মোস্তাফিজ কারিগরের কবিতা
মো স্তা ফি জ কা রি গ র, বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১২


মোস্তাফিজ কারিগরের জন্ম ১৪ই আগস্ট, ১৯৮৬ সালে কুষ্টিয়ার হরিপুরে, নানাবাড়িতে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত কুষ্টিয়াতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ হতে মৃৎশিল্পে স্নাতক। একাডেমিক আঁকাপড়ার পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসাবে পেশাজীবন চর্চা করছেন।

প্রকাশিত কবিতার বই: নৌকাখখণ্ডে দেবীর লাল।

কবিতা ভাবনা

আমি ছবি আঁকি পেশাগত নেশাগত ও শিক্ষাগত কারণে, কিন্তু কবিতা লেখার তেমন কোন উপযোগ নেই আমার। এক সময় প্রতিদিন কবিতা লিখতাম, নতুন মাস্টারবেশন শিখলে যেভাবে স্বরতিভ্রমণ করতাম। এখন মাস্টারবেশনও যেমন পরিমিত রুপ পেয়েছে, কবিতাও। বোধে কোন নতুন চিন্তা এলে সহজেই লিখি না, তাকে বেশ কিছুদিন লালন করি, মাস বা বছরও। কোন তাড়া নেই, কোন প্রস্তুতি নেই। যখন ভেতর থেকে হয়ে আসে তখন কলম-কাগজ বা ল্যাপটপের কি-প্যাড ব্যবহার করি। আমি অনেক আগেই টের পেয়ে গিয়েছি এ দেশে কবিতা লিখে জীবিকা অর্জন বা সমাজ পরিবর্তন আদতেই অসম্ভব, খ্যাতি অর্জন আরও হাস্যকর ব্যাপার। ঠিক কেন লিখি, তার কোন সদুত্তর নেই আমার কাছে। তবে পৃথিবীর পথে হাঁটতে গিয়ে এমন কিছু দৃশ্য দেখি যা সাংবাদিকরা কোন পত্রিকায় লেখেন না বা তারা দেখতে পান না তাদের দাসবাদী চোখ দিয়ে, আমি তখন লেখার কাম বোধ করি। কবিতা লিখলে মনে হয় এই যেন একটি ভালো কাজ করলাম, প্রশান্তি লাভ করি।

লাজুক চকলেট

চকলেটটি হয়েছে লাজুক চুম্বনস্নাতক; দুইটা জিহ্বা
নিচ্ছে তার স্বাদ, বিবাদবিহীন, রাস্তার আলোকস্তম্ভের নিচে

দুইটা জিহ্বা ওদের, ওরা দুই সহোদরা চলতি পৃথিবীর

ছোটবোন একবার নিচ্ছে চুষে চকলেটের দেহদ্বীপ
বড়বোন তারপর; জ্বলে উঠছে চোখে, চোখের অধিক

দুইটা জিহ্বা ঠিক চুষছে পৃথিবী; পৃথিবীও তাহাদের


নীল শেয়াল

অন্ধকারের সালুন। মিহি ঝোল। দাতাল চামচ। নৈশভোজ চোখ
তুলে তাকিয়ে আছে নীল শেয়ালেরা। শেয়ালের লোমকূপে
উৎসব চোয়াড়তা, শাঁড়াশির ধাতব ঘ্রাণ ভেসে ভেসে
ঘিরে ধরে আছে মানুষের ক্ষুধা ভেজা পেয়ালায় জলের
শরীর বেয়ে ওঠে ঘামের মৃত্যু, খাদ্যের কুয়াশাহীনতা, টেবিল
টপকিয়ে উঠছে উপরে

নীল শেয়ালেরা, সারি সারি। শিকড় থেকে ক্রমাগত
শিখরে উঠে যাচ্ছে

মাসিকের রক্তবালিশের মতো নির্বাসনে দাড়িয়ে কী দেখছেন

আপনারা?


ফুলকপি

সকালবেলার বাজারে দাম বিশ, সন্ধে বারো

ফুলকপি দেখতে ফুলের মতো। ছয়টায় হয়েছে ছুটি
অফিসওয়ালাদের, তারা সবাই ফুলকপি কিনে
নিয়ে গেল বারো টাকায়

আমি কিনেছি ফুল ও ফুলকপি বারো টাকায়

শ্মশানসাবানের অঙ্কনশিল্প
সমুদ্রের বাম কাঁধে স্বপ্ন দেখতে দেখতে জেগে ওঠে সম্ভ্রান্ত শ্মশান, সাপের গ্রীবার মতো ভেসে
আসে জল আগুনের চোখের ভেতর থেকে লাল জবাফুল নিয়ে বেলাভুমে একটি সাবান...

