রথো রাফির কবিতা ভাবনা ও ২টা লাম্বা কবিতা
র থো রা ফি, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১২


রথো রাফির জন্ম ১৯৭৫ সালে বি.বাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জে।নব্বইয়ের দশকে তার লেখালেখির কিছু প্রকাশ হয়।মূলত ছোট কাগজের লেখক। অন্য কোথাও লেখেন নাই বললেই চলে। নব্বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন।লিখেছেন গাণ্ডীবে, অনিন্দ্য, শিরদাঁড়া, ব্রাত্য ও দ্রশ্টব্যে। তবে অধিকাংশ লেখালেখি তার গাণ্ডীবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ফেসবুকে অনিয়মিত লিখে থাকেন। আর এরই মধ্যে তার অনেক কবিতা, কিছু গদ্য, গল্প, ফেসবুকে নোট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া কবিতা, গল্প, প্রবন্ধের অনুবাদও প্রকাশ করেছেন। তাও তার নিজের এফবি একাউন্টেই। এর আগে কিছু ছোট ছোট পুস্তিকা প্রকাশ হয়েছে, তাও সীমিত লেখকদের মধ্যেই হাতে হাতে বিলি করেছেন । তার কবিতার একাধিক পাণ্ডুলিপি রয়েছে।

কবিতা ভাবনা

ঘামরাঙা আঁকবাঁকা পরিশ্রমের ইতিবৃত্ত: কবিদের পাণ্ডুলিপি
মসৃণ, নির্ভুল, সুসজ্জিত ও নির্মেদ কবিতা পড়তে পড়তে আমরা প্রায়শই এসব লেখার পেছনের কবিদের বিপুল ও দীর্ঘকালীন, সচেতন ও সংবেদনময় পরিশ্রমের ইতিবৃত্তটি ভুলে যাই। বলছি কবিতা লিখতে চাওয়া লোকের উদ্দেশ্যে। এমনতর লেখার এটাও একটা প্রলক্ষণ যে, ভাল লেখা নিজের গা থকে পরিশ্রমের ঘর্মচিহ্নসমূহ তুলোটকাগজের মতো শুষে ফেলে। ফলে পড়ার সময় আমাদের পক্ষে পরিশ্রমের এই ইতিবৃত্তটি উপলব্ধিতে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমি নিজেও এ বিষয়টি ভুলতে বসি অনেক সময়, তখন ভাবি, অনেকেই হয়তো এই বিপুল পরিশ্রমের গোপন অধ্যায়টি বিস্মৃত হতে চান আমার মতো, আর ভুলে গিয়ে একসময় ভাবেন, লেখা ভাল হচ্ছে না বা অন্য কিছু, উৎসাহের হিম পরিস্থিতি তাকে ঘিরে ফেলে।

এ সময় কবিদের পাণ্ডুলিপি হয়তো আমাদের অনেকটা উদ্ধার করতে পারে, পরিশ্রমী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে উদ্দীপক হতে পারে। এটা কিন্তু ততটা পরনির্ভরতা নয়। একজন কবি ভাষা ও শব্দ নির্বাচনের ক্ষেত্রে, বিষয় ও দৃষ্টি ভঙ্গি নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেমন নিজ ভাষা এবং নিজ সংস্কৃতির কাছেই সাধারণত হাত পাততে বাধ্য হন, এই বিষয়টিও তেমনি। তবে এটা একধরনের ন্যূনতম পরনির্ভরতাও, যেখানে প্রতিভাবানের সাথে প্রতিভাবানের কথাপোকথন চলে, আত্মঅক্ষচ্যুত না হয়েই।

