হাসান শাহরিয়ারের ৬টি কবিতা
হাসান শাহরিয়ার, বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১২


হাসান শাহরিয়ারের জন্ম ফেনী জেলায়। থানার নাম পরশুরাম, গ্রাম দক্ষিন সলিয়া। জন্মের পর পরই বাবার চাকুরীর সুবাদে জিয়া সার কারখানা (জিয়া ফারটিলাইজার কোম্পানী লিমিটেড), আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে চলে আসতে হয়। শৈশব,কৈশোর এই কারখানা কলোনীর চার দেয়ালের ভেতরই কাটে।
লেখাপড়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান।


কবিতা ভাবনাঃ

কবিতা নিয়ে কি ভাবি, কি ভাবছি তা কবিতাই বলে দিক।

.................................................
হাসান শাহরিয়ারের ৬ টি কবিতাঃ
..................................................



শব্দ

এই যে একটা শব্দ হলো,তুমি কি শুনতে পেলে? কোনো পিস্তল থেকে আচমকা নির্গত এক বুলেটের আঘাতে চূর্ণ কোনো আরণ্যকের বুকের আর্তনাদের শব্দ এটা নয় অথবা এই অবিরত বরষায় সিক্ত প্রকৃতির নির্লিপ্ত চোখে সহসা বিবর্ণ কাশফুল দেখে কোনো স্বাপ্নিকের বিলাসী হাহাকারের শব্দও এটা নয়! আমাদের অস্তিত্বের গভীরে যেইখানে অরণ্যের অস্পৃস্য অন্ধকার আছড়ে পড়ে তীর থেকে তীরে,অদেখা অপরিণত প্রান্তরে- তার অববাহিকায় যে ছায়া আলো জ্বেলে রাখে; আমাদের সভ্য করে, বেঁধে রাখে প্রণয় অথবা ভ্রাতৃত্বের সূর্য সুতোয়- এটা তার ডুকরে কাঁদার শব্দ! অস্তিত্বের বিপন্নতায় জড়ো হয়ে আসা ভীত কন্ঠের ভাঙ্গা অনুনাদ! তুমি কি শুনতে পেলে তার নিরাপত্তাহীনতার শব্দ ?


লড়াই

একটা লড়াই; স্বভাবতই দুই প্রতিপক্ষের অগ্নিচোখে জ্বলজ্বল করছে খুনের গদ্য। এক পক্ষে আমি, অন্যপক্ষে প্রতিদিন এই চোখ যা দেখে তা; নিজের ঘর, ঘরের সামনে নিত্য শুকিয়ে ওঠা আঙ্গিনা, রাস্তা, রাস্তার বাঁক, দোকান-পাট, দালান-কোঠা, এমন কি বাসের একটা সিট! অনেক বিভ্রমও। যেমন মধ্যরাতের আকাশ দেখে মস্তিষ্কের কোথাও প্রতিক্রিয়া হয় অন্ধকারের নিকোটিন ভরে চুরুট ফুকানোর তৃপ্তি; ভেসপার্সে নগরের রাস্তায় যখন বাসগুলোকে মনে হয় অবসন্ন পাথরের ফেরি, তখন যেনো নিশ্চিত হই সমুদ্র তার বালুতীরে আছড়ে পড়ছে না, সমুদ্র উঠে এসেছে চোখে! অনেক আবেগ, গিলোটিনের ভয়াল নকশার মত চারপাশ, স্বৈরাচারী মূল্যবোধ, বিচ্ছেদ, কোথাও স্থির হতে না পারার অস্থিরতা।

কোথায় আমি এই শক্ত প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে? কখনো পালিয়ে, কখনো নৈঃশব্দের কপট তপস্যায় ঘাপটি মেরে থাকি নিজের ভিতর অহমের পাহারায়; কখনো দরজা খুলি, নিঃশ্বাসে ভরে নিই আলো, তারপর বুকের বেড়িবাঁধ খুলে তাদের জানাই বেঁচে থাকার আমৃত্যু নিনাদ।


সেলাই মেশিন

জোছনা নেই, অন্ধকারও।
জানালার ভেতর একজোড়া চোখে
ঘুমও নেই।
একটা সুচ বুনে চলে কাঁথা।
মেশিনের শব্দে অভিশপ্ত তার
ক্লান্তির শিস!


আরণ্যক

বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। টিনের ছাদে ঝপঝপ শব্দ। ছাদের উপর নারিকেল আর বরই গাছের ডাল। একটা বিষন্ন রাতে এইসব ডাল বেয়ে যখন বাতাস আর বৃষ্টি ছাদের গায়ে ঝড়ের আয়োজন করে, আমি জানালা বন্ধ করে দেই নিঃশব্দে। বাতি নেভানোর আগে দরজার খিল লাগানো হয়েছে কিনা আরেকবার দেখে আসি। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছি বলে নয়, তাদের শব্দ শুনবো না বলেই ঘরের অন্ধকারে নিজেকে আড়াল আর একান্ত করি।