আমার ভীষণ গাত্রদাহ
আশরীরে জ্বর
শ্মশান তুমি এগিয়ে এসো
মুঠোর ভেতর

থির হয়ে ভাবছিলাম সামুদ্রিক অঙ্কনশিল্প সাবান, মায়াময়ী সাবান মাখতে মাখতে সমুদ্রে
এগিয়ে যাচ্ছি, ভাবছি আমারই নিঃশ্বাসের মতো ছোট পৃথিবীতে সারি সারি দর্জিঘর, রাতঅব্দি
মেশিন ঘর ঘর...সেলাই করছে পোষাক, প্রতিদিন সকালে সুর্যের জন্যে পোষাক
স্নান না করে কেবল পোষাকে বেঁচে থাকতে থাকতে প্রতিদিন সূর্য সলিলে পতিত

রাতের দর্জিদের পোষাক নিয়ে খেলছে শিশুরা শিশুরা হয়ে যাচ্ছে আশ্চর্য অঙ্কনশিল্প
পোষাকের বোতাম আটকে ওরা লুকিয়ে পড়ছে, ওদের ল্যাবেনচুষ উড়ে গেল মিউজিয়ামে
মিউজিয়ামে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে আমাদের গতকালের দিনলিপি, মিউজিয়ামের রশি বেয়ে
একটি মাকড়সা এবঙ আমি

রশি ধরে ঝুলে থাকলে উপরে ওঠা যায়
গলায় পেচিয়ে নিলে নামতে পারি অনেক নিচে, নিচে

মাকড়সা সমুদ্রের বাম কাঁধে জেগে ওঠা শ্মশান চিনেছে, আমি তার জন্যে একেছি সাবান
অ্যালোভেরা ও ভিটামিন-ই যুক্ত

নষ্টঘড়ি মেরামতখানার বিজ্ঞপ্তি

আমাদের শহরের নগরভবনের কপালে যদুনাথ দাদুর মতো লাঠিতে ভর দিয়ে একটি ঘড়ি
সূর্যকে কান ধরে মুদ্রের ওপাড় থেকে তুলে এনে সারাদিন গোল্লাছুট খেলে খেলে একটা বিরাট
ডিমের কুসুম বানিয়ে আবার সমুদ্রের শো-কেসের অন্ধকারে সামলে রেখে আসে, প্রতিদিন
নগর কর্তৃপক্ষের কোন বাধাঁই না মেনে কিংবা প্রভাবশালী মেয়রের চোখের সামনে মদখোরের মতো
দুলতে দুলতে ঘড়ির কাটাত্রয়

আকস্মিক হলুদ প্রেমিকার মতো ঘড়ি তুমি রাত হও ঘড়ি তুমি দিন

নগরের সবচেয়ে চতুর চোরের কোন ব্যাক্তিগত ঘড়ি নেই আমাদের শহরে চোর আমাদের চোখের ঘড়ি চুরি করে, হৃৎপিন্ডের পেন্ডুলাম, সুভদ্র স্বামীর আন্ডারওয়ারের ভেতর থেকে স্ত্রীঘড়িটিকে আর স্ত্রীঘড়ির পেটের ভেতর থেকে ভ্রুণের ব্যাটারী তখনো স্বপ্ন দেখে সবুজ কলাপাতায় কুয়াশাড্রাইভারকে

আর আকাশ থেকে লরীর এক মাতাল চালক নেমে এসে মহল্লায় মহল্লায় ধুলো উড়িয়ে গেলে শহরের প্রতিটি প্রসাশনিক ঘড়ির শরীরে মরিচা পরে গেলে নগরের কপালে যদুনাথ দাদুর শেষকৃত্যের জন্যে
যে পুরোহিত ডেকে আনা হয়েছিল তাকেই দেওয়া হয়েছিল এই দায়িত্ব্য

নগরের শিশ্নের উপর বসে বসে সেই পুরোহিত ঘড়ি মেরামত করা শুরু করলে আমাদের হরিপুর
গ্রামের ভাদু ঘড়িওয়ালার কথা মনে পড়ে গ্রামের সব বাড়ি থেকে পুরানো ঘড়ি কিনে নিয়ে যেত
শিশুদের চকলেটের বিনিময়ে অথবা প্রায়পক্কডালিমমেয়েদের দিত সোনালী কাকই সেই সব পুরানো ঘড়িতে সাজিয়ে রাখতো তার বাড়ি, গাদা গাদা নষ্ট ঘড়ির ভেতর ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে একদিন সব নষ্ট ঘড়ি নিয়ে একদিল শাহের মাজারের উপর দিয়ে কোথায় নাকি উড়ে চলে যায়