আহা লিখতে লিখতে লেখার ভিতর শব্দ কাটতে কাটতে কাটাকুটি কিভাবে একইসাথে কবিতা এবং ছবি হয়ে ওঠতো তার পাণ্ডুলিপিতে। কাটা অংশগুলি জুড়ে গিয়ে অনাকাঙক্ষার পটভূমি বা জগত যেনো সমমূল্যে ও সমমর্যাদায় জাগ্রত হতে চায়। ফলে লেখার ফাঁকে ফাঁকে এক ত্রুটি থেকে আরেক ত্রুটির দিকে লতিয়ে চলে রেখা, গোচর হতে থাকে ত্রুটির আত্মীয়তা নির্মাণ। লেখায় অবহেলিত হলেও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাদেরও আলাদা মূল্য রয়েছে। সেই দাবীতেই তাদের এই হয়ে ওঠা। এবার ক্রটি-লেখা হয়ে উঠলো ছবির পটভূমি। লেখা ও ছবি: একই পটে দুটি সহোদর, একই তলে ভাসমান ও সহাবস্থানরত। যেনো শেওলা এবং কুচুরিপানা, কিংবা ফসল ও আগাছা দুটিই সমগুরুত্বপূর্ণ। বরীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গেই এসব বলা। কবিতা শুধু নয়, ছবি শুধু নয়, উভয়ই: ছবিতা। পুস্কর দাসগুপ্তের কথা মনে পড়ছে, এ প্রসঙ্গে, যিনি ছবিতা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের থেকে পুস্করের উদ্দেশ্য ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথে রেখা আর কবিতা পাশাপাশি একে অপরের ফাঁকে অবস্থান করলেও যেনো দুটো আলাদা সত্তা যেনো যমজ বলে প্রতীয়মান, তিনি কবিতা আর ছবিকে একদেহ বা একাত্মা করতে চাননি। কিন্তু পুস্কর তা চেয়েছিলেন, তার ক্ষেত্রে কবিতা ও ছবি একই দেহে মিশে যাওয়া একে অপরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অর্থাৎ একীভূত সত্তা, আলাদা-কিছু নয় যেনো, ভেদরেখা লীয়মান, কিন্তু লুপ্ত নয়, সূক্ষ্মশ্রমে উদ্ধারযোগ্য।

কিভাবে ছন্দের স্রোতে ভেসে আসে অনাকাঙ্খিত কুচুরি পানা, আর তা দু’হাত ঠেলে সরাতে হয়, তারই অভিজ্ঞান এসব, বয়স্ক, দীর্ঘশ্রমে সমৃদ্ধ রবীন্দনাথেরও এ কাজ চালিয়ে যেতে হয়, নিরবিচ্ছন্নভাবে, আর কাংখিত শব্দ সাধনের ধ্যানে, তা আমাদের অনুপ্রেরণা হতেই পারে বৈকি। স্বতঃস্ফূর্ততা সে অনুধ্যানের ধন, ধূলো ঝেড়ে পাওয়া তুচ্ছ কিন্তু দুর্লভ ও মহামূল্যবান স্বর্ণকণা। যার প্রতিভায় একাধিক জাতির পাঠক ও বিজ্ঞ সমালোচক ও চিন্তাশীল পন্ডিতরা মুগ্ধ, তারই চালিয়ে যেতে হয় এমনতর কান্ডকারখানা, বড় অনায়াস নহে প্রতিভারও সোনার ফসল- এই উপলব্ধিই কবিদের পাণ্ডুলিপি উপহার আমাদের প্রতি!

স্বতোস্ফূর্ততা একা আসলে কিছুই নয়। শিশুরা কি এ গুণ থেকে বঞ্চিত? না। কোন মানুষই বঞ্চিত নয় এ গুণ থেকে। কই শিশুরা, বা যে কেউই, একটা ভালমানের কবিতা যেকোন মুহুর্তে বা আকস্মিকভাবে কখনই লিখতে পারে না তো। স্বতোস্ফূর্ততা নাকি অন্য কিছুর অভাব তার? অভাব তার অভিজ্ঞতার। কবিতা লেখা ও শ্রমের ভেতর দিয়ে ভাবনাকে প্রকাশের অভিজ্ঞতার, পাঠের ভেতর দিয়ে ভাবনার দশদিগন্ত ঢুড়ে বেড়ানোর, অভাব তাকে সংবেদন-অনুবাদের দক্ষতার। এই সব কিছুই শ্রমের ব্যাপক অনুশীলনের ভেতর দিয়েই অর্জিত হয়। শ্রমের ভেতর দিয়েই অর্জিত হয় ভাষা।
স্বতোস্ফূর্ততা শব্দটির পেছনে আসলে দীর্ঘকালীন অনুশীলনের অকথিত ইতিহাস রয়েছে, যদিও তা কেমন অপ্রধান হয়ে পড়ে পাঠকের কাছে। কোন কবির জীবনের প্রথম কবিতাটি কেন একটা সফল কবিতা হয় না, তা কি ভাবি আমরা? তা হলে আর আমরা কেবল স্বতোস্ফূর্ততার কথা বলতাম না; এর সাথে যোগ করতাম আরো অনেক বিষয়ই। আর এটা সত্য যে, এতো কিছুর পরও স্বতোস্ফূর্ততা অর্জিত না হলে লেখকের লেখা চালিয়ে যাওয়া মুশকিল শুধু নয়, এ না হলে, শিল্পমানে, সুরে, স্বরে, স্বাতন্ত্র্যে বেজে উঠে না সংবেদন-প্রজ্ঞার যুগল উদ্ভাসনা।

রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপিতে ত্রুটিগুলো ছবি হয়ে উঠতে গিয়ে যেখানে কালি লেপ্টে গেছে, ঢেকে ফেলেছে প্রথম প্রয়াসের ভেসে আসা শব্দগুলোকে, সেখানে আর শব্দগুলো উদ্ধার করতে পারি না, পাণ্ডুলিপি পাঠে। জানতে পারি না হারানো শব্দটির বদলে যে শব্দটি আজ পাঠের সুযোগ পাচ্ছি, তা কি ঐ শব্দের পুরো বদলি, নাকি আংশিক, সমার্থক নাকি বিপরীতার্থক। নাকি প্রসঙ্গ পাল্টানোর কারণে, নাকি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর কারণে পুরোই বদলে গেছে। কবিতাটিতে ফলে সূরের, বা বিষয়ের, বা ভাবনাদ্যূতির কি পরির্বতন ঘটেছে। উজ্জ্বল না নিস্প্রভ করার কাজে এসেছে, জানতে পারি না আর। অর্থাৎ, কবির গোপন কাজের একটা অনুধাবনরেখা আর অনুসরণ করতে পারি না। হয়তো বা এখানে ছিলো কবিতাকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার কোন নতুন প্রকৌশল। কবি হিসেবে হয়তো সেখানে একধরনের ঠকার সূক্ষ্ম অনুভব জাগে আমাদের। কিন্তু পাঠক হিসেবে সেখানে কবিদের জয়ই ঘোষিত হয়। আবার কবিদের নোট বইটাই নাকি আসল, বলেছিলেন মায়াকোভস্কি, তবে তা যার নোটবই তার চর্চার জন্যে, আর বলেছিলেন, আসলে তা অন্যের কাজেও আসতে পারে, সেটাও কম নয়।

এবার আসি জীবনান্দ দাশে।রূপসি বাংলার পাণ্ডুলিপি দেখলে মনে হয়, কি পরিশ্রমটাই না করতে হয় একজন কবিকে, একটি শব্দের সংকোচন বা প্রসারণ ঘটিয়ে কবিতার অভিপ্সা-অনুকুল স্বরের সাথে ও পটভূমির সাথে দারুণভাবে মিলিয়ে দিতে, আরও শক্তি শালী করে নিতে কবিতাকে, আরও মুগ্ধতা ও মগ্নতা সঞ্চারী করতে বাগভুবনকে। কবিদের মাথায় যে অসীম যাচাই বাছাই, সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার যে বিপুল যজ্ঞ, তার-ই কণামাত্র মূর্ত হয়ে আছে পাণ্ডুলিপির ঐসব পৃষ্ঠায়।

আবার সুধীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৬ বছর পর কবিতার সংস্কার করে চলা, এবং যেখানে তিনি সংস্কার চালিয়েছেন, সেই কপিটা দেখতে পেলেও আমাদের হয়তো অনেক উপকারে আসতো।

সমর সেন তার ছাপা কবিতাকে পুনরায় সংশোধন করে কাব্যগ্রন্থে স্থান দেন। তার কাব্যিক-বাক্যে শব্দের এমন অদলবদল আমাদেরকে অনেক শিক্ষা দিতে পারে।

