত নাড়ায়।

রিকশা নিয়ে গুলশান লেডিস পার্কে যাই। কোকিলের কুউ, বসন্তের মৃদু বাতাস, পার্কের দিঘির সবুজ জল আমাকে জাপানের ব্যালকনির কথা মনে করিয়ে দেয়। ঝরাপাতার স্তূপ মাড়িয়ে পাথুরে বেদিকায় বসি। আমার অদূরে আরেকটি বেদিতে বসে শ্বেতবসনা এক নারী মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছে। নানা রংয়ের মানুষের আসা-যাওয়া দেখে দেড় ঘণ্টা পার করে দেই। সন্ধ্যায় মা আমাকে লিপির বাসায় পাঠায়। বাবার প্রেশার, মায়েরও শরীর খারাপ, বাসা থেকে অন্তত একজনের অবশ্যই যাওয়া উচিত। লিপির বাসায় গিয়ে দেখি আমিই সবার আগে চলে এসেছি। অতিথিরা কেউ আসে নাই। লিপি তখনও রান্নায় ব্যস্ত। শাফকাত সাহেব আমার সাথে গল্প করে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘর্মাক্ত লিপি রান্না শেষ হতে দেরি হওয়ার দুঃখ প্রকাশ করে। শাফকাত জিনস আর কমলা টি-শার্ট পরেছে। সেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র। আমার কয়েক বছরের সিনিয়র। আমাকে বলে, ‘খালাম্মা বললেন, আপনার ডিভোর্স হয়ে গেছে? ভালো করেছেন, অ্যাডজাস্ট না করলে একা থাকাই উচিত। গাজীপুরে আমার একটা ফার্মহাউজ আছে। আমরা বন্ধু-বান্ধবরা ছুটির দিনে আড্ডা মারতে যাই। চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন।’ বলে সে আমার হাতটা টেনে তার মুঠির ভিতর নিতে চায়। ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে বলি, ‘আপনার সাথে আমি যাব কেন?’
‘না। না। আমি একা তো না। আমার আরো বন্ধুরা যায়। সরি, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি ভাবছি, আপনি হয়তো লোনলি আর বোরড হয়ে গেছেন ঢাকায় থাকতে থাকতে। তবে লিপি আমাকে ছুটির দিনে বাসা থেকে ছাড়তেই চায় না। সেদিন অন্তত সাত-আটবার আমাদের সেক্স হয়। আমি আসলে এটা মিন করতে চাইছি, শি ইজ রিয়েলি অ্যাট্রাকটিভ অ্যান্ড সেক্সি।'
আমি বলি, ‘আমি বাসায় চলে যাই। আমার ভালো লাগতেছে না। অতিথিরা সবাই এলে আমাকে আবার ডাকবেন।’
‘আরে কী বলেন, বাইরের অতিথি কেউ নাই। আমাদের ঘরের লোকজনই। আমি লিপিকে পাঠাইতেছি।’ বলে সে উঠে যায়।





২৮
দারফুরে গিয়ে আমি নিজেকে ফিরে পাই। আইডিপি ক্যাম্পে খরাপীড়িত, যুদ্ধপীড়িত মানুষের সাথে কর্মব্যস্ততায় সময় কেটে যায়। আমার নিজের সাথে নিজের সংযোগের সময় হয় সন্ধ্যায়, যখন মরুভূমিতে সূর্যের তেজ অপসৃত হয়ে গোধূলির ঝিরঝির বাতাস। তারপর রাত্রিভর। ভারতীয় এক বন্ধু টগর আর গাঁদা ফুলের চারা আমার বাড়িতে লাগিয়েছে। সকাল বিকাল পানি দেই। জুলাই-অগাস্টে বৃষ্টির পানি পেয়ে গাছগুলো হলুদ, বেগুনি, সাদা ফুলে ভরে ওঠে। অফিস থেকে ফিরে দেখি শত শত সাদা প্রজাপতি মিছিল করে আমার মাথার উপর উড়ে বেড়াচ্ছে। এক সন্ধ্যায় গেটে ঢুকতেই দেখি উঠানে ঝাঁক বেঁধে সাদা প্রজাপতি নামছে। এরা স্বল্পতম সময়ে আমার মুখ, মাথার চারপাশ, চারপাশের সব ফাঁকা জায়গা দখল করে ফ্যালে।

মাঝে মাঝে দূর-দূরান্তের নানা আইডিপি ক্যাম্পে যাই মরুভূমির ধুলা উড়িয়ে। পথে পথে ছড়িয়ে থাকে কত যে রূপ, কত বৈচিত্র্য। প্রহরায় থাকে খোলা মেশিনগান নিয়ে সুদানি নিরাপত্তা কর্মীরা। কখনো পেরিয়ে যাই সরকারি গোলাবর্ষণে পুড়ে-যাওয়া কালো মাঠ, সরকারি বিদ্রোহে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ট্রাক, কখনো ঢুকি দুর্গম শৈলমালায়। মনুষ্যনির্মিত স্থাপত্যের ন্যায় নানা বিভঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকে লাল পাথুরে শৈলশৃঙ্গ। কোথাও বিশাল কাছিমের পিঠের মতো লাল পাথর। কোথাও কোথাও পথের দু’পাশে বুক-সমান উঁচু ঘাসের নির্জন অলিতে-গলিতে রৌদ্রচূর্ণ। ঘাসের রং সবুজ নয়। সাদাটে সোনালি। ব্লন্ড মেয়েদের চুলের মতো ঘাসের সমুদ্র। বর্ষায় গজিয়ে ওঠা ঘাসগুলো শুষ্ক মৌসুমে মরে যাবার সময় সাদাটে সোনালি হয়ে যায়। আবার কোথাও ধুধু মরুভূমি। মাঝে দু’চারটা কাঁটাওয়ালা গাছ দাঁড়িয়ে থাকে।

সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে আমরা দেবদূতের মতো সুসজ্জিত মানুষগুলো দামি গাড়ি থেকে নেমে এলে কৃশ থেকে কৃশকায় হতে থাকা স্থানীয় মানুষগুলো শূন্য দৃষ্টি মেলে দ্যাখে আমাদের। ধুলামলিন, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষগুলো তাদের নানা অভাব, কষ্টের কথা বলে। আরো বলে স্বজনদের মৃত্যুর কথা। তাদের নারীদের সরকারি এবং বিদ্রোহীদের হাতে বহুবার ধর্ষিত হওয়ার কথা। বার বার উন্মূল হয়ে যাওয়ার কথা। যেখানে তাদের বাড়িঘর, পূর্বপুরুষের চিহ্ন ছিল, সব এখন বিরানভূমি। সে-সব গ্রামে জনমানুষের চিহ্ন নাই। মৃত নয়, জীবিত মানুষগুলোরও কারো কারো মুখ, শরীর ঢাকা থাকে মাছিতে। দীর্ঘদিন গোসল না-করায়। পানির অভাব এখানে এতই প্রকট যে সদ্যোভূমিষ্ঠ সন্তানকেও অনেকে গোসল করাতে পারে না।

ছুটির দিনগুলিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেই। একাকিত্বে কখনো ক্লান্ত হয়ে গেলে ফ্রিজ থেকে চকোলেট বার অথবা আইসক্রিম বের করে খাই। আমার বাসাটি চতুর্দিকে উঁচু দেয়ালে ঘেরা এবং দেয়ালে প্যাঁচানো কাঁটাতারের বেড়া এবং শক্ত লোহার গেটে নিরাপত্তা নিশ্চিদ্র করা হয়েছে। বাইরে উঠানে একটা খাট পেতে রেখেছি। পুরো শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে গেলে জেনারেটর চালু না করে খোলা আকাশের নীচে জোছনার সমুদ্রে শুয়ে থাকি। অমাবশ্যায় আকাশ জুড়ে ফুটে থাকে শত সহস্র গ্রহ-নক্ষত্র। এত নক্ষত্র আমি জীবনে দেখি নাই। রোজহাশরের মতো আকাশ যেন মাথার উপর নেমে এসেছে। কখনো উল্কাপাতও হয়। কখনো মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে ধূমকেতু, নক্ষত্রপুঞ্জে ঝড় উঠবে। রাতে কুকুরের কান্না, আশপাশের বাড়ির গাধাদের অপার্থিব সুরে আর্তনাদ আর রাত্রির আলো-ছায়ার কাঁপনে আমার শরীরে কাঁটা দেয়। দেয়ালের বাইরে পর পর কয়েকটি গুলির শব্দ হয়। অথবা দূরে শহরে বাজারের দিকে সরকারি বিদ্রোহীরা একে৪৭-এ গুলি-বিনিময় করতে থাকে। কখনো মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে দেখি কী দ্রুত চাঁদকে পেরিয়ে মেঘেরা সাঁতরে যাচ্ছে। আবার কখনো দেখি চাঁদের চারপাশে বৃত্তাকারে মেঘ জমে জমে সোনালি বলয় তৈরি হয়ে আছে।




