হুমায়ূন আহমেদ, মার্কসবাদ ও হাইব্রিড জার্নালিজম
জাহেদ সরওয়ার, শনিবার, আগস্ট ১১, ২০১২


হুমায়ূন আহমেদ ইন্তেকাল করেছেন। তাকে নিয়া হুদা-বেহুদা বহুত কথাবার্তা চালু হচ্ছে। কোনো অতিবিজ্ঞাপিত মানুষ মরলে এইটা স্বাভাবিক। দুইচোখ মেলে দেখতেছি। কেউ কেউ কাল্পনিক এশকের ঠেলায় তাকে বড়ছোট করতে জগতের সব লেখক, ভাবুকদের ভলিউম বাড়াচ্ছেন, কমাচ্ছেন। বাংলাদেশে, বই পড়ে অথচ হুমায়ূন আহমেদ পড়ে নাই সেরম পাঠক নাই। শ’ শ’ উপন্যাসের অন্তত কয়েকটাতো পড়েছেই। নিজেরাও পড়েছি। তার প্রথম উপন্যাসতো বলতে গেলে ফর্জ ছিল। বার কয়েক পড়েছি। মনোজগতের এই টানাপোড়েন, দৈহিক জগতের অচেনা রন্দ্র পাঠের জগতে খানিকটা অচেনা লাগে। পরে অবশ্য ফ্রয়েডকে মনে পড়ে গিয়েছিল।



খুবই স্বাভাবিকভাবে এরপর হুমায়ূন আহমেদ তার লেখার ভঙ্গি বদলেছেন। পরেও আরো অনেক উপন্যাস পড়েছি। বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, মফস্বলের পত্রিকার স্টল, থানাসদরে নোটবই বিক্রির দোকানে সবখানে তার অজস্র বই পাওয়া যায়। সে গুলো ৩-৫ ফর্মার ভেতর ঘোরাফেরা করে। এরকমও ঘটেছে একদিনে দুইটাও শেষ করা গেছে। পরে তার নভেলে আর সেরম ইউরোপিয় দৈহিক মানসিক কমপ্লেক্সিটি, টেকনিক হিসাবে আসে নাই ফলে তিনি বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে সহজেই জায়গা দখল করেছিলেন।

তবে মনোজগতের অন্য একটা এলাকায় তিনি প্রবেশ করেছিলেন। যেটাকে আমরা বলি শ্রেণিচেতনা। হুমায়ূনের প্রায় লেখার মধ্যেই সর্বহারা জাতীয় একটা না একটা চরিত্র থাকবেই। হুমায়ূনকে যারা কাহিনীর যাদুকর বলে তাক লাগাচ্ছেন। তাদের সাথে একমত হওয়া কঠিন। হুমায়ূনের এই সফলতার পেছনে আছে ভাষা। ডায়লগের ভেতর থেকে এন্টিডায়লগ তৈরির খেলা। দুইটা চরিত্র হুমায়ূনের প্রায় নভেল নাটকে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এখনো। মধ্যবিত্ত আর সর্বহারা। সামন্ত আর সর্বহারা।



হুমায়ূনের কাহিনী এমন কোনো আহামরি কিছু না। হয়তো একটা জার্নি। রেলে, গাড়ীতে, ভ্যানে ইত্যাদি। অথবা কোনো ভঙ্গুর জমিদার পরিবার। সামন্তীয় অহঙ্কার আর সর্বহারার অসহায়ত্ব। এই দ্বান্ধিক পদ্ধতিতেই এগিয়েছে তার কাহিনী আর সংলাপ। ‘তুই জানস তোরে কইছে’ ‘শরবতের মইধ্যে একটা মরিচ ভাইঙ্গা দিমু’। হয়ত কোনো সামন্তীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অথবা শরবত দেবার আদেশের বিরুদ্ধে এই এন্টিডায়লগ তৈরি হয়েছে। কিন্ত সেই সর্বহারা চরিত্রগুলা শেষ পর্যন্ত এই ডায়ালগেই আবদ্ধ থেকেছে। এই এন্টিডায়লগ উৎপাদনের পরও সর্বহারা চরিত্রগুলা প্রদত্ত আদেশ পালন করেছে যেন কিছুই হয়নি সেরম ভাব নিয়া। কিন্তু এই যে আদেশের বিরুদ্ধে সাথে সাথে অ্যাকশন এটা একটা প্রস্তুতি।



