জেফরি আর্চারের 'দি ইলেভেন্থ কমান্ডমেন্ট'
আবিদুল ইসলাম, শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১২


জেফরি আর্চারের পরিচয় মূলত একজন থ্রিলার লেখক হিসাবে। সারাবিশ্বে তার লেখা বইয়ের প্রচুর জনপ্রিয়তা এবং কাটতি রয়েছে। এর বাইরে তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় তিনি একজন প্রাক্তন বৃটিশ রাজনীতিক এবং এমপি- ইংল্যান্ডের টোরি পার্টির। আর্চারের বইয়ের আলোচনায় এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

জেফরি আর্চারের 'দি ইলেভেন্থ কমান্ডমেন্ট' উপন্যাসটি বেরোয় ১৯৯৮ সালে। থ্রিলার হিসেবে এটা কোন দরের এই প্রশ্নের মধ্যে যদি আমরা যাই তাহলে বলতে হয় অন্যান্য বইয়ে তার গল্প বলার যে অদ্ভুত রকমের মুনশিয়ানার দেখা পাওয়া যায় সেটা বিবেচনায় নিলে বর্তমান বইটা অত্যন্ত সাধারণ মানের একটা উপন্যাস। ঘটনা-পরম্পরায় গোঁজামিল, কাহিনীর অসামঞ্জস্য, উদ্ভট সমাপ্তি থেকে নিয়ে এর গঠনগত অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যা লক্ষ করা যায় তাতে একে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রগুলোর কাছাকাছি স্তরের ধরে নেয়া যেতে পারে। উপন্যাসটির মান বিষয়ে তার ঘরানার সমালোচকেরা লেখালিখি করেছেন। সেটা তারা করবেনই। কিন্তু আমার বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য এই থ্রিলারের মান কিংবা রচনাশৈলী নয়। লেখক যে বক্তব্য এবং মতবাদ এর মাধ্যমে পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তার তাৎপর্য বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

উপন্যাসের মূল চরিত্র কনর ফিটজেরাল্ড, ভিয়েতনাম যুদ্ধফেরত সাবেক সৈনিক, সিআইএর একজন হিটম্যান। তাকে চরিত্রায়িত করা হয়েছে একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি হিসেবে, যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির নির্দেশে বিভিন্ন দেশের মার্কিন-বিরোধী নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে থাকে। এই কাজকে সে মনে করে একটি পবিত্র কর্তব্য; নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের একজন সুরক্ষক হিসেবে তার মনে হয়। উপন্যাসের প্রথমেই দেখা যায় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এক ব্যক্তিকে সাফল্যের সাথে হত্যা করে সে দেশে ফেরে। এই কাজ সে করে সিআইএর পরিচালকের কাছ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে। যদিও তার ধারণা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেই মূলত এই নির্দেশ এসেছে। কিন্তু সিআইএ পরিচালক হেলেন ডেক্সটার নিজের গরজেই এই কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের 'নিষ্পাপ' রাষ্ট্রপ্রধান এ বিষয়ে কিছুই জানেন না! কী কারণে এবং কোন উদ্দেশ্যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিআইএ পরিচালকের মতো একজন সরকারি চাকুরে মার্কিন রাষ্ট্রপতি অথবা প্রশাসনের উচ্চস্তরের কোনো ব্যক্তিকেই অবহিত না করে এ কাজ করে তার কোনো জবাব এ বইয়ে নেই।