ডব্লিউ বি ইয়েটস তার এক কবিতা দ্যা ডাব (এগনিয়াসের প্রতি) এর শেষ দুই লাইন কেন কেটে দেন বহুবছর পর? একবার লেখা হয়ে গেলেও কবিতাটির লেখা বা পরিমার্জন যে অনেকবছর ব্যাপী বা বহুবছর পরও অনুভূত হতে পারে সে কথা আমরা কজন ভাবি? একটা লেখা এভাবে নিজের ভেতর লেখকের মনন পরিবর্তনের সাপেক্ষে কত নাজুকভাবে কম্পমান, তা ভাবলে লেখার অক্ষত চেহারা বলে কিছু তো লেখকের কাছেই টিকে থাকে না। কিন্তু এই দীর্ঘকালীন রদবদল দুর্লভ বলেই আমাদের বাঁচোয়া। ইয়েটসতো প্রথমে প্রবন্ধ বা গল্পের মতো রূপরেখা তৈরি করতেন, পরে ক্রমে ক্রমে কবিতায় উত্তীর্ণ করতেন সেটাকে। গদ্য কবিতাকে ছন্দোয়ময় কবিতায় প্রকাশ করাও কবির অভিপ্রায় হয়ে উঠতে পারে। এবং দুটো দশাই প্রকাশিত অবস্থায় আছে বোদলেয়ারে। তো একই কবিতা দুই ধরনে, নাকি দুটি আসলে একই বিষয়ে হলেও দৃষ্টিকোণের কোথাও হয়তো ভিন্নতা নিয়েই বিরাজ করছে এক আত্মার দুই দেহ? আমরা সাধারণত এটা খেয়াল করি না। তবে তাও বিবেচনায় আনা জরুরি নিশ্চয়। আর স্বতোস্ফূর্ততার কথা যদি বলি, একই লেখা দুই ধরনের বাক-কাঠামো নিয়ে কিভাবেই বা বিরাজমান থাকে, আমাদের চোখের সামনে?

আবার অনেকে একই কবিতা খন্ড খন্ড করে বহু বছরে একটি কবিতাকে পূর্ণতা দেন। তাদের ক্ষেত্রে স্বতস্ফূর্ততার মুহূতর্গত অস্তিত্বকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো আমরা? কিংবা যখন একজন কবি একটা পংক্তি নির্মাণে হাজারটা বিন্যাস ঘেটে একটা গঠনকে বাছাই করেন, এবং ছন্দের সাথে বা স্বরের সাথে বা চিন্তার সাথে বা সংবেদনের বা আবেগের সাথে খাপ খাইয়ে নেন? লিখনোত্তর একটা বাগসংগঠনের দেখা পাই আমরা। কিন্তু লিখন-মূহুর্তে, বা পরে হাজারো পরিমার্জনা আর সংশয়ের তর্কাবর্ত বাদ দিয়ে স্বতোস্ফূর্ততাকে কিভাবে ভাববো আমরা? পাণ্ডুলিপি এই জটিলতা উপহার দিয়ে হয়তো স্বতোস্ফূতর্তা নিয়ে যে সংস্কার তাকে পরিশোধন করে দিতো, আরো একটু নিখুত করে তুলত।


............................................
রথো রাফির ২টি লাম্বা কবিতা
.............................................

গেটের সামনে


‘ঈশ্বর আমারে লিঙ্গ দিলা ক্যান, লিঙ্গ দিলা ক্যান?’ বলে লোকটা কাঁদছে।
হঠাৎ
নিজেকে
এভাবেই কল্পনা করেছিলো সে।

রাত সাড়ে এগারটায়
বাসায় ফেরার পথে রিকশায়
শাহবাগ থেকে।

আসলে সে গাঁজা খেয়েছিলো
আসলে সে ৩৬
আসলে সে কুমার
আসলে সে ফতুর
আর বেকার।

আসলে সে পড়াশোনাও ঠিকঠাকমতো করে নি
আসলে সে মাবাবার কথাও শোনেনি
আসলে সে নিজের কথাও তেমন একটা শোনে নি
আসলে সে করেনি ঠিকঠাক কোনটাই।

আসলে সে ঠিকঠাক মেনে নিতে পারেনি কিছুই
আসলে সে ঠিকঠাক অমান্যও করেনি কিছু
আসলে সে খুবই সাধারণ
আসলে সে ঠিক সাধারণও নয়
আসলে সে নাস্তিক আর সংকটে যা সংজ্ঞা হারায়।