নষ্ট ঘড়ির বিনিময়ে মুগ্ধ ল্যাবেনচুষের ঘ্রাণ

ধিরে ধিরে নগরের সব পুরোহিত ঘড়ি সাড়েওয়ালা হয়ে গেল, আমাদের
নষ্ট ঘড়ির মেরামতখানায় ঘড়ি সাড়া হচ্ছে

আমাদের নষ্টঘড়ির মেরামতখানা, ঘড়ি মেরামত, ঘড়ি মেরামত...


গলিত রাতঘড়ির হুইসেল, সাদা ইঁদুর

একটি পঁচাগলা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ি গলিত রাতঘড়ির হুইসেল, সাদা ইঁদুর, কয়েক বস্তা পেঁজা তুলোর
মধ্যেÑআমার হাত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে একটি হ্যাঙ্গারে...উড়ে যাচ্ছেন কারা?
আমার পা খুঁজে বেড়াচ্ছে এক জোড়া ক্রাচ...আপনারা বিকালের জন্যে হাঁটছেন
আমার চোখ ঝুলে আছে কাপড় শুকানো রশিতে...প্রদর্শনীকক্ষে আমি একাই দর্শক

যদি এরকম দৃশ্য
যদি এরকম পুঁচ
এরকম যোনি যার নারী নেই অথবা নারীহীনা যোনিকাহিনীর গল্প আমি জানি, আমি জানি এই শহরের
ঘুম মানে আপনাদের ঘুম ও আপনাদের স্ত্রীর অসুখ মাসিকের বালিশ, শিশুর ভাঙা খেলনা
খেলতে খেলতে স্টেডিয়াম ভর্তি খেলোয়ার হলে আপনারা, আমি দৃশ্য দেখি

আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার কলিগ
আপনার অন্তর্বাসের সাথে আপনার মহিলা কলিগ
আপনার সাথে আপনি একা আমরা কিন্তু আপনার পেছনেও নেই সামনেও নেই

একটি শরীরজীবিনী দৌঁড়ে চলেছে রাষ্ট্রের নাক থেকে যতদূর চারণক্ষেত্র আর তার হাতঘরি
দুলছে
যুবকদের মাস্টারবেশনের জন্যে যেহেতু নেই কোন সংরক্ষিত এলাকা যেখানে চাষ হয়
সেনাতন্ত্র
পুলিশের নিরবধি হাতলাঠি কতদিন পোশাকশ্রমিকের জন্যে বয়ে আনবে ওপরি মজুরির
ইস্তেহার

আপনাদের মদঘর নাঁচকক্ষে সিরিঞ্জ হাতে ডাক্তার
মৃত্যুর কয়েক পা আগেই যেই রেখাটি সেখানেই আমি একটি হাড়ের ছবি আঁকলাম ডারউইনের
অপরিচিত একটি হাড় দিয়ে, তখনই বিদ্যুৎ এলো

শহরের শরীর বেয়ে বিজ্ঞাপনের টিকটিকি
যখমের গভীর বিজ্ঞাপন নিয়ে আরো কিছু আমরা বোঝাতে আমাদেরই বুঝবেন আপনারা
অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি
বাসের ঝুলন্ত
দড়জায়

রন্ধনশালা

ধোঁয়াদের ব্যালে নাচ, অর্ধসিদ্ধ খাবারের চটুল লাস্যকাম,জেগেছে পৃথিবী
ব্লাকআউটের শহরের ধারালো সড়কের সামান্য ফুটপাতে

ধারালো সড়ক বেয়ে শহর উঠে যাচ্ছে সভ্যতার রঙীন কার্নিশে
তারই নিচে আয়োজন এই মহাভোজনের ভোজন রসিকেরা সারি সারি

ন্যূল, ন্যূজ্ব, ন্যাংটো আরা মানুষের কাছাকাছি গড়নের

বাতাসের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখেছে পরম তৃপ্তি, ক্ষুধার
সোহাগী ডিটার্জেন্টে স্নাত স্বপ্নেরা হামুখ...উন্মুখ

আধাসিদ্ধ খাবারের পাপড়ি বিকাশিছে
রন্ধন চলিয়াছে সিলভারের গরম পাতিলে, স্বপ্ন ফুটছে
সমস্ত পৃথিবী টগবগ, ছুটন্ত অশ্বের গ্রীবার উত্তেজনায়
সিদ্ধ হচ্ছে
লোভনীয় স্বাদ নিয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে পুঁজিবাদি শিশ্নের সালাদ