২৯
সুদান থেকে প্রথম ছুটিতেই জাপানে যাই। মিনামি কুসাৎসু শহরে ট্রেন থেকে নামলেই এই শহরের পথঘাট, সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো, আমার আড়াই বছরের অন্তরঙ্গ জীবন, সব আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ট্যাক্সি নিয়ে এক্সেলশিয়রের সামনে নামি। লিফটে উপরে উঠে চারশ‐বারো নম্বরে বেল টিপি। কেউ দরজা খোলে না। দিনের বেলা হয়তো এই রুমের বাসিন্দা ভার্সিটিতে বা কাজে গেছে। নীচে নেমে সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশে ছোট পার্কে কিছুসময় অপেক্ষা করি। নীচতলার ক্যাফেতে সন্ধ্যায় ডিনার সারি। সন্ধ্যার পর আবার চারশ-বারোতে চলে যাই। এইবার বেল টিপলে দরজা খুলে যায়। দক্ষিণ এশীয় চেহারার এক তরুণ দরজায় দাঁড়িয়ে। আমি তাকে বলি, ‘দুই বছর আমি এই রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। এখানে পড়ার সময়ে তোমার এই ফ্ল্যাটে থাকতাম। যদি কিছু মনে না করো, আমি কি কিছুক্ষণ তোমার ব্যালকনিতে বসে সময় কাটাতে পারি?’ সে আন্তরিকভাবে আমাকে অভ্যর্থনা জানায়। রান্নাঘর আর বাথরুমের মাঝখানের প্যাসেজটুকু আর বেডরুম পেরিয়ে সোজা ব্যালকনিতে যাই। ব্যালকনিতে আমার দু’চোখে পানি জমে। আমার সবুজ জলের পুকুর। মেঘের মুকুট-পরা আমার নীল পাহাড়, আমার পুকুরপাড়ের গাছ, লতার ভেষজ গন্ধ, দূরের হ্রদ, এই ব্যালকনিতে বসে কাটিয়ে দেয়া আমার অনন্তকাল, আমার পৃথিবী আবার ঝিকমিকিয়ে ওঠে। তরুণটি আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘আমার নাম অঙ্কুজ, আমি ভারতীয়। কিন্তু বড় হয়েছি জেনোয়াতে। এখানে অর্থনীতি পড়ছি।’ অঙ্কুজকে সরাসরি বলি, ‘আমি কিছুদিন সেতায় একটা হোটেলে থাকব। তুমি কি আমাকে বিকালে বা সন্ধ্যার পর এসে তোমার ব্যালকনিতে বসার অনুমতি দিবে?’

আমার মুখের দিকে নিষ্কম্প তাকিয়ে থাকে। তাঁর চোখে তাকিয়ে আমার গায়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। সুদীর্ঘকাল নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের চোখের নিঃসঙ্গতা তার চোখ গলে নামছে। আমাকে বলে, ‘ঠিক আছে, তুমি এসো।’ সে রুমের ভিতর চলে যায়। আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে সন্ধ্যা-নামা উপভোগ করি। কয়েকটা ফুলঝুড়ি পাখি মাথার উপর বাতাসে তাল মিলিয়ে নাচছে। একটা ট্রেনের আওয়াজ সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা পিছলে মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। সন্ধ্যার আকাশ তখন ভ্যানগগের ছবি। দূরের হ্রদ, পুকুরের জল, হ্রদে-ভাসা হাঁস, সবাই রং বদলায়। আকাশে উড্ডীন পাখিরা তাদের গতি বদল করে, দূরে মিলিয়ে যেতে থাকা বুলেট ট্রেনও। পরদিন বিকালে ব্যালকনিতে বসে লোকটাকে দেখি একই ভঙ্গিতে বসে আছে। পুকুরে ছিপ ফেলে বসে থাকা লোকটি অরণ্যের গায়ে অন্ধকার রং ধারণ করে। ঝুপ করে বৃষ্টি নামে। সোঁদা মাটির সুমিষ্ট গন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করে।





৩০
তার পরদিন বেল চাপলে ভারি পর্দা-টানা নিকষ অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে অঙ্কুজ দরজা খোলে। আমি বলি, ‘ঘুমিয়ে ছিলে?’ সে বলে, ‘না, পড়ালেখা না-থাকলে অন্ধকার ঘরেই আমি থাকি। অন্ধকারে ক্লান্ত হয়ে উঠলে ব্যালকনিতে বসি।’ আমাকে ব্যালকনিতে নিয়ে বসায়। ‘এখানে এত আলো চোখে লাগে! দীর্ঘসময় এত ঝকঝকে আলো আমার সহ্য হয় না। পুকুরপাড়ে স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ঐ যে যেখানে আগাছা জঙ্গলে ছাওয়া অন্ধকার যেখানে জমাট বেঁধেছে, হাত-পা ছড়িয়ে ওখানে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। বিশেষ করে রাতের বেলায় রাতজাগা পাখি অথবা ঝিঁঝিপোকার নিনাদ যখন সপ্তমে, তখন আমার ঐ স্থানটিকে শুনশান কবর মনে হয়। এই কবরে শুয়ে থাকতে মন চায়। যদিও কোনোদিন ওখানে যাই নাই, সাপখোপের ভয়ে।’

অঙ্কুজ বলে, ‘তুমি ছাড়াও এই ব্যালকনিতে কোজু নামের আরেকটা ছেলে আসে। এক-দুই সপ্তাহ পর পর। সেও এই ফ্ল্যাটে থাকত।’ আমি বলি, ‘আমি যখন এখানে থাকতাম তখনও কোজু আসত। আমার সমস্যা ঠিক কোজুর মতোই।’
‘কিন্তু আমাকে ব্যালকনি খুবএকটা টানে না,’ বলে অঙ্কুজ ভিতরে চলে যায়। এই দালানের সিকিউরিটি লাইটের আলো পড়ে পুকুরের একপাশের জলকে হলুদাভ-সবুজ করে তুলেছে। হালকা বাতাস সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউ ভাঙার মতো আমার শরীরে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে বাঁশবনের মর্মর, গাছগাছালির ভেষজ গন্ধ ফিরে এসেছে। কাছেই হ্রদের উপর মানুষকে বিভ্রান্ত করার মতো রুপালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে চাঁদ।

অঙ্কুজের রুমে ভারতীয় রাগসঙ্গীত বাজছে। ঘরে আলো জ্বেলে বিছানায় হেলান দিয়ে ‘এমবেডেড অটোনমি’ নামের একটা বই পড়ছে সে। জানতে চায় আমি তার সাথে ডিনার করব কীনা। আমি না করি। তাকে বলি, ‘এখন তো দিব্যি ঝলমলে আলোর নীচে তুমি। তোমাকে আলোতে অনেক উজ্জ্বল দেখায়। অন্য আরেকদিন খাব।’
‘রান্না আর অন্য কাজের সময় বৈদ্যুতিক আলো, দিনের আলোয় আমার ঘর ভর্তি থাকে। যখন রিলাক্সড থাকি, ঘর অন্ধকার করে গান শুনি। গানের সুর আর বাণী আমি স্পর্শ করতে পারি। প্রচুর ক্ল্যাসিকাল শুনি। পশ্চিমা, ভারতীয়, আর অপেরাও শুনি। মার্গ সঙ্গীত শোনার সময় বহুবার এমন হয়েছে, আমার ঘরে রঙধনুর সব রঙ খেলা করে।’

ঘর থেকে বেরুবার আগে বলি, ‘কিছু মনে কোরো না। আগামিকাল বা পরশু বিকালে তুমি কি বাইরে যাবে? আমি অল্প যে কয়দিন আছি তুমি যদি বাসায় থাকো এবং ব্যস্ত না থাকো, আমি আসব তোমার এখানে।’
‘তোমার যখন মন চায় এসো।’ কোজুও এখন এসে ব্যালকনিতে বসে থাকে। তোমাদের সমস্যাগুলো আমি বুঝি।’ অঙ্কুজ বলে। অঙ্কুজ আমাকে নীচতলার সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।

ঢালু পথ বেয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে বাড়িটার দিকে ফিরে তাকাই। এটা আর আমার না। লাইফ উইল নট বি দ্য সেম এগেন। খোলা আকাশের নীচে একটা বেঞ্চিতে বসে থাকি। এটাই বাসস্ট্যান্ড। বেঞ্চির পাশে একটা বোর্ডে বাসের সময়সূচি লেখা। সেতাগামী একটা বাস চলে যায়। আমি উঠি না। বসেই থাকি। আধঘণ্টা পর আরেকটা বাস আসবে। মফস্বলের এই বাসস্ট্যান্ডে আমি ছাড়া অন্য কোনো যাত্রী নাই। ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে অসংখ্য পোকা জড়ো হয়েছে।