জানতে পারি নাই হুমায়ূন মার্কস পড়েছিলেন কিনা। কিন্তু তিনি মার্কসের সাহিত্য মানসের থেকে খুব দূরে ছিলেন না। হুমায়ূন না পড়া মার্কসবাদী অথবা মার্কস না পড়া হুমায়ূনিদের লগে আমি এই তর্ক করতে অনিচ্ছুক।হুমায়ূন আহমেদকে মার্কসবাদী প্রমাণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ মার্কসবাদ আকাশ থেকে পড়ে না। জগতের প্রতিটি খণ্ড খণ্ড সমাজ, রাষ্ট্র যেই দ্বান্ধিকতার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে মার্কস সেটা আবিস্কার করার চেষ্টা করেছেন মাত্র।



হুমায়ূন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তরুণ সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদ তার জনপ্রিয় সাহিত্য, বাজারি সাহিত্য, সিরিয়াস সাহিত্য নামের রিপোর্টে বলেন ‘অজনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ছোট লেখকরাও নিজেদের বড় লেখক বলার সুযোগ পাচ্ছেন তার একটা শক্ত প্রেক্ষাপট আছে। এই প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে, একটা ভুল ভিত্তির ওপর। এর মূল সুর মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বের সমাজ-বাস্তবতা, নিম্নবর্গ-প্রীতি, লড়াই-সংগ্রাম, নিম্নবর্গের পিঠচাপড়ানি। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা এ সাহিত্যে পরিত্যাজ্য। এলেও আসতে হবে নেতিবাচকভাবে’।

শ্রেণি না বুঝা একজন হাইব্রিড সাংবাদিকের স্বমস্তিস্কপ্রসূত বা প্রকল্পভিত্তিক এই তথ্য সন্দেহ নাই। তারও চেয়ে বড় কথা হচ্ছে এইটা ধান ভানতে শিবের গীতের মত লাগে। যেন তিনি ভুল ভিত্তি আর মূলভিত্তি চিহিৃত করবার ওহি পেয়েছেন।



মার্কসবাদে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা পরিত্যাজ্য এমন কথা স্বয়ং কার্ল মার্কসও বলেন নাই। কারণ সমাজ বাস্তবতাকে বুঝার ক্ষেত্রে সাহিত্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে ধরা হয় মার্কসিয় সাহিত্যতত্ত্বে। মধ্যবিত্ত এমন একটা শ্রেণি যারা সমাজ পরিবর্তনের মূল কাঁচামাল না হলেও মূল পরিকল্পনাকারী। কারণ তারা থাকেন সর্বহারা আর সর্বপাওয়াদের মাঝখানে। দুইশ্রেণিরই লিয়াজো হিসাবে। কার্ল মার্কসও ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। জগতের অজস্র বিপ্লবী লেলিন, স্তালিন, মাও, চে, কাস্ত্রো, চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত প্রমূখ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। মধ্যবিত্তের চরিত্রটাই হচ্ছে টলটলায়মান। মধ্যবিত্তের কাজই হচ্ছে উচ্চবিত্তের শোষণের সহযোগিতা। এছাড়া সে বাঁচতে পারে না। কিন্তু তার একটা অংশ সবসময় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ার সাথে সাথে সর্বহারায় পরিণত হয়। আর একটা অংশ ক্রমাগত উপরের দিকে ধাবমান।ফলে দুইদিকটাই তার অভিজ্ঞতার আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে তার চেতনার এলাকা প্লাবিত হয় সবার আগে। এই টলটলায়মান জীবন সর্বহারাদের চেয়েও মারাত্মক। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের তত্ত্বগত অস্থিরতা মধ্যবিত্ত সমাজেই দেখা দেয় সর্বাগ্রে। জগতের অধিকাংশ সাহিত্যই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাই উৎপাদন করে।



১৯৫১ সালে মার্কিন প্রশাসন ‘পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট রুখতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি’ নামে একটি প্রকল্প খাড়া করেছিলেন। সম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের পুরানা গোপন নথিপত্র, যা এত দিন সিক্রেট বা ক্লাসিফায়েড বলে বাক্সবন্দী হয়ে পড়েছিল, তা খুলে দিয়েছে। ফলে এই নথিটি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। (http;//www.icdc.com/paulwolf/Pakistan/pakindiawars.htm#bangladesh)

