আল-বিরুনী প্রমিথের কবিতা
আল-বিরুনী প্রমিথ, শুক্রবার, অক্টোবর ০৫, ২০১২


জন্ম ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারী , দেশের বাড়ী নোয়াখালীর মাইজদী তবে বড় হওয়া থেকে শুরু করে বসবাস সব ঢাকাতেই । মোট ৫টি স্কুলে এবং ২টি কলেজে অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়েছে । শৈশব জীবন নানাবিধ কারনেই বিশেষ আনন্দের হয়নি । একান্তই ব্যক্তিগত নানাবিধ ঘাত - প্রতিঘাতের সাথে একাই যুঝেছি একটা নির্দিষ্ট সময় যাবত । চারপাশকে ঠিকঠিক বুঝতে শেখার তাড়না বরাবরই বোধ করেছি কিন্তু নানা সময়ই তা ধরা দিতে দিতেও কোনভাবে ধরা দেয়নি । সেই ফসকে যাওয়া সময়ের ইতিপর্ব শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে । ভবিষ্যতে যদি কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমার জীবনের সবচাইতে তাৎপর্য্যপূর্ণ সময়কালে কোনটি তবে উত্তর হিসাবে ২০১১ সালকে নির্বাচিত করতে কনামাত্র সময় নেবোনা । ২০১১ সাল আমার জীবনের রেঁনেসা যার ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের এই আমি ।


কবিতা সম্পর্কে ভাবনা

চারপাশের ঘুণে ধরা , পঁচে যাওয়া , ক্লেদাক্ত সমাজের খোলনলচে পাল্টে দেবার তাড়নাবোধ থেকেই সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ততা । যাত্রাপথের প্রতি পরতে পরতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা স্ট্যাবলিশমেন্টের দুর্গন্ধ চেতনায় চারপাশের প্রতি প্রবল ঘেন্না এনে দিয়েছে । সেই চেতনা থেকেই মার্ক্সবাদকে প্রতিনিয়ত সঠিকরুপে ধারণ করার চেষ্টা করে যাই । কবিতা বলি কিংবা কবিতা ব্যাতীত অন্য কোন সাহিত্য তার কোনটি সম্পর্কেই অগাধ জ্ঞান আমার নেই তবে স্বীয় উপলব্ধিতে এটুকু বুঝি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই সময়ে যখন প্রতিনিয়ত সময় , পারিপার্শ্বিকতা , সামষ্টিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ক্রমান্বয়ে বিপদসংকুল এবং স্থূল হয়ে পড়ছে তখন সাহিত্যে তার প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয় । রক্তাক্ত ইতিহাস , ক্লেদাক্ত দৈনন্দিন জীবনের ইতিগাঁথা যেই সাহিত্যে অনুপস্থিত তাকে গ্রহন করতে মন কোনভাবে সায় দেয়না । সেই সাহিত্য যা স্পষ্টভাবে সকল বাকচাতুর্যতা , ইনিয়ে - বিনিয়ে , ফেনিয়ে হাজারো শব্দের ঝনঝনানিকে মাড়িয়ে , পিষ্ট করে আমাদের সামনে সেই আদি ও অকৃত্রিম প্রশ্নটি এনে হাজির করবে ' তুমি কোন পক্ষে ? ' । চীনের সেই বোকা বুড়োটির মত স্বপ্ন দেখে যাই একদিন যেদিন আমি বেঁচে থাকবোনা আমার উত্তরসরীরা ঠিকই পেরে যাবে । আমি তাই পুতিগন্ধময় এই পারিপার্শ্বিকের জঞ্জাল সরাতে চেষ্টা করে যাই যেন তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও কম হয় , এই কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার মাঝেই এখন জীবনের সার্থকতা খুঁজে ফিরি , সফল হবো কি ব্যর্থ তার তার চুলচেরা বিশ্লেষন বেঁচে থাকলে বছর ২৫ পরেই না হয় দেওয়া যাবে ।




