ইতিহাসে উপেক্ষিত এক নিঃসঙ্গ দ্রাবিড়া-কবি চন্দ্রাবতী
লায়লা আফরোজ, সোমবার, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৩



কবি চন্দ্রাবতীকে ঘিরে আমার দীর্ঘকালের জমাট বাঁধা কৌতুহল। এই প্রগাঢ় কৌতুহলকে উস্‌কে দিয়েছিল বহু আগে প্রমথনাথ বিশীর লেখা ‘মলুয়া’ শিরোনামের একটি ছন্দবদ্ধ অনবদ্য কবিতা। ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ উজ্জ্বল চরিত্র মলুয়া-সুন্দরীকে নিয়ে লেখা এই কবিতাটির বিষয় বস্তু, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য এবং রূপকল্প অনেকটা নিসর্গ-চিত্রের মত। বিলের মধ্য দিয়ে সাত ভাই পালাচ্ছে বোন মলুয়া সুন্দরীকে নিয়ে, আর বুকে তীর-বেঁধা রক্তাক্ত শরীর নিয়ে তাদের তাড়া করছে কাজীর ‘নাও’! এই অসামান্য সিনেম্যাটিক-দৃশ্যটি প্রমথনাথ বিশীর কবিতায় বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

“সাত ভাই দাঁড় টানে
বোন ধরে হাল,
উড়ে চলে ছিপখান
ফুলের জাঙাল,
ফুলের জাঙাল ভাঙে
খাগড়ার বন,
সাত ভাই দাঁড়ে ব’সে,
হালে ব’সে বোন।
হালে বসে ফিরে চায়,
‘কেন ফিরে চাও?’
সভয়ে মলুয়া বলে-
‘কাজিটার নাও’...........”!

এই কবিতাটি ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’ সম্পর্কে আমার মুগ্ধতা এবং কৌতুহলের মাত্রাকে টেনে নিয়ে যায় এভারেস্ট-শৃঙ্গের সমান উচ্চতায়। কে এই মলুয়া? সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই প্যান্ডোরার ঝাঁপি ডালা খুলে, আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। জানতে পারি ‘মলুয়া পালা’র রচয়িতা চন্দ্রাবতী এবং তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী-কবি! প্রায় ৫০০ বছর আগে এই বঙ্গীয় উপদ্বীপে জন্ম নেয়া রক্ত-মাংসের মানবী চন্দ্রাবতী নিছক একজন পালাকারই ছিলেন না! ছিলেন সুন্দরী, বিদুষী এবং সর্বোপরি চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর এক দ্রাবিড় রমণী !

চন্দ্রাবতীর বিস্ময়কর কাব্য-প্রতিভার পরিচয় মেলে তাঁর রচিত ‘দস্যু কেনারাম’, ‘মলুয়া পালা’ এবং ‘রামায়ণ’সহ অজস্র কবিতা ও লোক-সঙ্গীতের ছত্রে ছত্রে। তাঁর কবিতা সুরভিত বনফুলের মতো। চন্দ্রাবতী রচিত গ্রন্থাবলী তাঁকে বাংলা সাহিত্যের একটি উত্তুঙ্গ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে যে স্থানটি কেড়ে নেওয়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বেদনা-বিধুর জীবন কাহিনীর জন্যেও চন্দ্রাবতী কিংবদন্তী হয়ে রয়েছেন।

মহাকালের ধুলায় মিশে যাওয়া চন্দ্রাবতী আমার চেতনায় স্থায়ী আসন গেঁড়ে ব’সে আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণীত করেন। মনোলোকে তাঁর সাথে আমার কথা চলে প্রতিক্ষণ। তাঁর হাতে হাত রেখে আমি পথ চলি। একান্ত নিরালায় পা-ছড়িয়ে বসে ফুল-পাখি আর আকাশের নীল নিয়ে কথা বলি। আমাদের আলাপ-চারিতা নন্দনতত্ত্ব ছাড়িয়ে ঘুরে আসে সাহিত্যের একাল ও সেকালের সীমানা। চন্দ্রাবতীর প্রগাঢ় পান্ডিত্য, কালোত্তীর্ণ মনন ও প্রজ্ঞা তাঁর প্রতি আমাকে দুর্নিবার কৌতুহলী করে তোলে।

কিন্তু, তাঁর ব্যাপারে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। কারণ, চন্দ্রাবতীর সাহিত্য-কর্ম বাঙালির হৃদয়-মনে যতখানি তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, সে তুলনায় ব্যক্তি-চন্দ্রাবতীর ব্যাপারে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ততখানিই উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে। অপার-রহস্যের উৎস চন্দ্রাবতীকে আমাদের সাহিত্যে ঠিক যেভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল বা তিনি যেভাবে গবেষণার উপাত্ত হয়ে উঠতে পারতেন তেমনটি কিন্তু ঘটেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? এই প্রশ্নটি ইতিহাসবেত্তার কাছে বর্তমান ও ভাবিকালের সাহিত্যামোদি মানুষের একটি বিরাট জিজ্ঞাসা হয়ে থাকবে বৈকি!

তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে কী আশ্চর্য রকমের বৈপ্লবিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী ছিলেন চন্দ্রাবতী! অথচ, রেনেসাঁ-উত্তরকালেও বাঙালির আড্ডা-আলোচনায় নিদারুণভাবে উপেক্ষিত তিনি! এই দেশের সচেতন নারী সমাজ নারী-স্বাধীনতা, নারী-অধিকার ও নারী-মুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু তাঁদের কাছেও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছেন চন্দ্রাবতী! ইবসেনের ‘ডলস্‌ হাউসের’ নোরা কিংবা সিমন দ্য ব্যঁভেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’–এর সাথে তাঁদের যোগাযোগ যতখানি নিবিড়, চন্দ্রাবতীর সাথে ততখানি নয়! সামগ্রিক বিচারে এর উল্টোটি ঘটাই কাম্য ছিল। এ দিক থেকে বাংলা-টাইপের ‘চন্দ্রাবতী হরফ’ নামকরণটি অবশ্য কিছুটা দায়মোচন করেছে!

এই শূন্যতার মাঝে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ শ্রী নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত ‘চন্দ্রাবতী পালা’ শুকতারার মতো আলো ছড়াচ্ছে। ‘চন্দ্রাবতী-পালা’ ব্যতীত আর কোন নির্ভরযোগ্য পুস্তক বা গবেষণালব্ধ ঐতিহাসিক দলিল নেই যা থেকে আমরা তাঁর সম্পর্কে বিশদ জানতে পারি। তাই, আপামর বাঙালি পাঠকের পক্ষ থেকে সকল ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার শ্রী নয়ান চাঁদ ঘোষের। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ অনুযায়ী ১৫৫০ সালের দিকে খরস্রোতা ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজখাপন ইউনিয়নের পাতুয়াইর গ্রামে চন্দ্রাবতী জন্মগ্রহণ করেন। ‘মনসামঙ্গল কাব্যের’ রচয়িতা পন্ডিত দ্বিজ বংশীদাস আর সুলোচনার কন্যা চন্দ্রাবতীর জন্মকথা ‘চন্দ্রাবতী-পালা’ বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

“ধারাস্রোতে ফুলেশ্বরী নদী বহি যায়
বসতি যাদবানন্দ করেন তথায়।
ভট্টাচার্য ঘরে জন্ম অঞ্জনা ঘরণী ।
বাঁশের পাল্লায় তালপাতার ছাউনি।
ঘট বসাইয়া সদা পূজে মনসায়।
কোপ করি সেই হেতু লক্ষ্মী ছাড়ি যায় ।
দ্বিজবংশী বড় হৈল মনসার বরে।
ভাসান গাইয়া যিনি বিখ্যাত সংসারে”।

কবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের এক ট্র্যাজিক নায়িকা। রোম্যান্টিক মনের অধিকারী চন্দ্রাবতীর বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া প্রেমের বিয়োগান্তক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় ‘চন্দ্রাবতী পালা’য়। ১২টি অধ্যায়ে ৩৫৪টি ছত্রের এ লোকগাথা চন্দ্রাবতীর জীবনীর তথ্যভিত্তিক একমাত্র লিখিত দলিল। নয়ানচাঁদ ঘোষের বর্ণনায় আছে, চন্দ্রাবতীর সঙ্গে বাল্যসখা জয়ানন্দের বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিণত হয়। সমর্পনের আশায় উদ্বেলিত চন্দ্রাবতী বলেন-

“তোমারে দেখিব আমি নয়ন ভরিয়া।
তোমারে লইব আমি হৃদয়ে তুলিয়া।
বাড়ির আগে ফুইট্যা রইছে মল্লিকা মালতী।
জন্মে জন্মে পাই যেন তোমার মত পতি”।