এই প্রকল্পে কমিউনিস্টকে ভুল প্রতিপন্ন করতে অনেকগুলা উদ্যোগ নেয়া হয়, বিভিন্ন সেক্টরে।

এর একটা পয়েন্ট ছিল এরকম: যেসব তথ্যমাধ্যম ব্যবহৃত হবে: সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা (বই ও পুস্তিকা), গ্রাফিক আর্টস। (আমি পুরা রিপোর্টটা পাঠকদের পড়তে অনুরোধ করবো। কারণ আমাদের চিন্তা জগতে এই প্রকল্পটার মারাত্মক প্রভাব এখনো নিরন্তর প্রবাহিত)



এই জিনিস খুব সফলতার সাথে সেই ৫১ সাল থেকে ক্রমে ক্রমে এই দেশটির সাংস্কৃতিক আবহে এমনভাবে মিশে গেছে যে নিজেরাই আমরা এখন সেসব এজেন্ডা সামনে নিয়া আসছি। আমাদের এই সাংবাদিকটিও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি হয়তো এই প্রকল্পের অংশ, নয়তো তার নিজের অজান্তে তিনি সক্রামিত। তিনি বাজার ব্যবস্থার কথা বলেন। সব সাহিত্যকেই বাজারি সাহিত্য বলে তকমা মারেন। তাইলে বলতে পারি পত্রিকা আর ম্যাগাজিনের আড়ালে সবচাইতে বেশি বাজারজাত হয় পর্ণ মেগাজিন। লেখকদের কি উচিত নয়, সাহিত্য-ফাহিত্য ছেড়ে পর্ণসাহিত্য করা? বাজারের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যতো তাই যেখানে লাভ সেখানে বিনিয়োগ।



বাজার ব্যবস্থা ও পণ্যের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জনপ্রিয়তা সম্পর্কে যে ভুল ধারণা আমাদের সমাজে আছে তা বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেওয়া। বাজারি কথাটার মতো আরেকটি কথা শস্তা জনপ্রিয়তা। বস্তুত, জনপ্রিয়তাই মূল্যবান। যা লোকে কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে স্বেচ্ছায় কিনছে নিশ্চিতভাবেই সেটি তার অবশ্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর তালিকায় আছে।’



সাংবাদিকদেরও অর্থনীতি পড়ার প্রয়োজন আছে। না হলে এরকম গায়ের জোরে সবকিছুকে ভুল প্রতিপন্ন করতে থাকবেন। এই ঢাকা শহরের কথাই বলি প্রতিদিন সকালে অফিসের বা কাজের উদ্দেশ্যে বেরুনো এক লোক ডানে বামে সামনে পিছনে চলমান বাসের ভেতরে বাইরে অথবা রাস্তার ধারে, ফুটওভার ব্রিজে অথবা সংবাদপত্রে অথবা বাসায় চলতে থাকা টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে নিরন্তর যেই জিনিসটার মুখোমুখি হয় তার নাম বিজ্ঞাপন। ‘জনপ্রিয়তা’ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বানিয়ে তোলা ব্যাপার। পাঠকপ্রিয়তা আর জনপ্রিয়তা একই মাল নয়। । কোম্পানির অজস্র বিজ্ঞাপন নিজের অজান্তে ভোক্তার সম্মতি উৎপাদন করে। বাণিজ্য খানিকটা দানবীয় ভাবে নিজের পণ্য বিজ্ঞাপিত করে জনপ্রিয় করে তোলে। এছাড়াও আরো নানান কৌশলে একেকটা পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলা হয়। যে বস্তু দিয়া সবচাইতে বেশি পণ্যকে জনপ্রিয় করে তোলা যায় তা হচ্ছে যৌনতা।