আমারে লিঙ্গ দিলা ক্যান লিঙ্গ দিলা ক্যান
একটু শব্দ করে বলতে চাইলো সে
আর তার মৃদু হাসি পেলো
রিকশায়
একা
বাসায় ফেরার পথে
শাহবাগ থেকে
সিপাহীবাগে পকেটের তুলনায় অধিক ভাড়ায়।
আর চাবিটা আজও
গেটের বানানো হয়নি
দেরী হয়ে গেছে
লেগে যাবে গেটটা
তাকে কি বাইরেই কাটাতে হবে
রাতটা?
কাকে বলবে চাবিটার কথা?
মালিক চলে গেছে
শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে
বেড়াতে
আর কারো সাথেই তো তার
কথা হয় না
এখন আজ হঠাৎ কাকে বলবে
চাবিটার জন্য?

সবাইও তাকে কিছুটা এড়িয়ে যেতে চায়
আর প্রত্যেকের বাসাতেই
মেয়েরা রয়েছে
পুরোনো
নতুন ও রজস্বলা।

আর-কারো সাথেইতো কথা হয় না
কেউ আসবে না,
খুলতে গেটটা তার
চাবি হাতে।
আসলে সে ঠিকঠাক কী করবে
বুঝতে না-পেরে
দাঁড়িয়েছিলো টাকা বাঁচাতে
বাসের জন্য

কিন্তু আসছিলো না
একটা বাসও।
আর বহু বছর ধরে সপ্তাহে একদিনও বন্ধুরা
আসে না আড্ডা দিতে
শাহবাগে
একা একা পাক খেতে হয় তাকে
ভাল লাগে না
আর আসবো না শাহবাগ
কিন্তু সন্ধ্যা হলে
ফের এই কথা সে কেমন ভুল যায়
আর বাসাটা যেনো তাকে
বমি করে ফেলে দেয় রাস্তায়
সে বাধ্য হয়
নিজের ভেতরে শাহবাগের অভাব
তীব্র হয়ে ওঠে
যেনো ওখানেই শান্তি

আর আসার পর
শাহবাগে
বাসার মতোই এখানেও সে
নিঃসঙ্গ
আর মনে হয়
আর আসবো না
শাহবাগ।
ভাবতে ভাবতে
দাঁড়িয়ে থাকে
বাসের আশায়
আর বাসের দেরী
সইতে না পেরে
আবার
আবার
রিকশার দিকে
এগোয়
আর ভাবে রিকশায়
সময় লাগবে বেশি
অনেক দেরী হয়ে যাবে
আর গেটটাও লেগে যাবে।

আর এসে সিপাহীবাগ
দেখলো
হা তাই তো!
এখন?
কাকে ডাকবে?
হাসবে সবাই
জানলে চাবি নেই
অবাক হবে শুনলে
চাবিটা আজও তার
বানানো হয়নি।

অনেকবার বলা হয়েছে
চাবিটা বানাও
আর সে কাউকে বিরক্ত না করেই
এতোদিন
চাবি-ছাড়া পার করে দিয়েছে।

আর জানতে পারলে
কেউ কি মুচকি হাসবে না?

কারণ প্রতিটি বাসাতেই
অব্যবহৃত তার চেয়ে দামী
কুমারীরা রয়ে গেছে
যাদের বাজার দর
তার চেয়ে অনেক বেশি
তাই কেউ আসবে না
খুলতে গেটটা তার
চাবি হাতে
আনন্দে নাচতে নাচতে
মা বা মেয়ে
আর তাদের বাবারা
তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ে
হাসবে না
বলবে না একদিন আমরাও
এমন রাত করে ফিরতাম
আর এখনো ইচ্ছে হয়
চুটিয়ে আড্ডা দেই
কিংবা মেয়েকে বলবে না
মা একটু যাতো
গেটটা খুলি দিয়ে আয়তো
আর মেয়েটা বাবার উপর বিরক্ত হবে
বাবার ইচ্ছেটা বুঝতে পেরে
কারণ তারও কি
বাবার অজ্ঞাতে
কোন প্রিয়মানুষ থাকবে না?
আর পুরোনো মেয়েদের
মায়াও জংধরা
পুরোনো ফুরোনো

মেয়েদের মা-রা একবার
সুযোগ বুঝে
বিদ্যুৎহীন দিনগুলোতে
পানির অভাবে
গরমে তিষ্টোতে না পেরে
নিচে নেমে এসে
ভীড় করেছিলো
পানি তুলতে বালতিতে টেনে
সিঁড়ি বেয়ে
দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে
তার যাওয়ার পথে
পেছন থেকে তারা
বলে ওঠেছিলো
এই তোদের আঙ্কেলকে বল
উনিই চাইলে পারবেন
পানির ব্যবস্থা করতে
তার মানে কি তারা জানে
সে কিছুই পারে না
অক্ষম লোক এক!