আলিঙ্গন

চাকচিক্যময় আলোকবর্তীকার বিপরীতে

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শহরে নির্লিপ্ত জনতার কোলাহল

জনতা পথ দিয়ে চলে যায় , হেঁটে বেড়ায়না ,

তমসাচ্ছন্ন রাতে এক ফালি চাঁদ

স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে আত্নপ্রেমাসক্ত ,
চৌরাস্তার মাঝপথে অর্ধ - উলঙ্গ বালিকার আলিঙ্গনে

নির্বিঘ্নে ঘুমায় তার সহোদর ।

আরো একটি দিন তাদের কেটে যায় ,

আরো একটি দিন চাঁদ ম্লান হয়ে

পরম মলিনতায় আলো বিকিরন করে ।

দাঁতে দাঁত চেপে বালিকা , সহোদরের লড়াইকে

যতদিন মেনে নিয়ে দিনানিপাত করা হবে ,

চাঁদের আলো ততদিন ফিকে রয়ে একপাশে

কিছু অন্ধ , বধির মানুষেরই থেকে যাবে ।


আলোড়নের প্রহর

উল্লাস - আয়োজনের কৃত্রিম মহোৎসবে

দাঁত চেপে পড়ে থাকি এককোনে , অপেক্ষারত ,

স্থূলতার নগ্নতায়

অপেক্ষার প্রহরের পালাবদলের

যবনীকা টেনে দিতে চাইনা ,
ঘুমিয়ে পড়ার পুর্বে জেগে উঠবার ধ্বনি

স্বরতন্ত্রীতে অনুরণন সৃষ্টি করবে , তার দিন বানাই ।

শরতে এক ঝাঁক বকের উড়ন্ত আত্মপ্রকাশ

বৃষ্টিস্নাত শেষ বিকেলে কাঠগোলাপের নিজেকে মেলে ধরা ,

দেখে আলোড়িত হই , ক্লান্তি আমায় স্পর্শ করেনা ।

জানি দুঃসহ এই সময়ে

অপেক্ষা করা অপরাধ ,

তবুও নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছি

প্রহর হয়ে আসছে , আলোড়নের প্রহর ।



আমার কোন সঙ্গী বেঁচে নেই

গাঢ় সবুজ
প্রবঞ্চনার পেয়ালায়
চুমুক দিয়ে চলেছি ,
বছরের পর বছর , বিরামহীন ।
উত্থিত নীল চাঁদ অবশেষে
প্রতিশোধ নিয়েছে আমার উপর ।
সেই নীল চাঁদ আজ
একরাশ ধূসর দীর্ঘশ্বাসের থালা ।
নিকষ কালো অপেক্ষা ছাড়া
আমার কোন সঙ্গী বেঁচে নেই ।

আরো একটি দিন বেঁচে থাকো বন্ধু

বন্ধু আমার , শুনে রাখো

নির্মম সত্য কথাগুলো বলবার জন্য

আগামীকাল তোমাকে ছিঁড়ে ফেলা হতে পারে ,

কিংবা পারে তোমার শিরদাঁড়া চুরমার করে দিতে

অন্ধকার ঘরে আটক থেকে তোমার কন্ঠস্বর স্তব্ধ হতে পারে
তারা তোমাকে ফাঁসীকাষ্ঠে হত্যা না করে ঝুলিয়ে রাখতে পারে ।

