সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্ত মো ইয়ানের সাক্ষাৎকার
ভাষাবদল: রথো রাফি, শনিবার, অক্টোবর ১৩, ২০১২


মো ইয়ান হলেন চীনের সবচেয়ে সম্মানিত ও খ্যাতিমান লেখকদের একজন, ইংরেজিতে ব্যাপকভাবে অনুদিত হয়েছে তাঁর লেখা, এক কৃষক পরিবারে জন্ম, ১৯৫৫ সালে, শানডঙ প্রদেশে। বিশ বছর বয়েসে পিপল লিবারেশন আর্মিতে নাম লেখান, আর সে সময় থেকেই গল্প লিখতে শুরু করেন। এরই মধ্যে রেড সারঘাম, বিগ ব্রেস্ট এন্ড ওয়াইড হিপস, লাইফ এন্ড ডেথ ওয়ারিং আউট আর সম্প্রতি, ফ্রগ সহ বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। এ সপ্তাহেই মো ইয়ান গ্রান্টা পত্রিকার সম্পাদক জন ফ্রিম্যান এর সাথে কথা বলেছেন, লন্ডন বই মেলায়, শক্তসমর্থ নারীদের নিয়ে লেখা বিষয়ে, অনুবাদেও তাঁর লেখার বাগবিধি আর রসিকতা বজায় রাখা, আর সেন্সরশিপ এড়ানো নিয়ে। সেই সাক্ষাৎকারটি এইদেশের চর্চাপাতার পাঠকের জন্য ভাষাবদল করেছেন কবি রথো রাফি।




..........................................
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: জন ফ্রি ম্যান
ভাষাবদল: রথো রাফি
..........................................



জন ফ্রিম্যান: আপনার অনেক উপন্যাসই আধো-কাল্পনিক এক শহরকে ঘিরে আবর্তিত হয়, যার পেছনে আসলে আপনার নিজের শহর গাওমি। বলা যায়, এ এক ধরনের মিল, ফকনারের আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের সাথে। এই আধো-কাল্পনিক শহরের আপনার ফিরে ফিরে আসার কারণটা কি, আর আসলে বিশ্বব্যাপী পাঠক পাওয়ার পরিণতিতে মনোযোগের জায়গাটাই নড়ে গেছে?

মো ইয়ান: আমি যে-সময়ে লিখতে শুরু করেছিলাম, সে-সময় ওই পরিবেশটা ছিলোতো সেখানে, খুব বাস্তব ছিলো, আর গল্পটাতো আমার নিজেরই অভিজ্ঞতা। তবে প্রকাশিত কাজের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে আমার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা ফুরিয়ে এলো, লেখালেখিতে কল্পনাকে একটু অনুমোদন দেয়ার দরকার পড়লো, এমনকি কখনো কখনো অতি-কল্পনাকেও।

জন ফ্রিম্যান: আপনার কিছু কাজ গ্রন্টার গ্রাস, উইলিয়াম ফকনার ও গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনার বেড়ে ওঠার সময়ে এসব লেখকের বই কি চীনে পাওয়া যেতো? আপনি কি বলবেন কাদের প্রভাব আপনার উপরে রয়েছে?

মো ইয়ান: আমি যখন প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন সেই ১৯৮১ সাল। ফলে আমি গার্সিয়া বা ফকনার পড়িনি। কেবল ১৯৮৪ সালে এসেই আমি তাদেরকে পড়ার সুযোগ পাই। আর নিঃসন্দেহে, আমার সৃষ্টিশীল কাজের উপর তাদের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আমি দেখতে পেলাম, আমার জীবনের অভিজ্ঞতা প্রায় তাদের মতোই, কিন্তু আমিতো তা আবিস্কার করলাম পরে। আমি যদি আগেই তাদেও পড়ার সুযোগ পেতাম, তাহলে আমিও এরইমধ্যে একটা মাষ্টারপিস লিখে ফেলতাম, যেমনটা তারা করে ছিলেন।

জেএফ: সরঘামের মতো প্রথম দিককার উপন্যাস অনেকটা ঐতিহাসিক, বা কেউ কেউ এমনও মনে করেন যে, এসব রোমান্স ধারার। সেক্ষেত্রে, সম্প্রতি আপনার লেখালেখি অনেক বেশি বর্তমান পটভূমি আর ভাবনা ঘিরে আবর্তিত। এর পেছনে কি কোন সচেতন রুচি কাজ করছে?

