তাজমহল ও ফতেহপুর সিক্রির কথা
হাবিবুর রহমান স্বপন, শনিবার, অক্টোবর ১৩, ২০১২


জ্ঞান বিজ্ঞানে মানুষ গত তিন শতাব্দিতে বহু দূর অগ্রসর হয়েছে। নতুন নতুন আবিস্কার ও নির্মাণ বিষ্ময়কর। অথচ ৩শ ৫৫ বছর আগে নির্মিত তাজমহল এখনও বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য দর্শনীয়ের একটি। প্রায় ২২ হাজার শ্রমিক, এক হাজারেরও বেশী হাতীর শ্রম এবং ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন ভারত সম্রাট শাহজাহান। বলা হয় তাজমহল এর সৌন্দর্য স্বর্গীয় উদ্যানতুল্য।
তাজমহল তৈরী করা হয়েছিল জনগণের টাকায়। আমরা যারা ভারতবর্ষে এখন বসবাস করি তাদের পূর্ব পূরুষের খাজনার টাকায় সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর সমাধীর উপর তাজমহল নির্মান করেন। এর পক্ষে-বিপক্ষে বহু লেখক লিখে গেছেন। এখনও এ নিয়ে মানুষের মতামতের অন্ত নেই। যেমন : তাজমহল তৈরী করতে বৈদেশিক মূদ্রা লেগেছিল কি না ? লেগে থাকলে তার যোগান দাতা কোন দেশ বা ব্যাংক ? বিশ্ব ব্যাংক না কি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক কিংবা অন্য কেউ ? তাজমহল তৈরীতে দুর্নীতি হয়েছিল কি না? টেন্ডার হয়েছিল কি না ? সেই টেন্ডার যদি হয়ে থাকে তার স্বচ্ছতা ছিল কি না ? সর্বোপরি তাজমহল তৈরীতে সম্রাট শাহজাহান মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না ? নিম্নমানের নির্মান সমগ্রী কেনার অভিযোগে কেউ তখন বরখাস্ত বা শাস্তি পেয়েছিলেন কি না ? এমন অনেক প্রশ্নই রশিক জনেরা করেন।

তবে একথা নির্দিধায় বলা যায় তাজমহল তৈরী হয়েছিল জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। যে ট্যাক্স আমাদের পূর্বপুরুষেরাও দিয়ে গেছেন। এখন যেমন ভারত উপমহাদেশে গরীব মানুষ আছে, তখনও ছিল। জনগনের টাকায় তাজমহল নির্মান করলেন কেন সম্রাট শাহজাহান ? কেউ বলেছেন এই ব্যয় অবশ্যই অপব্যয়, আবার কারও দৃষ্টিতে তাজমহল এক অপরূপ সৃষ্টি। আমার এক বন্ধুর অভিমত : শাহজাহান যে পরিমাণ টাকা খরচ করে তাজমহল তৈরী করেছিলেন সেই টাকায় অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যেত। আমাদের পূর্বসুরিরা শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করতে পারলে অস্ত্র তৈরী করতে পারতো। আর অস্ত্র তৈরী করতে পারলে ইংরেজরা এদেশ দখল করে আমাদের পদানত করতে পারতো না।
তাজমহল নিয়ে এক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, “তাজমহলের দিকে একবার অর্থনীতিকারের চক্ষু লইয়া দর্শন কর, দেখিবে উহা অপব্যায়িতা ও নির্বুদ্ধিতার একটি জীবন্ত নিদর্শন ভিন্ন অন্য কিছুই নহে।” আবার এক রুশ লেখক লিখেছেন ‘তাজমহলের দেয়ালের গায়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্থি পঞ্জর ব্যতিত আমি আর কিছুই দেখতে পাইনে।’ আবার বিশ্বের বহু কবি-সাহিত্যিক লেখক এটাকে নিছক একটি ইমারত হিসাবে দেখেননি। তারা তাজমহলকে নারী-পুরুষের শাশ্বত প্রেমের মজবুত বন্ধন হিসাবে চিহিৃত করেছেন। প্রেম ছাড়া এ বিশ্ব বৃথা। আরও কত মত, কত কথা।
সকল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এক না। আবার সবার পছন্দ এক না। একটি গ্লাসে যদি অর্ধেক পানি থাকে কেউ বলেন গ্লাসটি অর্ধেক খালি, আবার কেউ বলেন অর্ধেক ভরা। কেউ বা পছন্দ করেন লাল রং কেউ সাদা আবার কেউবা কালো, সবুজ, হলুদ ইত্যাদি। এক মানুষের সাথে অপর মানুষের সাদৃশ্য নেই। এক মানুষের চেহারার সঙ্গে যেমন অন্য মানুষের চেহারায় মিল নেই তেমনই কারও কণ্ঠের সঙ্গে কারও কণ্ঠের মিল নেই। এখানেই সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টির গূঢ় রহস্য নিহিত।