তিনি আরো বলেন ‘এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আপনি আমাকে এমন কোনো লেখকের নাম বলতে পারবেন যার লেখা মানহীন, বিষয়বস্তু শস্তা অথচ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে যাওয়া লাগেনা। দেশেই ইমদাদুল হক মিলন, প্রণব ভট্ট, আনিসুল হক, সুমন্ত আসলামের মত লেখকরা জনপ্রিয় কি কারণে। এদের বইগুলার ভেতর কি মাল আছে, সে গুলা কি উল্টানো যায়? রাজনৈতিক কারণেই বাংলাদেশকে দ্বিজাতিতত্ত্বে ভাগ করা হয়েছে। আওয়ামী জাতি আর বিএনপি জাতি। নির্মলেন্দু গুণ বা আল মাহমুদতো স্রেফ আওয়ামীলীগ ও জামাত হওয়ার কারণে জনপ্রিয়। স্ব স্ব জাতির কাছে তারা মহীরূহ। স্ব স্ব বুর্জোয়া পার্টির কবি তারা। দুয়েকটা কবিতা ছাড়া গুণের লেখার মধ্যে কি আছে? হরেম রকমের নারী সঙ্গমের বাসনা, আওয়ামীলীগের দালালি মার্কা শস্তা কবিতা বাদ দিলে কী থাকে? আল মাহমুদের দু'একটা কবিতার বই বাদ দিলে শস্তা যৌন শুড়শুড়ি মার্কা গদ্যগুলো আর জামাত মার্কা স্মৃতিকথাগুলা কি পড়া যায়? তিনি নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। কোথায়, কলকাতায়? লক্ষ লক্ষ নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে বেঈমানী করেছেন তিনি। তিনি এখন ঘাতকদের কবি। আওয়ামীলীগ বিরোধীতা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা এক জিনিস নয়। আওয়ামীলীগও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি নয়। তারা বিজয় ছিনতাই করেছে মাত্র। দেশের তথাকথিত লেখকরা কোনো না কোনো এজেন্ডা নিয়া জনপ্রিয় হচ্ছে। এটার সাথে জড়িত রাজনৈতিক অর্থনীতি।



তিনি বলেন, ‘অপরের উপকার করার মিশনারি চিন্তা, পেটিবুর্জোয়া পাপবোধ সর্বোপরি পলায়নপরতা আমাদের সাহিত্যকে জীবনের স্পর্শবিহীন, দিশাহীন এক জায়গায় নিয়ে গেছে। বিগত ষাট বছরে আমাদের সাহিত্য মহাকালজয়ী লেখকদের হাতে কী ঘোড়ার আন্ডা প্রসব করেছে তা আমরা সবাই জানি।’



না আমরা জানি না। এরকম স্ববিরোধী কথার সাথেও একমত নই। অপরের উপকার কিরূপে পলায়নপরতা হয় বুঝি না। আর উপকার পাওয়া ছাড়া কোনো সাহিত্য কালজয়ী হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। পাঠকের জানা থাকলে বলবেন। তলস্তয়ের `পুণরুজ্জীবন' সম্পর্কে বলা হয় পাঠের আগের পাঠক আর পরের পাঠক এক থাকতে পারে না। আন্না কারেনিনাও তাই। জোলার নানা, সয়েলকে কি উপকারী সাহিত্য বলবনা? গোর্কির মাকে? শালোকভের প্রশান্ত দন? অস্ত্রভস্কির ইস্পাত? গোগলের তারাস বুলবা? বালজাকের হিউমেন কমেদিয়া? মার্কেজের শতবছরের নিসঙ্গতা? দস্তইয়েভস্কির কারামাজভ ভাইগণ, অপরাধ ও শাস্তি, অভাজন, ইডিয়ট কি এমনি এমনি জনপ্রিয় হয়েছে? লাতিন আমেরিকার প্রতিরোধী সাহিত্যসমূহ হুয়ান রুলফো, আলেহা কার্পেন্তিয়ার, য়োসা, কার্লোস ফুয়েন্তেস, মারিয়ানো আসোয়েলা, ম্যানুয়েল পুইগ, আন্তনিও স্কারমেত্তা, সের্হিও রেমিরেসের সাহিত্য কি উপকারী সাহিত্য নয়? আফ্রিকার আচিবি, ওসমান সেমবেন, নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো, তালাল আসাদ, তায়িব সালেহ, ওলে সোয়িঙ্কা, লিওপোল্ড সেদর সেঙ্গর, ফ্রাঞ্চ ফানোনের সাহিত্য কি উপকারী সাহিত্য নয়? প্রবন্ধ ও দর্শনের বইগুলার কথা না হয় বাদই দিলাম। তিনি কি ভাবছেন সাহিত্য বড় বড় দালান করিয়ে দিয়ে দেখাবে, দাতব্য প্রতিষ্টান করে দেখাবে? সাহিত্য কীভাবে কাজ করে তা কি তিনি কল্পনা করতে অক্ষম!