ফিটজেরাল্ড দেশে ফিরে জীবনের স্থিতির জন্য এই চাকরি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, অন্যান্য জায়গায় যোগাযোগ করে নতুন চাকরি সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার বস এটা হতে দেবে না। তার পরিকল্পনা অন্য; রাশিয়ার নব্য কমিউনিস্ট নেতা জেরিমস্কিকে হত্যা করা। জেরিমস্কি রাশিয়ার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। পশ্চিমাপন্থী প্রেসিডেন্ট জনসমর্থনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও জেরিমস্কি খুব একটা পিছিয়ে নেই। এই লোকটা ভয়াবহ রকমের ধুরন্দর, অসহিষ্ণু, অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিস্ট চরিত্রের এক ব্যক্তি। ‘‌হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল, দিলখোলা, সরল মনে'র মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিপরীতে ভয়ঙ্কর কুটিল, চক্রান্তকারী টাইপের লোক এই জেরিমস্কি। তার প্ল্যান হলো একবার কোনোমতে নির্বাচনে জিততে পারলেই রাশিয়ায় নির্বাচনী ব্যবস্থা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করে দিয়ে আজীবন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা। পাঠকমনে আসন্ন হত্যাকাণ্ডের প্রতি মানসিক সম্মতির ক্ষেত্র সৃষ্টিই এহেন চরিত্রায়নের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। আর্চারের বিভিন্ন উপন্যাসেই কমিউনিস্ট চরিত্রগুলো এভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তার 'কেন অ্যান্ড আবেল' উপন্যাসটি গুণগতমানের দিক থেকে নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য- এবং তার কাহিনীও অসাধারণ; কিন্তু সেখানেও নির্জলা মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার কমিউনিস্ট রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অত্যন্ত কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একদিকে কমিউনিস্ট-বিদ্বেষ আরেক দিকে মার্কিন-প্রীতি আর্চারের বেশ ভয়াবহ রকমের। 'কেন অ্যান্ড আবেল' উপন্যাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সেই দেশ, যেখানে ইমিগ্র্যান্ট হওয়ার অর্থ হলো স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, যেখানকার অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চমৎকারিত্ব বহির্বিশ্বের মানুষের কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার। ঐ উপন্যাসে আরেকটা বিষয় বেশ লক্ষ করার মতো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশে শেষ পর্যায়ে এসে উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সেখানে আছে, জাপানি বিমান বাহিনীর পার্ল হারবার আক্রমণ থেকে শুরু করে কিছুই বাদ যায় নি। কিন্তু মার্কিন বাহিনী কর্তৃক হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা চালিয়ে বিগত শতাব্দের জঘন্যতম গণহত্যার সংঘটিত করার বিষয়ে একটি বাক্যও ব্যবহৃত হয় নি সেখানে। একজন লেখক হিসেবে তার মানসিক অসততার বিষয়টি পাঠকদের কাছে আর অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। তবে বর্তমান নিবন্ধের পাঠকদেরকে জেফরি আর্চারের রাজনৈতিক পরিচিতিটা আরেকবার স্মরণ করে নিতে বলি।