কেঁপে ওঠেছিলো ভেবে
আর আয়নার সামনে গিয়ে
আবিস্কার করেছিলো
অন্তরঙ্গ অনেক চুলই সাদা
বুকের ও বোঁটার চারপাশের
উপড়ে ফেলেছিলো
সাদা-চুলগুলো
সমূলে
ক্ষোভ না আত্ম-ঘৃণা না
নিজেকে লুকনোর চেষ্টায়
পেলো না ভেবে
পেলো নাগাল শুধু
নতুন দুয়েকটা দীর্ঘশ্বাসের

আর এখন কিভাবে
কাকে
ডাকবে সে
কারণ প্রতিটি বাসাতেই
কুমারী মেয়েরা রয়ে গেছে

আর তারা জানে
যে মাঝরাতে বেশ উচ্চ শব্দেই
তার কম্পিউটারে
প্রেমের আর বিরহের গান শোনে সে

যে একদিন আবিস্কার করে ছিলো
৯৯%
সুন্দর প্রেমের গানগুলোই
বিরহের মানে করুণ
বা নিষ্ঠুরতার বিবরণে
ঠাসা

আর সে দেখতে
আকষর্ণীয় হলেও
তাদের মায়েরা ভয়ে থাকে
তার সাথে কথা হওয়া মানে
মেয়েদের বিপদে পড়া
অনভিজ্ঞ মেয়েরা
কথা বলতে চাইলে
তাদের মায়েরা তাদের দিকে
বড়ো বড়ো চোখে তাকায়
চোখ থেকে আতঙ্ক ও রাগ
হামলে পড়ে
মেয়েদের গায়ে

আর সেও সবার অজ্ঞাতে
আবিষ্কার করে
কী বিপুল প্রেমিক সে

একদিনেই স্বপ্ন দেখে
সফলতার
বিপুল
সচ্ছলতার

আর অভিজ্ঞ মেয়েরাতো
অভিজ্ঞতায় পোড়া মোড়া
নয় রাজি
আবারও পুড়তে
তার প্রতি তাই আগ্রহ-হারা

রিকশাটা ডান দিকে
মোড় নিলেই
মৌচাকের মতো ভবনটি
সামনে ভেসে উঠবে
আর আতঙ্কিত বন্ধ গ্রিলের গেটটা

কিন্তু এখন
এই এখন
কাকে ডাকবে...

২৪.০৫.২০১২



যাত্রা

১.
বাড়ির দিকে উড়ছিলো বালিহাঁসটা
নির্জন নদীর উপর দিয়ে
তীরে বাঁধা নৌকার উপর দুইটা গাছ
ছায়া ঢালছিলো সারাক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ অন্ধকারের ছোঁয়া লেগে
মুছে মুছে যাচ্ছিলো সন্ধ্যায়
আমি দেখেছিলাম বহুদিন আগে

২.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো এ প্রশ্নে
ফিরে এসেছিলাম আবার
বাড়ির দিকে উড়ছিলো বালিহাঁসটা
নদীর উপর দিয়ে তখনও
তীরে বাঁধা নৌকার উপর একটা গাছ
ছায়া ঢালছিলো সারাক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ অন্ধকারের ছোঁয়া লেগে
মুছে মুছে যাচ্ছিলো সন্ধ্যায়
যেমন দেখেছিলাম আমি বহুদিন আগে

৩.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো দেখতে
ফিরে এসেছিলাম ফের এক সকালে
দেখলাম
যেমন দেখেছিলাম আমি বহুদিন আগে