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাজমহল দর্শন করেছিলেন কি না তা জানা না গেলেও কবিতায় লিখেছেন, ‘এই তব মনে ছিল আশা/ হিরা মনি মুক্ত মণিক্যের ঘটা/ যেন শূন্যদিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা/ যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক, শুধু থাক এক বিন্দু নয়নের জল/ কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জল/ এ তাজমহল।’ তিনি আরও লিখেছেন ‘এইযে তাজমহল এমন তাজমহল, তার কারণ শাহজাহানের হৃদয় তাঁর প্রেম, তাঁর বিরহ বেদনার আনন্দ অনন্তকে স্পর্শ করেছিল; তাঁর সিংহাসনকে তিনি যে কোঠাতেই রাখুন তিনি তাঁর তাজমহলকে তাঁর আপন থেকে মুক্ত করে দিয়ে গেছেন।’ কবি কায়কোবাদ লিখেছেন, ‘প্রেমের আদর্শ তুমি এ ধরণীতলে/ তবে সে স্বর্গীয় শোভা, মুনিজন মোনোলোভা/ আছে কি ধরা ধামে আকাশের তলে ?’ কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ভিতরে তার মমতাজ নারী / বাহিরে শাহজাহান।
তাজমহল সম্পর্কে ছাত্র জীবনে বহু গল্প এবং প্রবন্ধ পড়েছি। আমার এক শিক্ষক বলেছিলেন ‘শাহজাহান তাজমহল তৈরী করে নারীজাতি বা স্ত্রীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন’।
কলেজের বাংলার শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেছিলেন, ‘তাজমহলের মর্মর পাথরের বুকে প্রেম জেগে আছে’।
তাজমহল নিয়ে আমার কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছিল সেই স্কুল জীবনেই। ইচ্ছা তাজমহল দেখা। সেটা তো আর সহজ কথা নয়। আগে অবিভক্ত ভারত ছিল আমার বাবা চাচা নানা গেছেন ট্রেনে চেপে কোলকাতা-বোম্বে। এখন ভারত আলাদা রাষ্ট্র। আগ্রা যেতে পাশপোর্ট-ভিসা লাগে। এর পরও কত ঝক্কি ঝামেলা। ১৯৯৮ সালে দিল্লী আগ্রা জয়পুর ও আজমীর গিয়েছিলাম। তখন তাজমহল দর্শনের জন্য বিদেশীদের দিতে হতো ( টিকিট এর মূল্য) ২০ টাকা আর ভারতীয়দের জন্য ৫ টাকা মাত্র। এখন যদি আপনি তাজমহল দেখতে চান তাহলে আপনাকে প্রবেশ মূল্য গুনতে হবে ভারতীয় মূদ্রায় ৫শ ১০ টাকা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ৩ থেকে ১৫ বছরের বিদেশীদের জন্য ৫শ টাকা। ৩ বছরের কম বয়সিদের টিকিট লাগে না। এটা সার্কভূক্ত দেশের নাগরিক এবং ইওগঝঞঊঈ ভূক্ত দেশসমূহ যেমন থাইল্যান্ড ও মায়ানমারের নাগরিকদের জন্য। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশের পর্যটকের জন্য টিকিট কাটতে হবে ৭শ ৫০ টাকায়। আর ভারতীয়দের দর্শন ফি মাত্র ২০ টাকা।
চাঁদনী বা জোৎস্না রাতে তাজমহল দেখতে হলে ভারতীয়দেরও ৫শ ১০ টাকায় টিকিট কাটতে হবে। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর চাঁদনী রাতে তাজমহল দর্শন বন্ধ ছিল। এর পর চাঁদনী রাতে মাসে দুই বার (৫ দিন) দর্শকদের তাজমহল দেখার অনুমতি বা টিকিট দেয়া হয়। মনে রাখবেন সে টিকিটও আগাম কাটতে হয়। ২২ নং আগ্রা মল থেকে ২৪ ঘন্টা আগে চাঁদনী রাতের টিকিট কাটা যায়। কপালের জোর থাকলে মিলেও যেতে পারে আপনার টিকিট। পূর্নিমার চাঁদনী রাতে তাজমহলকে পলিশ করা হীরার মত চকচকে দেখায়। মর্মর পাথরের উপর চাঁদের আলো দ্যূতি ছড়ায় যা গোলাপী আভার সৃষ্টি করে তা বর্ণনাতীত। চোখ জুড়িয়ে যায়। এ এক অপার সৌন্দর্য। রাত সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত দর্শনের সুযোগ আছে। তবে প্রতি রাতে মাত্র ৪শ ব্যাক্তি এই সুযোগ পান। প্রতি গ্রুপে ৫০ জন করে, ৮টি গ্রুপ প্রবেশ করে। প্রতি গ্রুপের জন্য সময় বরাদ্দ মাত্র ৩০ মিনিট।
কোলকাতা থেকে সরাসরি আগ্রার ট্রেন পাওয়া যায়। আমি গেলাম ভারতের সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং বিলাশ বহুল ট্রেন রাজধানী এক্সপ্রেসে। সকাল সাড়ে ১০ টায় নিউ দিল্লী স্টেশনে নেমে সোজা স্কুটারে চেপে হযরত নিজাম উদ্দিনের মাজার। শিখ স্কুটার ড্রাইভার আমাকে বোকা পেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে নিল। নিজাম উদ্দিনের মাজারের এক খাদেম আমাকে তার বৈঠক ঘরে নিয়ে গেলেন। উক্ত খাদেম এর নাম-ঠিকানা আমাকে দিয়েছিলেন ‘সংবাদ’ সম্পাদক প্রয়াত আহমদুল কবির। তিনি মাজারের খাদেম এর জন্য আমার কাছে কিছু উপঢৌকন দিয়েছিলেন। আমি সেগুলো তার হাতে তুলে দিলাম। এ কারনে একটু বাড়তি আদর জুটলো। খাদেম এর অতিথিশালায় ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। মাজারে দোয়া কালাম পড়ে বেড় হলাম দিল্লী দেখতে (খাদেম আমার সঙ্গে আরফাত খান নামের এক যুবককে গাইড হিসাবে পাঠালেন)।