অস্তিত্ববাদ

কাকমৃত ও শহরে ককটেল সামরিক বেনীতে বারুদ প্রধানমন্ত্রী যাবে বলে
রাজপথে কুকুরের ঘেউ আর আমাদের থামিয়াছে ঘড়ি, বোকা ল্যাবেঞ্চুশ মুখে
নিুাঙ্গের কেশে রচি হস্তচিরুনি

আহ্! যায় দেশকর্তা আর আমরা আমাদের পাছার গু নেড়ে দেখি, গন্ধ

বন্দুক

মধ্যরাতে জেগে ওঠে ভয়াল কুকুরের ঘেউ, ঘুমানো শহরের অন্ধকার মগজের ভেতর
হাই তোলে পুঁজির মেকুর আমি নারীর গোপন বালিশের মতো
গোপনে রক্তাত্ত হয়

আমার বাবা জাল ফেলে বসে আছে একটা বিরাট বোয়াল ধরবে...
আমার মায়ের কোন সোনার গহনা নেই গহনার খালি বাক্স পড়ে আছে...

আর এই মধ্যরাতে শহরের মানুষের ঘুমের মধ্যে মেশায় বিষ এক ভিক্ষুক
ও তার অন্ধ সন্তান, অভিশাপ কেবলই অলঙ্কার করে জরায় তাদের
ভাড়া বাড়ির জানালা ভুল মনে হয় আমার শহরের রাস্তায় বেশি প্রিয় তখন
খুব প্রতিবাদ নিয়ে হাজির হয় অন্ধকার এক বন্দুকের দোকানের গ্রীবায়
একটা বন্দুক কিনে শহরের সব বন্ধুদের আমি তেড়ে নিয়ে বেড়াবো

একদল বিদেশী ধীবর বৈদ্যুতিক জাল নিয়ে ঘিরে ফেলছে আমাদের গ্রাম...
আমাদের বাড়ির দলিল চোখের সামনে উঁই পোকাদের লোভে ডুবে যাচ্ছে...

বন্দুকের দোকানের সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকি আমার কাঁধে হাত দেয়
বন্ধু হাতের মুঠোয় বেধে এনেছে সকালের বকুল সাদা সাদা

বকুল ফুলগুলি বন্দুকের গুলি হয়ে তেড়ে আসছে আমার দিকে

নুনখোর

তখন আমার বাম পকেটে মৃত্যু, ডান পকেটে স্বপ্ন নোনা জল ঝরে যেত
নিঃশ্বাসের শরীরে শরীরে, উঁচু উঁচু এই শহরের
খাঁচাগুলোর দিকে লিঙ্গ তাতিয়ে ধরে প্রশ্রাব করতে মজা লাগতো
ভারি গান আসতো মগজের তানপুরায়, রঙ-তুলি-ক্যানভাস রঙীন রঙীন
পাখা নিয়ে উড়ে এসে আমাকে পাহারা দিতো, পাশবালিশের মতো
বুকে পিঠে জড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম সভ্যতার মেরুদণ্ডের গোড়ায়
পুরাতন পাথরের লিথোগ্রাফে আমি কয়েকশো বোধিদ্রুম একেছিলাম

কিন্তু আমি আমার পিতাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম না তার সারা গায়ে
থক থক করতো ক্ষুদ্র ঋণের মলম, মায়ের চোখের দিকে তাকাতে ভয় হতো
উঠোনের বকুল গাছটি সে বিক্রি করে দিয়েছিলো একদল
বিদেশী সওদাগরের কাছে, কুয়োতলার যেই নিমগাছ দেখিয়ে আমাকে
ভূতের ভয় দেখাতো দাদিমা, একদিন এক চাইনাফনিক্স সাইকেলের সাথে
একসিডেন্ট করে নিমগাছটি মহাবিশ্বের প্রথম পাখি হয়ে গিয়েছিল
আমি ভাবতাম একসিডেন্ট করাই বোধহয় ভাল, পাখি হওয়া যায়

তারপর থেকে একসিডেন্ট হওয়ার জন্যে শহরের সড়কে বুক পেতে
দাড়াতে থাকি, আমার পরীক্ষা এগিয়ে আসে, পরীক্ষার ফিস জোগাড় হয়না

মা যাদের কাছে বকুল গাছ বেচেছিল তারা আমাকে শিক্ষাঋণ দিলো

আমি তাদের কখনো ভুলবো না