'ঝড়' কামাল রাহমানের উপন্যাস
কামাল রাহমান, সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১২


কামাল রাহমানের জন্ম ১৫ জানুয়ারি, শেরপুর, বাংলাদেশ।
এমবিএ করেছেন। পেশা: প্রাক্তন ব্যাংকার (শেষ কর্মস্থল: অধ্য, প্রিমিয়ার ব্যাংক ট্রেইনিং একাডেমি, ঢাকা)।
পৈতৃকবাস: কুমিল্লা, বাংলাদেশ।বর্তমান অবস্থান: যুক্তরাজ্য।


অন্যান্য উপন্যাস

তাজতন্দুরি
অন্য আলো
ঝুম পাহাড়



...................................................
কামাল রাহমানের উপন্যাস 'ঝড়'
...................................................



আদিগন্ত সমুদ্রের বিপুল ধূসর জলের দিকে চোখ রেখে পেকাম অপেক্ষা করে সারেঙের নোঙর তোলার ডাক শোনার জন্য। পৌষের কুয়াশামাখা বিকেলের আলোয় গ্রামগুলো ধোঁয়াশা সাদা আর কোঁকড়ানো। রাত না এলেও কালোপক্ষের ভাঙা চাঁদ এসে ঝুলে থাকে আকাশে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ ধূসর ম্লান এক অজাগতিক আলো অজানা শিহরণ জাগানো অনুভবে ঢেকে দেয় সমুদ্রের শরীর। শীতের বাতাস সাধারণত ভেসে আসে উপকূলের দিক থেকে, এখন উল্টো ওটা, সমুদ্র থেকে আছড়ে পড়ে তন্দ্রালাগা কূলের আঁচল ঘেঁষে। কান সজাগ রেখে ট্রলারের সংকেতবাতি জ্বালানো দেখে পেকাম, তীরের ছোট্ট গঞ্জে সারিবাঁধা দোকানের বাতি জ্বালানো হয় নি এখনো, হয়তো হবেই না আর, দোকান বন্ধ করে চলে যাবে সবাই। ওরা জানে, আর কোনো ট্রলার এখানে ভিড়বে না আজ, ওদেরটাই কূল ছেড়ে যাওয়া শেষ ট্রলার। ঊনিশশ’ একানব্বুয়ের মধ্য ডিসেম্বরের ক্লান্ত সন্ধ্যায় বাড়ি যাওয়ার জন্য শেষ চেষ্টা করছে শুধু ওদের দলটাই। সমুদ্রের এদিকটায় মাছ ধরে যারা, ওদের সবাই বাড়ি পৌঁছে গেছে এরি মধ্যে। তিন দিন পর রোজার ঈদ। ওদের নৌকোটা প্রকৃতই এক হতভাগা দলের, পুরো হপ্তা সমুদ্রে কাটিয়েও তেমন কোনো মাছ পায় নি বলা চলে। ওটা পুষিয়ে নেয়ার আশায় আরো ক’দিন সমুদ্রে কাটিয়ে আজ সকালে ফিরে এসেছে ছোট্ট এই গঞ্জে।

শান্ত ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রের ছোট্ট এই খাঁড়িতে নোঙর বাঁধা ট্রলারের জানালার ছোট্ট খোপের মধ্য দিয়ে ভাঙ্গা টুকরো ঝিনুক-খোলের মত দেখা দেয় চিরচেনা চিরনতুন গ্রাম বাংলার বর্ণিল সবুজ ছবি। দেয়ালপঞ্জিকার পাতার মত ওসব ঝুলে থাকে শীতের স্বপ্নজড়ানো জবুথবু আকাশের গায়। সবুজ গাছপালার ঘেরের ভেতর বিকেলের আলো নিঙড়ে কোথাও চকচক করে টিনের একটা দো-চালা ঘর, মাথা উঁচিয়ে থাকে কয়েক প্রজন্ম আগে লাগানো নারকেল গাছের ঝাঁকড়া মাথা, বাঁশের আড়ে ঝোলানো কালো জালের ভৌতিক শরীর, বালুচরে আবাদ করা তরমুজ খেতে ছেঁড়া ফতুয়া গায়ে কাকতাড়ুয়া, এরকম আরো কত কি! সমুদ্রে নৌকো ভাসানোর আগে নাবিকেরা দু’চোখ পেতে রাখে লোকালয়ের পরিচিত এসব গাছপালা, পোষাপ্রাণী, গাছের ডালে বসে থাকা দু’একটা কাকাতুয়া, কিংবা রঙিন কোনো পাখির লেজ দোলানো দেখার তীব্র ইচ্ছে নিয়ে। সমুদ্রের প্রায় একই রকম, অনেকটা প্রাণহীন একঘেয়ে ছবির সঙ্গে লোকালয়ের মনকাড়া বিচিত্র রূপ কূল ছেড়ে যাওয়ার পর নাবিকেরা বুঝতে পারে প্রতি পলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন সমুদ্রের মাতাল ঢেউ দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে ওঠে চোখ। অথচ লোকালয়ের সব ছবিই ভিন্ন, এমনকি বাড়িগুলোও অন্য রকম, প্রতি ঋতুতে নতুন, খড়ের চাল পুরো ঢেকে কখনো লাউ কুমড়ো লতাপাতার সবুজ বিস্তার, আবার কোনো সময় পুঁইলতার মেরুন সবুজ সমারোহ! মাটির মানুষের কাছে প্রকৃতি কখনো একঘেয়ে হয়ে ওঠে না এই প্রাণবৈচিত্রের জন্য।

সমুদ্রে এখন ভাটার টান, তীর থেকে অনেকটা সরে গেছে ঘোলাজলের দুর্বল ঢেউ, কাদাপ্রিয় ছোট ছোট মাছেরা ভেজা বালুতে লুটোপুটি খায়, ঝাঁক বেঁধে মাছখেকো পাখিরা সাবাড় করে ওদের। শীতের আকাশে অতিথির মত এক টুকরো সাদা মেঘ শেষ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে বাড়িয়ে দেয় আকাশের নীল। মাটির কাছাকাছি আকাশ ধূসর, নি®প্রাণ, তীব্র শীতের ছোবলে অনেকটা আহত।

উল্টো দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসে শফি সারেঙের গলা ফাটানো চিৎকার অনেক দূর থেকে আসা মনে হলেও কেউ যেন পেকামের কানে মুখ লাগিয়ে টেনে টেনে বলে ‘নোঙর তোলো পেকাম, নৌকা ভাসাও’।

কাদার মধ্য থেকে নোঙর টেনে উপরে উঠিয়ে নেয় জফির মাল্লা, রশি টেনে পাটাতনের ওপর তুলে শক্ত করে বেঁধে রাখে ওটা হানিফ শুকানি। কাঠের মই বেয়ে জফির উপরে উঠে এলে বদর বদর বলে সবাই সমুদ্রে ভাসে। ইঞ্জিন-ঘরে অপেক্ষায় থাকা তালেব মিস্ত্রি সারেঙের সংকেত পেয়ে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ইঞ্জিন চালু করে, বাজ পড়ার মত গর্জে ওঠে ওটা। কয়েক মিনিট চলার পর যন্ত্রদানবটার শব্দে এক ধরনের সমতা আসে। নৌকা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে সমুদ্রমুখী করে হালে বসা শফি সারেঙ, সামান্য সময়ের মধ্যে ঢেউয়ের সঙ্গে দুলে দুলে গতি পেয়ে যায় কাঠের ছোট্ট কাঠামোটা। ইঞ্জিনের ঝিকঝিক শব্দ, নৌকোর তলায় আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ছলছল মাতাল শব্দ, বাতাসের মাতামাতি, সব মিলে-মিশে একটা থিকথিকে শব্দঝড় অতি-পরিচিত ধ্বনি সৃষ্টি করে কানের ভেতর।

ঠিকভাবে গতি এনে পেকামের হাতে ট্রলারের হাল ছেড়ে দেয় শফি সারেঙ। তারপর অজু করে গলা ফাটিয়ে আজান দেয়, সঙ্গী চারজন নামাজিকে নিয়ে কাতার বেঁধে নামাজ পড়ে, আরো একটা শান্ত দিন উপহার দেয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানায়।

ট্রলারের পুরো নিয়ন্ত্রণ পেকামের হাতে দেয়ার আগে ওটার গতিপথ ও ঢেউয়ের দিক ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয় শফি সারেঙ। খুব যে দরকার ছিল এটা পেকামের, তাও না। সমুদ্রের এ অংশের একটা মানচিত্র আঁকা রয়েছে ওর বুকের ভেতর, হাতের তালুতে যেমন রয়েছে পরিচিত সব আঁকিবুঁকি, চোখ বন্ধ রেখেও মনে করতে পারে সে-সব। বড় বিঘাইর কূল ছেড়ে যাওয়া থেকে হাতিয়ার চর ঈশ্বর ঘাটে পৌঁছানো পর্যন্ত সময় লাগে সাধারণত তিন থেকে চার দিন। সে-হিসেবে ঈদের প্রথম প্রহরের লাল রং আকাশে ছোঁয়ার আগেই নিজেদের কূলে ভিড়বে ওরা। নাবিক জীবনের শুরুতে চাঁদনী রাতের সমুদ্রকে যত রহস্যজড়ানো ও কুহকে ঘেরা মনে হয়েছে, এখন আর ততটা মনে হয় না, সমুদ্রের ঐ প্রহেলিকা এখন জীবন যাপনের একটা সাধারণ অংশ হয়ে ওঠেছে।

ছোট্ট লাটিমের মত দ্বীপ সোনার চরের পাঁচ মাইল পশ্চিম দিয়ে ঘণ্টায় আট মাইল বেগে উত্তরে এগিয়ে চলে ওরা। কম্পাশের কাঁটা আশি ডিগ্রিতে, নাক বরাবর রাতের কালো আকাশ যেন জমাট বাঁধা বিশাল এক টুকরো আদিরহস্য, যার আড়ালে কি রয়েছে, জানে না কেউ। মাথার উপরের আকাশে ফুটে থাকা অসংখ্য উজ্জ্বল তারা পেকামের চোখে জীবনের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। দক্ষিণের চিলা দ্বীপের শরীর ক্রমশ ছোট হতে থাকে, ডানদিকের উপকূলে ঘন কালো কেওড়া বন, বনের বুক চিরে কোথাও নেমে এসেছে নোনা জলের সরু খাল, অন্ধকারে মনে হয় ঘন মেঘের আকাশে বিদ্যুতের স্থায়ী কোনো ছাপচিত্র। উপকূল ঘেঁষা কোনো কোনো বাজারের মশালবাতি এক ঝাঁক জোনাকির মত মিটমিটিয়ে জ্বলে। ঈদের বাজার আর মসলাপাতির বেসাতি চলবে পুরো হপ্তা জুড়ে, প্রতি মধ্যরাত পর্যন্ত। চাঁদের ধূসর আলোয় শুয়ে থাকা গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে নেমে আসে শেয়াল, বাঘদাস, মাছখেকো বুনোবেড়াল, এমন সব রাতবিহারী প্রাণী। দিনের আলোয় রাস্তার আশেপাশের ঝোপঝাড়ে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে কাটায় ওরা। রাতের অন্ধকারে গৃহস্থ বাড়ির আঙিনা ঘুরে ঘুরে দেখে, কোনো বাড়ির গেরস্ত-বউ হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ের দরোজা ভুল করে না আটকালে, একটুও শব্দ না করে টুঁটি কামড়ে জঙ্গলের ভেতর নিজেদের নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে আসে। গ্রামগুলোর ঝাঁপসা রূপ পেকামকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। বছর প্রায় পেরিয়েছে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে এসেছে, ওদের গ্রামের শেয়ালগুলোও নিশ্চয় দল বেঁধে রাতের আকাশে আগমনী চিৎকার ছড়িয়ে অন্ধকারকে আরো গাঢ়ো করে তুলেছে এখন!

‘উৎসবমুখর একটা নতুন চাঁদের জন্য যখন তোমার চারপাশের মানুষেরা প্রতীক্ষা করে, তখন তুমি ভেবে নিতে পারো যে সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষেরাও ঈদের চাঁদের জন্য স্বপ্ন বুনে চলেছে, কারণ ঈদ হচ্ছে সারা পৃথিবীর মুসলমানের জন্য একটা আনন্দের দিন।’ নিজেকে কথা কটা বলে পেকাম, আর অন্তর্গত একাকীত্ব থেকে বেরিয়ে অনেক মানুষের আকাঙ্খার ভেতর প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে। বছরের এ সময়ে ঘরে ফেরার জন্য অপেক্ষা করে থাকে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ, সেও ওদেরই একজন। বুকের ভেতর ফুরফুরে হাওয়া বইতে থাকে, সারা বছরের ক্লান্তিকর কঠিন জীবনের গ্লানি ছাপিয়ে মনে হয় ঘরে ফেরাতেই সকল সুখ। কষ্টকর চাষাবাদের পর ফসল তোলার আনন্দের মত উপভোগ্য, আর হৃদয়জুড়ানো।

সমুদ্রের ঢেউগুলো ট্রলারের মাঝখানে বাঁকানো সবচেয়ে নিচের অংশ থেকেও অনেক নিচুতে রয়েছে। গতি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য ইঞ্জিনঘরে সংকেত পাঠায় পেকাম। হাল ঘুরিয়ে ট্রলারের মুখ এবার সোজাসুজি পূর্ব দিকে স্থির করে। কয়েকঘণ্টা এভাবে চালিয়ে নেয়া যাবে একই গতিতে, আবহাওয়ায় তেমন কোন গোলমাল যদি দেখা না দেয়। ইফতারির পর নামাজ পড়ে শুয়েছে সারেঙ চাচা, বিশ্রাম নেবে কিছু সময়, রাতের খাবারের আগ পর্যন্ত। মাঝি-মাল্লাদেরও কোনো কাজ না থাকায় ট্রলারের খোলের ভেতর নেমে ঝিমিয়ে নেয়।

ইঞ্জিনের থিকথিক, বাতাসের শোঁশোঁ, আর ট্রলারের গায়ে ঢেউ ভেঙে পড়ার ছলছল শব্দের একঘেয়েমির ভেতর থেকে বাঁচার একমাত্র পথ, নতুন কোনো স্বপ্ন দেখতে শুরু করা, অথবা অতীত কোনো স্মৃতির ভেতর ডুব দেয়া। স্বপ্ন তো আর ইচ্ছে হলেই দেখা যায় না, অথচ এই একাকীত্বের ভেতর অতীত স্মৃতি এমনিতেই এসে ভিড় করে। গেলো বছর ঈদের উৎসব আনন্দ শুরু হওয়ার বেশ ক’দিন আগে ঘরে ফিরতে পেরেছিল পেকাম। রোজগার ছিল বেশ ভালো, কেনাকাটাও করেছিল প্রচুর। অথচ এবার মাছ ধরা পড়েছে কম, মৌসুমের আরো ক’দিন বাকি থাকতেই বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে। পনেরো দিন এগিয়ে এসেছে ঈদ, মানে মৌসুমটাও পনেরো দিনের জন্য ছোটো হয়ে গেছে। ঈদের পরে এসে আবার জো ধরা মুশকিল, মাঝি-মাল্লাও পাওয়া যাবে না তখন।

বাড়ি ফিরে এবার মাকে জানিয়ে দেবে, প্রস্তুত সে এখন। গত দু’বছর ধরে বিয়ে করার জন্য মায়ের ঘ্যানঘ্যান শুনে এসেছে, এবার মায়ের হাতে কোনো কিছু তুলে দেয়ার দরকার হবে না, শুধু এই ইচ্ছেটা ঈদের আনন্দের ভেতর ডুবিয়ে দেবে মাকে। ছোট ভাইবোনদের জন্য অবশ্য যথেষ্ট কেনাকাটা করেছে, শরফুনের জন্যেও কিনেছে অনেককিছু, কিন্তু সে-সব পৌঁছাতে হবে লুকিয়ে।



খুব শান্তভাবে শুরু হয় সমস্যাটা, একটু আগেও ধারণা করতে পারে নি পেকাম যে কি ঘটতে চলেছে! প্রথম সংকেত পায় বাতাসের দিক-নির্দেশক মোরগটার এলোমেলো ঘুরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে, কম্পাশের কাঁটার দিকে তাকিয়েও বিষয়টা ধরা পড়ে। তিনশো ত্রিশ ডিগ্রিতে স্থির হয়ে থাকার পরিবর্তে অনবরত পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ করে চলেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, যদিও ভাবছে পেকাম যে সোজা সামনে এগিয়ে চলেছে নৌকোটা, আসলে তা নয়, একটা কানামাছির মতো ধেয়ে চলেছে ওটা! মন্থর ও অলসভাবে শুরু হলেও যে-কোনো রূপ ধরতে পারে এটা এখন, ঢেউয়ের উচ্চতায় অবশ্য তেমন কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না, বাতাসের গতিতেও না!

কালো হয়ে ওঠেছে সামনের আকাশ, তারাগুলো হারিয়ে গেছে কখন ঘন মেঘের আড়ালে। ম্লান হতে হতে চাঁদের রেশটুকুও মুছে গেছে দৃষ্টি থেকে। এখনও গভীর হয়ে ওঠে নি রাত, দিগন্তের ওপাশে সূর্যের প্রতিফলন রয়ে গেছে আকাশে। একটা ভুতুড়ে আলো আচ্ছন্ন করে রেখেছে সমুদ্রের শরীর। মাঝে মাঝে একটা লালচে ঝিলিক আকাশ আর সমুদ্রের মধ্যে পার্থক্য গড়ে তুলে। ঐ ক্ষণিক আলোয় নৌকোর কালো শরীরও যেন লাফিয়ে ওঠে। অপার্থিব এক স্তব্ধতার ভেতর আসন্ন দুর্যোগের চিহ্ন ফুটে ওঠে। এই শীতের রাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দেয় পেকামের, মনে হয় মাথাটা যেন ঘুরছে, শক্ত হাতে হুইল আঁকড়ে ধরে সামলে নেয় নিজেকে।

কম্পাশের এ রকম আচরণে মনে মনে কিছুটা রেগে যায় পেকাম, নৌকোর গতি কোনোভাবেই বলে না যে এ রকম দিকবিদিক ছুটে চলেছে ওরা, কাছে রাখা ছোটো আরেকটা কম্পাশ দেখে চমকে ওঠে, ওটার আচরণও একই রকম, বন্যভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কাঁটাটা!