মো ইয়ান: যখন সরঘাম লিখছি আমি, মোটে ত্রিশ বছর বয়স আমার। বলা বাহুল্য-যে, তখন আমি খুবই তরুণ। সে সময়ে আমার জীবন অনেক কাল্পনিক বিষয়ে ভরা ছিলো, তখন আমার পূর্বপুরুষরা ছিলো আমার ভাবনার কেন্দ্রে। তাদের জীবন নিয়ে লেখালেখি করছিলাম তখন, যদিও আমি তাদের সম্পর্কে তেমন জানতাম না, তাই ওইসব চরিত্রের ভেতর আমি কল্পনাকেও মিশিয়ে দিয়েছিলাম। যখন আমি লাইফ এন্ড ডেথ আর অয়ারিং মি আউট লিখলাম, ততোদিনে আমার বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেছে। ফলে আমি তরুণ থেকে এক মধ্য বয়স্ক লোকে পরিণত হলাম। আমার জীবনেও ভিন্নতা এলো। আমার জীবনও অনেক বেশি হালনাগাদ, অনেক বেশি সাম্প্রতিক হয়ে উঠলো। আর আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের গলা-কাটা নিষ্ঠুরতা আমি যে-রোমান্স অনুভব করতাম তার রাশ টেনে ধরেছে।

জে এফ: আঞ্চলিক লাওবাক্সিং ভাষাতে আপনি প্রায়ই লিখে থাকেন, বিশেষ করে সেঙডন বাচনে, আপনার গদ্যকে রুখো-কাঁচবালির মতো তীক্ষ্ণতা দেয়। এ বাচন-রীতির কিছু কিছু বাগবিধি আর কৌতুকদীপ্তি ইংরেজিতে অনুদিত হওয়া সম্ভব হয় না এ বিষয়টি আপনাকে কি হতাশ করে? কিংবা অনুবাদক হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট-কে দিয়ে আপনি কি এসব কাজ করিয়ে নিতে পারেন?

মো ইয়ান: হাঁ, তাতো অবশ্যই, আমি বেশ পরিমাণেই আঞ্চলিক বাচনরীতি, বাগবিধি আর রসিকতা আমার লেখায় ব্যবহার করে থাকি, কারণ সে সময়ে আর অমিরিতো নয়ই, এমনকি চীনেরও প্রগতি ঘটেনি, কিন্তু প্রগতি নিজেই অনেক বিষয় আমাদের সামনে টেনে এনেছে, যেমন পরিবেশ ভাবনা আর নৈতিকতার স্খলন, আর সে কারণে আমিও ভাবি নি, আমার লেখা অন্য ভাষায় অনুদিত হবে। পরবর্তিতে আমি টের পেলাম, এ ধরনের ভাষা অনুবাদকদের অনেক ঝামেলায় ফেলে। কিন্তু এসব বাচন, বাগবিধি, রসিকতা না ব্যবহার করেও কাজ চলে-না আমার, কারণটা আর কিছুই নয়, বাগবিধি প্রযুক্ত ভাষা অনেক বেশি উদ্ভাসিত, এর অনেক বেশি প্রকাশক্ষমতা, আর একজন লেখকের নিজস্ব ভাষা মুদ্রার সাথে এ অবিচ্ছেদ্য। আর তাই, একদিক দিয়ে বললে, আমি কিছু রসিকতা ও বাগবিধির পরিমার্জন ও সমন্বয় করতে পারি, তবে অন্যদিক ভাবলে, আমি ভিন্নভাষায় যে-বাগবিধি ও রসিকতা ব্যবহার করি, আশা করি, অনুবাদকরাও তাদের কাজে এসবের প্রতিধ্বনি করতে পারবেন তা-ই যুক্তিসম্মত।

জেএফ: আপনার অনেক লেখার কেন্দ্রেই শক্তসমর্থ মহিলাদের দেখা মেলে বিগ ব্রেস্ট এন্ড ওয়াইড হিপস, লাইফ এন্ড ডেথ আর ওয়ারিং মি আউট, আর ফ্রগ আপনি নিজেকে কি নারীবাদী ভাবেন, নাকি নেহায়েতই নারী-প্রেক্ষাপটে লিখতে প্রলুব্ধ হয়েছেন?

মো ইয়ান: সবার আগে, আমি নারীদের গুণমুগ্ধ আর শ্রদ্ধা করে থাকি। আমিতো মনে করি তারা খুব মহৎজন। তাদের জীবন-অভিজ্ঞতা, আর কষ্ট সয়বার ক্ষমতা পুরুষের চেযে অনেক-অনেক বেশি। যখন আমরা বড়ো বড়ো বিপদআপদগুলোর মুখে লড়ে চলি, মহিলারা পুরুষের চেয়ে সবসময়েই বেশি সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকে আমি মনে করি, তাদের আসলেই সঠিক-সামর্থ্য রয়েছে, তারাতো মা। যে-শক্তি এ জাগিয়ে তোলে, তা এমনকিছু, যা আমরা ভেবে উঠতে পারি না। আমার বইয়ে আমি একজন মহিলার সু-য়ের ভেতরে নিজেকে রাখতে চেষ্টা করলাম, নারীর দিক থেকে আমি এ বিশ্বকে বোঝার, ব্যাখা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তলিয়ে দেখলেতো, নারী নই আমি: এক পুরুষ লেখক, আর যে-বিশ্বকে আমি ব্যাখ্যা করলাম আমার বইগুলোতে, সেখানে আমি আমি যেনো একজন নারী যাকে মহিলারাই ভালভাবে গ্রহণ করে নি, তবে সে নিয়ে আমার কিছুই করার সুযোগতো নেই। আমি ভালবাসি নারীদের আর তাদের খুবই গুণমুদ্ধ আমি।

