যে-প্রভাব মূলের অধিক
রাজু আলাউদ্দিন , রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১২


রাজু আলাউদ্দিন কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। ১৯৬৫ সালের ৬ মে শরিয়তপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম-এ কাজ করছেন। দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখার পাশাপাশি ইংরেজি ও স্প্যানীশ থেকে প্রচুর অনুবাদ করেছেন। প্রকাশিত অনুবাদ গ্রন্থ : গেয়র্গ ট্রাকলের কবিতা (মঙ্গলসন্ধ্যা), টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা (বাংলা একাডেমী), সি. পি. কাভাফির কবিতা (শিল্পতরু প্রকাশনী), কথোপকথন (বাংলা একাডেমী), সাক্ষাতকার (দিব্যপ্রকাশ), খ্যাতিমানদের মজারকাণ্ড (মাওলা ব্রাদার্স), নির্বাচিত বোর্হেস (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ৫ খণ্ড, সম্পাদনা) বোর্হেসের আত্মজীবনী (সংহতি প্রকাশনী, সহ-অনুবাদক), আলাপচারিতা (পাঠকসমাবেশ, গৃহীত সাক্ষাতকার)


...................................
রাজু আলাউদ্দিনের প্রবন্ধ
...................................


‘প্রভাব’ শব্দটি নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা অস্বস্তি সব সময়ই কাজ করে। কারণ শব্দটিকে আমরা সদর্থে বিবেচনা করি না । কখনো কখনো হয় হেয় কিংবা অন্যদিকে, পরাক্রান্ত হিসেবে দেখাবার জন্য আড্ডায় আলোচনায় আমরা হামেশাই বলে থাকি ‌'ওমুক লেখক তমুককে প্রভাবিত করেছে' বা 'ওমুক লেখক তমুকের দ্বারা প্রভাবিত'।

এইভাবে দেখানোর মধ্যে দোষের কিছু নেই। কারণ প্রভাবিত হওয়া এবং প্রভাবিত করা শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ এমন কোন মৌলিক লেখক বা শিল্পী নেই যিনি কোন না কোনভাবে তার পূর্বসূরীদের দ্বারা প্রভাবিত নন। আবার এমন কোন প্রভাবিত গৌণ লেখকও নেই যিনি কোন না কোনভাবে মৌলিক নন। মৌলিক হওয়া এবং প্রভাবিত হওয়া সব শিল্পী ও লেখকের এক অনিবার্য নিয়তি।

লেখালেখির শুরুর দিকে আমার এক সহযাত্রী বন্ধুর কাছে একদিন আড্ডার মধ্যে জানতে চেয়েছিলাম ইদানীং কী পড়ছেন। তিনি বললেন, আমি খুব কম পড়ি বা পড়িই না বলা যায়। কারণ পড়লে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা। উত্তর শুনে আমি না হেসে পারি নি। যদিও তিনি ঠিকই বলেছেন, কারণ যা কিছুই পাঠ করুন না কেন তার প্রভাবতো পড়বেই কোন না কোনভাবে লেখার প্রকাশ্য বা পরোক্ষ কোন স্তরে গিয়ে। কিন্তু তিনি যেটা বোঝেন নি তা হলো কোন প্রভাবই মৌলিকতার জন্য অন্তরায় হতে পারে না। আমি বরং সন্দেহ করবো এমন কোন লেখক বা শিল্পীকে যিনি শতভাগ মৌলিক বলে পরিচিত হয়ে উঠতে চান। আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন যিনি প্রভাবিত নন বরং পুরোপুরি মৌলিক বলতে পারলে শ্লাঘাবোধ করবেন।

কিন্তু আমি শ্লাঘাবোধ করবো বরং উল্টোটা বলতে পারলে। কারণ প্রত্যেক লেখকই তা সে যত গৌণই হন না কেন--বোর্হেসের সেই অমোচনীয় উক্তির প্রতিধ্বনি করে বলা যায়-- “সৃষ্টি করেন তার পূর্বসূরী।” প্রভাব কোন লেখককে গৌণ করে না, গৌণ হন তখনই যখন তিনি প্রভাব থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাড় করতে ব্যর্থ হন বা প্রভাবকে সৃষ্টিতে রূপান্তরিত করতে পারেন না।