ষাট বছরের পরিসংখ্যান চেয়েছেন তিনি, ভাবছি পাকিস্তান আমল থেকেই জানতে চাচ্ছেন, জসিম উদ্দীন, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কাজী আব্দুল ওদুদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সিকান্দার আবুজাফর, আব্দুল গণি হাজারী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মুহাম্মদ এনামুল হক, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হক, আবুল ফজল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আহমদ ছফা, শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, সত্যেন সেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, শওকত আলী, আবু ইসহাক, যতীন সরকার, আবুল মনসুর আহমদ, রেহমান সোবহান, আনিসুজ্জামান, বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, হায়দার আকবর খান রনো, হুমায়ুন আজাদ, সলিমুল্লাহ খান এদের লেখা কি ঘোড়ার আন্ডা? এদের লেখাকি প্রভূত উপকার করে নাই দেশিয় জনগণের মানস গঠনে? ষাট বছরে আর কত ‘ঘোড়ার আন্ডা’ চান তিনি!



অতিরিক্ত শস্তা, জনপ্রিয় সাহিত্য পাঠ মনে হয় তার অধিশাস্তাকে দিশাহীন করে তুলেছে ‘আমাদের’ করে নাই। তিনি নিজের কথা ‘আমাদের’ বলে চালিয়ে দেবার খায়েস করছেন।



তিনি বলেন, ‘তিনি (হুমায়ূন) ছাড়া বাকী জনপ্রিয়রা কিন্তু বিক্রিতে ৫ হাজারের কাতারে। আর সিরিয়াসরা এক হাজারের ওপরে উঠতে পারেন না।’তাকে কে দিয়েছে এই পরিসংখ্যান? আবার বলছেন, ‘আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বই যেখানে ৫ হাজার বিক্রি হয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রবন্ধের বই বিক্রি হয় ৫ হাজার।’এ দ্বারা কি প্রমাণ করতে চান তিনি! ইংরাজ আমলের রাজনৈতিক কারণেইতো পশ্চিমবঙ্গ কমপক্ষে ৫০ বছর আগানো। এইটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আর তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বাংলা বইপড়া ক্রমশ কমছে। এক জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বসার ঘরে দেখেছিলাম সিংহভাগ ইংরাজি বইয়ে ঠাসা তার বইয়ের সেল্ফ। জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের লেখকরাতো বাংলাবই পড়ে না। তারা বাংলায় লেখে, তাদের বাজার পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণি ঘরে ইংরাজি পত্রিকা পড়ে। নিম্নবিত্ত কথা বলা শুরু করেছে হিন্দিতে।পশ্চিমবেঙ্গ বাংলাভাষা আদৌ টিকবে কিনা সন্দেহ। সেখানে তার এই পরিসংখ্যান মনগড়া মনে হয়। আর প্রবন্ধ কি সাহিত্যের বাইরে, প্রাবন্ধিকদেরকেও কি সাহিত্যিক বলব না?



বাংলাদেশের অধিকাংশ পত্রপত্রিকার মালিকানা সম্প্রতি শোষক বুর্জোয়াদের হস্তগত হয়েছে। কোন একটা বিষয় পেলেই সেটা নিয়ে কমপক্ষে একসপ্তাহ যাবত চটকিয়ে পত্রিকার পসার বাড়ানোর কালচার তৈরি হয়েছে। যে কোনো বিষয় পেলেই পত্রিকাপালিত বেতনভুক্ত বুদ্ধিজীবীরা হাজার শব্দে উগরে দিচ্ছে তাদের হাইব্রিড জার্নালিজম। আর কিছু লেখা পত্রিকার মালিকারা নিজেদের শ্রেণির স্বার্থে উৎপাদন করায়। সাংবাদিক মাহবুবের লেখাগুলাও এর ব্যাতিক্রম নয়।

.