জেএফ: এই সুক্ষকৌশলের প্রশ্ন কি সেন্সরশিপকে এড়াতেই, আর জাদুবাস্তবতা, অধিকন্তু অধিক প্রচল-রীতির চরিত্রায়ন কৌশল কতটাই বা এই পথ খুলে দিয়েছিলো, বহুমতের প্রতি সংবেদনহীন হয়ে গভীরতম বিষয়গুলোকে প্রকাশে এই পথ লেখকদের কতটা সহযোগিতা করে?

মো ইয়ান: হাঁ অবশ্যই, অনেক লেখকই এমন সাহিত্যের দিকে এগোয় যাতে রাজনৈতিক দায় রয়েছে, যেমন আমাদের বাস্তব জীবনে তীক্ষ্ণতা ও অতি স্পর্শকাতর কিছু বিষয় থাকতে পারে, যাদের গায়ে হাত পড়ুক তারা চায় না। এমন সংকটে, লেখক তার নিজের কল্পনাকে মিশিয়ে তেমন-বিষয়কে বাস্তব বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারে, কিংবা তারা হয়তো এই পরিস্থিতিটাকে ভাঁড়িয়েও তুলতে পারে এ প্রভাবশালী, উদ্ভাসিত, আর আমাদের বাস্তব জগতের ছাপই বহন করছে, এসব নিশ্চিত করেই। তাই আমি আসলে বিশ্বাস করি, এইসব সীমাব্ধতা বা সেন্সরশিপ লেখালেখির জন্য বড়ো সুযোগ।

জেএফ: আপনার শেষ বই যেটা ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হলো, অতিছোট একটা স্মৃতি কথার বই গণতন্ত্র। বইটি বালক ও একজন যুবক হিসেবে আপনার নিজের অভিজ্ঞতায় ধরা-পড়া চীনের একটা যুগের সমাপ্তি নিয়ে লিখিত। এ নিয়ে সেখানে একটা বিষাদঘন ভাব প্রবহমান রয়েছে, যা পশ্চিম থেকেই এসেছে, তা কিছুটা হলেও বিস্ময়কর: আমরা প্রায়ই বিশ্বাস করি ‘প্রগতি’, যা আদশায়িত আসলে, যা সবসময়েই অধিক ভাল অবস্থাকে নির্দেশ করে থাকে। কিন্তু আপনার স্মৃতিকথা এমনকিছুর প্রতি ইঙ্গিত করে যা হারিয়ে গেছে। এ কি সঠিক চরিত্রায়ন?

মো ইয়ান: হাঁ, আপনি যে-স্মৃতি কথাটির কথা বললেন, তা আমার নিজের অভিজ্ঞতা আর আমার প্রতিদিনের জীবনযাপন দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। আর অবশ্যই কিছুটা কল্পনাও রয়েছে বইটিতে। যে-বিষাদের কথা আপনি বলছেন, তা খুব সত্যি। কারণ আর কিছুই না, গল্পটি যে চল্লিশ বছর বয়েসের এক লোককে ফুটিয়ে তোলে, যে নিজের তরুণ-সময় নিয়ে ভাবছে যা আসলে হারিয়ে গেছে। এই ধরুন না, আপনি তরুণ ছিলেন যখন, কোন এক বালিকার সাথে প্রেমে পড়েছিলেন, আর যেকারণেই হোক সে এখন অন্যের গৃহিণী, এই স্মৃতিতো অবশ্যই বিষাদের। গত ত্রিশ বছর ধরে আমরা চীনকে দেখে আসছি, নাটকীয় অগ্রগতি হচ্ছে দেশটির, কি আমাদের নাগরিকদের জীবনমানের দিক দিয়ে, কি বুদ্ধিবৃত্তিক বা আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে। এই প্রগতি দৃশ্যমান। তবে নিঃসন্দেহে, আরো অনেক অনেক বিষয় রয়েছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে যা নিয়ে আমরা তুষ্ট নই। আসলে, চীনের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু এই উন্নতি অনেক বিষয়কে আমাদের সামনে এনেছে, যেমন পরিবেশ-ভাবনা, আর নৈতিকতার স্খলন। তাই, আপনি যে বিষাদের কথা বলছেন তা দুই কারণেই ঘটে,- আমি বুঝতে পারি যে, আমার তরুণ-সময় এরই মধ্যে গত, আর দ্বিতীয়ত, আমি চিনের সাম্প্রতিক সামাজিক সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি, বিশেষ করে যে বিষয়গুলো নিয়ে আমি নিজে খুশি নই।

জেএফ: ইংরেজিতে আপনার পরবর্তী বই কোনটি ?

মো ইয়ান: স্যান্ডওড প্যানাল্টি।