যা-ই হোক, ফিটজেরাল্ডকে রাশিয়া অভিযানে প্রাথমিকভাবে রাজি করানো যায় না, চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে অন্য জায়গায় কর্মসংস্থানের চেষ্টা চালাতে থাকে। এক প্রতিষ্ঠানের সাথে মোটামুটি পাকা কথাও হয়। কিন্তু ডেক্সটার লোক মারফত সুকৌশলে সেই চুক্তি বরবাদ করে দ্যায়। ফিটজেরাল্ডকে এই অভিযানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাকে জানানো হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বয়ং এই অপারেশনে ফিটজেরাল্ডকে অ্যাকশনে দেখতে চান। প্রত্যুত্তরে ফিটজেরাল্ড এর হাতেনাতে প্রমাণ দাবি করে। তখন ডেক্সটার এবং তার সহকারী এক প্রযুক্তিবিদের সাহায্য নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তৃতা থেকে শব্দ বাছাই করে একটা কৃত্রিম কথোপকথন তৈরি করে, কথোপকথনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফিটজেরাল্ডের সম্ভাব্য বক্তব্য আন্দাজ করে নিয়ে সেভাবে প্রতিবক্তব্যগুলো সাজানো হয়। এই পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন যতোই শিশুসুলভ ও হাস্যকর মনে হোক না কেন, সুদক্ষ হত্যাকারী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে এই সাজানো টেলিফোন-কথোপকথনের মাধ্যম সহজেই ধোঁকায় ফেলে রাশিয়ায় পাঠাতে সক্ষম হয় তারা। ফিটজেরাল্ডও মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ‘সরাসরি’ নির্দেশ লাভ করে দুই হাত বুক ফুলিয়ে রাশিয়ায় উপস্থিত হয় এবং তারই বসের প্রতি-চক্রান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে ব্যর্থ হয়। উপন্যাসের এই পর্যায়ে দেখা যায় যে জেরিমস্কিকে হত্যার জন্য ফিটজেরাল্ডকে পাঠানো পুরোটাই ছিল একটা চাল। মূল উদ্দেশ্য নায়ককে নিকেশ করা। বেঁচে থাকলে কোনোদিন যদি সে এই গোপন অভিযানসমূহের কথা কোথাও ফাঁস করে দ্যায় তাহলে পরিচালক ম্যাডাম প্রেসিডেন্টের কাছে ধরা খেয়ে যাবেন! যা-ই হোক, বিচারে একদিকে যেমন ফিটজেরাল্ডের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়, অপরপক্ষে নির্বাচনকে সামনে রেখে হত্যাপ্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ায় জেরিমস্কির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়- তৎকালীন মার্কিন-বান্ধব ক্ষমতাসীনকে হটিয়ে সে-ই ক্ষমতার রাজদণ্ড ধারণ করে। এ সময় এগিয়ে আসে ফিটজেরাল্ডের এক পুরোনো বন্ধু, যাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ফিটজেরাল্ড একবার বাঁচিয়েছিল- ষড়যন্ত্র আঁচ করে এবং প্রেসিডেন্টের এক কর্মচারীর কাছ থেকে গোপন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সে ফিটজেরাল্ডের পিছু নিয়েছিল আগেই। নিজের জীবনের বিনিময়ে সে ফিটজেরাল্ডের প্রাণ রক্ষা করে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটিই এখানে যেভাবে হাস্যকর ও দায়সারাভাবে লেখা হয়েছে তাতে এটি যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন থ্রিলার লেখকের রচনা সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। যা-ই হোক, আগেই বলেছি উপন্যাসের গুণগতমানের বিশ্লেষণ বর্তমান রচনার পরিধি নয়, সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হলো।প্রাণে বেঁচে গিয়ে ফিটজেরাল্ড দেশে ফিরে আসে পরিচয় গোপন করে, বসের সমস্ত চক্রান্ত সে বুঝতে পারে। প্রেসিডেন্টের টেলিফোন কলটিও এখন তার কাছে ভুয়া হিসেবে প্রতীয়মান হয়। জেরিমস্কি যুক্তরাষ্ট্র সফরে এলে দ্বিতীয়বার তার প্রাণনাশের জন্য পরিকল্পনা করে। এরই মধ্যে স্ত্রী, কন্যা এবং কন্যার অস্ট্রেলিয়ান প্রেমিককে অত্যন্ত কৌশলে হিতার্থীদের সহায়তায় অপহরণ করে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দ্যায় নিরাপত্তার খাতিরে। ম্যারিল্যান্ডের বেসবল স্টেডিয়ামে জেরিমস্কিকে হত্যা প্রচেষ্টা চালিয়ে সে গুলিবিদ্ধ হয় এবং আহত অবস্থায় রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হয় ফিটজেরাল্ড। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে সে সমস্ত চক্রান্ত ফাঁস করে দ্যায় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে, যার ফলশ্রুতিতে 'উদার' এবং 'মহৎ হৃদয়' মার্কিন রাষ্ট্রপতি সিআইএ পরিচালক ডেক্সটার এবং তার সহকারী গুটেনবার্গকে পদত্যাগ করার সুযোগ দ্যান, পরিচালক ভদ্রমহিলা পদত্যাগ করে এক পর্যায়ে বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দান করে রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রেসিডেন্টকে নাকানি-চুবানি খাওয়ায়। ‘মহান’ প্রেসিডেন্ট তাতে কিছুই বলেন না, ডেক্সটারের এতো বড় রাষ্ট্রীয় অপকর্ম এবং প্রতারণার জন্য তাকে কোনো শাস্তি তো দেয়াই হয় না, তার এই কুকার্যের কোনো তথ্যও সরকারিভাবে ফাঁস করা হয় না।

এদিকে ফিটজেরাল্ডকে মৃত বলে ধরে নেয়া হলেও সে আসলে মারা যায় নি! যে হাতে গুলি লেগেছিল সেই হাত কাটা অবস্থায় সে উপস্থিত হয় অস্ট্রেলিয়ায় তার স্বজনদের কাছে উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে। জানা গেল, তার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলেও এটা আসলে করা হয়েছিল তার এবং পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থেই, স্বয়ং প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা-মাফিক!