তোমাকে সীমাহীন যন্ত্রনা দিয়ে তারা অর্গাজমিক আনন্দ পেতে পারে

শীতল সাপ এঁকেবেঁকে চলে যেতে পারে তোমার মেরুদন্ড বরাবর ,

সূর্যাস্তের অপরুপ সেই দৃশ্য , গোধূলী আলোর নিকট তুমি যখন

নিজেকে সঁপে দিতে , তোমার সেই দৃশ্য আর দেখা নাও হতে পারে ।

তবু দিব্ব্যি রইলো তোমাকে , একসাথে কাটানো আমাদের ক্ষনস্থায়ী জীবনের

তোমার প্রিয়তমার চিবুকে রাখা হাতের প্রতিটি স্পর্শের দিব্ব্যি রইলো ,

সাথে রইলো সেই সব স্বপ্নীল রাতের দিব্ব্যি যাতে মগ্ন হয়ে আমরা

হৃৎপিন্ড বরাবর নিজেদের সত্যিকারের আশ্রয়াস্থল খুঁজে পেতাম ।

তুমি ফেরী করোনা নিজের আকাঙ্খাগুলোকে , আরো অন্তত একটি দিন

তুমি বেঁচে থাকো , বেঁচে থাকো তুমি তোমার চিন্তার মণিকোঠায় ।

অতিরিক্ত একটি দিন নিভু নিভু করে হলেও তুমি জ্বলতে থাকো ,

তুমি জ্বলতে থাকলে সহস্র বছর বন্দী থাকা প্রাণগুলো শ্বাস নেবে

ভয় দমিয়ে রাখা উপেক্ষাকে ভ্রুকুটি করে বেঁচে থাকো তুমি আরেকটি দিন

তুমি বেঁচে থাকলে প্রজ্জ্বলিত আকাশের প্রদীপ কখনো নিভে যাবেনা ।


আত্মসমর্পন

বন্ধুবরেষু আমার ,

বহুদিন পর আজ

কিছু লিখতে বসেছি তোমাকে ,

শিল্পমন্ডিত কোন উপাখ্যান রচনা করছিনা

তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবোনা তোমার কাছে ,
তোমার ভাবনা ছিনতাই করে হয়েছিলো , চিন্তারাজিকে

কি নির্মমরুপে পিষে ফেলা হয়েছিলো দেখেছিলাম ,

দেখাটাই বুঝি সার ছিলো , অনুভূত হয়নি তবু ।

নিস্তরঙ্গ প্রতিটি আলোকজ্জ্বল রাত্রির রিক্ততা

বর্শার ফলার ন্যায় এখন আমার বুকে বিঁধে যায়

অক্ষমতার পুঁজ হতে সৃষ্ট মধ্যবিত্ত অহংকার

ভাবনাকে বিকশিত হবার পূর্বেই ছেঁটে ফেলছে ।

এখন দিনের প্রতিটি নিঃসঙ্গ পথযাত্রা ,

ক্ষুদ্রক্ষুদ্র একেকটি মাহেন্দ্রক্ষন ভেবে যাকে

পরম ভালোবাসায় পূর্বে আপন করে নিতাম ,

আমাকে তীব্র ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করে ।

আগে সহমর্মীতায় দেখতে পেতাম

এখন সহযোদ্ধার মর্মব্যাথায় উপলব্ধি করি

চিন্তারাজি ছিনিয়ে নেওয়া হলে প্রতিটি শিরায়

ব্যাখ্যাতীত রক্তক্ষরনে কিভাবে মন ধ্বংস হয় ।

জীবনানন্দ সেই কবে বলে গিয়েছিলেন

“ সময়ের কাছে সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়

কি কথা ভেবেছি আর কি করেছি “

কিন্তু দেখো , কি ভেবেছি আর কি করেছি

এই ভাবনার সময়টুকুও আমাদের দিতে কত ভয় ।

আমরাও কত সহজে মেনে নিয়েছি সব বিনা দ্রোহে ,

এই আমাদেরই কাল ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে

আত্মসমর্পনের জ্বলজ্যান্ত , নির্মম প্রতিচ্ছবি বলতে

মানুষ আমাদেরই বুঝবে , এ আর আশ্চর্য কি ?