মাজারের উত্তর দিকে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে কাওয়ালি হতে দেখলাম এবং দক্ষিণ দিকে ভক্ত-অনুরাগীরা দোয়া-দরুদ পাঠ করছেন। কেউ বা গোলাপ পাপড়ি ছিটিয়ে কবর জিয়ারত করছে। হযরত নিজাম উদ্দিনের মাজার এর ৫০ মিটার দূরেই বিশ্ব তাবলিগ জামায়াতের প্রধান কার্যালয় পাঁচ তলা বিশিষ্ট নিজাম উদ্দিন মার্কাজ মসজিদ। দেখলাম রেড ফোর্ট, দিল্লী জামা মসজিদ, কুতুব মিনার ইত্যাদি। পর দিন দিল্লীর অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান দেখলাম। যা কিছু দেখলাম সবই ঐতিহাসিক স্থান বা স্থাপনা। পর দিন আগ্রা যাত্রা। শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে পর দিন তাজমহল দেখার উত্তেজনায় রাতে ভাল ঘুম হলো না। পর দিন দুপুরে পৌছুলাম আগ্রা। দালাল লাগলো পিছু। তার সহযোগিতায় হোটেল কোহিনূরে উঠলাম। দুপুরের খাবার খেয়েই রওনা হলাম স্কুটার যোগে তাজমহলের উদ্দেশ্যে। ২০ টাকায় টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম তাজমহলের বিশাল আঙিনায়। দেশী বিদেশী বহু পর্যটক। তখনই জেনেছিলাম প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার বিদেশী পর্যটক তাজমহল দর্শন করে।
আমার এক বন্ধু ভারতীয়দের মতই ৫ টাকার টিকিট কেটে তাজমহল দেখে এলো। ওর যুক্তি তার পূর্ব পুরুষের ট্যাক্সের টাকায় এটা গড়া হয়েছে অতএব যদি ভারতীয়রা ৫ টাকায় দেখার সুযোগ পায় তাহলে আমিও ৫ টাকার বেশী দেব না। এ নিয়ে আমাদের বেশ হাস্য কৌতুক হলো। ওর আরও যুক্তি সীমান্তের ওপার থেকে পাখি, কুকুর-বিড়াল এপারে ভারতে প্রবেশ করতে দেখলাম। ওদের তো পাশপোর্ট ভিসা লাগে না। এরকম কত যুক্তি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অর্থাৎ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আমরা তাজমহল দেখলাম। সন্ধ্যার গোধূলী লগ্নে তাজমহলের শুভ্র রংয়ের মধ্যে এক মাদকতার ছোঁয়া মিললো। পর দিন সকালে নাস্তা সেরে আবার গেলাম তাজমহল চত্বরে। বিদেশীরা ক্যামেরায় ছবি ধারণ করছিল। আমিও আমার আশাহি ‘প্যানট্যাক্স ক্যামেরায়’ ছবি উঠালাম। আলেকজান্ডার হিথ নামের এক অস্ট্রেলিয়ান প্রৌঢ় বয়সী পর্যটক আমাকে বললেন তোমার ক্যামেরা এবং আমার ক্যামেরা তো একই, তাহলে তুমি দয়া করে আমাকে কিছু ছবি উঠিয়ে দাও। আমার হাতে তিনি তার ক্যামেরা দিলেন। আমি বেশ কয়েকটি এ্যাঙ্গেলে তাজমহলের সামনে তার ছবি তুলে দিলাম। এর পর তিনি আমার ক্যামেরায় আমার বেশ কয়েকটি ছবি তুলে দিলেন। তাজমহল চত্বরের মসজিদের পার্শ্বে শতাধিক কাঠবিড়ালী খাবার খাচ্ছে। যব, বাজরা, কাউন দেয়া হয়েছে কাঠবিড়ালীর জন্য। প্রতিদিন তিন বার করে এভাবে কাঠবিড়ালীর জন্য তাজমহল কর্তৃপক্ষ খাবার দেয়। আমরা কাঠবিড়ালী দলের ছবি ক্যামেরা বন্দি করলাম। আমি আমার ক্যামেরায় ব্যবহার করছিলাম ২০০ এএসএ ফিল্ম। আর তিনি ব্যবহার করছিলেন ৮০০ এএসএ ফিল্ম। আমার ফিল্ম দেখে আলেকজান্ডার বললেন ওতে ছবি খুব ভাল হবে না। তিনি আমাকে ৮০০ এএসএ একটি ফিল্ম উপহার দিলেন।
সকাল ১১ টায় একটি দক্ষিণ কোরিয়ান পর্যটক দল তাজমহলের আঙিনায় প্রবেশ করলো। ওরা সংখ্যায় মোট ৩৮ জন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের দল। দলে ৩৪ জন নারী এবং ৪ জন পুরুষ। সকলেরই এক রংয়ের (লাল-হলুদ) পোশাক এবং ছাতা। ওরা গাইড’ এর সহায়তা নিল। গাইড ভদ্রলোক হ্যান্ড মাইকের সাহায্যে স্পষ্ট ইংরেজিতে কোরিয়দের তাজমহলের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আমি এবং আলেকজান্ডার বিনা পয়সায় তার বর্ণনা শুনে জেনে নিলাম তাজমহল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।
