আবিদুল ইসলামের কবিতা
আবিদুল ইসলাম, সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১২


আবিদুল ইসলামের জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১ সালে ঢাকায়।
স্নাতকোত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগ।
বর্তমানে সহকারী সচিব, বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)


কবিতা ভাবনাঃ

কবিতাকে আমার কাছে নিজস্ব ভাবনা প্রকাশের একটা মাধ্যম বলে মনে হয়। এটা চিন্তার একটা নির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ, যা ঘটে থাকে তার স্বকীয় ভঙ্গিমায়। গল্প, আলেখ্য কিংবা প্রবন্ধ যেমন তাদের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত শারীরকাঠামোয় লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আর বক্তব্য ফুটিয়ে তোলে, কবিতাও তেমনি আরেকটি বাহন, যার নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে। কলাকৈবল্যবাদ কিংবা জীবনবিমুখ সৌন্দর্যের চর্চার স্থান কবিতা নয়। আমার যেকোনো চিন্তা- যেটি প্রবন্ধে অথবা গল্পের ভাষায় উদঘাটন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না- সেটিকেই কাব্যে মূর্ত করে তুলবার প্রয়াস পাই। সৌন্দর্যের সাধনা শিল্পের একটা লক্ষ্য অবশ্যই, কিন্তু তাকেই আরাধ্য করে জীবনের পঙ্কিলতা, দিনানুদৈনিক বাস্তবতার নিগড় এবং সেখানে অবরুদ্ধ মানবাত্মার আর্তনাদ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কেবল শিল্পের তাড়নায় সমূহ বাক্যবন্ধে নপুংসক পঙক্তিমালা রচনা জীবনের দায়বোধ হতে পলায়নের মধ্যবিত্তীয় প্রয়াসের অপশৃঙ্খলে আবদ্ধ। জীর্ণতার অলিন্দে কিংবা অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বাস করা কবির চোখে সূর্যের রুদ্র প্রতাপ এসে পড়ে না, আলোর অভাবে সে তাই বহির্জগৎকে অবলোকন করতে ব্যর্থ হয়। এই অবরুদ্ধ কবির পক্ষে সম্ভব নয় পাঠকের অভিনিবেশ জীবনের রূঢ় বাস্তবতার দিকে ফেরানো। আমার কাছে তাই কবিতা নিজের অন্তর্জগৎকে প্রকাশের মাধ্যম, সৌন্দর্য ও শিল্পবোধ যেখানে কাজ করে আবহ সঙ্গীতের মতো।


যুযুধান স্বকীয়তা

কী বিপুলা রাত্রি! বাইরে বয়ে যায় ক্রমাগত তিমিরস্থিত সময়
অস্থির পায়চারি, মনোদর্পণে বিকৃত প্রতিচ্ছবি, সমূহ পরাজয়-
সব ভেঙে চলে যাবো সুতোর ওপারে- অলীক চিত্রকল্প ভাসে ...

আমি; সময়কে ধারণ করে চলেছি অবিরত- যেনবা আমাতে
স্থিত সমগ্র জগৎ। মুহূর্ত কয়েক কেবল- রয়ে যাবো তফাতে
তোমার, অতঃপর স্নাত হবো প্রণয়-প্রপাতে; প্রান্তরে, ঘাসে-

যেখানে অলৌকিক ফুলের ঘ্রাণ সুতীব্র তৃষ্ণা আনে মনে; প্রিয়
থেকে প্রিয়তর এ পৃথিবীর বুকে শুয়ে থেকে ফসলের যাবতীয়
স্নিগ্ধ অসুখ শুষে নেবো নিজেদের বুকের ভেতর- শুভ্র শিশির

ভিজিয়ে দিয়ে যাবে আমাদের দুর্লঙ্ঘ্য দুটি দেহ- প্রতি কোষে
বেজে উঠবে প্রলয়-মাদল; বেটোফেন অভাবিত অক্ষম রোষে
কাঁপাবে বাতাস; মৃত্যুহীন ঝড় এসে ছুঁয়ে যাবে তোমার শরীর।

...