কী অসাধারণ আকুতি! সমকালীন সাহিত্যের প্রেম-পিয়াসী মানব-মানবীর ভাষা থেকে এ-ভাষার অবস্থান কি খুব দূরে? আপাততঃ সে তর্ক ছেড়ে ফিরে আসা যাক মূল আলোচনায়। দুই পরিবারের সম্মতিতে জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতীর বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এরই মাঝে ঘটে যায় এক নাটকীয় ঘটনা। বাল্যপ্রেমকে পদ-দলিত করে চঞ্চলমতি জয়ানন্দ ত্রিভুজ প্রেমের জালে জড়িয়ে পড়ে। যে সন্ধ্যায় চন্দ্রাবতী বিবাহবেশে অপেক্ষমাণ সে সন্ধ্যায় খবর আসে, আসমানি নামের এক মুসলমান মেয়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে কাপুরুষ জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে তাকেই করেছে বিয়ে! এ নিদারুণ সংবাদে লগ্নভ্রষ্টা-চন্দ্রাবতীর হৃদয় ভেঙে যায়, স্তম্ভিত চন্দ্রাবতী নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করেন। প্রচন্ড আঘাতে মুষড়ে পড়া কন্যাকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য আপত্য স্নেহে এগিয়ে আসেন পিতা দ্বিজ বংশীদাস। তিনি কন্যাকে একমনে শিবের নাম জপ করতে এবং রামায়ণ রচনায় মনোনিবেশ করতে উপদেশ দেন। চন্দ্রাবতী পালায় এই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আছে এভাবে-

“অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে
শিব পূজা কর আর লেখ রামায়ণে”।

পরাহত প্রেম আর চরম অপমানের জ্বালা ভুলবার জন্য চন্দ্রাবতী পিতার উপদেশ শিরোধার্য করে তাঁর কাছে দুটি প্রার্থনা করেন। প্রথমটি, ফুলেশ্বরী নদী-তীরে একটি শিব-মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবার অনুরোধ। দ্বিতীয়টি, চিরকুমারি থেকে বাকি জীবন শিবের-সাধনায় নিয়োজিত থাকার অনুমতি। পন্ডিত পিতা কন্যার দুটি প্রার্থনাই মঞ্জুর করেন। চন্দ্রাবতী, বিরহী প্রেমের স্মৃতিময় জীবন কাটিয়ে দেন সাহিত্য-চর্চায় নিবেদিত থেকে। আর, ফুলেশ্বরী নদী-তীরে চন্দ্রাবতীর শিবমন্দিরটি আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কিছুকাল পরে মোহ কেটে গেলে অনুতপ্ত জয়ানন্দ পুনরায় ফিরে আসে চন্দ্রাবতীর কাছে। তখন চরাচরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করে চন্দ্রাবতী সন্ধ্যারতি এবং শিবের পূজায় মগ্ন। রুদ্ধদ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে জয়ানন্দ বারবার চন্দ্রাবতীকে নাম ধরে ডেকেও কোন সাড়া পায়না। এই নীরবতাকে চন্দ্রাবতীর প্রত্যাখ্যানের ভাষা মনে করে ব্যর্থ-মনোরথ জয়ানন্দ, লাল রঙের সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে মন্দিরের দরোজায় ৪ ছত্রের একটি পদ লিখে সে স্থান ত্যাগ করে-

“শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৌবনকালের সাথী
অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী
পাপিষ্ঠ জানিয়ো মোরে না হইল সম্মত।
বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো”।

পূজা শেষে মন্দিরের দরোজা খুলে চন্দ্রাবতী লেখাটি দেখতে পান। মন্দির অপবিত্র হয়েছে ভেবে মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ সে লেখা মুছে ফেলার জন্য তিনি নদীর ঘাটে জল আনতে গিয়ে দেখেন নদীর জলে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ। মুহূর্তে তাঁর জীবনের সব আলো নিভে যায়। জয়ানন্দের মৃত্যু থামিয়ে দেয় চন্দ্রাবতীর জীবন। প্রাণের আবেগ সম্বরণ করতে না পেরে প্রন্মত্তা-ফুলেশ্বরীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে জয়ানন্দের শেষযাত্রায় তিনিও সঙ্গী হন। এভাবেই চন্দ্রাবতী তাঁর প্রেমকে অমর করে রেখে গেছেন, সেটা ১৬০০খৃস্টাব্দের কথা।

আত্মাহুতির ফলে অসমাপ্ত রয়ে যায় চন্দ্রাবতীর ‘রামায়ণ’ রচনা। চন্দ্রাবতীর রামায়ণ মূলত একটি পালাবদ্ধ গীত। এ রামায়ণ ৩খন্ডে মোট ১৯টি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে- প্রথম খন্ড, জন্মলীলা। এখন্ডে রয়েছে ০৮টি অধ্যায়। দ্বিতীয় খন্ডের কোন নামকরণ করেননি চন্দ্রাবতী। এই খন্ডের ০২টি অধ্যায়ে যথাক্রমে সীতার বনবাস-পূর্ব জীবনের কাহিনী এবং বনবাসকালীন সময়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয় খন্ডেরও কোন নামকরণ করেননি চন্দ্রাবতী। এই খন্ডের ০৯টি অধ্যায় যথাক্রমে- সীতার বনবাসের সূচনা, সীতার বিরুদ্ধে কুকুয়ার চক্রান্ত, রামের কাছে সীতার বিরুদ্ধে কুকুয়ার মিথ্যা অভিযোগ, রাম কর্তৃক সীতাকে বনবাসে পাঠানোর সিধান্ত, সীতার বনবাস, মুনি বাল্মীকির আশ্রয়ে সীতা কর্তৃক লব ও কুশের জন্মদান,সীতা-হনুমানের সাক্ষাৎ, রাম-হনুমানের সাক্ষাৎ এবং সীতার অগ্নিপরীক্ষা ও পাতাল-প্রবেশের বর্ণনা।

নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ রচনা করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেন তিনি। সেই অর্থে চন্দ্রাবতী আমাদের সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী কবি। বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার গুণে চন্দ্রাবতীর এই রামায়ণ আমাদের চমকে দেয়। কারণ, তাঁর রচনায় সীতা-চরিত্রটি প্রাধান্য পেয়ে মূখ্য চরিত্রে পরিণত হয়েছে যার পাশে রাম চরিত্রটি পুরোপুরি ম্লান। সীতার মানসিকতাকে তিনি এক কালজয়ী চিন্তার আলোকে সুনিপুণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে নারী কেবল ব্যক্তি নয় ব্যক্তিত্ব! পুরাণের খোলস থেকে বের করে সীতাকে তিনি নবজন্ম রেজারেকশান দিয়েছেন। সীতা এখানে দেবী নন, মানবী। সীতা চরিত্র উপস্থাপনের এই নব-রীতি এবং নির্মানে আধুনিক ভাবনার মধ্য দিয়ে আমরা যে চন্দ্রাবতীকে পাই তিনি মূলতঃ নারীবাদের প্রবক্তা।

রামায়ণের এ নবতর রূপ-কল্পনা করতে গিয়ে তিনি নিজস্ব শিক্ষা এবং রুচি অনুসারে রামায়ণের চিরাচরিত বহু বিষয়কে যেমন বিমুক্ত করেছেন, তেমনি বহু নতুন বিষয়কে সংযুক্ত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং জীবনাদর্শকে জারিত করে সেটিকে রামায়ণের গতানুগতিক ধারার সাথে সম্পৃক্ত করে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক ব্যতিক্রমী রচনা যা প্রকৃত অর্থে রামায়ণের মোড়কে সীতায়ণ! সেই হিসেবে, চন্দ্রাবতীর ‘রামায়ণ’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

কবি ও সাহিত্যিক নবনিতা দেবসেন চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণ পাঠ করে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, এ রচনাটি দুর্বল তো নয়ই, এটি অসমাপ্তও নয়। এ রচনাটিতে রামের জয়গান না করে একজন নারীর দুঃখ ও দুর্দশাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে যা তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধাচারণ হিসেবে মনে করা যেতে পারে। সুখের কথা, নবনিতা দেবসেন চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণের ইংরেজি অনুবাদের কাজটিও সম্পন্ন করেছেন।

চন্দ্রাবতী এবং তাঁর রচনাবলীকে লোকগাথার স্তূপ থেকে উদ্ধার করে কয়েকশ বছরের ধুলোবালি সরিয়ে আধুনিক কালের পাঠক সমাজের কাছে নিয়ে আসেন প্রথমে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে। তিনি ১৩২০বঙ্গাব্দে(১৯১৩) ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত ‘সৌরভ’ নামের একটি মাসিক পত্রের ফাগুন সংখ্যায় ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধটি পাঠ করে দীনেশচন্দ্র সেন কবি চন্দ্রাবতী সম্পর্কে প্রবল আগ্রহবোধ করেন। পরবর্তীকালে, দীনেশচন্দ্র সেন এবং চন্দ্রকুমার দে’র যৌথ প্রয়াসে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা চন্দ্রাবতীর লেখা অসংখ্য গান এবং অবশিষ্ট সৃষ্টি-কর্ম উদ্ধার হয়।

চন্দ্রাবতী রচিত রামায়ণের পান্ডুলিপিটি বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। অনাদি ভবিষ্যতের কোন অনুসন্ধিৎসু পাঠক হয়তো সেই প্রাচীন পান্ডুলিপিটি ঘেঁটে নবরূপে আবিষ্কার করবে বাংলা সাহিত্যের এই প্রথম নারী কবিকে। ততক্ষণ পর্যন্ত অভিবাদন এবং নিরন্তর শোভাযাত্রা অব্যাহত থাকুক এই নিঃসঙ্গ দ্রাবিড়ার প্রতি।

লায়লা আফরোজঃ পেশায় ব্যাংকার আর নেশা আবৃত্তি, সেই সাথে সাহিত্যের একজন নিবিষ্ট পাঠক।