রওশন আরা মুক্তার ৪টি কবিতা
র ও শ ন আ রা মু ক্তা, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১২


রওশন আরা মুক্তার জন্ম ১২ এপ্রিল ১৯৮৮। বাবার চাকরি সূত্রে পরিবার তখন জামালপুর জেলায় বসবাস করছিল। জন্মস্থানে আর ফিরে যেতে পারেন নাই। বাবার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় থানায় কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। মোট দশটি স্কুলে পড়েছেন ক্লাস ওয়ান থেকে টেন। অনলাইন আর কাগজে প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কিছু কবিতা।


কবিতা ভাবনা

কবিতা ভাবনা কী বস্তু বুঝি না। তবে একটা বিষয় প্রায়ই মনে হয়, পাঠকদের ঠিক কতটুকু আর কী জ্ঞান-গরীমা থাকা উচিত কবিতা পড়ার জন্য এই বিষয়ক কোনো নোট বই আমাদের কবি সমাজ ছাড়লে বোধহয় পাঠকদের সাম্প্রতিক কবিতা পড়ার সম্যক জ্ঞান লব্ধ করার ঐশী সুযোগ হইবেক। কারন, এই কবিতা পাঠক না বুঝে— না পাঠক পড়ে। আমাদের এই কবিতাযজ্ঞে পাঠকদের জড়িত করার ইহা একটি উপায় হতে পারে।


.........................................
রওশন আরা মুক্তার ৪টি কবিতা
.........................................


বরফ-জনম

আমরা দু’জন আজ এক প্রাণ আমাদের এই বরফ-জনমে
আমাদের এই পরিমিত মনে জন্মায় দ্বিধা নানান প্রকার,
আমাদের এই সহবাস কেন, মিলন না কেন! কেন দাঁতে দাঁত!
এ বরফ-যুগে সুন্দর করে ঘষা-মাজা-সাজা ছেলেমেয়েগুলো,
কেন খোঁজে বলো প্রেম-মাধুর্য? এই হিমযুগে প্রেম! কেন প্রেম কেন!
হায় কী তোহফা পেলাম আমরা! বিশ্ব উষ্ণ— তাই প্রেম হিম।

আমি ছিলাম যে বিনাশী আগুন, পুড়িয়েছিলাম তোমার বরফ
তুমি গলেছিলে, কিন্তু তোমার বরফায়নের দামামায় আমি
গলিয়েছি যত, পুড়িয়েছি যত, তারচেয়ে বেশি তাপ খুইয়েছি
তারচেয়ে বেশি বরফ হয়েছি, ঝরে ঝরে গেছি মেঘজাত শিলা!
আমার ধারণা তার নিচে কোনো তরল ছিল না, তোমার বরফ
ফঙ্গবেনে না গলল না তাই, প্লুত হলই না চারপাশ শেষে।

কুপিয়েছি আমি, গর্ত খুঁড়েছি পানি পাই নাই, চৈত্র ছিল না।
ঘুটঘুটে কালো তার মাঝে আমি ছুটেছি চাকর, পেয়েছিলাম কী?
সিমেন্ট বালির মিশেল শাপলা। পেয়েছিলাম কী? পঙ্গু দোয়েল।
আমি ঘুঁটে খুঁজি অথচ গরুই পাওয়া গেল না! জ্বালাব বৃক্ষ
বন আর বন! কাটো আরো কাটো! ইটভাঁটা জ্বালি আমাদের মনে,
যেহেতু আগুন জ্বলতেই হবে, পুড়তেই হবে, পোড়াতেই হবে।

আমি চাইতাম রোষানল গতি, চারপাশে আমি তা দেখেছিলাম,
কী করে ছুটছে সকল বিদেশ, ধোঁয়া ছেড়ে ছেড়ে, আমি চাইতাম
সেই গতি হোক আমার আপন, সেই গতি পেতে পুচ্ছ খুলেছি,
আমি না বুঝেই মাছরাঙা-নীল মুছেছি যতনে; গতির সঙ্গী
রক মিউজিক আমি কানে-তালা— বধির হয়েছি মূক হয়ে গেছি।
কেরাঞ্চি আঁকা মিউজিয়ামের দেয়ালে দেয়ালে বাইরে শকট।

কী ক্ষতি হত হে! যদি থাকতাম লেপটে ঊষায়, যদি থাকতাম
তোমার খামারে; আমাদের ক্ষেতে ফলনে ফসলে যবের হাসিতে!
ধানের ক্ষেতের অল্প পানিতে মাছ হয়ে যদি ভাসতাম! তাতে
কী অভাব ছিল? বৃষ্টি হত না? গাছের পাতা কি দুলত না প্রিয়?
পুকুর শুকালে তার শাদ্বলে শুয়ে থাকতাম জড়াজড়ি করে,
বৃষ্টি ঝরত ... আহা যদি হত! এমন সবুজ! এমন জনম!

ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেল আমার আগুন; হিমবাহ হল, কেননা জামানা
আমার জন্য উপায় রাখেনি, সোনাদানা-মোহ আমাকে ছাড়েনি।
আমরা ক্রমেই দূরে সরে যাই দুই হিমগিরি দূরে আরো দূরে...
ধীরে ধীরে, সেই হাবল-সূত্রে, হেন দাবদাহে বরফের এই
সংসার যেন সিল-চিৎকার, তারা-ভরা রাতে দুই মেরুবাসী।
সবুজ ঘরেতে খালি ঘাম নয়— রাশি রাশি হিম জমে আজকাল।

২৮/০৪/২০১২


কাজলগলা-অপরাধ


এর চেয়ে পেশাদার খুনিরা বোধ হয় ভাল হয়,
যেহেতু খুন করা তাঁদের রুটিরুজি-ডালভাত
যেহেতু তাঁরা খুনি কুকুর পায় পানি— পিপাসায়
মুখোশধারী কবি আমি যে পাপী-খুনি ওগো নাথ!

করো গো ক্ষমা প্রভু, দাও গো পায়ে ঠাই ঈশ্বর!
নিয়ো না তুলে ওই সোনার আলো-ছড়ি অবেলায়
বাকি যে রয়ে গেল একটা ইতিহাস অগ্নির,
ছাইয়ে যে ঢেকে যায় আমার দাবানল— নিভে যায়!

যে তুমি শুনেছিলে আমার হৃদয়টা মসলিন
যে তুমি ছুঁয়েছিলে আমার হৃদয়টা ঘষাকাচ,
একটু আঁচে পোড়ে, একটু চোটে ভাঙে দিনমান!
তুমি তো জানো প্রভু, জানে না দ্রৌপদীর স্বামী-পাঁচ।

তোমারে ভজিয়াছি জেনে নিয়ো গো প্রিয় প্রাননাথ ,
কাজল গলে গেছে এ কালি যে আমারই অপরাধ;
করো গো ক্ষমা প্রভু, দাও গো পায়ে ঠাঁই ঈশ্বর!
নিয়ো না তুলে ওই সোনার আলো-ছড়ি ওগো বর!
২৮/০৫/২০১২


ফায়ার অ্যালার্ম


পাব না তোমাকে কি? ও তুমি চুম্বক পাহাড়,আমি লোহা।
সামনে প্যাঁচানো যে কাঠের সিঁড়ি তার প্রতিটি পাটাতন
মুক্ত। এক থেকে আরেক ধাপে যাই যখন, মাঝে মাঝে
এদের ব্যবধানে নজর চলে যায়, নিচেই ফুটে-ফুঁসে
উঠছে লাভা-দীঘি।কমলা হুতাশন ছটায় লাল লাল
আমার নাক চোখ, নাকি গো কাঁদি আমি? কেঁদেই লিখিয়েছি
চক্ষু ডাক্তার-কলমে— ব্যবস্থাপত্র? নিষ্প্রাণ
তুমি তা কী করে বা জানবে! আছি আমি সিঁড়ির মাঝপথে।
হঠাৎ ফেলে আসা সোপান গুলো দেখি;আমি তো লড়ে গেছি,
পলকহীন আঁখি আমার মঞ্জিল হিসেবে তোমাকেই
দেখেছে। আজ কেন আমার নভোযান কাঁপছে থর থর!
আকাশে থাকো তুমি, মাধ্যাকর্ষণ ছেদন-কালে,হাল
সবার এরকমই হয়তো হয়, যেন নিজের ওজনেই
পতিত হবে, হবে চূর্ণ-চূর্ণ! এ গলিত পাথরেই
ডুবে কি যাবে এই প্রাণের আকুলতা? আমার চুলে সরু
আঙুল পাব না কি তোমার? আর কত মূল্য তুমি চাও?
কান্না, কন্যার— পাথর-বাঁধা বুক আমার— আর যত
স্বপ্ন দিনরাত দেখেছি— উঁচুতম পাহাড়ে যাব ,পাব
তোমাকে লালফিতা-জড়ানো তুমি মুঠি-মধ্যে; কালো টুপি-
গাউন পরে কোলে তুলব তোমাকে, ও আমার চাঁদ সোনা!
আসবে? হবে তুমি? সনদ পত্র হে... হবে না গো আমার?
২৮/০১/১২


কপিয়াল


মার্কেট হইছে যে এইবেলা হাট
হইতেছে বড় বড় কবিতার পাঠ

নীল-সাদা মাঠে হয় কবিয়াল-রতি
নবীনায় বিলি করে কালো রাতেজ্যোতি

হাটওয়ালা জ্বলে যায় কপিবর ডাকে
ভাবওয়ালা ঠোঁট বাঁকা কচু-গাছশাখে

এক হাট দুই ভাব মিল মিশ নাই
গঞ্জের ধুলাবালি মোরা কনে যাই!

১৯/০৫/২০১২