সুষমা, স্বরাজ চাই। আমাদের জন্য চাই নব-পালঙ্ক সুনির্মিত;
প্রণমী কামদেবী! পরস্পর ঘেঁটে বার করি নিবিড় শরীরতত্ত্ব। ...
কোথা লুকিয়ে ছিলে হে কামনার আশাবীজ? সাদর আমাদের

বরণকে মেনে নাও। দুইটি শরীরের যূথবদ্ধ যে যাপিত জীবন
মোদের, তাকে কুসুমিত করে তোলো- কেননা অনন্যসাধারণ
এই রাত্রি বয়ে যায় ... অন্তরে অবিরাম ঝরে পঙক্তি নিশীথের।


পুড়তে থাকা সময় (২)

শুধু ভাবাবেগ নয়- পেত্রার্কের কবিতার মতো
তুমি জানো, প্রকৃতির যাবতীয় অমোঘ আখ্যান
নিশিদিন ক্রমাগত কুয়াশাচ্ছন্ন রাখে আমায় ...
ক্লিষ্টতায় আচ্ছাদিত করে আমার জীর্ণ অলিন্দ।
অস্থির ঘুণপোকা হৃদয়ে ধরে রাখে তার যতো
ধ্বংসের অভিলাষ, তার অধিক বিনাশী প্রাণ
আমার অস্তিত্বে কাঁপে, আমাকে অহর্নিশ শোনায়
মৃত্যুর সঙ্গীত; সত্তায় বেড়ে ওঠে অন্ধ কবন্ধ।

আর কোনো বিনির্মাণ নেই। সম্মুখে ধ্বনিত হয়
অপদেবতার স্বর ... অন্ধকারে কারা যেন আসে
ওরা মৃত্যুর চর- আমাকে ডেকে নিতে চায় দূরে,
পরাজিত জীবনের গ্রাসে; জন্মে ব্যাধি, অস্থিময় ...
স্বগত মৃত্যুর বোধ আমাকে পোড়াতে ভালোবাসে
পরিপার্শ্বে আশ্চর্য দ্রোহ ও শিল্পবোধ ভেঙেচুরে।


বাঁধ ভেঙে এসেছি

কতোটা জোর সঙ্গম চাই ফলাতে মেধার বীজ মননে ও মৃত্তিকায়?
পৃথিবী, পরিকীর্ণ শিল্পকলা-
মানবের খুনপাতের অবিরল ধারায় হয়ে ওঠে রক্তাক্ত বিমল,
তপোবনে চিরহরিৎ- কিছু নিশ্চিন্ত গুল্মলতা সীমিত আবেগে কাঁপে
কবে নাড়া দেবে স্বীয় সত্তায়-
এবং বলো কতোটা ঝড়ো হাওয়া প্রয়োজন হয় তাতে?
আর কিছুটা ঘৃণার আশাবীজ
যতোখানি ভালোবাসার উত্তাপ পেলে অঙ্কুরিত হয়ে
প্রস্ফুটিত হবে মানবমননে নবজাগরণের সূত্রপাতে, নতুন ভোরে
(আর সেই ভোরের শুরু যেনবা অন্য এক অস্থির আঁধারেরই প্রারম্ভে)
আমিও ততোটা উত্তাপের হালচাষ দেবো এনে ধরণীর বুকে
এবং সেই ভোরের আশায় থাকব চেয়ে সুদূর পূর্বের পানে
শত রাত্রি যাপনের শেষে।
আমার শিশ্নের মতো কখনো আমারো
ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ে মাথা
দৃঢ়তাহীনতায় মৃত্তিকাভিমুখী হয়-
তবু বাঁধ ভেঙে এতোটা পথ এসেছি,
আজ প্রয়োজন বিপ্লবী সঙ্গমের; তৃষ্ণার সাথে আকাক্ষা-বস্তুর
খেয়ালি বাস্তবতার সঙ্গে রূঢ় বৈষম্যের-
-এবং ঝড়ের চেয়েও তীব্র বেগবান কিছু
চিরাচরিত মুদ্রাসঙ্কট ভেঙে যেমন সচল মুদ্রাপ্রবাহ।

মাঝে মাঝে তবু জাগে স্মৃতিতে
শৈশবের পরান্নভোজী মুখাবয়ব
তাকেও সম্পূর্ণ মুছে দিতে হলে চাই রক্তাক্ত প্রণয়লীলা
কেননা পৃথিবী, তৃষিত গোলক
এবং সর্বদা ক্ষুধিত সে যৌবনের রক্ত আর নব-উন্মাদনায়
এই পৃথিবী, কখনোবা দৃষ্টিনন্দন মরুভূমি
ঝড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে নব্যসৃষ্ট কোনো উপত্যকায় লীন।
আর সংগ্রামী মানব তারেই করে তোলে দ্যূতিময় মহান
আদিকাল হতে সর্বদা।