৩১
পরদিন দুপুরের পর অঙ্কুজের দরজা নক করলে ঘোরকৃষ্ণ আঁধারের পেটের ভিতর থেকে সে বের হয়। বাইরের আলোয় তার চোখ যেন ধাঁধিয়ে যায়। প্লাবিত জলের মতো ভেসে আসে তার ঘরে বাজতে থাকা অপেরার শব্দ। চোখ কুঁচকে বলে, ‘সোজা ব্যালকনিতে চলে যাও। আমার ঘরে একবিন্দু আলো ঢুকুক আমি চাই না।’

শান্ত বনতল। মেপল, ওক এবং বাঁশঝাড়ের ঝরাপাতায় পুকুরপাড়ের মাটি ঢাকা। হলুদ বোলতা দরজার চৌকাঠে ভনভন করে। সন্ধ্যার পর অঙ্কুজ ব্যালকনিতে আসে। আমাকে রাতের খাবারে আমন্ত্রণ জানায়। প্রতিদিন রাতের খাবারের সময় আমি বেরিয়ে যাই এটি তার কাছে অশোভন ঠ্যাকে বোধ হয়। ডিনার টেবিলে বলে, ‘দুপুরে তোমার সাথে ঠিকমতো কথা না বলে সোজা ব্যালকনিতে পাঠিয়ে দিলাম বলে কিছু মনে করো নাই তো? আমি সঙ্গীতে বুঁদ হয়ে ছিলাম। আমি বলি, ‘না, আমি বরং তোমার প্রাইভেসি নষ্ট করছি।’
অঙ্কুজ বলে, ‘না, এতে আমার খুবএকটা সমস্যা হয় না। কোজু আমার বাসায় ঘন ঘন আসত। একসময় দুই-তিন মাস পর পর আসত। মাঝে কিছুদিন প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার। আমার সাথে খুবএকটা কথা হতো না। লাজুক ভঙ্গিতে বেল টিপে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত। আমি বলতাম “সরাসরি ব্যালকনিতে চলে যাও।” রাতের দিকে কোনো একটা সময়ে মাথা ঝুঁকিয়ে আরিগাতো বলে বেরিয়ে যেত। গত তিন-চার মাস ধরে একবারও আসছে না। ফোন করলে ফোন বন্ধ পাচ্ছি। শেষ দিকে সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে বিড়বিড় করে কিছু বলত। তবে তোমাকে দেখার পর আমার আশঙ্কা হয়— আমিও তোমার মতো ব্যালকনির নেশায় পড়ে যাই কীনা।’
আমি বলি, ‘এরপর আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিকা সবার সাথে তোমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকবে। শুধুমাত্র এই ফ্ল্যাটের এই ব্যালকনিতে আসার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক চুকে গেছে আমার। তারা সবাই সন্দেহ করে আমি কোনো প্রেমিকের টানে জাপানে ছুটে আসি।’
অঙ্কুজ বলে, ‘দ্যাখো, নৈঃশব্দ্য আমার ভালো লাগে না। ব্যালকনি আমাকে টানে না। যা টানে তা নিকষ অন্ধকারে গান শোনা। আঁধার ঘরে গানের সুর থেকে নানা বর্ণের আলো ছড়ায়। আজ বিকালেই তুমি যখন এলে তখন এই অপেরার সুর থেকে নীলচে বেগুনি আলো বের হচ্ছিল। কোনো কোনো গানের সুরে সাত রঙের আলোর নাচন শুরু হয় আমার ঘর জুড়ে। এর মাঝে একটুখানি বাইরের আলো ঢুকলেই রঙের ঝর্নাধারা অদৃশ্য হয়ে যায়।’
আমি বলি, ‘কবে থেকে তুমি এমন সঙ্গীত-পাগল?’
‘আশৈশব। আমার মা আমাকে বই এবং সঙ্গীতে আগ্রহী করতে হেন চেষ্টা নাই করেনি। আমার কোনো বন্ধু নাই। প্রেমিকা নাই। মা ছাড়া আত্মীয়-পরিজন কেউ নাই। মায়ের সাথে ফোনে কথা বলি। বলতে গেলে আর-কারো সঙ্গেই আমার কথা হয় না।’
আমি বলি, ‘কোনো বন্ধু, প্রেম, গার্লফ্রেন্ড?’
‘না কোনোদিন প্রেম বা গার্লফ্রেন্ড হয়নি। ঘর অন্ধকার করে আমি গান শুনি এটা শুনে যে কেউ আমাকে অদ্ভুত চোখে দ্যাখে। তাদের ফ্যালফ্যাল চোখের সামনে আমি কুঁকড়ে যাই। নিজেকে ওভাবেই তৈরি করে নিয়েছি। কারো প্রতিই কোনো প্রেমভাব আর জাগে না। আমার মায়ের সাথে বাবার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল আমার বয়স যখন পাঁচ। মা জেনোয়ায় জাতিসংঘে কাজ করতেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করলেও মা ছিল আপাদমস্তক ভারতীয়। একেবারে সনাতনপন্থী। ভারতীয় খাবার ছাড়া অন্য কোনো খাবার খেতে পারত না। মা চাইত আমি অমর লেখক বা সঙ্গীতজ্ঞ হই। বই এবং সঙ্গীতে ডুবিয়ে রাখত। আমি এখন গানের ভিতরই কাটাই দিনরাতের বেশিরভাগ সময়। প্রচুর বইও পড়ি। কিন্তু লেখক বা সঙ্গীতজ্ঞ কোনোটাই হইনি। মা ভারতীয় কমিউনিটিতেও মিশত না। ডিভোর্সি বলে সুইজারল্যান্ডের ভারতীয়রা বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করত। মা তাদের সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলত। মা তার অফিস-সহকর্মী সাদা-চামড়ার কারো সাথেও অফিসের বাইরে মিশত না। বলত, ওরা বর্ণবাদী। অফিস শেষ হলে সোজা বাড়ি চলে আসত। মায়ের পৃথিবী ছিল পুত্রময়। জাতিসংঘে কাজ করার সময় কোনো বর্ণবাদী সহকর্মী মায়ের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করে, তাকে কুৎসিতভাবে অপমান করে। চাকরি হারাতে পারে দেখে মা কোনো অভিযোগ করে নাই। এর পর থেকে মায়ের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায় সাদা-চামড়া মাত্রই বর্ণবাদী। অফিসে প্রয়োজনীয় কাজের বাইরে কারো সাথে কথাও বলত না। তার সমস্ত সাধনা আর আয়োজন ছিল আমাকে গড়ে তোলার। আমার জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা ধরনের গানের কালেকশন করেছিল। ভারতীয় রাগসঙ্গীত শেখানোর জন্য মা আমাকে নিয়ে অফিস থেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে ভারত গিয়েছিল। ছয় মাস গানের ওস্তাদের বাড়িতে যাওয়া এবং আমার গান-সাধনার তত্ত্বাবধান ছাড়া মা আর কিছুই করেনি। বড় লেখক বানানোর জন্যও মা এমন কিছু নাই করেনি। আমাকে বলত, “জীবনের কাছে আমি সবদিক দিয়ে পরাজিত, সবখানে মিসফিট। ইন্ডিয়াতেও আমি অ্যাডজাস্ট করতে পারি না, ইয়োরোপেও নিজেকে অনাহূত মনে হয় সবসময়। বাবা, তুইই আমাকে জিতিয়ে দিবি।” অথচ আমি লেখক বা সঙ্গীতজ্ঞ কোনোটাই হলাম না। খালি গান-পাগল হয়েছি আর বই পড়ি। শেষদিকে আমাকে নিয়ে আফসোস আর দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে। একটা সময় আমাকে নিয়ে কী সীমাহীন কষ্ট সে করেছে। তখনো জাতিসংঘে তার চাকরি হয় নাই।’




৩২
অঙ্কুজ বলে চলে, ‘মা একদিন অফিস থেকে ফিরে চোখের পানি মুছছিল। সেদিন তাকে নাকি স্টাফ কাউন্সিলর তার অফিসে ডেকেছে, বলেছে, “তুমি কখনো হাসো না। সারাক্ষণ গোমড়ামুখো বলে অফিসের অন্যান্য সহকর্মীরা তোমাকে নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে থাকে। তুমি কি কোনো কারণে হতাশাগ্রস্ত?” মা জবাব দেয়, “আমি গোমড়ামুখো হলেও কোথাও কাজ কম করেছি এমন কোনো উদাহরণ আছে?”’