এ অবস্থায় কি সারেঙ চাচাকে ডাকা যায়? কম্পাশের কাঁটা যেভাবে নেচে চলেছে, এর অর্থ ‘আমি জানিনে ঘুরেফিরে কোন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকোটা, অথবা কোথাও যাচ্ছে কিনা আদৌ!’ সারেঙ চাচাও-বা এ মুহূর্তে কি বলবেন? বরং ওর সার্বক্ষণিক সঙ্গি জাকেরকে ডাকে, ‘জাকের, জাকের, ও জাকের আলী... ...’ ঐ শব্দগুলোকে ওর কানেই আবার ফিরিয়ে দেয় সমুদ্রের রহস্য হয়ে ওঠা বাতাস, অথবা নিয়ে যায় অন্য কোনো রহস্যলোকে। জাকেরের দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ধরে নেয়, ঘুমিয়ে পড়েছে ওরা, এক ধরনের বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে পেকামের ভেতর। সামনে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, আকাশ যদিও বলা যায় পরিষ্কার এখন, এবং চাঁদের কিরণ মেঘহীন আকাশ থেকে নির্বিবাদে ঝরে পড়ছে ঢেউয়ের চূড়োয়, কিন্তু যে-কোনো মুহূর্তে সমুদ্র পাল্টে ফেলতে পারে তার রূপ। খুব বড় দেখায় না ঢেউগুলো, কিন্তু কেমন যেন এলোমেলো। পেছনের ছোট সোনার চরের মানুষেরা গরম চায়ের কাপে ওদের অলস ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে এখন, সামনে রয়েছে ছোট্ট একটা রাত, এক ঘুমেই উড়িয়ে দেয়া যায়। কিন্তু পেকামের রাত যেন শুরু হয়েছে অজানা এক ভৌতিক আচরণের মধ্য দিয়ে। তীরে ছেড়ে আসা ওর বন্ধুরা হয়তো এ মুহূর্তে কত কথাই না বলছে ওকে নিয়ে। ছোট্ট এই সমুদ্রযাত্রা, ঘরে ফেরা, শরফুর সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করা, এসব নিয়ে রঙ্গতামাসা করছে। ভারি হয়ে ওঠে বুকের ভেতরটা, হালকা করা যায় না কিছুতেই।

খুব শান্ত ও নিঃসঙ্গ মনে হয় সমুদ্রটাকে হঠাৎ, এ মুহূর্তে শূন্য ও ভয়াবহ, শীতের কুয়াশার ভেতর এখন আরো জটিল ও অকরুণ। দৃষ্টির অস্বচ্ছতার জন্য কিছুটা সংকুচিত, এই শূন্যতায় ছোট্ট ট্রলারটার ভেতর কয়েকটা প্রাণের অস্তিত্ব যেন একমাত্র ব্যতিক্রম। মজবুত কাঠ আর ধাতুপাতের ছোট্ট এই বাক্সটার ভেতর কয়েকটা জীবনের অসামঞ্জস্যকর উপস্থিতি না থাকলে বিশাল এই জলপর্বতের উপর লাফিয়ে আছড়ে-পিছড়ে ভাসতে থাকা এই নৌকোটা এখন একটা কুটো ভিন্ন অন্য কিছু নয়। প্রতি সেকেন্ডে কয়েক ফুট এগিয়ে পিছিয়ে, কিংবা ডানে বাঁয়ে যেয়ে কিছুটা জায়গা পরিবর্তন করে হয়তো, কিন্তু ঘুরপাক খায় সেই একই অতিপ্রাকৃতিক ভয়াবহতার ভেতর। হিমশীতল, অবর্ণনীয় কোনো ধ্বংসের অনুভূতি একজন নাবিককে সমুদ্রের ভেতর খুব তাড়াতাড়ি নিষ্ক্রিয় করে তোলে। মৃত্যুর শীতল অনুভূতি ছড়াতে পারে এমন কোনো কাল্পনিক দৃশ্য থেকে তাই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে পেকাম। মুখের ভেতর শুকিয়ে ওঠা খটখটে জিভ চুষতে থাকে, আর দরিয়ার পাঁচপিরের নাম জপে অবিরাম। নিঃসঙ্গ এই অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছেয়, অথবা ভেতরে সাহস সঞ্চয়ের জন্য আবার চিৎকার করে ডাকে জাকেরকে। কিন্তু ঐ বিরুদ্ধ বাতাস সমুদ্রের অশান্ত গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ ফিরিয়ে দেয় না ওর অস্থির কানের ভেতর। এরকম কঠিন এক সময়ে মুহূর্তের একটা ভগ্নাংশের জন্যও হাল ছেড়ে কোথাও যাওয়া যায় না, অথচ নিচে নেমে ওদের কাউকে ডেকে আনা দরকার। ইঞ্জিনে থাকা জাকের কি বুঝতে পেরেছে সমুদ্রের এই অসংলগ্ন অবস্থা? যত চিৎকার করেই ওকে ডাকুক না কেন পেকাম, কোনো শব্দই ওর কানে পৌঁছাবে না ইঞ্জিনের বিকট ধাতব শব্দ ছাড়িয়ে, তবুও প্রাণপণে ‘জাকের, জাকের’ বলে হাঁক দেয়। ঐ তীব্র চিৎকার সমুদ্রের ভয়াবহ শব্দ তরঙ্গের ভেতর কোথায় হারিয়ে যায়, পেকাম জানে না, হয়তো কেউই জানে না! মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভেবে দেখে, শুধু একটা কাজই করতে পারে সে এখন, সমুদ্রের এই ভয়াবহ স্বেচ্ছাচারিতার ভেতর নিজেকে ছেড়ে দেয়া, পরিস্থিতির উপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে নিজের প্রতিটা ঈন্দ্রিয় সজাগ রাখা। তীব্র উত্তেজনায় ফেটে পড়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অতীতের কোনো ঘটনা মনে করতে পারে। সারেঙ চাচার হাত থেকে নৌকোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে পাওয়ার জন্য আটটা বছর দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে, বেশিরভাগ সময়ই সারেঙ চাচা শিখিয়েছেন কীভাবে বিপদকালে মাথা ঠাণ্ডা রেখে জাহাজ চালাতে হয়, স্বাভাবিক সময়ে নৌকো বা জাহাজ চালানোয় কোনো বাহাদুরি নেই, সারেঙের আসল পারদর্শীতা আপৎকালীন সংকটে, এখন মনে হয় ঐ পরীক্ষায়ই ওকে বসিয়ে দিয়েছেন সারেঙ চাচা।

‘তোমাকে বুঝতে হবে ঢেউ ও পানির স্রোত পৃথকভাবে। ঢেউগুলো পানির স্রোতের কোন দিক থেকে আসছে। স্রোতের দিক থেকে এলে এক রকম ব্যবস্থা, বিপরীত দিক থেকে হলে অন্য রকম। ডান বা বাম পাশ থেকে হলেও ভিন্ন রকম ব্যবস্থা নিতে হবে। বুঝতে হবে, দুটো ঢেউয়ের মাঝখানে পড়ার হাত থেকে কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে। কী করে ঢেউয়ের চূড়ায় উঠে যাওয়া যায়। আবার কীভাবে পতন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যদি কখনো পাশ থেকে ঢেউ এগিয়ে আসতে থাকে তাহলে তোমার আচরণ কেমন হবে। ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ে গেলে করণীয় কি? আর যদি জাহাজটা ডুবেই যায়...’ নাহ্ এত দূর সে ভাববে না। মনে হয় সারেঙ চাচার ট্রেইনিংয়ের মধ্যেই এখন রয়েছে সে।



পেকামের ইচ্ছে হয় না কম্পাশের দিকে তাকাতে, কোন দিকে যাচ্ছে এখন, ওটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল, সমুদ্রের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জাহাজের সামনের দিকটা মৃত্যুর বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে রাখা। ঢেউয়ের গতিবিধি ও বাতাসের আচরণ খুব সাবধানে খেয়াল রাখে পেকাম। সামনের দিকে, অথবা যে-কোনো দিকে, খুব বেশি দূরের কিছু যদিও চোখে পড়ে না, তবুও বুঝতে চেষ্টা করে ধারে কাছে অন্য কোনো জলযানের অস্তিত্ব রয়েছে কিনা। ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে ট্রলারের নিচে আছড়ে পড়া পানির শব্দ। বাতাসের তীব্রতায়ও চাঞ্চল্য বোঝা যায় বেশ পরিষ্কারভাবে, কখনো বেড়ে যায় হু হু করে, আবার কখনো প্রায় শান্ত। হতে পারে, কোনো দৈত্য-দানোর ধাওয়া-পথের সামনে পড়েছে ওরা, অথবা ধেয়ে চলেছে ঐ দৈত্যের পেটের ভেতর দিয়ে। অথচ খুব অবাক করে দেয়ার মত গভীর কালো-নীল আকাশের লাবন্য, মাথার উপরে আবার দেখা দিয়েছে উজ্জ্বল তারাদের ঝিকিমিকি! ‘এসব ক্ষেত্রে জ্বালানির অপচয় রোধ করতে হবে তোমাকে, কারণ মহা বিপদের সময় প্রচুর জ্বালানি ব্যবহার করতে হতে পারে।’ সারেঙ চাচার নির্দেশ মনে পড়ে, ইঞ্জিনরুমে সংকেত পাঠায় গতি কমিয়ে দিতে, সঙ্গে সঙ্গে কাজ হয়, ট্রলারের ঝাঁকুনিও কমে যায় কিছুটা। পর-মুহূর্তে বুঝতে পারে মারাত্মক একটা ভুল করে বসেছে, দিয়াশলাইর একটা বাক্সের মত কাত হয়ে ডুবে যাওয়ার অবস্থা হয়। ইঞ্জিনের গতি বাড়ানোর সংকেত পাঠানো, আর হাল ঘুরিয়ে ট্রলারটাকে রক্ষা করার কাজ দুটো একই সঙ্গে সম্পন্ন করে পেকাম। পলকের জন্য দম আটকে গিয়েছিল মনে হয়, সামলে নেয়ার পর বুঝতে পারে, ট্রেইনিংটা ভালোই দিয়েছে সারেঙ চাচা। এতোক্ষণ ঠিক গতিতেই চালিয়ে এসেছে জাহাজটা, নয়তো অনেক আগেই অবস্থা অন্যরকম হত।

‘প্রকৃতি যখন নীরব থাকে, ও সমুদ্র থাকে শান্ত, আকাশের তারাগুলো নাবিকদের দিক-নির্দেশনা দেয়। আকাশের তারাদের মানচিত্র প্রতিটা নাবিককে মনে রাখতে হয়। স্বাভাবিক সময়ে তোমার অবস্থান সম্পর্কে এর চেয়ে ভালো পরামর্শ আর কেউই দেয় না! কিন্তু সংকটের সময় ওগুলো শুধুই দৈত্য-দানোর চোখ হয়ে উঠতে পারে। ওসবের দিকে তাকানোরই প্রয়োজন নেই তোমার, ভাবতে পার, চোখ থাকবে শুধু ঢেউয়ের ওপর। ঢেউ, শুধুই ঢেউ। এর হাত থেকে বাঁচা মানেই মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচা। তোমার সামনে হঠাৎ কখনো একেবারে শান্ত হয়ে পড়েছে সমুদ্র। তুমি কি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে? মোটেও না। তখনই হয়তো দেখবে পেছন থেকে দৈত্যের মতো ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছে তোমার উপর। কি করবে?’ সারেঙ চাচা যেন এ মুহূর্তে এ প্রশ্নটাই করছেন ওকে! ওটার জবাব তো ওর জানা নেই, বলতে হবে সারেঙ চাচাকেই, মনে মনে উন্মুখ হয়ে থাকে, কি বলেন তিনি তা শোনার জন্য!

‘মানুষের মূল পাঁচটা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে একজন নাবিকের তিনটা ইন্দ্রিয় খুব তীক্ষ্ম হতে হয়। প্রথমটা, চোখের দৃষ্টি, দ্বিতীয়টা কান এবং তৃতীয়টা ত্বক। প্রথম দুটো প্রখর থাকতে হয় সব সময়, আপৎকালে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তৃতীয়টা। সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হয় তাপমাত্রার পরিবর্তন। দুর্যোগের সময় গরম লাগা, অথবা বাতাস হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, প্রভৃতি ভিন্ন রকম ইঙ্গিত দেয়।’ নাবিকের নাক ও জিহ্বা জাহাজ চালানোয় কোনো কাজে না আসলেও এ মুহূর্তে ওদুটোকেই যথেষ্ট সক্রিয় মনে হয় পেকামের। নাকের ডগায় দেখা দিয়েছে ঘাম, আর জিভ শুকিয়ে যাচ্ছে বাজে রকমভাবে।

দিনের উজ্জ্বল আলোয় জাহাজ চালানো, আর দুর্যোগের রাতে চালানোর মধ্যে আকাশ ও পাতালের পার্থক্য ঘটে। দক্ষ হয়ে ওঠার আগে একজন নাবিক একই পথে অসংখ্যবার আসা যাওয়া করে, তীরের বিচিত্র রূপ দেখে বুঝতে পারে সমুদ্রের কোথায় সে রয়েছে, এমনকি সমুদ্রতীরের পরিচিত ঢেউয়ের ভেতরেও থেকে যায় অনেক নিশানা, কোনো কোনো তটের কাছে বেশ উঁচু হয়ে ওঠে ঢেউগুলো, আবার অন্য কোথাও শান্ত। জলের গভীরতা ও বাতাসের গতির জন্য এরকম হয়ে থাকে। আবার নদীর মোহনায় সমুদ্রের অন্য রূপ। ঘুমের ভেতরেও এসব অনুভব করতে পারে দক্ষ নাবিকেরা।

নিকষ কালো রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সমুদ্রের বুকে কিছু আলোর বিন্দু দেখা যায় কখনো, অনেক সময় ভ্রান্তি তৈরি করে সে-সব। আবার কখনো আশার আলো হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে পেকামের সামনে ও পেছনে কোনো আলোর বিন্দুও নেই এমনকি। দানবের মত কালো ও পর্বতের মত বিশাল ঐসব ঢেউ থেকে চোখ ফেরানো মানে বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়া, তবুও হাতঘড়ি দেখে নেয় চকিতে, মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আগে তীর ছেড়ে এসেছে। সামান্যও যদি পুবে এসে থাকে, আর জাহাজটা যদি এখন ওদিকেই এগোয়, তাহলে বাঁদিকের উপকূলে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে কাছের লোকালয়। কিছুটাও যদি তীরের কাছাকাছি থাকা যায়, ক্ষীণ একটা আশা জিইয়ে রাখা যায় যে কূলের মানুষজন এই বিপদের বিষয়টা জানতে পারবে। এমনকি উদ্ধারের চেষ্টাও করতে পারে। কিন্তু সত্যিই বুঝতে পারে না পেকাম যে কূল থেকে নৌকোটা আরও দূরে সরে যাচ্ছে এখন, নাকি কূল বেয়ে চলেছে। উপকূলের যে দিকে রয়েছে ওরা, তাতে দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখি অথবা পুব থেকে পশ্চিমমুখি ঢেউ আসার সম্ভাবনা বেশি। কূলের দিক থেকে ঢেউ আসবে না যদি না সে কোনো ঘূর্ণির ভেতর পড়ে গিয়ে থাকে। কিন্তু এখন যে কোথায় রয়েছে সে, কোনোভাবে তা ধারণা করতে পারে না পেকাম।

দুলতে দুলতে ছোট্ট নৌকোটা একবার ঢেউয়ের চূড়ায় ওঠে, আবার ছিটকে পড়ে খাদের গভীরে। তখনই সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্থ মনে হয়, যখন সামনের ঢেউ ছুটে আসে সবসুদ্ধ ওদের গিলে নিতে। অসীম শক্তির ঐ জলের ধাক্কায় ছোট্ট নৌকোটা আরেকটা ঢেউয়ের চুড়ায় ওঠে যায়। এ রকম অসংখ্য ফেনিল উপত্যকায় হাবুডুবু খেতে খেতে পেকামের ছোট্ট ট্রলারটা বঙ্গোপসাগরের গভীরে এগিয়ে যায়। হুইলডেকের দরজা জানালা বন্ধ থাকায় ভেতর থেকে ততটা বোঝা যায় না কীভাবে প্রবল বাতাস এর বাইরে পিটিয়ে চলেছে। সমুদ্রের গর্জন কখনো এক অবদমিত ক্রুদ্ধতায় ছুটে আসে ভয়ানক গোঁ গোঁ শব্দে, মাঝে মাঝে মনে হয় ট্রলারের ডেকের ওপর দিয়ে অবিরাম দৌড়ে চলেছে কেউ। কাঠ ও ধাতুপাতের অবিরাম ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ শব্দ হাতুড়ি পিটায় মাথার ভেতর। হাজার হাজার হায়েনার ফ্যাঁস-ফ্যাঁসে আর্তনাদ জাগিয়ে ছোট্ট হুইলডেকের দরজা জানালার শার্সি ও পাল্লাগুলো প্রতি-মুহূর্তে তৈরি করে এক ভুতুড়ে শব্দ-জঞ্জাল। ট্রলারের কমলা হলুদ আলো বৃষ্টির ছাঁট অথবা ঘন কুয়াশা ভেদ করে সামান্য ক’ফুট দূরত্বের ভেতর নাচানাচি করে। কল্পনা করা যায়, কাঠের বাঁকানো এই কালো খোলটা কোনো প্রেতের হাতের খেলনা, অথবা সামনের এই দৃশ্যটা এক উত্তাল জনসমুদ্র, সামনে খোলা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে পেকাম।

মাইজদি কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় রাজনীতির বিভ্রান্তিতে, আরো বিশদভাবে বললে, হঠকারিতায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টা মনে পড়ে। এখন এই জনসমুদ্রের জন্য মনে মনে একটা জ্বালাময়ী ভাষণ সাজায় সে। সামনের অসংখ্য ঢেউ যদি হয় মানুষের প্রতিরূপ, তাহলে একটা মহাসমাবেশই বলা যায় এটাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছু সময় সেখানে ডুবে থাকে পেকাম। ‘শুনুন বন্ধুগণ’, বন্ধু বলে সম্বোধন করে শ্রোতাদের, অনেকটা আন্তরিকতা দেখানো হয় এতে। জাহাজের হুইলের ওপর হাত দুটো এমনভাবে রাখে যেন উঁচু পোডিয়ামের উপর ওগুলো, সামনের দিকে নোয়ানো মাথা। একটা অপরিচিত ষাঁড় দেখে বাড়ির পোষা কুকুরটা যদি ঘেউ ঘেউ করতে থাকে অকারণে, তাহলে মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে যেভাবে শুধু শিং দুটো দেখায় ষাঁড়টা, অনেকটা সে-রকম। হঠাৎ মাথা সোজা করে শ্রোতাদের কাছে জানতে চায় সে, ‘বন্ধুরা, দিনের পর দিন আপনারা কি মঞ্চের এপাশ থেকে প্রতিশ্র“তি শুনে আসছেন না? আপনাদের পর-দাদারা শুনেছেন, দাদা-নানারা শুনেছেন, বাবা-চাচারা শুনেছেন, আপনারাও কি তাহলে প্রতিশ্র“তি শুনতেই এখানে জড়ো হয়েছেন?’ শ্রোতাদের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। ‘তাহলে হতাশ হতে হবে আপনাদের, আপনারা জানেন প্রতিশ্র“তি দেয়া কত সহজ, প্রতিশ্র“তি পেতেও খুব ভালো লাগে, কিন্তু কোনো প্রতিশ্র“তি দেয়ার কথা ভাবি না আমি, তাহলে কি আমাদের অভাব অভিযোগের কথা বলব? আপনাদের চেয়ে কে আর বেশি জানে এসব? আপনাদের সকলের পেটে কি যথেষ্ট খাবার আছে? আপনাদের ছেলেমেয়েরাও কি সমাজের জঞ্জাল হিসাবে বেড়ে উঠছে না? এদেরকেই কেউ কেউ বলছেন মানব-সম্পদ! আশরাফুল মখলুকাত!’ আবার সামান্য নীরবতা, ও গুঞ্জন। ‘ফুঃ! বলুন দেখি জীবনের চেয়ে সস্তা আর কি আছে? আমরা বলি জীবন অমূল্য! কথাটা শুধু আপনার আমার মত মূর্খ মানুষদের ঠকানোর জন্য, জীবন নয়, বরং বস্তু অমূল্য। কত অসংখ্য জীবন, অথবা জীবনের সম্ভাবনা প্রতি মুহূর্তে ধ্বংস করছি আমরা জানেন? একটা মাছের কথাই ভাবুন, কত কোটি ডিম দেয়? প্রতিটা ডিমের ভেতরই একটা জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে কিনা বলুন! বলবেন তো মাছের আর মানুষের জীবন এক নয়, আমি স্বীকার করি, এক নয়, কিন্তু বন্ধুরা, আমি বলছি জীবনের সহজলভ্যতার কথা, এক জন পুরুষ একবারেই পৃথিবীর কোটি কোটি নারীর জন্য একটা করে ভ্রুণের ব্যবস্থা করতে পারে, এগুলো কি জীবনের সূত্র নয়? পৃথিবীতে প্রতিদিন যত প্রাণের সংহার হচ্ছে তত বস্তু ধ্বংস হচ্ছে না, তারপরও প্রাণীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।’ এ পর্যায়ে মানুষের ভেতর অতিরিক্ত কিছুটা গুঞ্জন দেখা দেয়। ‘আমি বুঝতে পারি, আপনাদের ভেতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার জবাব এ রকম হতে পারে যে জীবনের মূল্য ততটুকুই যতটুকু আপনি নির্দ্ধারণ করেন। তার মানে আপনার কাছে হয়তো আপনার জীবন অমূল্য, আপনার প্রিয়জনদের কাছেও আপনার জীবনের কিছুটা মূল্য রয়েছে, কিন্তু অন্যের কাছে আপনার জীবনের মূল্য একটা জীবনের বেশি কিছু না।’ আঞ্চলিক ভাষায় এসব বলে সে, কিন্তু বুঝতে পারে, গ্রামের চাষা-ভুষা এইসব মানুষের সামনে জীবনের মূল্য নিয়ে কচকচালে উঠে যাবে ওরা, সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘তাহলে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছি যে নিজেদের কাছে আমাদের জীবনের মূল্য রয়েছে, এবং এটা নিয়েই ছিনিমিনি খেলছে ওরা।’ মনে হয় একটা প্রতিপক্ষ এবার সামনে নিয়ে এসেছে সে, প্রতিপক্ষ না থাকলে যে খেলা জমে না তা সবাই বোঝে। ‘একটা গল্প বলি শুনুন, ওদের ভাষায় মূর্খ অশিক্ষিত গাঁইয়া এক চাষার গল্প। আল্লার দুনিয়ায় সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠতে হত তাকে, মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ে মাঠে বেরোতে হত হাল নিয়ে, কোমর পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি হয়ে ফিরে আসতে হত ঘরে, তারপর গোছল সেরে নাস্তা খেয়ে আবার ছয় মাইল দূরের স্কুলে দৌড়ে পৌঁছতে হত চাষা থেকে মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টায়। কলেজে উঠে সে স্বপ্ন দেখে নিজের গাঁয়ের চাষা-ভুষো মানুষগুলোর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য। লোভনীয় রাজনীতির সুন্দর সুন্দর বুলির ফাঁদে পড়ে এক সময় দেখতে পায় তার কাঁধে বেশ শক্ত করে বাঁধা একটা জোয়াল, হাত দুটো ওর পরিণত হয়েছে সামনের পায়ে, পালিয়ে বাঁচে সে। তারপর পিতৃ-পুরুষের চারণভূমি এই সমুদ্রের বুকে ফিরে আসে চিরদিনের জন্য!’