ভারতের উত্তর প্রদেশ এর আগ্রার দূরত্ব দিল্লী থেকে ২০৪ কি:মি। সম্রাট আকবরের নাতি অর্থাৎ সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র সম্রাট শাহজাহান তার প্রয়াত স্ত্রী আর্জুমান্দ বেগম ওরফে মমতাজ এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তার কবরের উপর তাজমহল নির্মাণ করেন। ওস্তাদ ইছা মোহম্মদ ইফেন্দী, পারস্যের পুরু এবং ইতালির আর্কিট্যাক্ট গেরোনিমো ভেরোনিও-এর দেয়া থিওরি অনুসারে বিখ্যাত আর্কিট্যাক্ট উস্তাদ আহমেদ লাহাউরি (খধযধঁৎর) তাজমহলের নক্সা করেন । মুঘল নির্মাণ কৌশলে মিশ্রণ রয়েছে ইসলামী, পার্শিয়ান এবং ভারতীয় স্থাপত্য কলা। ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দে নির্মান কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মোট ২০ হাজার শ্রমিক এবং এক হাজারেরও বেশী হাতীর শ্রমে ২২ বছর ধরে তাজমহল নির্মান করা হয়। নির্মান ব্যয় হয় ৩২ কোটি টাকা। তাজমহলের প্রধান ফটকের নাম দরজা ই রওজা। উচ্চতা ৯৩ ফুট। এর নির্মান কাজ শুরু হয় ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। স্থপতি উস্তাদ আহমেদ লাহাউড়ি এটিসহ তাজমহলের পশ্চিমে লাল বেলে পাথরে তৈরী মসজিদ ও পুর্ব দিকের নওকাব খানারও (বিশ্রামাগার) নক্সা কারক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা কারিগর, চিত্র শিল্পী, ক্যালিওগ্রাফার, পাথর কাটার শিল্পী এবং গম্বুজ তৈরীর বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছিল আগ্রায় তাজমহল তৈরীর জন্য।
সম্রাট শাহজাহান জন্ম গ্রহণ করেন ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি। মৃত্যু বরণ করেন ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। ডাক নাম খুররম। যার অর্থ ‘আনন্দদায়ক’।
অল্প বয়সে তিনি যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী হন। সম্রাট জাহাঙ্গীর পুত্রের উপাধী দেন ‘বাহাদুর শাহজাহান’। তাজমহল এবং আগ্রা দুর্গের মূল নক্সা শাহজাহানের ধারণা থেকেই আসে। শাহজাহানের চেয়ে মমতাজ মাত্র এক বছরের ছোট। মমতাজের জন্ম ১৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে। মৃত্যু ১৬৩১ এর ১৭ জুন। ১৪ তম সন্তান প্রসবের সময় মমতাজের মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স ৪০ বছর।
মমতাজ এর সঙ্গে শাহজাহানের প্রথম দেখা ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে আগ্রার একটি মিনা বাজারে। তখন মমতাজের বয়স ১৪ বছর এবং শাহজাহানের বয়স ১৫।
মমতাজের পিতা আবুল হাসান আসাব খান ছিলেন পার্শিয়ান মুসলিম। মমতাজ মিনা বাজারে সিল্কের কাপড়, কাঁচ ও পুঁতির পশরা সাজিয়ে বসেছিলেন। সেখানেই সম্রাট জাহাঙ্গীরের চতুর্থ পুত্র রাজপুত্র খুররম (শাহজাহান) আর্জুমান্দ বানু ওরফে মমতা কে দেখে মুগ্ধ হন। এক বছর পর সম্রাট জাহাঙ্গীর মমতাজকে আংটি পড়িয়ে আশির্বাদ করেন। এর ৫ বছর পর ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান মমতাজকে বিয়ে করেন। ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান দিল্লীর সিংহাসনে আরোহন করেন।
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানের পুত্র আওরঙ্গজেব বড় দুই ভাই দারা ও মুরাদকে হত্যা করে দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন ( ছোট ভাই সুজাউদ্দৌলা বশ্যতা স্বীকার করায় তাকে বাংলার দায়িত্ব দেয়া হয়। সুজাউদ্দৌলা নদী পথে সোনারগাঁ যাওয়ার পথে পাবনার সুজানগর এসে তাঁবু করে কিছুদিন ছিলেন এবং তার নামানুসারে সুজানগর নামকরণ হয়) এবং পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করে রাখেন। পিতা শাহজাহানকে তিনি অপব্যয়কারী এবং প্রজাদের প্রতি দায়িত্বহীন উদাসীন আখ্যা দিয়ে গৃহবন্দী করেন। তবে মৃত্যুর পর পিতার ইচ্ছানুসারে আওরঙ্গজেব মমতাজের কবরের পাশে শাহজাহানের কবর দিয়েছিলেন। জনশ্রুতি আছে তাজমহলের উত্তরে যমুনা নদীর অপর প্রান্তে সম্রাট শাহজাহান তাজমহলের অনুরূপ অপর একটি তাজমহল তৈরী করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তবে সেটি করার ইচ্ছা ছিল কালো মার্বেল পাথর দ্বারা।