ব্যাবিলন

একদিন-
শুকনো পাতায় ছাওয়া প্রাচীন নগরীর বুকে
এলোমেলো সভ্যতার ভিতে
সম্রাট নেবুচাদনেজারের ঝুলন্ত বাগান
সশব্দে পড়েছে ভেঙে ধূলিকণার ’পরে-
ইতিহাস সে শব্দ ধারণ করে রেখেছে।

প্রস্তরপ্রাচীরের মাঝে
মেসোপটেমিয়ার বুকে জেগে থাকা বালুচরে
সভ্যতার শেষ প্রশস্তিগীত
আলুথালু বাতাসে ভেসে বেড়ায়
সেই সঙ্গীত ভেসে আসে সবহারা পথিকের কানে।

পথিক কি জানে
এখানকার বাতাসে কতো হাহাকার
রক্ত ঝরিয়েছে ইতিহাসের বুক চিরে;
কতো সবুজ হৃৎপিণ্ড কফিনে
হয়ে আছে নিঝুম মহাকালের পিঞ্জরে?

পথিক কি শোনেনি
এই রম্য অট্টালিকার বুকে
কতো জীবনের দীর্ঘশ্বাস প্রোথিত মর্মর দেয়ালে;
কতো অনাদি স্বপ্ন হয়েছে তামাটে
কংক্রিট নিষ্ঠুরতার প্রাসাদ মায়াজালে?

পথিক কি জানেনা
সভ্যতার নিদারুণ এই সঙ্কটে
ডুবে গেছে মহাসভ্যতা অশুভ আঁধারের গহীনে?


স্মৃতি; দুঃখময় অতীত

জীবনের নীল বাস্তবতাকে দূরে ঠেলে
দুর্বহ স্মৃতির করায়ত্তে আবদ্ধ হই;
মাঝে মাঝে জাগতিক বেড়াজাল ছিন্ন করে
দুরাশার পথে হাঁটি পরিপার্শ্ব ভুলে।

পাড়ি দেয়া যেতো অনেকটা পথ তারে পেলে?
দুঃস্বপ্নেও পাই না চিন্তার কোনো থৈ-
শেকড় আলগা হলে উঠে আসি শৈবাল-সাগরে
তন্দ্রা কেটে গেলে রাখি হাত ভুলের মাস্তুলে।

এখনো সে আসে আমার বহু কাছে
অস্পষ্ট কুয়াশার মতো দূরে সরে যায়-
পিনপতন নিরবতায় অস্থির যামিনী জেগে
কাকভোরে ফিরে আসে সে সফেদ বলাকা ...

ভাবনার জোনাকিরা আমায় ঘিরে আছে
পাখিউড়ি দিনের শেষে রাতভর শিশির-শয্যায়;
নত্রেরা ছুটিতেছে আদিগন্ত অন্তহীন বেগে
স্মৃতিকোষে জ্বলে দীপ্র আলোর শলাকা।


‘কাল’-এর পরিধি

তের নদী পার হয়ে দূর হতে এ বিস্মৃত ক্ষণে
অকস্মাৎ এলো সেই আকাক্ষিত কণ্ঠধ্বনি-
“গতকালও এসেছিলাম তোমার দরোজায়”।

ধূসর জীবনে, বার্ধক্যের অলিন্দে বসে
পিরিচে ঢালা বিস্বাদ চায়ে চুমুক দিতে দিতে
আমিও মেলাই আমার ভেঙে আসা কণ্ঠস্বর-
“শত যুগ যেন তোমার ‘কাল’-এর পরিধি!”


লাশেরা

লাশেরা শুয়ে আছে অন্তহীন রাজপথে মাথা রেখে
যদিও কখনো ছিল ওরা সবুজ-শ্যামল
এই পাপাচারী শহরের বুকে-
আজ ওদের প্রতি মাংসপিণ্ড থেকে গড়িয়ে নামে
কষ্টের অদৃশ্য রোহিত কণা ...

শুধু দিকচিহ্নহীন ধু ধু মরুভূমি হবে আমাদের শহর-
গগনবিদারী অট্টালিকাগুলো কেবল দন্তবিহীন
মুখ খুলে আমাদের ক্রমাধুনিক মূর্খতাগুলোকে
মুখব্যাদান করা উপহাস জানিয়ে নিশ্চুপ
দাঁড়িয়ে থাকবে। ...

...
আর এখন, লাশেদের শরীর থেকে জীবনের
শেষ রক্তবিন্দু শুষে নিয়ে
ফেলে রাখা হয়েছে রাজপথের পরিপার্শ্বে ...
চারিদিকে ব্যাখ্যাতীত দৃশ্য, সবুজ-সতেজ
পটভূমি ঠেলে দৃষ্টিপথে ভাসে গাছেদের লাশ।