আর এ মুহূর্তে সম্ভবত নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে চিরতরে! বাস্তবে ফিরে আসে পেকাম। সমুদ্রের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা ওর সামনে এখন, উত্তেজিত জনতার চেয়েও অনেক বেশি বিপদজনক ওগুলো। কল্পনায় আর কতক্ষণ বক্তৃতা চালানো যায়? ঝড়ের সমুদ্রে ভেসে থাকার মত একাকীত্ব বোধ হয় আর কোনো কিছুতেই নেই। সমুদ্রের বিপুলতার সামনে এমনিতেই নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, তুচ্ছ ও নিঃসঙ্গ মনে হয় মানুষের, আর এখন তো প্রকৃত অর্থেই নিঃসঙ্গ সে। সারেঙ চাচা যখন জাহাজ চালাতেন, হুইলডেকে তার পাশে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসাবে তখন থাকত পেকাম, গত আট বছর ধরে একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে এটা। পেকামও এই সন্ধ্যায় চেয়েছিল হুইলডেকের ভেতর ওর সঙ্গে থাকুক জাকের। নৌকোটার খোলের ভেতর সেই যে সেঁধিয়েছে বেরোনোর নাম-গন্ধও নেই, এখন তো আসার প্রশ্নই আসে না আর। নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্নের সম্মুখীন এখন পেকাম, ভয়ানক এই যুদ্ধটা যে চালিয়ে যাচ্ছে, এটা কি শুধু নিজের জন্য? নিজের বীরত্ব প্রকাশের জন্য! জীবন বাজি রেখে এভারেষ্ট শৃঙ্গে চড়ে যে মানুষ, শুধু কি অন্যকে দেখানোর জন্য, দেখ কত বড় দুঃসাহসী আমি! কেউ কি এত পরিশ্রম করে খেলা দেখাত যদি মাঠ ভর্তি দর্শক না থাকত? অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রেই তো তুমি ও আমি, নয়তো তুমি কেউ-ই নও, এ মুহূর্তে আমিও কিছু নই, ভাবে পেকাম। যদি তোমার সঙ্গে অন্য কেউ না থাকে, তাহলে তোমার কোনো অর্থ থাকে না, যেমন এ মুহূর্তে পৃথিবীর সামনে কোনো পেকাম নেই! সে কি করছে, পৃথিবীর কেউই তা দেখছে না, সে যা-ই করুক এখন, অন্যের কাছে তা অর্থহীন। অথবা এসব বলার সুযোগ পাওয়ার জন্য যদি বেঁচে থাকে সে, তাহলে তা হবে নিছক এক গল্প, যার সত্যি মিথ্যায় মানুষের কিছু যায় আসে না। বরং কল্পিত ও মিথ্যা গল্পই বেশি ভালোবাসে মানুষ, সত্য কাহিনী থেকে। যুদ্ধের কোনো বর্ণনাই সত্যি যুদ্ধের সঙ্গে মিলে না। কোনো ইতিহাসই সত্যি ইতিহাস না, মানুষ যা জানতে চায় তাই ইতিহাস। মানুষ রূপকথা ভালোবাসে, জীবনের সত্যি নয়!



অন্ধকার এই ঘূর্ণাবর্তের ভেতর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার মত ভয়াবহ আর কিছু হতে পারে না, এ মুহূর্তে জাকেরের উপর খুব রাগ হয় পেকামের। ও একটা কুকুর, আস্ত কুকুর, এখন সে পাশে থাকলে পেকামের মনোবল দ্বিগুণ নয়, পাঁচ গুণ হতে পারত। আর এই বাহাদুরিরও একটা অর্থ দাঁড়াত। কুকুরটা কাছে না থাকায় ওর পা নিশপিশ করে একটা লাথি ছোঁড়ার জন্য। আল্লার কিড়ে, একটা কুকুর লাথি খাওয়ার আগ পর্যন্ত তোমার পায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেন তুমি ভালোভাবে ওর পাঁজরে লাথিটা ছুঁড়তে পার। যদি তুমি লাথিটা না-ই মারলে তা হলে তুমি ঈশ্বরের ইচ্ছে অপূর্ণ রাখলে, জীবে প্রেম দেখালে না। আর তুমি যদি সত্যিই একটা লাথি মারতে চাও, তখন কুকুর কেন, কুকুরের একটা লেজও পাবে না। সারেঙ চাচা কুকুরের লেজ নিয়ে একটা গল্প বলেছিলেন। কোনো এক বছর কর্পোরেশনের কুকুর নিধন দল ঠিক মত গড়তে না পারায় ওরা ঘোষণা দিয়েছিল যে যারা কুকুর মেরে লেজ জমা দেবে তাদের লেজ-পিছু কুড়ি টাকা করে দেয়া হবে। সে বছর দেখা গেল লেজ-কাটা কুকুরে ভরে গেছে শহর। তারপরও কর্পোরেশনের মোটা-মাথাগুলো বুঝতে চায় নি যে মানুষের ইচ্ছে নয় শহরের সব কুকুর মেরে ফেলা!

জাকেরের কোনো কোনো স্বভাবও কুকুরের, শরৎ কালে যেমন কুকুরেরা চঞ্চল হয়ে ওঠে, সে-ও হঠাৎ কোনো এক সময় উতলা হয়ে ওঠে। তখন কোনো কাজে লাগানো যায় না ওকে। এমনিতে, কাজ ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখায় না কখনো। ওর শরীর, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য গুণাবলি, যতটাই আছে, অনেকের ঈর্ষার কারণ হতে পারে তা। চাইলে অনেক কিছুই পায়ের কাছে লুটাতে পারে, কিন্তু ফুর্তির ওসব পথে এগোয় না সে। হঠাৎ ক’দিনের জন্য হয়তো আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায়। নিজেই নয় শুধু, ঘনিষ্ট বন্ধুদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বাঁধভাঙা জোয়ার যেমন গাছপালা লতাগুল্মসহ একেবারে শেকড় উপড়ে নিয়ে চলে যায়, অনেকটা ওরকমই ওর গতি, ওর চোখ থেকে তখন ঠিকরে বেরোয় নক্ষত্রের উজ্জ্বল আলো। একটা অপ্রকাশ্য চঞ্চলতা, প্রাণের শিহরণে সারা শরীর ও মন নেচে ওঠে, যেন একটা আস্ত বাদক-দল ওর শরীরের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ, তীব্র তীক্ষ্ম সুরে সারাক্ষণ নেচে গেয়ে চলেছে ওরা। অথবা একটা বিশাল টারবাইন ঘুরছে ওর ভেতর, যা উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ওর শরীরে, নয়তো নিজেই একটা আণবিক বোমা হয়ে ওঠেছে, নীল স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যে-কোনো মুহূর্তে প্রকাণ্ড একটা ব্যাঙের ছাতার মতো মাথার উপরের পুরো আকাশ ছেয়ে ফেলবে। এরকম অবস্থায় ওর কাছাকাছি থাকার বা যাওয়ার সুযোগ কারো হয় না। তবে ভালো যে এরকম অবস্থা বছরে এক কি দু’বারের বেশি ঘটে না।

যে-কোনো পরিবেশ দ্রুত পাল্টে ফেলার আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে ওর, এই তো মাত্র ক’দিন আগের ঘটনা, কেন যেন সবার উপরে খুব চোটপাট দেখাচ্ছিল সারেঙ চাচা, প্রয়োজন না হলে তাঁর ধারে কাছেও কেউ যেতে চাইছিল না, কথা-বার্তাও বলছিল অনেকটা নিচু স্বরে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে মাঝি-মাল্লারা একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল। সমুদ্র বেশ শান্ত ও শীতল ছিল সেদিন, ওদের কুঠুরির দরজাটা শব্দ করে খুলে যাওয়ায় সচকিত হয়ে ওঠে সবাই। এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে দুম করে সেও ঢুকে পড়ে ওখানে। একটা কুকুর যেমন বৃষ্টি থেকে টুপ করে বারান্দায় লাফিয়ে উঠে গা-ঝাড়া দিয়ে আশেপাশের সবাইকে সন্ত্রস্ত করে তোলে, এর পর ছিটানো জলের রেশ কেটে গেলে মানুষেরা আর উপদ্রব মনে করে না ঐ প্রাণীটাকে, এক সঙ্গে অপেক্ষা করে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার জন্য, তার পর চলে যায় যে যার গন্তব্যে, তেমনি ওর আসার বিষয়টা হঠাৎ একটা কুয়াশা-ভেজা পরিবেশ সৃষ্টি করে, ব্যপারটা ওরকমই দাঁড়িয়ে যায়।

সতীর্থদের ভারি নিঃশ্বাস হালকা করে একটা অন্তরঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভেতরে ঢুকেছে সে, দুটো থালায় উপচে পড়া ভাজা মাছ নিয়ে এসেছে। নিজেদের খাওয়ার জন্য একটু ছোটো আকারের মাছ বেছে আলাদা করে রাখে ওরা। হাতে যখন যথেষ্ট সময় থাকে, বিস্কুটের বদলে ঐ সব ভাজা মাছ খায় মজা করে। ভাজা মাছের ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও মুহূর্তে হালকা হয়ে ওঠে ওরা, লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরে জাকেরকে।

হ, তাইলে এই জন্যই সারেঙ চাচা জাকেইরারে খুঁইজা পায় নাই!
না পাইয়া তো ভালোই অইছে।
ঠিক কইছোস।
অই জাকেইরা, সারেঙ চাচারে দিছোস তো?
সারেঙ চাচারে দেওন লাগবো না, নিজেগো লালোচ সামলাও আগে।

হেসে ওঠে সবাই, হাতে হাতে দ্রুত শেষ হয়ে যায় মাছগুলো। একটা প্লেইটের ভাঙাচোরা মাছের টুকরো অন্য প্লেইটে রাখতে গিয়ে পেকামের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় জাকের। চোখে চোখে কি জবাব দেয় পেকাম, কে জানে। ওর চওড়া দু’চোয়ালের মাঝখানে কালচে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। জাকেরের ভারি ঠোঁটদুটো ওর শান্ত মুখের জন্য একেবারে বেমানান। ও গম্ভীর থাকলে মনে হয়, মুখের ওপর অস্ত্রোপচার করে ঠোঁট দুটো বসিয়ে দিয়েছে বিধাতা, জন্মের সময় এ পৃথিবীতে ও-দুটো ছাড়াই আসতে চেয়েছিল সে, শেষ সময়ে ভুল বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি অস্ত্রোপচারটা করিয়ে দেন তিনি। কিন্তু কোনোভাবে হেসে উঠলে, যদি কেউ হাসাতে পারে ওকে, তখন অবাক হতে হয়, যারা ওর হাসি সত্যিই দেখতে চায়। এক অপূর্ব ভাস্কর্যের মতো পাথুরে কঠিন সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে ওর পুরো মুখ-চোখ জুড়ে! প্রগাঢ় উষ্ণতার ছোঁয়া প্রতিপক্ষকে নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করে।

এই জাকের, সারেঙ চাচা ঘর থাইকা বাইরোনের সময় কাছে আছিলি তুই? জিজ্ঞেস করে পেকাম।
কাছে আছিলাম না, তয় এক সাথেই তো বারাইলাম।
চাচির সঙ্গে কুনো ঝগড়া-ঝাটি অইছে?
মুনে অয়।
তাইলে তো খেপ এইডা গেছে।
কয় কেডা?
আমিই কই।
আমি তো অন্য কথা কই, এই খেপেই আমাগো দুনা মাইর অইবো।
দেখা যাউক, আল্লা ভরসা।

প্লেইট দুটো খালি হয়ে যাওয়ায় মেঝে থেকে উঠিয়ে নেয় জাকের, শরীরের আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ায় ফিরে যাওয়ার জন্য। পেকামের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা অদ্ভুত, আত্মীয়তা সূত্রে চাচাতো ভাই। খুব ভালোভাবে জানে পেকাম, শরফুর প্রতি ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে ওর, বাড়িতে বেশি সময় থাকার ফলে শরফুর কাছাকাছি সে-ই কাটিয়েছে বেশি। যদিও পেকামের সঙ্গে শরফুর বিয়ে হবে, সবাই জানে, নিবিড় সান্নিধ্যের কারণে শরফুর কাছাকাছি এসে পড়ে জাকের, এমনকি ওর সঙ্গে মাখামাখি সম্পর্কও গড়ে ওঠেছে বলে মনে করে পেকাম। জাকেরও ভালো করে জানে, শরফুকে চিরদিনের জন্য পাবে না সে, কিন্তু মন ও শরীরের আকর্ষণ এসব কিছুকে তো পরোয়া করে না। হঠাৎ পেকামের কি মনে হয় কে জানে, জাকেরের পিছু পিছু বেরিয়ে আসে, ট্রলারের পেছন দিকটায় দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত রাখে।

তোরে একটা কথা জিগাই, জাকের?
মুহূর্তকাল কি যেন ভাবে সে, তারপর খুব ছোট্ট করে জবাব দেয় না।

ছোট্ট এই উচ্চারণটুকুর ভেতর এতটা দৃঢ়তা জড়িয়ে থাকতে পারে ভাবতে গিয়ে অবাক হয় পেকাম, জাকের নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে যে পেকাম কি জিজ্ঞেস করতে চায়, এ জন্যই এই অবিচলতা। কেউ যখন নির্বিঘেœ কোনো সাঁকো পেরোতে গিয়ে দেখে হঠাৎ কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে ওটা, তখন দৃঢ় হাতে ঐ সাঁকোটাকেই আঁকড়ে ধরে নিরাপত্তার জন্য। শেষ মুহূর্তে সব ছেড়ে ছুঁড়ে জলে ঝাঁপ দেয়। পেকামও তা-ই করে, একই অবস্থা ওর, সে বুঝতে পারে, এখুনি ভেঙে পড়বে জাকের, তবুও ওকেই জড়িয়ে ধরে।
¬¬¬¬¬¬¬¬
জাকের, পষ্ট কইরাই কই, শরফুরে বিয়া কর তুই।
কুনো দিনও এই রকম আশা করি নাই আমি।
তাইতে কি? আগে আশা করস নাই, এখন করবি।
না, এইডা অয় না পেকাম ভাই।
তুই চাইলেই অয়।
কুনো দিনও না। আমার চাওয়া আর না চাওয়ায় কি আইয়ে যায়!
তুই চাইয়া দেখ, আমি চেষ্টা কইরা দেখি।
বিষয়ডা কি, তুমি কেন আচমকা এমুন ভাবতাছ?

যে জলে ঝাঁপ না দিলেও সাঁকোটা ওকে ওখানেই নামিয়ে দিত, পেকাম হাবুডুবু খায় সেখানেই, সাঁতরে কূলে উঠে আসা ছাড়া এখন আর করণীয় কি আছে? বুদ্ধিমান হলে অন্য তীরে উঠে যাবে সে, নয়তো ফিরে আসবে সেখানে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পেকাম বুদ্ধিমান, কাঁধ থেকে নামিয়ে জাকেরের পিঠে হাত রাখে, ওর ঘাড়ের চুলের গোড়ায় সুন্দর একটা চক্র আবিষ্কার করে, খুব ছোট্ট ও সূক্ষ্ম একটা আবর্ত, মাকড়শার জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় কোনো শিল্পী এঁকেছে যেন এটা।

না জাকের, তোর কাছে কথাডা আমি আইজকা উঠাইলেও অনেক দিন ধইরাই ভাবছি।
উঁহুঁ... বুঝার চেষ্টা কর তুমি, পেকাম ভাই, ওর সাথে আমার কিছুতেই কিছু হইতে পারে না, আমি গরিব, অশিক্ষিত, আমার কুনো যুগ্যতাই নাই।

কিন্তু পেকাম জানে, এই গরিব অশিক্ষিত মানুষটাই তৃপ্ত করতে পারে শরফুকে, কারণ ওর রয়েছে পাকা বেতের মত একটা শরীর, এতেই ওদের সম্পর্কটা তুলনামূলকভাবে দৃঢ় হবে। একথা তো জাকেরকে বলতে পারে না, ভাবনায় পড়ে যায়, চুপ করে থাকে কিছু সময়। ব্যপারটা মিটে গেছে মনে করে ওকে একা রেখে সরে যায় জাকের। কিন্তু পেকামের সমগ্র হৃদয় জুড়ে ছত্রাকের মত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা সংশয়! অজানা একটা ঝড় ওর ভেতরে তোলপাড় জুড়ে দেয়। জাকেরের বিপক্ষে ওর মনের মধ্যে একটা অভিযোগ ওঠার কথা, কিন্তু ওরকম কোনো কিছুই সে অনুভব করে না। অথবা বিপরীতভাবে জাকেরের ভেতর যদি সৃষ্টি হত পেকামের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ, যা একটা সরল-চিত্ত মানুষকে নিদারুণ মর্মপীড়ার ভেতর ছুঁড়ে দেয়, তাহলেও লড়ার জন্য একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু পেকামের বিরুদ্ধে জাকেরের কোনো অভিযোগ আছে বলে মনে হয় না। ওরা কেউই শরফুকে কারো কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় নি, নিতে চায় না, অথবা নেবেও না। কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যেখানে ওদের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। একটা বিষয় মনে হয় দু’জনেই জানে যে ওদের কারো ভালোবাসাই খুব বেশি জোরালো নয়। কারো হৃদয় দৃঢ় হয়ে ওঠার পর তার অন্তর্গত দুর্বলতাগুলো অতিক্রম করতে পারে সে। এমনকি বাইরের বাঁধাগুলোও দৃঢ়ভাবে অপসারণ করার চেষ্টা করে, কিন্তু চিরকালীন, অথবা প্রাত্যহিক কোনো বিষয় যদি একটা স্বাভাবিক ঘটনার মত সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হয়তো কাউকে সাময়িকভাবে খুব বিচলিত করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা পানসে বিষয়ে পরিণত হয় এটা। এখন যন্ত্রণা বোধ করে পেকাম, কোনো একটা সিদ্ধান্তে যেতে হবে তাকে, খুব ভালো হত যদি বিশ্বাসঘাতকতার কোনো ব্যপার হত এটা। তা হলে প্রতিপক্ষের দিকে বন্দুকের নল তাক করতে পারত, কিন্তু এখন ভাবতেও পারে না ট্রিগারে হাত রাখবে কেন সে? বরং নিজের দিকে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে প্রতিপক্ষকে ট্রিগার টানার জন্য আহ্বান জানায়।

কোনো একটা বিষয়ে তখনই বোঝাপড়ায় আসা যায় যখন প্রতিপক্ষও এগিয়ে আসে, কিন্তু কোনো এক পক্ষ একেবারে নির্বিকারভাবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলে তো আর সমাধানে পৌঁছা যায় না! কেন যে এটা এখন ওর ভাবনা-রাজ্য জুড়ে রয়েছে এভাবে, বুঝতে পারে না পেকাম। অন্ধ হলে প্রলয় থেমে থাকে না, চোখ বন্ধ রাখলে মৃত্যু ভুল করে ছেড়ে যায় না! যে ঝড় সমুদ্র তোলপাড় করছে সেটাই এখন মুখ্য, ভেবে পায় না কেন মনের ঝড় তাল মিলিয়েছে এর সঙ্গে। অন্তর্যামী হয়তো জানেন যে যুদ্ধ করার জন্য এখন ভাবনার একটা মুখোশ হলেও ধারণ করতে হবে ওকে, হয়তো এই ভাবনাগুলোই সেই মুখোশ!


কাগজের খেলনা নৌকোর মত এই ট্রলারটা নিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে যেটুকু সময় ধরে যুদ্ধ করছে, তাতে বড় বিঘাই ছেড়ে খুব বেশি দূরে যেতে পারার কথা না, পরের যে লোকালয় সমুদ্র থেকে দেখা যায় তার নাম লতাচাপলি। ওখানের বাতিগুলো ট্রলার ভেড়ানোতে সাহায্য করতে পারে পেকামকে। ছোট্ট ঐ গঞ্জটার পাশে একটা সমুদ্রখাঁড়ি রয়েছে। বিপদে পড়ে একবার ট্রলার ভিড়াতে হয়েছিল ওখানে, তারপর ঝড় না থামা পর্যন্ত ওখানেই কাটিয়েছে ক’দিন। বসতিটা ছিল বেশ পুরোনো, আর মানুষগুলোও খুব আমুদে। দিনগুলোর স্মৃতি এখনও স্পষ্ট মনে আছে পেকামের। ছোট্ট ঐ গঞ্জটার নাম তালতলী বন্দর। এক সময় রাখ্যাইনদের এলাকা ছিল ওটা, এখনও দু’এক ঘর রাখ্যাইন হয়তো আছে। এক রাখ্যাইন পরিবারে কয়েকদিনের জন্য অতিথি হয়েছিল ওরা। ওখান থেকে একদিন বেড়াতে যায় কুয়োকাটার মিশ্রিপাড়ায়। বিশাল বুদ্ধ-মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিল পেকাম। উঁচু ঘরের ছাদ সমান মূর্তিটা ঐ অজপাড়াগাঁয়ে কা’রা নির্মাণ করেছিল, ভেবে অবাক হয়!