শাহজাহান বন্দী অবস্থায় ৮ বছর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আগ্রার দূর্গ শীর্ষে শাহজাহান বন্দি অবস্থায় অপলক দৃষ্টিতে তাজমহলের দিকে চেয়ে থাকতেন। এসময় শাহজাহানের সেবা করতেন তার কন্যা জাহানারা। আগ্রা দূর্গের অর্ধেকাংশে দিল্লীর রেড ফোর্ট (লাল কেল্লা)-এর মতই দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত। অর্ধেকাংশ ক্যান্টনমেন্ট বা সেনা ঘাঁটি। আমরা ১০ টাকায় টিকিট কেটে (বর্তমানে বিদেশীদের জন্য টিকিটের মূল্য আড়াই’শ টাকা) আগ্রা দূর্গের শীর্ষে উঠলাম। যে ঘরটিতে সম্রাট শাহজাহান বন্দী ছিলেন সেখান থেকে দেখলাম তাজমহল খুবই সুন্দর এবং স্পষ্ট দেখা যায়।
প্রেম বিশুদ্ধতার অনুপম প্রতীক তাজমহলের নিচে গ্রাউ- ফ্লোরে মমতাজ এবং শাহজাহানের কবর। দোতলায় ডামি বা ফলস্ কবর। নিচের তলায় বা গ্রাউ- ফ্লোরে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার নেই। তবে বিশ্বের কোন বিশেষ বা সন্মানীয় ব্যক্তির জন্য নিচে কবর দেখার ব্যবস্থা করা হয়। মমতাজের কবরের ডানে শাহজাহানের কবরটি আকারে খানিকটা বড়। মমতাজের কবরের উপর প্যাসেজে আরবী ক্যালিওগ্রাফীতে লেখা আছে ‘আল্লাহ পাকের ৯৯ নাম এবং আরবীতে যা লেখা আছে তার অর্থ ‘এখানে ফেরেশতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত আল্লাহর এক ভক্ত শায়িত আছেন।’ শাহজাহানের কবরের উপরের প্যাসেজে আরবী ক্যালিওগ্রাফিতে লেখা আছে ‘আল্লাহর এই বান্দা দুনিয়া ভ্রমণ শেষে মৃত্যু বরণ করেন রজব মাসের ২৬ তম রজনীতে ১০৭৬ হিজরীতে’।
তাজ মহলের দেয়ালে পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াত সুরা ইয়াসিন, সুরা আনসহ যে ১৪ টি আয়াত লেখা আছে তা সাদা মার্বেল পাথরের উপর লেখা। যা ‘জ্যাসপার ইনলাইং’ দ্বারা করা।
তাজমহল হচ্ছে মনুষ্য সৃষ্ট বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মিনার এর নির্মান শৈলী এবং স্থাপত্য অতুলনীয়। ৪২ একর জমি রয়েছে তাজমহলের আঙিনায়। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদ, বিশ্রামাগার, বাগান, পানির ফোয়ারা এবং খোলা সবুজ ঘাসের চত্বর। যমুনা নদীর (এটা বাংলাদেশের যমুনা নদীর মত বড় বা প্রশস্ত না, আমাদের দেশের ছোট নদীর মত, যা শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়) তীর ঘেঁষে ৫০ ফুট উচু বেদীর উপর নির্মিত। চার কোনায় চারটি মিনার রয়েছে। গোলাকৃতির গম্বুজ। এর ব্যাস ৫৮ ফুট এবং উচ্চতা ৮১ ফুট। এই গম্বুজও স্ফটিক বা মার্বেল পাথরের তৈরী।
তাজমহলের ভিতর ও বাহিরের দেয়াল সাদা ধবধবে মার্বেল পাথরে তৈরী । প্রতিটি পাথর আড়াই ফুট বাই আড়াই ফুট বর্গাকৃতির। পাথর এর পুরুত্ব প্রায় এক ইঞ্চি। এত বড় পাথর কি ভাবে সমান মাপে কেটে মসৃন করা হয়েছে এবং তা দেয়ালে লাগানো হয়েছে ? এখনও এ নিয়ে নির্মানবিদরা অবাক হন। তখন তো এখনকার মত যান্ত্রিক সুবিধা ছিল না।