অঙ্কুজের দুই চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। দুপুরে অন্ধকার ঘরে তাকে যেমন ফ্যাকাশে আর বয়স্ক মনে হচ্ছিল, সেই বয়স্কভাব খানিকটা তিরোহিত হয়েছে। দু’-তিন দিন শেভ করেনি। হয়তো মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকার কারণে বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখায় তাকে। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে আজ তাকে বেশি উচ্ছল দেখাচ্ছে। হতে পারে মা তার খুব প্রিয় প্রসঙ্গ।

খেতে খেতে মনোযোগী শ্রোতার হয়ে অঙ্কুজের কথা শুনি। কথা বলা থামিয়ে সে খাবারে মন দেয়। ঝটপট প্লেটের খাবার শেষ করে। আমার মাথার পিছনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুসময়। মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘আমার মায়ের অদ্ভুত নানা সমস্যা। স্কুল জীবনে সাদা-চামড়ার কোনো ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হলে মা রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ত। আমি নাকি আমার লেখক হওয়া, সঙ্গীতজ্ঞ হওয়া, সব উদ্দেশ্য থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছি, কয়দিন পর শরীরসর্বস্ব হয়ে পড়ব। এদের সাথে মিশলে স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছু আমার মাথায় থাকবে না; পড়ালেখা, সাধনা সব শিকায় উঠবে— এমন অসহ্য বিলাপ, হৈচৈ শুরু করত যে আমি নাকে খত দিতাম আর বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যেতাম। এভাবেই আমার নিঃসঙ্গতার শুরু। মা ছিলেন হিমবাহের মতো কঠিন এবং অমিশুক একজন মানুষ। ঘরের দরজা বন্ধ করে সঙ্গীতে আশ্রয় নিয়েছি, এতে অন্তত মা খুশি হয়েছে। সে হয়তো ভাবত তার পুত্রের লেখক বা সঙ্গীতজ্ঞ হওয়ার পথে আর কোনো বাধা নাই।’
অঙ্কুজ বলে, ‘ভারতীয় রাগসঙ্গীত শুনতে শুনতে প্রথম নীলচে-বেগুনি আলোর রেখা ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে যেতে দেখি। এই ঝর্নাধারা কখনো ঘরের কোথাও স্থির হয়, তো পরমুহূর্তে পুরো ঘরে ঘূর্ণি তোলে। মায়ের ডাকাডাকিতে দরজা খুললে উধাও হয়ে যায়। এর পর যে গানেই আমি আঁধারে পুরোদস্তুর বুঁদ হই, কোথা থেকে দৃশ্যমান হয় আলোর এই ঘূর্ণন।’

অঙ্কুজের ঘরের মেঝেতে পুরুস্তরের ধুলা জমেছে। ধুলার মাঝে টেবিলের কোনায় মাইল্ড সেভেনের দুইটা শূন্য প্যাকেট গড়াগড়ি খাচ্ছে।




৩৩
জাপান ছাড়ার আগের শেষ দুই দিন দুপুরের সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে পুরোসময় অঙ্কুজের ব্যালকনিতেই কাটাই। রাত আটটার দিকে অন্ধকার ঘরের কাচের দরজা ঠেলে ব্যালকনিতে সে আমার সাথে যোগ দেয়। দরজা গলিয়ে চাঁদের আলো তার ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে আলোছায়ার আলপনা এঁকেছে। আমি বলি, ‘দ্যাখো, তুমি অন্তত ব্যালকনির ব্যাপারে নেশাগ্রস্ত হও নাই, তাইতেই অন্তত তোমার মায়ের সাথে তোমার সম্পর্ক টিঁকে আছে।’ অঙ্কুজ বলে, ‘মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার জন্যই আমি ইয়োরোপের কোথাও ভর্তি না হয়ে জাপানে চলে এসেছি। মা চাইছিল ইয়োরোপে কোনো নামী মিউজিক স্কুলে আমি পড়ি। কিন্তু ততদিনে আমি নিশ্চিত জানি, গান শোনায় আমার যত আগ্রহ, গান শেখার ব্যাপারে তার কিয়দংশও নাই। তারুণ্যে পৌঁছার আগেই মা আমাকে সম্পূর্ণ বন্ধুহীন করেছে। স্কুলের ক্লাসের পরে ঘড়ি ধরে বাড়ি পৌঁছাতে হতো। মায়ের ধারণা, মা ছাড়া অন্য যে কোনো বন্ধু আমাকে বিপথে চালিত করবে। কয়েক বছরে মা যখন নিশ্চিত হয় আমি সম্পূর্ণ বন্ধুহীন, মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে প্রায় অক্ষম, সে নিজেই আমাকে একদিন নিচুস্বরে বলে, “তুমি একটা প্রেম-ট্রেম করো। এই বয়সে সবার তো গার্লফ্রেন্ড থাকে।” আমি যে এক-দুইজন মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করি নাই, তা নয়, কিন্তু আমি আঁধার ঘরে গান শুনি— এটা জেনে আমাকে ছেড়ে যায় সবাই। জাপানে এক মেয়েকে আমার বাসায় এনে ঘর অন্ধকার করে গান ছেড়ে দেই। বলি, “দেখো সুরের সাথে তৈরি হবে আলোর ঝর্নাধারা। রঙধনুর সাত রঙেরই ঘূর্ণবাত্যা তৈরি হবে।” ঐ মেয়ে আমার দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকায় আর শরীর খারাপ লাগছে বলে প্রায় দৌড়ে আমার বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।
‘একটা সময় নারীসঙ্গ যে একেবারে টানত না তা না, কিন্তু আমি জানি আমি আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো না, কোনো মেয়েই আমার সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে না, অন্ধকারে আমার জীবনযাপন নিয়ে বিস্মিত হবে, অদ্ভুত তাকাবে, আমাকে বদলাতে বলবে। এখন আর কোনো মেয়ে আমাকে আকর্ষণ করে না। নিজেকে ওভাবে তৈরি করে নিয়েছি।’

জিজ্ঞাসা করি, ‘একবারও কারো প্রেমে পড়ো নাই?’
অঙ্কুজ মাথা নাড়ে, ‘নাহ্, আমার যে বয়সে প্রেম হবার কথা সেই বয়সে মা কোনো মেয়ের সাথে মিশতে দেখলে কী যে উন্মাদের মতো আচরণ করত। মাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমারও খুব অসহায় লাগত। মা কাঁদছে এটা সহ্য করতে পারতাম না, অথচ আজ আমি মায়ের কাছ থেকে দূরে সরার জন্য জাপান চলে এসেছি। জাতিসংঘে চাকরি পাওয়ার আগে মা কী যে কষ্ট করে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছে চিন্তা করতে পারবে না। একটা ছোট এনজিওতে কাজ করত অল্প বেতনে। আমার দামি স্কুলের খরচ জোগাতে অফিসের পর টিউশনি করত। জাতিসংঘে চাকরির জন্য তখনই দরখাস্ত করে। মা আমাকে সবচেয়ে দামি স্কুলে পড়াত। জাতিসংঘে চাকরি পাওয়ার ঠিক আগের বছর, ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন, স্কুলে দরিদ্র ভালো ছাত্রদের স্কলারশিপ দিবে। স্কলারশিপ ইন্টারভিউ বোর্ড আমাকে জিজ্ঞাসা করে বাবার পেশা কী। আমি বলি, বাবা ইঞ্জিনিয়ার। মা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পই পই বলে দিয়েছিল, বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে, বাবা আমার কোনো খবর নেয় না, কম-বেতনে চাকুরে মা হিমশিম খাচ্ছে আমার পড়ালেখা চালিয়ে নিতে, এসব যেন বলি।’