রাতের সমুদ্র থেকে কূলের বাতিগুলো ছোট ছোট বিন্দুর মতো দেখায়, যদি সেগুলো একেবারে তীরবর্তী কোনো লোকালয় অথবা গঞ্জের বাতি হয়। নয়তো লাইট হাউসের বাতিই একমাত্র ভরসা। কূল-বাওয়া নাবিকদের অভিজ্ঞতায় অন্য রকম আলোর নিশানাও থাকে, কোনো কোনো ছোট শহরের উপর ভেসে থাকে হালকা আলোর আভা, বিস্তৃতি ও উজ্জ্বলতা দেখে ওরা বুঝে নেয় কোন শহর ওটা। উপকূলের বয়া বাতি তো রয়েছেই, কিন্তু এই কুয়াশা-ঢাকা রাতের অপ্রাকৃত চরিত্রের ভেতর কোনো কিছু আঁচ করতে পারে না পেকাম। উজ্জ্বল জ্যোৎস্না রাত সমুদ্র ও উপকূলের দৃশ্যগুলোর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়, নাবিকের পথের নিশানা দেয় না। ‘যদি আমি বাইশদিয়ার পশ্চিমদিকের উপকূলভাগের বিশাল বাঁকটা খুঁজে পাই, যেটার বিস্তৃতি চর হরি থেকে চর নাজির পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে, তাহলে আশার চর অথবা চর বিশ্বাসের কোনো একটাকে চিনে নিতে পারব, ওখানে পৌঁছাতে পারলে কোনো একটা পরিচিত খাঁড়ি পেয়ে যেতে পারি, যেখানে পাওয়া যেতে পারে কিছুটা নিরাপত্তা।’ মনে মনে ভাবে পেকাম। কিন্তু ওটা হারিয়ে ফেললে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে, আলোর আভা দেখা যায় এমন উপকূলের সন্ধান পাওয়া এখন অসম্ভবের প্রায় কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক দূরের শহরের আলো উপকূল থেকে কম করে হলেও কুড়ি মাইল ভেতরে। শাহবাজপুর নদীর মোহনার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেও কিছুটা ভরসা, হয়তো কোনো ট্রলার বা পণ্যবাহী জাহাজের দেখা পাওয়া যেতে পারে। অনেক বয়া-বাতি আছে ওখানে, কোনো একটার কাছে যেয়ে লালবাতি দোলালে উদ্ধারকারী কোনো দলের চোখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামনে, অনেক দূরে, পর্বতের ছায়ার মত কালো একটা কিছু দেখা দেয়ায় পেকামের মনে হয় উপকূলের দিকে এগিয়ে চলেছে সে। দিগন্ত জুড়ে থাকা ঐ ছায়া আরো গভীর হতে থাকে, মাটির কাছাকাছি পৌঁছার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়, ধীরে ধীরে ট্রলারের গতি কিছু কমিয়ে দেয়ার চিন্তা করে। ক্ষুব্ধ সমুদ্রে প্রতিটা নাবিকেরই প্রচেষ্টা ও প্রার্থনা থাকে যেন জাহাজের ইঞ্জিন কোনোভাবে বন্ধ হয়ে না যায়, হুইলটা যেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। ইঞ্জিনরুমে সংকেত পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে যদিও পালিত হচ্ছে সে-সব, কিন্তু ওর মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, সমুদ্রের ঐ ভয়াবহতার বিষয়টা কতটুকু অনুভব করতে পারছে জাকের। হুইলডেকের সামনে থেকে সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করা, আর ইঞ্জিনরুমে ঠিকঠিকভাবে ইঞ্জিন চালু রাখার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে, জীবন ও মৃত্যুর আসল সূত্র যদিও থেকে যায় ইঞ্জিন চালকের হাতেই। ইঞ্জিন যদি বন্ধ হয়ে যায় কোনোভাবে, তাহলে সারেঙের কাজ শেষ, তখন সমুদ্রের কাছে নিজেদের সমর্পণ করা ছাড়া কোনো গতি থাকে না।

নির্মম একাকীত্ব প্রতি মুহূর্তে অনুভব দিয়ে কাবু করে রেখেছে পেকামকে, খুব ইচ্ছে হয় কারো সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলে, হুকুম তামিল করায়। যুদ্ধাবস্থায় নিজের উপর আস্থা অবিচল রাখার জন্য অন্যকে আদেশ দেয়া এবং তা ঠিক ঠিকভাবে পালিত হতে দেখার গুরুত্ব প্রত্যেক যোদ্ধাই বোঝে। পেকামের স্নায়ুগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে। বড় বিঘাই ছেড়ে আসার সময় আকাশের যে সৌন্দর্য ওকে মোহিত করেছিল ওটাকেই এখন কুৎসিত নগ্নতা মনে হয়। তারাগুলো আর অদ্ভুত দ্যুতি ছড়ানো নয়, ডাকিনীদের কুটিল চোখের মত কদাকার, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ অসীম শূন্যতার মাঝে ভেসে বেড়ানো শয়তানের দূত। সমুদ্রের উপর লুটিয়ে থাকা আকাশ, তাপমাত্রা ততটা কমও নয় এখন, অন্তত বরফে জমে যাওয়ার মত ঠাণ্ডা নয়। সমুদ্রের সঙ্গে অবিরাম লড়তে গিয়ে শরীর থেকে ঘাম ঝরার কথা, তা হয় না, ছোট্ট হুইলডেকটাকে কারাগারের কুঠুরির মত মনে হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর ও নৃশংস মনে হয় জানালার নিচে ফুঁসতে থাকা শীতল জলের বিপুল তাণ্ডব, ক্রুদ্ধ ড্রাগনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা আগুন নয় ওগুলো, উত্তরের মেরুদেশের অতিকায় কোনো দানবের নিঃশ্বাস থেকে বেরোনো বরফকুঁচি। এখানে চিরদিনের মত হারিয়ে যেতে পারে এই ছোট্ট কালো বাক্সটা, যা হয়তো জানবেও না কেউ কোনোদিন।

বিরূপ এই সমুদ্রের তীর থেকে আরো দূরে সরে আসছে, না এগিয়ে যাচ্ছে ওদিকে বুঝতে না পেরে যখন নিয়তির হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে পেকাম, প্রায় তখনই টের পায় নতুন আরেক শত্র“র আবির্ভাব। অনেক দূরে, ডানে এবং বামে, সামনে তো বটেই, এবং নিঃসন্দেহে পেছনেও, চাঁদের সাদা আলোর বিচ্ছুরণ দেখা যায় এক অসীম গোলাকার আবর্তে। তার মানে বঙ্গোপসাগরের রহস্য-কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের এ অংশে, ঈশ্বরই জানেন কতটুকু এর বিস্তৃতি। কাছাকাছি ছোটোখাটো কোনো দ্বীপ যদি থেকে থাকে, তাহলে ঈশ্বর সহায়, অথবা কোনো উপকূলভাগের কাছাকাছি যদি এমন কুয়াশার ফাঁদ সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আগামী দিনের সূর্য ওঠার অনেক পরও থেকে যাবে এর রহস্য, অবশ্য আগামী দিন পর্যন্ত যদি টিকে থাকে ছোট্ট এই নৌকোটা।

সমুদ্রের এই অদ্ভুত আচরণে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে পেকাম, কখনো বরফ শীতল স্পর্শ অনুভব করে বাতাসে, আবার কখনো কোথায় উড়ে যায় সে-সব। বরফঠাণ্ডা জলের কোটি কোটি কণা বাতাসে ভেসে রয়েছে, এগুলোর ঘনত্ব এত বেশি, আর এতটাই বিস্তৃত, যে মাত্র কুড়ি পঁচিশ মিনিটে কয়েকশ’ বর্গমাইলের একটা লোকালয় গ্রাস করে ফেলতে পারে। পুবে ও পশ্চিমে কতদূর ছড়িয়ে রয়েছে এটা, কে জানে, সম্ভবত পুবের সন্দ্বীপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের দুবলার চর পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। ঢেউগুলোর মধ্যে কিছুটা শৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, প্রায় একই সমান উচ্চতায় এগিয়ে আসছে এগুলো, কম্পাশের কাঁটাও আর প্রতি মুহূর্তে দিক পাল্টাচ্ছে না। দক্ষিণ দিকে ঘুরে স্থির রয়েছে ট্রলারটা, অথবা এগিয়ে চলেছে, যদি এর গতি ঢেউয়ের পেছনে ঠেলে দেয়ার গতি থেকে বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু এখন দক্ষিণমুখি হয়ে থাকা খুব বিপদজনক, এর অর্থ দাঁড়ায়, নৌকোটা সমুদ্রের গভীরতর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, পেছনে সরে যাচ্ছে উপকূল। অন্য কোনো দিকে এটা চালানো প্রশ্নাতীত, এবং অসম্ভবও। নিজের অবস্থান সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়া, সঙ্গী-সাথিদের সহায়তা ছাড়া, যে-কোনো অপরিচিত ও বিপদসংকুল পরিবেশে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রতি মুহূর্তে। বড় বিঘাই দ্বীপে ফিরে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারে না এখন। উপকূলের কাছাকাছি কোনো দ্বীপে পৌঁছানোর মত জ্বালানি ট্রলারটাতে রয়েছে কিনা সন্দেহ। অবশ্য, যদি ফিরে যাওয়ার সুযোগ আসে এ জীবনে, তাহলেই কেবল এসব ভাবনা দেখা দিতে পারে। শুধু এক রহস্যঘেরা ঈশ্বরের ইচ্ছা, আর পেকামের মস্তিষ্কের অলৌকিক কৃতকার্যতা ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই হাতিয়া দ্বীপের মাটি স্পর্শ করতে সক্ষম হওয়ার। সব চেয়ে বেশি সম্ভাবনা, গভীর সমুদ্রে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া!

ছোট্ট এই নাবিক জীবনে বেঁচে থাকা এবং উদ্ধার পাওয়ার অনেক গল্প সে শুনেছে সারেঙ চাচা ও অন্যান্য প্রবীণ নাবিকদের কাছে। একবার এক জেলে তেরো দিন সমুদ্রে ভেসে ছিল তীর থেকে ভেসে আসা নারকেলের উপর নির্ভর করে। দাঁত দিয়ে ছিলে দুটো নারকেলের ছোবড়া বের করে জোড়া দিয়ে পুরো শরীরটাকে ভাসিয়ে রেখেছিল জলের উপর। আর নারকেলের পানি ও শাঁস খেয়ে ধরে রেখেছিল জীবনটাকে যে ক’দিন পেরেছিল। পরে যখন অচেতন অবস্থায় ওকে উদ্ধার করে অন্য একটা জেলে নৌকো, তখন সবাই ভেবেছিল মরা মানুষ। শরীরের বিভিন্ন অংশে পঁচন ধরেছিল, আর ফুলে উঠেছিল এমনভাবে যে সবাই ভেবেছে বেশ অনেক দিন আগে মরে গেছে মানুষটা। ট্রলারের এক কোণে ফেলে রেখেছিল প্রায় পুরোদিন। রোদে শুকিয়ে এবং স্বাভাবিক বাতাসে কিছুটা সুস্থ হয়ে নড়ে চড়ে উঠলে মানুষগুলোর হুঁশ হয়, সেবা শুশ্রুষা করে সারিয়ে তোলে ওকে।

ঢেউ কিছুটা শান্ত হওয়ায় জ্বালানি খরচ সামান্য বাড়িয়ে হলেও ট্রলারের গতি বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পেকাম। আরেকটু গভীরে ঢেউয়ের উচ্চতা হয়তো কম হতে পারে, জ্বালানির কিছুটা সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তখন। সারেঙ চাচার নির্দেশ মনে পড়ে, ‘যখন এলোমেলো ঢেউয়ের পাল্লায় পড়ে যাই তখন কি ইঞ্জিনকে পূর্ণ শক্তিতে ব্যবহার করি না আমরা, যেন হুইলটাকে বশে রাখা যায় ঠিকভাবে। পাখাগুলো যত বেশি পানি কাটবে, ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার তত বেশি শক্তি পাবে জাহাজ। মনে রাখতে হবে, সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে এক মুহূর্তও টিকতে পারবে না তুমি, তোমার যুদ্ধ হচ্ছে ঢেউয়ের বিরুদ্ধে, বিপদকালে ঢেউগুলোকে যদি বাগে রাখতে পার, ভাববে, তোমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’

‘অবশ্যই সারেঙ চাচা, কিন্তু যখন ঢেউগুলো আপনার জাহাজ থেকে কয়েক গুণ উঁচু হয়ে আসে, আর আপনি প্রায়ই দুটো ঢেউয়ের মাঝখানে পড়ে যান তখন ওগুলোকে বাগে রাখার কথাটা কি মনে থাকে আপনার, না শুধু আল্লার ওপর ভরসা করেন?’
‘আমাদের প্রথম কাজ জাহাজটাকে ঢেউয়ের দিকে ঘুরিয়ে রাখা, তা যত বড় ঢেউই হোক, আর স্থলভাগ থেকে যত দূরে থাকা যায়, বিপদের ঝুঁকি তত কম।’
‘তাই তো যাচ্ছি সারেঙ চাচা, কিন্তু আর কত দূর?’

পদ্ধতিগত সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে পেকাম, কিন্তু যে নাবিক কুয়াশা-ছাওয়া প্রচণ্ড শীতের রাতে বঙ্গোপসাগরের কুজ্ঝটিকার ভেতর জীবনের একশ’, নিরানব্বুই, আটানব্বুই... গুণে চলেছে, যার হয়তো আর একটা ঘণ্টা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা একশ’য় এক, তার করণীয় কি?’
কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে সারেঙ চাচা, ‘ওটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে বাপ, কারণ সমুদ্রের দুটো বিপদ কখনোই এক রকম না, দুটো ঝড় কখনো এক চরিত্রের হয় না, যেমন দুটো মানুষ হয় না এক রকম, বিয়ে করে দেখো দেখি দুটো!’

যদি ডুবে না যায়, তাহলে এই সব ছোট জলযানের নাবিকেরা শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে যা করে, তা হল কোনোভাবে উদ্ধারকারী জাহাজের জন্য সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কিন্তু পেকামের সংকেত ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে রয়েছে, হালের উপরে বাধা লালবাতিটা যদি কারো চোখে পড়ে, এবং সে বুঝতে পারে যে ওরা বিপদে পড়েছে তাহলেই একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু উপকূল ছাড়িয়ে সম্ভবত এত দূরে সরে এসেছে যে ট্রলারটা কারো চোখে পড়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। আর এই ঝড়ের সমুদ্রে কাছাকাছি কোনো ট্রলার থাকার বিষয়টাও প্রায় অসম্ভব। পেকামের বোধ হয় এখন একটা কাজই বাকি, তা হল, বিপদসংকেত বাজিয়ে সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে চরম বিপদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি রাখা। অনেক আগেই এ কাজটা করা উচিত ছিল, কিন্তু কোনো অলৌকিক নির্দেশ, অথবা আশায় এতটা সাহসী হয়ে ওঠে যে, ওর ধারণা, যা-ই ঘটুক না কেন, নৌকোটা ডুববে না!

ঘড়ির দিকে চোখ ফেরানোর সুযোগ হয় পেকামের, তিন ঘণ্টার উপরে ভেসে রয়েছে। অবাক হতে হয়, এত দীর্ঘ সময় কীভাবে পেরিয়ে এসেছে ভাবতে পারে না। জ্বালানি নিয়ে ভাবনায় পড়ে, এভাবে আরো ঘণ্টা দুয়েক যদি চালাতে হয়, তাহলেই সব শেষ।

প্রার্থনা করার একটা সুযোগও আসে পেকামের। সত্যিই, অনেকদিন প্রার্থনা করা হয় নি। সারেঙ চাচার ধমক এড়াতে নামাজে দাঁড়িয়েছে অনেকদিন, কিন্তু আল্লাকে ডাকে নি, ওসব প্রার্থনা শুধুই লোক-দেখানো বলা চলে।

‘মাপ করে দিও আল্লা, এই লোনা পানির হাত থেকে বাঁচাও আল্লা।’
নাহ্, এভাবে প্রার্থনা করতে দেয়া যায় না তোমাকে!
‘হে গাফুরুর রাহিম, আমার সকল গুনাহ-খাতা মাফ করে দাও, তোমার দরবারে হাত তুলেছি আল্লা, তোমার গুনাহগার বান্দা...’



সমুদ্রের সীমাহীন নির্মমতা, এর হৃদয়হীনতা আর বিপুল ভয়াবহতা ততক্ষণে বশীভূত করে ফেলেছে পেকামকে, এ সম্পর্কে পূর্ব-ধারণা রয়েছে যদিও, এ মুহূর্তে এগুলোকে বিবেকবর্জিত এক নিষ্ঠুরতা মনে হয়। জীবন যেন ঠুনকো এক মাটির পাত্র, সারেঙ চাচার বিখ্যাত ঐ কথাটা মনে পড়ে, ‘‘জীবন একটা জগাখিচুড়ির পাত্র, যার ভেতর রয়েছে অনেক উপাদান, যতক্ষণ এতে আঁচ রয়েছে, টগবগ করে ফোটে, নড়ে চড়ে। আগুনের আঁচ নেই, জীবনও নেই। তোমার কাজ হচ্ছে ঐ আগুনটাকে নিভতে না দেয়া।’’

জীবন যদি হয় এক জগাখিচুড়ি, তাহলে মৃত্যু কি? পেকাম বুঝতে পারে না সারেঙ চাচার মত একজন সাদাসিধে নিয়ম-নিষ্ঠ মানুষ কেন জীবন সম্পর্কে এরূপ নঙর্থক উক্তি করেছিলেন! এটা কি তাঁর নিজের কথা? সব সময় যে নিজের কথা বলে না মানুষ, তা পেকাম জানে। অনেক সময় না বুঝে, অথবা এমনিতেই অন্যের কথা নিজের মত করে উচ্চারণ করে। মৃত্যু তাহলে একটা অর্থহীন জড়তা? এই সমুদ্রের ভেতর কোথায় লুকিয়ে রয়েছে মৃত্যু? নাকি সর্বত্রই মৃত্যু ছড়ানো! ভয়ংকর এই দুর্যোগ মনে হয় অপ্রতিরোধ্য। মৃত্যু যদি এখন খুব কাছে এসে যায়, আর অনিবার্য হয়ে ওঠে, তাহলে এ মুহূর্তেই উল্টে যাক নৌকোটা। ব্যপারটা যখন ঘটবেই তখন আর দেরি কেন? হুইলডেকের উপর তীব্র ঝাঁকুনি খেতে খেতে মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ অনুভব করে সে। কেন এত সব কাণ্ডকারখানা? মৃত্যুতেই তো মানুষের সকল উন্মাদনার অবসান। আত্মার এ রকম অর্থহীন বিনাশের মধ্যে মাহাত্ম কোথায়? আগুনটাকে নিভতে না দেয়া? জলের ঝাপটায় আগুন তো নিভবেই। মৃত্যুর মুহূর্ত এগিয়ে এলে জীবনকে কি খুব কুৎসিত আর মূল্যহীন মনে হয়? এখন, এই উত্তাল সমুদ্রে বাতাসের দাপাদাপির ভেতর জলের মধ্যে ডুবে গেলেই সব শেষ। পৃথিবীর কোথাও আর কোনো পরিবর্তন হবে না। একই সূর্য আগামীকাল পূর্ব দিকে উঠবে। পৃথিবীর নিয়মের এতটুকু হের ফের হবে না। শুধু পেকামের অস্তিত্বে থাকবে না পৃথিবী বলে কোনো কিছু। অথবা পৃথিবীতে থাকবে না পেকাম নামে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব। হুইলডেকের ঝাঁপসা কাচের ভেতর দিয়ে সমুদ্রের বিপুলতার দিকে ভয়-জড়ানো এক অজানা কৌতুকের চোখে তাকিয়ে থাকে পেকাম।

এখন মনে হয় জীবন বোবা প্রাণীর মত কিছু একটা, নাকে দড়ি দিয়ে যে দিকে টেনে নেয়া যায় ঐ দিকেই যায়। এই নির্মমতার ভেতর একে, আত্মবিবর্জিত নোংরা রক্তমাংসের এক পিণ্ড মনে হয়, যা পেকামের ইচ্ছাধীনও নয় এমনকি! হুইলের কাঠিগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কল্পনা করে সমুদ্রের নিরানন্দ ফেনিল ঢেউগুলোর আড়ালেও তো থাকতে পারে ওর গন্তব্যের ঐ উপকূল। দৃষ্টিকে ঢেকে রাখা ভারি কুয়াশার নিচু দেয়ালে চোখ আটকে থাকে কিছু সময়, থেকে থেকে হালকা বৃষ্টির ছাঁট আসে, তখন কুয়াশাও কিছুটা দূরে সরে যায়। সমুদ্রের কালো জলের বিপুলতা আর বাতাসের তাণ্ডবের ভেতর এই নিঃসঙ্গ ছোট্ট নৌকোটার খোলের ভেতর কয়েকজন সাংঘাতিক লোকজন নিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলেছে, অথবা যে-কোনো দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের বিপুল বিস্তৃতির মধ্যখানে।

জীবন ও মৃত্যুর দোলাচলে পড়ে, ক্ষণিকের জন্য জীবনে দেখা দেয়া প্রেমের স্মৃতি মনে পড়ে, যদি ওটাই প্রেম হয়ে থাকে। কোনো এক দুর্বল সময়ে শরফুর খুব কাছাকাছি হয়ে পড়েছিল, সংশয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠেছিল মন, প্রেমকে যে ভয় পেয়েছিল সে, তা নয়, অথবা ঐ জোয়ারে সাড়া দিতে সে অনিচ্ছুক ছিল, তা-ও না। বরং জীবন সম্পর্কে যতটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর, নরনারীর এদিকটাকে সব সময়ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পর্কের মর্যাদা দিয়েছে সে। মানবিক বিষয়ের সকল সম্পর্কের শেকড় যেন ওখানেই রয়েছে। জীবনপণ সংগ্রাম করে মানুষ, সচল থাকে ঐ প্রেমের টানেই। খুব সরল একটা প্রশ্ন একদিন করেছিল শরফু, ‘আপনি ভালোবাসা বোঝেন?’ জবাব দিতে পারে নি সে।

শরফুর এ প্রশ্নের জবাব সত্যিই ওর জানা নেই। ওকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কি বোঝে শরফু কে জানে? আরেকটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে একটা ধাঁধার জবাব দেন তো, এক সেকেন্ডের মধ্যে দিবেন। আমার বলার সঙ্গে সঙ্গে দিবেন। কন তো, চামেলিরা তিন বোন, একজন সোনালি, আর একজন রূপালি, অন্যজন কে?’ সত্যি সত্যি ধাঁধায় পড়ে যায় পেকাম। কিছু সময় চুপচাপ কাটিয়ে বলে ‘আমি সত্যি কোনো ধাঁধার জবাব জানি না শরফু। কোনো হেঁয়ালিও বুঝি না। পানির মত সোজা না হলে কোনো কিছু বোঝার সাধ্য আমার নাই, শরফু!’