এই উপন্যাস থেকে আমরা আকাট মূর্খ পাঠক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারি! সেগুলো হলো:

(১) দেশে দেশে মার্কিন-বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিছুই জানেন না। এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
(২) সিআইএ কোনো কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের গরজে বিভিন্ন দেশে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে থাকে।
(৩) যদি সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নির্দেশ আসে তাহলে এভাবে বিদেশি নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা জায়েজ আছে, এবং শুধু জায়েজ নয়- সেটা করা রীতিমতো উচিত কর্তব্য ও দেশপ্রেমমূলক কাজ।
(৪) কমিউনিস্ট নেতারা খারাপ। সকল মার্কিন-বিরোধী রাজনীতিক অগণতন্ত্রী।
(৫) দেশপ্রেমের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে যেকোনো নির্দেশ পেয়ে সেটা অন্ধের মতো পালন করা।

জেফরি আর্চার তার এই উপন্যাসে কনর ফিটজেরাল্ডের চরিত্র অঙ্কন করেছেন একজন যথার্থ দেশপ্রেমিক হিসেবে, যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে একজন বীর সেনা হিসেবে যোগদান করে এবং বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে; এই যুদ্ধ ন্যায় কি অন্যায়, যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী- এসব তার কাছে কোনো মাথা ঘামাবার মতো বিষয় নয়। প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নির্দেশ এলে সে নির্বিকার চিত্তে অন্য একটি দেশে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাতে পারে, এমনকি সেদেশের একজন অন্যতম রাজনৈতিক নেতাকে হত্যাও করে আসতে পারে। যদি তাকে বলা হয় ঐ লোকটা ক্ষমতাসীন হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হবে, সে কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তাকে হত্যা করতে তার সামান্যও হাত কাঁপে না- মনে প্রশ্নের উদয় হয় না যে তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কতোটা ক্ষতি করতে সক্ষম; যদি সক্ষম হয়েও থাকে তেমন কিছু করার পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত প্রমাণ হাতে পাওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা কতোটা নৈতিক এবং যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ কেউ একজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হতে পারে এ ধারণার উদ্ভব হলেই তাকে হত্যা করা যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বিধিসম্মত হয়ে যাবে- এটাই একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের চিন্তা করা উচিত। আবার লক্ষ করা যায়, ফিটজেরাল্ড তার বসের কাছ থেকে প্রথম রাশিয়া-অভিযানের নির্দেশ পেয়ে সে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, পরে তাকে প্রেসিডেন্টের সরাসরি নির্দেশের কথা জানালেও সে সন্দেহ পোষণ করে রাখে, প্রমাণ চায়। এরপর টেলিফোনে প্রেসিডেন্টের সরাসরি নির্দেশ (যদিও পুরোটাই সাজানো) পেয়ে সে এই অভিযানে সম্মত হয়। অর্থাৎ আর সব বিবেচনা বাদ রেখে একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশই তার কাছে শিরোধার্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান যে নির্দেশ দেবেন চোখ-কান বুজে, বিবেকের ঘরে তালা মেরে সে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কেননা মার্কিন রাষ্ট্রপতি সেদেশের প্রধান, তিনি সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং মার্কিন জনগণের স্বার্থের রক্ষক। তিনি কখনো ভুল কিংবা অন্যায় নির্দেশ দিতে পারেন না, তার সকল কর্মতৎপরতা, চিন্তাভাবনা এবং আদেশ-নির্দেশ তো দেশ ও জনগণেরই স্বার্থে! হলিউডের বিভিন্ন চলচ্চিত্রেও মার্কিন রাষ্ট্রনায়কদেরকে বিবিধ উপায়ে মহিমান্বিত করবার খোলাখুলি প্রচেষ্টা বেশ ভালোভাবেই লক্ষ করা যায়।