অঙ্কুজ বলে, ‘বাবা ইঞ্জিনিয়ার শুনে ইন্টারভিউ বোর্ডের একজন বলেন, “বাহ্! তোমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার, তোমার কেন স্কলারশিপের দরকার। ইয়োর ফাদার শুড বি ওয়েল-অফ!” যে বাবা আর খোঁজ নেয় না, তাকে নিয়ে মনে মনে তখন গর্ব বোধ করি। আমি আর বলি না আমার বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়েছে। গর্বিত সন্তানের মতোই হাসিমুখে রুম থেকে বের হই।
‘সন্ধ্যায় মাকে যখন জানাই আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার বলে আমাকে স্কলারশিপ দেয়নি, মা জিজ্ঞাসা করে, “তুমি বলোনি বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে?” আমি বলি, “ডিভোর্স শুনে ওরা অনেকগুলো প্রশ্ন করত। এসব নিয়ে কথা বলতে মন চায়নি।” রাগ আর হতাশায় ভেঙে পড়ে মা কাঁদে। আমাকে বলে, “তোর স্কুলে যাওয়া বন্ধ, বাড়ির কাছের সরকারি স্কুলে পড়বি তুই। প্রাইভেট স্কুলে তোকে আর পাঠাতে পারব না। তা নইলে তোর ইঞ্জিনিয়ার বাবার কাছে চলে যা। তোকে কি আমি ভিক্ষা করে পড়াব?” কল্পনায় দেখি ঝাঁকড়া চুলের পাগলির মতো মা থালা হাতে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভিতর পাতলা হয়ে যাওয়া পুরনো কাপড়-পরা, মাংসহীন শীর্ণ শরীর, বসে-যাওয়া চোখ, চোয়ালের উঁচু হাড়সহ মাকে সাজগোজ-ছাড়া ভিক্ষুকের মতোই দেখায়।’

ব্যালকনির সুখস্মৃতি আর অঙ্কুজের বন্ধুত্ব নিয়ে আমার কর্মস্থল সুদানে ফিরে যাই। অঙ্কুজের সাথে ইমেইলে যোগাযোগ হতে থাকে।




৩৪
মা-বাবার পিড়াপিড়িতে প্রায় বছরখানেক পর ঢাকায় যাই। বাবা ফোনে বার বার বলে, ‘আমার শরীর ভালো যাইতেছে না, ব্লাড প্রেশার হাই যাইতেছে। কিছুদিনের জন্য হলেও বাংলাদেশে একবার ঘুরে যা।’

ঢাকায় ফিরে দেখি মা পোতানো মুড়ির মতো চুপসে গেছে। বাবা তিন-চার মাস যাবৎ তাবলিগে ঢুকেছে, অষ্টপ্রহর মসজিদে পড়ে থাকে। তবে বাড়ির কাজের বুয়া কাকলির মায়ের সাথে মায়ের সহজ সম্পর্ক দেখে আমার মনে হলো, মা আগে যেভাবে কাজের মানুষ বা ছোটলোকদের সামনে রাশভারি ব্যক্তিত্ব ঝুলিয়ে রাখত তা আর করে না এখন। আমার ছোটলোক-বিদ্বেষী মা এখন কাকলির মার সাথে বসে টিভি সিরিয়াল দ্যাখে। সিরিয়াল নিয়ে অবসরে দু’জনে আলোচনাও করে। সম্ভবত চাকরি ছাড়ার ফল। মা এমনিতেই অফিসে নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসছিল, তারপর আমার ডিভোর্স নিয়ে গুজুরগুজুর-ফুসুরফুসুর শুরু হলে কর্মক্ষেত্র তার কাছে অসহ্য হয়ে পড়ে। তবে এমনিতে মিলমিশ হলেও, মাথায় চড়ে বসতে চাইলেই মা কাজের লোকদের বাপের নাম ভুলিয়ে দেয় এখনো।

মা আলমারি থেকে বের করে ঈদে কেনা তার শাড়ি দেখায়। কালচে-নীল রঙের ভেজিটেবল-ডাই করা শাড়ি। আমি বলি, ‘বাহ্! কী সুন্দর!’ মা বলে, ‘তুই নিয়ে যা। আমার অনেক আছে।’ আলমারিতে সার সার সাজানো মার সুতি-জামদানি শাড়ি দেখি। হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে মা ঘোষণা দেয়, ‘রোমেলকে আমি মাস-দুয়েক আগে ফোন করছিলাম তার শরীরের খোঁজ খবর নিতে। এর আগে আমি খোঁজ নিয়ে জানছি সে এখনো বিয়ে করে নাই। আমার ফোন পেয়ে এত খুশি হইছে! তোর বাবার আর আমার শরীরের খোঁজ নিল। তুই কেমন আছিস, জানতে চাইল।’
আমি বলি, ‘দুই মাস ধরে আমাকে জানাও নাই কেন?’
‘আমি ভাবছি তুই হয়তো আমার উপর খেপে যাবি। আর দেশে আসবি না।’

আমি বলি, ‘আচ্ছা মা, রোমেলের ব্যাপারে কী চাও তুমি?’
‘দ্যাখ, রোমেলকে কিন্তু এবার খুব নরম মনে হইছে। আমাকে দুইবার বলল, “আপনি ফোন করায় আমি খুব খুশি হইছি মা।” তারপর আরেকদিনও ফোন করে খোঁজখবর করল। আমার মনে হয় তুই চাইলে সে আবার সংসার করবে।’
‘আমি তো আর চাই না, মা। রোমেল প্রসঙ্গে কোনো কথা আমাকে আর কোনোদিন বইলো না।’ পায়ের কাছে মিউমিউ-করা বিড়াল দুইটাকে আমি খাবার দেই। মার সামনে বেশি সময় বসে থাকা দুঃসহ। মা কী কী ত্র“টির কারণে আমার সংসার টিঁকল না তা আমাকে শোনাবে। সংসার না-টেঁকার পিছনে সমস্ত অপরাধ যেন আমারই ছিল।

প্রাক্তন কলিগদের সাথে আড্ডা মারতে আমার পুরনো অফিসে যাই। জাফর স্যারের রুমে ঢুকতেই আমাকে একপলক দেখে ফাইলে চোখ নামিয়ে বলেন, ‘ব’সো।’ এরকম শীতল, অনান্তরিক আমি তাকে কখনো দেখি নাই। একসময় উনি আমার কাজের প্রশংসা করতেন সহকর্মীদের কাছে। ফাইলে চোখ রেখেই বলেন, ‘দেশে আসছো কবে?’ আমি বলি, ‘এই তো আট-দশদিন। আপনার শরীর ভালো? ভাবি, বাচ্চারা সবাই ভালো আছে?’

আমার পাশে বসা আজমল স্যার। ক্রূর চোখে জানালার বাইরে শালপাতার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন আমাকে চেনেন না অথবা আমার সাথে কথা-বলা বা আমার দিকে তাকানোর রুচি তাঁর নাই। আচম্বিতে প্রায় ধমকের সুরে, ভ্রূ কুঁচকে জাফর স্যার বলেন, ‘তোমার হাজব্যান্ড কোথায় বলো তো? তার খোঁজখবর জানো? বিদেশে গিয়ে নাকি তার কোনো খবর কখনো নাও নাই?’ আমার মনে পড়ে অফিসে একবার এক সহকর্মীকে বলেছিলাম, জাপান থাকতে রোমেলের সাথে যোগাযোগ করতাম না, মন চাইত না। এজন্য সে ডিভোর্স দেয়। সে হয়তো এ কথা পুরো অফিসে চাউর করে দিয়েছে।

জাফর স্যারকে আমি বলি, ‘আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে।’ স্যার ফাইলে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, ‘আজকে একটু ব্যস্ত। একটা মিটিংয়ে ঢুকতে হবে। আরেকদিন ফোন করে আইসো।’ আজমল স্যার তখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে। আমার দিকে হয়তো ভয়ে তাকাচ্ছেন না। যেন আমার দিকে তাকালেই তাঁর এইডস হয়ে যাবে। কোনো প্রাক্তন সহকর্মীর রুমে ঢুকলে সে অন্যদের সামনে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। যেন আমি বেরিয়ে গেলেই অন্য বন্ধু সহকর্মীরা তাকে নানা প্রশ্নে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে।

খাবার টেবিলে আমার প্লেটে খাবার এগিয়ে দিতে দিতে মা বলে, ‘তোর নেসার মামার বউ, তোর রিপা মামি বলে, তারে নাকি আত্মীয়-স্বজনেরা নানা কথা শোনায়। তোর সাকি আপার শাশুড়ির সাথে তোর রিপা মামির খুব খাতির। সারাদিন তোর ডিভোর্সের গল্প ছড়ায় দু’জনে। রিপা আমাকে বলে লোকজন নাকি রিপাকে বলে, একা একা মেয়ে বিদেশ থাকে। নিশ্চয়ই ওখানে বয়ফ্রেন্ড-টয়ফ্রেন্ড আছে। এ-জন্য তার বিয়ে করা বা স্বামী লাগে না। একা থাকতে পারে।
আমি বলি, ‘তুমিও কি মামির মতোই মনে করো?’
মা গলা নামিয়ে বলে, ‘যখন কানে আসে মানুষেরা তোর একা থাকা নিয়ে নোংরা কথাবার্তা বলে, আমার আত্মহত্যা করতে মন চায়।’