তাজমহলের মার্বেল পাথর এবং মূল্যবান নানা প্রকার পাথর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। ভারতের রাজস্থান ও পাঞ্জাব এবং তিব্বত,চীন,আফগানিস্তান,শ্রীলঙ্কা, আরব থেকে এসব পাথর সংগ্রহ করা হয়। তাজমহলে ব্যবহৃত হয়েছে ২৮ প্রকার মূল্যবান পাথর। এসব পাথর দিয়ে তাজমহলের দেয়ালে লতা-পাতা ফুল এর মনোরম নক্সা করা হয়েছে। যার অনেকটাই ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্ণর উইলিয়াম বেন্টিক এর সময় ও ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের সময় এবং ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান বিভক্তির সময় চুরি গেছে। বহু মূল্যবান পাথর হীরা, নীলা, চুনি পাথর দেয়াল থেকে তুলে নিয়ে গেছে বৃটিশ সৈন্য ও চোরেরা। এখন তাজমহল এর নিরাপত্তা যতটা মজবুত আগে তেমনটি ছিল না। আমি ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে তাজমহল পরদর্শন করার সময়ও তেমন নিরাপত্তার কড়াকড়ি দেখি নাই। কিন্তু ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে স্ত্রী এবং পুত্রকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছি কঠোর নিরাপত্তা। এখন নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ভারতের এলিট ফোর্স ‘ব্লাক ক্যাট’।
ভারী অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত এক প্লাটুন সৈন্য।
মোবাইল ফোনের টর্চ লাইট যদি আপনি তাজমহলের দেয়ালে ধরেন দেখবেন সাদা মার্বেল পাথর জ্বলজ্বল করছে। আমি ছোট্ট একটি পেনসিল টর্চ লাইট নিয়ে তাজ অভ্যান্তরে প্রবেশ করে দেয়ালে ধরলাম দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। আরও বিষ্মিত হলাম যখন টর্চের আলো ফেললাম দেয়ালের লতা-পাতা-ফুলের উপর। এদৃশ্য বোঝানোর ভাষা আমার জানা নেই। যেন জীবন্ত ফুল এবং লতা-পাতা ! দেয়ালে কারুকাজ করা মহামূল্যবান জহরত, হীরা এবং নীলা পাথর চুরি হয়ে গেছে। সেসব স্থানে এখনও খতের চিহ্ন বিদ্যমান।
তাজমহল এর দৃশ্য একেক সময় একেক রকম হয়। সূর্যোদয়ের সময় হলুদ রং ক্রমশ তা হালকা গোলাপী আভা ধারণ করে। দুপুরে, বিকালে, সূর্যাস্তের সময় এবং জোৎস্না বা চাঁদনী রাতে রং এর পরিবর্তন হয়। হাসি-কান্নার এক রহস্যময়তা তাজমহলের শরীর জুড়ে দেখা যায়। কেউ কেউ এই রূপ পরিবর্তনকে নারীর সৌন্দর্য বা নারীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক বৃটিশ চিত্র শিল্পী তাজমহলকে নিখুঁত মুক্তার সাথে তুলনা করেছেন। এক ফরাসি সাহিত্যিক তাজমহল সম্পর্কে বলেছেন ‘এটি একটি নিখুঁত বাড়ী, যা সম্রাটের প্রেম গর্বিত আবেগ এবং জীবিত পাথরের নীড়’।
এক চীনা পরিব্রাজক বলেছেন, তাজমহল তৈরী করে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।
তাজমহল থেকে মাত্র ২০ মিটার পশ্চিমে মসজিদ এবং সমান দূরত্বে পূর্ব দিকে নওকাব খানা। মসজিদে সাড়ে পাঁচ শত মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। শুক্রবার এলাকার মুসল্লীরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। এ কারনে শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। এই মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ কাজ দেখতে উপস্থিত হতেন প্রতিদিনই। তার বসার জন্য এবং দর্শনার্থীদের জন্য নওকাব খানা নির্মান করা হয়।
তাজমহলের অভ্যন্তরে তরল খাবার জাতীয় কোন কিছু নিতে দেবে না নিরাপত্তা কর্মীরা। সন্দেহ হলেই ব্লাক ক্যাট সদস্যরা জিজ্ঞাসা করেন তবে খুবই বিনয়ের সাথে। উপরের ফ্লোরে ওঠার সময় সাবধানে উঠতে হবে। মার্বেল পাথরের উপর যদি বৃষ্টির পানি পড়ে তা হয় পিচ্ছিল। যেহেতু আপনাকে খালি পায়ে বা পাদুকা ছাড়া (মোজা পড়া যাবে) তাজমহল পরিদর্শন করতে হবে। অতএব সাবধান।
যেহেতু আমার পূর্বপুরুষরাও ট্যাক্স দিয়েছেন ভারতের তৎকালীন সম্রাট শাহজাহানকে তাই আমিও সপরিবারে আমার বন্ধুর যুক্তি মোতাবেক ভারতীয় সেজে মাত্র ২০ টাকার টিকিট করে তাজমহল দেখেছি ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে। আমি এবং আমার স্ত্রী টিকিট কাটলাম দুটো। ছোট ছেলে রাতুল এর বয়স যেহেতু ৬ বছর, তাই ওর টিকিট লাগলো না (এখন অবশ্য অর্ধেক লাগে)। ১ নং গেইট দিয়ে তাজমহলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। মূল ফটকে এবং ভিতরের পরবর্তী প্রবেশ পথে দু’দফা মেটাল ডিটেকটর দ্বারা পরীক্ষা করা হলো। তাজমহলের সিড়িতে ওঠার সময় হঠাৎ করেই একজন সাদা পোষাকের ব্লাক ক্যাট অফিসার আমাকে ডাকলেন এবং খুবই বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন আর ইউ বাংলাদেশী ? আমি আগে থেকেই এরকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম। উত্তরে বললাম ‘নো আই অ্যাম ইন্ডিয়ান’।