গণতন্ত্রের পাহারাদার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশাল হৃদয়ের অধিকারী, দিলখোলা, আমুদে, কৌতুকপ্রিয় মানুষ, এবং যিশু খৃস্টের চাইতে অধিক ক্ষমাশীল ব্যক্তি। আর একজন কমিউনিস্ট অথবা মার্কিন-বিরোধী রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা রাজনৈতিক নেতা- সে হলো চক্রান্তকারী, কুটিল প্রকৃতির, অসহিষ্ণু এবং স্থূল চরিত্রের দুষ্ট লোক। প্রচণ্ড রকম স্বার্থপর সে, সঙ্কীর্ণমনা এবং ওয়াদার বরখেলাপকারী। একজন মাফিয়া ডনের চেয়েও নিকৃষ্ট মানসিকতার অধিকারী সে। 'দি ইলেভেন্থ কমান্ডমেন্ট'-এর রাশিয়ান মাফিয়া বসকে জেরিমস্কি হত্যা করায় তারই আপন ভাইপোকে দিয়ে, তাকে নতুন বস হিসেবে অধিষ্ঠিত করার প্রলোভন দেখিয়ে। লোক সম্মুখে প্রচার করে ক্ষমতায় গিয়ে মাফিয়াদের দুষ্টচক্রের বিনাশ সাধন করবে, গোপনে যোগাযোগ রাখে মাফিয়া-ভাইপোটির সাথে, তাকে আশ্বাস দ্যায় ক্ষমতাসীন হলে তাদের নির্বিঘ্নে কাজ-কারবার পরিচালনার সুযোগ দেয়া হবে। আবার কার্যসিদ্ধির পর প্রথম সুযোগেই অজুহাত তৈরি করে হত্যা করা হয় ডন হয়ে উঠবার স্বপ্নে বিচরণরত ভাইপোকে। এছাড়া উপন্যাসের প্রারম্ভে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মার্কিন-বিরোধী রাজনীতিক গুজম্যানও অত্যন্ত অসহিষ্ণু এবং অগণতান্ত্রিক চরিত্রের লোক হিসেবে চিত্রিত হয়েছে- তার দেয়া নির্বাচনীয় ভাষণে মনে হয় কোনো অর্বাচীন বালক ধর্মীয় মৌলবাদী ভাবধারায় উদ্দীপ্ত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজিত ভাষায় গালাগাল করছে।

উপন্যাসটির প্রকাশকাল ১৯৯৮ সাল। এরপর কেটেছে ১৪ বছর। এই ১৪ বছরে বিশ্ববাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র দুনিয়াজুড়ে ‘মানবিক’ আচরণের অজস্র নমুনা প্রত্যক্ষ করেছে। কীভাবে একটি ভিন্ন রাষ্ট্রে জাতীয় সম্পদের ওপর লুটপাট চালানো এবং দেশটিকে করায়ত্তে রাখার জন্য সেখানে সামরিক হামলা চালানো হয়- সেই হামলা চালানোর যথার্থতা সৃষ্টির জন্য অজস্র মিথ্যার পাহাড় তৈরি করে তা চাপিয়ে দেয়া হয় সাধারণ মানুষের ঘাড়ের ওপর মার্কিন প্রধানতম ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রত্যক্ষ পৌরোহিত্যে সেকথা আজ আর অজানা নেই কারো। শুধু সাম্রাজ্যবাদী সামরিক হামলাই নয়, আরো কতোভাবে তারা বিশ্বের, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশ নামে পরিচিত প্রান্তিক ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখে, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থতাড়িত চক্রান্তের বাস্তবায়ন ঘটায় ও অজস্র মিথ্যার সৃষ্টি করে, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী কখনো সরকারি কখনো বিরোধী পক্ষকে সহায়তা করে, আধিপত্যবাদী স্বার্থের অন্তরায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে হত্যা অথবা ক্ষমতাহীন করে- সেটি শুধু গত ১৪ বছরের ইতিহাস নয়। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া- এমনকি ইউরোপের অনেক দেশেও তাদের বহুবিধ অপকর্মের তালিকা কয়েক যুগব্যাপী। সারাবিশ্বেই প্রগতিশীল চিন্তক এবং রাজনৈতিক লোকজন এ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন ও সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন অনেকদিন থেকে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এবং তার উইকিলিকস। এই ব্যক্তি এবং তার ওয়েবসাইটটির কল্যাণে অনেক বছরব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বহু তৎপরতার কংক্রিট ও পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য এখন জনগণের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী অন্যান্য সমচরিত্রসম্পন্ন রাষ্ট্রসমূহ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে এখন রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। উদার হৃদয় ও ক্ষমাশীল মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাকে হাতের মুঠোয় পেলে জীবিত ছাড়বেন বলে মনে হয় না।