মাকে বলি, যারা তোমাকে এত কথা শুনায় তাদের সাথে মিশো কেন?’
‘তোর বাবা সারাদিন-রাত ব্যবসা বা তাবলিগ নিয়া থাকে। আত্মীয়-স্বজনের সাথে না মিশলে, কথা না বললে আমি তো তোর মতো ভ্যাম্পায়ার হয়ে যাব। তুই না-হয় দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াস, নানা মানুষের সাথে পরিচয় হয়, যে কারণে ভূত হয়ে গিয়েও তুই বেঁচে আছিস। তোর মতো একা হলে আমি তো আত্মহত্যা করব। পাগল হয়ে রাস্তায় বের হয়ে যাব।’
‘তুমি আমার সাথে কথা বললেই লোকজন আমারে নিয়া কী কী বলে, রোমেল কত ভালো মানুষ ছিল, এগুলা শোনাও। আমার সাথে আর কোনো কথাই বলবা না।’

মা ক্ষীণ স্বরে বলে, ‘আসলে তোর সাথে আমি কথা বলতে চাই। অনেক কথা বলতে ভালো লাগে। আর কথা শুরু করলেই ঘুরে ফিরে ওইগুলা ছাড়া আর কথা খুঁজে পাই না।’ দীর্ঘাঙ্গী, দৃঢ়পায়ে হেঁটে-বেড়ানো, পৃথিবীর সকলকিছু তুচ্ছ করতে পারে, সেই মা আমার আর নাই। ভীত, ভারাক্রান্ত, ভঙ্গুর এক ভিন্ন মূর্তি।




৩৫
ঢাকায় থাকতে আর সুদান ফিরে গিয়েও, অঙ্কুজের সাথে ইমেইলে যোগাযোগ চলতে থাকে। সহসাই অঙ্কুজ আমাকে ইমেইল পাঠানো বন্ধ করে দেয়। জাপানে যাওয়ার জন্য এমনিতে খুবএকটা তাগিদ অনুভব করছিলাম না। অঙ্কুজের ইমেইল বন্ধ হবার পর জাপানের জন্য আমার মন ছুটে যায়। পরের ছুটিতেই আবার জাপান যাই। মেইলের জবাব না-দিলেও অঙ্কুজ আমাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। তবে তাকে খুব অসুস্থ ও ফ্যাকাশে দেখায়। আমার সাথে কথাও কম বলে। আমাকে দেখেই সরাসরি ব্যালকনিতে চলে যেতে বলে। চার-পাঁচদিন বিকাল-সন্ধ্যা ব্যালকনিতে কাটানোর পর একদিন রাত ন’টায় যখন ব্যালকনি থেকে তার রুমে ঢুকি, অঙ্কুজ কিছুসময় দু’চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ক্ষিপ্তের মতো বলে বলে, ‘আচ্ছা, তুমি সত্যি করে বলো তো, এইভাবে দিনে রাতে নানা সময়ে তুমি আমার ঘরে আসো কেন? তুমি ভালো করে জানো আমি একা ছেলে। তুমি অন্ধকারে ব্যালকনিতে বসে থাকো, আমার ঘরে এসে ঢোকো। আমি নিশ্চিত জানি তুমি আমার কাছে কী চাও। আমি জানি তুমি আমার সাথে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাও।’

আমার বুক, মাথা, কান ঝাঁ-ঝাঁ করে ওঠে। আমি বলি, ‘খোদার দোহাই, আমাকে ভুল বুঝো না। শুধুমাত্র ব্যালকনির জন্য এখানে আসি। প্লিজ, মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করো।’
চোখমুখ খিঁচিয়ে সে চিৎকার করে, ‘আমার বাসায় আর কোনোদিন আসবে না।’
আমি বলি, ‘তোমার আজকে কী হলো! গতকাল পর্যন্ত তুমি ফেরেশতার মতো মানুষ ছিলে।’
সে বলে, ‘আমি জানি ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কৌশলে তুমি আমার সাথে প্রেম বা কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইছ। যতটুকু হয়েছে ইনাফ, জাস্ট গেট লস্ট।’

টলটলায়মান আমি কোনোরকমে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাই। ল্যাম্পপোস্টে লাইটের চারপাশে কমলা রঙের কুয়াশা জমেছে। বাস আসতে এখনো আধঘণ্টা দেরি। আমার ঘুম পায়। আমি ভাবি অথবা স্বপ্নে দেখি, একপাশে উঁচু কালো পাহাড়ের সারি। সামনে কী সরু পাহাড়ি বাঁক, অসাবধানে গাড়ি ছিটকে পড়লে সমুদ্রসমাধি হবে আমাদের। আমার পাশে কেউ একজন ড্রাইভ করছে। তার অবয়ব চেনা চেনা মনে লাগছে। একবার মনে হচ্ছে এটা শুভ। আবার সে যেন রোমেল। মুখটা অস্পষ্ট। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বিশাল একেকটা ঢেউ ভাঙছে পাথরের উপর। কী অসামান্য জলকল্লোল, পৃথিবীর যে কোনো সঙ্গীতের চেয়েও শ্র“তিমধুর, অশ্রান্ত বেজে যায়।

পুরো পথে আমাদের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন বা মনুষ্যচিহ্ন নাই। পাথুরে সব বাঁক পেরিয়ে দু’পাশে গহিন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যায়। সমুদের জলকল্লোল শোনার জন্য গাড়ির কাচ নামিয়ে দেই। আকাশে দুগ্ধসফেদ আকাশগঙ্গায় নক্ষত্রের মেলা। আমার সঙ্গীকে পথের পাশে গাড়ি পার্ক করে হেডলাইট বন্ধ করে দিতে বলি। পাথুরে মরণ-বাঁক পেরিয়ে পথের একপাশে গাড়ি থামিয়ে বাতি নিভিয়ে দিলে আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। নিকষ আঁধার পৃথিবীর উপর থোকা থোকা ফুলের মতো নক্ষত্র। সবগুলো যেন টুপ টুপ ঝরে যাচ্ছে। সে কী ধুন্ধুমার আলোর নাচন! সমুদ্রগর্জন বেড়েই চলে। পাশে তাকিয়ে দেখি সঙ্গীটি গাড়িসহ উধাও। পিছন থেকে কেউ আমার মুখ বেঁধে ফেলছে আর বলছে ‘আমি তোমাকে খুন করব। তুমি আমাকে নষ্ট করতে চাও।’ অঙ্কুজ আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে এগিয়ে যায়। শরীর দুমড়ে মুচড়ে ছুটতে চেষ্টা করি। আমার জোরাজুরিতে সে আমাকে পাশের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলে আঁধারে হারিয়ে যায়। চারিদিকে শবভুক্ পশুরা দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস ফেলে ঘুরছে। আমাকে পেয়ে একদল হাউন্ড রক্ত-হিম-করা চিৎকার করতে করতে ছুটে আসে। একটা কুকুর আমার কণ্ঠনালিতে দাঁত বসিয়ে দেয়।

পরদিন হোটেল রুমে আমার ঘুম ভাঙলে প্রথমেই মনে হয় আমি আজকেও আবার যাব ব্যালকনিতে। অঙ্কুজ যত অপমানই করুক না কেন। বিকালে যাব। আর কোনোদিন ব্যালকনিতে যেতে পারব না ভাবতেই আমার দু’চোখ পানিতে ভরে যায়। সকালের নাস্তা সেরে সেতা স্টেশনের নিকটবর্তী শপিং মলে যাই। বেকারির সামনে বেঞ্চে বসে দু’জন বৃদ্ধা গল্প করছে। যারা কোনোরকম হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে বা বাসভাড়া দিয়ে শপিং মল পর্যন্ত আসতে পারে সেইসব নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা এখানে চলে আসে। মাছ, মাংস, ডোনাট, পেস্ট্রি, চিংড়িভাজা, মুরগিভাজা আর বর্ণিল মানুষজনের দিকে তাকিয়ে থেকে তাদের পুরো সপ্তাহের নিঃসঙ্গতা ঘুচিয়ে নেয়। চিংড়ি মাছ, ট্রাউট, রেড স্ন্যাপার, স্যামন দেখে কেউ কেউ আনন্দে ঝলমলিয়ে ওঠে। আমি মাছ-সবজির আশপাশে ঘোরাঘুরি করে চারতলায় মেয়েদের পোশাকের ফ্লোরে যাই। প্রায় সব ডিজাইনের জামা, ট্রাউজার, জুতা পরে পরে ট্রায়ালরুমের আয়নায় মুগ্ধ হয়ে নিজেকে দেখি। টানা চার ঘণ্টা শপিং মলে কাটিয়ে কোনোকিছু না কিনেই বেরিয়ে আসি। রেল স্টেশনের পিছনের সরু গলি দিয়ে আমার প্রিয় এবং এখানকার সবচেয়ে শস্তা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকি। মিসো স্যুপ, ফ্রাইড রাইস আর স্কুইড অর্ডার করি। ডিম্বাকৃতি মুখের মাঝারি উচ্চতার তরুণী ওয়েট্রেস অর্ডার নিয়ে যায়।