অগ্রজ লেখকদের সাথে সম্পর্কের সূত্রে বোর্হেসীয় এই ধারণার একটি পূর্বধ্বনি বা সমধ্বনি (প্রতিধ্বনি নয়) হঠাৎ সেদিন লক্ষ্য করলাম ভূমেন্দ্র গুহের লেখা আলেখ্য: জীবনানন্দ নামক বইটিতে। জীবনানন্দের কাছে জীবনানন্দের কবিতার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন যে “তাঁর কাব্যের সঙ্গে শেলী কীটস্ হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস-রিলকে এলিয়ট পেরিয় ডিলান টমাস পর্যন্ত কবিদের কবিতার আত্মীয়তা।” এই ব্যাখ্যা জীবনানন্দের মধ্যে খানিকটা অস্বস্তি ছড়িয়ে দিয়েছিলো। জীবনানন্দ কি ভাবছিলেন যে সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁকে প্রভাবিত বলে ভুল করেছেন? সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পরবর্তী উক্তিটি ছিলো বিপরীত স্রোতের সেই অভ্রান্ত কিন্তু দুর্লভ উপলদ্ধি যা একই সঙ্গে ভ্রান্তিমোচন ও স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলো জীবনানন্দের মধ্যেঃ “আপনি এদের বংশপরম্পরার, এরা আপনার উত্তরাধিকার; আমি ভাই বলতে চাইছি।” বোর্হেসের মতোই ঠিক বিপরীত দিক থেকে সম্পর্কের অনিবার্যতাকে আবিষ্কার করে পূর্বসূরী নয়, বলেছিলেন “এঁরা আপনার উত্তারাধিকার।” জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার সাথে অ্যালান পো-এর ’To Helen’ কবিতার সম্পর্কের কথা অনেকেই বলেছেন, সত্য বটে, অনেক সাযুজ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু যেটি আরও বেশি সত্য তাহলো এই সাযুজ্য, জীবনানন্দের ক্ষেত্রে কাজ করেছে স্বাতন্ত্র্যের উপায় হিসেবে যে স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করে তুলেছে মৌলিকতাকে।

শুধু দূরের বা ভিন্ন ভাষারই নয় এমনকি নিজ ভাষার কবিকুল নজরুল, মোহিতলাল ও সত্যেন দত্ত থেকে শুরু করে একেবারে সমসাময়িক সতীর্থ অচিন্ত্য সেনগুপ্তের কোন কোন কবিতার চূর্ণ বিশেষ উদ্দীপক হয়ে উঠেছিল জীবনানন্দের নিজস্বতার উন্মীলনে।

অচিন্ত্য সেনগুপ্ত যখন বলেনঃ
“কীটের পাখার অস্ফুটতম বেদনা আমারে হানে।”
সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যাবে জীবনানন্দেরঃ
”কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে আমি সে বেদনা পাই।”

কিন্তু এই সাযুজ্যের অজুহাতে আজ আর কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয় যে দুজন একই ধারায় কবি। কারণ দু’জনের প্রবণতার মৌলিকতা বা স্বাতন্ত্র্য এতই প্রকট যে তা আমরা সহজেই বুঝে ফেলতে পারি।

রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার মহান লেখক যার উপর দেশী বিদেশী নানা তরঙ্গ তার প্রতিভাকে উত্তাল করে তুলেছিলো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রকাশের স্বাতন্ত্র্যকে তা ব্যাহত তো করেই নি বরং তার স্বাতন্ত্র্যকে আরও বেশি নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিলো। চর্ষাপদের কবি থেকে ইষৎ অগ্রজ বিহারীলাল পর্যন্ত ছিলো প্রভাবের অন্তহীন ঘুরানো সিঁড়ি বা কোন সর্তকতা ছাড়াই তিনি মাড়িয়ে গেছেন স্বাতন্ত্র্যের উর্ধ্বলোকে। চর্যাপদের কবি কামলি’রঃ
“সোনে ভরিলী করুনা নাবী।
রূপা থোই নাহিকে ঠাবী।”

এই স্বর্ণোজ্জল পংক্তির মুখোমুখি হ্ওয়া মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের সুপরিচিত ’সোনার তরী’ কবিতার পংক্তিগুলোঃ
“ঠাই নাই ঠাই ছোট সে তরী
আমারই সোনার ধানে গিয়েছে ভরি”

আমাদের অনুভূতি সাদৃশ্যের এই সেতুর উপর দাঁড়িয়ে শিহরিত ও রোমাঞ্চিত বোধ করতে পারে কিন্তু একথা বলা যাবে না যে এই প্রভাব রবীন্দ্রনাথের স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ন করেছে। করেনি যে তাঁর কারণ দু’জনের পরিপ্রেক্ষিত ও অভিপ্রায় ভিন্ন আয়োজনের স্মারক হয়ে উঠেছে।

বোর্হেসের উপর অন্যদের প্রভাব এবং তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের সূত্রে ফরাসী সাহিত্য সমালোচক আঁদ্রে মারোয়া বলেছিলেন যে “বিশুদ্ধ এবং পান্তিত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বর্ণিত এই আবিষ্কারসমূহ যার নিশ্চিত যোগসূত্র রয়েছে অ্যালান পোর সাথে ‘যিনি জন্ম দিয়েছেন বোদলেয়ারের, যে-বোদলেয়ার জন্ম দিয়েছেন মালার্মের, যে-মালার্মে জন্ম দিয়েছেন ভালেরীর’, যে-ভালেরী জন্ম দিয়েছেন বোর্হেসের। ‘প্রেমে পড়া মানে এমন এক ধর্ম তৈরি করা যার ইশ্বর হবে নশ্বর।’ পুঞ্জীভূত খুঁতের মাধ্যমে, তিনি কখনো কখনো ফ্লবেয়ারকে স্মারণ করিয়ে দেন; বিরল বিশেষণের কারণে সাঁ ঝ পের্স-এর কথা মনে পড়ে যায়। ‘পাখির করুন ক্রন্দন।’ কিন্তু এইসব সম্পর্কের উল্লেখ সত্ত্বেও, এটা অবশ্যই বলা সম্ভব, বোর্হেসের শৈলী তার ভাবনার মতোই অত্যন্ত মৌলিক।”