এবার প্রশ্ন ‘হোয়াট ইজ ইয়োর এ্যাড্রেস?’ আমি ঝটফট উত্তর দিলাম ‘থ্রি বাই সেভেন, সল্টলেক, ক্যালকাটা’। এবার আবার প্রশ্ন হিন্দিতে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গলকা মূখ্যমন্ত্রীকা নাম কিয়া হ্যায় ?’ উত্তর দিলাম ‘বুদ্ধদেব ভট্টাচারিয়া’।
এবার আবার প্রশ্ন ‘ইন্ডিয়ান ফরেন মিনিস্টারকা নাম কিয়া হ্যায়?’ আমার উত্তর ‘যশবন্ত সিনহা’।
রক্ষা পেলাম। সাদা পোশাকের ওই ব্লাক ক্যাট আমার পিছু ছাড়লো। ভয়ে ভয়ে তাজমহল দেখে ফিরলাম। হোটেলে ফিরে আমার স্ত্রী আমাকে বললো আচ্ছা তুমি তো ঝটফট উত্তর দিলে। ওরা যদি আমাকে অথবা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করতো তা হলে কি হতো ? নির্ঘাত ধরা পড়তে হতো এবং জরিমানা গুণতে হতো মাথা পিছু দুই হাজার টাকা। সর্ব্বোপরি বিষয়টি হতো লজ্জাষ্কর। তখন বোধোদয় হলো তাই তো কাজটি করা তো মোটেই ঠিক হয়নি। তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি পূর্বপূরুষের দেয়া ট্যাক্সের টাকা ‘উসুল’ করতে পেরে মজাই পেয়েছিলাম ! আমাদের সফর সঙ্গী মকিবুল, শফি, শহীদ, রমজান ও জাহিদ ভারতিয় হিসাবে ২০ টাকার টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু গেইটে জিজ্ঞাসাবাদে ফেরত এসেছিলেন। আগ্রা যেয়েও তাদের তাজমহল দেখা হয়নি।
বিশ্বের ছোট বড় সব দেশের রাষ্ট্রনায়কগণ ভারতের আগ্রায় আসেন সপ্তম আশ্চর্য তাজমহল দেখতে। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার প্রায় সকল রাষ্ট্রপতি বা রাজা-রাণী তাজমহল দেখতে আগ্রা গেছেন। অথচ আমাদের সফর সঙ্গীরা তাজমহল না দেখেই ফিরে এলেন এবং প্রচুর টাকার কেনা-কাটা করলেন কোলকাতায় এসে ! পরে তারা আফসোসে ফেটে পড়লেন, আর বার বার বললেন সাড়ে সাত’শ টাকায় তাজমহল না দেখে তারা মহা ভুল করেছেন। একজন তো বলেই ফেললেন ‘এখন ৩২ লাখ কোটি টাকার তিন-চার গুণ খরচ করেও ওই রকম আর একটি তাজমহল নির্মান করা যাবে না। হায় রে কপাল ! কপালে নাই, তাই বিশ্ব সেরা শ্বেত শুভ্র তাজমহলের সাথে দেখা হলো না ’!
ফতেহপুর সিক্রির দূরত্ব আগ্রা থেকে ৩৫ কিলোমিটার। এটি একটি ঐতিহাসিক শহর। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে রাজপুত মহারাজা সংগ্রাম সিংহ ফতেহপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। সম্রাট আকবরের সৈন্য বাহিনী ৭ বার ফতেহপুর আক্রমণ করেন এবং ৭ম বারে ফতেহপুর দখল করেন। ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৮৫ পর্যন্ত সম্রাট আকবরের রাজধানী ছিল ফতেহপুরে। আকবর এর নামকরণ করেন ফতেহাবাদ। পরে এটি ফতেহপুর সিক্রি হিসাবে পরিচিতি পায়। এই শব্দের অর্থ ‘বিজয়পুর’। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে আকবর পুত্র জাহাঙ্গীরের বয়স যখন দু’বছর তখন পানির সংকট দেখা দেয়ায় আকবর রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেন। এছাড়া কৌশলগত কারনে বা পার্শ্ববর্তী উত্তর পশ্চিমের রাজপুতনারা আক্রমণ করতে পারে এমন ধারণা থেকে রাজধানী সরিয়ে নেয়া হয়। এখানেই রয়েছে রাজপুত রানী কুলদেবী’র (চামাদ দেবী) সমাধি।
দরবেশ সেলিম চিশতির সন্মানে ১৫ বছর ধরে ফতেহপুর সিক্রি গড়ে তোলা হয়। এটি ছিল পরিকল্পিত এক নগরী। মিয়া তানসেনের প্রিয় শহর ছিল ফতেহপুর। দুই মাইল দীর্ঘ এবং এক মাইল প্রস্থের সে সময় ছিল বিশ্বের অন্যমত শ্রেষ্ঠ শহর আর এই শহরকে এখন বলা হয় ভূতের শহর। এখানেই সম্রাট মোহাম্মদ শাহ এর সময় ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে মোঘল বংশের দুই প্রিন্স সৈয়দ হোসেন খান বরহা ভাতৃদ্বয়কে খুন করা হয়।