৩৬
অঙ্কুজের দরজায় বেল টিপি পর পর দু’বার। অঙ্কুজ দরজা খুলে বাঁকা-চোখে তাকিয়ে বলে, ‘কেন এসেছ আবার? তুমি ভাবছ ধৈর্য নিয়ে আমার পিছনে লেগে থাকলে পেয়ে যাবে? শুরুতে এসেই আপনজনের মতো আমার বন্ধু হয়ে গেছ। ভাবছ এসব চালাকি আমি বুঝি না? এর আগেও এক বয়স্ক মহিলা আমার সাথে সম্পর্ক করতে চেষ্টা করেছিল। ঠিক তোমার মতো করেই এগিয়েছিল। তারপর জীবনে ঐ মহিলার সাথে আর কথা বলি নাই। আমার মা কলেজে পড়ার সময়ই বলেছেন বয়স্ক মহিলাদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে। সে তার কিছু বয়স্ক মহিলা কলিগের বেলাল্লাপনা মানতেই পারত না।’

‘প্লিজ অকারণে আমাকে ভুল বুঝো না। তোমার ব্যালকনিতে সময় কাটাতেই আমি আসি। এর বেশিকিছু আমার চাওয়ার নাই।’ বলে তার পাশ কাটিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকে ব্যালকনির সামনের কাচের দরজার ওপর ভারি পর্দা সরিয়ে দরজা খুলে সোজা ব্যালকনিতে দাঁড়াই। প্রাণ উপচে পড়ছে পুকুরপাড়ের গাছাগাছালিতে। হেমন্তে সবুজ অরণ্যের বৃতিতে স্তবক মেলে আছে উজ্জ্বল আগুন ছড়ানো তিনটা মেপল গাছ। ঘণ্টাখানেক পর পিছন থেকে জাপানি উচ্চারণে কেউ আমার নাম ধরে ডাকলে পিছন ফিরে দেখি পুলিশ। ভদ্রভাবে তারা জাপানি ভাষায় বোঝাতে চেষ্টা করে আমি জনাব অঙ্কুজ সাহেবকে বিরক্ত করতে পারি না। অনাকাক্সিক্ষতভাবে কারো বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারি না। তারপর তারা আমার পাসপোর্ট চেয়ে নেয়। কাছেই অঙ্কুজ নতশিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জাপানি ইংরেজি মিলিয়ে বলি, অঙ্কুজের সাথে এক ধরনের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে বলে এসেছি। এই ফ্ল্যাটে আড়াইবছর থেকেছি বলে ব্যালকনির প্রতি ভালবাসা জন্মেছে।

পুলিশ কর্মকর্তাটি আমাকে সবিনয়ে বলে আমি যেন তার সাথে বেরিয়ে যাই। আমি জিজ্ঞাসা করি, ‘আমাকে কি থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?’ সে মাথা নিচু করে থাকে। অঙ্কুজ একবারের জন্যও আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। তাকে ফ্যাকাশে আর ভীষণ রোগা দেখাচ্ছে। পুলিশ আসা উপলক্ষে তার ঘরভর্তি ঝলমলে আলো। গাড়িতে ওঠার আগে পুলিশ কর্মকর্তা আবার আমার পাসপোর্ট দেখতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সুপারভাইজারের টেলিফোন নাম্বার, ইমেইল অ্যাড্রেস দেই। পুলিশ কর্মকর্তাটি আমার সুপার ভাইজারের সাথে ফোনে কথা বলে। জানতে চায় সেতায় আমি কোন হোটেলে থাকি। হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোকের মতো মাথা নুইয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়। হোটেলের রুমে বসে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে রাখি। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। আমার শিক্ষক, মাস্টার্স থিসিসের সুপারভাইজার, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, সবার সাথেই দেখা করি। এই শহরে বা কিয়োটোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি অথবা গবেষণা পেলে হয়তো আবার ফিরে আসতে পারব। অঙ্কুজের চারশ-বারো নম্বর রুমটি না-হলেও পাঁচতলায় বা তিনতলায় হয়তো চারশ-বারো বরাবর কোনো ফ্ল্যাটে থাকব। কেউ আমাকে আশার বাণী শোনায় না। বিকালে গিয়ে এক্সেলশিয়রের সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশে পার্কে বসে থাকি। সন্ধ্যার পর এক-দুইবার বাড়িটির চারপাশে ঘুরে বেড়াই। ইমারজেন্সি-এক্সিটের সিঁড়ি বেয়ে দশতলায় উঠে যাই। জমকালো চাঁদের আলোয় পৃথিবী ঝিলমিল করছে। দূরে আলো-ঝলমলে সেতা শহর। অনেক নীচে পুকুরের সবুজ পানিতে সিকিউরিটি লাইটের আলো দেখা যায়।

আমার মায়ের সাথে ডাইনিং টেবিলে গল্প করে রোমেল। হাস্যোজ্জ্বল। আমি মায়ের পাশে বসে থাকি। ও মাকে বলে, ‘ফাহিমা যদি একটু প্র্যাকটিকাল হইত বহু কিছু সে করতে পারত। তার লাইফটাকে এভাবে সে মেস আপ করত না।’
মা বলে, ‘ও আমার একমাত্র সন্তান। তারে প্র্যাকটিকাল বানাতে হেন চেষ্টা নাই আমি করি নাই। কিন্তুলাভ হয় নাই।’
‘জরুরি কাজ আছে, উঠতে হবে,’ বলে সে উঠে দাঁড়ায়। আমিও উঠি।

বিশাল এক হলরুমে আমরা। কারো বিয়ের আয়োজন চলছে। চারপাশে শাড়ি, গয়না, ফেস-পাউডার আর চুলের বিন্যাসে জবড়জং নারীরা আর সুসজ্জিত শিশু, কিশোর আর নানা বয়সী পুরুষ। রোমেল আমার চেয়ে সামান্য অগ্রসর। তার পাশ ঘেঁষে আমেরিকায় প্রবাসী আমার মামাতো-খালা তুলি ছুটে আসে। বিয়ের সাদা গাউনে। তুলি আমার বয়সী। শৈশবে তার সাথে দেখা হয়েছিল। পরে ফেসবুকে তার ছবি দেখি। আমি তুলিকে জিজ্ঞাসা করি, ‘খালা তোমার বিয়ে আজকে?’
সে মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ, খালা।’
তুলির সাথে কথা বলার সময় রোমেল হারিয়ে যায়। আশপাশে কোথাও তার চিহ্ন নাই। বিয়ের অতিথিদের মাঝে আমার স্কুলবান্ধবী লিসাকে দেখি। স্কুলের পর আর দেখা হয় নাই। লিসার সাথে আমার চোখাচোখি হয়। সে আমাকে চিনতে পারে না।

আমার মনে পড়ে রোমেলকে আমি কখনোই বলি নাই তার শরীরে আমি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করতাম, রোমেলের পাশে থেকে থেকে আমি আরেকটা রোমেল হয়ে উঠছিলাম।




৩৭
একরাতে আমি এক্সেলশিয়রের চারপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছি, অঙ্কুজ আমাকে ফোন করে। ‘প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। আমি অন্যায় করেছি। এত অপরাধবোধে ভুগেছি যে লজ্জায় তোমাকে ফোন করতে পারিনি। তুমি কি আমার বাসায় আসবে? তোমার সাথে কিছু কথা শেয়ার করার কথা ভাবছিলাম।’
আমি বলি, ‘আমি তোমার বাড়ির সামনেই আছি। দালানটির আর এর চারপাশের গন্ধ শুঁকছিলাম। এক্ষুনি আসছি।’
দরজা খুলে বলে, ‘চলো, বসি।’

ব্যালকনিতে দু’টি চেয়ার পাতা। দূরে পাহাড়ের উপর টিমটিম আলো জ্বলছে। সে বলে, ‘তুমি সুদান থেকে এবার এখানে আসবে বলে আমাকে ইমেইল পাঠিয়েছ কিন্তু আমি জবাব দেইনি। মা মারা যাবার পর থেকে আসলে আমি কোনো মেইলের জবাব দেই না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে বলে ভার্সিটির কোনো মেইলও আসে না।’
আমি সবিস্ময়ে বলি, ‘তোমার মা মারা গেছে? কবে?’