পর্তুগীজ ভাষার অগ্রগন্য লেখক একা দে কেইরোজ-এর কথা অনেকেই জানেন। পর্তুগীজ কথাসাহিত্যের মুক্তিদাতা কেইরোজ ফরাসী ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়ার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। মার্কিন সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম তার Genuis গ্রন্থে এই প্রভাবের কথা আরও বিষদভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু অন্ধ বোর্হেস আমাদেরকে অবাক করে দেন, যখন তার অন্তদৃষ্টির নির্ভুল আলো দিয়ে আমাদের বিবেচনাকে বিভ্রান্তির হাত থেকে মুক্ত করেন এইভাবেঃ

'In Flaubert’s case, the influence on Eca de queiroz is evident. And I believe that O Primo Bazilio (cousin Bazilio) is quite superior to Madame Bovary although evidently it is based on Madame Bovary.'
(Seven conversations with Jorge Luis Borges by Fernando Sorrentino, Tras: clark M. Zlotchew, New York, P-41)


মাদাম বোভারির শ্রেষ্টত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন সংশয় নেই। কিন্তু মাদাম বোভারির অনুষঙ্গ, সংবেদ ও সংশয়কে ভিত্তি করে অন্যভাষায় অন্য এক প্রতিভাবানের দ্বারা তারও চেয়ে যে অতিরিক্ত কিছু গড়ে উঠতে পারে তা কেইরোজ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে কারণ পাঠ, বিশেষ করে প্রতিভাবানের সৃষ্টিশীল পাঠ নিশ্চিত করে তোলে রুপান্তরের। আমরা কি দেখিনি লুসিয়াস এপুলিয়াস-এর Golden Ass কিভাবে কাফকার Metamorphosis- এর জন্মকে নিশ্চিত করে তুলেছিলো আরও বেশি প্রভাবক হিসেবে? এই ধারার আরেক পরাক্রান্ত নজীর আমরা স্প্যানীশ ভাষায়, হয়তো গোটা পৃথিবীতেই, প্রথম উপন্যাস সংক্ষেপে দন কিহোতের বেলাতেই দেখতে পাবো।

কিহোতেকে কী উদ্ধুদ্ধ করেছিলো অবাস্তব ও ছন্নছাড়া রোমাঞ্চকর সব অভিযানে? এক কথায় পাঠ। মধ্যযুগের বীর বিষয়ক পুঁথিগুলো তাকে পাগল করে তুলেছিলো। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না এই দন কিহোতে সের্বান্তেসেরই মুখোশে লেখকের অল্টার ইগো। কী পড়েছিলেন দন কিহোতে, মানে সের্বান্তেস? পড়েছিলেন ফরাসী লেখক জিওফ্রেই দে চার্নির লেখা Livre de chevalerie, ১৩৫০ সালের দিকে লেখা। অনামা লেখকের স্প্যানীশ শিভালরিক রোমান্স Amadis de Gaula যা প্রকাশিত হয়েছিলো ১৫০৮ সালে। পড়েছিলেন প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত অর্থাৎ ১৪৯০ সালে কাতালান ভাষায় লেখা ভালেন্সিয়ার হোয়ানত মার্তোরেল -এর Tirant lo Blanch নামের আরেক বীরত্বগাথা। বাদ যায়নি ১৫৪০ থেকে ১৫৪৬ সালে পর্তুগীজ ভাষায় লেখা ফ্রান্সিসকো দে মোরায়েস কাব্রালের Palmerin d’Angleterre নামক রোমান্সটিও। সের্বান্তেসের ক্ষেত্রে এইসব পাঠের সামগ্রিক প্রভাবটি ছিলো এক বিপুল ও বিস্ময়কর বিস্ফোরণের মতো। পূর্বসূরী এই লেখকদের চূর্ণ বিচূর্ণ নিয়ে যে দন কিহোতে গড়ে উঠেছে তার স্পন্দন ও অভিপ্রায় পুরোপুরি ভিন্ন হয়ে গেছে। সেকালের বীরত্বগাখাগুলোর প্রতি মিহি বিদ্রুপ আর চিরায়ু শিল্পকৌশলের মাধ্যমে এতটাই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র্য যে দোন কিহোতের মৌলিকতার কাছে ঐ প্রভাব-সঞ্চারী উদ্দীপক মূল বইগুলো আজ হয়ে পড়েছে গৌণ।

free counters