৪.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো দেখতে
ফিরে এসেছিলাম আবার এক দুপুরে
বাড়ির দিকে উড়ছিলো বালিহাঁসটা
নদীর উপর দিয়ে সেদিনও
তীরে বাঁধা নৌকার উপর একটা গাছ
ছায়া ঢালছিলো সারাক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ অন্ধকারের ছোঁয়া লেগে
মুছে মুছে যাচ্ছিলো সন্ধ্যায় আগের মতোই
যেমন দেখেছিলাম আমি বহুদিন আগে

৫.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো দেখতে
ফিরে এসেছিলাম আবারো এক সন্ধ্যায়
বাড়ির দিকে উড়ছিলো তখনো বালিহাঁসটা
নদীর উপর দিয়ে
যেমন দেখেছিলাম আমি বহুদিন আগে

৬.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো দেখতে
ফিরে এসেছিলাম আবার বহুদিন পর
বাড়ির দিকে উড়ছিলো বালিহাঁসটা
নদীর উপর দিয়ে
তীরে বাঁধা নৌকার উপর একটা গাছ
ছায়া ঢালছিলো সারাক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ অন্ধকারের ছোঁয়া লেগে
মুছে মুছে যাচ্ছিলো সন্ধ্যায়
যেমন দেখেছিলাম বহুদিন আগে

৭.
বালিহাঁসটা কি বাড়ি পৌঁছালো দেখতে
যাচ্ছি আবার বহুদিন পর
জানি তো দেখতে পাবো আবার
বাড়ির দিকে উড়ছে বালিহাঁসটা
নদীর উপর দিয়ে
তীরে বাঁধা নৌকার উপর একটা গাছ
ছায়া ঢালছে সারাক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ অন্ধকারের ছোঁয়া লেগে
মুছে মুছে যাচ্ছে সন্ধ্যায়
যেমন দেখেছিলাম আমি বহুদিন আগে


৮.
কিন্তু না
আমি জানি না বালিহাঁসটা উড়ছে কিনা
বাড়ির দিকে
নদীটা এখনও নৌকাটকে ভাসিয়ে রেখেছে কিনা
গাছটা নৌকার উপর ছায়া ঢালছে কিনা

৯.
দেয়াল থেকে ছবিটি খুলে নেয়া হয়েছে
জানি না যে-দেয়ালে সাঁটাছিলো ছবিটি
ছবির প্রতি ঐ কোমল হাতের কোন্ মুগ্ধতা ছিলো
আর তা কিভাবেই বা হলো শেষ
ছবিটি কি দেয়ালটাকে বদলে ফেলেছে

১০.
হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে
গাছটা এখনো ছায়া ঢালছে নৌকাটির গায়ে
বালিহাঁসটা এখনো বাড়ির দিকে উড়ছে
মনে হচ্ছে বাড়িটি সন্ধ্যার রক্তিম আলোয় এখনো স্নান করছে

১১.
বালিহাঁসটা বাড়িতে পৌঁছালো কিনা তা আমি
জানতে পারলাম না আর

১২.
ছবিহীন স্থানটা একটা শূন্যস্থানের মতো লাগছে
আমার অভিজ্ঞতা আমার জ্ঞান
যা কখনই পূরণ করতে পারবে না আর

ছবিটা যে এঁকেছিলো
সে বাড়িাটকে অনেক বড় করে দেখিয়েছিলো
সেও সম্ভবত মৃত, আঁকার তারিখ ১৬২৪

আমি যে কারণে ফিরে ফিরে আসতাম
সেও কি একই কারণে এঁকেছিলো ছবিটি?
সে কি জানাতে চেয়েছিলো আমাদের?
সে কি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারলো
কিংবা আমি তার সাথে?

১৩.
তবু বাড়ি পৌঁছার একটা বিরামহীন চেষ্টা
দৃশ্যমান দেখতে পেতাম বাড়ি থেকে দূরে যেতে যেতে

বহুদিন জীবিত ছিলো তারা চোখের পাতায়
এই যে এখনই আবার দৃশ্যমান হলে যেনো

কেবলই মনে হচ্ছিল আমি ঐ বালিহাঁসটা
কিংবা ঐ শূন্য নৌকাটা যা সন্ধ্যায় অন্ধকারে
মুছে যাচ্ছে আর মুছে যাচ্ছে...

না-ছেঁড়া হলে হয়তো এতাদিনে...