জীবনের তীব্রতম আনন্দের অনুভূতি বোধ হয় ঐ প্রেমই এনে দিতে পারে। ওর প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্যই পেকাম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সারেঙ চাচা যদি মত দেন তাহলে এবারের মৌসুম থেকে ফিরে গিয়ে ওকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। তাহলে কি বিয়ে করলেই ভালোবাসা হবে? অসংখ্য বিবাহিত মানুষ সে চারপাশে দেখছে যারা প্রেমহীন জীবন যাপন করে। এক অনিশ্চিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পড়ে সে। প্রেমে পড়ার ফলে যদি এমন কিছু ঘটে, যার জন্য মৃত্যুর মুখোমুখি হতেও দ্বিধায় পড়ে না মানুষ, তাহলে কারো প্রেমাস্পদ হওয়ার চেয়ে নিজে প্রেমে পড়াই বরং যুক্তিযুক্ত। প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে কিংবা প্রেমাস্পদের জন্য মনোহরণের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে, একসময় ইউরোপের মানুষেরা ডুয়েল লড়ত। হয় বেঁচে থাক প্রেমপূর্ণ জীবনে, না হয় বিদেয় হও। অন্য একটা জীবনকে ভালোবেসে নিজের জীবনকে এমন তুচ্ছ করতে পারা প্রেমের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু পেকামের জীবনের এই প্রহেলিকাময় মুহূর্তে, ওর প্রেমকে স্বীকৃতি দিতে, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা তীব্র হয়ে ওঠে। যদিও মৃত্যুর হাতছানি প্রতি পলকেই অনুভব করতে পারে সে।

প্রেমের জন্য বেঁচে থাকা! জীবনের সপক্ষে এত বড় যুক্তি কখনোই আর দাঁড় করাতে পেরেছিল কিনা, জানে না সে, মৃত্যুর মুখোমুখি আরোও অনেকবার হয়েছে, কিন্তু এই প্রথম ওর অনুভূতিতে প্রেমের এ রূপ ধরা দিয়েছে, তীক্ষè দৃষ্টিতে তরঙ্গক্ষুব্ধ ভয়াল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে অনিমেষ, আর ভাবে এই সমুদ্রই কি এখন তার ডুয়েলের প্রতিপক্ষ?

আরো একটা ঘণ্টা ঢেউয়ের সঙ্গে যুঝে যাওয়ার পর বুঝতে পারে পেকাম, আর কারো সঙ্গে দেখা হচ্ছে না ওর, ওকে উদ্ধার করতেও কেউ আসবে না। জ্বালানি নিশ্চয় শেষের কাছাকাছি এখন, হয়তো ঘণ্টাখানেক আরো টিকে থাকা যেতে পারে, এরপর ‘অলৌকিকের’ হাতে নিজেদের ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় নেই, এক ধরনের অবসাদ নেমে আসতে থাকে পেকামের হৃদয় জুড়ে।

আরো আধ ঘণ্টা পর বুঝতে পারে, এই রাত আর পোহাবে না, কিন্তু যে বিষয়টা ওকে অবাক করেছে, তা হলো, ভয়ের কোনো অনুভূতি নেই ওর ভেতর, আশ্চর্য এক নির্লিপ্তি জীবনের শেষ কাজগুলো সাঙ্গ করিয়ে নিচ্ছে ওকে দিয়ে, শুধু এক অদ্ভুত বিষাদগ্রস্থতা চেপে আছে অস্তিত্ব জুড়ে, মাঝে মাঝে দুঃখের এক ঝাঁক তরঙ্গ ভাসিয়ে নেয় ওকে, যে কাজগুলো এখনও করে নি, ওগুলোর জন্য। ঐ সব স্থানের জন্য যেখানে যাওয়ার স্বপ্ন সে দেখেছে রাতের পর রাত, সেখানে যেতে পারবে না বলে। ঐ সব মানুষদের জন্য, যাদের আর শুভেচ্ছা জানানো হবে না কোনো দিনও।

এটা অত্যন্ত বাজে ও নির্মম, এই তেইশ বছর বয়সে মরে যাওয়া, যখন আসলে বেঁচে থাকাই হয় নি। বলা যায়, মরে যেতে হবে বলে খুব যে একটা দুঃখ হচ্ছে, তা-ও না, কিন্তু বেঁচে থেকে যে এ পর্যন্ত কিছুই করা হয় নি। সামান্য এই জীবনটা যাপনের জন্য কঠিন পরিশ্রম করে প্রস্তুত হয়েছে সে, সত্যিই সে কঠিন পরিশ্রম করেছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে, দুঃখ সয়েছে। ওদের ছোট রেখে বাবা মারা যায়, পিঠে-পিঠি পাঁচটা ভাইবোনকে নিয়ে মায়ের সেকি কষ্ট! সারেঙ চাচা বুক দিয়ে আগলে না রাখলে কি যে হত ওদের, আল্লাই জানে!


অনেক আগে, সামনে যেটাকে কালো পাহাড় মনে হয়েছিল, তা আর নেই। ওখান থেকে কুয়াশাও সরে গেছে এখন, বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় দৃষ্টি। সামনে, কিছুটা বাঁদিকে একটা কালো ছায়া এক মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যায়। দৃষ্টি বিভ্রমও হতে পারে, কিন্তু না, ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে বেশ ক’বার দেখা দেয় ওটা। কুয়াশার ঘনত্ব আর চাঁদের আলো এলোমেলো প্রতিফলিত হওয়ায় বস্তুটাকে ঠিক বোঝা যায় না। কিছুটা বাঁদিকে রয়ে গেলেও, চোখের সামনে থাকায় ঐ কালো বস্তুটাকে লক্ষ্যের ভেতর রাখে পেকাম। কিছুক্ষণের মধ্যে কাছাকাছি পৌঁছে যায় ওটা। ভূত দেখেও সম্ভবত এত চমকে ওঠে না মানুষ! সমুদ্রের বিচিত্র রহস্য ও অনেক রকম ঝড়ের গল্প শুনেছে, সে জানে ঝড়ের সময় দুটো জাহাজ কাছাকাছি থাকে না কখনো। কামানের দুটো গোলা যেমন একই গর্তে পড়ে না, দুটো জাহাজডুবিও একসঙ্গে একই জায়গায় হয় না। ঝড়ের তাণ্ডব জাহাজগুলোকে খড়-কুটোর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় বিশাল সমুদ্রের বুকে। কিন্তু এত কাছাকাছি আরেকটা ট্রলারের অস্তিত্ব বিস্ময়ের চুড়ান্তে নিয়ে যায় ওকে! সত্যিই কি আরেকটা ট্রলার এটা! ঢেউয়ে দুলে দুলে আরো কাছাকাছি হয় ওরা, কিছু সময় পর মাত্র একটা ঢেউয়ের ব্যবধানে ভাসতে থাকে। কুয়াশা এখন কিছুটা হালকা থাকায় মনে হয় প্রায় পাশাপাশি চলেছে ওরা। এক ঝলকের জন্য ডেকের হুইলে থাকা সারেঙের মুখের গড়ন ফুটে ওঠে, মনে হয় সে যেন হাত নেড়েছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার একই ঘটনা ঘটে, নিশ্চিত হয় পেকাম যে ওর উদ্দেশ্যেই হাত নেড়েছে ঐ জাহাজের সারেঙ। পরের বার সুযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে সে-ও হাত নেড়ে জবাব দেয়। নতুন আরেকটা রহস্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মনে হয়। সে ভাবে, ওদের মত বিপদে পড়া আরেকটা ট্রলার নিশ্চয় নয় ওটা, অথবা, সমুদ্রের অশরীরী কোনো কিছু হবে, সারেঙের রূপ ধরে আরো গভীর রহস্যের ভেতর ছুঁড়ে দিচ্ছে ওকে। এসব ভাবনার মাঝে ঢেউয়ের আড়ালে ওটা হারিয়ে যায় হঠাৎ। গতি বাড়িয়ে আরেকটা ঢেউ যে এগিয়ে যাবে, তার উপায় নেই। প্রয়োজনও পড়ে না, আবার দেখা যায় ওকে। হাত উঠিয়ে নামিয়ে সংকেত দেয় সে, গতি বাড়িয়ে সামান্য ডানে ঘুরে যেতে। হাত নাড়িয়ে পেকামও জবাব দেয় যে সে বুঝেছে। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর ওর হাতের ইশারা বোঝায় যে পেকামের গতি কমাতে হবে, জবাবে সে-ও জানায় যে গতি কমালে ডুবে যাবে ওরা। গতি কমানোর জন্য আবারও চাপ দিতে থাকে সে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করে পেকাম যে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়েই গতি কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে। হাত নেড়ে ‘ঠিক আছে’ জানায় সে, এবং মনে হয় খুশির ভাব ফুটে ওঠেছে ওর ভেতর। ওদের মাঝখানে এতটা দূরত্ব এখনো যে, সংকেত পাঠানোর জন্য কেবল বাতির সামনে হাত নাড়িয়ে কাজটা করা যায়। মনে মনে ভাবে পেকাম, ওটা কি কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ, না ওরই মত দুর্যোগে দিশেহারা আরেকটা সাধারণ নৌকো? নাকি সমুদ্রের অজানা কোনো রহস্য-প্রাণী নতুন আরেক ভ্রান্তির ভেতর ঠেলে দিচ্ছে ওকে? সমুদ্রের এরকম অনেক গল্প শুনেছে, যে-ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে এখন, ওর মনের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ঐ অলৌকিক নৌকোটার নির্দেশদাতার ওপর নির্ভর করছে। ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত খুব চেষ্টা করে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছিল পেকাম। নয়তো সমুদ্রের এমন উদ্ভট আচরণের পর কারো মানসিক ভারসাম্য ঠিক রাখা খুব কঠিন ব্যপার। বেশির ভাগ নৌকোডুবি হয় এ কারণে, খেই হারিয়ে ফেলে নাবিকেরা, বুঝে উঠতে পারে না কি করতে হবে, এ রকম পরিস্থিতিতে টিকে থাকা যদিও দুঃসাধ্য, কিন্তু ঐ দুঃসাধ্য কাজটা সমাধা করার জন্য প্রচণ্ড মনোবলের অধিকারী হতে হয় একজন নাবিকের।

ট্রলারের হুইল যদিও এখন পেকামের হাতে, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ঐ রহস্যঘেরা মানুষটার উপর। কিছুক্ষণ পর দেখতে পায় পেকাম ঐ নৌকোটা আবার একেবারে পাশে চলে এসেছে, রশি ছুঁড়োছুড়ি দূরত্বে। কুয়াশা ভেদ করে যতটা আলো এসে পৌঁছাতে পারে তাতে ঐ উদ্ধারকারীর চেহারার একটা পাশ বোঝা যায়, হয়তো বয়স্কই হবে বেশ। নৌকোটার অবস্থা দেখে অবাক হয় পেকাম, উদ্ধারকারী কোনো জাহাজ নয় এটা, পুরোনো ধাঁচের মাছ-ধরা ট্রলার একটা। এত পুরোনো যে ওরকম ট্রলারই আর বানায় না কেউ আজকাল, মাস্তুল লাগানো ও পাল খাটানোর ব্যবস্থাও ছিল ওতে। ট্রলারটার এই অবস্থা দেখে মনের সন্দেহ আরো গাঢ় হয়। নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে না থাকায় এ নিয়ে আর ভাবতে চায় না, একই গতিতে পাশাপাশি চলতে থাকে অনেকটা সময়। লোকটা যেন ঐ জাহাজ দুুটো একাই চালিয়ে নিচ্ছে।

রহস্যজনকভাবে পেকামের ডান দিকে থাকা মসৃণ চাঁদটাকে আরো এক ঝলক দেখে নেয়ার সুযোগ হয়, আশ্চর্য এক আলোয় সোনার থালার মত চকচক করছে ওটা, এত সুন্দর যেন প্রিয় কোনো নারীর মুখ, আজীবন তাকিয়ে থাকার লোভ জাগে মনের গভীরে। কিন্তু সে সুযোগ এখন নেই। ওর বাঁদিকে থাকা ট্রলারটাকে চাঁদের আলোয় নিজের ট্রলারের ছায়া ভাবতে ইচ্ছে হয়, মুখোশের মত ওটা সমুদ্র থেকে আড়াল করে রেখেছে ওদের। ঐ ভুতুরে জলযানের ঢেউ ছলকে দেয়ার ভয়াবহ দৃশ্যে শিউরে ওঠে পেকাম, তার মানে সে-ও ওভাবে ঢেউয়ের ওপর আছড়ে চলেছে! নাহ্, এসব বিভৎসতায় চোখ রাখতে চায় না সে, সমুদ্রে এটাই স্বাভাবিক। একটা বিষয় বুঝতে পারে পেকাম যে, ওর গতিতে ঐ পুরানো ট্রলারটা চালাতে হিমসিম খাচ্ছে বুড়ো মানুষটা, কিন্তু পেকামের ট্রলারের গতি কমানোর নির্দেশও দিতে পারছে না। ফলে কোনো কোনো সময় সামান্য পিছিয়ে পড়ে সে, পেকামও তখন চেষ্টা করে কিছুটা গতি কমিয়ে আনতে। এরকম করতে গিয়ে আরেকটা ঢেউয়ের আঘাতে প্রায় উলটে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল, ফলে ওরকম ঝুঁকি আর নিতে যায় নি, যা করার ঐ বুড়োই করুক। কেনো যেন অলৌকিক ঐ মানুষটাকে ওর বুড়োই মনে হয়েছে, ওর ভাঙাচোরা মুখের আদল ওরকম একটা ধারণাই দেয়, নিজেকে সান্তনা দেয় পেকাম, অন্তত একটা দিকে এগিয়ে আছে সে, ঐ লোকটার ট্রলারের তুলনায় পেকামেরটা একেবারেই নতুন, এবং সন্দেহাতীতভাবে মজবুত। ভয়ের একটা কারণও রয়েছে অবশ্য, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার জন্য জ্বালানি থাকলে হয় পেকামের!

আকাশে চাঁদের অবস্থান থেকে বুঝতে পারে পেকাম যে কূলের দিক থেকে এখনও দূরে সরে যাচ্ছে ওরা। ঢেউয়ের বিক্ষিপ্ততা কিছুটা কমে এলে, একটু বেশি সময় নিয়ে পাশের ট্রলারের লোকটাকে দেখার চেষ্টা করে। চাঁদের আলোয় সরাসরি ওর জাহাজের হুইলডেকে দৃষ্টি পড়ায়, দেখতে পায় বারবার হাত সামনে এগিয়ে নিয়ে তারপর বামে ঘুরিয়ে দেয় লোকটা। অর্থাৎ কিছুটা সামনে যেয়ে তারপর বামে যাব আমরা, হাত নাড়িয়ে পেকাম জবাব দেয়, সে বুঝেছে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বোঝানোর চেষ্টা করে যে ওর জ্বালানি ফুরিয়ে এসেছে, মাথা উপর-নিচ করে ঝাঁকিয়ে লোকটা বোঝাতে চেষ্টা করে যে সে-ও বুঝেছে। তারপর উপরের দিকে হাত তুলে দেখায়, অর্থাৎ আল্লা ভরসা, এভাবে সাংকেতিক আলাপ চলতে থাকে ওদের।

সামনে এগিয়ে গেলে আরো গাঢ় হতে থাকে কুয়াশা, ঢেউগুলোও কিছুটা নিচু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণপণে চেষ্টা করে পেকাম সঙ্গি ট্রলারটাকে যেন হারিয়ে না ফেলে। কুয়াশা এক লুকোচুরি খেলা শুরু করে ওর সঙ্গে। ঢেউগুলো অবশ্য ছোট হতে থাকে আরো। এভাবে কিছু সময় কাটানোর পর প্রায় শান্ত অবস্থার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে নৌকো দুটো। বাঁদিকে, এবং যতটা পেছনে দেখা যায়, দেখতে পায় পেকাম, এক বিশাল উপবৃত্ত জুড়ে প্রকাণ্ড ঢেউ পেছনে ছুটে যাচ্ছে, অলৌকিকভাবে ঐ ঢেউয়ের বাইরে অবস্থান করছে ওরা, সমুদ্রের এরকম অবস্থা সম্পর্কে কখনোই শোনে নি, হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সে! পাশের ট্রলারের উপর এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে, যেন ওটার সারেঙ একাই দুটো ট্রলার চালিয়ে নিয়ে এসেছে। বেশ ক’মিনিট সামনে চলার পর এমন একটা বৃত্ত গড়ে তোলে লোকটা, পেকামের মনে হয় পুরো এক চক্কর ঘুরে আবার একই পথে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু ঢেউগুলোকে এবার পেছনে না দেখে বাম পাশে দেখতে পাওয়ায় বুঝতে পারে, একেবারে নির্ভুল ঐ লোকটা!

আশ্চর্যরকম উষ্ণ এখানে সমুদ্র, কুয়াশার চিহ্নও নেই। এমন অদ্ভুত অবস্থা কল্পনাও করতে পারে না, লোকটার সঙ্গে সঙ্গে নৌকোটার গতি পেকামও কখন এত কমিয়ে এনেছে মনে করতে পারে না, মনে হয় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা, বাতাসের ধাক্কায় হয়তো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে কিছুটা, ওর হাতের অস্থির ইশারা লক্ষ করে পেকাম, সামনে তাকিয়ে বুঝতে পারে দূরের কোনো অজানা বিপদের দিকে এগিয়ে চলেছে ওরা। অনেক সামনে, ঢেউয়ের বৃত্তটা ঘুরে দিগন্ত যেখানে মিশে গেছে সেখান থেকে সামনে এবং ডানে পুরোটাই একটা সাদা দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যদিও ভয়াবহ, কিন্তু এ মুহূর্তে চমৎকার দুটো অর্দ্ধবৃত্ত সুন্দর একটা বেষ্টনী রচনা করে সামনে ছড়িয়ে রয়েছে ওদের, বাঁদিকেরটা অন্ধকার কালো ঢেউয়ের, আর ডান দিকেরটা সাদা কুয়াশার। হাতটা বারবার সামনের দিকে সোজাসুজি ছুঁড়ে দিচ্ছে লোকটা, তার মানে, সামনে যা-ই থাকুক, শুধু সোজা এগিয়ে যেতে হবে, পেকামও হাত নেড়ে সায় দেয়।

একটু পরে, সমুদ্রের বিচিত্র এক কুয়াশাগোলকের ভেতর ঢুকে পড়ে সে, সঙ্গে সঙ্গে তা-ই করে পেকামও, এবং ওর মনে হয় এক অপার্থিব শুভ্রতার ভেতর ডুবে গেছে। সুন্দর, অদ্ভুত সুন্দর! মনে হয়, সামনের ও পেছনের পুরো অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এর বিশালত্ব। জলযানটার নিচে ঢেউ কেন, এমনকি জলের অস্তিত্বও টের পাওয়া যায় না এখন, মনে হয় আশ্চর্য এক মহাশূন্যে ভেসে রয়েছে, নৌকোটার চারদিকে এই সাদা কুয়াশার জাল জড়িয়ে রয়েছে, তারাদের ঝিকিমিকি নেই, নেই কোনো আলোর নিশানা। সে ভাবে, হয়তো কূলের কাছাকাছি কোথাও এসে পড়েছে, এক দু’মাইলের ভেতরই বোধ হয় রয়েছে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা লোকালয়, জীবনের স্পন্দন, গরম খাবার, শীতল পানীয়, আর মানুষের সান্নিধ্য! কম্পাশ দেখে বোঝা যায় পুব দিকে এগিয়ে চলেছে ওরা, অথবা পুবমুখি হয়ে রয়েছে নৌকোটা, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তার কিছুই বুঝতে পারে না পেকাম।

উজ্জ্বল চাঁদনী রাতের এই কুয়াশা-ঘন নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ানোর মত, ধূসর তুলোর আবরণ ভেদ করে এগিয়ে যাওয়া যেন। হঠাৎ মনে হয় কোথাও কিছুই নেই, ধূসর সাদা কোটি কোটি শুভ্রকণা শুধু, অথবা খুব ছোট ছোট অনিঃশেষ সাদা বুদবুদ, যা একাকী কোনো মানুষকে অবশ্যই এক অসহায় বিভ্রান্তির ভেতর ঠেলে দেয়। এর কোনো আকার নেই, পরিমাপ নেই, কোনো বস্তুও নেই এর মধ্যে। অথচ মনে হয় বিশাল এক পর্বত রয়েছে সকল অস্তিত্ব জুড়ে, একমাত্র বাঁদিকে একটা ছায়া, সত্যি যদি সচল হয়ে থাকে সেটা, তাহলে এখনও সচল রয়েছে পেকাম, কিন্তু কোথায় এগিয়ে চলেছে ওরা, সে-সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, শুধু ঐ ছায়ার অনুকারক সে!

