নির্ঝর নৈঃশব্দ্য'র কবিতা
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১২


নির্ঝর নৈঃশব্দ্য'র জন্ম: ২৪ আগস্ট ১৯৮১ কক্সবাজারের চকোরিয়ায়। পড়াশোনা: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ চিত্রকলা। প্রকাশিত বই: পাখি ও পাপ (কবিতা), শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (কাব্যগল্প)।
সম্পাদনা: স্বপ্নান্ধশব্দাবলি (কবিতার কাগজ), জলপত্র (কবিতার কাগজ), চারপৃষ্ঠা মেঘ (কবিতার কাগজ), মুক্তগদ্য (মুক্তগদ্যের কাগজ) ইত্যাদি। যৌথ সম্পাদনা: প্রথমস্বর (প্রথমদশকের কবিতা সংকলন)।



কবিতা ভাবনা

আমি জেনেছি, ভাষা যাকে সমস্ত ধারণ করতে পারে না তাইই কবিতা। এবং কবিতা শেষপর্যন্ত পাঠকের কাছে টেক্স্ট। ফলত একটা কবিতা লেখার পর কবির অনুভূতি কবির একান্ত, আর তা পাঠোত্তর পাঠকের অনুভূতি বিভিন্ন। রবিনাথ বলেছিলেন, 'সহজ কথা যায় না বলা সহজে।' তার কথা সত্য জেনে বলতে পারি, সহজ কথা সহজে লিখতে পারলেই কবিতা হয়। কিন্তু আমরা তা পারছি না। তাই কবিতা পরিণত নয়।


.....................................
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য'র কবিতা
.....................................


নদীলগ্ন অভিমান
২০০৩১০

লাল বুনেছি লজ্জার খানিক পরে। তারপরে লক্ষ্মীচালের ভাত-- গরমভাপে তার চৈত্রের
আড়ষ্ট মুখ সেঁটে থাকে মুখে। আমি তার পরান্মুখ ঢেউ ভাঙি শঙ্খের এলোমেলো পদাবলি।
যে আমাকে সমূলে খুলে নেয় শরীর হতে-- আমি তার ধারে ভেঙে দেবো নদীলগ্ন অভিমান।
মরুবেহাগ একবার শুধু খেয়ালের দেহে হতে পারে প্রাণ।



সবুজ চশমার ঠিকাদার
২৮১২০৯

প্রতিটি আকাশের শেষে জ্বরাক্রান্ত দিগন্ত শুয়ে থাকে, প্রতিটি পাহাড়ের মাথায় যথা
শূন্যতার নীল। ভোরবেলা চাতালের সুখ তোমাকে বলেছে দীর্ঘপথের পাঁচকথা; আর তুমি
ধূলিচিহ্ন আড়াল করো, ধুতির কোণায় আতরের গন্ধ নিয়ে অচিনগঞ্জের বেনে, ফুলবাবু
সবুজ চশমার ঠিকাদার। চারবিঘা চরে বাড়াও বেগুনের ক্ষেত। তুমি কি জেনেছো
কখনো, শতরঞ্জিতে কতোরকম রঙ থাকে?



যদি তুমি অধিগ্রহণ করো
০৭১২০৯

যেদিন প্রথম রক্ত দেখে ভয়ে কাঁপছিলাম-- নিজের কথাই ভাবছিলাম। যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে
ভাবছিলাম কার্যকারণ। মা আমাকে শোনালেন মৃত্তিকার ইতিহাস। বললেন, মাটির মতো
হবি, মাটি যেমন সবকিছু সহ্য করে, মাটি যেমন....। আর আমি নিজের কথাই ভেবেছি,
আমার আঙুল একান্তই আমার, জন্মদাগ, নখ, চুলের সিঁথি, পলাশ এবং মণিকুন্তলা নদীটি
একান্তই আমার। যদি তুমি অধিগ্রহণ করো-- তারপরও।