দাসত্বের ঘন্টা

অতঃপর তারা জানাজা পড়ে ,

নিয়ম মানতে না চাওয়া মানুষগুলোকে কারারুদ্ধ করে

পিশাচরা খলখলিয়ে হাসে , সুবিশাল অট্টালিকা

সভ্যতার বুকে প্রহসন হয়ে নিরন্তর ,

দাসত্বের ঘন্টা বাজাতে থাকে , ঢং ঢং ঢং ঢং ।


দগদগে সেই ঘা

ঘড়িতে বেজে
রাত দশটা পয়ত্রিশ ,
রাস্তার ক্ষয়িষ্ণু আলো
আমাকে স্বাগত জানাবে
ভেবে রাস্তায়
পা বাড়িয়েছিলাম ।
আমি প্রতারিত হয়েছিলাম ,
গাছের প্রতিটি পাতা
ঠায় দাঁড়িয়েছিলো ,
বাইরে বেরুতেই
সড়কের বাঁ দিকের ডাস্টবিন
মনে করিয়ে দিয়েছিলো
পথ পাড়ি দেওয়ার বহুদূর বাকি ।
পথের ধারে পড়ে থাকা
গলিত লাশের দুর্গন্ধ
পুনরায় আমাকে
নরকের স্বাদের উপহার দিয়েছিলো ।
মুক্তি ভেবে
যার আলিঙ্গন চেয়েছিলাম
তার নির্মমতার দগদগে ঘা
পিঠে বয়ে চলেছি আজও ।
প্রবল সোল্লাসে ,
শকুনেরা শত হৃদয়ে
আর্তনাদের বেহুলা বাজিয়ে
উধাও হয়ে যাচ্ছে নিমেষে ।
আপোষকামীতা আমার
পরম যত্নে লালিত
একমাত্র এজমালি সম্পত্তি ।
যাকে বুকে আকঁড়ে ধরে
আমি ঘরে ফিরে আসি ।
সেই দগদগে ঘা আজও বয়ে বেড়াই ,
দগদগে সেই ঘা আমাকে অপরিচিত করে রাখে ।

ফেরানোর কেউ থাকেনা

তুই লিখেছিস ,

" কদম ফোঁটার আগেই

পাতা বিসর্জিত হয়েছিলো ,

ক্রমান্বয়ে বিমূর্ত মরুভূমিতে

বিমূঢ় বৃহ্মটি অবশেষে ঠাঁই নেয় । "
তোকে বলিনি বুঝি কখনো

আত্মপ্রেমী প্রতিটি সত্ত্বা আজ অন্ধ ,

কি অবিনশ্বর সেই নেশা জানিসনা ।

সত্ত্বাগুলো গোধূলীর আলোর ব্যাথা বোঝেনা

ক্রমাগত বিস্মৃত হতে থাকি আমরা ,

মানুষগুলো এক সময়ে পাশ ফিরে চলে যায়

মোমবাতির মত ক্ষয়ে যেতে থাকে দৃষ্টি ।

তুই আরো লিখেছিলি মনে আছে ,

" পৃথিবীর নগ্ন মানুষেরা

নগ্ন চাহিদার হূল ফোটালো

চরম উল্লাসে ,

অন্ধকার ঘনীভুত হলো

দূর পাহাড়ের গায়ে , ক্রমশ ধীরে " ......

কিন্তু বেলা শেষে আলো ক্ষয়ে আসে অবশেষে

ব্যাক্তিক শাসনের জয়রথে বিভেদের প্রাচীর ,

গড়ে উঠতে থাকে প্রগতির বুকে , নিমেষে ।

সভ্যতার আবরনের ঘ্রাণ নিতে নিতে

জ্ঞানলুপ্ত হতে থাকে মানুষ , ক্রমশ ।

মিলিয়ে যায় দূর অরন্য , বিলীন হতে থাকি

আমি , তুই , আমরা , সময় এগিয়েই যায়

অতঃপর এক সময়ে সব শূন্য ।

আমাদের অস্তিত্ত্বের ধ্বংসাবশেষ

সময়ের করুণায় এদিক - ওদিক পড়ে থাকে ,

সবশেষে নিঃস্বতার পুকুরে নির্মম অবগাহন

ফেরানোর কেউ নেই , কে ফেরাবে ?



কবিতাটি বন্ধু রাওয়ান সায়েমাকে উৎসর্গ করা হলো ।

গ্রন্থে কিছু লেখা ছিলোনা


পথিক হাঁটে
পথ বিকোয় ,
গ্রন্থে এই কথাটি
কখনো লেখা ছিলোনা ।

বেনিয়া চষে বেড়ায়
দূর হতে দূরান্ত ,
ক্লিশে হয় সভ্যতা
জন্ম ত্থেকে জন্মান্তর ,
গ্রন্থে এই উপলব্ধির কথা
কখনো বলা ছিলোনা ।

খেলে চলেছি আমরা
ভেবে চলেছি নিরন্তর ,
সবাইকে খেলিয়ে বেড়াচ্ছি ।
নাটাইটা আমাদের হাতে নেই ,
যাদের হাতে তাদের দেখার
চোখ হারিয়ে ফেলেছি ,
গ্রন্থে এই সত্যটি
কখনো বর্ণিত ছিলোনা ।