সিআইএ একটা ক্রিমিনাল সংগঠন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশে-বিদেশে গুম, খুন, চক্রান্ত, প্রতিবিপ্লব, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার সাথে তার সরাসরি এবং পরোক্ষ যুক্ততার ইতিহাস আজকের নয়। এবং তা সচেতন জনগণের অবিদিতও নয়। কিন্তু সিআইএ সম্পূর্ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এসব কাজ করে এই ধরনের ধারণা প্রচার করা সর্বতোভাবেই অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, এবং তাদের মধ্যে প্রধানত সিআইএ দেশ-বিদেশে যে গোপন অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালায় ও নানারকম চক্রান্তে লিপ্ত থাকে এর কোনোটাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের অজ্ঞাতসারে নয়। এটিও বিভিন্ন ক্ল্যাসিফায়েড দলিল পরবর্তীকালে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মোটামুটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এক পরিচিত বিষয়। মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েই এ জাতীয় তৎপরতা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু এই কথিত রাষ্ট্রপ্রধানও সত্যিকার অর্থে কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নন। সমগ্র বিশ্বেই একটা কথা প্রচলিত যে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তার কথাবার্তা, তৎপরতা, আচরণ এবং অন্যান্য কার্যক্রম দেখলে এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই রাষ্ট্রপতি নিজেও আসলে পরিচালিত হন সেদেশের বড় বড় কপোর্রেট সংস্থা, জ্বালানি ও অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও ঋণদাতা গোষ্ঠীর সম্মিলিত স্বার্থের অধীনে থেকে। এই বিশাল বিশাল কপোরেশনগুলোর পরিচালনা বোর্ডে বর্তমান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে মার্কিন প্রশাসনের অনেক উচ্চপদস্থ হর্তাকর্তা সদস্য হিসেবে পদ অলঙ্কৃত করে আছেন। এটা শুধু বর্তমান সময়ের সত্য নয়, অনেক আগে থেকেই এমনটি হয়ে আসছে। মোটা অংকের বেতন এবং কমিশনের বিনিময়ে এই কর্মকর্তাগণ তাদের চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে-দেশে লাভজনক প্রকল্পের ঠিকাদারী পাইয়ে দেন। নির্মাণ, জ্বালানি, উন্নয়ন থেকে শুরু করে আরো অনেক খাতেই বিশ্বের বিভিন্ন, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশ নামে পরিচিত সাম্রাজ্যেবাদের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রসমূহে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের পাশাপাশি মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মরত রয়েছে। যেসব জায়গায় এ ধরনের প্রকল্পের সুযোগ প্রাথমিক ভাবে থাকে না কিন্তু ভাড়াটে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ প্রভূত ভবিষ্যত মুনাফার সম্ভাবনাযুক্ত রিপোর্ট দাখিল করেন সে সমস্ত রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রয়োজন সৃষ্টি করা হয়। এই প্রয়োজন সৃষ্ট হয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের তৎপরতায়, স্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্থ শাসক গোষ্ঠী এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্তাদের উৎকোচ প্রদানের বিনিময়ে। তাতে কাজ না হলে সাম্রাজ্যবাদী রণনীতি গ্রহণ করা হয়। এই রণনীতির দুটো পন্থা রয়েছে। একটি হলো সরাসরি সামরিক হামলার মাধ্যমে দুর্বল কিন্তু বিবিধ দিক থেকে সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রটিকে দখল করে নেয়া। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আফগানিস্তান এবং ইরাকে এই পন্থা অবলম্বনের দৃষ্টান্ত আমরা লক্ষ করেছি। প্রায় সমজাতীয় কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে লিবিয়াতেও। বর্তমানে সিরিয়া এবং অতঃপর ইরানেও এই তৎপরতার ক্ষেত্র তৈরির প্রয়াস ক্রমশই পরিস্ফূট হচ্ছে।