আগ্রা থেকে বাসে যাওয়া যায় ফতেহপুর। পর্যটকদের জন্য প্রতি ঘন্টায় দুপুর ২ টা পর্যন্ত আগ্রা থেকে বাস যায় ফতেহপুর পর্যন্ত। সূর্যাস্তের পূর্বেই ফতেহপুর ত্যাগ করতে হয়। বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবেশ পথ ‘বুলন্দ দরওয়াজা’ নির্মান করা হয় ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে। রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করার জন্য এক বছর ধরে এটি নির্মিত হয়। প্রায় ৪০ ফুট উঁচু বেদীর উপর বুলন্দ দরওয়াজা পথে সম্রাট আকবরের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতে হয়। দরওয়াজাটির সর্বোমোট উচ্চতা ৫৪ মিটার। দরওয়াজা পথে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়বে দরবেশ শেখ সেলিম চিশতির মাজার। কথিত আছে সম্রাট আকবর তাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং স্বপ্নে পুত্র সন্তান লাভের সুসংবাদ তাকে দিয়েছিলেন দরবেশ সেলিম চিশতি। শেখ সেলিম চিশতির জন্ম ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যু ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে। উঁচু এই আঙিনায় রয়েছে দেওয়ানী খাস, দেওয়ানী আম, ইবাদত খানা, মসজিদ, আকবরের স্ত্রী যোধা বাঈ এবং মুসলিম স্ত্রীর দুটি বাড়ি ও আকবরের নবরত্ন সভার সদস্য এবং প্রিয় মন্ত্রী বীর বলের ঘর। এছাড়াও রয়েছে টাকশাল, ট্রেজারি, সরাইখানা, ওয়ার্কশপ, দারোগার ঘর ইত্যাদি। দীন-ই-ইলাহী’র প্রচার কার্যালয়ও রয়েছে বিশাল এই চত্বরের দক্ষিন প্রান্তে। রয়েছে পাঁচ মহল এটি পাঁচ তলা একটি বিরাট ইমারত। উপরের তলা গুলো ক্রমশঃই ছোট। ১শ৭৬ টি গোলাকৃতির খাম্বার উপর স্থাপিত। ফতেহপুর সিক্রির সকল ইমারত লাল বেলে পাথরে তৈরী।
ফতেহপুর সিক্রি এক বিষ্ময়কর নির্মান। হাজার হাজার শ্রমিক ১৫ বছর ব্যাপী এই পরিকল্পিত শহর নির্মান করে। পানির সঙ্কট সেখানে আগেও ছিল এখনও আছে। এর পরেও ফতেহপুরের মানুষ অপেক্ষাকৃত নরম স্বভাবের। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ফতেহপুরে পুতুল নাচ, বানর খেলা এবং ভাল্লুক খেলা দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় নৃত্য-গান-বাজনার আয়োজন করা হয়।
বুলন্দ দরওয়াজা পর্যন্ত পৌছুতে বিশাল উঁচু সিড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠতে ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিবেন পাশের হোটেলগুলোর যে’টি পছন্দ হয় সে’টিতে। পাওয়া যায় খাসি এবং ভেড়ার মাংস। সবজী, ডাল ও মুরগীর মাংসও পাবেন। তবে সবকিছুর দাম-দর করে নেবেন। দাম বেশ চড়া।
আগ্রায় আরও যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেগুলো হচ্ছে : ১৫২৮ খ্রি: সম্রাট বাবর কর্তৃক নির্মিত আরাম বাগ। তাজমহল থেকে বাগানটির দূরত্ব ৩ কি:মি। সিকান্দ্রার দূরত্ব ১৩ কি:মি: এখানে রয়েছে সম্রাট আকবরের কবর। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মান করেন। অসাধারণ কারুকার্য খচিত কবরটির উপরে আল্লাহর ৯৯ নাম লেখা রয়েছে। দেখা যাবে ইতমাদ উদ দৌলা বা মীর্জা গিয়াস উদ্দিন বেগ এর সমাধী। মীর্জা গিয়াস উদ্দিন ছিলেন সম্রাট আকবরের মন্ত্রী পরিষদের অর্থ মন্ত্রী। আকবরের মৃত্যুর পর বিচক্ষণ গিয়াস উদ্দিন বেগকে সম্রাট জাহাঙ্গীর চীফ মিনিস্টার করেন। গিয়াস উদ্দিনের আনিন্দ সুন্দরী কন্যা মেহেরুন্নেসাকে জাহঙ্গীর বিয়ে করেন। এই বিদুষি মহিলা ১৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬২৮ পর্যন্ত ৬ বছরে পিতা গিয়াস উদ্দিন বেগের কবরে দৃষ্টিনন্দন ইমারত নির্মান করেন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।