পাখিরা উড়ে চলেছে
মাছেরা সাঁতার কেটে চলেছে ,
আকাশ , নদী আজ
নিলামে কেনাবেঁচা হয় ,
গ্রন্থে এই হাহাকার
কখনো মূর্ত ছিলোনা ।

আমরা বলে চলেছি ,
আমরা পদানত করে চলেছি ,
অক্ষম পৌরুষের আস্ফালনে
মাড়িয়ে চলেছি চারপাশ ,
কিন্তু আমাদের গ্রন্থে
আমরাই ছিলাম অদৃশ্যমান ।
শত দীর্ঘশ্বাসের ইতিবৃত্ত
গ্রন্থে কখনো লেখা ছিলোনা ।


জলাঞ্জলি

একটি উজ্জ্বল কালো মাছ
সুনিপুণ আত্মমগ্নতায়
পুকুরে খেলা করতে থাকলো ,
আত্মপ্রেমী রুপবতী যুবতী ,
পূজার আড়ালে যাদের
দাস করে রেখে দিয়েছে
শকুনেরা , শতাব্দী ব্যাপী
ভ্রকটি করে পাশ দিয়ে
হেঁটে চলে গেলো ।
পাখিরাও আজ
আমাদের প্রত্যাশায়
অপেক্ষা করেনা ,
উপেক্ষার ভাষা
শিখে নিয়েছে তারাও ।
অনুভূতির স্কন্ধে
হাত রাখার পূর্বেই
সব ছেড়েছুড়ে
পাখিগুলো চলে যায় ।
প্রবল বিপন্নতায়
তিমির রাত ক্রমশ
নিকটতর হচ্ছে , এই বুঝি
সেকেন্ডের শেষ কাঁটা
পালাবার শেষ সুযোগও
ছিনিয়ে নেবে আমাদের থেকে ।
কিছু সময় বেঁচে আছে
এসো তবে , দেরী নয় ,
পথিকের ভাষা শিখে নেই ।
পথিক আত্মপ্রেমী নয় ,
আত্মমগ্নতাকে তুড়ি মেরে
কিভাবে হাসতে হাসতে ,
সামনে তাকিয়ে পথ চলতে হয়
পথিকের জানা আছে ।
বহুদিনের বিটুমিন না পড়া
ঝলসানো রাস্তায় অবশেষে
আত্মমুখীতাকে জলাঞ্জলি দেই ।