‘প্রায় মাসখানেক হয়ে গেছে। মা জাতিসংঘ থেকে রিটায়ার করেছে। চাচ্ছিল জেনেভা ছেড়ে জাপানে এসে থাকবে। আমি রাজি হইনি। সাফ বলে দিয়েছিলাম আমি চাই না মা জাপানে সেটল করুক। আমি তো তখন মায়ের কাছ থেকে দূরে যাবার জন্য ইউরোপে কোথাও পড়তে গিয়ে জাপান চলে এসেছি। আমি জাপান আসতে বারণ করেছি বলে হয়তো অভিমান করেছে। তাছাড়া বহু বছরের নিঃসঙ্গতার চাপ তো ছিলই। আত্মহত্যা করেছে। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় ভদ্রমহিলা ভালোই করেছে। মরার আগে চিরকুট লিখে গেছে। আমাকে যেন তার মৃত্যু সংবাদ না-দেওয়া হয় এবং আমি যেন তার মৃত মুখ দেখতে ফিউনারেলে না-যাই।’

আমি বলি, ‘প্রথম কয়দিন এসে যে তোমার ব্যালকনিতে এত সময় কাটালাম তখনও তো বলো নাই।’

অঙ্কুজ বলে, ‘আমার ধারণা ছিল আমি সামলে উঠেছি। আমি চেষ্টা করেছি স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু আমি তো আসলে স্বাভাবিক নাই। যেদিন তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করি সেদিন মনে হলো মা কখনো পছন্দ করত না আমি আমার চেয়ে বয়স্ক মেয়েদের সাথে মিশি। সেই সময় আমার মধ্যে মা এসে ভর করেছিল।
‘আত্মীয়-স্বজন আমাকে চিরকুটের কথা বলেছে। আমি মায়ের মুখ দেখতে যাইনি। মারা যাওয়ার পর আমার মধ্যে মা এসে যেন পুরোদমে ভর করেছে। তুমি আমাকে মেইল করলে যখন, ভাবলাম শুধু ব্যালকনির জন্য একটা মানুষ আফ্রিকা থেকে জাপান আসতে পারে না। আর প্রেম, সম্পর্ক, যৌনতা এসব আমার জন্য নয়।’

আমি বলি, ‘আমি নিজেও তাই। বিয়ের আগে একবার প্রেমে পড়েছিলাম সেটা ভেস্তে গেছে। বাবা-মা একটা বিয়ে দেন, কিন্তু তাও টিঁকল না, এবং সেটা আমার কারণেই।’
অঙ্কুজ বলে, ‘মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমিও দীর্ঘসময় ব্যালকনিতে কাটাই। মাঝেমধ্যে দুপুরের রোদ হেলে গেলে বসি, রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্তথাকি।’
‘কোজু কি এখনো আসে?’
‘না, অনেকদিন আসে না। তোমাকে ফোন করার আগে আজও কোজুকে চেষ্টা করছিলাম। ফোন বন্ধ।’ অঙ্কুজের চোয়াল, চোখ গর্তে বসে গেছে। চোখের পাশে চামড়া কুঁচকে গেছে।
আমি বলি, ‘প্রথম কয়দিন আমার সাথে কম কথা বলতে দেখে আমি ভেবেছি হয়তো সঙ্গীত নিয়ে ব্যস্ত আছ।’
সে বলে, ‘মা বহুবছর জীবন্মৃত ছিল। অফিসের কারো সাথে মিশত না। বাড়িতে আমাকে দখল করে রাখত সারাদিন। আমি জাপান চলে আসার পর সে তার নিজের নৈশ প্রতিচ্ছায়া হয়ে উঠেছিল। গতবছর আমি জেনেভায় মায়ের সাথে দেড় মাস কাটিয়ে আসি। আমার সাথেও খুব বেশি কথা বলত না। রান্নাঘরে, নিজের বেডরুমে একা একা বিড়বিড় করত। মরে গিয়ে মা বেঁচে গেল।’

আমরা দু’জনেই নীরব হয়ে যাই।




৩৮
আরেকজনের পাশে বসে আমার ব্যালকনির স্বাদ ঠিক পাচ্ছিলাম না। অঙ্কুজকে বলি, ‘আজ উঠি।’ অঙ্কুজ বলে, ‘আমি রাতে গাড়ি চালাই, তুমি যাবে?’ আমরা বেরিয়ে যাই। এতরাতেও রাস্তায় প্রচুর গাড়ি। সঙ্গীত-পাগল অঙ্কুজ গাড়িতে রেডিও বা কোনো গানই শোনে না। আমি বলি, ‘তুমি তো গান খুব পছন্দ করতে? গান ছাড়ো না কেন?’ সে বলে, ‘গান আর ভালো লাগে না। বরং নিস্তব্ধতা ভালো লাগে।’ বাইরে অন্ধকারে তাকিয়ে আমার রোমেলের কথা মনে পড়ে। রোমেল রাতে ড্রাইভ করত। যে কয়বার তার গ্রামের বাড়ি গেছে প্রতিবারই রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। রোমেলও গাড়িতে গান বা রেডিও বাজানো পছন্দ করত না। তার সাথে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ জুড়ে থাকত নৈঃশব্দ্য, খুব প্রয়োজন ছাড়া আমাদের কোনো কথা হতো না। পুরোসময় গাড়িতে অঙ্কুজের সাথেও এমনই নৈঃশব্দ্যে। গাড়িতে বসে জাপানের অন্ধকার দেখি।

তার পরের দুইদিনও ওই একই রুটিন। আমি আর অঙ্কুজ ব্যালকনিতে বসে থাকি। তারপর গাড়ি নিয়ে বের হই নিঃশব্দ ভ্রমণে।





৩৯
অঙ্কুজের সাথে ব্যালকনিতে বসতে ভালো লাগছিল না। ব্যালকনি শুধু একা উপভোগ করার। দুইজনে মিলে নয়। ছুটি সংক্ষিপ্ত করে সুদান ফিরে যাই। যথারীতি অফিসের পর আমার নিস্তরঙ্গ জীবন। ঘরের দেয়ালে তাকিয়ে, বই পড়ে রাত কাটে। মাঝেমধ্যে চকলেট বা আইসক্রিম খাই ফ্রিজ থেকে বের করে...

অঙ্কুজকে মেইল করি পর পর কয়েকবার। সে নিরুত্তর। ফোন করি। ফোনও বন্ধ। ছয় মাস পর ছুটিতে আবারও জাপান যাই। বেল টিপলে সুন্দরী এক জাপানি তরুণী দরজা খোলে। আমি অঙ্কুজের কথা জানতে চাই। সে জানায় সে এ-নামে কাউকে চেনে না। আমি তার ব্যালকনিতে যেতে চাই, বলি, আমি এখানকার বাসিন্দা ছিলাম। ‘দুই মিনিটের জন্য যেতে পারো। কিন্তু আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে এক্ষুনি বেরিয়ে যাব।’ ব্যালকনিতে ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। সব আগের মতোই আছে। একটু পরই বেরিয়ে যেতে হয় জাপানি তরুণীর সাথে।

পরে জানতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ না-করেই অঙ্কুজ জাপান ছেড়ে চলে গেছে। কোথায়, কেউ জানে না। বিশ্ববিদ্যালয়েরও কারো ইমেইলের জবাব সে দেয় না। আমি এক্সলশিয়রে ফিরে যাই। চারশ-বারো নম্বরে বেল টিপি। কেউ খোলে না। নীচে পার্কে বসে থাকি। জাপানি তরুণীটি বাইরে থেকে আসে। তাকে দেখে ছুটে যাই। বলি, ‘তোমার ব্যালকনিতে বসতে চাই।’ সে ভিতরে ঢুকে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে। ম্যানেজার বেরিয়ে এসে আমাকে বলে, ‘তুমি আর চারশ-বারো নম্বরে যাবে না, সে সিকিউর ফিল করে না তুমি গেলে। আমাকে অনুরোধ করেছে তোমাকে যেন বুঝিয়ে বলি।’
আমি জিজ্ঞাসা করি, ‘চারশ-বারো নম্বর ফ্ল্যাটটি কবে খালি হবে? আমি এটি ভাড়া নিতে চাই।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী না হলে তো পারবে না। তাছাড়া ঐ মেয়েটির সাথে এক বছরের চুক্তি আছে।’

সন্ধ্যায় ইমারজেন্সি-এক্সিটের সিঁড়িতে যাই। সাত তলার সিঁড়িতে নিস্তব্ধ বসে থাকি। চাঁদের রঙ হয়ে ওঠে খুনে-লাল, যেন এক্ষুনি টুপ টুপ রক্ত ঝরবে। আকাশ হঠাৎ অনেক নীচে নেমে আসে আর পৃথিবী এ-মাথা ও-মাথা তীব্র ঝাঁকি খায়। আমাদের দশতলা দালানটি হুড়মুড় করে ব্যালকনি সমেত ভূগর্ভে ঢুকে যেতে থাকে। আমি ঝাঁপ দিই।