কিন্তু প্রথম পন্থাটি সবসময় কার্যকর না-ও হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতোই শক্তিশালী রাষ্ট্র হোক না কেন; গণতন্ত্র এবং মানবতার ভেকধারী তাদেরকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। নীতি এবং লক্ষ্য অটুট রেখে পরিবর্তিত কৌশলে কাজ করার জন্য যে পথ অবলম্বন করা হয় তাহলো, সম্ভাবনাময় কিন্তু স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক রাষ্ট্রসমূহে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকূলে আনার চেষ্টা, যার মধ্যে আবার অন্যতম হলো পেশাদার গুপ্তঘাতক দ্বারা অবাধ্য রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা আধিপত্যবাদবিরোধী প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা।

এই কাজের জন্য কনর ফিটজেরাল্ডের মতো ভাড়াখাটা দেশপ্রেমিকদের প্রয়োজন হয়। যারা চোখ বন্ধ রেখে, বিবেক ও মস্তিষ্কের দরজা তালাবদ্ধ করে নিজ দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং সমগ্র বিশ্বের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নামে বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল ছোঁয়াবে। তারা প্রশ্ন করে না, না তারা বিশ্লেষণ করে যে সত্যিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বিশ্বের শান্তি ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য বিশেষ একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার প্রয়োজন আছে, নাকি সে প্রয়োজন চূড়ান্ত বিচারে মার্কিন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা এবং জ্বালানি খাত ও অস্ত্র কোম্পানির সম্মিলিত মুনাফা-স্বার্থের অধীন। এরাই মার্কিন গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার নামে শপথ নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অথবা ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত অবস্থানে থাকা দুর্বল দেশগুলোয় আধিপত্য বিস্তারের ‘মহান’ উৎসবে। তারা কোনো প্রশ্ন করতে জানে না। তাদেরকে বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার ‘পবিত্র’ দায়িত্ব তাদের ওপর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অর্পিত হয়েছে, তদুপরি মহান ঈশ্বরের ইচ্ছাও তা-ই। প্রচারিত এই বক্তব্যকেই প্রশ্নহীন মানসে ধর্মগ্রন্থের বাণীসম বিবেচনা করে তারা শিরোধার্য করে। এদেরই একটা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ অংশ গুপ্তঘাতকের ভূমিকায় বিভিন্ন দেশে যায় বিশেষ মিশনে।

যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা এই সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সংজ্ঞায়িত দেশপ্রেমের ধারণার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক। কেননা প্রশ্ন থেকে পর্যায়ক্রমিক জন্ম নেয় সন্দেহ, প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদ। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ধারিত দেশপ্রেমের সংজ্ঞা তাই সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অখণ্ড সত্তা হিসেবে মনে করতে এবং সেই অনুযায়ী নিজস্ব আচরণ ও চিন্তার গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায় (এটা কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থা সম্পন্ন বিশ্বের সব রাষ্ট্রের জন্যই বিভিন্ন মাত্রায় সত্য)- এজন্যই মার্কিন সেনাবাহিনীর সশস্ত্র সৈনিকেরা আরেকটি দেশ দখল করতে যাওয়াকে দেশপ্রেমমূলক কর্ম হিসেবে জ্ঞান করে, মারা গেলে শহীদি মর্যাদা লাভ এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হওয়ার সম্ভাবনায় গর্ববোধে তাদের বক্ষ স্ফীত হয়। নিজের জীবন এবং সর্বস্ব ঝুঁকি রেখে এভাবেই তারা আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, অর্থ সংস্থা এবং জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবাধ মুনাফা ও লুটপাটের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়ে যায়, অস্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ বৃদ্ধি করে। মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান হতে শুরু করে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিগণ এই কর্পোরেশনের সম্মিলিত স্বার্থের সাথে নিজস্ব স্বার্থের গাঁটছড়ায় বন্দি এবং তাদের মুনাফা নিশ্চিত ও স্ফীতকায় করার প্রজেক্টে তারা ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করে থাকে নিজেদের স্বার্থের সংরক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য। এরা যে কোনো একটি নির্দিষ্ট দল অথবা প্রার্থীকেই অর্থসাহায্য করে, তা নয়। এদের নজর থাকে গ্যালাপের দিকে, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা প্রার্থীর প্রতিই তাদের পক্ষপাত বেশি থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যাতে কর্পোরেশনের সম্মতি এবং বিপুল পরিমাণ অর্থসাহায্য ছাড়া তাদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করা কোনোক্রমেই সম্ভব হয় না। একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো যে ডেমোক্র্যাট অপেক্ষা রিপাবলিকানরা সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট স্বার্থের নিকট অধিক গ্রহণীয় এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তাদের পক্ষপাত তুলনামূলক কম। কিন্তু বর্তমানে অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান নির্বিশেষে সব প্রার্থীই এখন কর্পোরেট স্বার্থের উদরে সমভাবে বিলীন হয়েছে এবং তাদের নিজস্ব দলীয় আদর্শ বলতে যা কিছু ছিল তার প্রান্তিকীকরণ ঘটেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