জয়রথ

চলতি পথে যাত্রা

সামান্য কোলাহলেই

জয়োল্লাসের মাতম চারিদিকে ,

কত শত ফুল প্রস্ফুটিত হয়ে

আলোকজ্ব্বল করতো গন্তব্যস্থল ,
অবশেষে শোনা যেত সেই

অশ্রুতপূর্ব বিজয়সঙ্গীত ,

সেই খবর রাখতে চাইনা ।

রাখলে কোলাহলকে

গন্তব্য বলে ভ্রম হতোনা ,

ঠিক ঠিক পৌঁছে যেতাম

যেখানে যাবার স্বপ্ন দেখেছি

যেখানে পৌঁছানো ছাড়া

জীবনের প্রতিশব্দ ,

গলায় পেঁচিয়ে থাকা এক

অদৃশ্য সাপ বৈ কিছু নয় ।

শপথ ভালোবাসিনি কখনো

তবু স্বপ্ন দেখি শপথ হোক

শুভ্র – হলুদ কাঠগোলাপের ,

শপথ হোক উজ্জ্বল , প্রখর

লাল কৃষ্ণচূড়ার ,

গন্তব্যেই শুরু হোক

জয়ঃধ্বনির সঙ্গীত ।


ক্লান্তি স্পর্শ করেনা

উল্লাস - আয়োজনের কৃত্রিম মহোৎসবে

দাঁত চেপে পড়ে থাকি এককোনে , অপেক্ষারত

স্থূলতার নগ্নতায়

অপেক্ষার প্রহরের পালাবদলের

যবনীকা টেনে দিতে চাইনা ,
ঘুমিয়ে পড়ার পুর্বে জেগে উঠবার ধ্বনি

স্বরতন্ত্রীতে অনুরণন সৃষ্টি করবে , তার দিন বানাই ।

শরতের বিকেলে এক ঝাঁক বকের উড়ন্ত আত্মপ্রকাশ

বৃষ্টিস্নাত শেষ বিকেলের কাঠগোলাপের নিজেকে মেলে ধরা ,

দেখে আলোড়িত হই , ক্লান্তি আমায় স্পর্শ করেনা ।


মানুষটি আমাদের ঘৃণা করে

অর্ধমৃত শহরে
জীবন্মৃত মানুষদের ভীড়ে ,
আপাদমস্তক জীবন্ত , তেজোদ্দীপ্ত
মানুষটিকে প্রশ্ন করেছিলাম
আপনি কোথায় থাকেন ?
তার ক্রুর হাসি , ব্যাঙ্গাত্বক চাহনীতে
নিজেকে সার্কাসের ভাঁড় মনে হয়েছিলো ।
মৃত্যু উপত্যকায় জীবন্ত মানুষদের নিজ
একটি ঠিকানা থেকেও বঞ্চিত রাখা হয়
এই সত্য উপলব্ধি না করাটা বিলাসীতা ,
মধ্যবিত্তীয় সৌজন্যতাবোধের ন্যায় তা ধারন করে
বিষধর সাপের দংশনের অবয়ব ।
মানুষটির বুকপকেটের কাছে বুলেটফাঁটা দাগ ছিলো
মানুষটি মাথা নিচু করে হেঁটে চলে গিয়েছিলো ,
তীব্র ঘৃণায় পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছিলো
তোমাকে , আমাকে , আমাদেরকে ।


নেক্রোপলিস

বিপর্যন্ত নগরী
তোমাকে নেক্রোপলিস
উপহার দিয়ে পালিয়েছে ,
শরীরের ভাঁজ়ের খোঁজে
ওৎ পেতে থাকা প্রেমিক
যেমন কার্য সিদ্ধি হলেই
নিরুদ্দেশ হয়ে যায় ।
কোন এক বিস্মৃত হওয়া কালে
জীবনানন্দ বলে গিয়েছিলেন ,
অর্থ , কীর্তি , স্বচ্ছলতা ছাড়াও
এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তে খেলা করে ।
আরবান , আপরাইজিং সোসাইটি
তোমাকে আজ নিঃস্ব করে পালিয়েছে ।
কোন বিপন্ন বিস্ময় তোমার অন্তর্গত রক্তে
আজ আর খেলা করেনা , পালিয়ে বেড়ায় ।
পথিক থেকে বণিক হতে গিয়ে
বিস্ময় তোমার থেকে ধুয়েমুছে গেছে ।
তোমার জীবনের প্রাপ্তি বলতে বুঝি ,
আলবেয়ার কামুর উপন্যাসের নায়কের চেয়েও
তুমি অনেক বেশী নির্মম হয়েছো ।


সূর্যাস্ত এবং একটি অনাহূত লাশ

ঘন্টা থেকে মিনিট , অতঃপর

সেই সময় সেকেন্ডে এসে

ঠায় দাঁড়িয়ে পড়েছে ।

যখন সে ভাবছিলো তার চুলগুলো

এখনো কুচকুচে কালো আছে ,
তার চোখ দুটো আজও হারায়নি

অন্যরা যা খোলা চোখে দেখেনা

তা দেখে নেবার অদম্য স্পৃহা ,

সূর্যাস্তের শেষ আলো তাকে

বরন করেছিলো নিবিড় মমতায় ।

অস্ফূট স্বরে বলতে পেরেছিলো

তোমরা দেখো আমার রক্তও লাল ,

আমি অনেক ভালোবাসতাম

চিন্তা করতে , কিন্তু তোমরা দিলেনা ।

তার চারপাশে ঘুরতে থাকা মাছিগুলো

সাথে দূর থেকে ছুটে আসা কুকুরটি ছাড়া

মানুষটির সঙ্গী আর কেউ হতে চেয়েছিলো

এই কথাটি আমরা কেউ বলতে পারিনি ।