হঠাৎ লক্ষ্য করে পেকাম, ওর সঙ্গী ট্রলারটা চলছে আলো নিভিয়ে, সে-ও আলো নেভাতে গিয়ে আবার থেমে যায়, মুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সে, তারপর বুঝতে পারে যে কত নির্ভুল ঐ লোকটা! কুয়াশার ভেতর আলো অনেক সময় প্রতারণা করে। তাছাড়া, হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আলোর প্রতি ছুটে যাওয়ার প্রবণতা যে কাউকে বড় রকম বিপদে ফেলে দিতে পারে, খুব কাছে থেকেও মনে হতে পারে যে দূরে ছিটকে পড়ছে। এ কারণে কাছাকাছি আসতে গিয়ে একটা আরেকটার উপর আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। কুয়াশার ভেতর দুটো জাহাজ, যার একটা কেবল অন্যটার অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, দুটোরই ধ্বংসের কারণ হতে পারে ওটা। লোকটার বুদ্ধিমত্তায় অভিভূত হয় সে, নিজের ভেতরেও এবার শক্তি ফিরে পায়। এখন একটাই কাজ ওর, ওকে অনুসরণ করা, সঠিকভাবে। সব সময় ওকে বামে রেখে এগিয়ে যেতে পারলে, হয়তো গন্তব্যে, অথবা দুর্যোগ থেকে মুক্ত কোনো জায়গায় পৌঁছে যাবে সে। ছায়াটা যখন সামান্য এগিয়ে যায় তখন কিছুটা ডানে ঘুরে যায় সে, আর পিছিয়ে পড়লে বামে, পাশাপাশি থাকলে সোজা এগিয়ে যেতে থাকে, পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারছে ওকে ভেবে ভালো লাগে পেকামের, ওর উপর যেন আস্থা রাখতে পেরেছে সে।

হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে পেকাম, এত সময় কীভাবে পেরিয়েছে? ওর জ্বালানিই-বা কি করে এখনো ট্রলারের ইঞ্জিন চালু রেখেছে! আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি এ দুর্যোগ থেকে রক্ষা না পায় তাহলে পুরোপুরি সমুদ্রের হাতে সঁপে দিতে হবে ওদের, যদিও এখন নিজেদের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে নেই ওরা।

এক ঝলক আলোর মতো কুয়াশা ভেদ করে এক ধরনের রহস্যরাতের আলো অন্ধকার ফাঁদে যেন আটকে আছে ওরা। পাশে তাকালে প্রায় স্পষ্ট দেখতে পায় লোকটাকে, একটা আঙুল তুলে সামনে দেখায়, এবং বারবার সামনের দিকে ইংগিত দিতে থাকে, অর্থাৎ তুমি ওখানেই যাচ্ছ। সামনের আকাশে হালকা লালের ছোঁয়া, দিগন্তে ছোট্ট একটা লাল বিন্দু দেখে লাফিয়ে ওঠে পেকামের অন্তরাত্মা, অবশেষে অবসান হল এই কালরাত্রির! কৃতজ্ঞতা জানাতে পাশে তাকাতেই দেখে, তিনটা আঙুল ভাঁজ করে পুরো মুঠোটাকে উপর-নিচ করছে লোকটা, তার মানে নোঙর ফেল এবার।



হুইলডেকের দরজা খুলতেই বরফশীতল বাতাস জাপটে ধরে ওকে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে কোনোভাবে নোঙরটাকে নামিয়ে দৌড়ে ডেকের ভেতর ছুটে আসে, তখনও বাইরে প্রবল বাতাস। সঙ্গী নৌকোটাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করার জন্য পাশে তাকায় এবার, কিন্তু কোথাও দেখতে পায় না ওটাকে, ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে, কী আশ্চর্য! শেষবারের মত ওকে হাত নেড়েছিল কি সে? তাই তো মনে হয়, নোঙর ফেলার সময় এক পলকের জন্য তাই মনে হয়েছে, এটা কি সম্ভব? সামনের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে পেকাম। হুইলডেকের জানালা একটু ফাঁক করে দেয়ায় বাতাসের সাঁ-সাঁ শব্দ ছাপিয়ে ট্রলারের নিচে বয়ে যাওয়া পানির মৃদু কলকল কানে আসে, সামনের জানালার কাচে বাতাস যেন কাঁপছে। কাঁপতে থাকে পেকামের দৃষ্টিও, সত্যিই কি এই নির্মম ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে ওরা? বাতাসের ধাক্কায় নৌকোটা ঘুরে যাওয়ায় সূর্যটা সামনে থেকে বাম দিকে সরে এসেছে। বাংলাদেশের পতাকার সামনে একটা ভূভাগের দৃশ্যও যেন ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে। একবার মনে হয় এসব কিছুই দেখছে না পেকাম, সবই সমুদ্রের হেঁয়ালি, অতঃপর কোনো কিছুর অস্তিত্ব ওর সকল অনুভূতিকে সজীব করে তোলে, প্রায় কালো-সবুজ উপকূলে কয়েকটা গভীর কালো বিন্দু যেন নড়াচড়া করছে। তটরেখা আর সমুদ্রের ধূসর জলের মধ্যে ধীরে ধীরে পার্থক্য সৃষ্টি করে ওরা, কিছু সময় পেরোলে বোঝা যায়, একঝাঁক সাম্পান ওগুলো, আধ ঘণ্টার মধ্যে পেকামদের ট্রলারের গায়ে লেগে যায় ওরা।

বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট একটা দ্বীপে দীর্ঘদিন থেকে বসবাস করে আসছে ঐ লোকগুলো, সমুদ্রের ছোট বড় সব ঝড়ের পরই সাম্পান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওরা জাহাজডুবি মানুষদের উদ্ধারের জন্য। বেতনভূক কোনো বাহিনী নয়, বংশপরম্পরা এ কাজই করে চলেছে। শান্ত সমুদ্রে মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করে ওরা, আর ঝড়ের পরে খোঁজ করতে থাকে কোনো জেলে বা নাবিক বিপদে পড়েছে কিনা।

সামনে, কিছুটা ডানদিকে গেলে একটা খাল পাওয়া যাবে লোকালয়টাতে ঢোকার জন্য, কিন্তু ট্রলারে এক ফোঁটা জ্বালানি নেই যে চালিয়ে নিবে। ওদের সাম্পানে করে হানিফকে পাঠায় তেল কিনে নিয়ে আসতে। তারপর ওদের সাহায্য নিয়ে ঐ খাঁড়িতে পৌঁছে বুঝতে চেষ্টা করে, কি ঘটেছে এতক্ষণ!

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসায় আশা করেছিল পেকাম যে সবাই এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে, কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দেবে। কিন্তু সারেঙ চাচা উঠে এসেই অভিযোগ শুরু করেন, ‘কিরে পেকাম, আমি একটু ঘুমাইলাম, আর তুইও পথ হারাইলি! কই ভিড়াইলি নাওডারে?’ পেকামের বিশ্বাস হতে চায় না সত্যি সত্যি একথাগুলোই উচ্চারণ করেছে কিনা সারেঙ চাচা! ‘চল, আইজ তা হইলে আল্লার নামে এইখানেই ঈদের জন্য নাইমা পড়ি’ বলে সবাইকে নিয়ে নেমে যেতে থাকে। সাম্পানে আসা কেউ কেউ সারেঙ চাচার পরিচিত মনে হয়। হতাশা ও ক্লান্তিতে কান্না পায় পেকামের। ট্রলারের খোলের ভেতর নেমে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় ঘুমের দেশে।

ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় ওকে নেয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে এক লোক। তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে ওর সঙ্গে নেমে পড়ে, ট্রলারের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে মাটিতে পা রেখে মনে হয় দ্বিতীয়বার ভূমিষ্ট হলো সে, প্রথমবার মায়ের পেট থেকে, আর দ্বিতীয়বার জীবন নিয়ে, এই কাঠের কাঠামোটা থেকে। তীরের ঢাল বেয়ে অনেকটা দৌড়ে উপরে উঠে যায়, দীর্ঘ ঘুম সকল অবসাদ কাটিয়ে দিয়েছে, এখন পেট ভরে খেতে পারলে পূর্ণ শক্তি ফিরে পাবে শরীর। প্রায় দু’মাইল হেঁটে চারদিকে গাছপালা ঘেরা বড় একটা বাড়িতে পৌঁছায় ওরা। বেশ ভালো সমাদর ও যত্ন-আত্তির মধ্যে আছে সারেঙ চাচা। পেকামকে দেখে বলে

আয় পেকাম, এইটা আমার ওস্তাদের বাড়ি।
তাইলে তো আমার ওস্তাদের ওস্তাদ, তিনি কই? সালাম করি।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সারেঙ চাচার বুক চিড়ে।
তিনি তো নাইরে, অনেক আগেই উঠাইয়া নিছেন, আল্লা-মাবুদে।
একটা কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়ে পেকামের চোখে-মুখে। পাশে দাঁড়ানো এক লোক জিজ্ঞেস করে
ট্রলারটা কি তুমি চালাইয়া আনছো, ভাই?
হ, সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় পেকাম।
তোমার ভাইগ্য খুব ভালো।
ভাইগ্য ভালো!
না হইলে আর কি, আইজ কয় নম্বর সিগন্যাল জানো?
কত?
সাত নাম্বার, শুনতাছি আরো বাড়বো, খুব বড় ঝড় আইতাছে।
ঝড় আইতাছে!
অবাক হয় পেকাম, তাহলে পেরিয়ে এসেছে কি, সামনেই যদি থেকে থাকে ঐ ঝড়!
তোমার ভাইগ্য সত্যিই খুব ভালো।
হ, মাইঝ দরিয়ায় ডোবার থাইক্যা কেউ যদি ফিরা আইতে পারে তাইলে তো ভাইগ্য ভালোই।
এইখানটায় ভিড়লা কেমনে তুমি?
সেইটাই তো ভাবতাছি, একটা ট্রলার আমার পাশে থাইকা পথ দেখাইয়া নিয়া আইছে, কিন্তু পৌঁছাইয়া দিয়াই ঐটা মিলাইয়া গেল।
কি কও?
তাই তো ঘটলো, এই জায়গাটার নাম কি?
এখন তো সবে ভাঙানির চর কয়, কিন্তু এইডার নাম আছিল ভাঙা নাওয়ের চর, এই চরে আটকাইয়া অনেক নাও ভাঙনের ইতিহাস আছে, এই নাও ভাঙা থাইকা জায়গাডার নাম ভাঙা নাওয়ের চর, শেষ-মেষ এখন ভাঙানির চর।
এইডা ঠিক কোন জায়গা?
এই তো, যেইখানে আমরা আছি, এইখানেই, অন্য কোনোখানে এইডা নাই। এইডার সব থাইকা কাছের চরের নাম হইল উড়ির চর, ঐডার নাম বোধ হয় আপনেরা সবে জানেন। কিন্তু এই ভাঙানির চরটাই হইল অনেক পুরানা দ্বীপ, উড়ির চর হইল সেই দিন। ভাঙানির চরটা এক সময় অনেক বড় আছিল, ভাঙতে ভাঙতে এখন এই আছে। পুরান দ্বীপ ভাঙে, আর উড়ির চরের মত নতুন চর জাগে।

ঘড়িতে চোখ রাখে পেকাম, এখন দুপুর, বাড়ির উদ্দেশ্যে কোনো অবস্থায়ই যাত্রা শুরু করা যাবে না আজ, ওটার প্রশ্নও আসে না, ঝড়ের বিপদ সংকেত যেখানে বেড়ে চলেছে! তাহলে এই নির্বান্ধব, অজানা অচেনা লোকালয়টাতেই ঈদের দিনটা কাটাতে হবে ওদের, এই বুঝি লিখে রেখেছিলেন ভাগ্যে, বিধাতা জনাব! পর মুহূর্তেই মনে হয়, না, একটা জীবন ফিরে পাওয়া থেকে একটা ঈদ উদযাপন কখনোই বড় হতে পারে না। কয়েক ঘণ্টা আগেও লড়ছিল সে মৃত্যুর সঙ্গে, বেঁচে থাকাটাই ছিল জীবনের একমাত্র প্রার্থনা, এবং বেঁচে আছে সে। শুধু এ জন্যই আবার প্রার্থনা করে, ইয়া গাফুরুর রাহিম, দ্বীন দুনিয়ার মালিক, তোমার দরবারে হাজার শুকরিয়া...।



জীবন ও মৃত্যুর বিষয়টা বিমর্ষ করে তোলে ওকে আবার, মন থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় ঐ চিরন্তন প্রশ্নটা, কারণ, সুনির্দিষ্ট কিংবা সত্যিকার কোনো জবাব নেই এর। যে ছকের ভেতর বাস করে মানুষ, সেটার সূত্র যখন ধরে ফেলতে পারে, অনেক দেরি হয়ে যায়, কিছুই করার থাকে না তখন, ঐ ছকের ভেতরে বন্দি জীবন কাটানো ছাড়া। অধিকাংশ মানুষই খাঁচায় বন্দি কয়েদির জীবন যাপন করে, নিজের ইচ্ছে মত শুতে পারে না, বসতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না, এমনকি বুঝতেও পারে না যে মায়াবী এক বাক্সের ভেতর বন্দি ওরা। যারা বুঝতে পারে, তাদেরও কোনো গতি থাকে না আর। নিজেদের জন্য যে সংজ্ঞা নির্দ্ধারণ করে মানুষ, সে-সবেরই ইচ্ছাধীন সে, সবকিছুতেই নিজেদের মনোবাসনার প্রতিফলন। এ রকম সংজ্ঞায়িত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নতুন নতুন সত্তার নির্মাণ করতে হয়, কিন্তু পুরোনো সত্তা তো পুরোনোই, নতুন সত্তা নির্মাণ করবে নতুন দিনের মানুষেরা, পুরোনো খাঁচায় বন্দি মানুষেরা নতুন দিনের সন্ধান কখনো পায় না, এমনকি এটার স্বপ্ন বা কল্পনাও করতে পারে না।

অতীত জীবনে সঞ্চিত সামান্য অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মন এখন কোন সুদূরে উড়ে যেতে চায় নিজেও জানে না পেকাম। কলেজের লাইব্রেরি থেকে সংগ্রহ করে দর্শন ও উচ্চমানের সাহিত্যের কিছু বই গোগ্রাসে গিলেছে সে এক সময়, ওগুলোর প্রতিক্রিয়া ওর ভেতরে চিন্তা করার এক অদম্য উৎসাহ সৃষ্টি করে। খুব একা হয়ে পড়ে যখন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাবনার উৎসারণ ঘটতে থাকে ভেতর থেকে। অনেক রহস্যময় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় মাঝে মাঝে, যে-সব অভিজ্ঞতা রয়েছে ওর, স্বপ্নের ভেতর কখনো দেখা দেয় সেÑসব, কিন্তু এই মুহূর্তে, বা এ সময়ে যা ঘটছে, এমন অনেক বিষয়ের স্বপ্নও সে অতীতে দেখেছে বলে মনে করতে পারে। ঐ ঘটনাটা ঘটার পরে মনে হয়েছে, আরে, এরকম একটা স্বপ্ন তো দেখা ছিল আমার! এ বিষয়ের ব্যাখ্যা সে জানে না, সুযোগ পেলে কোনো কোনো ঘটনার গভীরতা বিশ্লেষণ করে। সেই সব দুর্মূল্য অভিজ্ঞতার, বিচিত্র ঘটনাবলীর পেছনের যুক্তিগুলো চেতনায় হয়তো ধরা থাকে, অস্পষ্ট হয়ে যায় ঘটনাগুলো, এক ধরনের হেঁয়ালি সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে কোনো স্মৃতির চকিত উদ্ভাসনে সেগুলো ঝলকে উঠলে ঘটনার ছকটা স্পষ্ট হয়, এবং ওটার সংজ্ঞা দেয়া ছকের বাইরে কিনা ভাবতে চেষ্টা করে। ছকের বাইরের এই ঘটনাগুলোই ওর বিস্ময়, রহস্যটা জমে ওঠে সেখানেই। প্রকৃতির সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের ভেতর, নিয়মগুলো স্বপ্নের মত অবাস্তবতায় পর্যবসিত হয়, আবার প্রকৃত স্বপ্নগুলো বাস্তবতায় পরিণত হয়। প্রকৃতির এই কঠিন ধাঁধা ওর মাথা গুলিয়ে দেয়। ফলে শরফু যখন একটা সামান্য ধাঁধার জবাব চায় ওর কাছে, অথবা অতি নগণ্য এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ‘ভালোবাসা বোঝেন?’ তখন খেই হারিয়ে ফেলে।

ঝড়ের এই তাণ্ডবের ভেতর একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকে বাস্তব না অবাস্তব বলবে এখন? যদিও একে অবাস্তব বলার পেছনেই সব রকম যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এটা তো বাস্তব! নাকি এটা কোনো উদ্ভট স্বপ্ন? নিজে হয়তো অবাক হচ্ছে না পেকাম, কারণ বাস্তব তো কোনো একটা ঘটনার সংঘটন নয়, তা হচ্ছে ঘটনাটার অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনাসমূহের মধ্যে সেতু রচনার বর্তমান উপাদান। যার ব্যাখ্যা টলষ্টয় তাঁর ‘ওয়ার এণ্ড পীস’ উপন্যাসে দিয়েছিলেন ‘এখন যা ঘটছে, তা একটা ঘটনাশৃঙ্খলের ছোট্ট একটা খণ্ড মাত্র। এর সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগে, এবং এর ফলে, এর পরেও আরো অনেক ঘটনা ঘটবে। প্রতিটা ঘটনা অতীত ঘটনাসমূহের ফলাফল, এবং ভবিষ্যত ঘটনাসমূহের কারণ। তাই কোনো একটা ঘটনা যখন ঘটে তখন তা পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের হাতে খুব কমই থাকে।’ টলস্টয়ের এ বক্তব্যের মূলে রয়েছে মহামুনি গৌতমের দর্শন।

পেকামও তা বিশ্বাস করে, যত বই সে পড়েছে জীবনের সামান্য এই পরিসরে, তার মধ্যে ঐ ওয়ার এণ্ড পীসকে খুব মূল্যবান মনে করে। বইটা থেকে অনেক কিছু শিখেছে সে, জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শিখিয়েছে এটা, ওর সামান্য জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে এই একটা উপন্যাস।

এমনিতে, বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী মানুষেরা এক অদ্ভুত জীবন যাপন করে, কোনো একটা পরিবার এখানে পাওয়া যাবে না, যারা নিজেদের মধ্যে স্বজন-হারানোর বেদনা বয়ে না চলেছে। প্রতি দশ বছরে একটা প্রাণসংহারী ঝড় হবেই, যা কোনো না কোনো নিকট প্রিয়জনকে ছিনিয়ে নেবে ওদের কাছ থেকে, আর ঐ বেদনার ভার বইতে না বইতে দেখা দেবে নতুন আর এক আহাজারি, ফলে জীবনের প্রতি এক ধরনের উন্নাসিকতা জন্ম নেয় ওদের ভেতর, একারণে সমুদ্রের বুকে যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সমুদ্রকে যে খুব ভয় পায় ওরা, তা-ও না, এক ধরনের রহস্য যেন এই সমুদ্র, যেমন ওদের ‘জীবন’!