তোমাকে বলি নি মনখারাপ
০৬১২০৯

তুমি আমার ত্বক ও কানের পাশে একটি তিলের দিকে তাকিয়েছিলে। মৃদু হাতে নিরীক্ষা
করছিলে শাড়ির বুনন। বলছিলে এটা হাতে বোনা। বলছিলে পেয়ারার ঘ্রাণ আসছে।
আমার তখন দিঘিপাড়ের বিস্তারিত পেয়ারাবাগানটির কথা মনে হলো। একদিন পিকনিকে
আমরা ছিলাম। তুমি পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখের জলে একসা। যদি আমার চোখের
ভিতর তাকাতে! তোমাকে বলি নি মনখারাপ।


বেগুনিদাঁতের কিশোর
৩০১০০৯

আমি তো দেখি না কিছু। উদ্ভ্রান্ত সাঁঝের কথক রাত্রিতে কোন মোহে হয়ে যায় চরাচর,
কেউ কি দেখেছে আর? বেগুনিদাঁতের কিশোর জামবনে ফিরে এসো একবার; রাত ভেঙে
খেতে দেবো জাম আর কথকের শূন্যতা। আমি হাত খুলে করতলে রেখেছি অন্ধকার।
ভাসমান দৃশ্যে নৃত্য ম্রিয়মান আহা। কথক আমার জনকের ডাকনাম।



কূয়াতলার ছায়া
১২১০০৯

একদিন ভোর ভেঙে যাবে। রাস্তার মাদিকুকুর তাকাবে আড়চোখে। শাড়ির ভাঁজে ফুরিয়ে
যাবে উষতা। চায়ের কাঁপে ডুবে যাবে মাছি আর মহাকাল। তোমাদের কূয়াতলার ছায়া
নিয়ে আমি ফিরে যাবো। বনের পাড়ে একটি ঘর। মৃগয়ায় স্যাঁতা পড়ে আছে। আমি দিন
গুনবো অভিজ্ঞানের কামনায়।



রজঃলাল সন্ধ্যা
১৩০৭০৯

তুমি শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকো। আমার খড়িমাটির জীবন। দেয়ালের পাশ দিয়ে চলে
গেছি আষাঢ়ের চিতায়। রজঃলাল সন্ধ্যায় আমার বিভ্রম। আমার দীর্ঘচুলে ক্ষমাহীন
অভিমান। যেখানে আগুন গাহে স্বাতীতারা শাড়ি। আমার বিসর্জনে আরাধ্য ক্ষেতের
ভিতর জুঁইজ্বরে জেগে যায় রূপালি-মুষিক। মুষিক এসো, আমার ঢেউ আর সন্ধ্যা কেটে
নিয়ে যাও।



বিছানীল জ্বর
০২০৭০৯

চোখের ভিতর তাকিয়ে আছে মহিষের ভয়। নির্জলা ধূপে শুয়ে শুয়ে পোড়ে আমকাঠের
আগুন। কাদাজলে দাঁড়িয়ে শুঁকে বিছানীল জ্বর। বাঁধের ওপারে ডাকে মাজরার ঝাঁক।
এবং লোপাটবুকের ঢিবি বালিয়াড়ি লাগে। তুমি কি আটকুঁড়ে নিম, তাকিয়ে থাকো
সজনের ডালে? আমার এখানে বর্ষা পাগলের মতো নামে।



পাতার উঠান
২৬০৬০৯

আমার সূক্ষ্মলতা অলসতা, আমার সুচতুর বাজারের ব্যাগ, অপরিচয়ের যন্ত্রণা, সুতোর
আড়ত, সস্তা সুখাবলি, সেলাইকল, কাঁচুলির স্ট্রিপ, সমুদ্রের ফেনা, দানাদার এলাচির বন,
স্বপ্নে দেখা ঘোড়া, আরো আরো বিস্তারিত জনপদ, সব ফেলে চলে আসি পাতার উঠানে।
পাতা আমাকে নিদ্রা দেবে ঘুম। বাতাস এসো, পাতার কাঁপন থামাও।



দিগন্তের করাল-গ্রীবা
২৫০৬০৯

ভেবে নিই, চুলচেরা হিশেবের দিন, আমার চুলের বেনি ছুঁয়ে আসে দিগন্তের করাল-গ্রীবা।
সিঁথিতে সূর্য ঘষে দাঁড়াই অধীর! কাহাকে প্রত্যাখ্যান করি আমি? সেই-ই তবে আসে। সে
হাতের ভিতর নখ গুজে রাখে! বিছন ছড়িয়ে পড়ে ডোবার পানিতে। ওরা ঠিক মাছ হবে
মাছ...