কিন্তু দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মুক্তবিশ্বের নামে কর্পোরেট স্বার্থকবলিত প্রচারযন্ত্র যতোই মার্কিন সাধারণ করদাতা জনগণের দৃষ্টি অস্বচ্ছ রাখার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকুক না কেন, এখন কিছুটা হলেও অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বৈষম্যমূলক কোনো রাষ্ট্রই যে অখণ্ড সত্তা নয় এবং এই রাষ্ট্রে বসবাসকারী সাধারণ করদাতা জনগণ ও বড় বড় কর্পোরেশনের স্বার্থ যে একসূত্রে গাঁথা নয়, উপরন্তু পরস্পরবিরোধী- এ বিষয়টা তাদের বোধে এসেছে। মার্কিন সরকার অনুসৃত রাজস্বনীতির কারণেই মূলত এমনটা হচ্ছে। জনগণ দেখতে পাচ্ছে যে, ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধ্বংস এবং দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য সামাজিক কল্যাণমূলক খাতগুলোতে ব্যয় সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান সহ জনকল্যাণমূলক সামাজিক খাতসমূহ হতে জনসাধারণের করের টাকা সরিয়ে সেগুলো রুগ্‌ণ কর্পোরেশনগুলোর ভেতর রক্তসঞ্চালনের কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট পণ্যের বাজার দখল করে রাখার প্রতিযোগিতায় এক অথবা একাধিক প্রতিষ্ঠান অঙ্গীভূত হচ্ছে, মুনাফা রক্ষার জন্য বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই, বিপন্ন হচ্ছে কর্মসংস্থান খাত। বেকারত্বের হার লাঘবের জন্য সরকারের কার্যকর ভূমিকা নেই। শুধু তা-ই নয়, জনসাধারণের করের টাকায় বিশ্বের দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে যুদ্ধ ও আধিপত্যের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানসমূহের বিক্রি বাড়ছে, অবকাঠামো নির্মাণ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠানসমূহের বাণিজ্য ও লুটপাটের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ থেকে জনগণের উপলব্ধিতে এসেছে যে এই সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট স্বার্থ তাদের অস্তিত্ব ও নাগরিক হিসেবে তাদের স্বার্থের পক্ষে রীতিমতো হুমকি। এই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই অল্প, বলতে গেলে ১%, কিন্তু তারাই বিভিন্নভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রে অবস্থান করে, বাকি অংশের জনসাধারণের নাগরিক স্বার্থের ওপর ছড়ি ঘোরায়। এ কারণে আজ এই কর্পোরেট আধিপত্যের তীর্থস্থান ওয়াল স্ট্রিটে শ্লোগান উঠেছে: “আমরাই ৯৯%”, “ওয়াল স্ট্রিট দখল করো”, “পুঁজিবাদ ধ্বংস হোক” প্রভৃতি। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যম ও সরকারের ডামাডোল এবং ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নে ওয়াল স্ট্রিট দখল আন্দোলন বর্তমানে কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলেও যে স্ফূলিঙ্গ একবার দেখা গেছে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কম বলে মনে হয় না। অদূর ভবিষ্যতে তা আবার স্ফূলিঙ্গ সৃষ্টি করে দাবানলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। জেফরি আর্চার ‘দি ইলেভেন্থ কমান্ডমেন্ট’-এ কনর ফিটজেরাল্ড চরিত্রটির দ্বারা অত্যন্ত স্থূলভাবে দেশপ্রেমের সংজ্ঞা ফেরি করার যে প্রয়াস লাভ করেছেন, অনুরূপভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা হবে খড়কুটোর সাহায্যে বন্যা প্রতিরোধের নামান্তরমাত্র।