এই সব মানুষের সংস্পর্শে এলে বোঝা যায়, এরা কতটা সশিক্ষিত। সারেঙ, শুকানি প্রভৃতি নামের মানুষগুলো জীবনে অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে এসেছে, ওদের জীবনের অভিজ্ঞতাও যে কত সমৃদ্ধ, কখনো এদের সঙ্গে আলাপে বসলে বোঝা যায়, যখনই সুযোগ পায় পেকাম, এসব নাবিকদের সঙ্গে আড্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও সমুদ্র ও জলযান সম্পর্কে এদের ব্যবহারিক জ্ঞান যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাবিকের বিস্ময় হতে পারে। কিন্তু সমুদ্রতীরবর্তী নারীদের বিষয়টা অন্যরকম, সব সময় একটা অজানা ভীতির ভেতর থেকে ওদের ভেতরটাও অন্য ধাতুতে গড়ে ওঠে, একেবারে জৈবিক বিষয়গুলো ছাড়া অন্য কোনো অভিজ্ঞতা ওদের নেই বললেই চলে। সন্তান উৎপাদন, পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করা, ঝড়ের সময় আপনজন সমুদ্রে থাকলে ওদের জন্য প্রার্থনা করা, প্রভৃতি স্থূল বিষয়গুলোর মধ্যে সীমিত থাকে ওদের জীবন। ফলে শরফুর সঙ্গে যখনই ঘনিষ্ট হতে চেয়েছে পেকাম, মনের থেকে শরীর অনেক বেশি এগিয়ে এসেছে। কিন্তু পেকামের সশিক্ষিত মন চেয়েছে একজন নর্মসহচরী। জীবনসঙ্গিনী হিসেবে এমন কাউকে পেতে, যার সঙ্গে জীবনের অনেক কিছুই ভাগ করে নেয়া যায়। অনেক অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে, পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যৌথভাবে উপভোগ করা যায়। যে অভিজ্ঞতা মানুষ অর্জন করে তার প্রকাশ না ঘটাতে পারলে আত্মার তৃপ্তি হয় না, অন্তত আপন কোনো মানুষের কাছে হলেও ওটাকে উপস্থাপন করতে হয়।

খুব বেশি দিন তো নয়, বছর দশেক আগে ওর ভেতরে প্রেমভাব জাগিয়ে তুলেছিল শরফু, কলেজের পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল পেকাম। পড়াশুনার ফাঁকে, অথবা নিত্য দেখার মধ্যে হয়তো লক্ষ্যই করে নি যে শরফু এক পরিপূর্ণ নারীত্বের দিকে এগিয়ে এসেছে। ফ্রক পরা ছেড়ে শাড়ি পরায় একটা পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের মতই লেগেছিল ওকে। কলেজের পড়াশুনা ছেড়ে দেয়ায় ওর কাছে শরফুকে বিয়ে দেয়ার বিষয়ে বেঁকে বসেছিলেন সারেঙ চাচা। পেকামের মায়ের খুব ইচ্ছে শরফুকে বিয়ে করানো, সারেঙ চাচাও প্রথমে সম্মত ছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন পড়াশুনা করে অন্য পেশা বেছে নিক পেকাম, সমুদ্রের ঝুঁকিপূর্ণ জীবন থেকে সরে আসুক ওরা। কয়েক বছর সমুদ্রে কাটানোর পর সারেঙ চাচারও ধারণা হয়েছে যে, সমুদ্রের যে-কোনো বিপদ জয় করে টিকে থাকতে পারবে পেকাম। ওর সাহসিকতা আর সুযোগ মোকাবেলা করার অসাধারণ পারদর্শিতা সারেঙ চাচাকেও বিস্মিত করে, এবারের মওসুম শেষ হলেই ওদের বিয়ে হওয়ার কথা।

মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা ‘কালের সম্পর্ক’ যোগ রয়েছে। ‘গড়ে ওঠা’র সময়ে যদি ‘গড়ে না ওঠে’ তাহলে পরবর্তীতে ‘গড়ে ওঠা’ কঠিন হয়ে যায়, আর যদি সত্যিই একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাতে অনেক অদৃশ্য ও বায়বীয় যোগসূত্র তৈরি হয়। গ্রামের বাড়িতে বসে শরফু যখন একটা তেঁতুলের স্বাদ নেয়, সমুদ্রের নির্জনতার মধ্যেও তখন পেকামের দাঁত শিরশির করে। দেয়ালের গোপন খাঁজে লুকিয়ে থাকা টিকটিকি তত্ত্ব এটা, সবারই মানতে হয়। সমুদ্রকে যতটা না ভয় পায় শরফু, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পায় ঐ লুকিয়ে থাকা টিকটিকিকে। যে তেঁতুল পেকাম খায় নি কখনো, তারই টক স্বাদে যখন ওর দাঁত শিরশির করে, তখন বুঝতে হয় যে দেয়ালের গোপন খাঁজে একটা টিকটিকি অবশ্যই রয়েছে। ঠিকঠিক জানতে পারলে এটা বোঝা যায় কার্ণিশে লতিয়ে ওঠা সবুজ আঁকশি ও পাতার আড়ালে গোপনে রঙিন কিছু ফুলও ফুটেছে, তখন মন চায় আরো গভীরে যেতে। উদ্ভিদজগতের বিচিত্র নিয়ম অনুসন্ধানের প্রবৃত্তি পেকামের রয়েছে জন্মাবধি। সেই সূত্রে যখন গোপন ফুলটি ছিঁড়ে এনে শরফুকে দিতে চায়, তখন ওরা প্রবেশ করে অজানা ঐ ছিন্ন গ্রন্থিতে, আর ওটা বেয়ে নেমে যায় গাছের গভীর শেকড়ে, শেকড় থেকে মূলরোমে। ঐ সব আশ্চর্য কোমল মসৃণ ছোটো ছোটো শেকড় ছুঁয়ে ওরা অনুভব করে এগুলো এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে রয়েছে ওদের বিস্তৃত বিচরণভূমির প্রতি আনাচে কানাচে! ওদের অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি খুঁজে পায় গভীর জলের সন্ধান, দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘটায় অবনতি। অনেক দিন শেকড়ে জল না পেলে গাছ যেমন মরে যেতে থাকে, তেমনি সম্পর্কও শিথিল হতে থাকে। বেশি নিবিড়ভাবে পেতে চাইলে আরো জটিল হয়ে ওঠে বিষয়গুলো। এ মুহূর্তে পেকাম ভাবে শরফুর কাছে আর কতটুকু চাওয়া আছে ওর?

সব মানুষের জীবনেই আসে একটা সময়, যখন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তীব্র আকুলতা থাকে, ঐ আকুলতা থেকে হৃদয়ে আর্তি জন্ম নেয়। তারপরেও যদি প্রাপ্তি না ঘটে, হয় সে প্রার্থনা করে, যদি সে দুর্বল হয়, না হয় যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে, শক্তি প্রয়োগ করে, যদি সে সবল হয়। কিন্তু শরফুকে পাওয়ার জন্য কি করতে হয়েছে পেকামের? সত্যি বলতে কি, ততোটা আকুলও হতে হয় নি, এমনকি। খুব সহজেই শরফু ওর কাছাকাছি চলে এসেছে, এখনও শরফুকে পেতে পারে সে, মাঝখানে শুধুই স্থানিক দূরত্ব। কালের দূরত্ব ওদের ভেতর সাময়িক ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছে। পেকাম শরফুর ভালোবাসা চেয়েছে, সহজেই পেয়েছে। নিবিড় সান্নিধ্য চেয়েছে, তা-ও পেয়েছে। এখন সে পেতে চায় একেবারে নিজের করে। এ পর্যায়ে, স্বার্থপর মনে হয় নিজেকে, সবকিছু এভাবে নিজের মতো করে পেতে চাওয়ার মধ্যেই রয়েছে মানুষের দুর্বলতা। ধনবানেরা যেমন চায় ওদের দেখা সুন্দর সবকিছুই নিজেদের ড্রয়িংরুমে সাজাতে, ওরা বোঝেও না যে ঐ সব শৌ-পিস দেখতে কেউ ওখানে যায় না। শহরের সুন্দর সুন্দর মার্কেটগুলোর দোকানের শৌ-কেইসে হাজার হাজার সৌখিন জিনিস সাজানো রয়েছে, দেখতে চাইলে যে কেউ সেখানে যেতে পারে। মানুষ কারো বাসায় যায়, বন্ধু অথবা আপনজনের সান্নিধ্য পেতে। সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য ড্রয়িংরুম সাজানো, আর দেখানোর জন্য পণ্য স্তুপ করার পার্থক্যটুকুও ওরা বোঝে না। পেকাম কেন এখন শরফুকে নিবিড়ভাবে পেতে চাইছে? নিজেকেই জিজ্ঞেস করে সে।

সমুদ্রের ঐ ঝড়ের মধ্যে আবার পড়েছে মনে হয়, প্রকাণ্ড একটা ঢেউ এসে ওর ভাবনাজাল ছিন্ন করে, গলদঘর্ম হতে হয় ওটা সামলাতে। সুতোয় বাঁধা ঘণ্টির তিন টোকার সংকেত ইঞ্জিন-ঘরে পাঠিয়ে ট্রলারটাকে পূর্ণ অশ্বশক্তিতে চালিয়ে নিতে চাইতে পারে সে এখন, তাহলে প্রবল এক আক্রোশে সামনে ঝাঁপিয়ে পরবে যন্ত্রদানবটা। খুঁটি উপড়ে ফেলা ষাঁড়ের মত তেড়ে এগিয়েও যেতে পারে, গোঁ গোঁ করতে করতে চিরদিনের জন্য ঢুকে যেতে পারে কোনো এক সফেন ঢেউয়ের ভেতর, কিন্তু কি অর্থ হবে এসবের?

ভাবনাহীন এক শূন্যতা, অথবা এলোমেলো অনেক ভাবনার দুর্বার জটিলতার ভেতর কিছু সময় কাটিয়ে কোনো এক দিনের বাড়ি ফেরার অতীতস্মৃতি আবার চেপে বসে পেকামের অস্থির অন্তর জুড়ে।

দু’দল ছাত্রের মারামারিতে কলেজ বন্ধ করে দেয়ায় তল্পি-তল্পা গুটিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয় ওরা, হোস্টেলের ডালের ডিশে শেষবারের মতো সাঁতরে অনেকখানি সতেজ হয়ে, ও বাড়ি ফেরার আনন্দে হালকা হাওয়ায় ভেসে উপকূলগামী এক বাসে উঠে বসে।

চোখ-মুখের উপর সকালের সূর্য নিয়ে চলতে শুরু করে বাসটা, গ্রামের ভাঙ্গাচোরা রাস্তার উঁচুনিচু খাদের ভেতর লাফিয়ে লাফিয়ে সকালের প্রায়-প্রখর সূর্যের কিরণ যাত্রীদের গায়ে ছুঁড়ে দিতে থাকে টর্চের আলোর তীব্রতা নিয়ে। পথের পাশে হালকা সবুজ, সবুজ, গাঢ় সবুজ গাছপালায় ফুটে থাকা বুনোফুলের উপর বিচিত্র রঙের আলো ও ছায়া দ্রুত সরে যেতে থাকে। রূপকথার খেলনার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গ্রামের ছোটো ছোটো বাড়িঘর। খড়ের কুঁজোর ওপর দু’একটা মুরগির ধান খুঁটে খাওয়া, মাছ ধরার পলোর নিচে ছোটো ছোটো এক ঝাঁক বাচ্চা নিয়ে একটা মুরগি, থুতনিতে এক গোছা কালো দাড়ি নিয়ে অবাক চোখে চেয়ে থাকা সাদা-কালো রঙের একটা ছাগল, বাচ্চাদের ছবি আঁকার মতো সরল সব ছবি। ফসল ক্ষেতে কাজ করা মানুষগুলোর ব্যস্ত হাতে ঝলসে ওঠা কাস্তের কারুকাজ, বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো নি®প্রাণ হৃদয়েও আত্মবিশ্বাস এনে দেয় এর যে কোনো একটাই। মানুষের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডের ভেতরই রয়েছে সকল জ্ঞানের উৎস, আকাশ থেকে পাওয়া কোনো কেতাবে নয়, পেকাম বোঝে এটা, আর জানে যে জ্ঞানই হচ্ছে সব শক্তির আধার।

কড়া তামাকের একটা বিড়ি ধরায় পাশে বসা লোকটা, ধোঁয়ার তীব্র গন্ধে বমি এসে যায় প্রায়, অথচ ঐ বাতাসেই নিশ্বাস নিতে হবে ওকে। হুশ করে এক টুকরো কাগজ জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে ওর মুখে, সামলাতে গিয়ে বিড়ির আগুন ছিটকে পড়ে কাপড়ে। ‘খুব ভালো হয়েছে’, মনে মনে খুশি হয় পেকাম। ওর লাফিয়ে ওঠা আর আগুন ঝাড়ার ধকল সামলাতে হয় পেকামকেও, শব্দ করে হেসে ওঠে সে। শৈশবের আশাগুলো অক্লেশে মিটে যাওয়ার মত এত সহজে ওর বিড়ি খাওয়ার শাস্তি ঘনিয়ে আসবে ভাবতে পারে নি পেকাম। লোকটার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি তখন, শিশুর মত বিষয়টা উপভোগ করে পেকাম।

ছোট্ট একটা বাজারে এসে বাস থামে, সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে নেমে পড়ে ড্রাইভার, মনে হয় খুব পেচ্ছাব পেয়েছে ওর। দুপুরে খাওয়ার জন্য পনেরো মিনিটের যাত্রা বিরতি, খুব কায়দা করে ঘোষণা দেয় বাসের হেল্পার ছেলেটা, সে জানে, পনেরো মিনিটে নিজেরই খাওয়া হবে না ওর। স্বাভাবিক সময় যা লাগা উচিত, ধরা যাক আধ ঘণ্টা, যদি বলে দেয় সে, তাহলে এক ঘণ্টায়ও খাওয়া শেষ হবে না লোকগুলোর। গ্রামের হাট-বাজারগুলোয় একেবারে অকারণে কিছু মানুষ ঘোরাফেরা করে। না আসে কিছু কিনতে ওরা, না বেঁচতে। অবশ্য কিছু ধান্দাবাজ তো সব জায়গায়ই রয়েছে। একটু পরিচ্ছন্ন একটা খাবারের দোকানে এক বেয়ারাকে দেখে হঠাৎ আপনজন মনে হয় পেকামের, ওখানেই ঢুকে পড়ে। হোটেলের পিছনে হাত ধুতে গিয়ে দেখে দশ বারো বছরের এক কিশোরী দুর্বল হাতে খাবার থেকে মাছি তাড়াচ্ছে। আগুনের হল্কায় বাতাস অনেক হালকা, মাছিগুলোর উড়তে হয় না, মেয়েটার শীর্ণ হাতের দোলায় এদিক থেকে ওদিকে সরে যায় শুধু। একবারে যত মাছি খাবারের উপর বসা সম্ভব, বসে নেয় সুযোগ বুঝে। রান্না শেষ হলেও, কয়লার আগুনের আঁচ ধরে রাখা হয়েছে চুলোয়, হোটেলের মালিক এসে হাঁড়িগুলো গরম করে নেয় মাঝে মাঝে।

রঙচঙে শার্ট পরা এক লোক হোটেলে ঢুকেই শুরু করে হম্বি-তম্বিÑ
¬¬¬¬¬এই মেছিয়ার, এই দিকে আয়।
হাতে জড়ানো টেবিল মোছার কাপড় নিয়ে ধীরে-সুস্থে সামনে এসে দাঁড়ায় বেয়ারাটা।
এইডা কি ভাতের হুঠেল, দুই আঙুল চওড়া বেঞ্চি বসাইছোস, প্লেইট রাখবি কই?
মিটিমিটি হাসে ছেলেটা, রান্নাঘরের দিক থেকে বাবুর্চি জবাব দেয়Ñ
ছার আপনে তো ভুল কইরা এইখানে ঢুইকা পড়ছেন, আপনের জন্য ভিতরে দস্তরখান বিছাইয়া রাখছে, ঐখানে আসেন ছার, সব বেবোস্তা আছে।
হাসির হুল্লোড় ওঠে হোটেলে আসা সবার ভেতর, লোকটাও যোগ দেয় এতে।
যা, ঢুইকাই যখন পড়ছি, খাওন দে, কি কি আছে তোগো হুটেলে?
পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা,,,
থাউক, থাউক, আমার ওগলানি উঠে।
ছইর দানা দেই তা হইলে?
কি দিয়া রানছোস?
সইল মাছ।
দে, দে, তাড়াতাড়ি দে, ভুখ লাগছে।

পেছনে হাত ধুতে কলপাড়ে যায় সে, দৌড়ে গিয়ে টেবিল মোছার কাপড়টা আগে ধুয়ে নেয় ছেলেটা, ওটার পানি নিংড়ে পাশের বেড়ায় শুকোতে দেয়, তারপর লুঙ্গি তুলে উবু হয়ে মুখের ঘাম মোছে। ফাজিল লোকটা হো হো করে হেসে ওঠেÑ

আরে শালা, পয়সা ছাড়াই খেইল দেখাইলি?
দেখছেন ছার?
দেখছি মানে? হালায় কয় কি?
সত্যই দেখছেন?
কমু কি কি দেখছি?
ওদের কথা শুনছিল অন্যেরা, আর হেসে উঠছিল থেকে থেকে। এবার ছেলেটা একটু এগিয়ে এসে বলেÑ
দেখলে তো পয়সা দিতে অইবো।
পয়সা দিতে অইবো?
জ্বি, আমরা বিনা পয়সায় দেখাই না।
তয় আগে কস নাই কেন, হালার পো। তোর ঐ নাখাস্তা জিনিস পয়সা দিয়া দেখে কোন হালায়?
এইডা আমাগো হুটেলের নিয়ম, আমরা আগে কুনু সময় পয়সা নেই না। আগে খাওয়াই, তারপর পয়সা নেই। দেখানোর বেলায়ও তা-ই। আগে দেখাই, তারপর পয়সা নেই।

ছেলেটার কথা বলার ঢঙে বেশ মজা পায় সবাই, হাত ধুয়ে তাড়াতাড়ি ভাত খেতে বসে লোকটা। ভাত খেতে খেতে গ্রামের মানুষের মোটা দাগের এসব রসিকতা উপভোগ করে পেকাম। ভাতের প্লেটের পাশে তরকারি ও ডালের পাশাপাশি কাঁচামরিচ ও লবণের ছোটো ছোটে বাটিও সাজিয়ে দেয় ছেলেটা। হোটেলে যখন অনেক খদ্দের একসঙ্গে চলে আসে, বাবুর্চিও হাত লাগায়। হোটেলের মালিকও উঠে আসে এটা সেটা এগিয়ে দিতে।

এরকম ওঁচা জায়গায়, যে রকমই হোক হোটেলটা, রান্না বেশ ভালো রাঁধে ওরা। ক্ষুধাও ছিল বেশ, তাই পেট পুরে খেয়ে নেয় পেকাম। হোটেলের বাইরে ঘরের বেড়া ঘেঁষে এক বৃদ্ধ বসে আছে, সামনে রাখা টুকরিতে সাজানো টিনের ভেতর বিভিন্ন্ রকম সবজির বীজ। লোকটার মুখের অসংখ্য ভাঁজের ভেতর পৃথিবীর যাবতীয় উর্বরতার প্রতীক ফুটে ওঠেছে, ঐ সব বীজের থেকে ছড়িয়ে পড়া শেকড়ের ছবি যেন। বানভাসির পানির মত ঘোলা চোখে সামনের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে বুড়ো মানুষটা, কোনো কিছুর জন্য তাড়া নেই। যখন ঘরে ফিরতে শুরু করবে বাজারের মানুষজন, সন্ধ্যার আগে আগে রাস্তার ধারে বসবে সে। এক টাকা দু’টাকার বীজ বিক্রি করে যা পাবে তা দিয়ে চাল ডাল কিনে ঘরে ফিরবে। সামর্থ্য থাকলে আগামী দিন বাজারে আসবে আবার, নয়তো ছেঁড়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে জগতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাটিতে শুয়ে কাটাবে ক’টা দিন। তারপর টেঁসে যাবে, ঈশ্বরের কৃপায়! এসব দেখতে দেখতে নিজের ভেতর গোপন জ্ঞানের প্রচণ্ড শক্তি অনুভব করে পেকাম, যেভাবেই হোক ঐ মহাশক্তির কাছাকাছি যেতে হবে ওকে। কিন্তু কলেজের পড়াশুনায় বিতৃষ্ণা এসে গেছে ওর। ওখানে, জ্ঞানের ধারে কাছেও নিয়ে যাওয়া হয় না ওদের। এই গ্রাম গঞ্জে থেকে বই পুস্তকও বা কীভাবে সংগ্রহ করবে সে?

যাত্রা বিরতির পর হেলে দুলে আবার চলতে শুরু করে বাসটা, সবুজ ধানের খেত আর ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে গর্জন করতে করতে এগিয়ে যাওয়ার সময় ধুলোর ঝড় সৃষ্টি করে ছোট্ট বাহনটা। একটা বড়-সড় গ্রামের বুক চিরে যাওয়ার সময় পথের পাশের বাড়িঘরগুলোর বেড়াকাটা জানালার ভেতর দিয়ে সংসারের টুকিটাকি তৈজসপত্রগুলোও দেখা যায়। বাড়িগুলো পেঁচিয়ে থাকা ছোটো ছোটো ঘেরাওগুলোকে খুব অকিঞ্চিৎ মনে হয়। মনে হয়, প্রাকৃতিক এসব ঘেরগুলো প্রয়োজনের সময় রক্ষা করতে পারবে না এই বাড়িগুলোকে। বিস্তীর্ণ সবুজ শস্যের ক্ষেত এক সময় সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ফুলে ফেঁপে ফুঁসে উঠে নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে সব কিছু। সবুজ সমতলের এক লাগামহীন প্রান্তরে পরিণত হবে এসব। আঁকাবাঁকা রাস্তাটা এক জায়গায় সমুদ্রের বেশ কাছাকাছি এসে এগিয়ে গেছে সামনে, ঘরবাড়ি দেখে কেমন খাপছাড়া মনে হয়, যেন অস্থায়ী কোনো যাযাবর গোত্রের মানুষেরা ঘর বেঁধেছে কিছু দিনের জন্য, অথবা এমনও হতে পারে, ওদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে স্থায়ী ঘরবাড়ি বানানোর সামর্থ্যই নেই। খুব বড় কোনো গাছও নেই লোকালয়গুলোতে, ঝড়ের তাণ্ডবে বোধ হয় গাছেরাও এখানকার মানুষের মত হার-মানা। যে-কোনো সময় পালাতে হবে এমন ভাব নিয়ে দিন কাটায় ওরা। ঘরের বেড়ায়, বাঁশের বাতায় দা, কাস্তে প্রভৃতি গুঁজে রাখে এমনভাবে যেন দৌড়ে পালানোর সময় অন্তত ছোট্ট একটা হাতিয়ার হলেও সঙ্গে থাকে। মানুষের বৈরিতা এখানে শুধু ঝোড়ো বাতাস আর বিরূপ সমুদ্রের লোনা জলের সঙ্গে। জঙ্গল, কিংবা হিংস্র পশুর আস্তানা নেই ধারে কাছে কোথাও যে ওদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে তীর-ধনুক, অথবা বল্লম সড়কির প্রয়োজন হবে। এক ধরনের অস্ত্র দু’ কাজে ব্যবহার করে ওরা। মাছ ধরার কোঁচ ও টেঁটা। মাছের মৌসুম আসে যখন, খালবিল সব পানিতে ডুবে যায়, ঐ সব কোঁচ, টেঁটা দিয়ে মাছ শিকার করে তখন। আর শুকনো মৌসুমে জমি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে একদল আরেক দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওসব নিয়ে। সঙ্গে থাকে রাম-দা, বল্লম, কিরীচ প্রভৃতি। ঐ একটা সময় মানুষগুলোর খুব ‘গা-গরম’ থাকে, ওদের বৌ-ঝিরাও তখন দুরু দুরু বুকে দিন কাটায়। প্রতি বছরই পাড়ার দু’একজন এসব খুন-খারাবিতে নিকেশ হয়ে যায়। কখনো কখনো থানা পুলিশ আসে। যথারীতি তোলা নিয়ে বিদেয় হয়ে যায়, কোর্ট-কাছারি পর্যন্ত গড়ায় না এসব।
¬¬¬¬¬¬
এইখানে কেমনে আইলা, কও নাই কিন্তু। লোকটা আবার আগ্রহ প্রকাশ করে।
কইলাম না, আরেকটা ট্রলার থাইকা নিশানা পাইয়া।
কি কও! গত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এইখান থাইকা কোনো ট্রলার ছাইড়া যায় নাই।
সব কিছু কেমন জানি গুলাইয়া যাইতাছে, ঝড়ে পইড়া আমার মাথার ঠিক নাই আসলে।
ঝড়ে পড়লা কখন? ঝড় তো আসেই নাই!
কি কও? কেয়ামত দেইখা ফেরত আইলাম, আর তুমি কও ঝড় আসেই নাই!
তোমার তো দেখি মাথাটা ঠিকই খারাপ হইছে!

দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বাড়ির ভেতর থেকে ডাক আসে ওদের, ট্রলারের সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, ঈদের বিশেষ আয়োজন। কত রকম পিঠা যে তৈরি করা হয়েছে তার কোনো নাম নিশানা নেই। পিঠা-পর্ব শেষ হলে শুরু হয় ভাত মাংস খাওয়ার পালা। পিঠা খেয়েই ক্ষুধা মিটে গেছে অনেকটা। গতরাতের ধকলের পর যদিও সাতদিনের ক্ষুধা জমে রয়েছে এক সঙ্গে। বেশ চমৎকার রান্না, সারেঙ বাড়ির বৌ-ঝিরা বোধ হয় সবখানেই পাকা রাঁধুনি। ট্রলার থেকে বেছে বেছে অনেক মাছ আনিয়েছে সারেঙ চাচা। বেশ মজা করে রান্না করা হয়েছে, সব মিলিয়ে ঈদের খাবারের আয়োজন ষোল আনাই পূর্ণ।

বিপদ সংকেত না কমা পর্যন্ত যাত্রা শুরু করা যাবে না। ঢিলেঢালা ভাব সবার মধ্যে, খেয়ে দেয়ে সবাই ঘুমোতে যায় আবার। পেকামের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে এগিয়ে এসেছে যে ছেলেটা, ওর নাম জহির, সারেঙ বাড়িরই ছেলে। ঢাকায় পড়াশুনা করে, বাড়ি এসেছে ঈদের ছুটিতে। মাইজদি কলেজে বিএ পর্যন্ত পড়েছে পেকামও, ফাইন্যাল পরীক্ষা দেয়া হয় নি যদিও। ভাঙানির চরের মত জায়গায় এটুকু শিক্ষিত মানুষও খুব বেশি নেই, ফলে আরো কাছাকাছি আসে ওরা দু’জনে। খাওয়া-দাওয়ার পর শুতে না গিয়ে খালের ধারে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে যেয়ে বসে ওরা। ধীরে ধীরে বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকে, বোধ হয় এগিয়ে আসছে ঐ ঝড়। এখনো ঘোরের ভেতর রয়েছে পেকাম, হেঁটে আসতে আসতে লক্ষ্য করে অচেনা এই গ্রামটা, প্রচুর সুপুরি গাছ এখানে, বাড়ির ভিটিগুলো বেশ উঁচু, প্রায় প্রতিটা বাড়ির চার দিক ঘিরে রয়েছে সুপুরি গাছ। সামনে বা পেছনে, ছোট অথবা বড় একটা পুকুর রয়েছে অবশ্যই। পুকুরের মাটি দিয়েই বোধ হয় পুকুরের পাশে একটা করে চাতাল তৈরি করা হয়েছে, সুপুরি বাগান ওখানে। গ্রামের একটা অর্থকরী ফসল এটা, ঝড়ের দাপট থেকে বাড়িগুলো রক্ষা করে ঐসব গাছের আড়াল। যে-রকম শোঁ-শোঁ শব্দ করছে বাতাস, আর গাছগুলোর মাথা দুলছে, মনে হয় ওগুলো না থাকলে গ্রামের এসব বাড়িঘর ঝড়ের মুখে টিকতে পারত না। গ্রামের কোনো কোনো চায়ের দোকানে এত ভালো চা বানায় যে অনেকদিন মনে থাকে। এটা হয় সাধারণত, ঘন করে জ্বাল দেয়া গরুর দুধ ও ভালো পাতা ব্যবহার করার জন্য। যে-সব গ্রামে নাবিকদের আবাস রয়েছে, সেখানে অনেক কিছুই ভালো পাওয়া যায়। ঐ দোকানটার চা খেয়ে বোঝা যায় যে সারেঙদের গ্রাম এটা, এখানকার মানুষজনও বেশ স্বচ্ছল।

বোধ হয় নিজেও জানি না আমি, জহির, কীভাবে এখানে এলাম।
পাড়ার মসজিদের খায়ের চাচা বললেন, আযান দিতে যাচ্ছিলেন তিনি, ঘন কুয়াশার ভেতর একটা লাল বিন্দুকে সমুদ্রের উপর নড়তে দেখে অন্যদের ডেকে নিয়ে আসেন, সমুদ্রের কাছে যেয়ে দেখেন ভীষণভাবে একটা লালবাতি দোলাচ্ছ তুমি।
লালবাতি?
হ্যাঁ, তখনই বুঝতে পারি যে বিপদে পরা কোনো নৌকার সংকেত এটা। সঙ্গে সঙ্গে সাম্পান নিয়ে ভেসে পড়ি।

সময়ের ভেতর পিছিয়ে যায় পেকাম, মনে মনে বোঝার চেষ্টা করে ঐ বিষয়টা। অর্থাৎ হুইল ছেড়ে নোঙর ফেলায় ব্যস্ত যখন সে, বাতি দোলাতে দোলাতে ঐ জাহাজটা অদৃশ্য হয়ে যায় তখন, আর নোঙর ফেলার পর বাতাসের ধাক্কায় ওদের ট্রলারটা সমুদ্রের দিকে ঘুরে যায় আবার। ফলে সূর্যের আভা দেখা যাচ্ছিল ওদের বাঁদিকে, এই ফাঁকে ঘন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায় ঐ উদ্ধারকারী জলযানটা, যদি সত্যিই এরকম কিছু ঘটে থাকে।

চায়ের দোকান থেকে দেখা যায় খাঁড়িতে ভিড়ানো ঐ ট্রলারটা। সমুদ্রের বুকে যাকে মনে হয় কালো একটা বিন্দু, এখন এই ছোট্ট খালের ধারে ওটাকেই মনে হয় বিশাল এক জাহাজ, পর্বতের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিচের ছোট আকারের নৌকোগুলোর জন্য আরো বড় দেখায়। এ মুহূর্তে ওটাকে বেশ বড় বলে মনে হয় পেকামেরও, পেছনের হালের ওপর বাঁধা লালবাতিটা এখন নেভানো। ওটার চকচকে পুরু কাচ থেকে লাল রং যেন ঠিকরে বেরোয়। কালো কাঠামোর ভেতর এক চোখা দৈত্যের মত আগুনে লাল হয়ে জ্বলছে। এটা নাড়াবে কেন সে? সমুদ্রের ভেতর কোনো জাহাজ যখন ঝড়ে লুটোপুটি খায়, ওটার লালবাতি দোলাতে হয় না, পুরো জাহাজটাই এমনভাবে দোলে যে মুহূর্তের জন্য ঢেউয়ের কোনো এক ফাঁকে হয়তো চোখে পড়ে ঐ লালবাতিটা। ঐ মুহূর্তে, কিছু সময়ের জন্য সমুদ্র খুব শান্ত হয়ে পড়েছিল কি, যে বাতিটাকে দোলাতে হয়েছিল লোকটার? হতেও পারে।

ট্রলারের সামনের দিকের বাঁকানো গলুইটার ভঙ্গিমা বেশ রাজকীয়, পেছনের কেবিনটাও বেশ উঁচু। লালবাতিটাও দেখা যায় অনেক উঁচুতে। পানির তল থেকে কম হলেও ত্রিশ ফুট উঁচুতে হবে। ঘাটে বাঁধা নৌকোগুলো ঢেউয়ের দোলায় ভীষণভাবে দুলতে থাকে, ট্রলারটা প্রায় স্থির, ওটার গায়ে বাঁধা পেয়ে ব্যর্থতায় ফুঁসতে থাকে বাতাসের ঝাপটা। ইঞ্জিনের সিটি দেয়ার মত বাতাস কাটার শব্দ কানে আসে মাঝে মাঝে। এ মুহূতের্, ট্রলারটাকে খুব আপন মনে হয় পেকামের। ইচ্ছে করে, গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় আদর করে। উদ্ভিন্ন-যৌবন কোনো কিশোরীর মত নিরেট ওর শরীর। অথচ গত রাতে একটা কালো কফিন বলে মনে হয়েছে ওটাকে। একবার বেরোতে পারলে এ জীবনেও আর ওটার ভেতর প্রবেশ করবে না ভেবেছে। খুব অবাক হয়ে ভাবে পেকাম, মানুষের কোন প্রবণতাটা তাহলে সত্যি? বিপদে পড়ে যে-দিকে ঝুঁকে পড়ে, ওটা, নাকি স্বাভাবিক সময়ে যে-দিকে প্রলুব্ধ হয় সে, ওটা? আরো গভীরতায় ছুটে যায় মন। প্রেমের একটা ব্যাখ্যা এ মুহূর্তে আপ্লুত করে ওকে। এক বন্ধুর সঙ্গে জন্মাষ্টমীর কীর্তন শুনতে গেছিল, রাধাকৃষ্ণ লীলার ঐ রেশ এখনো মাঝে মাঝে শিহরিত করে। মানুষের প্রেম সত্য না বিরহ সত্য? এটার সমাধান এখনও পায় নি সে। কীর্তন দেখে ফেরার পথে ওর বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বল তো পেকাম মানুষের ভালোবাসা সত্য, না ভালোবাসার ইচ্ছা সত্য?’।
এটার জবাব দিতে পারে নি তখন, এখনও পারে না। মনে পড়ে, কৃষ্ণের প্রেমে বিভোর বিরহী রাধা কৃষ্ণকে বলছেন, ‘প্রভু, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে, প্রতি অঙ্গ মোর’।
জবাবে কৃষ্ণ বলেন, ‘রাধে, তোমার প্রতি অঙ্গে অঙ্গে মিশে রয়েছি আমি’।
রাধা বলেন, ‘প্রভু, সে তো যোজন যোজন দূর!’ কৃষ্ণ বলেন, ‘তোমার শিরায় শিরায় মিশে রয়েছি আমি, হে রাধিকা’। রাধা আবার বলেন, ‘প্রভু, সেও তো যোজন যোজন দূর!’ কৃষ্ণ বলেন, ‘তোমার প্রতি অণুতে অণুতে রয়েছি যে আমি হে প্রাণাধিকা।’ তবুও রাধার আর্তি ফুরায় না। তিনি বলেন, ‘প্রভু, অণুতে অণুতেও যে যোজন যোজন দূর! আমি বিলীন হয়ে যেতে চাই তোমাতে!’

পেকামের কাছে মনে হয় এটাই ঈশ্বর প্রেম, এখানে শরীরের বিষয় নিতান্তই গৌণ, ঈশ্বরের প্রতি এরকম ভালোবাসাই মানুষের থাকা উচিত। যে ঈশ্বরকে মানুষ ভয়ে ভালোবাসে, অথবা অর্চনা করে, সে ঈশ্বর মহান হতে পারেন, কিন্তু মানুষের কাম্য হতে পারে না। মানুষ খামোকাই ঈশ্বরকে মানুষের প্রতি কঠোর রূপে চিত্রিত করেছেন। যার ফলে অনেক ধর্মকেই অস্ত্রের জোরে কিংবা ছলচাতুরি করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে, এবং পালন করতে হচ্ছে।

পেকাম বিষণ্ন হয়ে আছে দেখে জহিরও আর কথা বাড়ায় না, এদিকে ঝোড়ো বাতাস বেড়ে যাওয়ায় চায়ের দোকানের লোকজনও চলে যেতে থাকে, পেকামকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে জহির।

১০
ওস্তাদের যে-বাড়িতে আজ অতিথি হয়েছে সারেঙ চাচা, ওটা কোবাদ আলী সারেঙের। কোবাদ আলী গত হয়েছে তিন যুগ আগে, বাড়িটা এখনো ঐ কোবাদ আলী সারেঙের নামেই পরিচিত। এই পরিবারের আর কেউ এখন সারেঙের জীবন বেছে নেয় না। কোবাদ আলী সারেঙ এই গ্রামের এক ইতিহাস, অনেক বড় বড় জাহাজ চালাতেন তিনি। কোলকাতা, রেঙুন, আকিয়াব, বোম্বাই, মাদ্রাজ, করাচি প্রভৃতি বন্দর পর্যন্ত চলে যেতেন জাহাজ নিয়ে, কোনো কোনো বার ফিরতেন বছর পেরিয়ে। শেষ জীবনে তাঁর কাজ ছিল ঝড়ে আক্রান্ত যে-কোনো জাহাজের স্বেচ্ছা-উদ্ধারকারীর। ঝড়ের পর পরই উপকূল চষে বেড়াতেন বিপদে পড়া নাবিকদের সন্ধানে, কত মানুষকে যে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করেছেন তার ইয়ত্বা নেই। জীবনের শেষ উদ্ধারকাজে নামেন ঊনসত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর, শ্যালককে উদ্ধার করতে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যান, ঐ শেষ বার, ডাঙায় ফিরে আসেন নি আর কোনো দিন।

কোবাদ আলী সারেঙ ছিলেন জহিরের দাদা, তাঁকে ঘিরে কত যে কাহিনী শুনে এসেছে সে গ্রামের মানুষজনের কাছে, তার কোনো শেষ নেই। ইচ্ছে ছিল দাদার কিছু কাহিনী শোনায় পেকামকে। ‘ঝড়ে আক্রান্ত প্রতিটা নাবিককেই আমি কূলের নিশানা দেখাবো ইনশাল্লাহ’ বলে দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে ঝাঁপিয়ে পড়তেন ঝড়ের সমুদ্রে। শেষ জীবনে যে ট্রলারটা চালাতেন, শুধু উদ্ধারকাজেই ব্যবহার করতেন ওটা। বঙ্গোপসাগরের যত ঝড় সামলিয়েছে ঐ দানবটা, ওর ধারণা হয় যে ঐ অলৌকিক জলযানটা সমুদ্রকে পরাস্ত করেছে চির দিনের জন্য।

টাকা পয়সাও অনেক জমিয়েছিলেন তিনি, প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন, দান দক্ষিণাও করতেন অবারিত হাতে, এক প্রায়-কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন জীবিতাবস্থায়। সারেঙ চাচার কাছে ওর অনেক কাহিনী পেকামও শুনেছে, কিংবদন্তীর এই মানুষটা গত হয়েছে ওর জন্মেরও আগে।

ঝড়ের গতি বাড়তে থাকায় মাঝি-মাল্লাদের খাইয়ে দিয়ে ট্রলারে পাঠিয়ে দেন সারেঙ চাচা, পেকাম ও তিনি থেকে যান সারেঙ বাড়ির অতিথি হয়ে। রাতের খাওয়ার পর সারেঙ চাচা যেখানে ঘুমাবেন কিছুটা সময়ের জন্য সেখানে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে বসে ওরা, বাইরে বাড়তে থাকে বাতাসের তীব্রতা, শব্দও যেন সেই সঙ্গে বেড়ে চলে আস্তে আস্তে, ঘরের ফাঁক-ফোঁকর দিয়েও ভেতরে ঢুকে পড়ে ঠাণ্ডা বাতাস। হ্যারিক্যানের মৃদু আলো দুলতে থাকে বাতাসের দাপটে। হঠাৎ পেকামের চোখ যায় দেয়ালে ঝোলানো একটা ছবির দিকে, ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। রাতের ঐ অলৌকিক মানুষটার অবিকল প্রতিরূপ ঐ ছবিটা! কীভাবে সম্ভব? বিছানা থেকে নেমে যেয়ে দাঁড়ায় ওখানে, খুঁটে খুঁটে দেখে ছবিটা। পেছনের পটভূমিতে অবিকল ঐ নৌকোটা, সেই পুরানো দিনের ছোট জাহাজ। মলিন হয়ে এলেও কাচের ভিতর দিয়ে এখনো স্বচ্ছ ঐ ছবি। বাতাসের ধাক্কায় সামান্য নড়তে থাকায় কাচের উপর আলোর প্রতিফলন ঘটে। ঢেউয়ের দোলায় ট্রলারের হুইলডেকে বসা মানুষটার মত অবিকল ঐ ছবি! জহির জিজ্ঞেস করে

কি দেখছো, পেকাম?
কার ছবি এটা?
আমার দাদা, কোবাদ আলী সারেঙের।
চমকে ওঠে পেকাম, ভালো এক রহস্য তো! সারেঙ চাচাকে জিজ্ঞেস করে
ছবিটা আগে দেখেছি আপনার কাছে, চাচা?

কিছুটা ভাবনায় পড়ে শফি সারেঙ। উষ্ণ হয়ে ওঠেছে ঘরের আবহাওয়া। চমৎকার খাওয়া দাওয়ার পর শরীরে ঘুমের আবেশ । স্মৃতির ভেতর ডুবে যায় শফি সারেঙ। ছবিটা কি আছে ওর কাছে? কিছুক্ষণ পর বলে
ছবিটার কথা মনে নেই। তবে ওস্তাদের একটা স্মৃতি এখনো খুব স্পষ্ট। এখানে দাঁড়িয়ে একদিন বলেছিলেন আমাকে, ‘মনে রাখিস শফি, কখনো কোনো ঝড়ে যদি কেউ পথ হারিয়ে ফেলে, এই ট্রলারটা নিয়েই সমুদ্রে ভেসে যাব আমি, আর ওকে কূলে ফিরিয়ে আনব। ইনশাল্লাহ!’
এ কথাটাই কেন বলেছিলেন?
ওর বয়স হয়ে যাওয়ায় বলেছিলাম যে এভাবে ঝড়ের মধ্যে জাহাজ চালানো ঠিক হচ্ছে না আপনার, ওস্তাদ।
একটু ভেবে বলে পেকাম
কথা রেখেছেন তিনি, এখনও ওকাজটাই করে চলেছেন!
কীভাবে বলিস?

কোনো জবাব নেই পেকামের। মিটিমিটি হাসে সারেঙ চাচা, কিছুটা বিস্ময় ওর চোখে-মুখে। ঘরের অদ্ভুত লালচে আলোয় সব গুলিয়ে ফেলে পেকাম। এ মুহূর্তে শফি সারেঙকেও এক অজাগতিক প্রাণীর মত রহস্যময় দেখায়। লাল আলোর বিপরীতে মহাকালের এক স্থাপত্যশিল্পের মত, অথবা প্রাচীন কোনো গুহামানবের মত! ঝড়ের আকাশে দুলতে থাকা ওর কপালের গভীর আঁকিবুকিগুলো অন্ধকার খাদে বিদ্যুতের মত ঝলকে ওঠে। সমুদ্রের অমসৃণ ঢেউয়ের মত লাফিয়ে ওঠে চোয়াল দুটো। ’ওস্তাদের অনেক মারফতিই আমি বুঝি নাইরে পেকাম, কি কমু তোরে?’

এর পর আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় না পেকামের। ধীরে ধীরে আরো গভীর হতে থাকে রহস্যটা, ক্রমাগত এগিয়ে আসে সমুদ্রের গর্জন। ছবিটার সামনে থেকে সরে যায় সে। অজানা এক রহস্য নিয়ে গভীর হতে থাকে রাতের প্রকৃতি। পেকাম হারিয়ে যায় যাবতীয় বাস্তবতা থেকে অনেক অনেক দূরের সমুদ্র গর্জনের ভেতর। ওটা এখন শরফুনের যৌবন-উত্তীর্ণ শরীরের অলৌকিক কাঠামোর ভেতর উথলে ওঠা এক মহা-ঝড়, এক অশনি-সঙ্কেত! অতপর এক অভূতপূর্ব আচ্ছন্নতার অন্তরালে ডুবে গিয়ে সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলে পেকাম। স্মৃতি হাতড়ে প্রাণপণে বুঝতে চেষ্টা করে, ঝড়টা কি পেরিয়ে এসেছে সে, নাকি ওটা ছিল শুধুই এক স্বপ্ন? আসল ঝড় এখনও রয়ে গেছে, সামনে!