নাকছাবি
১৩০৬০৯

বালিশের ওপারে গোপনে সরিয়ে রাখি তৃষা। অন্ধকারের করতলে ধরে রাখি গোপন।
কেউ পথ ভেঙে এলে দরজায় শেষ হয়। দরজা বন্ধ আছে। চাবি কারো কাছে নেই।
আমার নাকে দুলে নাকছাবি। আমি বালিশের ওপারে সরিয়ে রাখি অমিত ফাল্গুন।


কাপালিকের চোখের রঙ
১০০৬০৯

তোমরা জল শব্দটিকে নষ্ট করে ফেলেছো। আমি এই শব্দটিকে বানিয়ে দিলাম নদী আর
সমুদ্র। একটি তোমাদের বিদীর্ণ করবে, অন্যটি করবে প্লাবিত। তোমরা সাপ শব্দটিকে নষ্ট
করে ফেলেছো। সাপের বিষ হরণ করে বানিয়ে দিয়েছো বৃহন্নলা। এখন সাপ দেখলে আর
ভয় লাগে না, মায়া হয়। আমি তাই সাপকে লম্বালম্বি চিরে দুইফালি করেছি। একফালি
আমার চুলের ফিতা। আর ফালিতে দোপাটি, বুক ঢেকে রাখে অযত্নে। তারপর দেখো,
আমি কাপালিকের চোখ থেকে রঙ কেড়ে দুপায়ে পরেছি আলতা। এই আলতায় লেখা আছে
শিশু আর নারীহত্যার ইতিহাস। তোমরা আলতা শব্দটিকে নষ্ট করো না।


আমার জ্বর আসছে
০৭১২০৯

আমার জ্বর আসছে, গন্ধর্ব। আঁচলের ভাঁজ ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে রাত্রিজাগা অরণ্য। একটি
সুখফলা পাতা আমাকে না বলে ঝরে পড়ছে বনে। তোমার উরুর ভিতর রঙহীন পাথর
আমাকে মুছে দিতে বলে স্বেদের উত্তাপ। নৌকো যেমন, মাছ যেমন করাত হয়ে চিরে চলে
নদী...। গন্ধর্ব, তুমি কবন্ধ ঘুম হয়ে কেবল উড়ে বেড়াও। চাঁদ ধসে পড়ে, চাঁদের বোঁটায়
জামের গন্ধ, জোছনা গাঢ় বেগুনি ও বিকৃত। থেতলে যাওয়া বুকে ফাটলের চিহ্ন অবশেষ।
আমার শাদা শাড়িতে লেপে আছে একফোঁটা রামধনু। আমার শাদা সিঁথি খালিপায়ে হেঁটে
চলে যাবে দিগন্তের দিকে...। গন্ধর্ব, আমার জ্বর আসছে, জ্বর।



পাগলের বিষ
২০০৫০৯

বিছিয়ে রেখেছি শোক ধনেপাতায় আলতাপত্রে; তোমাদের গ্রামে ধসে যে নাভীশ্বাস-- আমি
এসেছি প্রত্যাগত ভাদ্রের উদাস পিঠে। আমার জরির চিহ্ন লুকিয়ে রাখি নি, দেখো; কেবল
শাদা প্লাবনে জড়িয়েছি দুপুর, তারপরে খুন করেছি সূর্য। তবু বুঝো নি উপত্যকায় কাঁপছে
পাগলের বিষ।