এইরকম অনেক শব্দ থেকেই এইভাবে নিজেকে সরিয়ে আনি রোজ; প্রত্যহের নির্বাচিত পথে হাঁটতে হাঁটতে অথবা আনমনে পরিকল্পনা থাকে না এমনসব রাস্তা যখন যতদূর যেখানে নিয়ে যায়! যেমন নগরের দায়সারা রাস্তায় বালু-পাথরে বোঝাই ট্রাকের চ্যাপ্টা চাকায় গুড়ো হওয়া পিচের শব্দ, দীর্ঘ জ্যামে আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ, বাসের জানালায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, গলির ভিতর আচমকা অন্ধকারের নিরবতার শব্দ, নিজের হাতে ঘরের তালা খোলার শব্দ। অথবা ট্রাফিক পুলিসের হুইসেল শুনে ট্রাক-ড্রাইভার অস্ফুটে মাদারচোদ বলে যে গালিটি দিয়েছে, তার শব্দ; মৃত্যুপথে রোগীটির অথবা তাকে ঘিরে থাকা সুহৃদদের হৃদয়ে রক্তক্ষরনের শব্দ; বাসের ভিতর গুমোট অন্ধকারে যাদের চোখ ভরে ওঠে জলে- বেঁচে থাকার অমোঘ শর্তে, ভীড়ে চাপা পড়া সে ডুকরানোর শব্দ; গলির সামনে পরিচিত ফকিরের ভরে ওঠা থালায় এক টাকার পয়সাটি টুক করে ফেলার শব্দ; তালা খোলার পর ঘরের একাকিত্ব নষ্ট হওয়ার শব্দ!

নগরের নগর হয়ে ওঠার শব্দও!

এইরকম আরো অনেক শব্দ। পাহাড়, গিরিখাত, বিশাল ধূ ধূ প্রান্তর, ঘন সবুজ জঙ্গল- এইসব ছেড়ে কোনো এক নির্বোধ নদীর গা ঘেঁসে ইট-পাথরের যে মাস্তুল তুলেছি আমরা, তার যোনিতে, উরুতে, চুলের অন্ধকারের ছাপে দিনের খাপে খাপে,সায়াহ্নে, রাতের গভীর থেকে গভীর অন্দরে অজস্র শেকলের কত শব্দ নারীদের চোখে, নরদের ঘামে- ছলছল করে, বেয়ে বেয়ে পড়ে; এইসব শব্দে আমার কোনো সাড়া নেই।কেননা আজ মনে হয় নগর এখন কেবল এক পক্ষের চর্মরোগে আক্রান্ত নয়। ফার্মেসিতে ভীড়; চুলকানির ঔষধ কিনছে সবা-ই; আপোষে, নিরবতার গলাবাজীতে, চিৎকার করতে করতে,উত্তর-দক্ষিনের লিঙ্গ চুষতে চুষতে।

কাজেই কোথায় যাবে নাগরিক? পাহাড়ে? গিরিখাতে? বিশাল ধূ ধূ প্রান্তরে? ঘন সবুজ জঙ্গলে? যেখানেই যাবে, এই নগরকে নিয়ে যাবে সেখানেই। তারপর পাহাড় কাটবে, গিরিখাতের কিনারে গড়বে নদীর অববাহিকা, প্রান্তরের বুকে বুনবে নতুন ইট-পাথরের মাস্তুল, জঙ্গল কেটে পথ!

সভ্য মাস্তুলের শব্দে, তার মুখোশের অন্তরালে অরণ্যের অন্ধকার পুষবে বলেই একদিন অরণ্য ছেড়েছিলো আরণ্যক !


বিলবোর্ড

বিলবোর্ডে তাকিয়ে কি ভাবে যুবক?
সেখানে স্টীল মিলের চকচকে ইস্পাত
নাগরিকের ঘর রাঙ্গানোর কথা বলে,
গুড়ো দুধ খেয়ে তরতাজা শিশু
একজন স্মার্ট মা’র হাত ধরে থাকে;
আর তার হাসি নগরের শব্দে পুষ্টির প্রতিক!

বিলবোর্ড যুবককে দেয়
মাথার উপর ছাদের নিশ্চয়তা; আর
তাকে আশ্বস্ত করে একটা ব্যাংক লোনই
দিতে পারে নাগরিক কাঠামো
দৃঢ়, সুঠাম কাঠামো!

বিলবোর্ডে চকলেট, আইসক্রিম খায়
আমাদের শিশুরা,
আর কতক ফরেন নকশায় জ্বলজ্বল করে
তরুনীর গা; চোখের তপ্ত রোদে
অন্ধকারে নিয়নের মত্ততায়!

আচমকা ঝাপসা হয় বিলবোর্ড, যুবকের চোখ!
কানে বাজে অবিরাম নগরের সোর
সিগনালের নিচে দাঁড়িয়ে আছে যুবক
কটকটে রোদে তার বুক ভিজে ওঠে;
অস্থির বুক!

যুবকের পাশে অন্য যুবক, অজস্র যুবক।
তারা সে নয়, তবু তার মত তারা।
বিলবোর্ডে প্রতি স্কয়ার ফিটের ঘুপচি ঘরে
তাদেরও ভেসে ওঠে চোখ, তার চোখের মত।
ভীড়, স্বার্থপর এ ভীড়-বিলবোর্ডের লেলানো স্বপ্নের
অলিক অভিলাষে যেনো তৃষ্ণার্ত বাজপাখি!


বৃষ্টি

বৃষ্টি হচ্ছিলো, সে আমার কাছে একটা ছাতা চাইলো।
আমি বলেছিলাম – ছাতা নেই।

বৃষ্টি হচ্ছিলো মনে। সে আমাকে চাইলো ।
আমি বলেছিলাম –আমি দুঃখিত।

বৃষ্টি হয়েছে এইখানেও। আমি তাকে ডাকলাম।
সে তার দরজা খোলে নি।
আমিও তার বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকিনি।

বৃষ্টি এখনো ঝরে,মনে।
বৃষ্টির শব্দ আর নিরবতা –একটা বাজে বুকে
আর একটা বসে থাকে চোখে!